ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া রিটার্নস

লিখেছেন - মোঃ ফরহাদ চৌধুরী শিহাব | লেখাটি 897 বার দেখা হয়েছে

হাসপাতালের সাদা দোলনাটার কিনার ধরে কোনো মতে হাচড়ে পাচড়ে ধরে ঝুলে রইল বাবাই, মাথায় নীল হেলমেট পড়ায় নাক পর্যন্ত ঢেকে গেছে, তার মাঝ দিয়েই গলাটা কেবল বকের মত বাড়িয়ে উঁকি দিল বহু কষ্টে। কৌতূহলী চোখে ভেতরটা দেখলো। সাদা টাওয়েলে পেঁচিয়ে পুটলি বানিয়ে রাখা হয়েছে দোলনার মাঝে কিছু একটা।

বাবাই হতাশ গলায় বলে উঠল, “এইটা কি খালামণি?”

মিথিলা বাবাইকে পেছন থেকে ধরে রেখেছে, না হলে পড়ে যাবে। হাসি চেপে বলল, “ছিঃ বাবাই! ‘কি’ না, বলো ‘এইটা কে?’”

ঘাড় ঘুরিয়ে খালামণির দিকে তাকালো, “এইটা কে?”

“এইটা তোমার ছোট বোন।”

“এইটা মানুষ?” অবাক হয়ে তাকায় বাবাই।

“হ্যাঁ! কেন?”

“এত ছোট কেন?”

“আস্তে আস্তে বড় হবে।” মুখ টিপে হাসল মিথিলা।

“অ।” গলা বাড়িয়ে আবার তাকায় বাবাই। অনেক ছোট ছোট নাক মুখ দেখা যাচ্ছে পুটলির ভেতর থেকে। বাবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে- এটা নাকি তার ছোট বোন! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবাই। ক্যাপ্টেন বাবাকোয়ার বোন এত ছোট একটা মানুষ হবে- ভেবে নাই সে।

এ.সি. ছাড়া রয়েছে কেবিনটায়। নোভেরা গভীর ঘুমে। দোলনাটা পাশেই। বাবাইয়ের নতুন বোনটাও ঘুমাচ্ছে। বাবাই চিন্তিত মুখে পেছনে হাত নিয়ে পায়চারি করছে মিথিলার সামনে। এত ছোট আকৃতির বোনকে নিজের মিলিটারি বাহিনীতে কীভাবে নেয়া যায়- তা নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে বাবাই। লেফটেনেন্ট মুরগীর সাথে বৈঠকে বসা দরকার জরুরী ভিত্তিতে। তার বদ্ধমূল ধারণা ছিল বোনটা তার থেকেও বড় হবে। এত ছোট হবে আগে বুঝেনি!

পায়চারি করতে করতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে বিছানায় উঠে নোভেরার পাশে ঠেলা ঠেলি করে ছোট বেডটায় কুন্ডলি পাকিয়ে শুয়ে পড়ল। মিথিলা উঠে গিয়ে বাবাইয়ের হেলম্যাটটা খুলে আধ ঘুমন্ত শরীরটা ঠিক করে শুইয়ে দিল নোভেরার পাশে। এ.সি’র শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই রূমে। লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলো। নিঃশব্দে ভেজিয়ে দিল দরজাটা। ঘুমাক ও। অনেক ছোটাছুটি গেছে আজকে বাবাইয়ের ওপর দিয়ে।

 

পরের এক মাস ক্যাপ্টেন বাবাকোয়ার ওপর দিয়ে মোটামুটি ঝড় বয়ে গেল। তার নতুন বোন হওয়ায় নোভেরা বাবাইয়ের প্রতি তেমন খেয়াল রাখতে পারেনি এই এক মাস। মিথিলাকেই সামলাতে হল সব। কিন্তু বাবাকোয়াকে সামলাতে গিয়ে মিথিলা এই প্রথম টের পেল বাচ্চা কাচ্চা সামলানোর কাজটা কি ভয়াবহ রকমের কঠিন। কালোঘাম ছুটে যাওয়া জিনিসটা যে কি সেটা হারে হারে টের পেল।

গত এক মাসে ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া যে সব অ্যাডভেঞ্চার (দূর্ঘটনা ঘটিয়েছে) করেছে- সেগুলো বাবাই সযত্নে তার “ক্যাপ্টেন বাবাকোয়ার গোপন মিশন সমূহ” নামক ডায়েরিতে লিখে রেখেছে। রাতে বাবাই যখন দাবার বোর্ডের ওপর ঘুমিয়ে কাঁদা হয়ে থাকে ডাইনিং টেবিলের নিচে, মিথিলা গিয়ে ওকে নিয়ে আসে প্রতিদিন। বিছানায় নিয়ে ঠিক করে শুইয়ে দেয়। তারপর ক্যাপ্টেন বাবাকোয়ার ডায়েরী বের করে পাতা ওল্টাতে থাকে। প্রতিদিনই মিথিলাকে এড়িয়ে ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া নানা রকম অ্যাডভেঞ্চার করে যাচ্ছেন। মিথিলা ভেবে পায় না বাবাই কখন এত সব কান্ড কারখানা করে বেড়ায়? নোভেরা রান্নাঘরে যেতে পারছে না বলে মিথিলাকে আপাতত রান্না বান্নার কাজটা করতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে জাহিদও এসে সাহায্য করে। শুধু মাত্র এই সময়টাতে বাবাইকে চোখে চোখে রাখতে পারে না মিথিলা। তার মাঝেই এত সব ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া। প্রতি রাতে মিথিলা “গোপন মিশন সমূহ” পড়ে আর হতাশ ভাবে মাথা নাড়তে থাকে। গত এক মাসের উল্লেখ যোগ্য মিশন সমূহ হলঃ

 

মিশন নং ৪৮-

                     আজকে ক্যাপ্টেন বাবকোয়া বাথরুমের মেঝেতে পানি জমিয়ে নৌকা ভাসানোর চেষ্টা করেছিল। পানি যাওয়ার সিংকের মুখটা বালতি চেপে ধরে পানি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কাগজের নৌকাও বানিয়ে ভাসিয়েছিলাম। কিন্তু লেফটেনেন্ট মুরগীকে নিয়ে সমস্যা হয়েছে। ভেবেছিলাম অনেকদিন পর লেফটেনেন্ট মুরগীকে গোসল করাবো সাবান আর শ্যাম্পু দিয়ে। কিন্তু সাবান নিয়ে যখনই ধরতে গেলাম লেফটেনেন্ট মুরগীকে- সে এমন দৌড় দিয়েছে পানির ওপর দিয়ে যে হাত ফসকে সাবানটা কমোডের মধ্যে পড়ে গেছে। নতুন সাবানটা আম্মা আজকেই দিয়েছিল। ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল তখন। আম্মা বাথরুমে ঢুকে সাবান না পেলে ধোলাই দিবে।

লেফটেনেন্ট মুরগীর র‍্যাংক ডাউন করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে খুব তাড়াতাড়ি। সেকেন্ড লেফটেনেন্ট বানায় দেওয়া দরকার। কথা শুনে না! ওর জন্য নতুন সাবানটা কমোডে পড়ে গেছে। অবশ্য কেউ দেখে নাই। আমি শলার কাঠি দিয়ে গুতিয়ে সাবানটা তুলে এনে শ্যাম্পু দিয়ে ভাল করে ধুয়ে আগের জায়গায় রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু আম্মা কীভাবে জানি টের পেয়ে গেছে সাবানে এতগুলা কাঠির গুতাগুতির চিহ্ন দেখে। সাবানটা ফেলে দিয়ে কোনো কথা বার্তা ছাড়াই আমার কান ধরে দুপুর বেলা ধোলাই দিয়েছে, লেফটেনেন্ট মুরগী আর বাবলির সামনেই। ক্যাপ্টেন বাবাকোয়ার মন খারাপ। খুব খারাপ।

 

মিশন নং ৪৯-

                     আজ দুপুরে আম্মা যখন ঘুমাচ্ছিল, ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া টুল এনে বাবলির দোলনার পাশে উঠে মিলিটারীতে জয়েন করার জন্য বিশেষ নীতিমালা পড়ে শোনাচ্ছিল বাবলিকে। লেফটেনেন্ট মুরগীও উপস্থিত ছিল সেখানে। কিন্তু বাবলি কিছুই শুনে নাই। সে পেট ফুলিয়ে হা করে ঘুমিয়েছে আমার গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের মাঝখানে। বাবাকোয়া শিশুদের প্রতি যত্নবান। ঐ সময় একটা মাছি এসে বাবলির মুখের ওপর ওড়া উড়ি করছিল। ঘরের কোনে রাখা এরোসলের ক্যান এনে টুলে উঠে বাবলির মুখের ওপর উড়তে থাকা মাছিটাকে স্প্রে করতে গিয়েছিল ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া। কিন্তু স্প্রে করার আগেই আম্মা কেমন করে জানি জেগে উঠে ঠিক তখনই। আম্মা বাবাকোয়ার শিশু কেয়ার কর্মসূচির কোনো কথাই কানে তোলে নাই। কান ধরে টুল থেকে নামিয়ে ধোলাই দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। বাবাকোয়া তার শিশু কেয়ার কর্মসূচির নীতিমালা বাতিল করে দিয়েছে। মিলিটারীতে শিশু কেয়ার থাকা ঠিক না। আম্মা মাইর দেয়।...........

 

ক্যাপ্টেন বাবাকোয়ার গোপন মিশন সমূহ পড়তে পড়তে চাপা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মিথিলা। পাশে গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকা বাবাইয়ের দিকে তাকায়। উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে বাবাই। ঘুমিয়ে থাকার ভঙ্গিটা বিচিত্র। বালিশটায় মুখ রেখে পেছন দিকটা ছাদের দিকে উঠে গেছে! মিথিলা হাসি চেপে বাবাইয়ের পেছন দিক চেপে বিছানায় নামিয়ে দেয়। কিন্তু আবার উঠে যায় ছাদের দিকে! হা হয়ে ঘুমাচ্ছে। জাহিদ প্রায়ই রাতে উঁকি মেরে যায় ছেলের ঘরে। মিথিলা বই পড়ে তখন। সেদিনও রাতের বেলা ঘুমাতে যাওয়ার আগে জাহিদ বাবাইয়ের ঘরে উঁকি মারতে এসেছিল।

বাবাইয়ের দিকে এক নজর তাকিয়ে মিথিলাকে অবাক গলায় বলল জাহিদ, “ছোট বেগাম, ক্যাপ্টেন সাহেবের পাছা কি জগৎ ছাড়িয়ে উর্ধ্ব গগণ পানে উঠে যাচ্ছে নাকি? বালিশ চাপা দেও!”

মিথিলা ফিক করে হেসে দেয়। জাহিদ তখন এসে গম্ভীর মুখে ক্যাপ্টেন বাবাকোয়ার নীল হেলমেটটা বাবাইয়ের পশ্চাতদেশে পরিয়ে দেয়, “নে বাবা, ঘুমা এখন!”

মিথিলা হাসি থামাতে পারে না, “একটা ছবি তুলে রাখা দরকার দুলাভাই!”

“যা, দৌড়ে গিয়ে ওয়ার ড্রোবের ওপরের তাক থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে আয়। সঙ্গে লেফটেনেন্ট সাহেবকেও আনিস। এই হেলমেটের ওপর ওটাকে বসিয়ে ছবি তুলবো।” জাহিদ বলল।

মিথিলা বই রেখে দৌড়ে নোভেরাদের রূমে গিয়ে ক্যামেরা নিয়ে আসে। লেফটেনেন্ট সাহেব ঘুমিয়ে ছিলেন। ঘুম ঘুম মুখে তুলে আনা হল তাকে। নোভেরাও কৌতুহলী মুখে পেছন পেছন বাবালিকে কোলে নিয়ে এই ঘরে চলে আসে। কি করছে দেখার জন্য। অবাক হয়ে দেখে ক্যাপ্টেন বাবাকোয়ার উর্ধ্বগামী পাছায় হেলমেট লাগিয়ে তার ওপর গম্ভীর মুখে এভারেস্ট জয়ী এডমন্ড হিলারীর মত দাঁড়িয়ে আছেন লেফটেনেন্ট মুরগী। ঐ অবস্থায় জাহিদ ছবি তুলছে বাবাইয়ের। বাবাই গভীর ঘুমে তখনো।

নোভেরা তখন বলে উঠল, “দাঁড়াও, বাবলিকে ওর পিঠে বসিয়ে দেই।” গিয়ে বাবলিকে বাবাইয়ের পিঠে বসিয়ে দেয়। এখনো বসতে পারে না বাবলি। চিত হয়ে বাবাইয়ের পিঠে শুয়ে থাকে। আনন্দিত মুখে নানা রকম শব্দ করতে থাকে বাবলি। হাতের বুড়ো আঙ্গুলটা মুখে নিয়ে খাওয়ার ব্যাপারটা অল্প কিছুদিন হল আবিষ্কার করেছে সে। আজও বুড়ো আঙ্গুলটা মুখে পুরে আনন্দিত মুখে তাকাতে লাগল সবার দিকে।

এর মাঝেই ছবি তোলা চলল জাহিদের। এবং এক পর্যায়ে বাবাইয়ের ঘুম ভেঙে গেল। কারণ বাবলি তার পিঠে হিসু করে দিয়েছে। ঘটনাটা কি ঘটেছে বোঝার সঙ্গে সঙ্গে মুখ কালো হয়ে গেল বাবাকোয়ার। উঠে বসার সাথে সাথে লেফটেনেন্ট মুরগী লাফ মারল কক্‌ কক্‌ করে। বাবলিকে একপাশে সাবধানে নামিয়ে রেখে উঠে বসে ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া। কঠিন মুখে সবার দিকে তাকিয়ে থাকে। শিশু কেয়ার কর্মসূচি বাতিল করে দিলেও বাবাই একটু উদার মনের মানুষ। ওর গেঞ্জি ভিজিয়ে দিলেও কিছু বলল না বাবলিকে। ক্যাপ্টেন বাবাকোয়ার রাগা উচিত না।

 

জাহিদ পরদিন বাবাইয়ের সেই ছবি বিশাল করে বাঁধিয়ে আনল ফ্রেমে; ড্রইং রূমের দেয়ালে টানিয়ে দিল। এবং ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া গভীর বিষাদে ডুবে গেলেন। তার পাছায় হেলমেট লাগিয়ে লেফটেনেন্ট মুরগী উঠে বসে আছে গম্ভীর মুখে- এজন্য মন খারাপ করেনি। লেফটেনেন্ট মুরগীর গলার র‍্যাংকটা পরাতে ভুলে গেছে সবাই। লাল নীল ফিতার বানানো র‍্যাংকটা পরায়নি কেউ লেফটেনেন্ট সাহেবকে। র‍্যাংক ছাড়া সিভিলিয়ান মুরগী লাগছে তাকে। এটা কোনো কথা হল?

 

এর কিছুদিনের মাঝেই একবার বাবাইকে স্কুলে ভর্তি করানো নিয়ে অনেক দৌড়া দৌড়ি হল। এত অল্প বয়সে ডায়েরী লিখে ফেলা বাবাইকে নিয়ে সবাই ভেবেছিল অনায়াসে স্কুলে ভর্তি করানো যাবে। হয়েছে উল্টোটা। পরীক্ষার খাতায় সে কিছুই লেখেনি। এমনকি ভাইবাতে যখন নিয়ে যাওয়া হল বাবাইকে, সে মুখ গোজ করে বসেছিল। তার সামনে মোটাসোটা ভালুক টাইপের এক মহিলা চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “বলতো বাবা, তোমার নাম কি?”

“ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া।”

“ভাল নাম?” একটু বিরক্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন।

“ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া বাবাই।” কঠিন মুখে তাকাল বাবাই।

একটা নিঃশ্বাস ফেলে মোটাসোটা ম্যাডাম প্রসঙ্গ বদলালেন, “বাবাই একটা ইংরেজী ছড়া বলো তো?”

“বলবো না।” মুখ গোজ করে রইল বাবাই।

চশমার ওপর দিয়ে সরু চোখে তাকালেন, “বাংলা কবিতা বলো তাহলে?”

“বলবো না।” আবারও একই জবাব দিলো।

“তাহলে একটা গান গাও?”

“গাবো না!”

মোটাসোটা ম্যাডাম হতাশ স্বরে বললেন, “নেক্সট?”

বাবাই বিজয়ী বেশে মিথিলার কাছে ফিরে আসে। মিথিলা উদ্বিগ্ন মুখে বসেছিল বাহিরে। বাবাই আসতেই জিজ্ঞেস করল, “সব বলতে পেরেছো?”

“বলি নাই।” গম্ভীর মুখে বলে বাবাই।

“কেন!” আকাশ থেকে পড়ল মিথিলা।

“ম্যাডামটাকে পছন্দ হয় নাই। আম্মুর কাছে বলবো।”

“কিন্তু এখানে না বললে তো স্কুলে ভর্তি করবে না।” মিথিলা বোঝানোর চেষ্টা করল।

“আম্মুর স্কুলই ভাল।” বাবাই উদাস উদাস মুখে বলে।

মিথিলা হাল ছেড়ে দিয়েছে। এই ছেলেকে ভর্তি করানো আপু ছাড়া সম্ভব না। নোভেরা এক ধমক দিলেই গড় গড়িয়ে সব কবিতা, ছড়া বলা শুরু করে বাবাই।

 

ছয় মাসের মাথায় মিথিলার ফাইনাল পরীক্ষা পড়ে গেল। পড়াশোনার অনেক চাপ। প্রচুর ক্লাস মিস গেছে বাসায় থাকতে গিয়ে। হলে চলে যেতে হলো। না হলে বাসায় বসে সব শেষ করতে পারবে না। নোভেরাকেও হাসপাতালে আবার জয়েন করতে হয়েছে। জাহিদ তো আগে থেকেই ব্যস্ত। রাতে ছাড়া সহজে পাওয়া যায় না ওকে। বিদেশের কোন কোম্পানির কাজ নিয়ে কদিন হল ঠিক মত বাসায় ফিরতে পারছে না। রাত হয়ে গেলে অফিসেই থেকে যাচ্ছে।

বাসায় বাবাই আর বাবলিকে দেখে রাখার জন্য লোক নেই। বেশ ঝামেলাতেই পড়ে গেল নোভেরা। জাহিদের সাথে এ নিয়ে কথা হয়েছে কয়েকবার। জাহিদের তেমন কোনো আত্মীয় স্বজন নেই এখানে যে এখানে এসে দেখে শুনে রাখবে। সবারই নিজের ফ্যামেলি আছে। নোভেরার দিক থেকেও প্রায় একই অবস্থা। শেষ মাথায় এসে ঠিক করা হল যে নোভেরার হাসপাতালের কোনো নার্স এসে অফ টাইমে বাবাইদের দেখে রাখবে। নোভেরা অফিসের ডিউটি শেষ করে আসা পর্যন্ত নার্স বাসায় থাকবে। প্রয়োজনে এ বাসাতেই না হয় থাকবে। এক্সট্রা রূম তো আছেই। নোভেরা ফিরে এলে তার ছুটি। মাস হিসেবেই টাকা দেয়া হবে এর জন্য।

জাহিদ মেনে নিল। অবশ্য এছাড়া আর কোনো ভাল বুদ্ধিও পাওয়া যাচ্ছিল না।

ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া বেশ কদিন ধরেই দেখছিল বাবা-মা দুজনেই বেশ চিন্তায় পড়ে গেছেন তাঁদের দুই ভাই বোনকে নিয়ে। কিন্তু চিন্তার কি আছে বুঝতে পারছিল না। লেফটেনেন্ট মুরগীর সাথে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

“আচ্ছা লেফটেনেন্ট মুরগূ, আব্বা আম্মা এত চিন্তা করছে কেন?”

“কক্‌ কক্‌।” গম্ভীর গলায় বললেন লেফটেনেন্ট মুরগী।

“হুম। কিন্তু আমাদের নিয়ে চিন্তার কি আছে?”

“কক্‌ কক্‌ কউক্‌......”

ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া বিভ্রান্ত মুখে তাকায় ফেলটেনেন্ট সাহেবের দিকে। কক্‌ কক্‌ কউকের মানেটা স্পষ্ট না তার কাছে। কি বোঝাতে চাইছেন উনি?

 

যা হোক। লেফটেনেন্ট মুরগীর কথার মর্ম উদ্ধার করার আগেই ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া আবিষ্কার করল তাদের বাসায় বেডিং পত্র নিয়ে হাজির হয়েছে বিশাল দেহী এক মহিলা। মোটামুটি পর্বতের মত দৈর্ঘ্য প্রস্থে। বাবাকোয়া প্রথম দর্শনেই অপছন্দ করল মহিলাকে। সারাক্ষণ পান খাচ্ছে। মুখের পান বেয়ে পানের কষ গড়াচ্ছে আর মুছছে। নাকের নিচে পুরুষ মানুষের মত সরু মোচ। আশে পাশে কেউ না থাকলে খুব যত্ন করে নাকের লোম টেনে টেনে ছিঁড়েন মহিলা। বাবাইকে কঠোর গলায় নোভেরা বলে দিয়েছে প্রথম দিনই, “বাবাই, ইনি তোর খালা হন। খালাকে একদম জ্বালাবি না। চুপচাপ থাকবি। বাবলিকেও দেখে রাখবি। মারামারি করবি না।”

বাবাই থমথমে মুখে তাকায়। মিথিলাও তার খালা। সে কত ভাল! এই মহিলাকে খালা ডাকতে হবে?

মহিলা কেবল লাল দাঁত বের করে হেসে হেসে বলেছে নোভেরাকে, “আপা, একদুম চিন্তা কইরেন না। আমি খুব কেয়ার করি রাখমু ওদের।”

ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে নোভেরা বলল, “খালেদা, একটু দেখে রেখো। সারাক্ষণ উদ্ভুট্টু সব কান্ড কারখানা করে বেড়ায় এই ছেলে।”

“ভাইবেন না আপা। বাচ্চা কাচ্চা তো আমরাও পালছি।” হে হে করে হাসতে থাকে পেট দুলিয়ে।

নোভেরা বেরিয়ে গেলেই খালেদা বেগম নামের মোটাসোটা মহিলাটা সবার প্রথমে ফ্রিজ খুলে আইসক্রিম বের করে খেতে থাকে রাক্ষসের মত। সোফায় পা তুলে লম্বা হয়ে শুয়ে টি.ভি.তে হিন্দী সিনেমা দেখতে থাকে। বাবাইদের প্রতি কোন ভ্রুঁক্ষেপ নাই। বাবলিকে যে ঘন্টায় ঘন্টায় ফিডার বানিয়ে দিতে হয় সেটাও ঠিক মত করে না। একবার তো ভীষণ গরম দুধ ফিডারে ভরে বাবলিকে খেতে দিয়ে টিভি দেখতে চলে গিয়েছিল মহিলা। ভাগ্যিস বাবাই নিজে সেটা খেতে গিয়ে ভিজ পুড়িয়ে হুলস্থূল কান্ডটা করল!

তখন থেকেই বাবাই দুই চোখে দেখতে পারে না মহিলাকে। বাবা মা বেরিয়ে গেলেই মহিলা রাথরুমে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নাকের লোম খুব যত্ন করে টেনে ছিঁড়তে থাকেন। আর প্রায়ই মোবাইল ফোন বের করে কার সাথে জানি নিচু গলায় কথা বলতে থাকে। বাসায় বাবা মা না থাকলে মাঝে মাঝেই কালো করে রোগা পটকা, বেড়ালের মত গোঁফ ওয়ালা একটা লোক আসে ওদের বাসায়। তখন খালেদা ওর হাসপাতাল থেকে আসার সময় নিয়ে আসা বাজারের চটের ব্যাগ থেকে অনেক ধরণের ওষুধের পাতা, বোতল বের করে লোকটাকে দেয়।

বাবাইয়ের কেমন যেন সন্দেহ লাগে। এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে ওষুধ দেয় কেন? ওষুধ কি লুকিয়ে দেয়ার জিনিস? আম্মা তো নাক টিপে জোর করে খাইয়ে দেয়। সারা বিল্ডিং-এ তখন খবর হয়ে যায় যে বাবাই ওষুধ খাচ্ছে। রোগা পটকা লোকটা এত ওষুধ নেয়- তাও মোটা হয় না কেন?- বাবাই অবাক হয়ে ভাবে।

 

এভাবেই চলছিল বেশ কিছুদিন।

নোভেরাকে একদিন রাতে জাহিদকে চিন্তিত গলায় বলতে শুনল বাবাই, “হাসপাতালের স্টোর থেকে ওষুধ চুরি যাচ্ছে। ঝামেলায় পড়ে গেছি আমি। এম.এই. রূমের দায়িত্বে আছি। মাঝখান থেকে ওষুধ গায়েব হয়ে যাচ্ছে- জবাব তো আমাকে দিতে হবে।”

“চুরি করছে কে? স্টাফরা নাকি?”

“বুঝতে পারছি না। আমি না থাকলেই চুরি হয়।” নোভেরা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “টেনশনে আছি খুব। এভাবে চুরি হতে থাকলে শেষে বড় ঝামেলায় পড়ে যাবো। আই.সি.ইউ’র দায়িত্বে ছিলাম ভালই ছিল। শুধু রাতে ডিউটি দিতে হবে বলে ডে শিফটের জন্য এখানে নিলাম। এখানে দেখি আরো বড় ঝামেলা!”

 

ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া টেবিলের ওপর হেলমেট পরে গম্ভীর মুখে পায়চারি করছে হাত পেছনে নিয়ে। টেবিলের সামনে মেঝেতে চুপচাপ বসে আছে লেফটেনেন্ট মুরগী। তার পাশেই বসে থাবা দিয়ে একটা তেলাপোকাকে মারার চেষ্টা করে যাচ্ছে বাবলি। হামাগুড়ি দিতে পারে মোটামুটি, তবে দাঁড়াতে পারে না। বসে থাকে এক জায়গায়। হামাগুড়ি দিতে গেলে বেশির ভাগ সময় অল্পতেই আটকে যায়। হাত পা এখনো শক্ত হয়নি। এক জায়গায় বসিয়ে দিলে কেবল থাবা মারে মেঝেতে। এখন যেমন মহানন্দে থাবা মেরে যাচ্ছে তেলাপোকাটাকে। কিন্তু লাগাতে পারছে না। সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে এদিক ওদিক চলে যাচ্ছে তেলাপোকাটা। ইদানীং এই বাসায় তেলাপোকা বেশি হয়েছে। ছোট বাচ্চা কাচ্চা আছে বলে নোভেরা ওষুধ দিতে পারছে না।

লেফটেনেন্ট সাহেব মাঝে মধ্যে ঘাড় ঘুড়িয়ে ঢুলু ঢুলু চোখে বাবলির ছেলে মানুষি খেলা দেখছে, আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবাকোয়ার দিকে তাকাচ্ছে।

ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া গম্ভীর গলায় বলে উঠল হঠাৎ, “কমরেডস, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি শত্রু শিবির আক্রমণ করবো। ঐ মোটা মানুষটাকে বাসায় থাকতে দেয়া চলবে না। আম্মার অবর্তমানে সে চুরি করে আইসক্রিম খায়। বাবলির ফিডার দেয় না ঠিক মত। এই অন্যায় মেনে নেয়া যায় না, বলো যায়?”

লেফটেনেন্ট সাহেব আড় চোখে তেলাপোকাটার দিকে বারবার তাকাচ্ছে। বাবলি সেটাকে থাবা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাবাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব দিল না কেউ। মৌনতা সম্মতির লক্ষণ ভেবে বাবাই বলে যেতে থাকল, “এই বাসায় যখন তখন এক শুঁটকা লোক এসে বস্তা বস্তা ওষুধ নিয়ে যায়- এটা ঠিক না। হামলা করতে হবে। কে কে সাথে আছে হাত তুলো?”

দেখা গেল ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া একাই হাত তুলেছে। বাবলি থাবা দিয়ে অবশেষে তেলাপোকাটাকে চ্যাপ্টা বানাতে পেরেছে। এবং লেফটেনেন্ট সাহেব সেই চ্যাপ্টা তেলাপোকাটা খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। বাবাইয়ের দিকে কারো ভ্রুঁক্ষেপ নাই।

বাবাকোয়া হতাশ হয়ে হাত নামিয়ে ফেলল। লেফটেনেন্ট মুরগীর র‍্যাংক ডাউন করা জরুরী হয়ে পরেছে। কাজ কর্মে একেবারেই মন নেই তার। ফোঁস করে একটা নিঃস্বাস ফেলল ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া। মিলিটারী বাহিনী চালানো অতি কষ্টকর। কঠোর হতে হয় যখন তখন।

ক্যাপ্টেন বাবাকোয়ার সমস্যার সমাধান অবশ্য সেকেন্ড লেফটেনেন্ট মুরগীই করল (পদবী ডাউন করে দেয়ার পর)। বৃহস্পতিবার সকাল সকাল নোভেরা আর জাহিদ যার যার অফিসে চলে যাওয়ার পর যথারীতি খালেদা বেগম ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে টিভি রূমে গিয়ে সোফায় গা এলিয়ে টিভি দেখা শুরু করল। একটু পর পর লাল দাঁত বের করে হেসে গড়িয়ে পড়ছে টিভিতে কিছু একটা দেখে। খাওয়া চলছে তার সাথে।

বাবাই উদাস মুখে নীল হেলমেটটা মাথায় দিয়ে রান্না ঘরে গেছে বাবলির জন্য ফিডার আনতে। এখানেই কোথাও বানিয়ে রাখার কথা। টুল নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল কোন তাকে রেখেছে ফিডার। সেকেন্ড লেফটেনেন্ট মুরগীকে দেখা গেল সে খাবারের তাকে উঠে কি যেন খুঁজছে অনুসন্ধিৎস্যু মুখে। মনে হয় ব্যক্তিগত কোন মিশনে এসেছে। বাবাই পাত্তা দিল না। এদিক ওদিক তাকিয়ে ফিডার খুঁজতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখল খাবার রাখার তাকে বড় একটা গামলায় অনেকগুলো মাংসের চপ রাখা। নোভেরা বানিয়ে ফ্রিজে রেখে দিয়েছিল। খাবার সময় বের করে ওভেনে গরম করে নিত কেবল। এখানে রাখা কেন এগুলো? ফ্রিজেই না থাকার কথা- অবাক হয়ে ভাবে বাবাই। খোলা অবস্থায় রেখে দিয়েছে কে? ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিতে যাবে- হঠাৎ দেখলো ভেতরে কি জানি একটা নড়ছে।

চোখ বড় বড় করে দেখলো দুটো কালো শূঁড় উঁচিয়ে উঁকি ঝুঁকি মারছে একটা গাবদা গোবদা তেলাপোকা। সেকেন্ড লেফটেনেন্ট মুরগীর তাড়া খেয়ে বোধ হয় এখানে এসে লুকিয়েছে। বাবাই শঙ্কিত হয়ে ভাবল- খাবারের মধ্যে তেলাপোকা থাকা ঠিক না। অসুখ হয়। নোভেরা বারবার বলে দিয়েছে তেলাপোকা যাতে খাবারে না যায়।

বাবাই চিন্তিত মুখে টুল থেকে নেমে পড়ল। টিভি রূম হয়ে নোভেরাদের ঘরে চলে এলো। খালেদা বেগম এখনো আইসক্রিম খেতে খেতে টিভি দেখছে আর ফোনে কথা বলছে উঁচু গলায়। কাকে যেন আসতে বলছে বাসায়। সেই লিকপিকে শুঁকনা লোকটা নাকি? পাত্তা দিল না ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া।

কয়দিন আগে বাসায় ব্যাঙ ঢুকেছিল। নোভেরা ব্যাঙ ভয় পায়। জাহিদ তখন বাথরুমের হারপিক ছিটিয়ে সেই ব্যাঙটাকে মেরেছিল। হারপিকে নাকি কার্বলিক নামের এসিড থাকে। পোকা মাকড় সমানে ভয় পায় এটাকে।

বাবাই বাথরুমে ঢুকে খুঁজে বের করল হারপিকের বোতলটা। গম্ভীর মুখে ওটা নিয়ে রান্না ঘরে চলে এলো। টিভি রূম থেকে রান্না ঘরটা ভাল করে দেখা যায় না। তাই খালেদা বেগম দেখতে পেল না বাবাইকে। সে ফোনা কথা বলায় ব্যস্ত। নাকের লোম ছিঁড়তে ছিঁড়তে কেমন ন্যাকা ন্যাকা গলায় বলছে, “মজিদ, তোমারে একবার না বলছি আমারে আপা ডাকবা না? খালেদা ডাকবা শুধু। আর এইটারে তোমার নিজের বাসা মনে করবা। চলে আসো এখন। একটু সুখ দুঃখের আলাপ করি। আর ব্যাগটাও নিয়া যাও। ডাক্তারনী ছেমড়ি আয়ে পড়লে তো ঝামেলা। রাতে যা সরাইছি দিনে দিনে নিয়া যাও।”

ওপাশের কথা শোনা গেল না আর।

বাবাই তার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। রান্নাঘরে এসে টুলে উঠে চপের গামলায় হারপিকের বোলতটা টিপে ধরল। ব্যাঙ মরলে তেলাপোকাও মরবে নিশ্চই। খাবার দাবার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা দরকার।

ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া আনন্দের সাথে দেখলো তেলাপোকাটা প্রায় সাথে সাথেই মারা গেছে। চামচ দিয়ে তেলাপোকাটাকে নিয়ে নিচে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিল, ঢাকনা দিয়ে সুন্দর করে ঢেকে দিল চপের গামলাটা। ফিডার খুঁজে পায়নি। বানায়নি বোধ হয় খালা। সেকেন্ড লেফটেনেন্ট মুরগীকে নিয়ে ফিরে এলো বাবলির কাছে। ডাইনিং টেবিলের নিচে দাবা বোর্ডে উপুর হয়ে ঘুটি চিবানোর চেষ্টা করছে মাড়ি দিয়ে।

ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া উদাস মুখে হারপিকের বোতলটা একপাশে রেখে বলল, “তোর ফিডার পাওয়া যায়নি। অনেক খুঁজেছি। আম্মা এলে বানায় দিতে বলতে হবে। ঐ মোটকা খালা বানায় দিবে না মনে হয়।”

কথা শেষ হতে না হতেই কলিং বেলের শব্দ হল। বিরক্ত মুখে বাবাই বলল, “ওই শুঁটকা লোকটা আবার আসছে মনে হয়।”

বাবলি গভীর আগ্রহ নিয়ে হারপিকের বোতলটার দিকে হাত বাড়াতেই বাবাই নিয়ে নিল ওটা, “উঁহু। এটা তোর খাওয়ার জিনিস না। তোর বয়স মাত্র সাড়ে ছয় মাস। ছোট বাচ্চাদের শুধু দুধ খেতে হয়। আরেকটু বড় হ, তখন খাবি।” বাবাই হারপিকের বোতলটা আবার বাথরুমে রেখে আসে। গন্ধটা ভাল না, তাই বাবাইয়ের খেতে ইচ্ছা হয়নি। না হলে একটু খেয়ে দেখা যেত।

যাবার সময় ড্রইং রূমে উঁকি দিয়ে দেখল সেই লিকপিকে লোকটা আবার এসেছে। বেড়ালের মত গোঁফে তাঁ দিতে দিতে গল্প করছে সোফায় বসে। মোটকা মহিলাটা প্রায় কোলে উঠে পড়বে যেন লোকটার। একটা চটের ব্যাগ বের করে অনেকগুলো ওষুধ দিয়েছে লোকটাকে।

“যাই তাহলে খালেদা?” উঠে দাঁড়াতে গেল লোকটা।

হাত ধরে টেনে বসালো আবার, “এত তাড়া কিসের মজিদ? বসো না? সব সময় তো খালি মুখেই উঠে যাও। একটু বসো। কিছু খায়ে যাও?”

বাবাই চলে আসছিল দরজা থেকে। শেষ কথাটা শুনে আবার ফিরে তাকাল, মহিলাটা কেমন ঢুলু ঢুলু নয়নে তরল গলায় বলছে, “তোমার জন্য কয়টা মাংসের বড়া বানায়ে রাখছিলাম। সারাদিন তো কত খাটা খাটুনি যায় তোমার ওপর দিয়া। কিছুই ঠিক মত খাও না। একটু বসো। আমি নিয়াসি।”

বাবাই মহাবিরক্ত হল মোটকা মহিলাটার ওপর। আম্মার বানানো চপ নিজের নামে চালাচ্ছে। আবার খেতেও দেবে এই লোককে! এটা মেনে নেয়া যায় না। মোটেই না!

গট গট করে হেটে এসে রান্নাঘরে ঢুকল মোটকা মহিলাটার পেছন পেছন, রাগী রাগী গলায় বলল, “খালা, চপ আম্মা বানিয়েছে। কাউকে খেতে দেবেন না।”

মুখ বাঁকা করে হাসি দিল, “এহ্‌। কি একখান অর্ডার দিলোরে! যা ইচ্ছা খাবো, যারে ইচ্ছা খাওয়াবো। তোমার কি? গিয়া খেলা করো। এইখানে ঝামেলা করবা না।”

বাবাই রেগে মেগে পা দাপিয়ে বেরিয়ে এল রান্নাঘর থেকে। সে “ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া”; তাকে রাগা মানায় না। তাই রাগ দমন করে চলে এলো বাবলিদের কাছে।

খানিক বাদেই বসার ঘর থেকে শুনতে পেল মোটকা মহিলাটা ন্যাকা ন্যাক গলায় বলছে, “হা করো মজিদ ভাই। আমি খাওয়ায় দেই।”

মজিদ নামের লোকটা কেমন সন্দিহান গলায় বলল, “আপনি- মানে তুমিই বানাইছো তো? কেমুন ওষুধ ওষুধ গন্ধ না?”

“আরে ধুর। এত সব ওষুধ নিয়া বসে আছো দেখে এই রকম লাগতেছে। আমি নিজেই সারাদিন ওষুধ পত্রের মধ্যে থাকি দেখে আইসক্রিম খাইলেও মনে হয় ডেটল খাইতেছি।........ হা করো- ”

ফ্রিজটা ডাইনিং টেবিলের পাশেই রাখা। রান্নাঘরে জায়গা কম বলে এখানে নিয়ে এসেছে নোভেরা। ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া হেলমেট পরে রাগে দুঃখে ফ্রিজের ভেতর গিয়ে ঢুকে পড়ল। যাওয়ার আগে বিদায় নিল সেকেন্ড লেফটেনেন্টের কাছ থেকে, “আমি গেলাম। এখানে থাকা আর সম্ভব না আমার পক্ষে। এত নিপীড়ন, এত অন্যায়- মেনে নেয়া যায় না! যায় না!!” নতুন শেখা শব্দ ‘নিপীড়ন’ আর ‘অন্যায়’কে জায়গা মত ব্যবহার করতে পেরে খুশি হল। অল্প কিছুদিন হল চে গুয়েভরার ওপর একটা সিনেমা দেখে শিখেছে বাবাই। বাংলায় রূপান্তরিত ছিল সেটা। ফ্রিজের দরজা লাগিয়ে ঢুকে পড়ল যেন বিপ্লবী চে বিদায় নিলেন কিউবা থেকে!

কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কিউবায় যুদ্ধ লেগে গেল যেন। ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া অবাক হয়ে অস্পষ্ট গলায় দুটো ধাড়ি গলায় গগণ বিদারী চিৎকার শুনতে পেল। চে সাহেব ফ্রিজের দরজা সামান্য ফাঁক করে কিউবার দিকে তাকালেন। তাকিয়ে যা দেখলেন তাতে আঁতকে উঠলেন।

টিভি রূম, ডাইনিং রূম, রান্নাঘর- সব তোলপাড় করে দশাসই শরীর নিয়ে ঝড়ের বেগে দৌড়াচ্ছে মোটা মহিলাটা! সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়াচ্ছে শুঁটকা লোকটাও! দুজনেই পেট খামছে ধরে একবার এইদিক, একবার ঐদিক দৌড়াচ্ছে।

কিউবায় কি নতুন কোনো বিপ্লব শুরু হল? স্লোগান দিতে দিতে দৌড়াচ্ছে নাকি? ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া সবে দরজা খুলে নেমেছে ফ্রিজ থেকে- শুঁটকা লোকটা দৌড়ে এসে ফ্রিজ থেকে একটা পানির বোতল বের করে ঢক ঢক করে গিলে ফেলল। বাবাই একটু অবাক হয়ে তাকাল। বোতলটায় পানি নেই। ওটাতে আম্মা আচার বানানোর সিরকা রেখেছিল। কথাটা এখন বলে লাভ নেই। খেয়ে ফেলেছে। আম্মা অনেক রাগ করবে। সূক্ষ্ম একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করল বাবাকোয়া।

লোকটা সেটা খেয়েই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাল বাবাইয়ের দিকে। কয়েক মুহূর্ত থম থমে নীরবতা। তারপরেই ঘরের ছাদ ফাটানো একটা চিৎকার দিয়ে ওখানেই পড়ে গেল লোকটা। ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া সহ সেকেন্ড লেফটেনেন্ট মুরগী, বাবলিও চমকে উঠল। সেকেন্ড লেফটেনেন্ট সাহেব ভয় একটু বেশিই পেলেন মনে হয়। কেন না উনি লাফ দিয়ে ডানা ঝাপটে উড়ে যেতে গেলেন। কিন্তু পড়লেন একেবারে খালেদা বেগমের হাতির পাড়ার সামনে। কক্‌রো কক্‌ করে আরেক দিতে দৌড় লাগালেন। খালেদা বেগম তাল সামলাতে পারলেন না। হা হড়কে সোজা এসে পড়লেন শুঁটকা মজিদের ঠিক ওপরেই। দেহে যা কিছু বল অবশিষ্ট ছিল মজিদ সাহেবের, পর্বতশৃঙ্গ ধ্বসে মোটামুটি ভূমির সঙ্গে মিশে গেলেন। কেবল নিচ থেকে চিঁ চিঁ গলায় ভেসে এল, “ও বাজিরে! ইতা হাতি আই ফড়িচ্চে!!” পরবর্তী কথাগুলো আর শোনা গেল না। ভোল্টেজ কমে গেছে- অনুমান করলেন ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া। একটা নিঃশ্বাস ফেলে হেলমেট খুলে সেটাকে বুকের সামনে ধরল সহানুভূতি ভরা মুখে।

 

ঘরের ভেতরের এই বিশাল সুনামি বয়ে যাওয়ার শব্দ পাশের বাসার বিন্তিদের কানেও গিয়েছিল। বিন্তির মা আর ছোট মামা এসে দরজা ধাক্কা ধাক্কি শুরু করতেই বাবাই টুল নিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল। ভেতরে ঢুকেই আক্কেল গুড়ুম তাঁদের। ঘরের সারা মেঝেতে ওষুধ পত্র ছড়ানো ছেটানো। নানা রকম ছোট বড় শিশি বোতলে ভর্তি। ডাইনিং রূমের ফ্লোরে বিশালাকায় এক মহিলা বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে লিকপিকে এক শুঁটকো লোকের ওপর। বাবলি মহা উৎসাহে মেঝেতে থাবা দিচ্ছে ওদের পাশে উপুর হয়ে শুয়ে। দেখে মনে হচ্ছে যেন কুস্তির এ পর্যায়ে রেফারি বাবলি কাউন্ট করছে ১, ২, ৩.......

বিন্তির মা বিড়বিড় করে বললেন, “কান্ডটা কি হল!”

কাপ্টেন বাবাকোয়া গম্ভীর মুখে বললেন, “শরীর ভাল রাখার জন্য নিয়মিত দৌড়াতে হয়। ওনারা মনে হয় সকালে দৌড়ায় নাই। তাই ঘরের ভেতর পিটি করতেছিল।”

বিন্তির মা শূণ্য দৃষ্টিতে তাকালানে বাবাইয়ের দিকে। বাবাই হেলমেট পরে গম্ভীর মুখে পেছনে হাত নিয়ে পায়চারি করে লাগল ওষুধ পত্রের ওপর দিয়ে।

 

বিন্তির মায়ের ফোন পেয়ে জাহিদ আর নোভেরা বিশ মিনিটের মাথাতেই চলে এল হন্ত দন্ত হয়ে। ঘরের ভেতরে ঢুকেই নোভেরা চারপাশ এক নজর দেখেই যা বোঝার বুঝে নিল। ঠান্ডা মাথার মানুষ নোভেরা। মেঝেতে এত সব ওষুধ পত্র আর লিকপিকে অজ্ঞান লোকটাকে দেখেই হতাশ  ভাবে মাথা নাড়তে লাগল, জাহিদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার ক্যাপ্টেন সাহেব তো আবারও চোর ধরেছে দেখছি!”

জাহিদ অবাক হয়ে তাকাল, “মানে?”

“বলেছিলাম না স্টোর থেকে ওষুধ চুরি যাচ্ছে? সব ওষুধ আসলে এই খালেদাই সারাচ্ছিল। আমি বাসায় না থাকলে ওষুধের ডিলার এই মজিদ বদমাশটার বাছে বেচে দিত। আগে আমাদের হসপিটালেই ছিল- ওষুধ চুরির জন্য জেলে গিয়েছিল। এখন দেখি বেরিয়ে এসেও একই কাজ করে যাচ্ছে!”

“কি বলো!” চোখ গোল গোল করে জাহিদ মেঝেতে পড়ে থাকা খালেদা আর মজিদের দিকে তাকালো। জ্ঞান ফিরেছে দুজনেরই, পেট ধরে কোঁকাচ্ছে।

“পুলিশে দেয়া দরকার” জাহিদ বলল।

“কিন্তু এদের এই অবস্থা হল কীভাবে?” নোভেরা চিন্তিত মুখে বলল।

বাবাই ডাইনিং টেবিলের নিচে বাবলি আর সেকেন্ড লেফটেনেন্ট সাহেবকে নিয়ে চুপচাপ বসে ছিল। ও গম্ভীর মুখে বলে উঠল, “ওরা মাংসের চপ খেয়েছে।”

নোভেরা সন্দিগ্ধ গলায় বলল, “মাংসের চপ খেলে এই অবস্থা হবে কেন?”

“ওখানে তেলাপোকা পড়ে ছিল।”

“তেলাপোকা? তেলাপোকা থাকলেই এই অবস্থা হয়?” সরু চোখে তাকালো নোভেরা।

“না....... আমি হারপিক এনে তেলাপোকাটাকে মেরে ফেলেছিলাম। তাও যে কেন এ রকম হল বুঝি নাই। মনে হয় তেলাপোকাটায় অনেক জীবাণু ছিল...” আমতা আমতা করে বাবাই।

জাহিদের চোয়াল ঝুলে পড়ল, মাছের মত খাবি খেতে বলল, “এরা হারপিক খেয়েছে? চপের সাথে?”

“অল্প, বেশি দেই নাই।”

নোভেরা মাথা নাড়তে নাড়তে মোবাইল বের করে হাসপাতালে ফোন দিল, “এদের হাজতে পাঠানোর আগে হাসপাতালে পাঠানো দরকার! তোমার ছেলে যে কোনদিন যে কি বিপদে ফেলে দেয় আমাকে.....”

 

অ্যাম্বুলেন্স এসে যখন খালেদা আর মজিদকে নিয়ে যাচ্ছে- বাবলি তখনো মেঝেতে আনন্দ সূচক থাবা দিয়ে যাচ্ছে। সেকেন্ড লেফটেনেন্ট মুরগী গম্ভীর মুখে নতুন তেলাপোকার খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এবং ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া লন্ড ভন্ড কিউবার দিকে তাকিয়ে আছে উদাস মুখে। এই কিউবাকে ঠিক করতে গিয়ে আজ আম্মুর খবর হয়ে যাবে।

 

 

বাবলির দুটো দাঁত গজিয়েছে। তার প্রধান কাজ হল ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া দাবা বোর্ডের ওপর ঘুমিয়ে পড়লে বাবাইয়ের কান গিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করা। বাবাই মহা বিরক্ত এটা নিয়ে। আজকাল শান্তি মত ঘুমাতে পারে না সে। ঘুমিয়ে থাকলেই বাবলি ওর পিঠের ওপর উঠে ঘুমিয়ে পড়ে। এবং পাঁচ মিনিট যেতে না যেতেই বাবাইয়ের ঘুম ভেঙে যায়- বাবলি হিসু করে দিয়েছে পিঠের ওপর। এত জায়গা থাকতে ঠিক বাবাইয়ের পিঠের ওপর উঠেই কেন ঘুমায় বাবলি- এটা বিশাল একটা রহস্য বাবাইয়ের কাছে।

“ক্যাপ্টেন বাবাকোয়ার গোপন মিশন সমূহ” নামক ডায়েরিতে বাবলির ওপর অনেক বড় একটা অধ্যায় রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন কিছু না কিছু যোগ হচ্ছে। আজও দুপুরে খাওয়ার পর টেবিলের নিচে হেলমেট পরে ডায়েরিতে পেন্সিল দিয়ে খস খস করে লিখছে বাবাইঃ

 

“বাবলি নামক এই ছোট মানুষটা ক্যাপ্টেন বাবাকোয়াকে বেশ কয়দিন যাবত অনেক জ্বালাচ্ছে। এইটা ঠিক না। সে যখন তখন বাবাকোয়ার কান খেতে আসে। আর ঘুমিয়ে থাকলেই পিঠের ওপর উঠে ঘুমিয়ে পড়ে। ভিজিয়ে দেয় সব সময়। এইটা অন্যায়, এইটা নিপীড়ন। ওর কান খাওয়া থেকে বাঁচতে এখন সব সময় হেলমেট পরে থাকে বাবাকোয়া। গরম লাগে মাথায়। এইটা কি ঠিক? কান একটা খাওয়ার জিনিস হল?...........”

 

ডায়েরি বন্ধ করে উঠে দাঁড়ায় বাবাই। হাই তুলছে ঘন ঘন। ঘুম পাচ্ছে। নোভেরার ঘরে এসে ঘুম ঘুম চোখে দেখল নোভেরা আর বাবলি গভীর ঘুমে। ইদানীং বিছানাতেই ঘুমায় বাবলি।

বাবাই হেলমেট পরেই বিছানায় উঠে আম্মুর অন্য পাশে শুয়ে পড়ল। উপুর হয়ে শোয়ার অভ্যাস বাবাইয়ের। শোয়ার প্রায় সাথে সাথেই ঘুম।

খানিক বাদে দেখা গেল বাবলি উঠে পড়েছে। একবার চিন্তা করল কান্না কাটি শুরু করবে কিনা। ঘুম ভাঙলেই সে গলা ফাটিয়ে চেঁচানো শুরু করে। বাবাইয়ের ভাষ্য মতে ‘গলা পরিষ্কার করে’। কিন্তু আজকে কান্নার চিন্তাটা বাদ দিয়ে বোধ হয় ভাবল আরেকটু ঘুমায় নেয়া যাক। তাই নোভেরাকে ডিঙ্গিয়ে বাবাইয়ের পিঠের ওপর এসে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

 

পাঁচ মিনিট পর.......

“আম্মা!!! এইটা আবার আমার উপর হিসু করে দিছে!!! আর জায়গা নাই?” ক্যাপ্টেন বাবাকোয়ার গলা ফাটানো চিৎকারে চমকে জেগে ওঠে নোভেরা। চোখ লাল করে বাবাই-বাবলির দিকে তাকিয়ে থাকে। ভেজা গেঞ্জি নিয়ে হেলমেট মাথায় জবুথবু হয়ে বসে আছে বাবাই। বাবলি উপুর হয়ে মহানন্দে থাবা দিচ্ছে বিছানায়।

হাসবে না হাসবে না করেও হেসে দেয় নোভেরা। ছেলে মেয়ের কান্ড দেখে হাসতে হাসতে চোখে পানি এনে ফেলে।

পৃথিবীতে মা হওয়ার চেয়ে বড় আনন্দের জিনিস আর কি আছে?

 

Share