রেডিও বাবাকোয়া

লিখেছেন - মোঃ ফরহাদ চৌধুরী শিহাব | লেখাটি 734 বার দেখা হয়েছে

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজতেই বাবাকোয়া তার রেডিওটা অন করে ওটার দিকে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে রইল। সে অনেক গবেষণার পর জানতে পেরেছে রেডিওতে নাকি মিলিটারিদের জন্য দূর্বার নামে একটা ছায়াছবির গানের অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। মিলিটারিদের অনুষ্ঠান- বিধায় তার মত একজন নিবেদিত প্রাণ মিলিটারির অবশ্যই এই অনুষ্ঠান শোনা উচিত। মিলিটারি হয়েছে বলে কোনো বিনোদন থাকবে না- এইটা সম্ভব না। তাদের অবশ্যই চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা থাকা উচিত।

দূর্বার অনুষ্ঠানের নাম ঘোষণার সাথে সাথে বাবাকোয়া নীল হেলমেট পরে গম্ভীর মুখে সটান হয়ে উঠে দাঁড়ালো। বিউগলের সুর শোনা যাচ্ছে। বাবাকোয়া সেটা শুনছে। মেজর মুরগীও তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে থম থমে মুখে। সে বুঝতে পারছে না কর্ণেল বাবাকোয়া কেন এই পুরনো বাক্সটার দিকে এত মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে? এটা থেকে বিচিত্র ধরণের শব্দ বের হচ্ছে। বাসায় তো একটা বড় কালো বাক্স আছেই, ওইখানে ছবি আর শব্দ দুটোই পাওয়া যায়। তাহলে কর্ণেল বাবাকোয়া শুধু শব্দ বের করা বাক্সের সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেন?

রেডিওটা কিছুদিন আগেও ছিল না। জাহিদ দিয়েছে তাকে। ট্রাংক ঘাটতে গিয়ে তার ভার্সিটি লাইফের রেডিওটা বেরিয়েছিল সেদিন রাতে। ব্যাটারি গলে গিয়ে ফুলে উঠেছে। প্রথমে ভেবেছিল নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু নতুন ব্যাটারি লাগিয়ে অন করা মাত্রই দিব্যি চলা শুরু করেছে। মৃদু শোঁ শোঁ একটা শব্দ হয় স্পিকারে, নয়তো বেশ ভালই শোনা যায় স্টেশনগুলো। এফ.এম. রেডিও নেই। মিডিয়াম ওয়েভে চলে। বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্র ধরিয়ে সেটা বাবাইকে দিয়ে দিয়েছে জাহিদ। এখন আর এসব শোনার সময় কোথায়? আগে হলে থাকতে টেলিভিশন ছিল একটা- কিন্তু বড় ভাইদের অত্যাচারে কোনো চ্যানেলই ঠিক মত দেখার জো ছিল না। তাই রেডিওটা কিনেছিল। মাঝে সাঝে গান শোনার জন্য। জাপানি কিছু চ্যানেল ধরতো তখন, সুন্দর সুন্দর টিউন প্লে করতো। ভালই লাগতো শুনতে।

এক সপ্তাহের মত হল বাসায় নোভেরা আর বাবলি নেই। বাবাই ব্যাপারটা তেমন ভাল ভাবে ধরতে পারছে না। বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল মা কোথায় গেছে বাবলিকে নিয়ে? জাহিদ ড্রইং রুমের ফ্লোরে শুয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিয়েছে, “আম্মু আর বাবলি ঘুরতে গেছে বাবা। সময় হলেই চলে আসবে।”

বাবাইয়ের কেন যেন উত্তরটা পছন্দ হয়নি। তার ধারণা খালামণি জবাবটা ভাল করে দিতে পারবে। কিন্তু আম্মু যাওয়ার পর থেকে খালামণিকেও আসতে দেখা যাচ্ছে না বাসায়। বিশাল ফ্ল্যাটে জাহিদ আর বাবাই ছাড়া এখন কেবল মাত্র মেজর মুরগীই রয়েছে। হাবিদলার ভোট্টু, কমান্ডো চিফ ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙ, বাবলির ইঁদুরগুলো- কেউ নেই। হঠাৎ করেই রাতা রাতি আম্মা আর বাবলির মত গায়েব হয়ে গেছে তারাও। হাবিলদার ভোট্টুর উদাস উদাস মন, এদিক সেদিকে বেড়াতে চলে যাওয়ার অভ্যাস আছে। কিন্তু বাকিরা কোথায় গেল সেটা নিয়ে বাবাকোয়া খুব চিন্তিত এবং মন খারাপ। তার “শিশু শিক্ষা প্রতিদিন” এর ক্লাস হচ্ছে না আর আগের মত। বিন্তি মাঝে মাঝে আসলেও ক্লাস হয় না। আম্মা না থাকায় প্রতিদিন বাবাকোয়া ঠিক মত নাস্তা খেয়ে স্কুলে যেতে পারছে না। এই বিষয়ে তার ডায়েরিতেও লিখেছে কর্ণেল বাবাকোয়াঃ

 

আম্মা আর বাবলি জানি কোথায় চলে গেছে। হাবিলদার ভোট্টু, কমান্ডো চিফ ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙ, বাবলির তিনটা ইঁদুর- কেউ নাই। বাবাকোয়ার মন খারাপ অনেক। মিলিটারিদের নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত। কিন্তু আম্মা না থাকায় কর্ণেল বাবাকোয়া এখন আর সকাল বিকাল হরলিক্স পায় না। ভাল পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার না খেলে শরীর ভাল থাকবে না। বাবাকোয়ার শরীর দূর্বল এখন। বাবা যদিও অনেক খেটে খুটে বাবাকোয়াকে নাস্তা বানিয়ে দেয় প্রতিদিন, অফিস থেকে আসার সময় হোটেল থেকে ভাত আর তরকারি নিয়ে আসে- কিন্তু বাবাকোয়া খেতে পারে না সে সব। অতিরিক্ত তেল থাকে। আম্মা বাবাকোয়াকে বলেছিল হটেলের খাবার না খেতে। বাবাকোয়া আম্মার কথা মনে রেখেছে, বাবাকোয়া ভাল মিলিটারি। সে খায় না। বাবা প্রথম প্রথম রাগ করতো। কিন্তু এখন নিজেই খেতে পারে না। অনেক আগে আগে অফিস থেকে চলে আসে। রান্না ঘরে গিয়ে চাল ডাল নিয়ে রান্না শুরু করে দেয়। বাবা ভাল রান্না পারে না আম্মার মত। বাবাকোয়ার খেতে অনেক কষ্ট হয়। কিন্তু না খেয়ে উপায় নেই। মিলিটারিদের প্রথম শর্ত হল শরীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখা। কর্ণেল বাবাকোয়া এই ব্যাপারে সর্বদা সচেষ্ট। 

কিন্তু বাবাকোয়ার বাবা কেমন জানি হয়ে গেছে। বাবা সন্ধ্যার আগেই বিছানায় শুয়ে পড়ে। মশারীও লাগায় না। সারাক্ষণ চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে একা একা। টি.ভি. দেখে না, পত্রিকাও পড়ে না। বাবাকোয়াও তার দেখা দেখি এখন সন্ধ্যা হলেই বাবার পাশে বিছানায় উঠে চুপচাপ শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেখানে তিনটা চিকন চিকন আর একটা ভোটকা টিকটিকি আছে। একটা মাকড়শাও আছে দেয়ালের কোণায়। পেটে ডিম নিয়ে বসে থাকে ধ্যানীর মত। দেখলেই কমান্ডো চিফ ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙের কথা মনে পরে যায়। আম্মা থাকলে মাকড়শাটা থাকতে পারতো না। আম্মা মাকড়শা ভয় পায় খুব। বাবাকোয়া আম্মার জন্য “মাকড়শা নিধন কর্মসূচি” হাতে নিয়েছিল আগে। কিন্তু আম্মা না থাকায় এখন আর কর্মসূচিটা চালাতে ভাল লাগে না।  

বাবাকোয়ার শুধু আম্মা আর বাবলির কথা মনে পড়ে.......” 

 

বাবাই তার নীল হেলমেট পরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিউগলের সুর শুনলো কিছুক্ষণ। তারপর পসে পড়ল মেজর মুরগীর পাশে। বাংলা সিনেমা থেকে গান দেয়া শুরু করেছে। শোঁ শোঁ শব্দের মাঝ দিয়ে গান ভেসে আসছে।

 

 

“......প্রতিদিন কত খবর আসে যে কাগজের পাতা ভরে

জীবন খাতার অনেক খবর রয়ে যায় অগোচরে

কেউ তো জানেনা প্রাণের আকুতি বারে বারে কেন যায়

স্বার্থের টানে প্রিয়জন কেন দূরে সরে চলে যায়

ধরনীর বুকে পাশাপাশি তবু কেউ বুঝি কারো নয়।। 

 

বাবাকোয়া গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মেজর মুরগীও গম্ভীর মুখে মৃদু গলায় কক্‌ কক্‌ করলো একবার। যেন বোঝাল, “গানের ভাষা ও সুর অত্যন্ত শ্রুতি মধুর। সুর এবং লয়ের অপূর্ব সমন্বয়!”

বাবাই মেজর মুরগীর দিকে শূণ্য দৃষ্টিতে তাকায়, “মেজর মুরগী, মনটা বড় উদাস উদাস লাগছে। কি করা উচিত?”

মেজর মুরগী পায়ের আঙ্গুল দিয়ে গলার র‍্যাঙ্কের ফিতাটা একবার চুলকে জাহিদের ঘরের দরজার দিকে তাকালো চিন্তিত ভঙ্গিতে। বাবাই সেদিকে এক নজর তাকিয়ে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল, “বাবার মন খারাপ। শুয়ে শুয়ে ছাদের টিকটিকি দেখছে। ওখানে গেলে আমারও মন খারাপ হয়ে যাবে। যাওয়া উচিত না এখন।”

মেজর মুরগী মন খারাপ করে ফ্লোরে মুখ নামিয়ে শুয়ে পড়ল।

ড্রইং রুমে টেলিফোন বাজছে। রেডিও’র শব্দ ছাপিয়ে যাচ্ছে টেলিফোনের একটানা ক্রিং ক্রিং শব্দ। বাবাই জাহিদের ঘরের দিকে তাকালো একবার। বাবা আসবে না মনে হয় ফোন ধরতে। নিজেই উঠে হাটতে লাগলো ড্রইং রুমের দিকে। সোফার পাশেই টেলিফোন সেটটা রাখা। বাবাইয়ের পেছন পেছন মেজর মুরগীও এসেছে। লাফিয়ে সোফায় উঠে ফোনতার দিকে সতর্ক ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল মেজর মুরগী। যেন টেলিফোন না, মাইন অপসারণের জন্য গেছে।

বাবাই রিসিভার তুলে নিল ভাবলেশহীন মুখে, “হ্যালো? আসসালামুয়ালাইকুম, কর্ণেল বাবাকোয়া বলছি। কাকে চান?”

ওপাশে দীর্ঘ একটা মুহূর্ত নীরবতা।

বাবাকোয়া অধৈর্য্য ভঙ্গিতে তার হেলমেটে আরো চেপে ধরলো রিসিভার, “হ্যালো? কে বলছেন?”

প্রায় সাথে সাথে ওপাশ থেকে একটা কান্না ভেজা গলা শোনা গেল, “হ-হ্যালো? বাবাই?”

কয়েকশো ওয়াট বাল্ভের মত জ্বলে উঠল মুখটা বাবাইয়ের। উজ্জ্বল মুখে হড় বড়িয়ে বলে উঠল, “আম্মা? কোথায় তুমি? কেমন আছো? বাসায় আসো না কেন? বাবলি কই?”

“বাবাই সোনা, ভাল আছিস বাবা?” ফোঁপাতে লাগল নোভেরা।

বাবাই কান্নার কারণটা বুঝতে পারছে না আম্মার। কেবল মুখ কালো করে বলল। “ভাল না আম্মা। বাবা ভাল রাঁধতে জানে না। পুঁড়িয়ে ফেলে সব। খেতে একটুও ভাল না।”

ওপাশে আবারও কান্নার শব্দ। কথা বলতে পারছে না নোভেরা। কান্নার দমকে কথা আটকে যাচ্ছে বার বার। বাবলির আনন্দিত গলায় হাসির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে বার বার। কোনো কিছু একটা দেখে সে মহা খুশি। ভোট্টুর মত একটা কুকুরের আওয়াজও পাওয়া গেল একবার মনে হল বাবাইয়ের। কিন্তু ঠিক স্পষ্ট না। মনের ভুলও হতে পারে।

“হ্যালো? আম্মা? কাঁদছো কেন তুমি?”

দ্রুত কান্না সামলে নিল নোভেরা, “এমনি, কিছু হয়নি বাবা। পড়াশোনা ঠিক মত করছিস তুই?”

“হু।”

“হোমওয়ার্ক?”

“নিয়মিত করি।” গম্ভীর স্বরে জবাব দেয় বাবাই। সে ভাল মিলিটারি। ভাল মিলিটারিদের ঠিক মত পড়াশোনা করতে হয়।

“তোর বাবাকে রেখে এদিক সেদিক যাওয়া যাওয়ি করবি না একদম।”

ঘাড় কাঁত করল বাবাই, “আচ্ছা।....... আম্মা, কবে আসবে তোমরা বাসায়?”

রিসিভারের মাউথ পিস চেপে কান্নার শব্দ আটকালো নোভেরা। তার ছেলেটা এমন হয়েছে কেন?

বাবাকোয়া মায়ের উত্তর শোনার জন্য ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু উত্তর আসে না। কেবল খুব ক্ষীণ স্বরে কান্নার শব্দ ভেসে আসতে থাকে স্পিকারে।

“আম্মা?”

“হু..... বল।” ঢোক গিলে কান্না ঠেকালো নোভেরা।

“বাবা একটা রেডিও দিয়েছে আমাকে। নিয়মিত দূর্বার নামে মিলিটারিদের জন্য গানের অনুষ্ঠান শুনি এখন আমি।” বেশ খুশি খুশি গলায় জানাল বাবাই।

“খুব ভাল করেছিস বাবা। তোর বাবার প্রতি খেয়াল রাখিস কেমন?”

“আচ্ছা।”

“আজকে রাখি টুকুন?”

“তোমাকে পাবো কোথায় আম্মা? আমি ঠিক করেছি রেডিওটার সঙ্গে একটা স্টেশনও খুলবো। রেডিও বাবাকোয়া। প্রথম শো’তে তোমাকে আর বাবাকে আনা হবে। ভাল না?”

“হু। খুব ভাল।”

“আমি এন্টেনা বসানো বিষয়ক পড়াশোনা শুরু করে দিয়েছি। খুব শীঘ্রই স্টেশন চালু করে দিবো। তখন তোমাকে আর বাবাকে নিয়ে শো করবো। তোমরা রেডি থাকবে।”

“ঠিক আছে..... শোন, তোর বেরি আন্টির কথা মনে আছে? মোটা করে আমার বান্ধবীটা? আমরা ওদের বাসায় আছি। ওর ফোন নাম্বারটা আছে ফোন বুকে দেখিস। ওখানে ফোন দিলেই আমাকে পাবি। পারবি না দিতে?”

বাবাই মাথা ঝাঁকালো, “পারবো।”

“ভাল থাকিস বাবাই সোনা। আজকে রাখি।” লাইনটা কাটার আগ মুহূর্তে বাবাই বিচিত্র একটা অস্থিরতা নিয়ে আবিষ্কার করল মা কাঁদছে আকুল হয়ে। ভয়াবহ একটা কষ্ট মিসে আছে সেই কান্নায়......

বাবাইয়ের সব কিছু এলো মেলো হয়ে যেতে লাগলো। মিলিটারিদের কঠিন মনের মানুষ হতে হয়। বাবাকোয়া খুব অবাক হয়ে দেখলো তার অস্থিরতা কেবল বাড়ছেই.........

 

 

কর্ণেল বাবাকোয়া অনেক খেটে খুটে ‘রেডিও বাবাকোয়া’রেডিও স্টেশন দাঁড় করিয়েছে। বাবাকোয়া মহাখুশি। রান্নাঘর থেকে ছয়টা এ্যালুমিনিয়ামের গামলা এনে তার দিয়ে বেঁধে ড্রইং রুম সহ নানান জায়গায় এন্টেনা লাগানো হয়েছে। মাউথ পিস হিসেবে দুটো স্টিলের গ্লাস আছে। তার দিয়ে বেঁধে বাবার সেই রেডিও’সাথে কানেকশন দিয়েছি। কথা বললেই শোনা যায়। শুধু একটাই সমস্যা। বাহিরের রেডিওতে এখনো কানেকশন পায় নাই আমার রেডিও স্টেশন। কাগজ পত্র না থাকলে বোধ হয় হবে না। চ্যানেল দিবে না। তাই আপাতত টেস্ট চালাচ্ছে বাবাকোয়া। ঘরের টেলিফোন লাইন দিয়ে দূরের ঘর বাড়ীতে অনুষ্ঠানের সম্প্রচার নিশ্চিত করেছে বাবাকোয়া, যতক্ষণ না বৈধ কাগজ পত্র আসছে টেলিফোন লাইনের মাধ্যমেই রেডিও বাবাকোয়ার অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। বাবাকে অবশ্য এই ব্যাপারে বলি নাই। যদি কাগজ পত্রের কথা নিয়ে হাসা হাসি করে? বাবাকোয়া নিজেই কাগজ পত্রের ব্যবস্থা করবে। সে মিলিটারি মানুষ। অন্যের ওপর নির্ভর করা ঠিক না। 

আজকে রাত সাড়ে আটটার সময় প্রথম লাইভ টক শো’তে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে থাকছেন বিশিষ্ট প্রকৌশলী, বাবাকোয়ার বাবা, জাহিদ হাসান। বাবাকোয়া খুব আনন্দিত নিয়ে। বাবাকে নিমন্ত্রণ পত্র পাঠানো হয়েছে ডাক যোগে। এখন কেবল অপেক্ষার পালা.......” 

 

জাহিদকে সন্ধ্যার আগেই বাবাই এবং মেজর মুরগী এসে গম্ভীর মুখে একটা হাতে বানানো কার্ড দিয়ে গেছে। রঙ পেন্সিল দিয়ে বাবাই লগো এঁকেছে, “RADIO বাবাকোয়া!” ভেতরে জাহিদের নাম আর অনুষ্ঠানের সময় দেয়া। রাত সাড়ে আটটায় তাকে রেডিও বাবাকোয়ার টক শো’তে যেতে হবে। জাহিদ চোখ গোল গোল করে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেছে, “এই রেডিও স্টেশন কবে চালু করলি তুই?”

“আজকেই। সাড়ে আটতায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সময় মত চলে এসো বাবা। আমার হাতে অনেক কাজ।” ব্যস্ত ভঙ্গিতে বাবাকোয়া চলে গেল। খানিক বাদে ড্রইং রুম থেকে খুটুর খাটুর শব্দ ভেসে আসতে লাগলো। জাহিদের আগ্রহ লাগছে না বাবাইয়ের কাজ দেখতে যাওয়ার। মন মেজাজ ভাল নেই। আগের মত বিছানায় চিত হয়ে শূণ্য দৃষ্টিতে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।

ড্রইং রুম থেকে বাবাকোয়ার গলা পাওয়া যাচ্ছে, “হ্যালো হ্যালো? রেডিও বাবাকোয়ায় আপনাকে স্বাগতম! আমি আপনাদের বেতার বন্ধু কর্ণেল বাবাকোয়া। আমার সঙ্গে সাউন্ড কন্ট্রোলিং’এ রয়েছে মেজর মুরগী। এটা আমাদের রেডিও’র পরীক্ষা মূলক সম্প্রচার চলছে..... আপনাদের জন্য এখন জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হবে......”

নভেরার গলায় মিষ্টি সুরে জাতীয় সংগীত ভেসে আসতে থাকে। জাহিদ অন্যমনস্ক হয়ে যায়। ওদের পুরনো টুইন ওয়ানে নোভেরা বাবাই হওয়ার আগে জাতীয় সংগীত সহ আরো অনেক গান গেয়ে গেয়ে রেকর্ড করে রেখেছিল। এই ছেলে সেটা খুঁজে খুঁজে বের করে ফেলেছে!

নোভেরার গলায় অদ্ভুত কিছু একটা আছে, কান পেতে শুনতে ইচ্ছে করে শুধু। বিশাল একটা শূণ্যতা বুকের ভেতরটায় এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত দৌরে বেড়াতে লাগল। চোখ বন্ধ করে ফেলল জাহিদ। প্রচণ্ড ভালবাসায় দূর্বোধ্যতা থাকে। সেই দূর্বোধ্যতার কোন সহজ অর্থও থাকে। জাহিদ অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না। তীব্র একটা হাহাকারে ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে আসছে তার......

 

“হ্যালো?” অনিশ্চিত একটা কণ্ঠ শোনা গেলো।

“কে? খালামণি?” খুশি খুশি গলায় বলল বাবাই।

“বাবাই!” প্রায় চেঁচিয়ে উঠল মিথিলা, “কেমন আছে আমার বাবাই সোনাটা?” বোনের মত গলা ভেঙে আসতে নিলেও সামলে নিল চট করে, “তোমার রেডিও স্টেশনের কি খবর কর্ণেল সাহেব?”

“খুব ভাল খালামণি। সাড়ে আটটা বেজে গেছে। এখনই উদ্বোধনী টক শো শুরু করবো। বাবা আজকের অতিথি। আম্মাকেও রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আম্মা তো আসতে পারলো না। তুমি আম্মাকে ফোনে নিয়াসো। এত ভাল একটা অনুষ্ঠান সবার শোনা উচিত। আমি ভাল জামা জুতাও পরেছি। মেজর মুরগীকেও ভাল করে শ্যাম্পু দিয়ে গোসল দিয়েছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে গোসল দেয়া উচিত হয় নাই। সর্দি লেগে গেছে। তুমি আম্মাকে নিয়াসো। এখনি অনুষ্ঠান শুরু হবে।”

বাবাকোয়া মিথিলাকে ঐ অবস্থাতে রেখেই দৌড়ে চলে এলো জাহিদের রুমে। ঘর অন্ধকার। তবে বাহিরের ঘর থেকে আসা আলোতে দেখা যায় অনেকটা। এখনো ছাদের দিকে উদাস উদাস চোখে তাকিয়ে আছে জাহিদ।

“বাবা?”

উঁ?”

“উঠো। অনুষ্ঠানের সময় হয়ে গেছে। উদ্বোধনী ভাষণ দিতে হবে তোমাকে। আসো!” গিয়ে জাহিদের হাত ধরে টানতে লাগলো বাবাই।

জাহিদ অনিচ্ছা শর্তেও উঠে বসল। বাবাই ওয়ারড্রব খুলে সুট তাই নিয়ে এলো বাবার জন্য, ‘এগুলা পরে নেও। প্রথম অনুষ্ঠানে পাঞ্জাবী লুঙ্গি পরে যাওয়া যাবে না।”

জাহিদ একটু অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু রেডিওতে তো মুখ দেখা যাবে না। এসব পরে লাভ কি?”

থমকে গেল বাবাই। এইটা তো আগে ভেবে দেখে নাই! বেচারা মেজর মুরগীকে আম্মার দামী শ্যাম্পু দিয়ে বালতিতে ইচ্ছে মত চুবিয়ে গোসল দিয়েছে সে- কোন দরকার ছিল না।

গম্ভীর মুখে কেবল বলল, “ঠিক আছে, প্যান্ট পরতে হবে না। কোট টাই পরে চলে আসো। সময় নাই হাতে। জাতীয় সংগীত চালু করা হবে এখনই!”

অগত্যা জাহিদকে ছেলের ঠেলা ঠেলিতে লুঙ্গি পাঞ্জাবীর ওপরেই কোট চড়িয়ে টাই লাগিয়ে আসতে হল ড্রইং রুমে।

ভেতরে এসেই আকাশ থেকে পড়ল জাহিদ! রান্না ঘরের সব গামলা- চেয়ার টেবিল, আলমারী, শো কেস- সব জায়গা থেকে ঝুলছে! ঘরের মাঝে তার পুরনো রেডিও আর টুইন ওয়ান সামনা সামনি রাখা। সাথে দুটো স্টিলের গ্লাস, টেপ দিয়ে তার লাগানো গ্লাসের পেছন থেকে। গিয়ে লেগেছে রেডিও’র লম্বা এন্টেনাতে! এক পাশে বড় একটা সাইন বোর্ড। রঙ পেন্সিল দিয়ে বড় বড় করে লেখাঃ “RADIO বাবাকোয়া!”

শিস দিয়ে উঠলো জাহিদ, “সেরেছে! এ দেখি এলাহি কাণ্ড করে রেখেছিস তুই! তোর মা একবার দেখলে হয়। ধোলাই দিয়ে.......” থেমে গেল মাঝপথেই। নোভেরার কথাটা নিজের অজান্তেই বলে ফেলেছিল। সামলে নিল দ্রুত, “কই? তোর অনুষ্ঠান শুরু কর?”

বাবাই উৎসাহী মুখে বাবার দিকে তাকায়, “এই তো, মেঝেতে গ্লাস গুলোর সামনে মুখোমুখি বসে পড়ো।”

“রেডিও স্টেশনের মত একটা জায়গা, তাও কোন চেয়ার টেবিল রাখিসনি? একেবারে ফ্লোরে?”

“সবে তো শুরু করেছি বাবা। আস্তে আস্তে সব হবে।” মুখ কালো করে ফেলল বাবাই।

জাহিদ এসে গ্লাস আর রেডিও’র সামনে বসল। বাবাই বসল ঠিক ওর মুখোমুখি। মেজর মুরগী সোফায় কুশনের ওপর বসে ঝিমাচ্ছে ঢুলু ঢুলু চোখে। বাবাইয়ের হাতে ‘শ্যাম্পু গোসল’ নামক ইঁচুর ডোবা খেয়ে সর্দি জ্বর উঠে গেছে তার। স্বাস্থ্য কর্মী বিন্তির কাছে যাওয়া দরকার।

“কই? তোর প্রোগ্রাম শুরু কর?” নিরুৎসাহী গলায় বলল জাহিদ। সোফার কাছে টেলিফোনের রিসিভারটা যে ঝুলছে দেখেনি যে। বাবাইয়ের দিকেই মনোযোগ। বাবাকোয়া তার নীল হেলমেটটা তুলে মাথায় দিলো, “বাবা উঠে দাঁড়াও, জাতীয় সংগীত শুরু হবে।” টুইন ওয়ানের সুইচ টিপে দিয়েই বাবাই উঠে দাঁড়ালো গম্ভীর মুখে। জাহিদ একটা নিঃশ্বাস ফেলে উঠে পড়লো ছেলের মত।

হারমোনিয়ামের মৃদু সুর শোনা গেল প্রথমে। তারপরেই কিন্বর কণ্ঠে নোভেরার গানটা ভেসে আসতে লাগলো।

 

“......কী শোভা, কী ছায়া গো,কী স্নেহ, কী মায়া গো-

কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে,নদীর কূলে কূলে

মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো—

মরি হায়, হায় রে মা, তোর বদনখানি মলিন হলে

আমি নয়ন জলে ভাসি।

আমার সোনার বাংলা,আমি তোমায় ভালবাসি......” 

 

নোভেরা এত সুন্দর করে রবি ঠাকুরের লেখা লাইনগুলো গাইতে লাগলো যে জাহিদ কিছুক্ষণের জন্য কেমন দিশেহারা হয়ে গেল।

জাতীয় সংগীত শেষ হওয়া মাত্রই বাবাই মাটিতে বসে পড়ল। একটা স্টিলের গ্লাস হাতে নিয়ে পানি খাওয়ার মত ধরে গম্ভীর গলায় বলা শুরু করল, “আসসালামুয়ালাইকুম, হ্যালো শ্রোতা বন্ধুরা, আপনারা শুনছেন RADIO বাবাকোয়া! সঙ্গে আছি, আমি আপনাদের বেতার বন্ধু কর্ণেল বাবাকোয়া। শারীরিক অসুস্থতার কারণে সাউন্ড সিস্টেমের মেজর মুরগী থাকতে পারেননি। তাই আমিই আজ থাকছি দুই অংশেই। আজ RADIO বাবাকোয়া’র প্রথম দিন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আমাদের মহান জাতীয় সংগীত দিয়েই শুরু করা হল। এখন উদ্বোধনী বার্তা নিয়ে আলাপণি অনুষ্ঠানে থাকছেন বিশিষ্ট প্রকৌশলী জনাব জাহিদ হাসান। তিনি আমার বাবাও। .... হ্যালো বাবা?” জাহিদের দিকে উজ্জ্বল মুখে তাকায় বাবাই।

জাহিদ দাঁড়িয়েছিল। তাড়াতাড়ি বসে পড়ে অন্য গ্লাসটা তুলে কেমন বোকা বোকা গলায় বলল, “হ-হ্যালো?”

“আপনার আজ কেমন লাগছে RADIO বাবাকোয়াতে আসতে পেরে?”

জাহিদ কথা খুঁজে পেল না প্রথমে, “ইয়ে মানে........... আসলে......”

“তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। মিলিটারি রেডিওতে ধীর স্থির হয়ে কথা বলাই ভাল।” বাবাকোয়া বড় মানুষের মত কথা যুগিয়ে দিল, “আপনার অনুভূতিটা বলুন আমাদের শ্রোতা বন্ধুদের উদ্দেশ্যে।”

জাহিদ মাথা চুলকালো, তারপর আবার বলতে লাগলো, “ইয়ে মানে... তোর মা থাকলে অনেক খুশি হতো আর কি। রেডিও স্টেশন দেয়া কি মুখের কথা নাকি! আমিই তো পারলাম না। তুই কিনা ছয়টা গামলা আর দুইটা গ্লাস নিয়ে রেডিও স্টেশন খুলে বসেছিস!”

বাবাই প্রশংসায় খুশি হল, তবে সেটাকে চাপা দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, “আপনি চাইলে আপনার সন্তান, স্ত্রীকে কিছু বলতে পারেন, সবাই শুনছে এটা। প্রিয় জনদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার থাকলে বলুন?”

দীর্ঘ একটা মুহূর্ত ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল জাহিদ। বাবাইয়ের ছেলে মানুষি কথাটায় হঠাৎ করেই বাবলি আর নোভেরার কথা মনে পড়ে গেল। হাত থেকে গ্লাসটা সামান্য নামিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে হেসে ফেলল হঠাৎ। কেমন যেন হেরে যাওয়া একটা হাসি।

বাবাই চুপচাপ বাবার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বুঝতে পারছে না বাবা এভাবে হাসছে কেন?

গ্লাসটা নামিয়ে রেখে ছেলের হেলমেটে হাত বুলিয়ে দিল, “বাবা, তুই একটু অন্য ঘরে যা। আমি একা একা কয়টা কথা বলবো তোর মাকে।”

বাবাই ভদ্র মিলিটারি মানুষ। কোনো কথা না বলে উঠে চলে গেল পাশের ঘরে। যাওয়ার সময় মেজর মুরগীকেও নিয়ে গেল।

বাবাইরা চলে যাওয়ার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টুইন ওয়ানটার কাছে ঝুঁকে এল জাহিদ। প্লে বাটনটা টিপে দিয়ে ভলিউম কমিয়ে দিল। নোভেরার গানের গলা ভেসে আসছে। সীমানা পেরিয়ে ছবির একটা গান খুব পছন্দ ছিল নোভেরার। গানটা গেয়ে রেকর্ড করে রেখেছিল সেটাই বাজছে-

                                     “বিমূর্ত এই রাত্রী আমার

                                      মৌনতার সুতোয় বোনা

                                        একটি রঙিন চাদর......”  

 

নোভেরা ঠিক আগের মতই গেয়ে চলেছে। কেবল জাহিদ বিব্রত গলায় হঠাৎ টুইন ওয়ানটা দু হাতে ধরে বাচ্চা মানুষের মত বলতে লাগলো, “বেগাম..... আমি ভালবাসার কথা বেশি বলতে পারি না। সব গুলিয়ে ফেলি...... তুমি তো জানো আমাকে..... তোমাকে ছাড়া আমার কিছুই ভাল লাগে না। আলুবতী আনন্দময়ীকেও কতদিন হল আলু হাতে হামাগুড়ি দিতে দেখিনি....... কবিতা শুনবে?

 

                               “....আধখানা এই দীর্ঘশ্বাসে 

                                      দুইটি মানুষ মিলে, 

                                  থমকে আছে সবটা আজও 

                                      যেথায় রেখেছিলে। 

                                   প্রহর শেষে তোমার কাছে  

                                      এসেছি আজ তাই, 

                                 পথের শুরুয় পাইনি তো কি? 

                                      পথের শেষে চাই........” 

 

তোমার কথা মত শেষ চার লাইন মনে রেখেছি, বাকিটা সারা জীবনই ভুলবো আর নতুন করে লিখবো। আমার কাব্যের আবর্তন তোমাকে আর তোমার লিলিপুটগুলোকে ঘিরেই...... সুট টাই আর লুঙ্গিতে তোমার ছেলে আমাকে কার্টুন বানিয়ে রেখেছে, এই অবস্থায় কাঁদাটা মানাবে না একদম........ আচ্ছা তুমি মিস করো তো আমাকে? আমি স্যরি বলতে পারবো না। তুমি চলে আসো প্লিজ। তুমি জানো আমি কতটা অপদার্থ। সকালে ডিম পোজ পর্যন্ত ঠিক করে করতে পারি না। সামান্য আলু ভাজির জন্য হলেও তোমাকে আমার চাই। তোমার আলু ভাজি ছাড়া আমার জগৎ শূণ্য বেগাম....”

চুপ হয়ে গেল জাহিদ। টূইন ওয়ানটাকে শক্ত করে ধরে রয়েছে ও। নোভেরার গানটা থেমে গেছে। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে কান্নার আওয়াজ পাচ্ছে সে। খুব নিচু স্বরে ঘরের ভেতরে কেউ কাঁদছে। অবাক হয়ে তাকাল জাহিদ। বুঝতে পারলো না ব্যাপারটা। কান্নার শব্দটা নেই। একটু আগেও তো ছিল!

 

রাত সাড়ে দশটা বাজার সাথে সাথে বাসায় কলিং বেলের শব্দ হল।

বাবাই তার  RADIO বাবাকোয়া নিয়ে ব্যস্ত। তাই দরজা খুলতে জাহিদকেই যেতে হল। এত রাতে কে এলো আবার? বিরক্ত মুখে দরজাটা খুলতেই থমকে গেল। বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল সামনে।

হালকা নীল শাড়ী পরে দাঁড়িয়ে আছে নোভেরা। চোখগুলো ফোলা ফোলা, একটু আগেও কাঁদছিল বোঝা যায়। কোলে বাবলি, ঘুমিয়ে কাঁদা হয়ে আছে মেয়েটা। একটা সেদ্ধ আলু খামচে ধরে আছে ঘুমন্ত অবস্থায়।

জাহিদকে দেখে হাসার চেষ্টা করল নোভেরা, “কেমন আছো?”

জাহিদ বোকার মত তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর আমতা আমতা করতে লাগলো, “ইয়ে মানে..... হ্যাঁ... ভাল! ..... পথে আসতে কোণ সমস্যা হয়নি তো?”

“হয়নি। নিচে ব্যাগ আছে। ড্রাইভারকে টাকা দেইনি। ভাংতি নেই। দারোয়ান ভাইকে নিয়ে ব্যাগটা নিয়ে এসো। ভারী দেখে তুলতে পারিনি।” নোভেরা আরেক দিকে তাকিয়ে কথাটা বলল। কান্না ঠেকাবার চেষ্টা করছে স্পষ্ট বোঝা যায়।

জাহিদ বিরক্ত হল এবার, “হাতির মত ব্যাগটা নিয়ে যাওয়ার কি দরকার ছিল? মানুষ একটা পঞ্চাশ কেজি, তার লাগেজ হচ্ছে পাঁচশো কেজি! ছোট ব্যাগ নিতে পারো না?”

“আমি কি জানি নাকি যে এক সপ্তাহ আলু ভাজি ছাড়া চলতে পারবে না তুমি! একেবারে RADIO বাবাকোয়াতে বসে হাউ মাউ জুড়ে দেবে ছাগলের মত!” মুখ ফিরিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকাবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে নোভেরা। কিন্তু পারছে না। চোখ উপচে ঠিকই পানি গড়িয়ে নামছে।

 

বাবাকোয়া ড্রইং রুম থেকে মা’র মত গলা শুনে গুঁটি গুঁটি পায়ে বেরিয়ে এল দেখার জন্য কে এসেছে। কিন্তু দাঁড়িয়ে গেল মাঝ পথেই। দরজার ওখানে মা বাবাকে ছোট বাচ্চাদের মত জড়িয়ে ধরে কাঁদছে আকুল হয়ে। বাবা শক্ত করে ধরে রেখেছে বাবলি আর মাকে। বাবার চোখেও পানি এসে যাচ্ছে, কিন্তু ঠেকিয়ে রেখেছে খুব কষ্ট করে। বেশিক্ষণ পারবে না মনে হয়।

বাবাকোয়া মিলিটারি ছোট মানুষ। তাড়াতাড়ি ড্রইং রুমে চলে গেল সে। এখানে থাকা ঠিক হবে না।

তবে হাবিলদার ভোট্টুর গলা শোনা মাত্র খুব অবাক হল বাবাই। আম্মা আর বাবলির সাথে ভোট্টুও ফিরে এসেছে। বাবাইকে খুঁজতে খুঁজতে ড্রইং রুমে এসে ঢুকল ভোট্টু। তাকে দেখেই জিভ বিঘত খানেক বের করে মহাআনন্দিত মুখে বাবাইয়ের সামনে এসে দুই থাবা মেলে শুয়ে পড়লো।

ভাবান্তর হল না বাবাইয়ের। অন্য গ্লাসটা তুলে ভোট্টুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর মুখে বলতে লাগলো, “RADIO বাবাকোয়া’র প্রিয় শ্রোতা বন্ধুরা, এখন আপনাদের সঙ্গে আলাপ করাবো বিশিষ্ট সামরিক ব্যক্তিত্ব হাবিলদার ভোট্টুকে। এক সপ্তাহের ছুটি কাটিয়ে সে ফিরে এসেছে। সে এখন আপনাদের তার ছুটির ভ্রমণ কাহিনী শোনাবে.....”

 

ডাইনিং টেবিলের নিচে বসে বাবাই তার নীল হেলমেট পড়ে ডায়েরী লিখছে। পাশে মেজর মুরগী, হাবিলদার ভোট্টু আর বাবলি। বাবলি উপুর হয়ে আলুর বাটি নিয়ে আলু খাচ্ছে। পাশের টিফিন বক্সে কমান্ডো চিফ ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙ ধ্যান করছেন।

 

৩৮২  

পরসমাচারঃ ছয়টা গামলা আর দুইটা গ্লাস নষ্ট করায় আম্মা ধোলাই মেরে RADIO বাবাকোয়া’অফিস উঠিয়ে দিয়েছে। বাবাকোয়ার মন খারাপ। একটা স্বাধীন মিলিটারি বেতার কেন্দ্র থাকতে পারবে না? এইটা অন্যায়, এইটা নিপীড়ন! 

তবে সুখবর হল, বাবাকোয়া মিলিটারি বাহিনীর মূল সদস্যরা ছুটি কাটিয়ে ফিরে এসেছে। কমান্ডো চিফ ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙ এগারো দিন পর জয়েন করেছে। বাবলির ইঁদুরেরাও। বাবাকোয়া অগ্রিম অফিসিয়াল লিভ নেয়ার ব্যাপারে তাদের ওপর অধ্যাদেশ জারী করেছে। অফিসে কিছু না বলে এভাবে চলে চাওয়া মোটেই উচিত হয় নাই তাদের। বাবাকোয়া দুশ্চিন্তায় ছিল অনেকদিন..... 

 

৩৮৩ 

.... কয়দিন আগে বন্যা হয়েছিল। চারিদিকে খালি ঘোলা ঘোলা চায়ের মত পানি। বাসার দুই তলার সিঁড়ি পর্যন্ত পানি উঠেছে। এই পানি নাকি খুবই দূষিত এবং স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। ছোট বাচ্চাদের নাকি নানান রকম পানি বাহিত রোগ ছড়ায় এখান থেকে। বাবাকোয়া শিক্ষিত মিলিটারি। সে বাবলিকে এই পানি খেতে কিম্বা ধরতে দেয় নাই। তবে মিলিটারি হওয়া সত্ত্বেও বাবাকোয়া সাঁতার জানে না। তাই সিঁড়ি পর্যন্ত উঠে আসা পানিতে বাবাকোয়া সাঁতার শেখার জন্য চেষ্টা চালিয়েছিল। পানি যেহেতু জীবাণু যুক্ত, তাই বাবাকোয়া আম্মার ড্রয়ারে রাখা পানি বিশুদ্ধি করণ ট্যাবলেটগুলো এনে সব সিঁড়ির পানিতে ছেড়ে দিয়ে পানি জীবাণু মুক্ত করেসাঁতার কাটতে নেমেছিল। 

কিন্তু আম্মা কেমন করে জানি চলে এসেছে। বাবাকোয়া সাঁতার শেখার আগেই আম্মা কান ধরে সবার সামনে দিয়ে বাবাকোয়াকে বাসায় টেনে নিয়ে গেছে। মাত্র ত্রিশটা ট্যাবলেট পানিতে ফেলার জন্য অনেক ধোলাই দিয়েছে। বাবাকোয়ার মন খারাপ। সামান্য কয়টা ট্যাবলেটের মূল্য কি একজন সম্মানিত কর্ণেলের চেয়ে বেশি হয়ে গেল? এইটা কি ঠিক? আম্মার তো খুশি হওয়া উচিত- সারা ঢাকা শহরের সমস্ত বন্যার পানি বিশুদ্ধ করে দিয়েছে বাবাকোয়া। খুব গর্বের বিষয় এটা। তাহলে ধোলাই কেন দেয়? আর আম্মার সব সময় বিন্তির সামনেই কান ধরে টেনে নিয়ে যায় বাবাকোয়াকে। এইটা মোটেও ঠিক হয় নাই। বিন্তি খালি ক্ষেপায়..... 

 

৩৮৪ 

...স্বাস্থ্য কর্মী বিন্তি সেদিন বাবাকোয়াকে রেগে গিয়ে খামচি মেরে বলেছে বাবাকোয়া নাকি বেশি গম্ভীর মানুষ, ভাব দেখায়। সে নাকি হাসতে পারে না! কখনও বলে বাবাকোয়া হাসে নাই! এইটা কি ঠিক? মোটেই ঠিক না। কর্ণেল বাবাকোয়া অনেক সুন্দর করে হাসতে পারে......”

 

নোভেরা বেশ কয়েকদিন ধরেই রান্নাঘরে যাওয়ার সময় একটু অবাক হয়ে লক্ষ্য করছে- বাবাই একটা টুল এনে কিচেনের বাহিরের বেসিনের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আশে পাশে কেউ না থাকলে প্রায়ই “হে হে হে এ এ এ” করে বিদঘুটে ভঙ্গিতে হাসার চেষ্টা করে। নোভেরা তাকালেই মুখ বন্ধ করে গম্ভীর হয়ে যায় বাবাই। রহস্যটা ঠিক কি সে এখনো বুঝতে পারছে না! কেবল বিস্মিত হয়ে প্রতিবারই ছেলেকে ধমক দেয়, “ছাগলের মত ব্যা ব্যা করে হাসিস কেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে? জিনে ধরেছে নাকি!”

 

(সমাপ্ত)

 


Share