যারা লিখছো নিভৃতচারে- তাদের বলছি

লিখেছেন - -মোঃ ফরহাদ চৌধুরী শিহাব | লেখাটি 575 বার দেখা হয়েছে

লেখা লেখি নিয়ে সাধারণত কথা বার্তা বিশেষ বলি না আমি। সোজা কথায় সাহিত্য বিষয়ক আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহ নেই আমার। কারণ সাহিত্য সম্পর্কে জ্ঞান আমার খুবই কম। আমার সামনে বিশ্বসাহিত্য এবং বাংলা সাহিত্য (যদিও বাংলা সাহিত্যও বিশ্বসাহিত্যের অংশ। ভিন গ্রহের কিছু না। যাহাই লেখা হবে- তাহাই বিশ্বসাহিত্যের অংশ বলে গণ্য হবে। কথা হল ধরণ এবং মান- কোনটা কেমন সেটার ওপরের স্বীকৃতিটা নির্ভর করে) নিয়ে যখন কেউ জ্ঞান গর্ভ আলোচনায় বসে- আমি মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনি। এবং তার কথা থেকে খুব সাবধানে তার অবস্থান এবং দৃষ্টিভঙ্গিটা চট করে বুঝে নেয়ার চেষ্টা করি। সরাসরি আলোচনায় ঢুকতে যাই না, এবং কিছু বলতে গিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করতে ভাল লাগে না। কারণ আমি জানি এক ঘন্টা সাহিত্য নিয়ে ঘ্যানর ঘ্যানর করে বক্তৃতা দেয়ার চেয়ে দশ মিনিট খাতা কলম নিয়ে নিরিবিলিতে বসে লেখা লেখির চেষ্টা করাটা শ্রেয়। আমি বলছি না সাহিত্য নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন নেই- প্রয়োজন অবশ্যই আছে। তা থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। কিন্তু আমি খুব হতাশ হই তখনই, যখন দেখি কৃষি বিশেষজ্ঞের সংখ্যাই বেশি, কৃষকের সংখ্যা প্রায় শূণ্যের কোঠায়। এবং আরো বিরক্ত হই তখন, যখন শুনি এসব কৃষি বিশেষজ্ঞরা শুধু গবেষণাই করে গেছেন সারা জীবন। কঠিন এবং মৌলিক সাহিত্যের অন্বেষণে তারা সমস্ত চারা গাছ শ্রেণির সাহিত্যকে অপমান করে গেছেন, সমালোচনা করে গেছেন এবং হঠাৎ হঠাৎ করে তারা দু একটা প্রবন্ধ লেখেন বর্তমান সাহিত্যের অবস্থা নিয়ে হাপিত্যেশ করে, কটাক্ষ করে।

আমি সব সময় এই সব আলোচনাকারী ও গবেষণাকারীদের সামনে খুব বোকা বোকা মুখে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের কথাগুলো শুনে বোঝার চেষ্টা করি আসলে তারা কি বোঝাতে চাইছেন এবং তাদের ভাষায় একজন হাতে খড়ি নেয়া নবীন লেখকের "মৌলিক সাহিত্য" আসলে কোন পর্যায়ে থাকলে তারা সত্যিকার অর্থে "মৌলিক/ভাল সাহিত্য" বলে সার্টিফাই করবেন। আমি অধিকাংশ সময়ে দেখি তারা বরাবরই একটা নতুন লেখকের (লেখা ছাপা হয়েছে কিংবা হয়নি) লেখা পড়ে শুরুতেই খুব গম্ভীর মুখে বলে বসেন- এটা অমুক লেখকের মত হয়েছে, তমুক গল্পের সঙ্গে মিল আছে, কিংবা বাহিরের দেশের সাহিত্যের স্কেলে এটার অবস্থান কোথায়, বেশি সহজ হয়ে গেছে, কিংবা বিষয় বস্তু খুবই কমন- এসব। এবং সব সময় একটা কথা আমি সব দিক থেকেই শুনি- খুব বেশি বেশি করে পড়তে হবে। তাহলে ভাল লেখা বের হবে।

আমি নিজেও বেশি পড়ার দিকেই ভোট দেবো। কারণ একটা মানুষ সব পরিবেশ ঘুরে আসতে পারবে না, সব জায়গা দেখেও আসতে পারবে না। বই পড়েই সে সব জানতে হবে। তবে আমি বই পড়ার ওপরে স্থান দেই ঘোরা ঘুরিকে। অনবরত থিয়োরি ক্লাস করার চেয়ে যদি সম্ভব হয় প্র্যাক্টিকেল ক্লাস দু চারটা করাও উত্তম। এতে লেখকের চোখ ফুটবে। কিন্তু অনবরত খোঁচানো আমার পছন্দ না। আমার কাছে একজন নতুন লেখকের মৌলিক সাহিত্যের সংজ্ঞা একটু অন্যরকম। শুরুতেই কেউ দুনিয়া খ্যাত উপন্যাস লেখে বসে না। ধীরে ধীরে হতে থাকে সেটা। এটা যদি মহেশ গল্পকে এদিক সেদিক করে দ্বিতীয়বার লিখে এনে আমাকে কেউ দেখায়- আমি হাসি মুখে তাকে উৎসাহ দিয়ে বলবো "দারুণ হয়েছে! পরের গল্পটা এর থেকেও ভাল হওয়া চাই। তুমি শরৎচন্দ্রেও চেয়েও ভাল লিখবে একদিন!" আমি যে কথাটা না পড়ে বলি- তা না। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ে দেখার চেষ্টা করি- শরৎচন্দ্র সাহেবের মহেশ গল্পের বাহিরে এই নতুন লেখক আর কি কি নতুন লাইন জুড়ে দিয়েছে? আর কি কি নতুন অংশ যোগ করেছে? আর সেই অংশ গুলো কতটা শক্ত পোক্ত?

আমার অভ্যাস হল নকল সাহিত্যটাকে ছেঁকে আলাদা করে পাত্রে জমা বিশুদ্ধ সাহিত্যের স্রষ্টাটাকে আবিষ্কার করা। যখন বুঝতে পারি এই মানুষটার কলম নিজে নিজে একদিন কথা বলবে- তখন উৎসাহ দিয়ে যাই। আর যখন দেখি পাত্রে কিছুই পড়েনি ফিল্টার করার পরও; আমি হাসিমুখে সরাসরি সেটা বলে দেই "নিজে থেকে কিছু লিখো। চেষ্টা করো। হয়তো পেরে যাবে।" আমি শুরুতেই মানুষকে ছোট করে দিতে পারি না। কারণ আমি ছোটবেলায় চুল আঁচড়াতাম আমার মা যেভাবে আঁচড়ে দিতো। শার্টের নিচটা ইন করতাম আমার বাবা যেভাবে করতেন সেভাবে। এখন নিজে নিজেই চুল আঁচড়াই, নিজে নিজেই ইন করি কিংবা ছেড়ে রাখি।

সাহিত্য জিনিসটাও তেমন। আপনি যদি কঠিন সাহিত্য বুঝতে পারেন, তবে সহজ সাহিত্যটাকেও হজম করার ক্ষমতা রাখবেন। কারণ সবাই খুব শক্ত ধরণের নার্ভ নিয়ে কাগজ কলমের রাজ্যে নামেনি। খুব প্রতিভাবান মানুষও শুধুমাত্র একটু উৎসাহের অভাবে ঝরে যেতে পারে।

আমার নিজের জীবনের কথাই বলি।

আমি ছোট বেলা থেকে আঁকা আঁকি করতে ভালবাসতাম। লেখা লেখিটা দুই চোখের বিষ ছিল। একজন মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা কাগজ কলম নিয়ে পরীক্ষার খাতায় লেখার মত নিজে নিজে লিখে যাচ্ছে- কোনো কারণ ছাড়াই; খুব বিরক্ত হতাম বিষয়টা নিয়ে। আমার আব্বা দিনের পর দিন পেট মোটা ডায়েরি লিখে শেষ করতেন ক্লান্তিহীন ভাবে। আমি অবাক হতাম খুব। কিন্তু কখনো আগ্রহ হয়নি দুই কলম লিখার।

ক্লাস সেভেন পড়াকালীন সময়ে একদিন আমাদের ক্লাস টিচার কলিমুদ্দিন স্যার হঠাৎ করে ঘোষণা দিলেন, "আমাদের স্কুল ম্যাগাজিন বের হবে- তোমরা যে যা পারো লেখা জমা দিও।"

আমি মোটামুটি হতাশ মুখে তাকিয়ে রইলাম তাঁর দিকে। কারণ লেখা লেখি জিনিসটা আমি কিছু পারি না। ছবি আঁকা চাইলেও পারতো, কিন্তু সেবার ছবি আঁকা চায়নি আমাদের কাছে। গল্প, কবিতা, ছড়া চেয়েছে শুধু। কারণ সেবারে দ্বিতীয়বারের মত ম্যাগাজিনটা বের হচ্ছিল। অনেক ধরণের সীমাবদ্ধতা ছিল স্কুলের।

যা হোক, স্কুলের এই বিজ্ঞপ্তির কথা বাসায় এসে বলিনি আমি। ক্রিকেট ব্যাট হাতে মাঠে চলে গিয়েছিলাম খেলার জন্য। ম্যাগাজিনের কথা বেমালুম ভুলে গেছি। সে সময়ে খেলা ধুলাই ছিল আমার সব কিছু। স্বপ্ন দেখতাম জাতীয় দলে খেলবো একদিন। সেটারই প্রস্তুতি নিতাম প্রতিদিন। কাঠের বলে সম্ভব না হলেও মারুতি বলে খেলতাম। পড়াশোনাতেও দিন দিন খারাপ হচ্ছিল অবস্থা। সব পরীক্ষায় পাস করলেও বাংলায় সব সময় থাকতো ৩৪/৩৫ করে নম্বর।

ম্যাগাজিনের লেখা জমা দেয়ার তারিখে যে পেড়িয়ে যাচ্ছে আমার সেদিকে কোনই খেয়াল ছিল না। কারণ সেটার প্রতি তেমন কোন আগ্রহই বোধ করিনি তখন।

কিন্তু আমার বন্ধু শাহনূর মহা উৎসাহী মানুষ। লেখা জমা দেয়ার শেষ দিনে সে নিজে নিজে গিয়ে স্যারের কাছে দুইটা কবিতা জমা দিয়ে এলো নাম, রোল নাম্বার দিয়ে। জমা দিয়ে একান ওকান হাসি নিয়ে ফিরে এলো সিটে। আমি অবাক হয়ে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলাম, "তুই কবিতাও লেখিস্‌! তাও আবার একটা না! দুই দুইটা কবিতা! কীভাবে লেখলি?”

শাহনূর বিশাল একটা জ্ঞানী জ্ঞানী হাসি নিয়ে গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলল, “কাউরে বলিস না! কিশোর কন্ঠ থেইকা দুইটা কবিতা তুইলা আনছি! হে হে হে! একটা আমার নামে দিয়া দিছি, আরেকটা তোর নামে!”

স্যার সামনে থেকে ডাস্টার দিয়ে বাড়ি দিলেন টেবিলে, “কে কথা বলে রে! থাবরায়া দাঁত ফালায় দিবো!”

শাহনূর সাথে সাথে চুপ। আমি মোটামুটি অবিশ্বাসী একটা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম সেদিন ওর দিকে।

 

এক বছরের মাথায় ম্যাগাজিনটা বের হল। ক্লাস এইটে পড়ি আমি তখন। ম্যাগাজিনের সব ইতিহাস ভুলে বসে আছি ততদিনে। ক্লাস এইটের প্রথম সাময়িক পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে সেদিন। রেজাল্ট কার্ড হাতে নিতেই মোটামুটি আকাশ ভেঙে পড়লো আমার মাথায়। এতদিন কেবল বাংলায় ফেল করতাম। এইবারে আগের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছি। বাংলা, ইংরেজী দুই পত্র এবং অংক- মোট মাট চার সাবজেক্টে ডাব্বা খেয়েছি। বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার আশাও শেষ।

আমাদের সেবারের ক্লাস টিচার ছিলেন আমান উল্লাহ্‌ মজুমদার স্যার। তিনি পরীক্ষায় খারাপ করলেই বেত দিয়ে পিটিয়ে পাছায় চামড়া ছাড়িয়ে নিতেন। সেই চামড়া বাঁচাতে প্যান্টের ভেতরে আরো দুই একটা মোটা জিনসের থ্রি কোয়ার্টার পরে যেতাম। তাতে শুধু প্যান্টের ওপর দিয়েই বিপদ যেত। কিন্তু সেদিন ঘটনাক্রমে আমি রিপোর্ট কার্ড হাতে নিতে স্যারের সামনে দাঁড়িয়ে গেছি যথারীতি ধোলাই খাওয়ার জন্য, কারণ আগেই শুনেছি চারটা সাবজেক্টে ধরা খেয়েছি। স্যারের কাছে কার্ড নিতে গেলেই বেতিয়ে ভূত ছাড়াবেন।

কিন্তু কি আশ্চর্য! আমার চেয়ে দুই এক সাবজেক্টে কম ফেল মেরে রবিন স্যারের ধোলাই খেয়ে সিটে বিবর্ণ মুখে ফেরত যাওয়ার পরে আমি সিরিয়ালে স্যারের কাছে যেতেই স্যার হঠাৎ করে আমার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকানোর বদলে খুব নরম দৃষ্টিতে তাকালেন; যেটা কষ্মিকালেও তিনি করেননি ক্লাসের কারো প্রতি! আমার হাতে রিপোর্ট কার্ড দিতে দিতে কেবল বললেন, “অসুবিধা নাই। মাঝে মাঝে খারাপ হতেই পারে। লেখা লেখি করতে পারাটাও খুব বড় একটা ব্যাপার।” আমার পিঠ থাবরে দিলেন তিনি আদর করে। আমি সিটে ফিরে এলাম রিপোর্ট কার্ড হাতে হতভম্ব মুখে। আমি তখনও ঘোর অমাবস্যায়। ঘটনাটা কি ঘটেছে যে আমান স্যার ধোলাইয়ের পরিবর্তে আমাকে বাহবা দিলেন ফেল করার জন্য?

রহস্যটা পরিষ্কার হতে সময় লেগেছিল সেদিন আরো চল্লিশ মিনিট। ক্লাস শেষ পিয়ন এসে যখন সবাইকে স্কুল ম্যাগাজিনগুলো হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেল- আমি অলস মুখে পৃষ্ঠা ওল্টাতেই হকচকিয়ে গেলাম তৃতীয় পৃষ্ঠায় এসে। “দিলদার আলীর ছড়া” নামে বিশাল একটা ত্রিশ লাইনের কবিতা ছাপা হয়েছে পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে। এবং নিচেই বড় বড় হরফে নাম লেখাঃ “মোঃ ফরহাদ চৌধুরী শিহাব! সপ্তম শ্রেণি!”

তার পরের পৃষ্ঠা ওলটানো মাত্র ঝকঝকে ছাপার অক্ষরে লেখা আরেকটা কবিতা পেলাম। “মজার দেশে। শাহনূর রশীদ। সপ্তম শ্রেণি।” হতবিহ্বলের মত শাহনূরের দিকে তাকাতেই দেখি বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে চওড়া একটা হাসি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চেহারা দেখেই বোঝা গেল, “আমি বলছিলাম না? এই কবিতা না ছাপায়া যাইবো কই! অখন তুই আর আমি সমান বিখ্যাত কবি এই পাবলিক ইস্কুলে!”

কিন্তু আমি খুশি হওয়ার বদলে আরো দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। কারণ যতই ক্লাস এগোচ্ছে- একের পর এক স্যার এসে আমাকে আর শাহনূরকে প্রশংসা করে যাচ্ছেন। দিন শেষে এমন অবস্থা দাঁড়ালো যে আমাকে রীতিমত লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে বেঞ্চের নিচে। কারণ স্যার ম্যাডামেরা ক্লাসে ঢুকেই হাঁক দিচ্ছেন, “ফরহাদ-শাহনূর? দাঁড়ায়া যা। নিজেদের কবিতাগুলা আবৃতি করে শোনা!”

সমস্যা হল নিজের কবিতা নিজের মুখস্ত থাকে। অন্যের কবিতা মুখস্ত থাকে না- তারওপর যে কবিতা আগে চোখেই দেখিনি, সেটা গড় গড় করে আবৃতি করে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে থাকলেও শাহনূর কেউটেকো একটা ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় প্রতি ক্লাসেই। এবং সুন্দর করে আবৃতি করে যেতে থাকে তার কবিতা। শালা ভাল মতে করে বাসা থেকে ঝেড়ে এসেছে আগে থেকেই। ধরেই নিয়েছিল তার কবিতা ছাপা হবে। পরে যদি আবৃতি করে শোনাতে বলে- এজন্য আগে থেকেই মুখস্ত করে রেখেছে। বিপদ যত সব আমার ওপর দিয়েই গেল। যদিও ধরা পড়িনি। বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে থাকায় সবাই ভেবে নিয়েছে চার সাবজেক্টে ধবল ধোলাই খেয়ে বাসায় চলে গেছি। ক্লাস করিনি।

বাসায় ফিরে সেই বিপদ মহীরুহ বৃক্ষের আকার নেয়া শুরু করল অতি দ্রুত। কারণ আমার ব্যাগ ঘেটে আম্মা আগেই রিপোর্ট কার্ড আর ম্যাগাজিন বের করে নিয়েছেন। আব্বা সে সময় চিটাগাং এ ছিলেন। আমরা থাকতাম সিলেটে। বাসার সবকিছু দেখা শোনার ভার ছিল আম্মার হাতে। তিনি রিপোর্ট কার্ডের অবস্থা দেখে তারপর গম্ভীর মুখে ম্যাগাজিন ওল্টাচ্ছিলেন। সামনে আমি জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ভয়াবহ ধোলাইয়ের পূর্ববর্তী অবস্থা এটা। আম্মা এবং আব্বা আমাকে মার ধোর করার আগে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকেন। তারপরেই বেত নিয়ে শুরু করে দেন উত্তম মধ্যম। যদিও আমার জীবনে মধ্যম ধোলাই বলে কিছুই ছিল না। আগা গোড়া পুরোটাই উত্তম এবং অতি উত্তম।

কিন্তু খুব অবাক হয়ে দেখলাম আম্মা ম্যাগাজিনের “দিলদার আলীর ছড়া”টা বের করা মাত্রই বিস্মিত গলায় বলে উঠলেন, “তুই আবার লেখা লেখি কবে থেকে করিস! আমি তো কিছুই জানতাম না!”

আমি মিনমিন করে বলতে গেলাম যেটা ওটা আমার লেখা না, শাহনূর কোত্থেকে এনে আমার নামে ছাপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার। আমি সেদিন সত্য কথাটা বলতে পারিনি। আমার সামনেই আমার মা আব্বাকে ফোন দিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, “তোমার ছেলের লেখা ছেপেছে স্কুল ম্যাগাজিনে! বিশাল একটা কবিতা লিখেছে শিহাব! তুমি দেখলে অবাক হয়ে যাবে!”

আম্মার মুখে সেদিন আমি যে হাসিটা দেখেছিলাম- সেটা ভোলা আমার পক্ষে কেন, পৃথিবীর কোনো ছেলেরই ভোলা সম্ভব না যদি তাদের মা সেভাবে হেসে থাকেন একবারও তাদের সামনে।

আমি আর কিছু বলতে পারিনি।

আমার আব্বা চিটাগাং থেকে পরেরদিনই চলে এসেছিলেন আমার সেই লেখা দেখার জন্য। ছেলে এক সাবজেক্টে ফেল করলে যিনি পিটিয়ে পাত করে দিতেন, সেই মানুষটা অবাক হয়ে বলেছিলেন, “শিহাব তো দেখি আমার চেয়েও ভাল লেখে! এত ভাল লেখা শিখলি কীভাবে!”

তীব্র একটা অপরাধ বোধ থেকেই সেরাতে আমার লেখা লেখির শুরু হয়। দরজা বন্ধ করে দিয়ে লিখে যেতে থাকি একের পর এক কবিতা, গল্প, উপন্যাস। সেগুলো কোন ধরণের ভাল তো দূরের কথা- কোনো সাহিত্যই ছিল না। কিন্তু তারপরও লিখে যেতে থাকি আমি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। ভয়ংকর খেলা পাগল সেই ছেলেটা হঠাৎ করেই সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে খাতা কলমের রাজ্যে ডুবে যায় চিরতরে। বিচিত্র সব স্বপ্ন দেখা আরাম্ভ করি আমি তখন থেকেই। স্বপ্ন দেখতাম, তারপর জেগে উঠে সেই স্বপ্ন নিয়ে ডাল পালা গজানো গল্প, উপন্যাস লিখে ফেলতে লাগলাম। থামিনি আমি কখনো। খুব যে পড়তাম আমি তাও না। খুব অল্পই পড়তাম। তবে একটা জিনিসের দিকে সব সময় খেয়াল রেখেছি- আমার পূর্বের মানুষেরা যা কিছু লিখে গেছেন; অন্তত পক্ষে সেটার ধারণা নিয়ে রাখতাম। না হলে ব্যাপারটা এমন দাঁড়াতো সে আইনস্টাইন গবেষণায় নামার পূর্বে আগের বিজ্ঞানীদের কাজ কর্ম সম্পর্কে না জেনেই আগুন আবিষ্কারে লেগে গেছেন। তিনি যদি না জানতেন যে আগুন আবিষ্কার হয়েছে- তিনি নিশ্চই থিয়োরি অব রিলেটিভিটি বাদ দিয়ে আগুন আবিষ্কারের প্রতি মনোনিবেশ করতেন। কিন্তু তিনি পড়েছিলেন তার আগের মানুষেরা কি করে গেছেন, কি করেননি। তাই তিনি আইনস্টাইন হয়েছিলেন। ঠিক তেমনি ভাবে আগের সাহিত্যিকদের লিখে যাওয়া তরল-গড়ল সবই একটু আধটু পড়ে ফেলাটা উত্তম। তাহলে নতুন জিনিস নিয়ে চিন্তা করা সম্ভব।

কিন্তু একজন মানুষ তো আর এক নিমিষেই দুনিয়ার লক্ষাধিক সাহিত্য পড়ে তারপর লেখা লেখিতে নামতে পারবেন না। একটু একটু পড়তে পড়তেই তার হাতে খড়ি হবে। ধীরে ধীরে সেই মানুষটা অনেক কিছু জানবে, শিখবে। শুরুতেই যখন তাকে অমুক লেখকের লেখা কপি করেছো, তমুক বই থেকে নিয়েছো, কিংবা আরেক বিদেশী লেখকের লেখা অনুবাদ করে নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছো- এভাবে বলতে থাকে; স্বভাবতই সেই লেখকের লেখক সত্ত্বার মৃত্যু ঘটবে খুব দ্রুত।

আমি নকল কিংবা চুরি করাকে সমর্থন দিচ্ছি না। আমি কেবল বলছি- আপনারা এটুকু বুঝতে শিখুন কখন ছেলেটি কিংবা মেয়েটি মায়ের আঁচড়ে দেয়া চুলের স্টাইলেই চুল আঁচড়াচ্ছে, কখন বাবার মত শার্ট ইন করছে। কিংবা কখন সেই সময়টা পেড়িয়ে এসে নিজের ধারায় ঢুকেও নকল করে যাচ্ছে। নকল আর অনুকরণ শব্দ দুটো আলাদা জিনিস। প্রথমটা ধ্বংস করে, দ্বিতীয়টা প্রেরণা যোগায়। কিন্তু অনেক কৃষি গবেষকের চোখে কোনটা কোন পর্যায়ে আছে সেটাই তারা ধরতে পারে না। তার ধান কাটার সময়ের আগেই ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে চোখ বন্ধ করে।

ফলপ্রসু সাহিত্যালাপে আমিও আগ্রহি। কিন্তু চারা গাছ পর্যায়ের সাহিত্যের প্রতি আমার আগ্রহ তার চেয়েও বেশি। আমি মহান সাহিত্য খুঁজি না। আমার চোখ চারা গাছ খোঁজে সব সময়। যেটা একদিন বাংলা সাহিত্যের মাথায় ডাল পালা মেলে ছায়া দেবে সূর্যের হাত থেকে। আমি যে তেমন চারা গাছ খুঁজে পাইনি- সেটাও না। আমি পেয়েছি। সংখ্যায় সেটা খুবই কম। কিন্তু উৎসাহ দিতে আমার কোন কার্পণ্য নেই। উৎসাহের চেয়ে বড় অক্সিজেন একজন লেখকের জন্য আর কিছু নেই।

আমি নিজেকে সাহিত্যিক দাবী না করলেও নিজেকে বেশ গর্বের সঙ্গে লেখক বলে দাবী করি সব জায়গায়। এবং আমি জানি একজন লেখকের মন কতটা দূর্বল হয় ভেতরে ভেতরে। বাহিরে খুব শক্ত দেখালেও এরা ভেতরে থাকে শিশুর মত কোমল অবস্থায়। বাহিরের কটূ বাক্য বাণে অনেকেরই ভেতরটা ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায়। নিভৃতে হয়ত কোনোদিন কলমও তুলতে পারে না কাগজে ওপরে।

অথচ অনেক গবেষক জানেই না তাদের সামান্য কথার জন্য খুব বড় ধরণের সম্পদ প্রতিনিয়ত হারিয়ে ফেলছে বাংলা সাহিত্য। বাহিরের দেশের সাহিত্যের প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই। আমার আগ্রহ নিজের দেশের সাহিত্যের কতটা উন্নতি হবে সেটা নিয়ে। তাছাড়া বাহিরের দেশের সাহিত্য চর্চার স্কেলটাও অনেক উঁচু পর্যায়ের। আমাদের মত না। আমার ছোট চোখে আমি যতটা ধরতে পারি- ভবিষ্যত বাংলা সাহিত্য পশ্চিম বাংলা নয়, শুধু মাত্র বাংলাদেশকে ঘিরেই আবর্তিত হবে। কলকাতা সাহিত্যের যুগ ফুরিয়ে এসেছে বেশ আগে থেকেই। আমাদের নিজেদের দেশকেই এখন টেনে নিতে হবে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যকে ওপরে তুলে আনার জন্য।

কিন্তু অধিক জ্ঞানী মৎস্যের কারণে ছোট ছোট পোনা মাছগুলো আগেই ধরা পড়ে যাচ্ছে। যেটা কাম্য নয়। আমি কৃষক চাই, কৃষি গবেষক না। গবেষকের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু যারা ফসল ফলাবে- তারাই যদি সংখ্যা কমে যেতে থাকে গবেষকদের কারণে- আমি সেটাকে কোনদিনই সমর্থন দেব না।

আমি মানুষের লেখার ত্রুটি যেমন দেখি- একই ভাবে তার ভাল দিক গুলোও দেখার চেষ্টা করি। কারণ জানি, একদিন এই ত্রুটিগুলোকে ছাপিয়ে স্বরূপে বেরিয়ে আসবে এই লেখক। উৎসাহ দিতে আমার তাই ক্লান্তি লাগে না।

প্রচুর পড়া ভাল, জানা যায়; সেই সঙ্গে যদি ঘোরা ঘুরিও করা যায়- আমি মনে করি একজন লেখক তার প্রথমিক এবং মৌলিক দায়িত্বগুলো পালন করে ফেলবে। আলোচনার চেয়ে তখন বেশি প্রয়োজন হবে নিভৃত চর্চার। এক ঘন্টা আলোচনার চেয়ে দশ মিনিট লেখাকে আমি এগিয়ে রাখবো। আলোচনার প্রয়োজন যে নেই তা না, কিন্তু তার চেয়ে বেশি দরকার লেখা লেখির অভ্যাস। দশ মেইল হেঁটে গিয়ে আলোচনায় অংশ না নিয়ে আমি এক ঘন্টা লেখতেই পছন্দ করি। আলোচনার ক্লাস সব করতে হয় না, সেটা অপশনাল সাবজেক্ট। ফেল করলে সমস্যা নেই। কিন্তু সাহিত্যের ক্লাস সব করতে হয়- কারণ সেটাই মেইন সাবজেক্ট। আমি অনেক প্রতিভাবান ছেলেকে দেখেছি দিনরাত সাহিত্যের আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু লেখার পেছনে ন্যূনতম সময় যদি লাগাতে পারতো সেই অনুপাতে- হয়ত অনেক বেশি কিছু দিতে পারতো আমাদের আগামী দিনের সাহিত্যকে। কিন্তু ঝরে পড়ার সংখ্যাই বেশি।

সাহিত্য হোক অপরিকল্পিত, এক্সপেরিমেন্টে ঠাসা এবং সাহিত্যের জ্ঞান গর্ভ ক্লাসের ফাঁকিবাজ ছাত্র ছাত্রীদের জন্যই কেবল। এখানে আলোচনায় গিয়ে ব্যাকরণ সৃষ্টির কোন দরকার নেই। সাহিত্য ব্যাকরণের অংশ নয়। সম্পূর্ণই আলাদা জিনিস।

Share