বিধাতা

লিখেছেন - মোঃ ফরহাদ চৌধুরী শিহাব | লেখাটি 758 বার দেখা হয়েছে

এনায়েত চৌধুরী সাহেব বাসার বারান্দায় একটা ঝুলন চেয়ারে এলিয়ে আছেন অলস ভঙ্গিতে। চশমাটা খুলে পাশের টুলটার ওপর রেখেছেন, পানের বাটার পাশেই। সন্ধ্যা অনেক গড়িয়েছে। এশার আযান দেবে একটু পরেই। বাহিরে উলটো পালটা বাতাসের ছোটা ছুটি। উঠানের কামরাঙা গাছটার পাতা উড়িয়ে এনে বারান্দায় ফেলছে। কারেন্ট যাবে যাবে অবস্থা। বারান্দার হলুদ লাইটটা এর মাঝেই চল্লিশ ওয়াটের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে গেছে- যে কোনো মুহূর্তে কারেন্ট চলে যাবার আগাম সংকেত। বৃষ্টি আসার ব্যাপারটা উঁই পোকারা বোধ হয় সবার আগে টের পায়। বারান্দার শ্যাডওয়ালা লাইটটার নিচে শত শত উঁই পোকা কুন্ডলী পাকিয়ে উড়ছে। ওড়ার ধরণটা খুব অদ্ভুত। মুগ্ধ ভঙ্গিতে আলোর দিকে ছুটে গিয়ে আচমকা গা ঝাড়া দিয়ে শেষ মুহূর্তে ডানা ফেলে দেয়। ছোট খাটো অপুষ্ট শুঁয়োপোকার মত দেখাতে থাকে তখন। গরম লাইটে বাড়ি খেয়েই মেঝেতে এসে পড়ছে। রীতিমত মৃত-অর্ধমৃত ডানাহীন উঁই পোকা দিয়ে বাদামি রঙের কার্পেটের মত তৈরি হয়েছে বারান্দার অনেকটা জায়গা জুড়ে।

 

বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে উঁই পোকাও উড়ে যাচ্ছে এদিক সেদিক। এনায়েত সাহেব আধ বোজা চোখে শুয়ে থেকে পানের বাটা থেকে না তাকিয়েই পান সুপারী নিচ্ছেন। চুন-জর্দা খান না গত দুই সপ্তাহ হল। চুন জর্দা খেয়ে খেয়ে মুখের বাম পাশে আলসারের মত করে ফেলেছেন। নিজের ফার্মেসিতে মাঝে মাঝে ঢাকা থেকে এফ.সি.পি.এস ডাক্তার এসে বসেন। সেই ডাক্তার সাহেব এক নজর দেখেই তাঁকে গম্ভীর গলায় বলে দিয়েছেন, “এনায়েত সাহেব, আর কিছুদিন বেশি বাঁচতে চাইলে পান, সুপারী, চুন-জর্দা, বিড়ি সিগারেট সব খাওয়া ছেড়ে দিতে হবে আপনাকে। না হলে ক্যান্সার হতে বেশি দেরি নেই। অলরেডি মুখের বারোটা বাজিয়ে ফেলেছেন। বিশেষ করে চুন-জর্দা আর সিগারেট না ছাড়লে- আপনাকে বাঁচানোর কোনো সম্ভাবনা দেখছি না আপাতত।”

 

এনায়েত সাহেব শুঁকনো মুখে কেবল মাথা নাড়িয়েছেন। সিগারেট তিনি অল্প সল্প খান। ওটা বাদ দেয়া কোনো সমস্যা না। কিন্তু চুন জর্দা দিয়ে যে পান খাওয়ার অভ্যাস করেছেন- সেটা তাঁর পক্ষে ছাড়া সম্ভব না। বয়সও কম হয়নি। ষাট পেড়িয়ে গেছে বহু আগেই। আসল বয়স যে কত- নিজেও জানেন না। অনেক দিন তো বাঁচা হল- মুখে ক্যান্সার বাঁধিয়েই না হয় মরলেন। মরার জন্য সব সময় উপলক্ষ্য দরকার। রোগ ব্যাধী হল সেই সার্বজনীন উপলক্ষ্য। অনেক দিন সুস্থ শরীরে কাটিয়েছেন। এবার একটু অসুস্থ হওয়া প্রয়োজন।

কিন্তু তাঁর স্ত্রী মরিয়মের কারণে চুন-জর্দা হারাম হয়ে গেছে তাঁর। ঘরে যতক্ষণ থাকেন পান সুপারী খেতে দিলেও চুন জর্দার চেহারাও দেখতে পান না তিনি। ডাক্তার সাহেবের সেই কথার পর মরিয়ম বাসায় যত চুন জর্দা ছিল সব পেছনের পুকুরের নিয়ে ফেলে এসেছেন। মরিয়মের এই কাজে এনায়েত সাহেব যথেষ্ট রাগ করেছিলেন। কিন্তু মরিয়মের এক কথা, “সংসারের বট বৃক্ষের নিচে সবার বসবাস। বট বৃক্ষ মরে গেলে সংসারও মরে যাবে।”

 

স্ত্রীর ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে দুদিন কথা বলেন নি এনায়েত চৌধুরী। কিন্তু লাভ হয়নি। তাছাড়া স্ত্রীর সঙ্গে কথা না বলেও থাকতে পারেন না তিনি। বহু বছরের অভ্যাস। হুট করে কথা বন্ধ করে দিতে গেলে নিজেই ঝামেলায় পড়ে যান। তাই স্ত্রীর কথাই মেনে নিয়েছেন। মরিয়ম কঠিন প্রকৃতির মহিলা। এনায়েত সাহেব যথেষ্ট সন্দিহান তাঁর জান কবজ করতে এসে আজরাইল (আঃ) ঝামেলায় পড়ে যেতে পারেন। মরিয়ম মানুষকে সংসারে টিকিয়ে রাখার মানুষ। সে জানে কাকে কোন চালে খেতে দিলে টিকে থাকবে বেশিদিন। এনায়েত সাহেব হাজার গাঁই গুঁই করলেও মরিয়মকে কিছু বলেন না মুখের ওপর। তিনি জানেন এই সংসারের বট বৃক্ষ যেমন তিনি, তাঁর শেকড় হচ্ছেন মরিয়ম। মাটি আঁকড়ে ধরে রাখার পরই বট বৃক্ষ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। মরিয়ম আছেন বলেই এনায়েত চৌধুরী টিকে আছেন সংসারে।

 

আধ বোজা চোখে পান সুপারীর সঙ্গে বেশ কিছু উঁই পোকা আর ছোট মেটে একটা ফড়িং চলে গেছে পানের ভাঁজে। বাহিরে বাতাসের ঝাপ্টা দিচ্ছে থেকে থেকে। ছাড়া ছাড়া ভাবে বৃষ্টি। কারেন্ট যায়নি এখনো। অন্যদিন এতক্ষণে চারপাশ ঘুট ঘুটে অন্ধকার করে দিয়ে কারেন্ট চলে যায়। আজ যাচ্ছে না কেন?

বাতাসের ধাক্কায় বাসার খোলা জানালাগুলো খট্‌ খট্‌ করে বাড়ি খাচ্ছে। বাসার ভেতর থেকে শোনা যাচ্ছে মরিয়ম গলা উঁচিয়ে মেঘলাকে বলছে, “জানালা সব খুলে রাখছিস ক্যান? বন্ধ কর! ঘরের ভিতর সব ধূলা বালি ঢুকে যাইতেছে দেখস্‌ না? হাওয়া খাওয়া বন্ধ করে জানালা লাগা।” গজ গজ করতে করতে ঘরের অন্যদিকে চলে গেলেন মরিয়ম।

 

এনায়েত সাহেব পানটা হাতে নিয়ে চেপে চুপে ভাঁজ করছেন অনেকক্ষণ লাগিয়ে। মুখে দিচ্ছেন না। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বাতাসের সাথে বৃষ্টির ফোঁটা উড়িয়ে এনে গায়ে ফেলছে, পানির ফোঁটাগুলো ঠান্ডা না, কেমন গরম গরম। উষ্ণ বৃষ্টির সময় নাকি এটা?

 

বাজ পড়ার শব্দ হচ্ছে থেকে থেকে। চোখ বন্ধ দেখে কারেন্ট কখন গেল টের পেলেন না। তবে ঘরের ভেতর থেকে শুনতে পেলেন মরিয়ম ধমক দিয়ে মেঘলাকে বলছে, “কারেন্ট যে গেছে দেখস্‌ নাই? জানালার কাছে বইসা আছিস্‌ ক্যান? তোর আব্বা যে বারান্দায় একলা অন্ধকারে বসে আছে- তাঁরে চার্জার জ্বালায় দিয়াসতে পারতেছিস না? জানালায় বইসা থাকোস ক্যান সারাক্ষণ? টিকটিকি নাকি তুই? যা, চার্জার নিয়া যা। বড়টা হইছে ধারী অলস, চব্বিশটা ঘন্টা ফার্মেসিতে বইসা বইসা ইট কলের মত বিড়ি টানে। ছোটটা হইছে জানালার টিকটিকি!”

 

এনায়েত সাহেব বিরক্ত মুখে পানটা মুখে দিলেন। ঘরে বসে থাকলেই নিজের ছেলে মেয়ে দুটো সম্পর্কে সারাদিন নানান কথা শুনতে হয়। চার জন মানুষের সংসারে মরিয়মই কেবল অনর্গল বক বক করে যেতে পারেন। বাকি তিন জনের অস্তিত্ব কেবল মরিয়মের কথাতেই বোঝা যায়। সাড়া পাওয়া যায় না।

পানটা মুখের ডান পাশে ঢুকিয়ে চুপচাপ রেখে দিলেন। শুরুতেই চিবাতে পারেন না। মুখের ভেতর পান সুপারী পুরে তার একটা কাঁচা স্বাদ নিতে থাকেন। চিবানো আরাম্ভ করেন আরো পরে।

 

চারপাশ আলো করে বিদ্যুৎ চমকালো। চোখ বন্ধ করেও টের পেলেন এনায়েত সাহেব। শব্দটা বেশ জোরে সোরেই হবে। ভাল লাগছে তাঁর। বাজ পড়ার শব্দে আনন্দ পান তিনি। যত আলো, ততটা বিকটা তার আওয়াজ। মুগ্ধ হয়ে সেই আওয়াজ শোনেন তিনি।

 

কিন্তু অন্ধকার হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে চারপাশে নীরবতা ভেঙে খান খান করে বাজ পড়ার শব্দ হতেই- তাঁর খুব কাছে ভারী কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ পেলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে তাকালেন। আবছা অন্ধকারে পাশেই দাঁড়িয়ে আছে তাঁর ছোট মেয়েটা। বাজের শব্দে কুঁকড়ে গেছে ভয়ে। অস্পষ্ট ভাবে বোঝা যাচ্ছে মেঝেতে পড়ে থাকা জিনিসটা একটা চার্জার লাইট। আচমকা বজ্রপাতের শব্দে ভয় পেয়ে হাত থেকে চার্জারটা ফেলে দিয়েছে মেঘলা।

 

সোজা হয়ে বসলেন এনায়েত সাহেব। মুখে পান নিয়েই নরম গলায় বললেন, “ভয় পাইছিস মা? কাছে আয়।” একটা হাত বাড়িয়ে ডাকলেন।

 

ছায়ার মত নিঃশব্দে এগিয়ে এলো মেঘলা। এই অন্ধকারের মাঝেও গলা হাত আর মাথা পেঁচিয়ে রেখেছে ওড়না দিয়ে। কথা বলছে না।

 

এনায়েত সাহেব নিজেই উঠে চার্জার লাইটটা তুলে জ্বালালেন। ভাল জিনিস। দুবাই থেকে তাঁর ছোট শালা পাঠিয়েছে গত বছর। হাত থেকে পড়লেও নষ্ট হয় না সহজে।

মেয়ের মাথায় আলতো ভাবে হাত বুলিয়ে দিলেন, “বেশি ভয় পাইছিস?”

অস্পষ্ট স্বরে মাথা নাড়ালো মেঘলা, “ন্‌-না।”

চার্জারের আলোতে মেয়ের মুখটা দেখা যাচ্ছে কেবল। ঘরের ভেতরেও হিজাবের মত ওড়না পেঁচিয়ে রাখে মেয়েটা। বড় বড় মায়া মায়া আনত দুটো চোখ। এনায়েত সাহেবের চেহারা পেয়েছে মেয়েটা। কথা বার্তাতেও একই রকম। কম কথা বলে। এবারে ইন্টার পরীক্ষা দিচ্ছে। ছাত্রী খারাপ না। সায়েন্স থেকেই পরীক্ষা দিচ্ছে। বড় ছেলের মত সায়েন্স নিয়ে শুরু করে মাঝপথে আর্টসে চলে যায়নি।

“তোর পরীক্ষা কেমন হইতেছে মা?”

“আল্লাহ্‌র রহমতে ভাল।” নিচু গলায় উত্তর দিল।

কথা খুঁজে পেলেন না আর এনায়েত সাহেব। মুখে পান রেখে যে কথা বলতে পারেন না তিনি তা নয়। কিন্তু মেয়ের সঙ্গে কেন জানি কথা বার্তায় তাঁর মাইল পথের দূরত্ব। পিতা হওয়া অনেক কঠিন কাজ। সন্তানের মত এত আপন মানুষগুলোর সাথে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে না চাইলেও একটা দূরত্ব সৃষ্টি হতে থাকে। ভদ্রতার সম্পর্ক। যেখানে ইচ্ছে করলেই কাছে নেমে আসা যায় না। বিচিত্র একটা জড়তা কাজ করে। না তারা দূরত্ব অতিক্রম করে, না তিনি। ধ্রুবক দূরত্ব রাস্তার দুই সারির গাছের মত দূরে ঠেলে রাখে সন্তান আর বাবাকে। মাঝে সাঝে বাতাস উঠলে নুয়ে এসে ছুঁয়ে দেয়া যায় দু’পাশের গাছে। এক থাকা হয় না।

 

মেঘলাকে বলার মত কথা খুঁজে পাচ্ছেন না এনায়েত সাহেব। মাথায় হাত রেখে অসহায় চোখে কেবল তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে।

“আব্বা চা খাবেন?” বাবার দিকে তাকালো মেঘলা। এনায়েত সাহেবের কথা আটকে যাওয়াতে অবাক হয়নি সে। তার বাবা বড় হওয়ার পর কয়দিন ক’টা কথা বলেছে- হাতে গুণে বলে দিতে পারবে সে।

পান মুখে নিয়ে হাসলেন এনায়েত সাহেব, “আইনা দে। বৃষ্টির ঠাণ্ডা পড়ছে। চা খাইলে ভাল লাগবে।” মেঘলা আর দাঁড়ালো না। ঘুরে ভেতরে চলে গেল।

 

এনায়েত সাহেবের মন খারাপ হয়ে গেল। চা আনতে না বললে বোধ হয় মেয়েটা আরেকটু সময় থাকতো। সারাক্ষণ তো ঘরেই বসে থাকে জানালার পাশে। দেখা সাক্ষাৎ হয় না।

 

ঝুলন চেয়ারে বসতে বসতে পান চিবানো শুরু করতেই মুখটা বিকৃত হয়ে গেল। মুখের আলসারের কারণে, নাকি উঁই পোকা আর ফড়িং মেশানো সুপারীর জন্য- বোঝা গেল না। তবে ফেলে দিলেন না তিনি। চিবিয়ে যেতে লাগলেন জোর করে। হেলান দিলেন চেয়ারে। মুখটা বিস্বাদ লাগছে। তাও নির্বিকার চিত্তে পান চিবাচ্ছেন ধীরে ধীরে।

 

চারপাশে কালি ঘুলে দেয়া অন্ধকার। থেকে থেকে বজ্রপাতের আলো এসেই মিলিয়ে যাচ্ছে। এনায়েত সাহেব এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেনবাহিরের বৃষ্টির দিকে। টিনের চালে ঝম ঝম শব্দে ঝাপিয়ে নেমেছে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি। এখন বাতাস মিইয়ে গেছে। খাঁড়া ভাবে বৃষ্টি হচ্ছে। চার্জারের আলোয় টিনের চাল থেকে অনেকগুলো সমান্তরাল রেখায় বৃষ্টির পানি পড়ছে। সাদাটে আলোয় হীরার মত মনে হচ্ছে। অবিরাম হীরার স্রোত গড়িয়ে নামছে টিনের চাল থেকে। শীত শীত লাগছে এনায়েত সাহেবের। এশারের আযান শোনা যাচ্ছে বৃষ্টির মাঝেও। মসজিদে যাবেন নাকি যাবেন না দ্বিধায় ভুগছেন। এই বৃষ্টির মাঝে ছাতা নিয়ে বের হলে জ্বর আসাবে তাঁর। আবার জ্বর হবার ভয়ে মসজিদে যাবেন না- এটা ভাবতেও খারাপ লাগছে তাঁর। আয়েশে জীবন কাটাবার জন্য দুনিয়ায় পাঠানো হয়নি তাঁকে। মরিয়মকে একটা ছাতা আনার কথা বলা দরকার। কিংবা মেঘলা চা নিয়ে এলে তখন ছাতা দিতে বলতে হবে। সারাদিন তো বাড়ীতেই পড়ে থাকেন। এই বয়সে এসেও যদি মসজিদে না যান- লোকে কি বলবে? নিজের ওপরেই বিরক্ত হলেন এনায়েত সাহেব। লোক দেখানোর জন্য মসজিদে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? তাহলে তো পূণ্যের চেয়ে পাপটাই বেশি হবে।

 

টিনের চালে বৃষ্টির রেখার বিচিত্র দেয়ালটার মাঝ দিয়ে ওপাশের অন্ধকারে দেখা গেল একটা হলদেটে টর্চের আলো এগিয়ে আসছে এদিকে। তাকিয়ে রইলেন এনায়েত সাহেব। কে আসছে? মনোয়ার? তাঁর বড় এই ছেলে তো এতো তাড়াতাড়ি বাড়ীতে ফেরার মানুষ না। ছেলে পড়াশোনায় ভাল না দেখে কম বয়সেই বিয়ে দিয়েছিলেন। ভাল ঘরের মেয়ে। কিন্তু ছেলে বৌয়ে বছরে বারো মাসে এগারো মাস ঝগড়া লেগে থাকে। তিন তিনটা বাচ্চা হওয়ার পরেও শুধরায়নি মনোয়ার।

 

হুট হাট করে মেরে বসে বৌমাকে। এনায়েত সাহেবের ছেলের বৌ মরিয়মের মতই কঠিন মেয়ে। স্বামীর মার খেলেই তিন ছেলে মেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়ীতে গিয়ে ওঠে। উঠলে আর আসার নাম করে না। মরিয়ম কিংবা এনায়েত সাহেব গিয়েও বৌমাকে ফিরিয়ে আনতে পারেন না। সে বাড়ীর এক কথা- জামাই নিজে না এলে মেয়ে দেবে না। অপমানের চূড়ান্ত। বাড়ী ফিরে ছেলেকে পাঠালেও দেখা যায় মেয়েকে ছাড়ছে না। মাফ চাইলেও রেখে দেয়। বহু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তারপর দেয় মেয়েকে।  শ্বশুড় বাড়ীর এই আচরণে বেশ কয়েকবার ক্ষিপ্ত হয়ে তালাকের কথাও বলে ফেলেছিল মনোয়ার। কিন্তু মরিয়মের কারণে তালাক দিতে পারেনি। এই বংশে অন্য বাড়ীর মেয়ে এসে কখনো তালাক কিংবা সতীনের ঘর করেনি। তার ছেলেকেও করতে দেয়া হবে না। মরিয়ম কঠিন গলায় বলে দিয়েছে, “বৌমাকে যেদিন তালাক দিবি- আমার লাশের মুখ দেখাও হারাম হয়ে যাবে তোর জন্য। অন্যের ঘরের মেয়ে আনে মার ধোর করবি- এই শিক্ষা দিছি তোরে আমি?”

মনোয়ার মায়ের কথা অমান্য করেনি কোনদিন। তবে বৌ পিটিয়ে বাপের বাড়ী পাঠিয়ে দিলেই কেমন যেন হয়ে যায় ছেলেটা। ঘর সংসারের প্রতি উদাসীন একটা ভাব এসে যায়। সারাক্ষণ ফার্মেসিটায় গিয়ে বসে থাকে আর একটার পর একটা সিগারেট টানে। আগে বয়স যখন কম ছিল- এনায়েত সাহেবের সামনে সিগারেট খাওয়ার সাহস পেত না। কিন্তু এখন বয়স বেড়েছে। চল্লিশ পেড়িয়ে গেছে। এখন এনায়েত সাহেব ফার্মেসিতে গিয়ে বসলেও বাবার সামনেই উদাস উদাস মুখে সিগারেট টানতে থাকে। মাঝে মাঝে ছেলের ওপর প্রচণ্ড বিরক্ত হন এনায়েত সাহেব। বৌমা দোষ করতে পারে, বাচ্চাগুলো কি করেছে? তাদের এনে রাখতে পারে না? নাতি নাতনি ঘরে ছোটা ছুটি না করলে এ বয়সে জীবন ক্ষয়ী রোগ তাড়াতাড়ি বাসা বাঁধে শরীরে। কিন্তু তাঁর ছেলেকে এই কথাটা কে বোঝাবে?

 

এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন এনায়েত সাহেব। আলোটা কাছে এগিয়ে আসতেই আবার হেলান দিলেন চেয়ারে। মনোয়ার আসেনি। মনোয়ার এতো হন হন করে হাঁটে না। মনোয়ার কচ্ছপ শ্রেণীর মানুষ। বৌ পেটানোর সময় কেবল খরগোশের মত তিড়িং বিড়িং করে লাফ ঝাপ দিতে পারে সে।

 

বৃষ্টির দেয়ালটা ভেঙে ভেজা ছাতা নিয়ে বারান্দায় দৌড়ে উঠে এলো হালকা পাতলা কালো একটা ছেলে। ছাতা নিয়ে আসলেও প্যান্টের নিচের দিক আর পিঠ ভিজিয়ে ফেলেছে। বা হাতে একটা কালো পলিথিন ব্যাগ ধরে রেখেছে। ছেলেটা মনোয়ারের এসিস্টেন্ট, ফার্মেসিতে বসে। দিলিপ।

 

“সালামালেকুম স্যার।” হাতের উলটো পিঠ দিয়ে মুখের পানি মুছতে মুছতে বলল দিলিপ।

“ওয়ালাইকুম সালাম। এই বৃষ্টি বাদলের মাঝখানে হঠাৎ কি মনে কইরা আসলা?” ওভাবেই চেয়ারে শুয়ে শান্ত গলায় বললেন।

“মনোয়ার ভাই পাঠাইলো। চাচী আম্মা নাকি এলার্জির ওষুধ চাইছে? হাচ্চি দিতেছেন বলে?” ছাতাটা ভাঁজ করে নিতে লাগলো ছেলেটা। ছাতা ভাঁজ করছে কেন? বসবে নাকি ছেলে? সামান্য ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন এনায়েত সাহেব, “তোমার চাচীকে তো তেমন হাঁচি দিতে দেখলাম না। মনোয়ার নিজেই রাতে আসার সময় নিয়ে আসতে পারতো। এত জরুরী কিছু না। তোমারে ঝড় বাদলার মাঝে না পাঠাইলেইও পারতো।”

দিলিপ দাঁত বের করে হাসল, “সমস্যা নাই স্যার। অভ্যাস আছে আমার। আগে বৃষ্টিতে ভিজে অনেক কাজ করতে হইছে। গা শওয়া হইয়া গেছে।”

 

ছেলেটাকে এনায়েত সাহেব ঠিক পছন্দও করেন না, আবার অপছন্দও করেন। মনোয়ার কোত্থেকে যেন খুঁজে নিয়ে এসেছে এই ছেলেক। ফার্মেসির কাজ ভাল জানে। তবে তার থেকে বেশি জানে কিভাবে উপজেলা হেলথ এডমিনিস্ট্রেটর ইন্সপেকশনে এলে ফার্মেসীকে বাঁচিয়ে দেয়া যায়। লোকজন কাকে কিভাবে হাত করে কাজ বের করে নিতে হয়- দিলিপের মত বোধ হয় ভাল কেউ জানে না। এনায়েত সাহেব চালাক চতুর মানুষ অপছন্দ করেন। দিলিপ শুধু চালাক চতুর না, রীতিমত ধূর্ত স্বভাবের মানুষ। গত বছর জেলা মেজিস্ট্রেট আর সিভিল সার্জন এসেছিল তাদের বাজারের ফার্মেসিগুলোতে মোবাইল কোর্ট নিয়ে। এনায়েত সাহেব ভাল করেই জানেন এই দুনিয়াতে খাঁটি ব্যবসা করে ভাত পাওয়া সম্ভব না। প্রচুর ডেট এক্সপায়ার্ড ওষুধ ছিল দোকানে। গ্রামের মানুষ তো আর এত সব বুঝবে না। চালিয়ে দেয়া যায় ভাল মত। তাছাড়া ওষুধের যে এক্সপায়ার্ড ডেট থাকে, সেটার অনেক দিন পর পর্যন্ত ওষুধ ঠিক থাকে। অযথা দিন তারিখের হিসাব ধরে ভাল ওষুধ ফেলে দেয়ার কোনো মানে হয় না। এনায়েত সাহেবের মত দিলিপও বিষয়টা বোঝে। সিভিল সার্জন আর মেজিস্ট্রেট আসার পর ছেলেটা কায়দা করে সব কিভাবে যেন হাত করে নিয়েছে। অথচ সেবারেই এই বাজারের সব চেয়ে বড় বড় চারটা ফার্মেসিতে সিল গালা করে দিয়ে গেছে মোবাইল কোর্ট। দিলিপ যে কিভাবে সামলেছে সেদিন এনায়েত সাহেবের কাছে বিরাট রহস্য। আরেকটু হলে স্ট্রোক করে বসতেন তিনি সেদিন। এই দিলিপ থাকায় বেঁচে গেছেন। না হলে জেল তো হতোই, পাঁচ দশ লাখ টাকা জরিমানাও হয়ে যেতো। “মরিয়ম মেডিক্যাল হল” সে দফায় বেঁচে যাওয়ার পর বড় করে মিলাদ দিয়েছিলেন বাজার মসজিদের। দিলিপকে দশ হাজার টাকা বখশিসও দিয়েছিলেন।

 

এনায়েত সাহেব দিলিপের দিকে তাকিয়ে আছেন, চার্জারের আলো মুখে পড়ছে না দেখে বোঝা যাচ্ছে না তিনি বিরক্ত না শান্ত মুখে তাকাচ্ছেন। তবে ছেলেটাকে বসতেও বলছেন না। অবশ্য বারান্দায় তাঁর এই ঝুলন চেয়ার ছাড়া বসার মত আর কিছু নেই। টুল আছে, কিন্তু ওটার উপরে পানের বাটা রাখা।

 

পায়ের প্যান্টের ভাঁজ খুলে ঝাড়ছে ছেলেটা শব্দ করে। যেন ঝাড়া দিলেই পানি বেরিয়ে শুঁকিয়ে খট খটে হয়ে যাবে। বৃষ্টি থামার জন্য অপেক্ষা করছে নাকি দিলিপ? ওষুধটা দিয়ে চলে গেলেই তো পারে। এমনিতেই তো ভিজে আছে। শুঁকালেই কি আর না শুঁকালেই কি? মরিয়ম ওর এ বাড়ীতে আসা পছন্দ করে না। হিন্দু দেখতে পারে না মরিয়ম। মনোয়ার একে বাড়িতে পাঠালেই খুব বিরক্ত হয় মরিয়ম। মেঘলা বড় হয়েছে। হুট হাট করে এ রকম জোয়ান একটা ছেলের বাড়ীতে আসাটা ঠিক না। মনোয়ারটা যত দিক যাচ্ছে তত গাধা হচ্ছে। মরিয়ম রাগ করে জেনেও দিলিপকে বাসায় পাঠায় এটা সেটা নিয়ে যেতে কিংবা বাজার করে পাঠায়।

 

এনায়েত সাহেব ভাবলেন একবার ভেতরে বলবেন একটা চেয়ার অথবা মোড়া এনে দিয়ে যেতে দিলিপকে। ফার্মেসিতে কাজ করে বলে সামান্য বসার মত সৌজন্য বোধটুকু দেখানো যাবে না- এটা ঠিক না। কিন্তু কিছু বললেন না। অলস চোখে বাহিরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

 

দিলিপ হাতের পলিথিনটা নিয়ে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। থাকুক। এনায়েত সাহেব দিলিপের দিকে তাকাচ্ছেন না। ছেলেটার দিকে তাকালেই মনে হয় সারাক্ষণ কিছু না কিছু ফন্দি আঁটছে মনে মনে। ছেলেটারকে থাকার জন্য ফার্মেসির পেছনেই একটা টিনের ঘর দেয়া হয়েছে। মনোয়ারই থাকতে বলেছে ওখানে। এনায়েত সাহেবের সেটা পছন্দ না। যদিও ছেলের সঙ্গে এ নিয়ে তর্ক করতে যাননি। মনোয়ার সংসার ভাল না বুঝলেও ব্যবসা ভাল বোঝে। মানুষও ভাল চেনে। দিলিপ যে টুক টাক চুরি টুরি করে না- তা না। সে যে প্রায়ই ওষুধের প্যাকেট থেকে দু এক ফাইল গায়েব করে দিয়ে সপ্তাহে বন্ধের দিনে শহরে চলে যায় অন্য ফার্মেসিতে বেচার জন্য- এনায়েত সাহেব সে খবরও রাখেন। অবশ্য চার হাজার টাকার বেতনে যে কারোই পোষাবে না; এটা সত্য। এনায়েত চৌধুরীও নিজের ছেলেকে বলেছিলেন চার হাজারে দিলিপের না হলে আরেকটু বাড়িয়ে দিতে- যাতে চুরি চামারি না করে। মনোয়ার সে কথা কানে তোলেনি। এনায়েত সাহেবকে সোজা সাপ্টা ভাষায় বলে দিয়েছে, “আব্বা, যার হাত টানের অভ্যাস আছে- তারে চাইর ক্যান চল্লিশ হাজার দিলেও ফাইল চুরি করে বন্ধের দিন শহরে বেচতে চলে যাবে। তার থেকে যা আছে- থাকুক। চুরির মালের হিসাব আমি আগেই হাতে রাখে মাসের লাভের হিসাব তুলি। দিলিপ দুই ফাইল চুরি করা চোর। তিন ফাইল সরাইতে গেলে এসব ছেলে পেলের হাত কাঁপা কাঁপি শুরু হয়।”

 

এনায়েত সাহেব আর ঘাটতে যাননি ছেলেকে। অবশ্য মনোয়ার যে ভুল কথা বলেছে- তাও না। দিলিপ আসলেই বড় চুরি করা চোর না। এ জন্য ব্যবসায় খুব একটা হের ফের হয় না কখনো। তাছাড়া মনোয়ার হচ্ছে ব্যবসার পোকা। সিগারেটের ধোঁয়ার নিচে অলস ভাবে ডুবে থাকা এই ছেলে এক ফার্মেসির ব্যবসা করেই এর মধ্যে শহরে ছয় শতক জমি কিনে ফেলেছে। ছাগল চড়ানোয় জাতে রাখাল ভাল। হুজুর, কবিরাজে হয় না। এনায়েত সাহেবের ছেলে জাত রাখাল। ধোঁয়ার নিচে বসেই সব করে ফেলে।

 

দিলিপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে। ছেলেটা যে থেকে থেকে শীতে কাঁপছে- লক্ষ্য করেছেন এনায়েত সাহেব। একটা তোয়ালে এনে হাত মুখ মুছতে দেয়া যেতো। কিন্তু বিচিত্র কারণে তিনি দিলিপের প্রতি অদ্ভুত একটা অবজ্ঞা দেখিয়ে যাচ্ছেন।

 

বৃষ্টি সামান্য ধরে এসেছে। দরজার পর্দা সরানোর শব্দ হতেই পাশ ফিরে তাকালেন এনায়েত চৌধুরী। মেঘলা একটা ছোট ট্রেতে করে চা নিয়ে এসেছে। মুখটানিচের দিকে করে রেখেছে। তাকাচ্ছে না আশে পাশে। এক হাতে পানের বাটা’টা তুলে ট্রেটা রেখে দিয়ে নিঃশব্দে চলে গেল।

 

এনায়েত সাহেব ট্রেটার দিকে তাকিয়ে সামান্য অবাক হলেন। দুটো কাপে চা দেয়া। সাথে এক পিরিচ বিস্কিট। দুটো কাপ কেন? মেঘলাও কি তাঁর সঙ্গে খেতে চেয়েছিল? কিন্তু সে তো কখনো এনায়েত চৌধুরীর সঙ্গে বসে চা খায় না। তাহলে আরেকটা কাপ কার জন্য? দিলিপের জন্য নাকি? মেঘলা কখন দেখলো যে দিলিপ এসেছে?

 

নড়ে চড়ে উঠে বসলেন এনায়েত সাহেব। বেশ অসন্তুষ্ট গলায় দিলিপকে ডাকলেন, “দিলিপ? চা নিয়া যাও।”

দিলিপ হাসি মুখে এগিয়ে এলো। এখনো কাঁপছে ছেলেটা। গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। তৃষ্ণার্তের মত কাপটায় চুমুক দিল সশব্দে দিলিপ।

এনায়েত সাহেবের মুখ চূড়ান্ত বিরক্তিতে ছেয়ে গেল, থম থমে গলায় বললেন, “দিলিপ?”

“জ্বি স্যার?”

“শব্দ করে চা খাবা না। মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট হল তরল খাদ্য শব্দ ছাড়া পান করবে সে। অন্যান্য প্রাণীরা শব্দ করে তরল জিনিস খায়।”

দিলিপ দাঁত বের করে হাসল, “জী স্যার। আসলে শীত ধরে গেছিল দেখে জোরে আয়েশে টান দিছিলাম।” এগিয়ে এসে বিস্কিট তুলে নিয়ে আরো শব্দ করে কামড় দিল।

এনায়েত সাহেব চায়ের কাপ হাতে অন্য দিকে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন। এই রোগা পটকা ছেলেটাকে কেন যেন তিনি সহ্য করতে পারছেন না।

“দিলিপ?”

“জ্বি স্যার?”

“চা বিস্কিট খাওয়া শেষ হলে ওষুধ রাখে ফার্মেসিতে চলে যাও। মনোয়ার একলা বসে আছে অনেকক্ষণ যাবত।”

“জ্বি স্যার, এখনি চলে যাবো।” ঝক ঝকে দাঁত বের করে আবার হাসি দিল দিলিপ।

এনায়েত সাহেব চুমুক দিতেই মুখ বিকৃত করে ফেললেন, চা’টা এত তিতা লাগছে কেন? মেঘলা কি চা বানাতে পারে না?

 

 

বৃষ্টি কমে এসেছে। টিপ টিপ করে বৃষ্টি হচ্ছে এখন।

দিলিপ প্যান্টের পা গুঁটিয়ে ছাতা হাতে চলে যাচ্ছে। এনায়েত সাহেবদের বাড়ীটার ডানদিকের রাস্তাটা বাজারে চলে গেছে। একটু ঝোপঝাড় বেশি এদিকটায়। জংলা ধাঁচের রাস্তা। ইট ফেলবে ফেলবে করেও ফেলা হয়নি। বৃষ্টি হলেই প্যাঁক প্যাঁক করতে থাকে কাঁদাতে।

 

দিলিপ সাবধানে টর্চ হাতে দেখে দেখে পা ফেলছে। পা পিছলে যেতে যেতে বেঁচেছে দুবার। বাকি রাস্তাটা ঠিকমত যেতে পারলে হয়। স্যান্ডেলের তলাটা কাঁদা লেগে পুরু হয়ে গেছে। পা ফেলতে গেলেই মনে হয় স্যান্ডেল ওখানেই আটকে যাবে। ওঠানো আর হবে না।

 

জংলার মত ঘন ঝোপের জায়গাটার সামনে এসে গেছে। এই বৃষ্টির মাঝেও চার পাঁচটা জোনাকি ঘর ছেড়ে বেরিয়েছে। ইতঃস্তত বিক্ষিপ্ত ভাবে উড়ছে এদিক ওদিক।

 

দিলিপ হঠাৎ টর্চ নিভিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। জোনাকিগুলো অদ্ভুত ভাবে ঘিরে ধরেছে তাকে। বিচিত্র একটা বৃত্তের মত তাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। আবছা অন্ধকারে সমস্ত অবয়বই জড় পদার্থ। জোনাকীগুলোর কাছে দিলিপও সেরকম। স্থির অবয়বে পতঙ্গের আকর্ষণ বেশি। দিলিপ মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে।

 

কিন্তু জোনাকিদের দিকে তাকিয়ে নেই সে। পেছনে ফিরে এনায়েত সাহেবের বাড়ীটার দিকে চেয়ে আছে দিলিপ। এত দূর থেকেও কেন যেন মনে হল পশ্চিম দিকের একটা জানালার পর্দা সামান্য সরিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারের মাঝেও এই পথটার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে মানুষটা। স্থির, নিশ্চল......

ধীরে ধীরে সরল একটা হাসিতে ভরে গেল দিলিপের মুখটা।

 

 

মেঘলা ওর বিছানার পাশের জানালাটার ধারে চুপচাপ বসে আছে। ঘরের ভেতর এক কোনায় একটা মোম জ্বলছে। বাসার সব চার্জার লাইট ঠিক নেই। এ জন্য মোম জ্বালাতে হয় কারেন্ট গেলেই। নষ্ট চার্জারগুলো ঠিক করাবে করাবে বলেও নেয়া হচ্ছে না বড় ভাইয়ার।

 

মোমের হলদেটে শিখা বাতাসের নড়া চড়ায় তির তির করে কাঁপছে। সেই সাথে কাঁপছে ঘরের সমস্ত ছায়াগুলো। যেন হাঁটা চলা করে বেড়াচ্ছে ছায়াগুলো জীবন্ত প্রাণীর মত। জড় বস্তুগুলোর জীবনের মাঝে একমাত্র জীবিত প্রাণীটি অসার হয়ে বসে রয়েছে জানালাটার পাশে। পর্দাটা সামান্য ফাঁক করে ঘুট ঘুটে অন্ধকারের মাঝে বাজারের দিকে চলে যাওয়া রাস্তাটা দিয়ে কাঁপতে থাকা হলুদ আলোটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে নিজের অজান্তেই। ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে আলোটা.......

 

মেঘলার চোখে মুখে তীব্র একটা যন্ত্রণার ছাপ ফুটে রয়েছে স্পষ্ট ভাবে। আলোটা মিলিয়ে যাচ্ছে কেন? নাকি অন্ধকারে কেউ দাঁড়িয়ে রয়েছে ওখানে?

মেঘলা খুব সাবধানে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে পর্দাটা ছেড়ে দেয়। মোমের আলোতে ওর ঘরে অসংখ্য ছায়ার অদ্ভুত ছন্দে নাচ শুরু হয়েছে।

অপলক চোখে মোমবাতিটার শিখার দিকে তাকিয়ে আছে মেঘলা। তারপর ধীরে ধীরে ওর ওড়নাটা হাতের ওপর থেকে সরিয়ে নিতে থাকলো......

তীব্র একটা দৃষ্টিতে হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে রইলো মেঘলা।

 

ছায়ার নাচের নাট্যশালার একমাত্র বেঁচে থাকা মেয়েটার দীঘির মত চোখের কিনার ছাপিয়ে ওঠা জলের খবর টের পায়নি কেউ। দেয়াল জুড়ে ছায়ার জীবন প্রাপ্তির মহা সুখে উল্লাসে মত্ত সব। ঠোঁট কামড়ে চোখের পানি আটকানোর কোনো ছায়া বোধ হয় দেয়ালে পড়েনি। তাহলে হয়ত ছায়ার জগৎটাও আচমকা স্থির হয়ে যেত।

মেঘলা কোনো শব্দ না করে হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে আকুল হয়ে কাঁদতে থাকে। টপ্‌ টপ্‌ করে পড়তে থাকা নোনা জলে ক্রমশ সাদা হয়ে আসতে থাকা হাতগুলোয় বড় অবহেলায় বিচিত্র নকশা কেটে যা ছায়ানটের অগোচরে.......

 

রাত সাড়ে দশটা।

 

এনায়েত সাহেব আর মনোয়ার খেতে বসেছেন টেবিলে। মরিয়ম খাবার বেড়ে দিচ্ছেন দুজনকে। মেঘলা আর তিনি পরে খান। আগে এক সাথে খেতো। কিন্তু ধীরে ধীরে নিয়ম বদলেছে।

 

কারেন্ট এসেছে একটু আগে। চার্জারের আলোয় খাওয়া দাওয়া করায় ভীষণ অসুবিধা হয় এনায়েত সাহেবের। বয়স হয়েছে। চশমা পরেও তিনি মাছের কাঁটা দেখতে পান না এখন। ইলেকট্রিক বাতির নিচে বসে খেতে হয়।

মনোয়ার চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। খাওয়ার সময় সাধারণত কথা বলে সে। কিন্তু মায়ের কথা থাকলে ভিন্ন ব্যাপার। আজকে মরিয়ম কথা বলার উদ্দেশ্যেই এখানে এসে ভাত বেড়ে দিচ্ছেন। না হলে ভাত বাড়ার জন্য রোজ আসেন না তিনি। মনোয়ারের বৌ থাকলে সেই বাড়ে। আর না থাকলে এঁরা নিজেরাই বেড়ে খায় কিংবা মেঘলা থাকে। আজকে মেয়েকে আসতে দেননি। ঘরে বসে থাকতে বলেছেন। স্বামী আর ছেলের সঙ্গে তাঁর জরুরী কথা আছে। এ সময় মেঘলার থাকা চলবে না।

“দিলিপকে ওষুধ দিয়া তুই পাঠাইছিলি?” ছেলের প্লেটে মাছের পিস তুলে দিতে দিতে তীক্ষ্ম গলায় বললেন মরিয়ম।

মাথা ঝাঁকালো মনোয়ার। হ্যাঁ সূচক উত্তর।

“তোরে না বলছি বাড়ীতে তোর বোনটা বড় হইছে- বাসায় যখন তখন কাউকে পাঠাইবি না?”

“বিয়ে শাদীর সম্বন্ধ নিয়ে তো আর আসেনি দিলিপ। ওষুধ দিয়া পাঠাইছি, নিয়াসছে।” গম্ভীর মুখে উত্তর দিল মনোয়ার।

মরিয়ম ছেলের উত্তরে হতচকিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। দ্রুত সামলে নিলেন। গলা কয়েক ধাপ চড়িয়ে বললেন, “ঘরে মেয়ে থাকলে আসলে বড় ভাইগুলারে আলাদা করে দেওয়া উচিত। মেয়ে বাড়ীতে বাহির থেকে জোয়ান পোলা একটা পথেই ঢুকতে পারে- মেয়ের ভাইয়ের মাধ্যমে। একবার ঢুকলে দূর্ঘটনা ঘটাইতে সময় লাগে না। দুনিয়ার পুরুষ মানুষ হইল সবচেয়ে খারাপ জাত। জায়গা দিবি- ঘরে ঢুকে নষ্ট করে দিবে। বিশ্বাস নাই এদের। এরা ঘুমায় থাকলেও ঘরে দরজা দিয়ে রাখতে হয়। আর তুই পাঠাইতেছিস দিলিপের মত চোর বাটপার পোলারে বাসার ভিতর? এ্যাঁ? বুদ্ধি শুদ্ধি কি দিন দিন কমে যাইতেছে তোর? নিজের ছেলে মেয়েগুলারে তো আরেকজনের বাড়ীতে বসায় রাখছিস। আমার মেয়েরে আমারেই সামলাইতে দে।”

এনায়েত চৌধুরী বিরক্ত হলে খুব, “আহ্‌! কি শুরু করলা মরিয়ম? ছেলেটা খাইতেছে- শান্তি মত খাইতে দিবা না?”

স্বামীর দিকে বিষ দৃষ্টিতে তাকালেন মরিয়ম, “মেয়ের যে হাতের মধ্যে শ্বেতী হইছে, বিয়া দিতে পারবা? পারবা বিয়া দিতে? কত করে বলতেছি পরীক্ষার কোনোই দরকার নাই, সারা শরীলে ছড়ানোর আগেই একটা হাবাগোবা ছেলে দেইখা বিয়া দিয়ে দেও- কথা কানে যাইতেছে না বাপ বেটার। পরে যখন মেয়েরে ঘরে বসায় রাখতে হবে সারা জীবন- তখন টের পাবা আমি কিছু বলছিলাম তোমাদের। কানে তুলো নাই।”

মনোয়ার হঠাৎ চাপা গলায় বলে উঠল, “আম্মা! আস্তে কথা বলেন। মেঘলা শুনতে পাইলে কি ভাববে?”

“শুনলে কি আমার? যা ঘটার তা তো ঘটেই গেছে। ভাবছো শ্বেতী কি জিনিস আমি চিনি না? ধবল না বানাইয়া ছাড়বে ভাবছো? এই সব হইল পাপ। পাপ করছে হয়তো ছেমড়ি। স্কুল কলেজ তো সব বেহায়াপনার একশেষ! আমাদের দিনে ঠিক আছিল। সব আলাদা আলাদা। এখন তো রাস্তা ঘাটেও প্রেম পিরিতি হয়।”

এনায়েত সাহেব রাগ চেপে রাখতে পারলেন না, “মরিয়ম, মুখ সামলায় কথা বলবা। সে তোমার মেয়ে। তোমার মতই মানুষ। এসব কথা তার কানে গেলে মেয়েটা ভাঙে পড়বে।”

“ঠিক আছে! চিল্লাইলাম না আর। আমার সাফ কথা- এই মেয়ের বিয়া যেমনে পারো দুই এক দিনের মধ্যে দেওনের ব্যবস্থা করো। সারা গায়ে ছড়াইলে কইলাম বাকি জীবন ভাত তোমার বাড়ীতেই বসে খাবে।”

এনায়ের সাহেব ভাতের ওপরেই হাত ধুয়ে উঠে পরলেন। ক্ষুধা নষ্ট হয়ে গেছে তাঁর। পাঞ্জাবীর গায়ে হাত মুছে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। বারান্দায় চলে এলেন। স্ত্রীর ওপর রেগে গেছেন প্রচণ্ড। কিন্তু রাগটা দমানোর চেষ্টা করছেন। মরিয়ম যে কথাগুলো বলেছে- একটাও অযৌক্তিক কিছু বলেনি। মেঘলার হাতের শ্বেতী রোগটা শুরু হয়েছিল মাস ছয়েক আগে। প্রথম দিকে তেমন পাত্তা দেয়নি কেউ। ভেবেছিল তেমন কিছু না। ওষুধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক হওয়ার বদলে এখানে ওখানে ছড়িয়ে পড়া শুরু করে দ্রুত। শেষে শহরে গিয়ে ভাল স্কিন ডিজিস স্পেশালিস্টের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন মেঘলাকে। ডাক্তার সাহেব ভাল করে পরীক্ষা করে হতাশ মুখে বলেছেন, “আপনার মেয়ের কপালটা খারাপই বলতে হবে এনায়েত সাহেব। ভিটিলিগো হয়েছে ওর। সোজা বাংলায় শ্বেতী রোগ। মেডিক্যাল সায়েন্সে এর কোনো ট্রিটমেন্ট নেই। ধীরে ধীরে সারা শরীরেই ছড়িয়ে যায় জিনিসটা।”

 

এনায়েত সাহেবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে তখন। কেবল অস্পষ্ট স্বরে বলেছেন, “আমাদের বংশে তো কারো....”

“কারো থাকতে হয় না। এমনিতেই হয়। তবে মাঝে মাঝে বংশের দোষেও হয়। রক্তে সমস্যা, জিনে ডিফেক্ট থাকলে কিংবা আল্ট্রাভায়োলেট রে’র কারণে হতে পারে। ঠিক নেই। তবে রোগটা ক্ষতিকর কিছু না। কেবল সাদা হয়ে যাবে স্কিন। শ্বেতাঙ্গদের মত।”


এনায়েত সাহেব চোখে মুখে অন্ধকার দেখছিলেন সেদিন। যে দেশে সামান্য গায়ের রঙ ময়লা হলে মেয়েদের বিয়ে দেয়া যায় না- সেখানে শ্বেতী রোগের মেয়েকে বিয়ে দেবে কিভাবে? রোগের কথা জানাজানি হলেই তো সম্বন্ধ আসা থেমে যাবে।

এনায়েত সাহেব সেদিন থেকে মেঘলাকে বলে দিয়েছিলেন যে খুব সাবধানে চলা ফেরা করে। কারো কাছে বিষয়টা নিয়ে কথা না বলে। বিশেষ করে বান্ধবীদের সঙ্গে।

কিন্তু লাভ কতটুকু হয়েছে কে জানে। এনায়েত সাহেব যে মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে চেষ্টা করেন নি তা না। গত ছয় মাস ধরে তিনি আর মনোয়ার মিলে মেঘলার বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু বিচিত্র কোনো উপায়ে ছেলে পক্ষ টের পেয়ে যাচ্ছে যে মেয়ের শ্বেতী রোগ হয়েছে। মেঘলার বান্ধবীরাই ছড়িয়ে থাকতে পারে। এছাড়া আর তো কোনো উত্তর নেই। এক মেয়ের রোগের খবর আরেক মেয়ে ফলাও করে ছড়াবে এটাই স্বাভাবিক। আর গ্রাম গঞ্জ এলাকায় বর পক্ষ মেয়ের বান্ধবীদের মাধ্যমেই খবর বের করার চেষ্টা করে। ওড়না দিয়ে হাত ঢাকা গেলেও খবর কি করে ঢাকা যাবে?

একটা নিঃশ্বাস ফেলে পিলারের গায়ে হেলান দিলেন এনায়েত সাহেব। বৃষ্টি নেই। বাহিরে নিকষ কালো আকাশটার মাঝে একটা দুটো করে তারা ফুটতে শুরু করেছে। চশমাটা খুলে ঝাপসা দৃষ্টিতে আকাশটার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি অসহায় চোখে। আচ্ছা বিধাতা ঠিক কোথায় থাকেন? তাঁর মেয়েটাকে এভাবে কষ্ট দিয়ে ওপরে বসে থাকতে এতো ভাল লাগে তাঁর? তাঁর মেয়েটা কার এমন কি ক্ষতি করেছিল? হাত পা পঙ্গু না হয়েও এভাবে পঙ্গু করে দেয়ার মাঝে কিসের এত পরীক্ষা তাঁর? এতো আনন্দ কেন তাঁর মেয়েটাকে নির্জীব একটা শ্বেত পাথরে পরিণত করায়?

 

 

দিলিপ ওর টিন শেডের ঘরটার ভেতরে বিছানায় মশারী টানিয়ে ভেতরে বসে আছে। কোনো জানালা নেই ঘরটায়। কেবল দরজা। টিনের দেয়ালের ওপর আর নিচে সামান্য ফাঁক আছে। বাতাস ওখান দিয়েই আসে। ফ্যান নেই। গরমের দিনে চুলার মত গরম হয়ে থাকে ঘরটা। দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা দরজা খোলা রেখে দেয়। সাপ, ব্যাঙ যা আছে সব ঢোকে। লাঠি দিয়ে মেরে টেরে যাতটা থাকা যায় আর কি।

ছোট একটা চৌকির ওপর তিন চারটা কাঁথা বিছিয়ে শোয়। তোশক নেই। তেল চিটচিটে বালিশ। সারাক্ষণ ভুর ভুর করে নারকেল তেলের গন্ধ আসতে থাকে।

অনেক রাত হয়ে গেছে। বাতি নেভানোর আগে কাঁথা উলটে অনেকগুলো ওষুধের ফাইল বের করল। ফার্মেসিতে বসে যখন যা পারে সরিয়েছে। রাতে ঘুমানোর সময় হিসাব করতে বসে কত টাকার ওষুধ সরিয়েছে। গত সপ্তাহেই শহরে গিয়ে দেড় হাজার টাকার ওষুধ বেঁচে এসেছে। এই সপ্তাহে তেমন হবে না। মনোয়ার ভাই সব সময় বসে থাকে দেখে ওষুধ সরানো মুশকিল। এবারে বেশি সরাতে পারেনি। টেনে টুনে সাতশো সাড়ে সাতশো হবে। চুরির জিনিস বলে অরিজিনাল রেটে বিক্রি করা যায় না। ছাড়তে হয় কিছু।

ওষুধের হিসাব করার পর কাঁথার নিচে আগের মত রেখে দিল। তারপর ভাঁজ করা একটা সাদা কাগজ বের করল। স্কুলের রুলটানা খাতায় লেখা ভাঙ্গা ভাঙ্গা হাতের একটা চিঠি। প্রচুর কাটা ছেঁড়া করা-

 

“দাদা,

কেমন আছিস তুই? কোথায় থাকা হয় এখন তোর? আমি জানি, আমি যে ঠিকানায় চিঠি দেই- তুই সেখানে নেই। তুই অন্য কোথাও থাকিস। কিন্তু আমাকে বলিস না। যদি জামাইয়ের মার খেয়ে তোর কাছে চলে আসি এই ভয়ে। তাই না?

তোর ভয়টা আসলেই সত্যিরে দাদা। তোর আসল ঠিকানাটা যদি জানতে পারতাম, কিংবা একটা মোবাইল নাম্বার থাকতো- তোকে খুঁজে বের করে চলে আসতাম। মরণের আগে আর বাড়ী ফিরতাম না। তোর টাকা পাঠিয়ে কি লাভ বলতে পারিস? আমার ভাঙা কপাল কি আর তোর ওষুধ বেচার টাকায় জোড়া লেগে যাবে?

কোথায় থাকিস একটা বার বল দাদা। না হলে এসে আমাকে নিয়ে যা। এখানে প্রতিদিন মরার চেয়ে তোর কাছ এসে না খেয়ে একেবারে মরে যেতাম। আগে তো কত রাত না খেয়ে কাটিয়েছি তোর সাথে। ভাতের জন্য আর কাঁদবো না আমি দাদা।

                                                                               ইতি

                                                                             দীপালী”

 

সূক্ষ্ম একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে চিঠিটা ভাঁজ করে আগের জায়গায় ঢুকিয়ে রাখলো কাঁথা উলটে। বাতিটা নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। বিড় বিড় করে অন্ধকারেই বলল, “মাফ করে দিস্‌রে দীপালী। আমার থালা ভরে ভাত খাওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। অর্ধেক থালা খাইতে পারবো না আর।”

 

গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ এনায়েত সাহেবের। ঘুমটা ভেঙে যাওয়ার কারণটা ধরতে পারছেন না। ঘরটা প্রায় অন্ধকার। ড্রইং রূমের বাতিটা জ্বলছে বলে দরজার কোণা ঘেষে আলো আসছে। সেই আলোতে ঘরটাআবছা ভাবে দেখা যায়। ঘুমের রেশটা ধীরে ধীরে কাটার পরেই টের পেলেন ঘরের মধ্যে কেউ খুব নিচু স্বরে কাঁদছে। চমকে উঠলেন। এত রাতে কাঁদে কে? মরিয়মকে ডাকার জন্য পাশ ফিরতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখলেন মরিয়ম বিছানায় নেই।

আস্তে আস্তে উঠে বসলেন এনায়েত চৌধুরী। মশারীর ভেতর থেকে বাহিরটা দেখা যাচ্ছে। ফ্যানের বাতাসে মশারীর দেয়ালগুলো অনবরত নড়তে থাকলেও ঘরের মাঝামাঝি জায়নামায বিছিয়ে মোনাজাত ধরা মরিয়মকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আকুল হয়ে কাঁদছেন তিনি তাহাজ্জুদের নামায পড়তে পড়তে।

এনায়েত চৌধুরী শক্ত হয়ে বসে আছেন বিছানার ওপর।

 

পরীক্ষা দিয়ে হল থেকে বেরিয়েছে মেঘলা। বাহিরে ভয়ংকর রোদ। ওড়নাটা খুব ভাল করে পেঁচিয়ে নিয়েছে। গরম লাগছে খুব। ক্লিপ বোর্ডটা মাথার সামনের দিকে এনে সূর্যটাকে আড়াল করে দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগলো। ওদের সেন্টার পড়েছে জামালপুর ডিগ্রী কলেজে। বাড়ী থেকে হাঁটা পথে বিশ মিনিটের দূরত্ব। আগে আগেই হল থেকে বেরিয়েছে ও। বান্ধবীদের সঙ্গে আসতে চাচ্ছিল না। তাছাড়া অসুখটা হওয়ার পর থেকে ওর বান্ধবীরাও কেমন যেন গুঁটিয়ে নিয়েছে নিজেদের ওর থেকে। মেঘলা আর ঘাঁটতে যায়নি। যার একা চলাই নিয়তি হয়ে গেছে- তার কারো জন্য অপেক্ষা করার কোনও অর্থ হয় না। কেউ সাথে আসবে না, এটাই স্বাভাবিক।

রাস্তার বালুগুলো আগুণ গরম হয়ে আছে। স্যান্ডেলের ভেতর ঢুকে পড়ছে বার বার। জ্বলতে শুরু করেছে পা। এভাবে হেঁটে যেতে থাকলে পায়ে ফোস্কা পড়ে যাবে কিছুক্ষণের মাঝেই। মেঘলা প্রায় দৌড়ে দৌড়ে হাঁটছে বালুর হাত থেকে বাঁচতে। আশে পাশে কাউ নেই যে দেখতে আসবে কে দৌড়াচ্ছে এমন ভাবে।

ভর দুপুর দেখে রাস্তাতে লোকজন নেই। দখিন বাড়ী পুলটা পেরুনোর সময় হঠাৎ পেছন থেকে ডাক শুনতে পেল, “মেঘলা?”

অবাক হয়ে ফিরে তাকালো। তাদের ফার্মেসির দিলিপ ভাই। একটা সাইকেল নিয়ে আসছেন। পেছনের ক্যারিয়ারে বড় একটা ওষুধের বক্স রাখা। মেঘলা দাঁড়িয়ে পড়তেই ওর পাশের এসে দাঁড়ালো সাইকেল নিয়ে দিলিপ, “পরীক্ষা দিয়া আসতেছো?” হাসি হাসি গলায় বলল।

মেঘলা ভর দুপুরের মাঝেও বরফের মত জমে গেছে। টের পাচ্ছে নাক মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে ওর। কথা বলতে গিয়ে কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, “হ্‌-হ্যা। বোটানী পরীক্ষা ছিল।”

“কেমন দিলা?” মুখের সামনে হাত এনে চোখ আড়াল করলো দিলিপ। চোখে রোদ লাগছিল।

মাথা কাত করলো মেঘলা, “ভ-ভাল।”

“দৌড়াতেছিলা ক্যান? দূর থেকে দেখলাম লাফায় লাফায় যাইতেছো?” হা হা করে হাসতে লাগলো দিলিপ।

লজ্জায় মাটি খুঁড়ে ঢুকে পড়তে ইচ্ছে করছে মেঘলার। মুখ পুরো গোলাপী হয়ে গেছে। তোতলাতে তোতলাতে কেবল বলল, “ন্‌-না, ব-বালি বেশি গরম দেখে দ-দৌড়াইছি!”

হাসছে দিলিপ। হাসলে ছেলেটার চোখগুলো ছোট ছোট হয়ে যায়। হাসার সময় পানিও চলে আসে। চোখে। মেঘলা তাকাতে পারছে না মানুষটার দিকে। কিন্তু হাসির শব্দটা শুনতে পাচ্ছে। প্রচণ্ড লজ্জার মাঝেও কেন যেন খুব ইচ্ছে করছে হাসতে থাকা মানুষটার চোখগুলোর দিকে একটু তাকাতে। ইস্‌ লোকটা অন্যদিকে তাকায় না কেন? গত বছর যখন মনোয়ার ভাই দিলিপকে ফার্মেসিতে চাকরী দেয়, প্রায়ই বাসায় নিয়ে আসতো। দুপুর দিকে ভাতও খেতো। মেঘলা তাকিয়ে দেখতো ছেলেটা সব সময় খুব আগ্রহ নিয়ে ভাত নেড়ে চেড়ে খেতো। খুব অদ্ভুত ব্যাপার হল- মানুষটা ভাত খাওয়ার সময় কেমন যেন চোখ লুকিয়ে রাখতো। মেঘলা ধরতে পেরেছিল দিলিপ ভাত খাওয়ার সময় কাঁদে। কেন কাঁদে মেঘলা জানে না। বড় মায়া লাগতো তখন থেকে এই মানুষটার জন্য। আজও যখন হাসছে সে- চোখ তুলে তাকাতে চেয়েও পারছে না। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে ধমক দিল- কি ভাবছে সে এসব!

“তুমি আমার সাইকেলের পিছনে উঠে বসো। তোমাকে নামায় দিয়া আসি।”

মেঘলা হা হয়ে তাকায় দিলিপের দিকে। এত ভয়ংকর একটা কথা কত অবলীলায় বলে দিল ছেলেটা!

মেঘলার বড় বড় চোখ দুটোর দিকে হঠাৎ হাসি থামিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে দিলিপ। খুব অবাক হয়ে দেখতে পায় মেয়েটার বড় বড় চোখ দুটোয় পানি চলে আসছে। মেয়েটা  প্রাণ পণ চেষ্টা করছে সেই পানি আটকাতে। পারছে না। আবার চোখও ফিরিয়ে নিচ্ছে না। ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।

দিলিপ কথা হারিয়ে ফেলল কিছুক্ষণের জন্য।

“ইয়ে, মেঘলা..... আরে কান্দো ক্যান! মানে তুমি সাইকেল.... ইয়ে থাক্‌ উঠা লাগবে না!”

দিলিপকে হতবাক করে দিয়ে মেঘলা ঘুরে ছুটতে থাকে তপ্ত বালুর সমুদ্রের মাঝ দিয়ে।

গণগণে আগুণ ঢালতে থাকা সূর্যটা ঠিক মাথার ওপরেই, পুলটার মাঝে হতভম্ব হয়ে সাইকেলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে দিলিপ। মেঘলার ছুটন্ত পথে চিক চিকে বালু অদ্ভুত নদী তৈরি করেছে..... মেয়েটার চোখের পানিও কি মিশেছে সেই নদীতে?

 

পনেরো দিন পর। দুপুর বেলা হঠাৎ করেই মায়ের ঘরে চলে এলো ব্যস্ত ভঙ্গিতে মনোয়ার।

“কিরে? কিছু বলবি?” মরিয়ম একটা বোতাম লাগাচ্ছিলেন এনায়েত চৌধুরীর একটা পাঞ্জাবীতে। এনায়েত সাহেব ঘুমাচ্ছেন পাশ ফিরে। একটু আগেই দুপুরের খাবার খেয়েছে। খাওয়ার পর ঘুমানোর অভ্যাস তাঁর। শোয়া মাত্রই ঘুমিয়ে গেছেন।

মনোয়ার এক ঝলক বাবার ঘুমন্ত শরীরটার দিকে তাকিয়ে অস্বস্তি মেশানো গলায় বলল, “কেরানী বাড়ীর সম্বন্ধটা মানা করে দিছে।”

দীর্ঘ একটা মুহূর্ত নীরবতা। মরিয়ম শান্ত স্বরে বললেন, “আরো কোনো বাড়ীতে সম্বন্ধ পাঠাইছিলি?”

“আরো তিন জায়গায় দিছিলাম।” মাথা নাড়লো হতাশ ভাবে, “মেঘলার অসুখটার কথা আসলে সারা গ্রামে ছড়ায় গেছে। ছেলের বাড়ী থেকে খোঁজ নিতে আসলেই দরজা থেকে ফেরত চলে যায়।”

থম থমে মুখে খোলা জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে রইলেন মরিয়ম। তারপর গম্ভীর হয়ে বললেন, “মিজান ভাইয়ের ছেলেটা মেঘলারে বিয়ে করতে চাইছিল না? জাফর? তারে বলবি মেঘলার সাথে বিয়ে দিতে রাজী আছি আমরা।”

মনোয়ার ইতঃস্তত গলায় বলল, “কিন্তু ওর তো আগের দুইটা বৌ আছে।”

“তোর বোনও বেশি ভাল জিনিস না। যে রোগ বাঁধাইছে তাতে বিয়ে বসানোই ঝামেলা।” কট মট করে তাকালেন ছেলের দিকে।

মনোয়ার মাথা নাড়ালো পুতুলের মত।

“আর শোন্‌ তোর ঐ এ্যাসিস্টেন্ট- দিলিপ; ঐটারে চলে যাইতে বলবি গ্রাম ছাইড়া। প্রয়োজনে বেশি টাকা দিবি। তাও যেন আর কোন দিন ফেরত না আসে। নানান দিক থেকে খবর পাইতেছি তোর বোনের কলেজের সামনে গিয়া নাকি দাঁড়ায় থাকে ছ্যামড়া। মেঘলার পিছন পিছন সারা রাস্তা হাঁইটা আসে। এই স হিন্দু ছেলেরে নিয়া কিছু কথা রটার আগেই পথটা বন্ধ করতে হবে। পরিষ্কার?”

মনোয়ার মাথা ঝাঁকালো আবার।

 

 

বৃষ্টি হচ্ছে। টিনের চালে ঝাপিয়ে নেমেছে এই মাঝরাতে। খানিক পর পর আকাশ চৌচির করে বিদ্যুতের নীল শিখা ছড়িয়ে পড়ছে। পুরো জগৎ খান খান করে ভেঙে দিচ্ছে প্রতি মুহূর্তে।

মেঘলা ওর বিছানার পাশের জানালাটায় মূর্তির মত বসে আছে। জানালা খোলা। বাহির থেকে বৃষ্টির ছটা বাতাসে নিয়ে এসে ভেতরে ফেলছে। ভিজে যাচ্ছে সে। তবু নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে বাহিরের জমাট অন্ধকারের দিকে। মুহূর্তে মুহূর্তে দিনের মত জেগে ওঠে চারপাশ। পরক্ষণেই ডুবে যায় নিকষ কালো অন্ধকারে। হীরার মত জ্বল জ্বলে চোখে মেঘলা তাকিয়ে থাকে।

কাল সকালে ওর বিয়ে। দূর সম্পর্কের এক ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে তার। জাফর সিদ্দিক। আগের দুটো বৌ আছে। তৃতীয় পক্ষ বসবে মেঘলা। কোন আয়োজন ছাড়াই বিয়েটা হচ্ছে। এনায়েত সাহেব তাঁর তিন বিঘা ধানী জমি লিখে দিচ্ছেন মেয়ে জামাইকে। সাথে ছয় ভরি সোনার গহনা সিয়ে সাজিয়েও দেবেন। আসবাব পত্র, ফ্রিজ, টিভিও বাদ রাখছেন না। বাদ থাকার মাঝে কেবল রয়েছে আত্মীয় সজনকে ডেকে ঘটা করে খাওয়ানো। মরিয়ম কোন রকম আত্মীয় ডাকা অনুষ্ঠান করতে চাননি। মেয়ের সম্পর্কে আজে বাজে কথা ছটানোর সময় মুখিয়ে থাকা আত্মীয়দের না খাওয়ালে তাঁর কিছু আসবে যাবে না। যে আত্মীয় বিয়ের আগেই সম্বন্ধ ভাঙার গীত গাইতে জানে- বিয়ের খাওয়া খেয়ে যে মাংসে লবণ বেশি পড়েছিল বলবে না- তার কোনো ঠিক নেই। জিভ সর্বস্ব প্রাণী মরিয়ম দুই চোখে দেখতে পারেন না।

বৃষ্টি-বাতাসের ঝাপ্টায় জানালার পর্দাটা বার বার উড়ে যাচ্ছে, ডানা ঝাপ্টাচ্ছে পাখির মত। মেঘলা জানালার গ্রিলে মাথা রেখে শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ওড়নাটা এখনো একই ভাবে পেঁচিয়ে রেখেছে।

বজ্রপাতের চমকাতে থাকা আলোতে পশ্চিম দিকের রাস্তাটা ধরে কেউ এগিয়ে আসছে, ছাতা কিংবা টর্চ কোনটাই সাথে নেই। পানি জমে ওঠা রাস্তাটায় ছপ্‌ ছপ্‌ শব্দে পা ফেলে হেঁটে আসছে মানুষটা। মেঘলা ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসল, মুখটা সরিয়ে নিলো গ্রিল থেকে। পর্দাটার এপাশে চলে এলো। বৃষ্টির মাঝে ভিজতে ভিজতে বাড়ীর দিকে এগিয়ে আসতে থাকা মানুষটাকে চিনতে পেরেছে সে বিদ্যুতের খনিক আলোতেও। দিলিপ ভাই। জানালা থেকে সরে গেছে সে জন্য। পাথরের মত জমে গেছে মেঘলা।

কাঁধের ছোট ব্যাগটা নিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটছে দিলিপ। মেঘলা জানালাটার এপাশে একটা বাগানের মত রয়েছে। ঘাসের ওপর ইঞ্চি খানেক পানি জমে আছে। হাঁটতে গেলেই ছিটকে ওঠে। তার ওপর প্রচণ্ড বাতাসের জন্য বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টিগুলো সূঁচের মত বিঁধছে। চোখ ছোট ছোট করে রাখতে হচ্ছে। না হলে দেখা যায় না কিছু। পানি এসে ভিজিয়ে দেয় চোখ।

টিনের চালে ঝম ঝম শব্দে সুর করে বৃষ্টি পড়ছে। মেঘলার জানালাটার কাছে এসে দাঁড়ালো দিলিপ। জানালার পর্দাটা উড়ছে ডানা ঝাপ্টে। বিদ্যুতের আলোয়া আবছা ভাবে মেঘলার অস্পষ্ট অবয়বটা বোঝা যাচ্ছে।

চাল থেকে যে অংশে বৃষ্টির পানি পড়ে, সেই সমান্তরাল রেখায় পানির দেয়ালটা ভেদ করে এগিয়ে এলো দিলিপ। অনুচ্চ স্বরে ডাকল, “মেঘলা?”

বিছানার ওপর স্থাণুর মত বসে রয়েছে মেঘলা। পতাকার মত পত্‌ পত্‌ করে এক কোনা উড়তে থাকা পর্দার ওপাশে নিচ থেকে দাঁড়িয়ে থাকা দিলিপকে দেখা যায়।  জানালাটা বেশ উঁচুতে বলে দিলিপের মুখটা কেবল দেখা যাচ্ছে। ভিজে গেছে মানুষটা। প্রচণ্ড শীতে কাঁপছে।

“মেঘলা?” আবারও ডাকল দিলিপ।

মেঘলা চাপা স্বরে বলল, “এত রাতে কেন আসছেন আপনি?”

“আমি তো চলে যাইতেছি। মনোয়ার ভাই সন্ধ্যার সময় হঠাৎ করে অনেকগুলা টাকা হাতে দিয়া বলল এই গ্রাম ছাইড়া দূরে অন্য কোথাও চলে যাইতে।” অসহায় গলায় বলল।

মেঘলা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকাতে চাইলো, “টাকা দিছে চলে যান। এইখানে আসছেন কেন?”

দিলিপ মুখ নিচু করে ফেলল। ভিজে যাচ্ছে এক টানা বর্ষণে। মেঘলা আপ্রাণ চেষ্টা করছে কান্না ঠেকাতে। পারছে না। চোখ ফেটে পানি আসছে। এই মানুষটা এভাবে দাঁড়িয়ে ভিজছে কেন বৃষ্টিতে? ভয়ংকর একটা কষ্ট মোচড় দিতে লাগল ভেতরে।

দিলিপ মুখ নিচু করে দাঁড়িয়েই আছে। কথা বলছে না। কাঁপছে শুধু ঠাণ্ডায়। মেঘলা উড়তে থাকা পর্দার আড়াল থেকে দেখতে পাচ্ছে মানুষটা ঠাণ্ডায় কাঁপা শুরু করেছে।

“আপনি দাঁড়ায় আছেন কেন? এইভাবে ভিজতেছেন কেন? চলে যাইতে বললাম না?” থাকতে না পেরে বলে ফেলল মেঘলা। কান্নার স্বরটা বৃষ্টির মাঝেও স্পষ্ট বোঝা গেল। মেঘলা টের পাচ্ছে তার পাগলের মত কান্না আসছে। কিন্তু শব্দ করে কাঁদতে পারছে না। মনে হচ্ছে সব কিছু ভেঙে চুরে গুড়িয়ে দিতে পারলে ভেতরের কিছু একটা শান্ত হতো। এত কষ্ট লাগছে কেন ওর?

দিলিপ ধীরে ধীরে মুখ তুলে প্রায় শোনা যায় না এমন স্বরে বলল, “মেঘলা? আমার সাথে যাবা? তোমার তো এখানে কেউ নাই।”

মেঘলা স্থির হয়ে গেল। উত্তর দিল না। বাতাসে মায়াবী পর্দা দুলছে।

“যাবা আমার সাথে?” জানালার গ্রিলে মুখ এনে ঠেকালো দিলিপ। কাতর চোখে তাকায় মেঘলার দিকে।

মেঘলা ফিস ফিস করে দীর্ঘ একটা মুহূর্ত পর বলে, “আমি তো সুন্দর না দিলিপ ভাই। দিন দিন কুৎসিত একটা মানুষে বদলায় যাবো আপনার চোখের সামনেই। আমাকে কেন নিতে চান সাথে?”

অসহায় ভঙ্গিতে হাসল, “সুন্দর অসুন্দরে কি দুনিয়ার হিসাব চলে? মানুষের মনের উপর সংসার গড়ছে। সুন্দরে না। সুন্দরে ঘরের শুরু করা যায় কেবল, সংসার না। মনের সুন্দর না থাকলে সংসার হয়?”

মেঘলা উত্তর দেয় না। কেবল টের পাচ্ছে জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার জন্য তার প্রচণ্ড মায়া হচ্ছে। কেন হচ্ছে জানে না।

“যাবা আমার সাথে?” আবার বলল দিলিপ।

মনের আনাচে কানাচে হাতড়ে সমস্ত শক্তি জড়ো করে নিলো মেঘলা। চোখ উপচে অনর্গল জল গড়াচ্ছে, তার মাঝেও অদ্ভুত দৃঢ় গলায় বলল, “না।”

দিলিপ চুপ হয়ে গেল ওপাশে। মুখ নিচু করে রেখেছে বৃষ্টির মাঝে।

মেঘলার দম আটকে আসা শুরু হয়েছে। ছেলেটা চলে যাচ্ছে না কেন? কেন এভাবে মুখ নিচু করে ভিজছে? কেন তার জানালার গ্রিল চেপে ধরে আছে? নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে মেঘলা। দু হাতে মুখ চেপে শব্দ আটকাতে থাকে পাগলের মত। জানালার অন্যপাশের গ্রিলে কাত হয়ে হেলান দিয়ে কেঁপে কেঁপে কাঁদতে থাকে মেয়েটা। ভয়ংকর একটা কষ্ট মিশে গেছে রাতের আঁধারের এই দৃশ্যটায়।

জানালার ওপাশ থেকে দিলিপ আস্তে আস্তে একটা খয়েরি প্যাকেট বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেলে দেয়। অনেকগুলো একশো টাকার নোট উঁকি দিচ্ছে সেখান থেকে।

মেঘলা পর্দার অন্তরাল থেকে শুনতে পেল দিলিপ অনুচ্চ স্বরে বলছে, “মেঘলা, আমার টাকার দরকার আছিল না কুনো দিন। আমি এক পেট নিয়ে জন্মাইলে আমি না খায়ে জীবন পার করে দিতে পারতাম। কিন্তু সাথে একটা বোনও দিয়া দিছিল বিধাতা। এক পেটের খিদা সহ্য করা যায়, অন্য পেটের খিদা কেমনে সহ্য করি বলতে পারো? আমার বোনটারে যে আমি কেমনে মানুষ করছি- আমি আর ওপরের তিনি ছাড়া কেউ জানতো না। এক থালায় ভাগ করে ভাত খাইতে হইছে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। বোনটারে যখন বিয়া দিলাম- তখন থালা ভরে ভাত খাওয়ার সাহেবী অভ্যাসটা হইছিল আমার। আমার বোনটা স্বামীর বাড়ীতে কুকুরের মত বাঁইচা আছে- আমি তাও আনি নাই তারে। চুরি করে করে টাকা পাঠাইতাম। আমার এক প্লেট ভাতে কাউরে ভাগ দিতে ইচ্ছা করতো না। আমি অনেক স্বার্থপর মানুষ।” হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছলো দিলিপ, “কিন্তু সেই এক প্লেট ভাতের মায়া আমি ছাইড়া দিতে পারবো মেঘলা। যাবা না আমার সাথে? আমি যেমনে পারি, যে ভাবে পারি- তোমারে কোনদিন না খাওয়ায় রাখবো না। আমি জানি খিদার কষ্ট, ভাতের কষ্ট কি জিনিস....... মেঘলা আমি জানি, আমি হিন্দু বলে আমার সাথে আসবা না তুমি। মেঘলা- তোমার যে বিধাতা আছে, সেই একই বিধাতা আমারও। বিধাতা কখনো দুইটা হয় না। না হলে দুই বিধাতায় দুই রকম মানুষ বানাইতো। তাকায় দেখো- তোমার মতই হাত পা মুখ নাক চোখ ঠিক আমারও আছে। খিদার কষ্ট আমিও টের পারি। ব্যথা পাইলে চোখ গড়ায় পানি আমারও আসে- আমি তোমার থেকে ভিন্ন কিসে? বিধাতা কুনো দিন ভিন্ন হয় না মেঘলা। তোমার বিধাতা যেমন তোমার কষ্ট টের পায়, আমার কষ্টও সে একই ভাবে টের পাবে। মেঘলা যাবা না আমার সাথে? আমি আমার বাকি জীবনটা আধ প্লেট ভাত খায়ে কাটায় দিতে পারবো। আসবা না তুমি?”

মেঘলা পাগলের মত কাঁদতে থাকে। জানালার ওপাশের মানুষটা এত ভয়ংকর ভাবে কষ্ট দিচ্ছে কেন তাকে? কি দোষ করেছে সে?

“যাবা না মেঘলা?” কাতর গলায় অনুনয় করল দিলিপ।

কান্না চেপে সমস্ত অবশিষ্ট শক্তি সঞ্চিত করে বলল মেঘলা, “না!”

দিলিপ বৃষ্টির মাঝে মাথা ঝুঁকিয়ে ফেলে আবার। তারপর ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে ভাঙা গলায় বলে, “ঠিক আছে তাইলে। আমি চলে যাইতেছি। কিন্তু যাওয়ার আগে আমাকে একটা বার ছুঁইয়ে দিবা মেঘলা? আমার বাকি জনমটা তোমার হাতে ধরার কথা মনে রাখে পার করে দিতাম?”

মেঘলা ফোঁপাতে ফোঁপাতে দেখে দিলিপ জানালার গ্রিল দিয়ে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছে ভেতরে। ভেজা হাতটা বজ্রপাতের আলোয় চিক চিক করছে।

মেঘলার মনে হতে লাগল সে মারা যাচ্ছে। এত তোলপাড় হচ্ছে কেন ভেতরটায়? দলা পাকানো একটা তীব্র কান্না গলায় উঠে এলো ওর। হাতটা ছুঁয়ে দেয়ার জন্য ভয়ংকর ইচ্ছে করছে। কিন্তু আটকে রেখেছে নিজেকে। প্রচণ্ড কষ্টে বিছানার চাদর খামচে ধরেছে মেয়েটা। জানালার গ্রিলের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে কেঁদে যাচ্ছে আকুল হয়ে। পা দুটো অস্থির ভঙ্গিতে বিছানায় ঘষছে। এত কষ্ট হচ্ছে কেন ওর? কেন মরে যাচ্ছে না? একটু মুক্তি পেতো তাহলে?

কেন ছেলেটা হাতটা এভাবে বাড়িয়ে রেখেছে? চলে যাচ্ছে না কেন? মেঘলা পাগলের মত কাঁদতে থাকে।

“দিলিপ ভাই আপনি চলে যান। আপনি চলে যান। না হলে আমি মরে যাবো এখন....”

প্রচণ্ড বজ্রপাতের মাঝে জগৎ খান খান হয়ে যাচ্ছে। সারা পৃথিবীতে এতটা হাহাকার কবে মিশেছিল আর সহস্র বৎসরে?

দিলিপ আস্তে আস্তে হাতটা নামিয়ে নেয়। বৃষ্টির মাঝেই হাতেই উলত পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে রাতের অন্ধকারে হারিয়ে যেতে থাকে চিরদিনের মত.......

মেঘলা জানালার গ্রিল চেপে ধরে শব্দ করে কাঁদতে থাকে। এবারে বাঁধ ভেঙে গেছে কান্নার জলে। অসহ্য একটা যন্ত্রণায় ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে আসছে।

বিধাতা কি দেখতে পেছিল মেয়েটা আর একটু হলেই ছেলেটার হাতটা ছুঁয়ে দিতে পারতো? যে কিনা আধ প্লেট ভাত খেয়ে জীবন পার করে দিতে চেয়েছিল মেয়েটার জন্য।

মেঘলার ওড়নাটা সরে গেছে আজ। ঘন কালো চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়েছে। বজ্রপাতের সাদাটে আলোয় ওর হাতের শ্বেত শুভ্র দাগগুলো বড় জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। ঠিক একেকটা নক্ষত্রের মত জ্বলছে...... বিধাতার নক্ষত্রের মত। দিলিপের বিধাতা কিংবা মেঘলার বিধাতা। যার গড়া আকাশে এত মেঘ বৃষ্টি আর আলোর খেলা চলে। যে আকাশের নিচে ঘাসের জলে ছপ্‌ ছপ্‌ পা ফেলে অন্ধকারের মাঝে কেউ হারিয়ে যায়...... আটকানোর জন্য পেছনে কেউ থেকেও বিধাতার অদৃশ্য দেয়ালে আটকা পড়ে থাকে; কোনো রোরুদ্যমনা নারী...... যার ডাক কেউ শোনেনি......

 

(সমাপ্ত)

 

উৎসর্গঃ

           ফাহিম ফয়সাল মাহমুদ। ভদ্রলোক বয়সে আমার চেয়ে বেশ ছোট হবেন। তবে বিচার বুদ্ধিতে তিনি ঝুনা নারকেল। পেঁকে গাছ থেকে টুপুস করে পড়ে গেছেন পুকুরে, সেখানে ভাসছেন বর্তমানে কচুরিপানার মাঝে। অবিশ্রাম লুকোচুরি তার। ভদ্রলোকের সঙ্গে পরমাণুর মেসন কনিকার কিছুটা মিল আছে। ভর আছে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো অবস্থান নেই। সমগ্র বাংলাদেশ চষে বেড়াচ্ছেন তিনি। নাম দিয়েছেন “অনির্ণেয় অন্তরক”। যদিও নামের সঙ্গে মিল নেই। নামটা হওয়া উচিত ছিল “অনির্ণেয় অবস্থান”। কখনো সিলেট, কখনো বা ঢাকা, কিম্বা কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম- উদয় হচ্ছেন। অস্ত যাচ্ছেন।

ব্যক্তিগত চেনা জানা হিসেবে আমি তাকে এক রকম চিনিই না বললে চলে। তবে ছেলেটার “পাঁখোয়াজ” চিন্তা ভাবনা, আর বিপ্লবী কথা বার্তা আমার অসম্ভব ভাল লাগে। দেশটাকে নিয়ে তার তুমুল বিশ্লেষণ দেখে দারুণ আনন্দ পাই আমি। কিছু কিছু মানুষকেই থাকতে হয় যারা চারপাশটাকে নিয়ে সারাক্ষণ ভাবে। আমার মত গৃহকোণী জীবন এদের নয়।

তোমার অবিশ্রান্ত বিচরণ দেশটার জন্য অনেক ভাল কিছু একটা বয়ে নিয়ে আসুক এই কামনা রইল।

 

           আহনাফ সানভী। একজন অভিমানী ও আবেগী মানুষ।

ছেলেটার ধারণা আমি সব সময়ে ওর সব উচ্ছ্বাসিত কাজে বিরক্ত হই। কথাটা ঠিক না। বিরক্ত হবার ভান করি। বইমেলাতে পেছন দিক থেকে জাপ্টে ধরে আমাকে চমকে দিয়েছিল ছেলেটা। প্রায়ই একা একা বসে থাকলে মনে পড়ে যায় রিক্সায় করে নীলক্ষেত যাওয়ার মুহূর্তগুলো। লেগুনাতে বসে তার গজগজ করতে থাকা। অথবা সিনেমা হলের সামনে শিশুর মত হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকা ছয় ফুটি ছেলেটার কথা আমি কখনই ভুলিনি। আমি সব মনে রাখতে পারি। সমস্যা হল পৃথিবী আমাকে বেশিদিন মনে রাখবে না বলে আমার ধারণা। তুই অন্তত মনে রাখিস।  (আমি সাধারণত তুই করে বলতে পারি না, এটা বোধ হয় জানিস। সামনা সামনি কথা বলতে গেলে তুমিটা আপনা আপনি বেরিয়ে আসে)

আমার ক্ষুদ্র পৃথিবীতে অতি অল্প কিছু সংখ্যক মানুষ আমার অজান্তেই বাহিরের দুনিয়া থেকে ঢুকে পড়েছে। সানভী তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে দাঁড়ানো। এই ছেলেকে আমি মনে রাখব। অতি অবশ্যই কিছুটা স্নেহ, কিছুটা বন্ধুত্ব আর কিছুটা শাসনের সহিত মনে রাখবো। যে কিনা উঠতে বসতে একটা ধ্রুব সত্য বাক্য আমাকে বড়দের মত উপদেশ দেয়, “শিহাব্বাই, আপনে এত নরম ক্যান? শক্ত হইতে পারেন না?”

আমি শক্ত হতে চাই না সানভী। কারণ পৃথিবীতে কিছু বোকা মানুষের আজও খুব প্রয়োজন।

Share