বাচ্চা সমাচার ও একজন লেখকের দিনলিপিঃ

লিখেছেন - মোঃ ফরহাদ চৌধুরী শিহাব | লেখাটি 945 বার দেখা হয়েছে

এক.

সাত সক্কাল বেলা যদি মশারীর ভেতর কেউ মাথা ঢুকিয়ে কম্বলের কোণা ধরে টান দিতে থাকে, "দাদা? ও দাদা? ঘুমাও? দাদা? ও দাদা? আমার গ্রামার পরীক্ষা- একটু দেখায় দেও না!" কেমন লাগে?

ওপর তলার পূজা এসেছে তার ইংরেজী গ্রামার ক্লাস টেস্টের জন্য পড়তে। ওপরের ক্লাসের বাচ্চাদের পড়িয়ে আরাম আছে, ক্লাস থ্রীর বাচ্চাকে পড়িয়ে কোন আরাম নেই। আগা গোড়া পুরোটাই একটা বিশাল "মাথা ব্যথা"!

কিন্তু উপায় নেই। পূজা-চৈতির আম্মার ধারণা আমি মহা জ্ঞানী মানুষ। সারা রাত জেগে পড়াশোনা করি। কিন্তু সেগুলো যে কাজের বই না, অকাজের বই সেটা বুঝাই কেমন করে?

এজন্য তার নার্সারি আর থ্রী পড়ুয়া দুই মেয়েকে আমার ঘাড়ে এনে চাপিয়েছে পড়ানোর জন্য।

আল্লাহর দুনিয়ার তামাম পাখ পাখালিও এত কিচির মিচির করতে পারে না- যতটা না এই দুই মেয়ে করতে পারে! তাদের "এইটা কি? ওইটা কেন? কীভাবে?" এইসব প্রশ্ন শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে আমার। কানের যাবতীয় পোঁকা মাকড় যা ছিল- বেডিং পত্র গুটিয়ে ছুটি কাটাতে চলে গেছে দার্জিলিং।

এত সকালে ঘুম থেকে ঠেলে তোলার কারণে মাথায় ভেতরটা দীর্ঘক্ষণ হ্যাং করে ছিল। কোথায় আছি, কি করছিলাম- প্রথমে মনে পরলো না অনেকক্ষণ যাবত। কেবল টের পাচ্ছি মশারীর ভেতর মাথা গলিয়ে রোগা পটকা একটা পিচ্চি মেয়ে আমার হাত ধরে ঝাঁকাচ্ছে। নীল রঙের স্কুল ড্রেস পরা, মাথায় ছোট ছোট দুইটা শিঙের মত ঝুটি। ওর পেছনে তার থেকেও ছোট সাইজের আরেকটা মেয়ে। সেও মাথা গলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে মশারীর ভেতর। কিন্তু ঘুমানোর সময় তোশকের নিজে মশারী গুজে যেভাবে চীনের মহা প্রাচীর তুলে রাখি- মশা তো দূরে থাক- মানুষও ঢুকতে পারবে না। পূজা কোনও মতে একটা ফাঁক দিয়ে মাথা ঢোকাতে পারলেও চৈতি এখনও চেষ্টার উপরেই আছে। সুবিধা করতে পারছে না।

"দাদা? ও দাদা? ইংরেজী গ্রামার কাকে বলে? সেন্টেন্স কয় প্রকার? একটু বুঝায় দেও না?" পূজা আমার হাতের আঙ্গুল ধরে টানতেই আছে। যেভাবে টানছে তাতে ওরাং ওটাঙের সাইজের আঙ্গুল হয়ে যেতে বেশি সময় লাগবে না। অনায়াসে তখন গাছে গাছে ঝুলে ঘুরে বেড়াতে পারবো। গ্রিপিং সিস্টেম হবে মারাত্মক।

কিন্তু হুট করে ঘুম থেকে টেনে তোলায় কানের পাশ কেটে বেরিয়ে যাচ্ছিল কথা গুলো। চোখেও ভাল মত দেখতে পাচ্ছি না। কোনোমতে বললাম, "উঁ?"

সাথে সাথে গলার ভোল্টেজ আরো উঁচুতে চড়িয়ে বলল পূজা, "উঁ না! দাদা গ্রামার কাহাকে বলে?"

চৈতি বোনের বগলের নিচে দিয়ে সামান্য সুবিধা করতে পেরেছে ততক্ষণে। সে ইতিউতি করে মাথাটা ঢুকিয়ে প্রথমেই বলে উঠল, "দাদা? ঐটা কি? নাইটটা জ্বলে?"

ছোট একটা টর্চ নিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। অন্ধকার ভয় পাই আমি। মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেলে যখন ঘুম আসতে সময় লাগে- সেই সময় টর্চটা জ্বালিয়ে রেখে দরজার দিকে তাক করে থাকি। আজ জ্বলছে না। কারণে রাতে ঘুম ভাঙেনি। অনেক দেরি করে ঘুমাতে গিয়েছিলাম।

চৈতির কথায় সামান্য হুশ ফিরে আসা শুরু করল। কারণ পরিচিত শব্দ পেলেই মানুষের ঘোর কাটতে থাকে। "ঐটা কি? নাইটটা জ্বলে?" এই কথাটা হল চৈতির অতি প্রিয় শব্দ। এবং এই কথাটা প্রতিদিন বলে বলে আমার কান ঝালাপালা করে ফেলেছে এই আড়াই ফুট সাইজের মেয়ে!

আমি ঘোর কাটার সঙ্গে সঙ্গেই মোটামুটি আতঙ্কিত চোখে তাকালাম দুই বোনের দিকে। বড় বড় গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে আছে দুটাই আমার দিকে। দুজনের চোখেই বিরাট কৌতূহল।

তাড়াতাড়ি পূজার হাত থেকে গ্রামার বইটা নিয়ে বাসি মুখেই বোঝাতে লেগে গেলাম গ্রামার কাকে বলে, সেন্টেন্স কি, কত প্রকার ও কি কি। সবগুলো বুঝিয়ে যখন শূন্যস্থান পূরণ দেখাতে বসেছি- দ্বিতীয়বারের মত আবিষ্কার করলাম আমার সদ্য নাযিল হওয়া এবং স্নেহাস্পদ এই দুই ছাত্রীর মাঝে বড়টা আমার মতই শূন্যস্থান সমস্যায় জর্জরিত। ছোট বেলায় আমি সব সময় শূন্যস্থান ছেড়ে এসে দিয়ে ভারী গলায় বলতাম, "কিছু কিছু শূন্যস্থান কখনই পূরণ হবার না আব্বা!"

আর আমার এই ছাত্রী শূন্যস্থান দেখলেই ভাবুক দৃষ্টিতে দেয়ালের টিকটিকির দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে উত্তর দেয়, "দাদা? একটা মানুষকেই সব পারতে হবে কেন বলেন? কয়টা শূন্যস্থান না পারলে কি কিছু হয়?"

আমার বড় ছাত্রী পূজা বর্তমানে পরীক্ষার হলেও তার উচ্চমর্গীয় চিন্তা ভাবনায় ব্যস্ত আছে বলে আমি আতঙ্কিত।

আমি বুঝিনা ঘুরে ফিরে সব একই টাইপের মানুষগুলোর দেখা হয় কেমন করে!

আর চৈতি বর্তমানে আমার ইহকালীন জীবনে সর্বোচ্চ ক্ষতি সাধন করে ফেলেছে আজ সকালে। বাথরুমে গিয়েছিলাম পিচ্চি দুটোকে পড়তে বসিয়ে রেখে। এসে দেখি চৈতি খুব আরাম করে একটা প্লেন আর নৌকা বানিয়ে ফ্লোরের উপর উপুর হয়ে খেলছে। এবং যেটা দেখে আমার হার্টফেল করার মত অবস্থা সেটা হল এই নৌকা আর প্লেন বানানোর কাগজ সে ছিঁড়েছে আমার "অমিয়েত্রা" উপন্যাসের পঞ্চম খাতার শুরুর দিকের চারটা পৃষ্ঠা থেকে!

স্যার আইজ্যাক নিউটনের বেড়াল তার আলোক সম্বন্ধীয় গবেষণা পত্রে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। এবং তিনি কেবল বলেছিলেন, "ওহ্‌ আমার বেড়াল, তুমি জানো না তুমি কি করেছো!"

আমি মোটামুটি শোকে দুঃখে মুহ্যমান অবস্থায় তার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে যাবো- কিন্তু তার আগেই ফোঁকলা দাঁত বের করে ভুবন ভুলানো একটা হাসি দিল চৈতি, "খুব ভালা হৈছে না পেলেন আর নুকাটা দাদা? আরেকটা বানামু?"

খস খসে গলায় কেবল বললাম, "চ্যাপ্টারটা পুরোটাই শেষ করে দেও আপু। বাকি দুই পৃষ্ঠা থাকলেও যা- না থাকলেও তা।"

চৈতি মহা আনন্দে সেই চ্যাপ্টারের বাকি দুই পৃষ্ঠাও ছিঁড়ে নৌকা বানাতে বসে গেল। আমি কেবল গ্রানাইট পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছি চৈতির নৌকার সামনে। পূজা ঘ্যানর ঘ্যানর করে পড়ে যাচ্ছে সেন্টেন্স কাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি?

 

আচ্ছা, একজন লেখকের দুঃখ কাহাকে বলে? উহা কত প্রকার ও কি কি?

 

দুই.

পূজাকে অংক করতে বসিয়ে দিয়ে চৈতিকে ইংরেজি পড়াচ্ছিলাম। শব্দার্থ শেখাচ্ছি কদিন ধরে। টুক টাক মুখস্তও করে ফেলেছে সে। তবে উচ্চারণের ব্যাপারগুলো এখনো পরিষ্কার না তার কাছে। আমি তাকে পাঁচটা করে শব্দ লিখে পড়তে দিয়েছিলাম; ভাল মত উচ্চারণও করে দিয়েছিলাম। কিন্তু আধ ঘন্টা পর যখন পড়া যখন ধরতে গেলাম- নিজের বিশাল ভালুকটাকে বোগল দাবা করে খুব গম্ভীর মুখে শব্দগুলো বলতে লাগলো সে। একটু পর পর থেমে মাথা চুলকায়, তারপর ভালুকের লোমের ভেতর উঁকুন খুঁজতে থাকে। আমি ধৈর্য্য ধরে তার পড়া নেই।

Paper mill- কে সে উচ্চারণ করছেঃ পাপের মিল। "এ্যাঁ এ্যাঁ..... পাপের মিল মানে হইল কাগুজের কল।"

Book - "বি ডাবল ও কে। বক। বক মানে হইল বই।"

Train - "টি আর এ আই এন। টারাইন। টারাইন মানে হইল রেলগাড়ি।"

Bag - "বি এ জি। এ্যাঁ এ্যাঁ। (উঁকুন খোঁজা হচ্ছে) বাগ। বাগ মানে থলে।"

Crow - "ছি আর ও ডবলু। এ্যাঁ এ্যাঁ..... (গম্ভীর মুখে এবার নিজের মাথা চুলকাচ্ছে) কোরুউ। কোরুউ মানে কাউয়া।"

আমি তখন একটা নিঃশ্বাস ফেলে শুধরে দেই, "কাউয়া না, বলো 'কাক'?"

সে তখন আরো মনোযোগের সাথে নাকের ভেতর একটা আঙ্গুল ঢুকিয়ে বলতে থাকে, "কোরুউ মানে কাউ.... এ্যাঁ না! কাক। কাক কা কা করে। কোরুউ মানে কাক। কোরুউ মানে কাক। কাক কাক কাক!!!"

অসহায় দৃষ্টিতে আমি পূজার দিকে তাকাই। সে অংক করতে করতেই আমার দিকে ফিরে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো একটা, "দাদা, অরে এইভাবে শিখায়া লাব নাই ইকটুও। অরে আম্মায় "I eat rice" শিখাইছিল। সে কি বলে জানেন? আই ইয়াট রিছে। বুজেন!"

আমি ঢোক গিললাম শব্দ করে, "অসুবিধা নাই। আমি ওকে বাংলায় লিখে দিবো উচ্চারণগুলো।"

হাত নাড়লো হতাশ ভঙ্গিতে পূজা, "তাতেও লাব নাই দাদা। অর বাংলা উচ্চারণ ইংরেজির চাই খারাপ। অরে লেইখা দিবেন- 'পাখি সব করে বর' সে পড়বে - 'পাখি সোবো কোরে রোবো! আষাঢ় মাস পড়তে দিলে পড়ে- আষাঢ। ঢ় আর ঢ আলাদা চিনে না। ড আর ড় তেও ভুল করে খালি। পড়তে বসো'রে কয় 'পোডতে বোসো'। অরে মুখে মুখে পইড়া দেখায়া দিতে হয়।" তারপর অংকের দিকে মনোযোগ দিল, অংক করতে করতেই ঠোঁট ওল্টালো, "তাতেও লাব হইবো না। এইডা খালি ভাল্লুকের উঁকুন বাছতে পারে। আর কিছু জানে না।"

আমি শঙ্কিত মুখে তাকালাম চৈতির দিকে। সে নিবিষ্ট মনে তার ভালুকের উঁকুন বাছায় ব্যস্ত। উঁকুন না পেলেও অদৃশ্য কিছু একটা টেনে ছাড়াচ্ছে লোম থেকে। তারপর খুব কায়দা করে কানের কাছে নিয়ে দুই বুড়ো আঙ্গুলের নখ দিয়ে টিপে দিচ্ছে। বোধ হয় গায়েবি সেই উঁকুন টিপে ভর্তা বানাচ্ছে সে।

পূজার অংক হয়ে গেছে। খাতা এগিয়ে দিয়েছে আমার দিকে। ছোট নাকের ওপর তার বিশাল চশমাটা ঝুলে থাকতে বেশ ঝামেলা হচ্ছে। এত অল্প বয়সে চশমা লাগানোয় কেমন যেন ভাবুক ভাবুক একটা ভাব চলে এসেছে পূজার।

ওর খাতা নিয়ে অংক দেখতে লাগলাম।

এবং খাতায় তাকানো মাত্র চোখে অন্ধকার দেখা শুরু করলাম। একটা ৩৬ মিটার ফিতাকে ৪ জনের মাঝে ভাগ করে দেয়ার অংক দিয়েছিলাম। সে সুন্দর করে গোটা গোটা অক্ষরে লিখেছেঃ

ফিতার দৈর্ঘ্য = ৩৬ মিটার।

যদি ইহা ৪ জনের মাঝে সমান ভাগ করে দেয়া হয়।

তাহলে,

প্রথম জন পাবে = ৩৬-৪ = ৩২ মিটার।

দ্বিতীয় জন পাবে = ৩২-৪ = ২৮ মিটার।

তৃতীয় জন পাবে = ২৮-৪ = ২৪ মিটার।

এবং চতুর্থ ব্যক্তি পাবে = ২৪-৪ = ২০ মিটার।

উত্তরঃ ৩২, ২৮, ২৪ এবং ২০ মিটার।

খাতাটা ওর দিকে দেখিয়ে শুঁকনো মুখে জিজ্ঞেস করলাম, "এটা তো সোজা একটা ভাগ অংক, তুমি এগুলা কি করেছো?"

পূজা বিজ্ঞ একটা হাসি দিয়ে আমাকে বোঝাতে লেগে গেল, "বুজলেন না দাদা? পশনে ভাল করে খিয়াল করেন- দ্যাখেন, লেকছে- প্রত্যেক জন কত করে পাবে? এর মানে হইলো এই চাইর জনের জন্য চাইরটা উত্তর দিতে হইবো। চাইর জনে কত কত করে পাইছে সেইটাই হইল উত্তর। ৩২, ২৮, ২৪ আর ২০ মিটার। বুজলেন দাদা?"

খাতা হাতে দিয়ে শূণ্য দৃষ্টিতে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে রইলাম আমি। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পূজা চৈতির দিকে তাকালাম। পূজা আমাকে অংক বুঝিয়ে এখন চৈতিকে ইংরেজি পড়াচ্ছে গম্ভীর গলায়, "কোরুউ না গাধী, বল্‌ 'করও' করও মানে কাক্‌!"

হতাশ মুখে বিড়বিড় করে দ্বিতীয়বারের মত নিজেকেই বললাম, "ঘুরে ফিরে সব জ্ঞানী গুণীগুলাই আমার ছাত্র ছাত্রী হয় ক্যামনে!"

                                             কহেন কবি কালিদাস,

                                            "নিত্যদিবা খাচ্ছি বাঁশ!"


তিন.

ঘটনা গতকালের।

বিশাল ড্রইং খাতাটা কোনোমতে দু হাতে জাপ্টে তুলে আমার দিকে দেখাল চৈতি। সে জাতীয় মাছ “ইলিশ” আঁকা শিখেছে। গত তিন চারদিন যাবত হাতের কাছে যে কাগজই পাক না কেন- ইলিশ মাছ এঁকে এঁকে ছেড়ে দিচ্ছে সেটাতে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ইলিশ মাছ আঁকছে সকালে দিয়ে যাওয়া প্যাপার-পত্রিকায়, দেয়ালের যতটুকু নাগাল পাচ্ছে আর কাঠের দরজায় পেন্সিল দিয়ে। ছবি আঁকার জন্য বাড়ীর যত দেয়াল ছিল সব ভরিয়ে ফেলার পর এখন সাইজে নিজের থেকেও বড় একটা টুল জোগার করেছে সে। যেখানেই ছবি আঁকার ইচ্ছে হচ্ছে- সেই টুলটা টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে সেখানে। উঠে দাঁড়িয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে ইলিশ মাছ আঁকছে। বেশির ভাগ সময়ই মাছটা ইলিশ মাছ না হয়ে তেলাপিয়া, মাগুর, বোয়াল, পুঁটি, রূপচাঁদা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোলা ব্যাঙের মত হয়ে যাচ্ছে। মাছ আঁকা সেই পর্যন্তই থাকলে ঠিক হতো। সমস্যা হয়েছে চৈতি মাছ বিশারদ মানুষ। তার ছোট খাট শরীরের ওপর বসানো বিশাল মাথায় ধরা পরেছে যে সকল মাছের পানিতে থাকা উচিত। না হলে পানি এবং অক্সিজেনের অভাবে সে দ্রুত মারা যাবে। যার কারণে চৈতি সকাল বেলার প্রথম আলো পত্রিকা দিয়ে যাওয়া মাত্রই সেখানের সূর্যটাতে মাঝারি সাইজের একটা ইলিশ মাছ (অধিকাংশ সময়ে সেটা রূপচাঁদা হচ্ছে) এঁকে সেই মাছকে বাঁচানোর জন্য পুরো পত্রিকাটাই বাথরুমে নিয়ে গিয়ে বালতির ভেতর চুবিয়ে ধরছে! পূজা-চৈতির আব্বা বিষয়টা নিয়ে মহা চিন্তিত। সকাল বেলা ভদ্রলোকের পত্রিকা পড়ার অভ্যাস। চা খেতে খেতে সকালের গরম গরম খবর না পড়তে পারলে দিন ভাল যায় না তার। কিন্তু ছোট মেয়ের চারুকলা প্রতিভার কারণে গত কদিন ধরে শান্তি মত গরম খবর তো দূরের কথা- শুঁকনো খবরও পড়তে পারছেন না। প্রতিবারেই চৈতি তার আগেই ঘুম থেকে উঠে গিয়ে ইলিশ মাছ এঁকে, সেটাকে পানিতে চুবিয়ে ভাল মত ভিজিয়ে সেই পত্রিকা এনে বাবাকে পড়তে দিচ্ছে। সেই ভেজা পত্রিকা খোলারই উপায় থাকে না তখন। খুলতে গেলেই ছিঁড়ে হাতে চলে আসে সব পাতা। হতভম্ব পিতা তার চারুশিল্পী কন্যাকে কিছু বলতে পারেন না। মেয়ে কষ্ট পেতে পারে ভেবে ঘুম থেকে উঠেই ইস্ত্রী বের করে সেই নেতিয়ে যাওয়া ভেজা পত্রিকা ইস্ত্রী করে শুঁকানো শুরু করেন বিমর্ষ মুখে। এজন্য গত কিছুদিন ধরে ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। দেখলেই মনে হয় বড় ধরণের কোন দূর্ঘটনা ঘটে গেছে তার বাসায়।

আজ সন্ধ্যায় কোনো কথা বার্তা ছাড়াই ভদ্রলোক আমার বাসায় এসে হাজির। আব্বা আম্মা এক বড় ভাইয়ের বিয়ে খেতে বাড়ীতে গেছেন। বাসা পাহারায় রেখে গেছেন আমাকে। দরজায় দুম দাম শব্দ শুনেই হন্ত দন্ত হয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখি পূজা চৈতির আব্বা দাঁড়িয়ে আছেন পাংশু মুখে। ফ্যাকাসে হয়ে আছে চেহারা। চোখ-মুখ ঢুকে গেছে। আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, “শিহাব? তুমি আমারে বাঁচাও তো বাজান!”

ভীষণ অবাক হয়ে বললাম, “কেন! কি হয়েছে?”

উনি মাথা নাড়তে নাড়তে আমাকে ঠেলে ঘরের ভেতর ঢুকলেন, “তোমার ছোট ছাত্রী তো ইলিশ মাছ এঁকে এঁকে আমার জিন্দেগীর সব সুখ হারাম করে দিতে বসেছে!”

ভ্রূ কোঁচকালাম, “কেন! চৈতি আবার কি করলো!”

“তোমার ছাত্রীকে ইলিশ মাছ আঁকা কে শিখাইছে বাজান? সে তো এখন দিন রাত মৎস্য বিশারদের মত ইলিশ মাছের নানান ইস্টাইলে ছবি আঁকতেছে!” হতাশ গলায় বললেন।

“খারাপ কি? ছবি আঁকা শিখছে -এতো ভাল কথা?”

“শুধু ছবি আঁকে ক্ষান্ত দিলে তো আমার সমস্যা আছিল না! বাচ্চা মানুষ ঘর ভরায় ছবি আঁকবে এইটা তো স্বাভাবিক জিনিস। কিন্তু এই মেয়ে তো মাছ আঁইকা সেই মাছ পানিতে ছাড়ে দিতেছে। প্রত্যেকদিন প্যাপারে ছবি আঁকে ইলিশের। তারপর সেই মাছ পানিতে ছেড়ে দেবে, অভয়াশ্রমে দান করবে বলে বাথরুমে গিয়ে বালতিতে চুবিয়ে দেয়! পত্রিকা এক লাইনও পড়তে পারি না। ডেইলি সেই ভিজা কাগজ ইস্ত্রী দিয়া গরম করে শুঁকাইতে হয় আমারে! তাও কাজ হয় না। অনেক খবরই নষ্ট হয়ে যায় পানিতে ভিজে।” হাহাকার করে উঠলেন তিনি।

আমি শূণ্য দৃষ্টিতে তাকালাম ভদ্রলোকের দিকে। আমার দেখা মতে পূজা-চৈতির বাবাই এমন একমাত্র মানুষ যে কিনা সকালে পত্রিকা না পড়তে পারলে দিন পার করতে পারেন না। নাস্তার টেবিলে বসেই হাস ফাস করা শুরু করে দেন। এবং হার্ট এটাকের মত হয়ে যায় চোখ মুখ! কোঁ কোঁ করতে থাকেন বুক চেপে ধরে! সেই সময় হাতে একটা পত্রিকা ধরিয়ে দিলেই অমনি ভদ্রলোক হাসি মুখে উঠে বসে আয়েশ করে পড়তে থাকেন। দিনের কাগজ দিনে না পেলেও তার বাসী পত্রিকা পড়া চাইই। তার কথা হলঃ

 

                                       “Without any newspaper!

                                      আজব বড়ই ব্যাপার স্যাপার!”

 

সেই মানুষের সকালের নাস্তা হৃষ্ট পুষ্ট পত্রিকা কিনা তার ছোট মেয়ে ইলিশ মাছ এঁকে ভরিয়ে দিচ্ছে! শুধু যে ভরিয়ে দিচ্ছে তাই না- একেবারে পানিতে নিয়ে গিয়ে অভয়াশ্রমে ছেড়ে দিচ্ছে!

আমি কেবল ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললাম, “কি বললেন? চৈতি ইলিশ মাছ পত্রিকায় এঁকে পানিতে নিয়ে গিয়ে ডুবাচ্ছে?”

করুণ মুখে মাথা ঝাঁকালেন তিনি, “হ বাজান। শুধু যে পত্রিকা ভিজাইতেছে তা না। একেবারে বাসার দেয়াল যতদূর পর্যন্ত ইলিশ মাছ আঁকতে পারছে- বাথরুম থেকে মগে পানি আনে দেয়ালে ছিটানো শুরু করছে! বাসার একটা দেয়ালও আর শুঁকনা নাই! পুরাই ফ্লাডেড! ইংরেজি রচনা “Flood in Bangladesh”এ আছে না- “Flood visits our country every year”? আমাদের বাসার অবস্থা ঠিক সেই জাতের! “Flood visits our walls every day!”

প্রথমে ভেবেছিলাম ভদ্রলোক বুঝি বাড়িয়ে চাড়িয়ে বলছেন মেয়ের ছবি আঁকার কথাটা। কিন্তু গায়ে শার্ট চড়িয়ে নিজে যখন তার সাথে দেখতে গেলাম বাসাটা- গিয়ে আমার আক্কেল গুড়ুম অবস্থা। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে মেয়েরা বিশ্বের বৃহত্তম রোড পেইন্টিং করেছিল- চৈতি করেছে বিশ্বের বৃহত্তম ওয়াল পেইন্টিং। প্রথম দফায় তার উচ্চতা অনুযায়ি যত দূর পেরেছে পেন্সিল আর রঙ দিয়ে ইলিশ মাছ এঁকেছে। এর পর টুল এনে সেই উচ্চতা ছাপিয়ে গিয়ে মোটামুটি সাড়ে চারফুট পর্যন্ত সারা বাসার দেয়াল ইলিশ মাছ এঁকে ভরিয়ে দিয়েছে। সম্ভবত মাছের আড়তেও এত ইলিশ মাছ কেউ দেখেনি। গেদুর আব্বা বারইয়ার হাটের মাছের আড়তের আড়তদার। তিনিও পেছন পেছন গেদুকে বোগলের নিচে ঝুলিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। ইলিশ মাছের বিশাল এই ওয়াল পেইন্টিং কিংবা ওয়াল স্কেচ দেখে ভদ্রলোক কেবল গম্ভীর মুখে বললেন, “আমাগো আড়তের দেয়াল গুলাতে কিনা ইলিশ মাছের ফডু থাকবো- পানের পিক আর ময়লা দিয়ে ভরায়ে দিছে! ছৈথি বেটিরে আমাগো আড়তে নিয়া ছাইড়া দিয়াসি ভাই? সেইখানে সে ইলিশ মাছ, কাতল মাছ, মৃগেল মাছ, রূপচান্দা, সরপুঁটি, কই, মাগুর, ইচা, বুন্দা, ভেটকি, ফাইস্যা, চাপিলা, কাঁকড়া, চিংড়ি- সব আঁইকা দিবো। শালার এমুন একখান জায়গায় ব্যাবসা করি- কুনু ডেকোরেশুন নাই!”

চৈতির আব্বা বিরক্ত চোখে তাকালেন গেদুর আব্বার দিকে। চুপ হয়ে গেল গেদুর আব্বা। চৈতির মাও চলে এসেছেন আমাকে দেখে। হাতে ভেজা একটা চট, “শিহব, তুমি আসছো এতক্ষণে? তোমার ছাত্রী তো সারা বাসার দেয়াল ছবি এঁকে ভরায় দিতেছে! শুধু আঁকলেও চলতো- বালতি বালতি পানি এনে সেই দেয়াল ভেজানো শুরু করেছে। মাছ তো পানি ছাড়া বাঁচতে পারবে না! এই হইল তার যুক্তি! আমারে তুমি মুক্তি দেও তো বাবা এই বিপদ থেইকা!” কাতর মুখে বললেন, “চট দিয়া দেয়াল আর ফ্লোরের পানি মুছতে মুছতে কাহিল হয়া গেছি।”

আমি ঢোক গিললাম কোনোমতে, “পূজা কিছু করছে না? সে তো জ্ঞানী গুণী মানুষ। চৈতিকে থামাচ্ছে না কেন?”

পূজার কথা বলতেই চোখ মুখ কঠিন হয়ে গেল আন্টির, “ঐ মেয়ের কথা আমার সামনে তো দূরের কথা, পিছনেও বলবা না!”

“কেন!”

“সব আপদের গোঁড়া তো বড়টা। মাছ আঁকা শিখাইছে ছোটটারে, শুধু যে শিখাইছে তাই না- বলেও দিছে মাছ পানিতে থাকে। এরা পানি ছাড়া বাঁচতে পারে না। ছোটটা বুইঝা নিছে নিজের মত।”

“কিন্তু এখানে তো পূজার কোনো দোষ নাই। কাগজে আঁকা মাছের কথা তো সে বুঝায় নি। সে এখন ছোটটাকে বললেই তো হয় এই মাছে পানি দিতে নাই?” একটু সাফাই গাইতে চাইলাম পূজার হয়ে।

কিন্তু চটের বস্তা আছাড় মেরে ফ্লোরে রেখে হুংকার দেয়ার ভঙ্গিতে বললেন আন্টি, “তুমি কি ভাবছো আমি সেই কথা বলি নাই তারে? পূজা ম্যাডামের তো বুদ্ধি বেশি। সে ছোট বোনের এই পানি কর্মসূচিরে কাজে লাগাইতে চাইছে বাসার ফুলের টবগুলায় পানি দেয়াতে। চৈতির আঁকা ছবিগুলা সুন্দর করে কাইটা ফুলের টবে নিয়া রাখে দিছে তোমার বড় গুণধর ছাত্রী। ভাবছে চৈতি গিয়া সেই মাছে পানি ঢালবে- তাতে গাছের গোড়ায় পানি যাবে। হইছে উলটা। চৈতি প্রথমে মগে নিয়া পানি দিতেছিল। কিন্তু টবগুলা পানি তাড়াতাড়ি টাইনা নিতেছে দেখে পরে বালতি ভরে ভরে পানি নিয়ে যাইয়া পুরা বালতির পানি টবগুলায় ঢাইলা দিছে। সারা বারান্দা ভাইসা যাইতেছে এখন! ছেমড়ি দুইটারে ধোলাই দিয়াও লাভ হয় নাই! আমি সরলেই পানি আইনা ঢালতেছে খালি।”

আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, “আমি কি করবো তাহলে এখন?”

“তুমি কি করবা আমি কিছু জানি না। তোমার ছাত্রী তুমি ঠেলা সামলাও!” চটের বস্তাটা আবার তুলে নিয়ে দুদ্দাড় পা ফেলে চলে গেলেন ঘরের ভেতরের দিকে। ভেতর থেকে ওনার চিলের মত গলার আওয়াজ পাওয়া গেল, “পূজা-চৈতি! তোগোরে না কইছি আর পানি ধরবি না! তোগোরে আমি উলটা লটকায়া রাখমু গ্রিলের সাথে আজকে সারা রাইত! নাইলে আমার নাম শকুন্তলা না। কবুতর-তলা!”

আমি আর গেদুর বাপ মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম হকচকিয়ে।

চৈতির আব্বা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “মাস্টর, তুমি কিছু একটা করো তো এই দুই মেয়েরে! আমরা তো আর সামলাইতে পারতেছি না!” গেদুর আব্বার দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত গলায় বললেন, “আপনে ভাই বড় আরামে আছেন এখনো। পোলাটা বড় হয় নাই। একটু খালি দৌড়ানো শিখুক- খবর কইরা ফালায় দেড় ফুট এই সব পুলাপান!” গেদুর আব্বা শঙ্কিত মুখে বোগলের নিচে চেপে ধরা ছেলের দিকে তাকালেন। গেদু অবশ্য কিছু বুঝতে পারলো না। কেবল নিজের আব্বার দিকে তাকিয়ে মাড়ি বের করে একটা হাসি দিল। তাতে যেন গেদুর আব্বার ভয় আরো আরো বেড়ে গেল। ঢোক গিললেন শব্দ করে।

আমি আর দাঁড়ালাম না ওখানে। ভেতরের ঘরে চলে এলাম। পূজা চৈতি থাকে এই ঘরটায়। ঘরটাতে আমি যখনই ঢুকি না কেন- প্রতিবারেই মনে হয় একটু আগেই বুঝি সমস্ত ঘরটার ওপর দিয়ে হ্যারিকেন বয়ে গেছে। তাদের ঘরের সিলিং ফ্যানটার পাখা থেকে কাপড় চোপড় ঝুলতে দেখিনি- এমন কোনোদিন হয়নি। ফ্যান ঘুরছে, সেই ফ্যানের পাখার সাথে পূজা কিংবা চৈতির ফ্রক ঝুলতে ঝুলতে ঘুরছে।

আজকে ঘরটায় ঢোকার মুখেই আছাড় খেতে খেতে কোনোমতে দরজার চৌকাঠ ধরে সামলে নিলাম। সারা ঘরের মেঝে পানিতে থৈ থৈ করছে!

 

                                      “একখানি ছোট ঘর, আমি একেলা-

                                       চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।

                                  দেয়ালেতে পানি মাখা- ইলিশের ছবি আঁকা

                                       ঘরখানি মেঘে ঢাকা সন্ধ্যাবেলা.......”

 

আমি একেলা হবে না, ঘরে আমি ছাড়া আরো তিনজন মানুষ আছে। আমার দুই গুণধর ছাত্রী এবং তাদের মা কালী মূর্তি ধারণকারী জননী। হাতে কেবল ত্রিশূল-বল্লম-বর্শাটা নেই। বাকিটা পুরোই মিলে গেছে। চৈতি বড় সড় একটা লাল বালতির পাশে মগ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। পূজা কাঁচি হাতে অনেকগুলো কাগজের মাছ কাটায় ব্যস্ত। এবং তাদের মা বিছানার ওপর থম থমে মুখে বসে আছেন বস্তা হাতে। যে কোন মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হতে পারেন। কারণ অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দুই মেয়ের দিকে।

আমাকে আছাড় খাওয়া থেকে বেঁচে যেতে দেখে কঠিন গলায় বললেন, “তোমার ছাত্রীদের অবস্থা দেখছো? তাদের শিল্প কর্মের অত্যাচারে তো আমি দেশ ছাড়া হমু!”

কিছু বললাম না। সাবধানে মেঝেতে পা ফেলে চৈতির পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম, সে মগ দিয়ে পানি তুলে খুব যত্ন করে দেয়ালে আঁকা তার কোলা ব্যাঙ সাইজের একটা ইলিশ মাছকে (বৈজ্ঞানিক নাম নিশ্চয় বুফো হিলসাস্‌টিক্টাস’ই হবে) পানি দিচ্ছে। চোখে মুখে তার পবিত্র পবিত্র একটা আভা। সবার প্রথমেই ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল কিংবা মাদার তেরেসার চেহারাই ভেসে উঠবে চৈতির এই মমতাময়ী মুখ দেখলে। সে যে শুধু পানি দিচ্ছে তা’ই না, সে পানি দেয়ার পর হাত দিয়ে আদর করে দিচ্ছে সেই মাছটাকে, এবং সুন্দর করে বলছে, “বেশি বেশি কইরা পানি খাবি আর সাঁতার কাটবি। পূজা দিদি কইছে পানি বেশি বেশি খাইলে জন্ডিস রোগ হয় না। গরম কাল আইতেছে। পানি খাবি বেশি কইরা। তাইলে জন্ডিস হইবো না।”

পূজার দিকে তাকালাম, সে এখন মনোযোগ দিয়ে কাঁচি নিয়ে ছবি কাটায় ব্যস্ত। আমার দিকে কারো নজর নেই। পূজা-চৈতির আম্মার মত আমিও বিছানায় গিয়ে বসলাম আন্টির পাশে। এক ঝলক তার থম থমে মুখের দিকে তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে দিলাম। উনি কেবল মেয়ে দুটোর দিকে ইঙ্গিত করে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে বললেন, “শিহাব? তুমি থামাইবা নাকি আমি থামামু? আমি এই দুইটারে আলমারীর ভিতর ঢুকায় রাখমু চিন্তা করতেছি। তবে দুশ্চিন্তারও বিষয় আছে। আলমারীতে ইঁদুর রাখলেও ইঁদুরে সব জামা কাপড় খাইবো না, কিন্তু এই মেয়ে দুইটারে আলমারী ঢুকায় দিলে এক ঘন্টা ভিতরে সব জামা কাপড় কাইটা কুটি কুটি করে দিবে! কোথায় যে ঢুকামু চিন্তা করতেছি।”

শুঁকনো গলায় বললাম, “আপনি এতো টেনশন করবেন না আন্টি। আপনি ড্রইং রুমে গিয়ে বসুন। আমি দেখি এদের কি করতে পারি।”

আন্টি আমার দিকে তাকালেন কঠিন মুখে। বোধ হয় আন্দাজ করার চেষ্টা করলেন পারবো নাকি? তারপর কি ভেবে যেন চটের বস্তাটা নিয়ে উঠে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় আমার মতই আছাড় খেতে খেতে বেঁচে গেলেন কোনোমতে আলনাটা ধরে ফেলে। সোজা হয়েই গজ গজ করতে করতে বেরিয়ে গেলেন।

অতি সাবধানে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আমার দুই ছাত্রীকে ডাক দিলাম, “পূজা-চৈতি?”

সাথে সাথে হাতের মগ রেখে চৈতি বাধ্য ছাত্রীর মত আমার সামনে চলে আসলো। পূজা ওর কাঁচি নিয়ে মাছ কাটতে কাটতে এলো খানিক ইতস্তত ভঙ্গিতে। ভারী চশমাটা নাকের ওপর বসিয়ে রাখতে সমস্যা হচ্ছে তার। সেটার মাঝ দিয়ে গভীর মনোযোগ সহকারে মাছ দেখে কাটছে। আমার দিকে তাকাচ্ছে না।

“মৎস্য প্রকল্প হাতে নিয়েছো নাকি তোমরা?” জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললাম।

চৈতি মহা উৎসাহী হয়ে বলা শুরু করল, “জী দাদা! খালি ইলিশ মাছ আঁকতাছি আর পানিতে ছাইড়া দিতেছি। ভালা না? মাছ হইল পানির জিনিস। এরা পানি ছাড়া বাঁচতে পারে না। তাই পানিও দিতে হইতেছে। একটু কষ্ট হইতেছে পানি দিতে। তাও, খুব ভালা কাজ। ঠিক না দাদা?”

পূজা গম্ভীর মুখে বোনকে সমর্থন দিলো, “ফুলের টবেও পানি দেওয়া হইয়া যাইতেছে। তাতে উদ্ভিদের (পূজা কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করতে পছন্দ করে, যেমনঃ গাছের বদলে উদ্ভিদ, মাটির বদলে মৃত্তিকা, শিলা) বৃদ্ধি সহজ হয়। পুষ্টি পায়।”

আমি দ্রুত চিন্তা করছি কীভাবে বোঝালে এই দুই মেয়ে বুঝবে যে ঘরের দেয়ালে কিংবা পত্রিকা পানিতে ডুবিয়ে লাভ নেই। মুখে কেবল বললাম, “অনেক সুন্দর কাজ! মহতী উদ্যোগ নিয়েছো দেখছি দুই বোন! বাহ্‌!”

চৈতি আনন্দিত মুখে আমার হাতে টানতে লাগল, “দাদা আসেন, পানি দেই। আপনেও তো ছবি আঁকেন। আমি টুল নিয়ে বেশি উঁচুতে উঠবার পারি নাই। আপনে আরো উঁচুতে ইলিশ মাছ আঁকে দেন। পানি দিমু তাইলে!”

আতঙ্কিত চোখে আমি দরজার দিকে তাকালাম, পূজা চৈতির আম্মা যদি এসে দেখে যে আমি তার মেয়েদের নিয়ে ছবি আঁকা ধরেছি- আমার খবর হয়ে যাবে! তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, “একটু রেস্ট নেও আগে। তারপর আবার কাজ শুরু করা যাবে। ভাল মহতী উদ্যোগ যখন নেয়া হয়- তখন কেবল কাজ করলেই হয় না। মাঝে মাঝে আলোচনাও করা উচিত। তাতে কাজের কি কি উন্নতি করা যায় সেদিক নিয়ে ভাবা যায়।”

পূজার এবারে উৎসাহ দেখা গেল, সে জ্ঞান গম্ভীর আলোচনা করতে পছন্দ করে। সে কাঁচি আর ছবিটা বিছানায় একপাশে রেখে আমার পাশে এসে উঠলো। চৈতিও কি যেন চিন্তা করে আমার অন্যপাশে এসে হাচড়ে পাচড়ে উঠে বসল। যদিও সে আলোচনা শব্দটার মানেই বোঝে না। তবে বড় বোনকে এত আগ্রহী হতে দেখে সে ধরে নিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু হবে “আলোচনা” জিনিসটা। তাই সেও মনোযোগ দিলো।

আমি গলা খাকারি দিলাম ভাষণ দেয়ার আগ মুহূর্তে যেমন নেতারা গলা পরিষ্কার করে নেয় সেভাবে।

“পূজা-চৈতি। আমার স্নেহাস্পদ ছাত্রীদয়, তোমরা যে উদ্যোগটা নিয়েছো মৎস্য সংরক্ষণ ও সেবা মূলক- সেটা সত্যিই অতি মহতী এবং ভাল উদ্যোগ। তবে এই কাজকে পূর্ণ মাত্রায় সফল করতে হলে আমাদের প্রথমেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় জানতে হবে। সেগুলো জানলে কাজটা আরো সূক্ষ্ম এবং সুনিপুণ হস্তে সম্পাদন করা যাবে!” এটুকু বলে ঘামা শুরু করলাম, দুই ছাত্রীই খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কি বললে কাজ হবে? বেশিক্ষণ চুপ থাকা যায় না, তাড়াতাড়ি মুখ খুললাম, “প্রথমেই আমাদের জানতে হবে- মৎস্য কি?”

“মৎস্য মানে মাছ। ফিছ ফিছ!” চৈতি হড়বড়িয়ে বলে উঠল।

“গুড! মৎস্য মানে মাছ। ইংরেজীতে একে FISH বলে। এখন আমাদের জানতে হবে এরা কেন মাছ হল- আর আমরা কেন মানুষ? বলতে পারবে?”

পূজা চিন্তা করে বলল, “এরা পানিতে থাকে তাই এতা মৎস্য, আর আমরা ডাঙ্গায় থাকি তাই আমরা মানুষ।”

“গুড। এটাও হয়েছে। এখন বল তো, এরা কেন পানিতে থাকে, আর আমরা কেন ডাঙ্গায় থাকি?”

পূজা আরেকটু চিন্তা করে নিল, “আমরা বাতাস ছাড়া থাকতে পারি না। কিন্তু মাছেরা বাতাস ছাড়া থাকতে পারে।”

“গুড! এইটাও হয়েছে! তোমরা তো দেখি অনেক কিছুই জানো! এখন বলো তো, অক্সিজেন ছাড়া কি মানুষ কিংবা কোনো প্রাণী বাঁচতে পারে?”

এবারে চৈতি নিজেই উত্তর দিল, সে টিভি দেখে শিখেছে, “পারে না দাদা! ওস্কিজেন ছাড়া মানুষ পছু পাখি কিছুই বাঁচে না। মইরা যায়।”

“ঠিক! তাহলে মাছেরা কেন বাঁচে? অক্সিজেন তো বাতাসে থাকে। মাছ তো থাকে পানিতে? তাদের অক্সিজেন লাগে না? ওরাও তো প্রাণী, তাদেরও জীবন আছে।”

পূজা চৈতি গভীর দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। আসলেই তো! মাছও তো প্রাণী- তাহলে অক্সিজেন ছাড়া তারা কিভাবে বেঁচে আছে?

আমি জ্ঞানী জ্ঞানী একটা হাসি নিয়ে বললাম, “এজন্যই পানিতে থাকে- কারণ তাদের নাক নাই। নাকের বদলে আছে কানকো, বা ফুলকা। সেটা দিয়ে তারা পানির ভেতর থেকে অক্সিজেন নেয়। মানুষের তো আর ফুলকা নাই, মাছ কাটার সময় দেখো না কান কাটলে ফুলকা দেখা যায়? সেটা মানুষের নাই। এজন্য মানুষকে নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নিতে হয়, বাতাস থেকে তখন অক্সিজেন টেনে নেয়।”

চৈতি অবাক হয়ে বলল, “আমাগো ফুলকা নাই? তাইলে মানুষ যে সাঁতার কাটে?”

“পানিতে তো আর থাকতে পারে না। দম ফুরালেই উঠে আসতে হয়। কিন্তু মাছকে কখনো দেখেছো নিঃশ্বাস নিতে ডাঙ্গায় উঠে এসেছে?”

মাথা নাড়ালো দুই বোন। তারা দেখেনি।

“এখন শোনো। পানিতেও অক্সিজেন আছে, বাতাসেও আছে। ওদের ফুলকা আছে, আমাদের আছে নাক। এজন্য ওরা ওদের মত অক্সিজেন নেয় পানি থেকে। আমরা নেই আমাদের মত বাতাস থেকে। এখন তোমরা যে দেয়ালে এত এত মাছ এঁকে কষ্ট করে পানি দিচ্ছো- কেন দিচ্ছো? নিশ্চয় অক্সিজেন দেয়ার জন্য দিচ্ছো?”

মাথা ঝাঁকালও পূজা চৈতি। তারা মাছকে অক্সিজেন দেয়ার জন্য পানি দিচ্ছে।

“কিন্তু ওরা তো এখন ডাঙ্গায় আছে। আছে না?”

“হু আছে। ডাঙায় আছে।”

“তাহলে তোমরা পানি টেনে টেনে এনে যে এত কষ্ট করে তাদের পানি দিচ্ছো- এখানে তোমাদের কষ্ট হচ্ছে না?”

“হু, খুউব!” চৈতি মুখ কালো করে বলল। পূজা কিছু বলল না। সে এখনো আমার কথার ঘোর প্যাঁচ ধরতে পারছে না ঠিকমত।

“এত কষ্ট না করে সহজেই তাদের তুমি অক্সিজেন দিতে পারবে- এটা কি জানো?” চৈতির দিকে তাকালাম।

চৈতির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, “কীভাবে দাদা?”

“ডিস্কোভারি চ্যানেলে দেখো নাই সাগরের নিচে ডুবুরীরা বড় বড় বাতাসের ড্রাম নিয়ে সাঁতার কাটে? তারা যদি পানিতে গিয়ে মাছের মত হতে পারে- মাছদের বাতাসে এসে আমাদের মত হতে দোষ কোথায়?”

“সেইটাই তো, আমরা তো এই জন্যই পানি দিতেছি!”

“উহু। আরো সহজ আছে।” মাথা নাড়লাম।

পূজা-চৈতি দুজনেই এবারে অবাক হয়ে তাকালো, “আরো সুজা? ক্যামনে দাদা?”

“শুধু যে সোজা- তা’ই না। অনেকদিন বাঁচবেও। তোমরা যে দেয়ালের মাছে এত পানি দিয়েছো- দেখবে বেশিদিন থাকবে না। মরে যাবে।” তাচ্ছিল্য ভরা গলায় বললাম। কারণ আমি জানি পেন্সিল আর রঙ তুলি দিয়ে যা এঁকেছে, পানি দেয়াতে অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে এর মাঝেই। বেশিদিন থাকবেও না।

“তাই নাকি?” মুখ কালো করে ফেললো চৈতি। অসহায় চোখে দেয়ালের মাছগুলোর দিকে তাকালো। আসলেই তো! অনেকগুলোই কেমন যেন মরে মরে গেছে। পঁচে যাচ্ছে! “কি করবো তাইলে দাদা? এইগুলা তো আসলেই পানি পাইয়া মরে যাইতেছে!” কেঁদে ফেলবে যেন সে। এতক্ষণে খেয়াল হয়েছে তার পানি পেয়ে সেগুলো মরতে বসেছে।

“খুব সোজা, এরা এখন ডাঙায় মানে বাতাসে আছে। তাই এদের মাথার সামনে মুখের ওপর ছোট ছোট দুইটা ফুটো দিয়ে নাক এঁকে দেও। তখন পানি ছাড়াই এরা বাতাস থেকে অক্সিজেন নিয়ে বাঁচতে পারবে। কষ্ট করে দেয়াল ভিজিয়ে পানি ঢাকতে হবে না আর।”

সাথে সাথে আশার আলো খুঁজে পেলো যেন চৈতি। সে কোনো কথা না বলেই দৌড়ে গিয়ে দেয়ালের মাছগুলোর পানি জামা দিয়ে মুছে দিতে লাগল, পেন্সিল বের করে ছোট ছোট নাক এঁকে দিতে লাগলো। শুধু যে সেখানেই আঁকছে তা না, পত্রিকা, খাতা, আলমারী- যেখানে যেখানে মাছ ছিল- সব মাছের নাক দিয়ে দিতে লাগলো। পানির বালতিটা আর মগ নিয়ে গিয়ে বাথরুমে রেখে এলো। উদার হাসি নিয়ে সে নতুন উৎসাহে মাছের নাক আঁকা ধরেছে। এদের পানিতে ভেজানো যাবে না। এরা তো নাক দিয়েই শ্বাস নিতে পারছে। পানির আর দরকার কি!

পূজার দিকে তাকালাম আমি। সে গম্ভীর মুখে আমার যুক্তিটা খতিয়ে দেখছে।

“কি ভাবছো এখনো? মাছের নাক নিয়ে চিন্তা করছো?”

মাথা নাড়লো সে, “না দাদা, ভাবতেছি তাইলে আর গাছে পানি দিয়া কি করমু? গাছেও দুইটা নাকের ফুটা করে দেই? তাইলে আর এত পানি দিতে হবে না।”

ঢোক গিললাম সশব্দে। কপালে চিকন ঘাম দেখা দিয়েছে ইতিমধ্যেই। জিভ দিয়ে শুঁকনো ঠোঁট চাটলাম, “ইয়ে গাছ তো ডাঙাতেই থাকে। তাই এদের আলাদা ভাবে নাকের ফুটো লাগে না। এদের গায়ে, বিশেষ করে পাতায় অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র আছে, খালি চোখে দেখতে পাবে না। তাছাড়া মাটির ভেতরেও মূলে অনেক ছোট ছোট ছিদ্র থাকে- সে সব দিয়ে মাছের মত পানি থেকে অক্সিজেন নেয়। আর পাতা দিয়েও দেয় বাতাস থেকে। এজন্য একটু হলেও পানি দিতে হয় গাছের গোড়ায়। কারণ এটা তো ফুলের টব। বাহির থেকে পানি আসবে কোত্থেকে? তোমাকেই দিতে হবে একটু। তবে তুমি যে রকম অনেক পানি দিচ্ছো- সেটা ঠিক না। তুমি কি এক সাথে অনেক বেশি খাবার খেতে পারো?”

মাথা নাড়ালো সে। পারে না। “বেশি খাইলে বমি হয়।”

“ঠিক তেমন একটা গাছও বেশি পানি খেতে পারে না এক সাথে। অসুস্থ হয়ে পড়বে। এজন্য অল্প অল্প করে পানি দিয়ে গোড়ার মাটি ভিজিয়ে দিতে হয়। বুঝেছো? গাছের নাকের ফুটো লাগে না। এদের সারা শরীরেই হাজার হাজার খুব ছোট ছিদ্র আছে।”

এতক্ষণে পূজার মুখে বুঝতে পারার একটা ভাব এলো। জিভ কেটে সে তড়িঘড়ি করে ছোট বোনের মত উঠে গিয়ে চট এনে ঘরের পানি মোছায় লেগে গেল। বারান্দার ফুলের টবের অতিরিক্ত পানিও মুছে দিল দ্রুত।

ঘরের দরজায় পূজা-চৈতির বাবা মা’র বিস্মিত মুখ দেখা গেল। তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তাদের মেয়েরা এখন পানি ঢালা বাদ দিয়ে পানি মোছায় লেগেছে!

আমি শুঁকনো মুখে তাদের দিকে তাকিয়ে দূর্বল ভাবে হাসলাম। এ যাত্রায় হয়ত বাঁচা গেছে। কিন্তু যে কোনো মুহূর্তেই এদের উর্বর মস্তিষ্কে নতুন প্রশ্নের উদ্ভব ঘটতে পারে। এবং তখন হয়ত কালো ঘাম ছুটে যাবে আমার পরিস্থিতি সামাল দিতে দিতে।

 

শুরুর কথায় ফিরে আসছি আবার।

বড় খাতায় নতুন আঁকা ইলিশ মাছটা দেখাচ্ছে চৈতি আমাকে। বিশাল বিশাল দুটো নাকের ফুটো দিয়েছে সে। উৎসাহী মুখে বলল, “ভালা হইছে না দাদা? বড় বড় নাকের ফুঁটা দিছি, যাতে বেশি বেশি অস্কিজেন খাইতে পারে!”

 

                                          “বড়ই বিপদ পুলাপানে

                                             ঠেলায় আছি বেশ!

                                          আস্ত জীবন ভাজা পোঁড়া

                                              ছাড়ছি বুঝি দেশ!

                                         মাছের নাকি নাকটি লাগে

                                              ‘নাকি’ স্বরে গান?

                                          নিথর বাবা কই ফেঁসেছে

                                              শুনতে নাকি চান?

                                         গাছেরও চাই নাকটি এবার

                                             কোথায় আমি যাই?

                                           চৈতি-পূজার কান্ড নিয়েই

                                              লিখছি বসে ভাই!”

 

(সমাপ্ত)

 

লেখকের কথাঃ 

অলস লেখক হিসেবে আমার পরিচিতি আছে। দীর্ঘদিন ধরে ভালবাসার গল্পে কিছু লিখতে পারছি না। একটা উপন্যাস লেখা নিয়ে ব্যস্ত আছি গত বছর থেকেই। কিন্তু পেজে যখন পরিচিত কাউকে লেখা দিতে দেখি- সত্যি বলতে গেলে “হিংসায় জ্বলে পুড়ে কাবাব” হয়ে যাই আমি। লেখকেরা মুখে সাধু ভাষী- ভেতরে হিংসুক হয়। আমিও ব্যাতিক্রম নই। বর্তমানে ফেসবুকে স্ট্যাটাস লেখা ছাড়া আর তেমন কিছুই লেখা হচ্ছে না। এমনকি ক্যাপ্টেন বাবাকোয়াকে নিয়েও কিছুই লেখতে বসা হচ্ছিল না।  

শেষ মেষ নিজের জীবনে নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনাগুলো নিয়েই স্ট্যাটাস দেয়া শুরু করলাম মুখবইয়ের পাতায়। ব্যক্তিগত ভাবে শুরু করলাম “ছেঁড়া ঘুড়ির দিনলিপি” নামের একটা সিরিজের। কিন্তু ভালবাসার গল্পে আমার আসা যাওয়া সেই আগের মতই থেকে গেল শূণ্যের কোঠায়। সে কারণেই খারাপ লাগতো অনেক। বাবাকোয়াকে আনতে না পারলেও তাই সিদ্ধান্ত নিলাম যতটা পারি হাসিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবো ভালবাসার গল্পের মানুষগুলোকে। কারণ এই মানুষগুলো আমার জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। নিজের দিনলিপি থেকেই আলাদা করে ফেললাম কিছু অংশ। ভালবাসার গল্পের মানুষগুলোর মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারলেই আমি স্বার্থক ধরে নেবো।

 

সবার জন্য ভালবাসা ও ভালোবাসা। 

 

অনেকেই আমাকে ইদানীং জিজ্ঞেস করা শুরু করেছে আমি কেন সব সময় ভালবাসা ও ভালোবাসা এই কথাটা বলি? ব্যাপার কিছুই না তেমন। এক ভালোবাসায় ‘ও’কার আছে, অন্যটায় নেই! কোনটা যে শুদ্ধ আর কোনটা ভুল আমি জানি না। কিন্তু ভুল-শুদ্ধ মিশিয়েই আমি ভালবাসার গল্পের মানুষগুলোকে ভালোবাসি। এজন্যই দুই বানানেই থাকুক তারা। পরিমাণ বেশি থাকলো! হা হা হা হা!

 

Share