বিশ্ব আব্বা দিবস ও আমার জনক

লিখেছেন - মোঃ ফরহাদ চৌধুরী শিহাব | লেখাটি 662 বার দেখা হয়েছে

বিশ্ব আব্বা দিবস উপলক্ষ্যে আব্বাকে "উইশ" করার জন্য ঘুর ঘুর করছিলাম। সমস্যা হল আব্বার সাথে কথা বার্তা বিশেষ বলা হয় না আমার। এই কারণে বলতে পারছিলাম না। গিয়ে কেবল আম্মাকে মিন মিন করে বললাম, "আম্মা আজকে তো বিশ্ব আব্বা দিবস। ভাল মন্দ কিছু খাওয়া দরকার না? তোমার বেলায় আম্মা দিবসে যেরকম খেলাম?"

আম্মা বালিশ পিটিয়ে সোজা করছিলেন, সেটা বন্ধ করে সরু চোখে তাকালেন আমার দিকে, "তো?"

মুখে হাসি ফুটিয়ে বললাম, "মানি ব্যাগ একেবারে খালি আম্মা। কিছু কিনতাম। আব্বার তো ফাস্ট ফুড পছন্দ।"

বিরক্ত গলায় বলল, "তোর আব্বাকে বল। আমাকে বলিস কেন?"

হাসিটা মিলিয়ে গেল আমার, শুঁকনো মুখে বললাম, "আব্বারে বলতে ভয় লাগে।"

"তাহলে বলিস না। সামনে থেকে ভাগ এখন। কাজের সময় বিরক্ত করিস না।" ধমক দিলেন।

আমি উসখুস করতে করতে বেরিয়ে এলাম। বের হয়েই পরলাম আব্বার সামনে, "কিরে? মুখ ভোঁতা করে রেখেছিস কেন এরকম?"

 

আমি দ্রুত চিন্তা করার চেষ্টা করলাম কি বলা যায়? বিশ্ব বাবা দিবস কথাটা কেমনে বলি? আব্বাকে তো "বাবা" বলেও ডাকি না। লেখা লেখির সময় হয়ত মাঝে সাঝে "বাবা" লেখি। মুখে সব সময় "আব্বা/ আব্বু" ডাকি। বিশ্ব আব্বা দিবস তো লেখে না কেউ। ইংরেজীতে বলবো নাকি "Happy Fathers Day"? ভাষার দেয়াল জড়তাকে খুব সহজেই আড়াল করে দেয়। কিন্তু সেটাও মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না। মুখে আঁঠা লেগে গেছে যেন! বাপের সামনে যে সব ভাষাই ফেল মারে টের পেলাম আজ।

আব্বা হাতের বইটা বন্ধ করে হাসলেন, "কীরে? কিছু বলবি নাকি?"

 

আমি ঢোক গিললাম শব্দ করে, "কই? কিছু না তো।" আব্বাকে ঐ অবস্থাতে রেখেই নিজের ঘরে চলে এলাম। নিজের ওপরেই খুব বিরক্ত লাগছে। এত সহজ কথাটা আম্মাকে যত তাড়াতাড়ি বলে দিতে পারি- আব্বাকে পারি না কেন? মন খারাপ হয়ে গেল। নিজের কাছে টাকা থাকলে নাহয় গিয়ে কিছু কিনে এনে আম্মাকে দিয়ে আব্বাকে দেওয়ানো যেত। আম্মা তখন বলে দিত "তোমার ছেলে বিশ্ব বাবা দিবসে তোমাকে দিয়েছে এটা" কত সহজেই হয়ে যেত। চাকরী বাকরী করি না দেখে আফসোস হল। আর মাসে মাঝা মাঝি দেখে পকেটও খালি। গম্ভীর মুখে শুয়ে পড়লাম। টিনটিনের লাল বোম্বেটের রহস্যটা নিয়ে পাতা ওল্টাতে লাগলাম। পাতায় মত নেই। অন্যমনস্ক হয়ে এটা সেটা ভাবছিলাম।

 

বইটার মাঝা মাঝি এসেছি ঠিক তখন পাশের ঘর থেকে শুনতে পেলাম আম্মা আব্বাকে বলছে, "আজকে নাকি বিশ্ব বাবা দিবস। তোমার ছেলে মেয়ে কেউ উইশ করেছে?"

আব্বা অবাক গলায় বলল, "কই? শিমু তো ফোন টোন করেনি। শিহাবকেও তো দেখলাম মুখ ভোঁতা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিছু বলল না তো!"

"শিমু ফোন দিয়েছিল। তোমাকে খুঁজেছে। তোমার মোবাইল নাকি বন্ধ পাচ্ছে সকাল থেকে। তুমি ফোন দিও। আর তোমার ভোম্বল দাস ছেলে ঘুর ঘুর করছে আমার পেছনে- তোমাকে নাকি কি সব কিনে খাওয়াতে চায়। টাকা নাই। এসেছিল বোধ হয় উইশ করতে। ভয় পায় দেখে ভেগেছে।"

আব্বা হা হা করে হাসতে হাসতে বলল, "আমি বাঘ না ভালুক যে ভয় পায়? আর বলতে যদি এতই লজ্জ্বা পায় তাহলে সালাম করে গেলেই হয়। ওটা তো করাতে সমস্যা নাই ওদের কারোই।"

"তোমার ছেলের মাথায় কি আর ঐ সব বুদ্ধি শুদ্ধি আছে? দুনিয়ার কেচ্ছা কাহিনী লেখে পন্ডিতের মত- অথচ নিজে এখনো গাধা থেকে গেছে!" আম্মা হালকা গলায় বলল।

"হয় ওরকম। খুব স্বাভাবিক জিনিসগুলো চোখে পড়ে না ওর। কদিন আগেও দেখলাম মশারি ছিঁড়ে দুই মাথা কোনাকুনি খুলে গেছে, তার মাঝেই ঘুমাচ্ছে হা হয়ে। কাঁথা ছিল না মনে হয়, দেখি শীতের জন্য মশারি টেনে ছিঁড়ে গায়ে দিয়েছে কম্বলের মত! পাত্থরের দেয়ালে কায়দা করে মশারির জন্য যে কয়টা পেরেক টেরেক লাগিয়েছিলাম- সব গেছে খুলে।" মানি ব্যাগ থেকে বোধ হয় টাকা বের করলেন। শুনলাম আম্মাকে বলছে, "টাকাটা শিহাবকে দিয়ে দিও। নিজে তো চাইতে আসে না। সব সময় তোমাকে দিয়ে বলায়। ঘরের মধ্যে থাকলে বাপ মা দুজনকেই বলতে হয়। এই ছেলে সেটা বলে না!"

টিভি রূমে চলে গেল আব্বা।

 

আমি শুয়ে শুয়ে বোকার মত ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর কোনো রকম দেরি না করে এক দৌড়ে টিভি রূমে গিয়ে আব্বাকে হালুম করে পা ধরে সালাম করে ফেললাম! আব্বা সোফায় বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। অবাক হয়ে মুখ তুললেন, "কীরে? সালাম কেন হঠাৎ? পরীক্ষা টরীক্ষা নাকি? কলেজ খুলল কখন আবার?"

আমি প্রবল বেগে মাথা নাড়ালাম, "বিশ্ব আব্বা দিবস আজকে আব্বা!"

"মাথা আস্তে নাড়া। সিলিং ফ্যানের মত ঘুরাচ্ছিস কেন? দেখি কাছে আয়।" হাত বাড়িয়ে ডাকলেন। আমি কাছে যেতেই আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, কেমন আড়ষ্ট গলায় বললেন, "ভাল থাক্‌। তোর মার কাছে টাকা দিয়েছি। কি নাকি কিনতে চাস। চেয়ে নিস ওর কাছ থেকে।"

আমি যন্ত্রের মত নিজের ঘরে ফিরে এলাম। বিছানায় বসতেই দেখলাম একটা একশো টাকার নোট রেখে গেছে আম্মা এই ফাঁকে। মোবাইলের নিচ থেকে উঁকি দিচ্ছে টাকাটা। টাকাটা নিয়ে নীরবে কয়েক মুহূর্ত বসে রইলাম বিছানায়।

 

আমার আব্বা আর্মিতে ছিলেন অনেক বছর। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে কঠোর শাসনে বড় করেছেন আমাদের দুই ভাই বোনকে। যখন স্কুলে নতুন ভর্তি হয়েছি- তখন আইসক্রিম খাওয়ার জন্য আব্বার কাছে টাকা চাইতে ভীষণ লজ্জ্বা পেতাম। অনেক ঘুর ঘুর করতাম ঘরটার আশে পাশে। আব্বা অফিসে যাওয়ার পর শুনতাম আমার জন্য টেবিলের ওপর দুই টাকা পাঁচটা রেখে গেছেন। যতই বড় হয়েছি- ভেবেছি আব্বা আমাকে টাকার অংক বাড়িয়ে দেবেন আপুর মত। আপু যত বড় হয়েছে- ওকে আব্বা হাত খরচের টাকার পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমাকে দেননি কখনো। খুব টিপে টিপে দিতেন।

 

আম্মাকে প্রায়ই এসব নিয়ে গাই গুই করতাম আমি। আম্মা আব্বার সামনে এটা নিয়ে কথা তুললেই আব্বা হেসে বলত, "ছেলেদের টাকা কম দিতে হয় রীতা। আর মেয়েদের টাকা দিতে হয় বেশি। তাহলে ছেলেদের হাত ঠিক থাকে, সভাবও ঠিক থাকে। মেয়েরা টাকা পেলে ওড়ায় না ছেলেদের মত। ছোট থেকে ঠিক মত মানুষ করতে চাইলে অনেক অপ্রীতিকর বিষয় এড়ানো দরকার। আর হুট করে কিছু চাইলেই দেয়া ঠিক না। দিতে হয় দেরিতে যাতে অভাব আর প্রয়োজনের ব্যাপার গুলো বুঝতে শেখে। একদিন তোমার ছেলে বুঝে যাবে নিজে থেকেই। এখন হয়ত আমার ওপর রাগ লাগবে ওর। তখন আর হবে না।"

আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে হাতে নোটটা নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখলাম। কোথায় যেন খুব সাবধানী একটা পিতার ঘ্রাণ লেগে আছে নীলচে কাগজটায়।

 

এই ঘ্রাণ লাগানো মানুষটাই ক্লাস এইটে থাকতে আমার কাঁচা হাতের লেখা একটা গল্প পড়ে বিস্মিত হয়ে বলে উঠেছিলেন, "আরে! আমার ছেলেটা তো অনেক ভালো লেখে! এত ভাল লেখা কীভাবে শিখলি?"

আমি সেদিন অবাক হতে তাকিয়েছিলাম তাঁর দিকে। এত আনন্দের কি ছিল আমি বুঝতে পারিনি সেদিন।

এস.এস.সি পরীক্ষায় যখন এ প্লাস পেলাম। আমি যন্ত্রের মত এই স্কুল গেটের সামনেই তার পা ছুঁয়ে সালাম করে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলাম শিশুর মত। সেদিনও তিনি মহা আনন্দিত স্বরে বলেছিলেন, "সেকেন্ড ডিভিশন নাকি? মন খারাপ করিস না। গ্রেডিং না থাকলে এই রেজাল্টও সবাই ভালো বলতো। ইন্টারে ভাল করবি।" তিনি ধরতেও পারেন নি আমি কি করেছি রেজাল্টে। সেদিন ওনার কথা শুনে মনে হয়েছিল আমি সত্যি সত্যি খারাপ করলেও সেদিন আমার বুক ভারী হতো না। আব্বা থাকলে আমার বুক ভারী হবে না কখনোই।

 

আমার জীবনের শুধু মাত্র যে মানুষটার প্রসংশায় আমি হতবিহ্বলের মত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি এখনো - তিনি আমার আব্বা। আমার দেখা পৃথিবীর বিশুদ্ধতম মানুষ। যিনি এখনো তিন বেলা খাওয়ারের সময় মেঝেতে বসে খেতে ডাকেন আমাকে। সবাইকে নিয়ে বসে তৃপ্তির সঙ্গে খেতে খেতে বলেন, "শিহাব প্লেট মুছে খাবা। মুছে খাওয়া আমাদের নবী (সঃ) এর সুন্নত। আমি নিজেও বিয়ের আগে খেতাম না কোনোদিন। তোমার মা'কে দেখে দেখে এভাবে খাওয়া শিখেছি। আর ভাল খেতে হয় প্লেটের সামনের দিকে খাবার রেখে, নিচের দিকে এনে এনে খেতে হয়। এটা নিয়ে কোরআন শরীফের একটা তাফসিরও আছে।"

 

আমি মুখ ঝুঁকিয়ে খেতে থাকি। আর গভীর বিস্ময় নিয়ে ভাবি- আল্লাহ্‌ এত মমতা নিয়ে আমার জীবন দিয়েছে কেন? পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হলেন বাবা। এই শিক্ষকের কোনো কথাই ভোলা উচিত না। মানুষ করার এই আজব কারিগর বোধ হয় "মা" শব্দের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি- যিনি গাছের অগচরে তার শেকড়ে মৃত্তিকা রস যুগিয়ে গেছেন আড়াল থেকে। টের পায়নি কেউ!

 

পৃথিবীর সমস্ত মানুষ গড়ার এ কারিগর "বাবা"দের আজ গভীর ভালবাসা জানিয়ে গেলাম নিভৃতচারে।

 

 

Share