একটি বিবাহ

লিখেছেন - মোঃ ফরহাদ চৌধুরী শিহাব | লেখাটি 1738 বার দেখা হয়েছে

দীপার মেজাজ এখন তিরিক্ষি হয়ে আছে। সে বর্তমানে বসে আছে তার বাসর ঘরে এবং বধু বেশে। এক হাত লম্বা ঘোমটা দেয়া মাথায়, গরমে আগে থেকেই ঘামছিল, এখন রাগের কারণে আরো বেশি ঘেমে গেছে। রাগার কারণ আর কিছুই না- হাতের চিঠিটা। লিখেছে তার হবু বর শ্রাবণ।

 

“ প্রিয় দীপা,

কলেজ থেকেই, থুক্কু স্কুল থেকেই তুমি জানো আমি তোমাকে কত বেশি ভালোবাসি এবং তার থেকেও বেশি ভয় পাই। তোমার মত মোহাম্মদ আলী টাইপের মত মেয়েকে কেমন করে আমার মত ছেলে ভালবাসল – তা আমার কাছে এখন পর্যন্ত দূর্বোধ্য একটা বিষয়!

তোমার মত বিরাট ঘরের মেয়ের আমার মত বেকার ছেলেকে বিয়ে করার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অবশেষে যখন জানতে পারলাম আসলে তোমার বাবা আমাকে ঘর জামাই বানাতে চান- তখন আমি ভয় পেয়ে গেলাম। ‘ঘর জামাই’ শব্দটার মানে হল সারা জীবন আমাকে তোমার বাবার বিশাল প্রাসাদে বন্দী হয়ে থকতে হবে! তাহলেই হয়েছে! আমি সব ত্যাগ করতে পারি তোমার জন্য, মাগার স্বাধীনতাটা ছাড়া।

ডার্লিং, আমার কথাটার অর্থ তুমি উলটা বুঝো না। আমি আসলে ছারপোকা টাইপের মানুষ তো, মেসের রূমই আমার জন্য স্বর্গ। এই স্বর্গ ত্যাগ করে তোমার বাবার রাজ বাড়িতে আমাকে যেতে বোলো না! একে বারে ককরোচের মত মরে যাবো!

তার চেয়ে এক কাজ করো, তুমি আমাকে বিয়ে কোরো না, তাহলে আমি বেঁচে যাই। তুমিও আমার মত ছারপোকার বউ হওয়া থেকে বেঁচে যাও।

                                                                                                                -ইতি

                                                                                                                শ্রাবণ”

 

চিঠিটা দীপা এক ঘন্টা আগেই পেয়েছে। তার বাড়িতে যখন বিয়ের উৎসব ধুমধামে চলছিল তখন একটা ছেলে এসে তাকে এই চিঠিটা দিয়ে গেছে। চিঠিটা দেখে তার বাবা মারাত্নক ক্ষেপেছেন। চেঁচিয়ে বলেছেন, “আমার মেয়ের জীবন নিয়ে মশকরা! মামদোবাজী!! ঐ চামচিকার গায়ে এত তেল হয়েছে!!! ঐ হারামজাদার হাড্ডি ভেঙ্গে আমি নেহারী পাঁকাবো! ঐ নেহারী দিয়ে আমি কাল দুপুরের ভাত খাবো, হুঁ!”

 

বিয়ের সব আয়োজন ভেস্তে গেল মাত্র পাঁচ মিনিটেই। কন্যা পক্ষের সবাই মেয়ের জন্য খানিক আহা উঁহু করে এবং বর নামের তেলাপোকাটাকে আচ্ছা মত গাল দিয়ে যার যার বাড়ি চলে গেল।

দীপা তার ঘরে বসেই সব জানতে পারলো। কিন্তু কিছু বললো না। কেবল শ্রাবণের ওপর রাগে গা টা কাঁপছে তার। সে কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। এক বার ভাবল বিষ খাবে, পক্ষরণেই বিষ খাবার চিন্তাটা বদলে দিল। ঘরে ইদুর মারার বিষ ছাড়া ভাল বিষ নেই। চাইলে ইদুরেরটাই খানিকটা খেয়ে দেখতে পারতো, তাতে লাভ নেই। কারণ ইদুরই ঠিক মত মরে না, আর সে তো আস্ত মানুষ! তারওপর বিষে ফ্যাট আছে কিনা জানে না। সে আবার স্বাস্থের ব্যপারে খুব সচেতন। দিনে এক বেলা খায়। রাতে খায় না। ইদুরের বিষের বোতলের গায়ের কাগজটা ছুটে গেছে। ফ্যাট আছে কিনা দেখার জন্য কাগজটা খুঁজে দেখল- পেলো না।

এখন সে কি করবে তাই ভাবছে। শ্রাবণ গাধাটাকে সে স্কুল থেকে ভালবাসে। অথচ এখন গাধাটা বলছে নাকি তাকে বিয়ে করতে পারবে না! পেয়েছে কি!

 

বিছানা থেকে নামল দীপা। ড্রেসিং টেবিল থেকে এক গাদা ঘুমের টেবলেট নিলো। মুখে দিতে গিয়েও থেমে গেল- ওষুধে কাজ না করে যদি? না মরে যদি ঘুমিয়ে থাকে কেবল,তাহলে তো চোখ মুখ বেশি ফুলে যাবে। বেশি ঘুমালে মানুষ নাকি মোটা হয়!  আর সে এভাবেই বা মরবে কেন? দোষ করেছে আরেকজন, তার জন্য সে মরবে কেন? মরা তো উচিত ঐ গাধাটার!

তাই ট্যাবলেট গুলো ফেলে দিল। মোবাইল বের করে শ্রাবণকে কল করল। অনেক্ষণ ধরল না ফোন শ্রাবণ। তারপর ধরল এক সময়, “হ্যালো?” ঘুম জড়ানো কন্ঠ শ্রাবণের।

“আমি দীপা।” ঠান্ডা গলায় বলল দীপা।

“ও...... ভাল আছো?” কথা খুঁজে পেল না শ্রাবণ।

“খুউব! তোমার মত ইডিয়েটকে বিয়ে করার হাত থেকে বেঁচে গেলাম।”

 

“কংগ্রাচুলেশন!”

“ফাজলেমি রাখো!” ধমক দিল দীপা, “আছো কোথায়?”

“মেসের রূমে।”

“ঘুমাচ্ছিলে?”

“হ্যা।”

“আমাকে বাসর ঘরে বসিয়ে রেখে তুমি মেসে আছো? লজ্জা করল না? বিয়েতে এলে না কেন?”

“এমন ভাবে বললে যেন বিয়েতে আমার দাওয়াত ছিল, খেতে গেলাম না কেন জানতে চাইছো!” মিনমিন করে বলল শ্রাবণ।

“যেটা জিজ্ঞেস করেছি সেটার উত্তর দাও!”

“তোমাকে বিয়ে করলে এক্কেবারে ফেঁসে যেতাম তো, তাই।”

“তাহলে কি জীবনেও বিয়ে করবে না?” দীপা ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করল।

“মনে হয় না। ভাবছি তোমার শোকেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবো।”

“আমার শোকে মানে! আমি কি করলাম আবার?” দীপা অবাক হয়ে বলল।

“মানে, তুমি তো কিছুই করনি।কিন্তু একদিন নিশ্চয়ই কাউকে বিয়ে করবে। সংসার হবে। ছেলে পুলে হবে- ওদের নিয়ে থাকবে। সেখানে আমি নেই। তাই ‘তোমার শোক’এর কথাটা বললাম।

“তোমার কথার আগা মাথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“আমিও তোমাকে বোঝাতে পারছি না।” শান্ত ভাবে শ্রাবণ বলল।

দীপা খানিক দম নিয়ে বলল, “আমি এই মুহূর্তে তোমার মেসে আসছি।”

“কেন?”

“আত্নহত্যা করবো বলে। তোমার তিন তলা মেসের ছাদ থেকে লাফ দিবো। সেখানে মরে পরে থাকবো। চিঠি লিখে যাবো- ‘আমার মৃত্যুর জন্য দ্বায়ি শ্রাবণ মানের একটা গাধা’।”

 

“সত্যিই আসছো নাকি?” বেশ খুশি খুশি গলায় বলল শ্রাবণ।

“হ্যা।” বরফ শীতল গলায় বলল দীপা, “একেবারে লাল বেনারসী পরে আসবো, মরার জন্য।”

বলেই লাইন কেটে দিল দীপা। রাগে গা জ্বলছে ওর। এভাবে আত্নহত্যা করবে বলায় পরেও শ্রাবণের নির্বিকত্ত্ব ওকে আরো রাগিয়ে দিয়েছে। বাড়ির কাউকে না জানিয়ে সে রাত সাড়ে এগারোটায় ট্যাক্সি ক্যাবে করে শ্রাবণের তিন তলা মেসের সামনে এসে নামল। সারা মেসের একটা ঘরেও বাতি জ্বলছে না, সবাই গভীর ঘুমে।

 

দীপা শ্রাবণকে কোথাও দেখতে পেল না। ভেতরে ভেতরে ওর মন বলছিল হয়তো শ্রাবণ ওকে থামাতে আসবে।

বলবে ‘প্লিজ দীপা তুমি মরতে যেও না। আমি তোমাকে বিয়ে করব!’

কিন্তু ইহ তল্লাটেও শ্রাবণের চেহারা দেখা গেল না। তাতে তার রাগ আরো বেরে গেল। মেসের সিঁড়ি বেয়ে দুপদাপ পা ফেলে ছাদে উঠে এল। সারা ছাদ ফাঁকা। ওপরে তারা জ্বলা আকাশ। চারপাশে সুনসান নীরবতা। মৃদু মন্দ হাওয়া বইছে। অদ্ভূত সুন্দর একটা মুহূর্ত- কিন্তু দীপার এসব দেখার সময় নেই। সে ছাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়াল। এক নজর চারপাশ দেখে শ্রাবণের উপর গভীর অভিমান নিয়ে লাফ দিল।

 

 

 

             ০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০

 

 

 

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। ১০৩ নং কেবিন। দীপা ভেতরে, বেডে। তবে শুয়ে নয়, বসে আছে। বেডে যে শুয়ে আছে ওর না শ্রাবণ। বেচারার সারা শরীর ব্যান্ডেজের পোটলা হয়ে গেছে। উঁ উঁ করে কোঁকাচ্ছে খানিক পর পরই।

দীপা বিরক্ত হয়ে বলল, “এখন এত চেঁচাচ্ছো কেনো?”

বান্ডিলের ভেতর থেকে চিঁ চিঁ করে শ্রাবণ বলল, “বাবারে! এক্কে বারে চ্যাপ্টা হইয়্যা গেছিরে! মাইয়্যার বডি এত স্লিম, এর পরও আলগাইবার পারলাম না!!”

ঝাঁঝিয়ে উঠল দীপা, “তোমাকে বলেছে কে আলগাতে?”

পাশেই ওদের বন্ধু বদি বসে ছিল। সে বিরক্ত কন্ঠে বলল, “তখনি শালারে নিষেধ করছিলাম বিয়া নিয়া তামাশা না করতে! শালার বলদা কোনহানকার!”

শ্রাবণ কোঁ কোঁ করতে করতে বলল, “আমি কি করলাম?”

“আমি যদি বিষ খেয়ে মরতাম মেসে না এসে? তখন?” ধমকে উঠল দীপা।

“ওইটা যে তুমি করবা না ভাল করেই জানি। যে মেয়ে ফ্যাটের ভয়ে আইসক্রিম পর্যন্ত খায় না- সে খাবে বিষ! তহলেই হয়েছে!” কোঁকাতে কোঁকাতে বলল।

দীপা আর বদি দুজনেই চোখ পাকালো ওর দিকে তাকিয়ে।

“আমার দোষ কই?” মিনমিন করে বলল শ্রাবণ, “ আমি তো মেসের রুমে ঠিক মত বাসর সাজিয়েই রেখেছিলাম। খালি.....”

“হ-হ, সব তো রেডিই করছিলি, খালি হাসপাতালে আওনের ব্যাপারডা বাদে।”

 

তিক্ত কন্ঠে নিজেকেই বলল বদি, “হালারে ভূতে পাইছে! কয় মেসে বাসর করবো! তাই দীপারে ভুল চিডি পাঠাইল। তারপর নিজে বাসর সাজাইল মেসের রূমে। দীপা গেল ছাদে লাফ দিবার। শ্রাবইণ্যা হালায় নিজেরে বাংলা সিনামার নায়ক পাইছে! যেন চাইলেই নায়িকারে ক্যাচ ধরবার পারবো! গাধা কোনহানকার! এক্কেবারে বাংলাদেশি ক্রিকেটার! ধরবার তো পারলোই না, উল্ডা ঘাড় মটকাইয়া, হাত পা ভাইংগা এইহানে!”

দীপা চোখ পাকিয়ে শ্রাবণের দিকে তাকাল। শ্রাবণ পাংশু মুখে বলল, “এ জন্যই তোমাকে বিয়ে করতে চাই না আমি....... তুমি আর আজরাইল একই জিনিস!”

“আর এখন আমাকে বিয়ে না করলে তোমাকে আমি এই বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে ফেলে দেবো, বুঝেছো!” হুংকার দিলো দীপা, “ রাজী কি না?”

সাথে সাথে ভদ্র ছেলের মত শ্রাবণ বলল, “ না কৈ বললাম? এই বদি, আমি কি না বলেছি? মোটেও না!”

 

 

 

 

 

 

(এটা আমার কলেজ লাইফে লেখা গল্প। ২০০৬ এর দিকে লিখেছিলাম। কলম তখন সবে মাত্র ছুটছে.....)

 

Share