বাবাকোয়ার ডায়েরি

লিখেছেন - মোঃ ফরহাদ চৌধুরী শিহাব | লেখাটি 772 বার দেখা হয়েছে

১.

"তেলেপুকা তেলেপুকা কুথায় তুমি যাউ?

এত্ত কাগুজ কেমুন করে চিবিয়ে তুমি খাউ?

খাচ্ছো কেনু বই খাতা আর জুতার কালো ফিতা- 

বুটের কালি খাউ নাকি ভাই- মিষ্টি নাকি তিতা?

আমিও খাই শাদা রবার- লাল কলমের কালি,

কেরসিনের তেল খেয়ে ভাই- পট করেছি খালি! 

আম্মা মারে ধুরুম ধারুম- আব্বা হাসে তাই 

বাবাকোয়ার সৈন্য নিয়ে- কুথায় আমি যাই?"

 

কর্ণেল বাবাকোয়ার মন খারাপ। সে বাবলিকে ধারাপাত শিক্ষা দেয়ার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে মাত্র দুদিন হল। তার নিজের হাতে লেখা ধারাপাতের শিক্ষামূলক বাণী সম্বলিত বই। সেই বই কিনা বাবলি তেলাপোকার মত খেয়ে ফেলা শুরু করেছে তার ছোট ছোট দুই জোড়া দাঁত নিয়ে। ইঁদুর কাগজ কেটে গুঁড়া গুঁড়া করে দেয়- কিন্তু তেলাপোকা গুঁড়া ফেলে রাখে না, পুরোটাই খেয়ে নেয়। বাবলিও তেলাপোকার মত সেই বই খেয়ে হজম করে ফেলছে। বাবাকোয়া চিন্তিত খুব ব্যাপারটা নিয়ে। আম্মাকে বিষয়টা জানানোর চেষ্টা করেছিল- কিন্তু নোভেরা তাকে কেরসিন তেল খাওয়ার কারণের ধোলাই দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। বাবাই বিষণ্ন মুখে ডায়েরি লিখতে বসে গেছে তাই।

 

বিশাল "তেলেপুকা" বিষয়ক ছড়াটা লেখার পর লিখেছে-

"আমাদের সবার উচিত আন্তর্জাতিক সমস্যা ফেলে দিয়া স্থানীয় সমস্যা নিয়ে চিন্তা করা। কিন্তু আম্মা সেইটা করতে চায় না। কর্ণেল বাবাকোয়ার কেরসিন তেল খাওয়া একটা আন্তর্জাতিক বিষয়। সেটা নিয়ে এখন চিন্তা না করে বাবলির কাগজ খাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা করা উচিত আমাদের সবার। কিন্তু আম্মা শুনে নাই। বিন্তির সামনে থেকে আবারও কান ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে ধোলাই দিয়েছে। এইটা কি ঠিকবাবাকোয়া এখন কর্ণেল হয়েছে। তাকে এইভাবে কোর্ট মার্শাল করা কি ভালবাবাকোয়ার মন খারাপ। তাকে তেল খাওয়ার অপরাধে মারা উচিত হয় নাই। বাবাকোয়া গবেষণা গ্রন্থে কেরসিন তেল নিয়ে একটা গবেষণা পত্র তৈরি করেছে বাবাকোয়া। সেখানে বড় বড় করে লেখা আছে- কেরসিন তেল খুব ভাল খাদ্য। খেলে গায়ে শক্তি বাড়ে! পুষ্টিকর। কিন্তু সেই সাথে বেশি বেশি করে হরলিক্স ও স্যালাইনও খাওয়া প্রয়োজন। নাহলে উদরাময় নামক একটা রোগ হয়। বাবাকোয়া এখন নিয়মিত বাংলা অভিধান পড়ে। সে জানে ডায়েরিয়ার বাংলা অর্থ কি। বাবাকোয়া বাবলির বই খাতা খাওয়ানো বন্ধ করা বিষয়ে গবেষণা করছে। কেরসিন তেলের ওপর বাবলির এখনও তেমন কোনো আগ্রহ জন্মায় নাই। বাবাকোয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কেরসিন খেলে নিশ্চই বাবলি বই খাতা খাওয়া ছেড়ে দেবে। বাবাকোয়াও তো ছেড়েছে।" 

 

মিথিলার ভার্সিটি বন্ধ দিয়েছে দুদিন হল। বাসায় এসে বাবাকোয়ার গবেষণা মূলক এই ডায়েরি পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য রাতারাতি বাসা থেকে কেরসিন তেলের সব বোতল সরিয়ে ফেলেছে যা বাকি ছিল। বাবাইকে জানতে দেয়নি। ঘুম থেকে ওঠার পর তেলের বোতলগুলো না পেয়ে বাবাকোয়া গভীর চিন্তায় পড়ে গেছে। কমান্ডো চিফ ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙ, মেজর মুরগী আর হাবিলদার ভোট্টুর ওপর দায়িত্ব দিয়েছে কেরসিন তেলের গায়েব হয়ে যাওয়া বিষয়টা নিয়ে তদন্তে নামতে। এই ভাবে মহান একটা গবেষণা শুরুর আগেই রসদ পত্র গায়েব হয়ে যাওয়া মোটেই ভাল কথা না। বাবাকোয়া ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছে। কেরসিন তেলের মত একটা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ হারিয়ে গেলে কেমন লাগে? বাবলির কাগজ খাওয়া বন্ধ হবে কেমন করে যদি তেল না পাওয়া যায়?

 

২.

ডাইনিং টেবিলটার নিচে দাবার বোর্ডে ঘুঁটি সাজিয়ে রেখে ডায়েরি লিখতে বসেছে বাবাই। মাথায় নীল হেলমেটটা চাপিয়ে গভীর মনোযোগের সাথে পেন্সিল দিয়ে খস খস করে লিখছে ডায়েরিতে। পাশেই মেজর মুরগী ডানার ভেতর মাথা ঢুকিয়ে ঝিমাচ্ছে। মাঝে মাঝে মাথা বের করে ঢুলু ঢুলু চোখে হাবিলদার ভোট্টুর দিকে তাকিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে মাথা আবার ঢুকিয়ে দিচ্ছে ডানার ভেতর। হাবিলদার ভোট্টু টেবিলের সামনে একটা মাছিকে কামড় দেয়ার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে অনেকক্ষণ হল। সে লাফ দিয়ে কামড় মারতে যাওয়া মাত্রই প্রতিবার মাছিটা উঠে যাচ্ছে আরো দুই হাত ওপরে। ভোট্টু জিভ বের করে হাফাতে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর আবার কামড় দেয়ার জন্য লাফ ঝাপ শুরু করে দেয়। কেবল কমান্ডো চিফ ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙ'এর মাঝে কোনো ভাবান্তর নেই। সে টিফিনের বক্সটার ওপর ধ্যান মগ্ন অবস্থায় বসে রয়েছে গত দুই ঘন্টা যাবত- নড় চড় করছে না একদম। বাবলিকে আশে পাশে দেখা যাচ্ছে না। সে একটু আগে তার আলুর বাটি নিয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে রান্না ঘরের দিকে গেছে। বোধ হয় আলু শেষ হয়ে গেছে। নোভেরার কাছে গেছে আলু সেদ্ধ নিতে।

কর্ণেল বাবাকোয়া বাবলির প্রাথমিক অক্ষর শিক্ষার কাজ অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে এর মধ্যে। বাবাইয়ের বানানো আগের ধারাপাত বইটা খেয়ে ফেলার পর বাবাই নতুন করে আরেকটা খাতায় বাবলির জন্য ধারাপাতের বই বানিয়েছে। সেখানে বাংলা বর্ণমালা শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজী ও অংকের ওপর দুটো অধ্যায় রেখেছে। সমস্যা হল বাবলিকে এখনও পর্যন্ত সে অ, আ ঠিক মত বলাতে পারছে না। বাবলি বই দেখলেই আলুর বাটি হাতে অন্যদিকে চলে যায়। বাবাকোয়া বিষয়টা নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছে।

“বাবলিকে প্রাথমিক অক্ষর শিক্ষা দেয়ার জন্য বাবাকোয়া নতুন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। পনেরো মাস বয়স হয়ে যাওয়ার পরেও নিরক্ষর থাকাটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। বাবাকোয়া আবার নতুন করে বাবলির জন্য ধারাপাত বই বানিয়েছে। আগের থেকেও সহজ ও সুন্দর করে লেখা হয়েছে এই বই। সেই সঙ্গে প্রতি পৃষ্ঠায় বাবাকোয়া নানারকম রঙিন ছবিও এঁকে দিয়েছে। যাতে সহজেই বর্ণমালা চিনতে পারে বাবলি। কিন্তু বাবলি কেন জানি সহজ সহজ পড়াগুলোও পড়তে চায় না। সন্ধ্যার পর বই খাতা নিয়ে ওকে পড়তে বসালেই আলুর বাটি হাতে নিয়ে হাটু পেড়ে পেড়ে আম্মার কাছে চলে যায়। আম্মার শাড়ী ধরে চোখ মুখ বাঁকিয়ে চেঁচাতে থাকে। আমি চেষ্টা করেছি তাকে ওখান থেকে এনে পড়তে বসানোর জন্য। আম্মা দেয় নাই। উল্টা বাবাকোয়াকে ধোলাই মেরে ভাগিয়ে দিয়েছে। বাবলির নাকি এখনও পড়ার বয়স হয় নাই। এইটা কি ঠিক? বাবাকোয়া কাউকে নিরক্ষর থেকে শিক্ষিত করার মহৎ চেষ্টা চালাচ্ছে আর আম্মা কিনা তাকে যখন তখন মাইর দেয়- এইটা কি ভাল? মোটেও ভাল না। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড হলে শিক্ষক জাতির কশেরুকা (আম্মা বলেছে মেরুদন্ডে নাকি অনেক কশেরুকা থাকে)। সেই হিসাবে কর্ণেল বাবাকোয়া একজন নিবেদিত প্রাণ জাতির কশেরুকা। তাকে এইভাবে মারা ঠিক না। জাতি কষ্ট পায়। বাবাকোয়ার বানানো বই পর্যন্ত আম্মা বাবলিকে পড়তে দিতে চায় না। পড়তে দিলেই আম্মা রেগে যায়, আমার কান ধরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে, “তোর বই পড়তে গেলে এইটা যে একটু আধটু কথা বলা শিখেছে- সেটাও ভুলে যাবে!”

কেন? বাবাকোয়া কি এতই খারাপ ধারাপাত বই লেখে? কত সহজ করে সোনামণিদের সহজ বাবাকোয়া ধারাপাত শিক্ষা লিখেছে বাবাকোয়া- আব্বা দেখেই বলেছে, “ভেরি গুড জব কর্ণেল সাহেব! এই কাজ জাদুঘরে রেখে দেওয়ার মত!” জাদুঘরে তো সব দূর্লভ আর ভাল ভাল জিনিস রাখা হয়। এত ভাল একটা প্রশংসা করার পরেও আম্মা কোনো কথাই কানে তুলতে চায় না। এইটা অন্যায়, এইটা নিপীড়ন! বাবলিকে স্বাক্ষরতা শিক্ষা দেয়া বাবাকোয়ার মত প্রতিটা মিলিটারির নৈতিক দায়িত্ব। কত সুন্দর করে বাবাকোয়া বই লিখেছেঃ 

অ-তে- অক্টোপাসটি আসছে তেড়ে।

আ-তে- আর্কিমিডিস গবেষণা করে।

ই-তে- ইলেক্ট্রনটি প্রোটনের চারপাশে ঘুর ঘুর করে। .......

কত সহজ স্বরবর্ণ শিক্ষা। আবার ব্যাঞ্জন বর্ণগুলাও কত ভাল ছড়া দিয়ে লেখাঃ

ক-তে- কলম্বাস বাসে চড়ে আমেরিকা যায়!

         আর বাবলি বসে আলু খায়!

খ-তে- খ্রিস্টপূর্ব মানে B.C  

         কিন্তু বাসায় নাই এসি!

গ-তে- গণ্ডার তৃণভোজী প্রাণি

         চল আফ্রিকা থেকে গণ্ডার ধরে আনি।.........

 

বাবলি বাংলা পড়াশোনাতে তেমন মনোযোগী না হলেও অংক বিষয়টাতে অনেক এগিয়ে আছে। বাবাকোয়া এই ব্যাপারে খুবই খুশি। বাবলি এখন এক দুই তিন পর্যন্ত গুণতে পারে। তবে একটা সমস্যা হয়েছে। বাবলিকে এক বলতে বললে ও বলে ‘একটা আলু’। দুই বলতে বললে বলে ‘দুইটা আলু’। কিন্তু তিন কিম্বা তিনের বেশি কিছু দেখালে ও সব সময় বলে ‘তিনটা আলু’ চার পাঁচ ছয়- সবই তার কাছে ‘তিনটা আলু’। বাবাকোয়া খুব চিন্তিত এই ব্যাপারটা নিয়ে। বাবলিকে তিনের ওপরে কোন সংখ্যাই শেখানো যাচ্ছে না। তাকে বাবাকোয়া চারটা কলম দিয়ে বলেছিল, ‘বলতো এইখানে কয়টা কলম আছে?’ বাবলি খুব মনোযোগ দিয়ে গোনার পর বলেছে, ‘তিনটা আলু’। বাবাকোয়া এই সংখ্যা সমস্যা নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মী বিন্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বিন্তি বলেছে বাবলির বয়স বাড়লে নিশ্চয় আরো বড় বড় সংখ্যা পড়তে পারবে। এখন ছোট দেখে পারে না। বাবাকোয়া তাই জোর করে নাই। বাবাকোয়া ভাল শিক্ষক।

তবে বাবাকোয়া বাবলির জন্য ব্যবহারিক ক্লাসের ব্যবস্থা করেছে ধারাপাতের। অ-তে অক্টোপাস শিখবে বাবলি- কিন্তু অক্টোপাস দেখতে কেমন সেটা জানবে না- এইটা ঠিক না। তাছাড়া অক্টোপাসের আটটা পা গুণতে গেলেও ওর অংক শেখা হয়ে যাবে- তাই বাবাকোয়া মিলিটারি বাহিনী অক্টোপাস খুঁজতে বেরিয়েছিল। তবে বাসার আশেপাশে অক্টোপাস পাওয়া যায় নাই। বাবাকোয়া তাই বাথরুম থেকে বড় ডিম ওয়ালা ভোটকা মাকড়শাটা ধরে এনে বাবার আতস কাঁচ দিয়ে বাবলিকে বড় করে মাকড়শাটা দেখিয়েছে। কারণ অক্টোপাস দেখতে মাকড়শার মতই। বাবলি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে ব্যবহারিক ক্লাসের প্রতি। সে মাকড়শাটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছে। পা’গুলাও গুনেছে। কিন্তু গুণার পরে আবারও বলেছে- ‘তিনটা আলু’। এইটা কেমন কথা? বাবাকোয়া খুব হতাশ। তাছাড়া ব্যবহারিক ক্লাস শেষে বাবলি মাকড়শাটাকে থাবড়া মেরে ভর্তা বানিয়ে দিয়েছে। এইটা ঠিক হয় নাই। বাবাকোয়া প্রাণি হত্যা পছন্দ করে না। বাবাকোয়া মিলিটারি বাহিনী সেই মাকড়শাটাকে যথাযথ সামরিক মর্যাদায় দাফন করেছে। স্বাস্থ্য কর্মী বিন্তি অবশ্য মাকড়শাটার ময়না তদন্ত করতে চেয়েছিল- কিন্তু সামরিক কাজে ব্যবহার হয়েছে দেখে আমি অনুমতি দেই নাই। সামরিক মর্যাদায় দাফন করতে গিয়েও সমস্যা হয়েছে। বাসায় কোথাও বিউগোল ছিল না। বাবাকোয়া তাই রেডিও বাবাকোয়া থেকে দূর্বার অনুষ্ঠানের সূচনা সংগীতের মিউজিক চালিয়ে দিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় দাফন করেছে। তাছাড়া বন্দুকের গুলিও করা দরকার ছিল বন্দুক না থাকায় বাবাকোয়া মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছে। একটা সামরিক বাহিনী চালানো আসলেই অনেক কঠিন! এত দারিদ্র!”

বাবাকোয়া গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডায়েরি লিখতে লিখতে। বাবলিকে দেখা যাচ্ছে গরম ধোঁয়া ওঠা আলু সেদ্ধ বাটিতে নিয়ে রান্না ঘর থেকে হামাগুড়ি দিতে দিতে বেরিয়ে আসছে আনন্দিত মুখে। বাবাই বোনের দিকে তাকিয়ে আরো বড় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বাবলি মিলিটারি বাহিনী চালাতে জানলে নিশ্চয় সারাক্ষণ এত আনন্দে থাকতে পারতো না। তাকে খুব শীঘ্রই মিলিটারিতে ভর্তি করে নিতে হবে, কিন্তু নিরক্ষর বলে সেটা পারছে না। তাকে বর্ণমালা না শিখিয়ে কীভাবে নেয় বাবাকোয়া মিলিটারিতে? বাবাকোয়া নিয়ম কানুনের দিক দিয়ে খুবই সচেতন। একটা আলু, দুইটা আলু, তিনটা আলু বলতে পারাকে বাবাকোয়া বাহিনী স্বাক্ষরতা হিসেবে দেখে না। আরো পড়াশোনা প্রয়োজন বাবলির। ছোট খালামণিকে এই বিষয়ে বলা উচিত। উনার অনেক জ্ঞান। নিশ্চয় কোনো না কোনো উপায় বের করতে পারবে সে। বাবাকোয়া আশাবাদী মিথিলাকে নিয়ে।

মিথিলা অবশ্য বাবাইয়ের নতুন ধারাপাত বই পড়ে দেখেছে। দেখার পর কেবল নোভেরাকে শুঁকনো মুখে বলেছে, “আপু, বাবাইয়ের বই আর যাই হোক বাবলির সামনে আসতে দিবি না! তাহলে আগামী পাঁচ বছরেও আলুবতী কথা বলা শিখবে না! একটা আলু, দুইটা আলু, তিনটা আলুতেই আটকে থাকবে!”

নোভেরা সূক্ষ একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে হতাশ গলায় বলেছে, “লাভ নেই। আমি তো আর সারাক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখতে পারবো না। সেদিন দেখি কোত্থেকে একটা তেলাপোকা ধরে এনে জাহিদের ম্যাগনেফাইং গ্লাস দিয়ে বাবলিকে দেখাচ্ছে সেটা। তেলাপোকা নাকি ‘প্রাগৈতিহাসিক’ প্রাণি। সেই প্রাগৈতিহাসিক প্রাণির সঙ্গে এক সময় ডায়নোসররাও বেঁচে ছিল। যেহেতু ডায়নোসর দেখানো সম্ভব হচ্ছে না- তাই তেলাপোকা দেখিয়ে প্রাগৈতিহাসিক জীব চেনাচ্ছে।”

নোভেরা অবাক হয়ে বলল, “তেলাপোকা আবার কেন দেখাচ্ছে যাচ্ছে? ধারাপাতে আছে নাকি? ত-তে তেলাপোকা?”

 

বিরক্ত মুখে মিথিলার দিকে তাকালো নোভেরা, “ত-তে তেলাপোকা হলেও তো সারা যেত। মিলিটারি সাহেব তো তার বোনের জন্য বায়োলজি শিক্ষা ক্লাসও খুলেছেন। সেই ক্লাসে আজকে ফড়িং ধরে তো কাল টিকটিকি। ঘর বাড়ী আমার চিড়িয়াখানা আর কৃষি গবেষণা ইনস্টিউট বানিয়ে ছেড়েছে! ধরে ধোলাই দিলেও আরেক সমস্যা। মানুষের ছেলে মেয়ে কত সুন্দর মার খেয়ে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে, সেই কাজ দ্বিতীয়বার আর করতে যায় না- কিন্তু এই ছেলে হয়েছে গৌতম বুদ্ধ! জাগতিক রাগ অভিমানের উর্ধ্বে থাকে। ধোলাই খেয়েও সেই কাজ আবার করতে যায় আমি একটু সরলেই! হয়রান পর্যন্ত হয় না! ওকে সামলাতে সামলাতে আমি নিজেই কাহিল হয়ে গেলাম! তারওপর এখন আবার নতুন ভূত চেপেছে- একটা কাঁচের বোয়ম যোগার করেছে, কোত্থেকে কোত্থেকে যেন ধরে নিয়ে এসেছে প্রায় শ’খানেক জোনাকি পোকা। সে নাকি প্রাকৃতিক আলোতে রাতের বেলা পড়াশোনা করতে চায়। সন্ধ্যা হলেই ঘরের বাতি নিভিয়ে সেই বোতল বের করে। সেই মিটমিটে আলোতে নাকি পড়বে!”

মিথিলা চোখ বড় বড় করে বোনের দিকে তাকায়, “দুলাভাই কিছু বলে না?”

চোখ মুখ কঠিন হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে নোভেরার, “ঐ গাধাটা আবার কি বলবে? ওর মতই তো হচ্ছে ছেলেটা। ছেলের জোনাকি পোকার বাতি বানানো দেখে উল্টা ছড়া কাটা শুরু করেছে তোর দুলাভাই-

 

“জোনাক বাতির তলেই বসে

করলে পড়াশোনা?

দেখছো নাকি চাঁদের আলো?

শুধাই জাহাঁপনা?

এক বোতলে আর কতটুক

শুদ্ধ আলো জোটে?

আকাশ জুড়ে এত্ত বিশাল

চন্দ্র কি রোজ ফোটে?”

 

মিথিলা ফিক করে হেসে দিল, “ভালই তো, দুলাভাই তাহলে বাবাইকে নিয়ে এখন জোনাকের বোয়ম ফেলে চাঁদের আলো দেখতে বের হবে। বাপ বেটা হা করে চাঁদের আলো গিলবে প্রতি সন্ধ্যা!”

“বাপ বেটা মিলে করলেও না হয় হতো,” বিরক্ত স্বরে বলল নোভেরা, “চাঁদ উঠলেই তো এখন আমাকে আর বাবলিকে ধরে নিয়ে যাওয়া শুরু করেছে ছাদে। ওদের সঙ্গে বসে বসে আমাদেরকেও চাঁদের আলো দেখতে হয়। বাবলিটা তো আর চাঁদের আলো বোঝে না- সে আলুর বাটি হাতে বসে বসে আলু খেতে থাকে আর হা করে চাঁদ দেখে। বাবাইয়ের মনে হয় চোখে সমস্যা- ম্যাগনেফাইং গ্লাস দিয়ে চাঁদ দেখে! আর তোর দুলাভাই হলেন রাজপুত্র সিদ্ধার্থ। তিনি গৃহ ত্যাগী হতে না পারলেও দূরবীন এনে ছেলের মত চাঁদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকেন! বদ্ধ পাগলের খাঁচায় আছি!”


৩.

বাবাই তার নীল হেলমেটটা মাথায় দিয়ে টিভির সামনে বসে আছে, গভীর আগ্রহে টিভিতে স্বাস্থ্য তথ্য দেখছে। মেজর মুরগী ওর পাশে বসে ডানার ভেতর মাথা গুজে ঝিমাচ্ছে। হাবিলদার ভোট্টু কিংবা কমান্ডো চিফ ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বোধ হয় ঘুরতে গেছে। বাবাকোয়া একটা টুল এনে একে বারে টিভির মনিটরের সামনে গলা বাড়িয়ে উৎসাহী মুখে তাকিয়ে রয়েছে। বাবলি তার আলুর বাটিটা নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে কার্পেটের ওপর। টিভির দিকে তার কোন আগ্রহ নেই। তার পোষা ইঁদুরের বাচ্চা তিনটা ওর সামনে ছোটাছুটি করছে মহা আনন্দে। বাবলি ওর আলুর বাটি থেকে তিনটা ছোট ছোট আলু সেদ্ধ দিয়েছে ওদের খেতে। তারা সেই আলু পেয়ে যার পর নাই আনন্দিত। আলু গুলোকে বলের মত গড়িয়ে গড়িয়ে খেলছে তারা। মৃদু কিঁচ কিঁচ শব্দ করে বাবলির দিকে তাকিয়ে কিছু বলছে একটু পরপর। বাবলিও যেন সব বুঝতে পেরেছে এমন ভাব করে মহানন্দে মাঝেতে হাত দিয়ে থাবা দিচ্ছে।

বাবাই স্বাস্থ্য তথ্য দেখার এক ফাঁকে বাবলি এবং ইঁদুর গুলোর দিকে হতাশ দৃষ্টিতে তাকাল। এত গুরুত্বপূর্ণ একটা অনুষ্ঠান ছেড়ে তারা সামান্য আলু নিয়ে এত ব্যস্ত! বাবাকোয়া ইঁদুর গুলোর দিকে একটু চিন্তিত মুখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। আলু সেদ্ধ খাইয়ে খাইয়ে বাবলি ইঁদুর গুলোকে নাদুশ নুদুশ বানিয়ে ফেলছে দিন দিন। এই বাসার ইঁদুর হিসেবে তারাও সামরিক ইঁদুর। এবং সামরিক ইঁদুর হয়ে শরীরের প্রতি যত্নবান না হওয়াটা অত্যন্ত অনুচিত কাজ। ওদের উচিত নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণ সুষম খাদ্য খাওয়া এবং সেই সাথে পরিমিত ব্যায়াম করা। কিন্তু বাবলির ইঁদুরগুলো একেকটা আধা কেজি হয়েছে আলু খেয়ে খেয়ে। ঠিকমত দৌড়াতেও পারে না, একটু ছোটাছুটি করলেই হাফিয়ে যায়। বাবাকোয়া একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে আবার টিভির দিকে তাকায়। স্বাস্থ্য তথ্য অনুষ্ঠানটা অতি প্রয়োজনীয় এবং শিক্ষা মূলক অনুষ্ঠান। বাবাকোয়ার মতে পরিবারের সবার উচিত নাটক সিনেমা দেখার মত এক সঙ্গে বসে স্বাস্থ্য তথ্য দেখা। কিন্তু বাবাকে দেখার জন্য ডাকতে গেলে বাবা খুব আগ্রহ নিয়ে দেখতে এসে বসা মাত্রই ঘুমিয়ে পড়েন। আর আম্মাকে ডেকে লাভ নেই। তার পরীক্ষা চলছে। সারাক্ষণ মোটা মোটা বই পড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ধারে কাছে গেলেও ধোলাই দিয়ে ভাগিয়ে দেন।

তাই উপায় না দেখে বাবাকোয়া একা একাই দেখতে বসেছে অনুষ্ঠান। কোলের উপর তার ডায়েরিটা খুলে রাখা, হাতে পেন্সিল। গুরুত্বপূর্ণ কিছু দেখালেই টুকে রাখছে। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটা লাইন লিখে ফেলেছে ডায়েরিতে-

“স্বাস্থ্য তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণীসমূহঃ 

এক. ছয় মাসের অধিক বয়সী শিশুকে দুধের পাশাপাশি নিয়মিত পরিমাণ মত শাক সবজি, ডাল, ভাত, মাছ-মাংস, ডিম খেতে দিন। এতে শিশুর মানসিক বিকাশ দ্রুত হবে। 

দুই. খাওয়া দাওয়ার আগে এবং পরে নিয়মিত সাবান দিয়ে ভাল করে হাত ধুয়ে দিন আপনার শিশুকে। 

তিন. শিশুকে নিয়মিত ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য দিন, তাহলে শিশুর দ্রুত হাড় গোড় শক্ত হবে এবং হাঁটা শিখবে........” 

বাবাই তৃতীয় লাইনটা লেখার পরেই কেমন যেন বিষণ্ন হয়ে গেছে। নিচে কার্পেটে হামাগুড়ি দিতে থাকা বাবলির দিকে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইল বাবাই। বাবলির বয়স প্রায় পনেরো মাস হয়ে গেছে। একটু একটু কথাও বলতে পারে ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে। কিন্তু এখনো নিজে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শিখেনি। কেউ ধরে তুলে হাঁটালে হাঁটতে পারে- ছেড়ে দিলেই ধপাস করে বসে পড়ে আবার।

বাবাকোয়া চিন্তিত মুখে টুল থেকে নেমে টিভিটা বন্ধ করে দিয়ে ডায়েরি হাতে ডাইনিং টেবিলের নিচে এসে ঢুকল। গম্ভীর মুখে পেন্সিল দিয়ে খস খস করে লিখতে থাকল-

“কর্ণেল বাবাকোয়া আজ খুব চিন্তিত। একজন সফল এবং সম্মানিত মিলিটারির বোন হয়ে বাবলি এখনো হাঁটা শিখতে পারে নাই। এইটা খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়। স্বাস্থ্য তথ্য অনুষ্ঠানে ডাক্তার আপা বলেছেন, “শিশুকে নিয়মিত ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার দিতে। তাহলে শিশুর দ্রুত হাড় গোড় শক্ত হবে এবং হাঁটা শিখবে।” কিন্তু বাবলি তো এখনো হাঁটা শিখে নাই। মনে হয় আলুতে ভাল ক্যালসিয়াম থাকে না। আম্মা বলেছে মুরগীর হাড্ডি চিবিয়ে খেলে তার ভিতরে ক্যালসিয়াম থাকে। বাবলির উচিত নিয়মিত হাড় গোড় চিবিয়ে খাওয়া। যেহেতু ওর উপরে নিচে দুইটা করে চারটা দাঁত গজিয়েছে- সে খাবার চিবিয়ে খেতে পারবে। বাবাকোয়ার উচিত একজন ভাল ও দায়িত্ববান ভাই হিসেবে বোনকে হাঁটার জন্য সাহায্য করা। বাবাকোয়া ভাল মানুষ। একটা শিশু এখনো হাঁটতে পারে না- এর থেকে দুঃখ জনক ঘটনা আর নাই। বাবাকোয়ার উচিত বাবলিকে সামরিক সহায়তা প্রদানের সকল ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা। বাবাকোয়া হাড্ডি গবেষক হাবিলদার ভোট্টুর সাহায্য নেবে ঠিক করেছে। ভাল ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ হাড্ডি কোথায় পাওয়া যায় সে নিশ্চই বলতে পারবে। কারণ ভোট্টু মাত্র দশ দিন বয়সের সময় দৌড়ানো শিখে গিয়েছিল। নিশ্চই উন্নত মানের ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ হাড্ডি খেয়েছে সে। তাকে জিজ্ঞেস করা উচিত বাবাকোয়ার......” 

ডায়েরি লিখতে লিখতেই বাবাই টেবিলের নিচে থেকে টিভি রুমে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াতে থাকা বাবলির দিকে উদাস উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আহা বেচারি! কতদিন হয়ে গেল এখনো হাঁটতে পারে না। হাসি মুখে সবাইকে আলু বিলিয়ে যাচ্ছে শুধু। নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলে নাই। বাবাকোয়া ভাল মিলিটারি। সে মানুষের কষ্ট বুঝে। তার উচিত বাবলিকে তাড়াতাড়ি নিজের পায়ে হাঁটতে সাহায্য করা। সে একটা বাংলা সিনেমায় দেখেছে নায়ক রুবেলের পা ভেঙে দিয়েছে ভিলেনেরা। সে হাঁটতে পারে না। সারাক্ষণ হুইল চেয়ারে বসে থাকে মন খারাপ করে। হাঁটতে না পারাটা খুব দুঃখের বিষয়। বাবাকোয়া বাবলির দুঃখ বুঝে। এত কষ্টের মাঝে থেকেও বাবলি হাসি মুখে থাকে সারাক্ষণ, মাদার তেরেসার মত আলু বিলিয়ে যায়। বাবলির মহানূভতার কথা চিন্তা করে বাবাই আরো উদাস হয়ে যায়। এত ভাল সমাজ সেবীকে বাবাকোয়া মিলিটারি বাহিনী থেকে একটা পদক দেওয়া উচিত। এর আগেও বাবাই পদক দেয়ার ব্যাপারে চিন্তা করেছিল। কিন্তু খালামণির সঙ্গে পরামর্শ করা হয় নাই দেখে আর পদকের বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি সে। এবারে সে নিজেই বাবলিকে সমাজ সেবা কর্মের জন্য পদক দেবে, সেই সঙ্গে ভাল একটা খেতাবে ভূষিত করবে। বাবলি কি খেতাব দেয়া যায় এটা নিয়ে বাবাই চিন্তিত। বাবার কাছে শুনেছে আমাদের দেশের সর্বোচ্চ পুরষ্কার হল একুশে পদক। বাবলিকে না হয় একুশে পদক দেয়া গেল একটা। কিন্তু উপাধি কিংবা খেতাব কি দেয়া যায়? বাবাকোয়া গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। বাবলিকে বাবা সব সময় আলুবতী আনন্দময়ী ডাকে। এই নাম কি খেতাব হিসেবে ঘোষণা দেয়া যায়? বাবা খুব জ্ঞানী মানুষ। বাবলি তাহলে রেডিও বাবাকোয়ায় সরাসরি সম্প্রচার করা অনুষ্ঠানে এনে একটা একুশে পদক ধরিয়ে দিয়ে আলুবতী আনন্দময়ী খেতাবটা সামরিক ভাবে তাকে দেয়া যাক।

বাবাই খুশি হল মনে মনে। খেতাবের বিষয়টার একটা সমাধান পাওয়া গেল। ডায়েরিতে পরবর্তী কার্যাবলীর বিবরণীতে দ্রুত লিখে ফেললঃ

“বাবাকোয়া মিলিটারির পরবর্তী কার্যাবলী  

এক. সমাজ সেবী বাবলিকে হাঁটার ব্যাপারে হাবিলদার ভোট্টুর কাছে তার মূল্যবান পরামর্শ চাওয়া হবে। ভাল ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ হাড্ডির সন্ধানে বাবাকোয়া মিলিটারি বাহিনীর একটি সুগঠিত এবং সুশৃঙ্খল প্লাটুনকে নিয়োগ দেয়া হবে। এছাড়াও বাবাকোয়া সিনেমায় দেখেছে কারেন্টের শক দিলে নায়ক দৌড়ানো শুরু করে। বাবলিকে কারেন্টের শক দেওয়া দরকার। এই ব্যাপারে বাবার সাহায্য নিতে হবে। বাবাকোয়ার বাবা খুব বড় ইঞ্জিনিয়ার। 

দুই. সমাজ সেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য বাবলিকে একুশে পদক প্রদান করা হবে বাবাকোয়া মিলিটারি বাহিনীর বার্ষিক মিলনি সভায়। অনুষ্ঠানটা রেডিও বাবাকোয়াতে সরাসরি সম্প্রচারের দায়িত্ব দেয়া হবে স্বাস্থ্যকর্মী বিন্তিকে। কারণ কর্ণেল বাবাকোয়া সেদিন পুরষ্কার বিতরণীতে ব্যস্ত থাকবে। সেদিন বাবলিকে ইঁদুর জাতির প্রতি গভীর মমতার জন্য তাকে “আলুবতী আনন্দময়ী” উপাধিতে ভূষিত করা হবে। এবং অনুষ্ঠানে সিভিলিয়ন অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেঃ বাবা, আম্মা এবং খালামণি। 

তিন. বাবাকোয়া মিলিটারিতে ভাল অস্ত্র নাই। এইটা খুবই দুঃখজনক বিষয়। একটা মিলিটারি বাহিনীর প্রধান এবং অতি দরকারী জিনিস হল অস্ত্র। বাবাকোয়া বাহিনী এই বিষয়ে খালামণির কাছে অর্থনৈতিক সাহায্য প্রার্থণা করবে। বাবাকোয়ার বিশ্বাস খালামণি বাবাকোয়া বাহিনীকে বাসার নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ লাঠি (কাঠের হবে, সংখ্যা- দুইটা) এবং কয়েকটা মর্টিন স্প্রে কিনে দিয়ে সাহায্য করবেন। সন্ধ্যা নামলেই বাবলিকে ইদানীং মশারা অনেক কামড়াচ্ছে। সে ছোট মানুষ এবং মহৎ বলে সেই তাদের মারে না। হাটু পেড়ে খাটের নিচে গিয়ে ঢুকে যায়। কিন্তু এইটা ভাল না। একজন সম্মানিতা সমাজ সেবীকে মশারা আক্রমণ করবে আর বাবাকোয়া বাহিনী চুপ করে বসে থাকবে- এইটা হবে না। বাবাকোয়া অবশ্যই নিরাপত্তার দিকেও কঠোর দৃষ্টি রেখেছে। বাবাকোয়া ঠিক করেছে মর্টিন স্প্রে পেয়ে গেলেই সন্ধ্যা নামার আগেই বাবলিকে স্প্রে করে মশা নিরোধক করে দেওয়া হবে। এবং প্রয়োজনে বাবলিকে কামড়াতে আসা মশাদের বাবাকোয়া লাঠি দিয়ে পিটিয়ে বাসা ছাড়া করবে। শুধু যে বাবাকোয়া বাসার কথাই ভেবেছে- তাই নয়। বাবাকোয়া বাহিনী বাসার চারদিকের যত ড্রেন, নালা নর্দমা আছে- সব জায়গায় দিয়ে লাঠি পিটিয়ে মশাদের মেরে আসবে। সেখানে স্প্রে করা উচিত হবে না। মর্টিন স্প্রের অনেক দাম। বাবাকোয়া এর আগে বাসার বাহিরের দুইটা ড্রেনের মশাদের মারার জন্য বাসার মর্টিন স্প্রেটা নিয়েছিল। এবং অপারেশন শেষে বাবাকোয়া সেই স্প্রে জায়গা মতই সুন্দর করে রেখেও দিয়েছিল। কিন্তু আম্মা কীভাবে জানি টের পেয়ে গেছে। স্প্রের বোতল খালি হয়ে গেছে দেখে আম্মা বাবাকোয়াকে ধোলাই দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। বাবাকোয়ার মন খারাপ হয়েছিল অনেক। আম্মা ধোলাই দিলেই কেবল ডান কানটা ধরে টেনে পিঠে ধুরুম ধারাম করে মারে। এইটা ঠিক না। বাবাকোয়াকে বিন্তি বলেছে যে তার ডান কান নাকি কয়েক ইঞ্চি লম্বা হয়ে গেছে। বিন্তি ভাল মানুষ। সে হাসে নাই। বাবাকোয়া আয়নায় দেখেছে। সত্যি সত্যি বাবাকোয়ার ডান কানের লতি বাম কান থেকে দুই ইঞ্চি লম্বা হয়ে গেছে। বাবাকোয়ার মন খারাপ। কান হল শারীরিক সৌন্দর্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেইটাও যদি দুই ইঞ্চি ছোট বড় হয়- কেমন দেখায়? স্বাস্থ্য কর্মী বিন্তি অবশ্য একটা সমাধান দিয়েছে। সে বলেছে বাবাকোয়াকে বাম কানটাও টেনে টেন লম্বা করে দুই কান সমান করে ফেলতে। খুব মূল্যবান সমাধান দিয়েছে সে। বাবাকোয়া এখন সময় পেলেই তার বাম কানের লতি টানতে থাকে। মাঝে মাঝে বিন্তিও টেনে দেয় গম্ভীর মুখে। সে বলেছে বাবাকোয়ার বাম কান নাকি এখন এক ইঞ্চির মত লম্বা হয়েছে। আরো এক ইঞ্চি লম্বা করা দরকার। বাবাকোয়া অধ্যবসয়ী মিলিটারি। সে কান সমান করেই ছাড়বে........ 

বাবাই দাবার বোর্ডের পাশে বসে গভীর মনোযোগের সাথে ডায়েরি লিখে যেতে থাকে।

 

নোভেরার এফ.সি.পি.এস পার্ট টু’র পরীক্ষা চলছে। সারাক্ষণ বাসায় বসে পড়তে হচ্ছে। বাচ্চা গুলোর দিকে তাকানোর মত সময় পাচ্ছে না ঠিকমত। বাসার যা কিছু সামলানোর মিথিলাকেই সামাল দিতে হচ্ছে আপাতত। ওর ভার্সিটির ক্লাস শেষ হলেই বাসায় চলে আসে। রান্না ঘরে গিয়ে খুটুর খাটুর শব্দ করে কাজ করতে থাকে। জাহিদও বেশ ব্যস্ত ইদানীং। অফিসে কাজের চাপ বেড়েছে। সকাল সকাল মুখে কোনোমতে অল্প কিছু খাবার গুজে দিয়েই অফিসে দৌড় দেয়। ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। বাবাই আর বাবলিদের দেখার মত সময় হয়ে উঠছে না কারই। বাবাইয়ের স্কুল ছুটি। সারাদিন বাসাতেই থাকে। স্কুলে গেলেই একটু স্বস্তিতে থাকতে পারে নোভেরা। বাসায় থাকলেই বিপদ। সারাক্ষণ কিছু না কিছু করে বেড়াচ্ছে বাবাই। পড়ার ফাঁকে রান্নাঘরে পানি খেতে গেলেই গত কদিন ধরে সে বেশ অবাক হয়ে দেখছে বাবাই ডাইনিং টেবিলটার নিচে হেলমেট মাথায় গম্ভীর মুখে বসে দুই হাতে নিজের বাম কানের লতি টানছে গায়ের জোরে। নোভেরা বিস্মিত মুখে প্রতিবারেই ধমক দিয়ে বলে, “কিরে! রামছাগলের মত নিজের কান টানছিস কেন?”

সে তাকানো মাত্রই বাবাই সাথে সাথে কান ছেড়ে দিয়ে গম্ভীর মুখে বসে ডায়েরি লিখতে থাকে। নোভেরা একটু সরে রান্নাঘরে গেলেই আবার কান ধরে টানা শুরু করে। নোভেরা পানি খেয়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কান ছেড়ে দেয় সরল মুখে। নোভেরা কেবল সন্দেহ জনক দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকায়। ছেলেটাকে নিয়ে হয়েছে যত সমস্যা। গত বেশ কিছুদিন ধরে যে শুধু কান ধরে টানা টানি করছে সেটাই না। ঘরের মধ্যে দুনিয়ার যতসব আবর্জনা মাখা বিশাল বিশাল গরুর হাড় গোড় নিয়ে আসছে সে আর কুকুরটা মিলে। সেই হাড্ডি নিয়ে ভাল করে সাবান দিয়ে ডলে ডলে ধুয়ে সেগুলো এনে খেতে দিচ্ছে বাবলিকে। নোভেরা এই ব্যাপারটা নিয়ে বেশ অন্ধকারে আছে। এত কিছু থাকতে হাড্ডি এনে খেতে দিচ্ছে কেন ছোট বোনকে? বড় ভাইরা তো কত সুন্দর চকোলেট, আইসক্রিম এনে খেতে দেয় ছোট বোন থাকলে। তার ছেলেটা এমন হয়েছে কেন?

সেই বিশাল সাইজের হাড্ডি দেখে বাবলি দীর্ঘ একটা মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে গোল গোল চোখে, তারপর প্রতিবারই ভয়ের চোটে ধনুকের মত শরীর বাঁকিয়ে বিশাল একটা চিৎকার দিয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে চলে আসে নোভেরার রিডিং রুমে। এসে সোজা টেবিলের নিচে নোভেরার পায়ের কাছে লুকায়। নোভেরা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে বাবলির পেছন পেছন বাবাইও তার বিশাল হাড্ডি দিয়ে চলে এসেছে এই রুমে। মাকে দেখেই চট করে হাড্ডিটা লুকিয়ে ফেলে পেছন দিকে। সরল মুখে কেবল হাসি দেয়।

নোভেরা তীক্ষ্ম চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বলে, “গাধার মত হাড্ডি নিয়ে এটার পেছন পেছন কেন দৌড়াচ্ছিস?”

বাবাই মুখ কালো করে হাড্ডি নিয়ে চলে যায়। কিছু বলে না। নোভেরা মহা দুশ্চিন্তায় পড়েছে ব্যাপারটা নিয়ে। এই ছেলে কখনোই কিছু বলে না। এত কিছু থাকতে হঠাৎ হাড় গোড় নিয়ে দৌড় ঝাপ শুরু করেছে কেন বোনের পেছনে- ধরতে পারছে না।

তবে খুব আশ্চর্যের বিষয়- নোভেরা একদিন সন্ধ্যার সময় পড়তে পড়তে পাশের ঘর থেকে শুনতে পেল বাবলি প্রতিদিনের মত গলা ফাটিয়ে একটা চিৎকার দিয়েছে। তারমানে কিছুক্ষণের মাঝেই হামাগুড়ি দিয়ে ছুটতে ছুটতে ওর পায়ের কাছে এসে লুকাবে। হাতের কলমটা বিরক্ত মুখে খাতার ওপর আছাড় দিয়ে ফেলে দরজার দিকে তাকালো। আজকে কর্ণেল সাহেবকে আচ্ছা মত ধোলাই দিতে হবে। ছেলেটা দিন দিন বাবলিটাকে জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে বাসার ছাদের সিমেন্ট ভেঙে ফেলতে শুরু করেছে। হাড় দেখিয়ে বোনটাকে ভয় দেখায় প্রতিদিন- আর হাড্ডি দেখেই মেয়েটা গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে থাকে। ওর চেঁচানির ঠেলার বাড়ীর ছাদ কাঁপতে থাকে। কোনদিন যে ছাদের সিমেন্ট খসে পড়তে আরম্ভ করে কে জানে!

কিন্তু খুব অবাক হয়ে দেখল - আজ বাবলি হামাগুড়ি দিয়ে নয়- রীতিমত নিজের দুই পায়ে দাঁড়িয়ে আলুথালু পায়ে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে ঢুকছে নোভেরার রুমে! আতঙ্কিত মুখে মায়ের দিয়ে ছুটে এসে ওর পা জাপ্টে ধরেছে! শাড়ীর কুঁচি ধরে কাঁদো কাঁদো মুখে কোলে উঠিয়ে নিতে বলছে ভাঙা ভাঙা গলায়, “কুলি উঠবোওওও! বাব্বাই ভালু না!” বাবাইকে সে এখনো ভাইয়া ডাকা শিখেনি। সবার মত বাবাইও ডাকতে পারে না। ‘বাব্বাই’ ডাকে।

নোভেরা অবিশ্বাসী গলায় বলে উঠল, “তুই হাঁটা শিখলি কবেরে বাবলি!”

বাবলির পেছন পেছন ততক্ষণে বাবাইও এসে ঢুকেছে ঘরে। মাকে দেখা মাত্রই হাতের হাড্ডিটা পেছনে লুকিয়ে ফেলল। গম্ভীর মুখে নোভেরাকে বলল, “আম্মা, দেখেছো- বাবলিকে হাঁটানো এবং দৌড়ানো দুটোই শিখিয়ে দিয়েছি। খুব ভাল হয়েছে না? একজন সমাজ সেবী নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না- এইটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। তবে হাড্ডির ক্যালসিয়াম না খেয়েই কীভাবে হাটা শিখে গেল- বুঝতে পারছি না!” বাবাইকে বেশ বিভ্রান্ত মনে হল। নোভেরার উত্তরের অপেক্ষা না করেই কি যেন চিন্তা করতে করতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

নোভেরা তখনো হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাবলি যে ওর শাড়ী ধরে টনছে এতক্ষণ ধরে- শুনতে পায়নি যেন। তারপর হঠাৎ মেয়েকে বোগল দাবা করে দৌড়ে ড্রইং রুমে চলে এলো। টেলিফোন তুলে জাহিদকে ফোন দিল।

বার কয়েক রিং হতেই জাহিদ ধরল ওপাশে, “হ্যালো? বেগাম?”

নোভেরা একেবারে হড়বড়িয়ে বলে উঠল, “তুমি এক্ষণি বাসায় চলে আসো!”

“কেন! কর্ণেল সাহেব কি এবারে জলদস্যু ধরেছেন নাকি?”

“ফাজলামো বাদ দাও তো! শোনো, তোমার মেয়ে কর্ণেল সাহেবের ওঝার মত হাড্ডি দৌড়ানি খেয়ে খেয়ে রীতিমত হাঁটা আর দৌড়ানো শিখে গেছে!”

“তাই নাকি! ইলেক্ট্রিক শক থিয়োরিতে কাজ হয় নাই তাহলে?” জাহিদ বেশ খুশি খুশি গলায় বলল।

“মানে! ইলেক্ট্রিক শক থিয়োরি কার?” থমথমে মুখে বলল নোভেরা।

“কার আবার? তোমার গুণধর পুত্রের। সে হাড্ডি থিয়োরির পাশা পাশি ইলেক্ট্রিক শক থিয়োরিও কাজে লাগাতে চেয়েছিল। সে নাকি ফিল্মে দেখেছে কারেন্টের শক খেয়ে নায়ক উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়াতে শুরু করেছে। তাই বাবলিকেও কারেন্টের শক দিতে চেয়েছিল। আমি আবার এই বিষয়ের ইঞ্জিনিয়ার তো- কর্ণেল সাহেব তার সামরিক বাহিনীকে সাহায্য করতে অনুরোধ করেছিলেন আমাকে।”

“তুমি কি করলে?”

“কিছু করিনি। তোমার ছেলেকে একটা পেন্সিল ব্যাটারি ধরিয়ে দিয়ে বলেছি- বড় মানুষের জন্য বড় কারেন্ট। আর ছোট মানুষের জন্য ছোট কারেন্ট। মানে ভোল্টেজ। তাকে ব্যাটারির দুই মাথায় দুটো তার লাগিয়ে দিয়ে বলেছি বাবলির হাতে দিয়ে শক দিতে। তাহলে নিশ্চই হাঁটা শিখে যাবে।”

“তারপর?” নোভেরা একটা নিঃশ্বাস ফেলে ক্লান্ত স্বরে বলল।

“তারপর আর কিছু না। আলুবতী আনন্দময়ী সেই ব্যাটারি নিয়ে মহানন্দে দিনরাত ঘোরাঘুরি করে। পেটের নিচে দিয়ে আরাম করে ঘুমায়।” হাসি হাসি গলায় বলল জাহিদ।

ফোনটা কানে ধরে মেয়েকে নিয়ে সোফায় বসে পড়লো নোভেরা। মুখ কালো করে বলল, “তোমরা বাপ বেটা এত কিছু করে বেড়াচ্ছো আর আমি কিছুই জানি না!”

“জানবে কোত্থেকে। সারাক্ষণ তো বইপুস্তকের ভেতর পড়ে থাকো। নিজের বাচ্চাদের শৈশব কৈশর যদি নিজের চোখে না দেখতে পেলে- জীবনটাই তো বৃথা!” হাসতে লাগলো জাহিদ।

বোগলদাবা করা আলুবতীর দিকে তাকালো, বড় বড় গোল গোল চোখ করে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে বাবলি। সে তাকানো মাত্রই মাড়ি বের করে সরল একটা হাসি দিল। একটু আগেও যে হাড্ডি দেখে ভয়ে দৌড় লাগিয়েছিল জীবনের প্রথম বারের মত- ভুলেই গেছে যেন। ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল নোভেরা, “হুম.... এখনো তো তাই’ই মনে হচ্ছে।”

“কর্ণেল সাহেব কোথায়? তাকে বলো তার জোনাক বাতি বের করে রাখতে। আজ রাতে জোনাক লাইট ডিনার হবে বাসায়। আমি চাইনিজ নিয়ে আসছি। ছোট বেগামকে ফোন দিয়ে হাজির থাকতে বল। আলুবতী আনন্দময়ী আজ প্রথম দৌড় দিয়েছে- সেটা উদযাপন করতে হবে না!” উদার গলায় বলল জাহিদ।

“আচ্ছা।” নোভেরা হতাশ মুখে ফোন রেখে দিল।

 

৪.

রাতের খাওয়া শেষে কর্ণেল বাবাকোয়ার জোনাক বাতির আলোয় আজ সবাই বসেছে টিভি রুমের সামনের বারান্দায়। বাহিরে জ্যোৎস্না নেই। মেঘে ঢাকা আকাশ। অন্ধকার। মৃদু মন্দ বাতাস বইছে এলোমেলো ভাবে। বৃষ্টি আসবে মনে হয়। বাবাইয়ের জোনাকের বোয়মটা সবার মাঝখানে রাখা। অদ্ভুত সবুজাভ আলোতে চারপাশটা কেমন যেন সুন্দর হয়ে গেছে। জাহিদ উদাস মুখে মাথার পেছনে হাত দিয়ে হেলান দিল দেয়ালে, পা লম্বা করে বিছিয়ে দিয়েছে সামনের দিকে। ওর পাশে একই ভাবে বসেছে নোভেরা।

“বেগাম?” জাহিদ বাহিরের দিকে তাকিয়েই বলল।

“হুম?” নোভেরা ওর দিকে ফিরলো। জোনাক বাতির আলোয় খুব অদ্ভুত লাগছে জাহিদকে। আধো অন্ধকারে বসে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বারান্দার গ্রিল পেড়িয়ে ওপাশের কালি গুলে দেয়া অন্ধকার আকাশটার দিকে।

“বৃষ্টি আসবে মনে হয়.... অনেকদিন কোনো রবীন্দ্র সংগীত শোনা হয়নি তোমার গলায়। গাইবে নাকি দু এক লাইন?”

নোভেরা আবছা অন্ধকারে মিথিলার আর বাবাইয়ের দিকে তাকিয়ে লাল হয়ে গেল। বাবাইকে গানের বিষয়ে তেমন আগ্রহী মনে না হলেও মিথিলাকে দেখা গেল মিটমিট করে হাসছে।

“ধুর। এখন আবার কিসের গান!” মৃদু স্বরে বলল।

“আরে গাও বেগাম। আলুবতী আনন্দময়ী তো শুনুক তার মা কত সুন্দর গলায় গান করতে জানে? তুমি তো বেচারির সামনে আজ পর্যন্ত কোনো গানই গাইলে না। তোমার গুণধর পুত্র তো তার রেডিও বাবাকোয়াতে দূর্বার শুনিয়ে শুনিয়ে মার্গারেট থেচার দ্য আয়রন লেডি বানিয়ে দিচ্ছে!”

নোভেরা বাবলির দিকে তাকালো। চুপচাপ মিথিলার কোলে বসে মার দিকে আগ্রহী মুখে তাকিয়ে আছে। যেন সেও বুঝতে পারেছে মাকে গান গাইতে বলা হয়েছে।

একটা নিঃশ্বাস ফেলে নোভেরা বলল, “গান গাইলে কিন্তু ভাল শোনাবে না আগে থেকেই বলে রাখছি। অনেকদিন গাওয়া হয়নি।”

হাত নেড়ে উড়িয়ে দিল যেন জাহিদ, “গলা ছেড়ে গাও বেগাম। তোমার গলা হল রত্ন খচিত গলা। কয়েক শতাব্দীতেও কিছু হবে না।”

লাল হয়ে গেল আরো নোভেরা। বাহিরের দিকে তাকিয়ে রইল দীর্ঘ একটা মুহূর্ত। তারপর খুব নিচু স্বরে গাইতে লাগলো গানটা-

“আমার ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন

আমার সকল দুঃখের প্রদীপ

গেলে দিবস, জ্বেলে করবো নিবেদন......”

তীব্র একটা হাহাকার যেন ছড়িয়ে পড়তে লাগল রাতের নিস্তব্ধ আঁধারের মাঝে.... কেবল নিঃসঙ্গ বাতাসের খেই হারিয়ে ছোটা ছুটির আওয়াজ পাওয়া যায়........

বাবাই মূর্তির মত বসে রয়েছে জোনাক বাতিটার সামনে। মায়ের গান শুনেও ছেলেটার মাঝে কোনো ভাবান্তর নেই। চুপচাপ বসে কি যেন ভাবে ছেলেটা সারাক্ষণ। গানটা শেষ হবার পর জাহিদ স্থির দৃষ্টিতে বাবাইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। এক সময় ছেলের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়েছে। বাহিরের কালো অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বাবাইকে আস্তে আস্তে ডাকল জাহিদ, “কর্ণেল সাহেব?”

“উঁ?” বাবাই এখনো তার বোয়মটার খুব কাছে বসে আছে গুটি সুটি মেরে। মাথায় নীল হেলমেটটা নেই। গম্ভীর মুখে জোনাক গুলোর দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে।

“খুব ঘুট ঘুটে অন্ধকার রাতে কোন জিনিসটা দেখলে মনে হয় বেঁচে থাকাটা স্বার্থক হয়েছে জানিস?”

বাবাই মাথার নাড়লো। সে জানে না।

“জোনাকিরা যখন দল বেঁধে অনেকটা জায়গা জুড়ে মেঘের মত উড়তে থাকে- তখন। আর সেটা কখন দেখা যায় জানিস?”

বাবাই আবার মাথা নাড়ায়। “কখন?”

“যখন অনেক গরম পড়ে, কিংবা যখন বৃষ্টি আসে- তার আগে।” গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল জাহিদ, “অনেক ছোট থাকতে দেখতাম আমি। তারপর আর বহুকাল দেখা হয়নি।।..... তোর কখনো দেখতে ইচ্ছা করে না?”

বাবাই খুব অবাক হয়ে জোনাকির বোয়মটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে বোয়মটার ঢাকনাটা খুলে দিল......

মুহূর্তের মাঝেই শত শত সবুজাভ জোনাকের নক্ষত্রে বাবাইদের বারান্দা আর রাতের অন্ধকার আকাশটা রাঙ্গিয়ে গেল অদ্ভুত এক অলৌকিক মুগ্ধতায়। বারান্দার গ্রিলের ফাঁক গলে জোনাকের মেঘ উড়ে যাচ্ছে রাতের এলো মেলো বাতাসের মাঝে। বিচিত্র এক ঢেউ সৃষ্টি করেছে জগৎ জুড়ে..... জাহিদ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে সেই জোনাকের নক্ষত্রের দিকে.......

বাবলি মিথিলার কোল থেকে ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে হঠাৎ বলে উঠল, “বাব্বাই ভালু...... উনিক ভালুউউউউ......”

বাবাই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাবার মত সেই নক্ষত্রের মেঘের দিকে। আহা! এ দৃশ্য না দেখলে কি মানব জনম স্বার্থক হয়?

 

(সমাপ্ত)

 

লেখকের কথাঃ 

আমার এক পাঠিকা আমাকে হঠাৎ করেই একদিন বলে বসলেন, "আচ্ছা, আপনি বাবলিকে এখনো হাঁটা শেখাচ্ছেন না কেন? ওর তো হাঁটার বয়স হয়ে গেছে! পনেরো মাসের একটা বাবুনি তো সহজেই হাঁটতে পারার কথা। ও তো এখনো হামাগুড়ি দিচ্ছে!"

আমি সেই পাঠিকার কথার পর বিশাল ভাবনায় পড়ে গেলাম। আসলেই তো! নিজের বিয়ে শাদী হয়নি দেখে এখনো বাচ্চা কাচ্চা বিষয়ে আমি খুবই অজ্ঞ। তার মানে তো আর এই না যে আমার বাচ্চা কাচ্চা হওয়া তক আলুবতীকে হামাগুড়িতেই আটকে রাখবো! নাহ। হাঁটানো দরকার দেখছি।

বাবলিকে হাঁটানোর জন্যই বসেছিলাম। দেখা যাচ্ছে তাকে দৌড়িয়ে তারপর উঠেছি!

নিছক ছেলে মানুষির ঘোরেই লিখলাম এবারের বাবাকোয়া। যখন প্রচণ্ড রকমের বিষণ্নতায় ভুগি- বাবাই হয়ে চারপাশ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলাটা আমার একটা অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এবারের বিষণ্নতাটাকে বাবাই কাটাতে পারেনি। কিছু কিছু বিষণ্নতা থাকে যার ঘোর সহজে কাটবার নয়। তবুও নিজেকে জোর করে কর্ণেল বাবাকোয়ার ছোট্ট সাদা মাটা জগৎটায় কিছুক্ষণের জন্য পাঠিয়ে দম আটকে আসা জীবন থেকে কয়েক মুহূর্তের জন্য ছুটি চেয়ে নিলাম। নাহ, এবারে কোনো এডভেঞ্চার নয়, কোনো চোর ধরা কিংবা জীন তাড়ানোর হুজুরের নাজেহাল হবার কাহিনীর সেই হাসি ঠাট্টায় ভরা বাবাইয়ের গল্প না লিখে তার সহজ সরল দিনগুলোর কিছু টুকরো ডায়েরিই লিখলাম এ দফায়।

আর উৎসর্গ করার কিছু নেই এবারে। সব সময় উৎসর্গ করতে হবে এমন কোনো কথা আছে!

 

 

Share