এক থালা ফুল-ভাত ও একজন তমিজদ্দী

লিখেছেন - ইমরান নিলয়- | লেখাটি 567 বার দেখা হয়েছে

 

থালার ভাত থেকে ধোঁয়া উঠছে। হালকা ছাঁইরঙের ধোঁয়া। ছাঁইরঙের মিষ্টি ধোঁয়া। ভাতগুলো সাদা ঝরঝরে। হঠাৎ দেখলে একগাদা বকুল ফুল বলে বিভ্রম হয়। ভাত থেকে হালকা বকুল-গন্ধও কি তমিজদ্দীর নাকে আসে না? তমিজদ্দী ধাঁধাঁ খায়- এগুলো কি আসলেই ভাত না ফুল? সে থালার ভাত বা ফুলে হাত ডোবায়। হাত বোলায়। না ভাতইতো। কড়কড়া গরম ভাত। প্রতিটা ভাতের দানার স্পর্শ আলাদা আলাদাভাবে আঙ্গুলের স্নায়ু বেয়ে তার মাথায় পৌছে যায়। থালার বস্তুটা ভাত জেনেও নিশ্চিত হয় না বৃদ্ধ। তার নাকের ডগায় কচি বকুল-গন্ধ ধাক্কাতে থাকে। ধাক্কাটা মৃদু এবং স্পষ্ট।

 

বকুলের গন্ধ পাশে ঠেলে তমিজদ্দী সামনের থালায় মনোযোগ দেয়। প্লেটের একপাশে বেগুনভর্তা। সেটা তার দিকে চেয়ে আছে অসংখ্য বেগুনের বিচির চোখ দিয়ে। বেগুনভর্তার এখানে সেখানে কালো শুকনা মরিচ ছড়ানো-ছিটানো-মাখানো। অনেকক্ষন থেকে গালের ভেতর বিন্দু বিন্দু পানির জন্ম ও বেড়ে ওঠা অনুভব করে তমিজদ্দী। পানিটুকু টেনে নিয়ে সে ভর্তায় হাত দেয়। এবং প্লেটের একপাশে রাখা দুটো তেলেভাজা শুকনো মরিচের দিকে চোখ পড়ে তার। আলো পড়ে কালো মরিচের গা চিক চিক করে। এবং তমিজদ্দী এটাও খেয়াল করে যে- সামনে দুই বাটিতে করে আরো ফুল-ভাত এবং মুগ ডাল রাখা। মুগ ডালের মাঝ থেকে গোটাকয়েক মুরগীর হাড়ের মুখ দেখা যায়। তমিজদ্দী হাড়সংখ্যা বের করার চেষ্টা করে। দু'টা পা, একটা পাখনা? নাকি একটা পা, দু'টা পাখনা? না দু'টা পা, দু'টা পাখনা? সংখ্যাটা অমীমাংসিত থাকে অথবা তাকে অমীমাংসিত রেখে দেওয়া হয়। কারন তমিজদ্দীর ডানহাত থালার ওপর সক্রিয় হয়। তমিজদ্দী দ্রুত হাত চালায়। তার মনে হয় তার মুখে সেনাবাহিনীর দেয়া লালার বাঁধ ভেঙ্গে গেছে।

 

বেগুনভর্তা ঝাল হয়েছে বেশ। ঝাল মনে হয় ইচ্ছা করেই বেশি দেয়া। কারন তমিজদ্দীর পছন্দ ঝাল। মরিচগুলোতেও ঝাঁঝ আছে। এখনকার লুতুপুতু-মিষ্টি মরিচের মত না। তমিজদ্দীর ঝাল লাগে। গরম ভাত মুখের ভেতরের ঝালটাকে উস্কে দেয়। তমিজদ্দী হাঁ করে গরম ধোঁয়া ছাড়ে। তাতে ঝাল কমে না অবশ্য; কিন্তু আরাম লাগে কিছুটা। ঝালের চোটে তার খিদেও যেন বেড়ে চলে হু হু করে। খাওয়া শুরু করার আগে তমিজদ্দী বোঝে নি তার এত খিদা লেগেছে। গ্রাসের পর গ্রাস মুখে দেয় সে। দ্রুত ফুরিয়ে আসে থালার ভাত আর বেগুনভর্তা আর তেলেভাজা কালো মরিচ। ঝালের চোটে তমিজদ্দীর চোখ ভিজে যায়। পরনের স্যান্ডো গেঞ্জি দিয়ে তার চোখ মোছার অবসরে থালার দিকে তাকালে অল্প কিছু ভাত আর একটা কালো শুকনা মরিচ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এককালে এই থালায় বেগুনভর্তার অস্তিত্ব ছিল- নতুন দেখা যে কেউ তা নিয়ে সন্দিহান হবে।

অল্প একটু পানি গলায় ঢালে তমিজদ্দী। এতে কাজ হয়- ঝাল কমে খানিকটা। কিন্তু সম্প্রদান কারকের মতো স্বত্ত্ব ত্যাগ করে চলে যায় না। তমিজদ্দী বাটি থেকে ভাত নেয়। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মুগ-ডালের বাটিটা প্লেটের উপর উপুড় করে ধরে। ডালের গন্ধ ব্যাপন প্রক্রিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। আশপাশ ম ম করে। বৃদ্ধ তমিজদ্দী আবারো গ্রাসের পর গ্রাস ভাত মুখে ঠেলে দেয়। শুকনা মরিচ আকারে ছোট হতে থাকে ক্রমশঃ। ক্ষয়িষ্ণু মরিচের সাথে পাল্লা দিয়ে তমিজদ্দীর ঝালানুভূতি বাড়তে থাকে। সে হাঁ করে গরম ধোঁয়া ছাড়ে। তাতে ঝাল কমে না অবশ্য; কিন্তু আরাম লাগে কিছুটা। কিন্তু তা স্থায়ী হয় না বেশি। গরম ভাত মুখে আছড়ে পড়েই আগে ঐ ঝালটাকে উস্কে দেয়। তমিজদ্দীর থালার ভাত শেষ হয়ে আসে। তার পাগলাক্ষুদাও যেন হঠাৎ করেই আত্নহত্যা করে। ক্লান্ত তমিজদ্দী থালায় পড়ে থাকা মুরগীর হাড় কামড়ায়- খয়েরী অস্থিমজ্জা চোষে শব্দ করে। আরামে তমিজদ্দীর ঘুম পেয়ে যায়। সে চোখ বন্ধ করেই মুরগীর হাড় চোষে।

 

'দাদা, দাদা, উইঠা বহ। খাইবা না? মায় ভাত লইয়া আইছে। ও দাদা। খাইবা না?'

বিশাল স্যুয়ারেজ পাইপের গায়ে ঠেস দেয়া তন্দ্রাচ্ছন্ন তমিজদ্দী হয়ত তখন মুগডাল লেগে থাকা থালাটা চেটেপুটে নিচ্ছিল।

 

[মাঝে মাঝেই বাংলা টাইপ করি ঘটঘট শব্দ তুলে। আবজাবকে গল্প নাম দেই। কিন্তু এটা লিখতে গিয়ে যেটা কখনো হয় নি তা হয়েছে। ব্যাপারটা হয়ত একটু হাস্যকর।

আমি কেঁদেছি। আমি তমিজদ্দীর জন্য কেঁদেছি। ভেজা চোখ নিয়েই টাইপ করেছি।

আমার খুব ইচ্ছা করছিল শেষ দু'টো লাইন না লিখতে।

আমার খুব কল্পনা করতে ইচ্ছা করে- সবাই তিনবেলা না হোক দু'বেলা খাচ্ছে। বোধহয় সৃষ্টির সেরা প্রানী মানুষই একমাত্র প্রানী যে কিনা খাবার কষ্ট পায়।]

Share