সেই সব দিন, সেই সব ছেলে বেলা

লিখেছেন - মোঃ ফরহাদ চৌধুরী শিহাব | লেখাটি 2338 বার দেখা হয়েছে

সন্ধ্যার পর পরই কারেন্ট চলে যাওয়াটা রুটিন হয়ে গেছে। মাগরীবের নামায শেষ করে উঠে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই জগৎ সংসারে লোড শেডিং নাযিল হয়। আজকেও হয়েছে। বিরক্ত মুখে ড্রইং রূমে এসে ধপাস করে সোফায় বসে পড়লাম। আব্বা নামায় পড়ে বাজারে চলে গেছেন, আম্মা চার্জার জ্বালিয়ে এনে ফ্লোরের মাঝা মাঝি রেখেছে একটু আগে। এখন রান্নাঘরে গিয়ে হরলিক্স বানাচ্ছে মোম জ্বালিয়ে। যেখানে বসেছি ওখানে থেকে রান্নাঘর দেখা যায়। খুটুর খাটুর করছে আম্মা ওখানে। আমি সোফায় পা তুলে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে বিরক্ত গলায় বললাম, “এই গরমের মধ্যে আবার হরলিক্স বানাও ক্যান? এমনিতেই তো সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। হরলিক্স খেলে কান দিয়ে ধোঁয়া বেরুতে থাকবে।”

রান্নাঘর থেকে হালকা গলায় জবাব দিল আম্মা, “খেয়ে নে আজকে। অন্য কিছু বানাতে ইচ্ছে করছে না। বিস্কুট আছে। বিস্কুট দিয়ে খা।”

আমি আর কিছু বললাম না। আধো অন্ধকারে বসে আছি। চার্জারের জন্ডিস হয়েছে। আলো কম। কানের পাশ দিয়ে উড়তে থাকা মশাটাকে তাড়াবার চেষ্টা করছি। পিন পিন করে কানের সামনে এসে জাতীয় সংগীত গাচ্ছে অনেক্ষণ যাবত। থাবড়া মেরে চ্যাপ্টা করতে ইচ্ছে করছে না। অলস ভঙ্গিতে বসে আছি। মসাটাকে ল্যান্ড করার হ্যালিপ্যাড দিচ্ছি না শুধু। ঘামছি কেবল। আজকে সারাদিনটা পাঁচ মিনিট রোদ-পাঁচ মিনিট বৃষ্টি- এভাবে গেছে। সন্ধ্যার পর আঠা আঠা গরম। গায়ের সাথে জামা কাপড় লেগে যাচ্ছে প্রায়। আম্মা হরলিক্সের বিশাল টিনের মগটা এনে আমার হাতে দিতেই পুরো মগের ট্যাম্পারেচার আমার গায়ে হেঁটে হেঁটে না, রীতিমত একশো গজ স্প্রিন্টের দৌড়ে চলে এলো। আমি কোনো মতে মগটাকে সোফার হাতলে বসিয়ে রেখে বিস্কুটের প্যাকেট খুলতে লাগলাম। আম্মা সন্ধ্যার সময় কিছু খায় না। চার্জারের কাছে গিয়ে মেঝেতেই শুয়ে পড়ল, “উফ! এত কারেন্ট যেতে পারে এখানে! গরমের চোটে ঘর বাড়ি সুদ্ধ চুলা হয়ে গেছে!”

আমি বিস্কুটের প্যাকেট ছিঁড়তে ছিঁড়তে আম্মার দিকে তাকালাম, “আবার ফ্লোরে শুলে কেন? এমনিতেই তো হাতে পায়ে ব্যথা। ফ্লোরে শুলে বেড়ে যাবে।”

“রাখ তোর ব্যথা। গরমে বাঁচি না এমনিতে। বিছানাতে শুলে মনে হয় হিটারের ওপর আছি। তোশক পর্যন্ত আগুন গরম!”

“শোও তাইলে।” ঠোঁট ওল্টালাম, বিস্কুট বের করে হরলিক্সে ডুবিয়ে খেতে লাগলাম।

ঘরের ভেতর ভ্যাপসা গরম। জানালাগুলো সব খোলাই আছে। কিন্তু এক ফোঁটা বাতাস নেই। পর্দাগুলো কেবল ঝুলেই আছে। নড়ছে না একটুও। আবছা অন্ধকারে অন্ধের মত বিস্কুট ডুবিয়ে খাচ্ছি। কতগুলো যে ভেঙে ভেঙে মগের ভেতরই পড়ে গেছে হিসাব নেই।

সিলিং এর দিক থেকে একটা টিকটিকি ভারী গলায় ডেকে উঠতেই মুখ তুলে তাকালাম। টিকটিকিটাকে খুঁজলাম অলস চোখে - টিভির এন্টেনার তারে ঝুলতে দেখা গেল। ভাবুক ভঙ্গিতে বসে আছে তারে। আমি তাকাতেই চুপ হয়ে গেল। চার্জারের ম্লান আলোয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে উদাস উদাস মুখে। আমি বিস্কুট মুখে দিতে দিতে বিরক্ত স্বরে বললাম, “যা ভাগ!”

সত্যি সত্যি টিকটিকিটা যেন আমার কথা শুনেই লাফ দিয়ে তারটা থেকে নেমে গিয়ে পড়ল টিভিটার ওপর। মুহূর্তেই হারিয়ে গেল ওপাশে। দেখা যাচ্ছে না আর।

টিকটিকিটার লেজ টেজ খসল কিনা দেখার জন্য তাকাতেই হঠাৎ করে যেন বিশাল রঙিন টিভিটা চোখে পড়ল এতক্ষণ পর। চুপচাপ বসে আছেন গম্ভীর মুখে। কয়েকটা শো পিস রাখা টিভির ওপর। শো কেসের পাশেই ছোট একটা টেবিলে রঙিন টিভিটা রাখা। আর শো কেসের ওপরে আমাদের পুরনো শাদা কালো টিভি। ওটা চালানো হয় না আর। রঙিনটা বিশ্বকাপের সময় মাঝে মাঝে চালানো হয়। আম্মাই দেখে বেশির ভাগ। বিটিভি’র বাংলা ছবি আর ইত্যাদি দেখে। বাসায় ডিশ নেয়া হয়নি। দেখবে কে? কম্পিউটারেই যা কিছু দেখার দেখি সবাই। টিভি দুটোই খুব চুপচাপ বসে থাকে যার যার জায়গায়। দেখতে কেন যেন অবসর প্রাপ্ত সবকারী চাকুরীজীবী বনে হয় টিভি দুটোকে। দীর্ঘ দিনের চাকরী জীবন শেষ করে এখন অবসরে চলে গেছে।

আম্মা ঘুমিয়ে পড়েছিল ফ্লোরেই। আমি একটু অন্যমনস্ক গলায় ডাকলাম, “মা?”

“উঁ?” জেগে উঠল।

“আমাদের রঙিন টিভিটার বয়স কত?” টিভিটার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলাম।

সামান্য অবাক হয়ে বলল আম্মা, “দশ বারো হবে। কেন?”

উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আর শাদা কালোটা?”

“ওটা তোর থেকেও বড়। শিমুর সমান হবে। সাতাশ আঠাশ।” উঠে বসল মেঝেতে, “হঠাৎ বয়স জিজ্ঞেস করছিস যে?”

“নাহ্‌। এমনি।” ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেললাম, “অনেক ছবি টবি দেখা হয়েছে না এগুলোতে?”

“শাদা কালোটাতে বেশি। বিয়ের আগে বাড়িতেও ঠিক এরকম একটা ছিল। কাঠের মত বড়িটা, ফিলিপ্সের। তখন তো আর এত সব ডিশ চ্যানেল ছিল না। বিটিভি’ই ছিল। প্রথম প্রথম মাসে একটা ছবি দিত। বৃহস্পতিবার রাতের বেলা। আশে পাশের কয়েক বাঃরই মিলে রাত জেগে ছবি দেখতাম। ফ্লোরে ঠাসা ঠাসি করে সব ভাই বোনগুলো বসে থাকতাম ছবি শুরুর এক ঘন্টা আগে থেকেই! কত দিন যে সেন্টার খোলার জন্য বসে ছিলাম তিনটার আগে থেকে। শুরু হলেই অনুষ্ঠান সূচিটা আগে শুনে নিতাম কি ছবি আছে আজ।” আপন মনেই হাসল আম্মা, “পরে এক মাসের জায়গায় সপ্তাহে একদিন করে ছবি দিত, বৃহস্পতিবার রাতে। চিটাগাং’এর বটতলী বাজারে থাকতাম তখন। শিমু কেবল হাটা শিখেছে। ভাড়া বাসায় থাকতাম। বাড়িওয়ালা, আশে পাশের বাড়ীর কারোই টিভি ছিল না। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে খাওয়া দাওয়া করে যার যার বাসায় তালা দিয়ে চলে আসতো ছবি দেখতে। সবাই মিলে কত যে ছবি দেখেছি। শাবানার “ভাত দে” ছবিটা দেখে তো প্রথমবার একে বারে সবাই কেঁদে ফেলেছিলাম।”

আমি আম্মার দিকে তাকালাম, “আমি তো সালমান শাহ্‌’র ছবি দেখার জন্য বিটিভি আর ইটিভি নিয়ে বসে থাকতাম। ওর “এই ঘর এই সংসার” ছবিটা দেখার জন্য যে কত দিন বিকালের স্কুল ফাঁকি মেরেছি!”

আম্মা মাথা নাড়ল, “হু। তোর আব্বা তো পারলে পিটিয়ে ছাল চামড়া ছাড়ায় তোদের!... ঐ ছবিটা অবশ্য আমারও অনেক ভাল লাগতো। মালেক আফসারির ছবি। রোজি আফসারি, বুলবুল, সালমান শাহ্‌, আলী রাজ ছিল না?”

মাথা ঝাঁকালাম, “হ্যাঁ। দারুণ অভিনয় করেছিল ওখানে সালমান শাহ্‌ আর রোজি। পুরা জীবন্ত। ক্যান যে মরে গেল.......” আফসোসের গলায় বললাম।

“সালমান শাহ্‌’র পরে তো বাংলা ছবিই পঁচে গেছে। ভাল কেউ আর আসেনি।”

“কেন? ওর আগের নায়কগুলো কি সব ভাল ছিল নাকি?”

“বাপ্পা রাজের কয়েকটা ছবি আছে। জীনের বাদশাহ আর চাঁপা ডাঙ্গার বৌ। শাবানার সাথে করেছিল চাঁপা ডাঙ্গার বৌ। ঐ ছবির শেষে তো একেবারে কাঁদিয়ে দিয়েছিল বাপ্পা। অনেক ভাল অভিনয় জানত। পরে কেন যেন কমার্সিয়াল ছবির দিকে ঝুঁকে গিয়ে সব নষ্ট করেছে।”

“মা মোর সাধ না মিটিল

আশা না ফুরিলো..... এই গানটা আছে না মনে হয় ঐ ছবিটাতে?” হাসলাম।

“হ্যাঁ। ভিলেন কে ছিল মনে আছে?”

“হানিফ সংকেত?” অনিশ্চিত গলায় বললাম।

হাসতে লাগল আম্মা, “হ্যাঁ। মনে আছে তো দেখি তোর সব। টিং টিঙ্গে ভিলেন ছিল হানিফ সংকেত। এটিএম শামসুজ্জামান ছিল শাবানার স্বামী, বাপ্পা রাজের বড় ভাই। দারুণ একটা ছবি ছিল ঐটা।”

আমি মগটা হাতে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বললাম, “বুলবুল রাজ্জাকের অনেক ছবি মনে আছে আমার। বুলবুলের বেস্ট যেই ছবিটা দেখেছি ওটা হল “সীমানা পেরিয়ে”। জয়শ্রী কবির ছিল নায়িকা; ভারতীয়। মায়া হাজরিকা ছিল নায়িকার মা। সাইক্লোনের সময় নায়িকা আর নায়ক একটা দ্বীপে আটকা পড়ে। বুলবুল ছিল তোঁতলা। চরম অভিনয় করেছিল ঐ ছবিতে। জয়শ্রী কবিরও। কাহিনীটাও চরম। এই এক কাহিনী ভেঙে যে পরে কত কাহিনী বানালো এই সময়ের পরিচালকরা! তারপরেও ধারে কাছে যেতে পারে না। ঐ ছবিটার একটা গান তো খুব দারুণ লেগেছিল আমার-

বিমূর্ত এই রাত্রী আমার

মৌনতার সুতোয় বোনা

একটি রঙিন চাদর....”

আম্মা বিস্মিত গলায় বলল, “তোর এত সব নাম মনে আছে!”

উদার ভাবে হাসলাম, “ঐ ছবির সংগীত সুরকার কে ছিল সেটাও মনে আছে; ভূপেন হাজারিকা। গানও গেয়েছিল কয়েকটা।”

আম্মা সোজা হয়ে বসল। বিচিত্র একটা উত্তেজনায় চক্‌ চক্‌ করছে চোখ, “ধাঁধাঁ খেলবি?”

“কি ধাঁধাঁ?” মগটা নামিয়ে কৌতুলহী চোখে তাকালাম।

“ছবির ধাঁধাঁ? আমি কাহিনী কিংবা নাম বলবো, তুই বাকি যা জানিস বলবি?”

দীর্ঘ একটা মুহূর্ত আম্মার দিকে তাকিয়ে রইলাম। চতুর্দশী কিশোরীর মত আম্মা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে, ধীরে ধীরে হাসি ফুটল আমার মুখে, “রাজী।” মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে পড়লাম সোফায় হেলান দিয়ে, “কে শুরু করবে আগে?”

“আমি করি।” আম্মা উৎসাহী গলায় বলল।

“করো।” হাতের আঙ্গুল ফোটালাম প্রস্তুতির ভঙ্গিতে। নিজের চেহারা দেখতে না পেলেও বুঝতে পারছিলাম কৌতুহল আর উৎসাহী একটা হাসি ছড়িয়ে পড়েছে চোখে মুখে।

আম্মা খানিকটা ভেবে নিল। তারপর প্রশ্ন করল, “বুলবুল আহমেদের দুটো ছবির নাম বল।”

“শুভদা আর রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত।” ঝট পট উত্তর দিয়ে দিলাম।

“হয়েছে। এবার তোর পালা।”

“শুভদা ছবিতে কে কে ছিল?” চিন্তা না করেই প্রশ্নটা করলাম।

“আনোয়ারা, জিনাত, বুলবুল, রাজ্জাক, মোস্তফা..... আর মনে পরছে না।”

“নাম ভূমিকায় কে ছিল?”

“আনোয়ারা। ওর নামই শুভদা ছিল। জিনাত ছিল ওর মেয়ে। রাজ্জাক ছিল গ্রামের ছেলে। আর বুলবুল জমিদার।”

“ফুল মার্কস। তোমার মেমোরীতো ভয়াবহ! আচ্ছা জিনাত নাকি কার মেয়ে ছিল বাস্তবে? মানে ছবির কেউ?”

“হ্যাঁ। খালেদা আক্তার কল্পনার মেয়ে। শুরু শুরুতে অনেক হিট করেছিল। পরে আর তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি ছবিতে।”

“আচ্ছা। এখন তুমি প্রশ্ন করো।” হাতপাখা নাড়া শুরু করলাম।

“রাজ্জাক আর ববিতার একটা ছবি আছে। যেখানে ববিতা রাজ্জাককে একটা সিনে ভাত রান্না করে খাওয়ায়, মাড় মাড় ভাত। রাজ্জাক নতুন বিয়ে করেছে, তাও বড়লোকের মেয়ে বলে ববিতাকে কিছু বলতে সাহস পাচ্ছিল না। কেবল ভাতের প্লেট দেখে শুঁকনো মুখে বলে, “তুমি মাড় ফেলতে পারো না?”

ববিতা মুখ কালো করে জবাব দেয়, “আমি তো কখনো রাঁধিনি। কেন? খুব খারাপ হয়েছে বুঝি?”

রাজ্জাক জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে, “নাহ্‌। মাড় মাড় ভাতে ভিটামিন বেশি থাকে। অনেক ভাল হয়েছে। ফাস ক্লাশ!” বৌকে খুশি করতে একগাদা ভাত মুখে নেয় চোখ বন্ধ করে। এই ছবিতে রাজ্জাক থাকে উকিল। আর নায়িকা হল বড়লোক মোস্তফার মেয়ে। ছবির নাম কি?”

গেলাম আটকে। ছবিটা দেখেছি ঠিকই। কিন্তু নামটা মনে করতে পারছি না। খালি মনে পরছে রাজ্জাকের বাপটা শওকত আকবর ছিল। অন্ধ বাবুর্চির অভিনয় করেছিল ওখানে। নামটা কি?

“কি হল? পারবি না?”

“নাহ্‌। মনে আসছে না। দেন-পাওনা?” অনিশ্চিত চোখে তাকালাম।

“হয়নি। টাকা পয়সার নাম নিয়ে ছবি।” হিন্টস ধরিয়ে দিল আম্মা।

সাথে সাথে মনে পড়ে গেল। তুড়ি মারলাম, “টাকা আনা পাই!”

হাসতে লাগল আম্মা, “হয়েছে। এবার তোর পালা।”

প্রশ্ন করার আগে ভেবে নিলাম এবারে, “শবনমের সাথে রাজ্জাকের একটা ছবি আছে। শবনম সেলস্‌ গার্ল থাকে। রাজ্জাক থেকে বড়লোকের ছেলে। ফোনের মধ্যে একটা বিখ্যাত গানও গায় রাজ্জাক। গান আর ছবির নাম বলো?”

সাথে সাথে উত্তর দিয়ে দিল, “নাচের পুতুল ছবি। গানটা হলঃ

আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন,

কপোলের কালো টিপ পড়বে চোখে.......”

“তোমাকে ঠেকানো মুশকিল। প্রশ্ন করো।” নাকের ডগা চুলকালাম।

“সারেং বৌ, জীবন থেকে নেয়া- এগুলোর পরিচালক কে?”

“জহির রায়হান।”

“কে কে ছিল ছবিগুলোতে? আর বিখ্যাত কি কি গান ছিল? মনে আছে?”

“হু। সারেং বৌ’এ ছিল ফারুক কবরী। ওখানে ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানটা ছিল। আর জীবন থেকে নেয়া’তে ছিল আগুনের আব্বা খান আতাউর রহমান, রওশান জামিল, শওকত আকবর, রাজ্জাক, রোজি, সূচন্দা, আনোয়ার হোসেন। ওটাতেই সর্ব প্রথম জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া হয়েছিল।”

“ফুল পয়েন্ট তোর! আমার লাইফে দেখা সেরা ছবি হল ‘জীবন থেকে নেয়া’। ওখানে রওশান জামিলের ছোট দুই ভাই আকবর আর রাজ্জাকের ওপর খবরদারি, আর স্বামী খানাতাউর রহমানের উপর হুমকি ধামকি আর দ্বিতীয় কোনো ছবিতে দেখিনি। পুরো ছবিতে এত সুন্দর করে জহির রায়হান সব খুটি নাটি ব্যাপারগুলো দেখিয়েছিল যে আজও মনে আছে প্রতিটা সিন! কেন যে বাংলাদেশের ভাল ভাল সব পরিচালক গুলো মারা গেল.....” একটা নিঃস্বাস ফেলে বলল, “এখন তোর পালা।”

“ববিতা আর উজ্জ্বলের খুব হিট করা কমেডি একটা ছবি আছে। কি নাম?”

“ইয়ে করে বিয়ে।” আম্মা ফটা ফট উত্তর দিয়ে দিল।                         

আমি হতাশ গলায় বললাম, “সারেং বৌ এর কাহিনীকার কে?”

“শহীদুল্লাহ্‌ কায়সার। শমী কায়সারের বাবা।”

“তোমাকে হারাতে পারবো না! তুমি বলো এখন।” হাল ছেড়ে দেয়ার গলায় বললাম।

“কুয়াশা ছবির নায়ক কে?”

“আনোয়ার হোসেন।”

“সাত ভাই চম্পার মধ্যে রাজার চরিত্রে কে অভিনয় করেছিল?”

“রঙিন না শাদা কালো?” আম্মার দিকে তাকালাম।

“যেটা পারিস।”

“শাদা কালোরটা মনে আছে। কবরী ছিল চম্পা। রাজা ছিল রাজীবের বাবা, রাজ।”

“হয়েছে।”

আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম, “কানের পাশ দিয়ে গেছে! রঙিন সাত ভাই চম্পা’র নায়িকা আর নায়ক চিনি; রোজিন আর সাত্তার। কিন্তু রাজা কে ছিল খেয়াল নেই।”

“রঙিনটায় রাজা ছিল প্রবীর মিত্র। মা ছিল দিলারা।” আম্মা বলে দিল।

“এবার তোমার জন্য প্রশ্ন- ঢাকা ৮৬’ ছবির পরিচালক কে?”

“রাজ্জাক। নায়ক ছিল ও নিজে আর বাপ্পা রাজ। ঐ ছবিটার একটা গান সেই সময় অনেক হিট করেছিল-

আউল বাউল লালনের দেশে

মাইকেল জেকসান আইলোরে

আরে সবার মাথা খাইলো রে

আমার প্রাণের সারিন্দা কাঁন্দে রে....” আম্মা হালকা স্বরে টান দিল গানটায়।

“তোমারে আর প্রশ্ন করা যাবে না!” ক্লান্ত গলায় বললাম।

“নাটক থেকে কর?” চোখ নাচালো আম্মা।

“ওটাতে আমি একেবারেই ডাব্বা মারবো।” হতাশ হয়ে বললাম, “হুমায়ূন ফরিদী, সূবর্না মোস্তফা, আফজাল, খুরশিদুজ্জামান উৎপল, ডলি জহুর, আলী যাকের, সারা যাকের, ত্রপা মজুমদার, ফেরদৌসি মজুমদার, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশীদ- এরা সব তোমাদের আমলের নাটকের মানুষ ছিল। ওদের নাটক কম দেখেছি। আমি হলাম বিপাশা-তৌকির, জাহিদ-মিমি, শমী কায়সারের জামানার পাবলিক!”

“ঠিক আছে। তোর সময়ের একটা নাটক থেকে জিজ্ঞেস করি। বল তো তৌকির আর বিপাশার একটা নাটক ছিল যেখানে তৌকির বড়লোকের ছেলে আর বিপাশা গ্রামের থেকে শহরে পড়তে আসা মেয়ে। তৌকির বিপাশাকে বিয়ে করবে বলে মায়ের সাথে দেখা করায়। কিন্তু পরে মেয়ের বাবা মেয়েকে গ্রামে নিয়ে অন্য ছেলের সাথে বিয়ে দিতে নেয়। তখন তৌকির গ্রামের ছেলে সেজে ওখানে গিয়ে হাজির হয়। বিয়ে বাড়ীতে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে রীতিমত হিরো হয়ে যায়। পুকুর থেকে সোনার চেন তুলে দেয়, প্যান্ডেল টাঙ্গিয়ে দেয় – অনেক কিছু করে। পরে মেয়ের বিয়ে ভেঙে যায়, বরটা সম্ভবত পালিয়ে যায় কিম্বা পুলিশ এরেস্ট করে নিয়ে যায় বিয়ে করতে আসার আগেই। সেই খবর এই বাড়ীতে আসলে মেয়ের বাপ দিশেহারা হয়ে যায়। তখন তৌকিরকে ধরে বিয়ে করিয়ে দেয় মেয়ের সাথে- কোন নাটক?”

সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম, “আশিক সব পারে! আমার ছোট বেলার সবচেয়ে প্রিয় নাটক! তুমি জেনে শুনে জিজ্ঞেস করেছো!”

“এবার তুই প্রশ্ন কর।” হাসল আম্মা।

“পারি না তো।” হতাশ গলায় বললাম।

“তাও যা পারিস বল।”

“আলী রাজ কিন্তু প্রথমে নাটক করতো, পরে সিনেমায় গেছে নায়ক হতে। ওর প্রথম নাটকের নাম কি?”

“ঢাকায় থাকি।” নির্লিপ্ত কন্ঠে বলে ফেলল আম্মা।

আমি হাত তুললাম, “হয়েছে! আর পারবো না তোমার সাথে। তোমার মাথায় ওয়ান টেরা হার্ড ডিক্স বসানো!”

সরল হাসি হাসতে লাগল আম্মা, “আমার কথা বাদ দে। আমার বয়সের সবাই’ই বলতে পারে এসব। কিন্তু তোর মত কয়জন পারবে? তোকে এই জেনারেশনের ছেলে মানায় না। তুই হলি আমাদের জেনারেশনের মানুষ। আমি শিওর এত সব আদিকালের খুটি নাটি কেউ মনে রাখেনি। অনেকে তো জানেই না!”

“আরে দূর! কি সব বলো!” লজ্জ্বা পেলাম হঠাৎ।

“কয়েকটা হিট নাটকের নাম বলতো- তাহলেই ক্লিয়ার হয়ে যাবে। তোর জন্মের দিকের নাটক। যেগুলো পুনঃপ্রচার দেখেছিলি।”

মাথা চুলকালাম, “এ্যঁ? অয়ময়.... সংশপ্তক..... ভাঙন...ছোট ছোট ঢেউ..... কোথাও কেউ নেই....না... আজ রবিবার, সবুজ সাথী..... আর কি? ও! মহানগর! আর.....”

“দাঁড়া দাঁড়া! মহানগর নাটকে কে ছিল মনে আছে?” আম্মা বলে উঠলো।

“হু। তৌকির, বিপাশা, খালেদ খান।”

“খালেদ খানের সেই ডায়লোগটা মনে আছে?”

“আছে। ‘ছিঃ ছিঃ তুমি এতো খারাপ!’” খালেদ খানের সুর নকল করে বলে হাসতে লাগলাম।

“কনফার্ম তুই এই জেনারেশনের ছেলে না!” ঘোষণার ভঙ্গিতে বলল আম্মা, “কারণ তুই এখন কার একটা অভিনেতা অভিনেত্রীর নামও ঠিকমত বলতে পারিস না!”

চুপ হয়ে গেলাম। কথাটা সত্যি। এখনকার কোনো নাটকই দেখি না আমি। সিনেমায় যেমন পঁচন লেগেছে- নাটকে ধরেছে তেমন ক্যান্সার। সবখানে না পঁচলেও অনেকখানি পঁচে গেছে। কথ্য ভাষার হালের ক্রেজ হতে গিয়ে সব নাটকে একই ভাষা ঢুকিয়ে দিয়েছে কয়েকজন পরিচালক। আমার নাটকে অরুচি ধরানোর প্রধান বাবুর্চি তারাই। শুধু আমি কেন- বাংলাদেশের প্রায় সব ছেলে মেয়েদের মাঝেই টিভি বিমুখতা সৃষ্টির জন্য এরা দায়ী। দেশের সত্তর ভাগ মেয়েরা এখন হিন্দী সিরিয়াল “ইস পেয়ার কা ক্যায়া নাম দু” নামক নাটক দেখার জন্য রাত সাড়ে আটটা থেকে ন’টা পর্যন্ত বসে থাকে। এদের আমি দোষ দেই না। দেশীয় সাহিত্যে অরুচি ধরায় সবাই যেমন বিদেশী সাহিত্যের দিকে ঝোঁকে- তেমনি দেশীয় নাটকে অরুচি ধরেছে বলে বিদেশী নাটক, সিনেমার দিকে সবার ঝোঁক পড়েছে। এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু কোথায় যেন একটা অতৃপ্তি থেকে যায়। এত সমৃদ্ধ শিল্প ও শিল্পী ভান্ডার যে দেশের, যে দেশের চলচিত্র এক সময় সমগ্র উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ চলচিত্র ছিল, কালজয়ী সব নাটক দিয়ে ছোট পর্দা মাতিয়ে রেখেছিল- সে দেশের দর্শকরা কেন এখন বিনোদন খরায় ভুগবে?

আমি চুপচাপ আম্মার দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার সামনে বসে থাকা মানুষটা নিখাদ আনন্দে ঠাসা এক শৈশব কাটিয়েছেন। যেখানে আমার দেশের সংস্কৃতি আর শিল্প ছিল। কিন্তু এখনকার শিশুরা যে শৈশব কাটাচ্ছে- সেখানে আমার দেশটা কোথায়? মনের কথার বাউল ভাই কোথায়? কোথায় পারুল? মোস্তফা মনোয়ারের তুলির যাদুকরী আঁচড় দেখার সময় কি মিলবে আমাদের এখনকার বাচ্চাদের হাজারটা কোচিং, টিউশনি আর প্রাইভেটের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে? ইংরেজী শেখার জন্য এখনকার বাবারা কি প্রতি শনিবার মুভি অব দ্য উইক দেখাতে নিয়ে বসে বাচ্চাদের? বিটিভির দশটার ইংরেজী সংবাদ পড়া দেখে কেউ কি তার গ্রামার আর ভকাবুলারি ঝালাই করে নেয় সেই সময় গুলোর মত? কেউ কি এখনো সংশপ্তকের তারিক আনাম হয়ে পরাধীনতার বিরুদ্ধে জেগে উঠবার মত চাঞ্চলতা অনুভব করে রক্তের মাঝে?

প্রশংসা আর উৎসাহ নামক অক্সিজেনের অভাবে আমাদের এত গৌরবের শিল্পগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। টের পাচ্ছি না কেউ। সবাই দোষ দিচ্ছে বাহিরের মত সুন্দর করে কেন বানানো হয় না এসব? কেন? ওদের মত করে করতে হবে কেন? প্রত্যেকটা ধারার স্বকীয়তার শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে; আমাদেরও ছিল। এক সময় তো ওরাই আমাদের অনুকরণ করতো। আমরাই ধ্বংস করে দিচ্ছি হুট করে পেয়ে বসা স্রোতে গা ভাসিয়ে। শুধু পরিচালকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই।

সমাজে ক্যান্সার হলে একাংশ ও একটা সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু শিল্পে ক্যান্সার লাগলে কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত প্রভাব পড়ে।

আমি ধাঁধাঁর খেলা থামিয়ে দিয়ে উঠে চলে এসেছিলাম। বিচিত্র একটা হাহাকার বুকের ভেতরটায় পাক খাচ্ছিল। কেন যেন বড় ইচ্ছে করছিল সারা বাংলাদেশের সমস্ত বাচ্চা কাচ্চা গুলোকে নিয়ে এক সাথে বসে জহির রায়হানের “জীবন থেকে নেয়া” ছবিটা দেখি।

মুগ্ধ হয়ে আমাদের বাচ্চাগুলো দেখবে সেই ছবি। কালজয়ী সৃষ্টি বলে কথা! ওরা অবাক হয়ে বলা বলি করবে, “কি আশ্চর্য! এত সুন্দর ছবি আমাদের দেশে হত!”

ছাদের ওপর বসে হারমনিয়াম নিয়ে বৌয়ের অত্যাচারে অতিষ্ট উকিল জামাই খান আতাউর রহমানের গান শুনে হেসে গড়িয়ে পড়বে সবাই-

 

“দিকে দিকে বাজল যখন

শিকল ভাঙ্গায় গান-

আমি তখন চোরের মত

হুজুর হুজুর করায় রত

চাচা আপন প্রাণ বাঁচা বলে

বাঁচিয়েছি প্রাণ।।

এ খাঁচা ভাঙবো আমি

-কেমন করে?”

 

"জীবন থেকে নেয়া" ছবির একটি দৃশ্যে খান আতাউর রহমান ও রওশান জামিল।

 

"জীবন থেকে নেয়া" ছবির অপর একটি দৃশ্যে রাজ্জাক ও সূচন্দা

 

চিনতে পারছেন? ইনি জহির রায়হান। বাংলাদেশের সফলতম চলচিত্র পরিচালক, কথা সাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক। হাজার বছর ধরে উপন্যাসের কথা তো অনেকেরই মনে আছে। ইনি লিখেছিলেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখ যোগ্য উপন্যাস হলঃ বরফ গলা নদী, আরেক ফাল্গুন, শেষ বিকেলের মেয়ে। তিনি ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বড় ভাইকে (শহীদ বুদ্ধিজীবী শহিদুল্লাহ কায়সার) খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হন। বাংলাদেশ হারায় অসাধারণ এক সাহিত্যিককে।

 

শহীদ বুদ্ধিজীবী স্যার শহীদুল্লাহ কায়সার (জন্ম: ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৬ - মৃত্যু: ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১)। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল আবু নঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি কালজয়ী উপন্যাস "সংশপ্তক"এর লেখক। জহির রায়হান নির্মিত বিখ্যাত চলচিত্র "সারেং বাড়ীর বৌ" এর মূল উপন্যাস তাঁর লেখা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষলগ্নে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তার স্থানীয় সহযোগী আল-বদরের হাতে অপহৃত হন। ধারণা করা হয় যে, অপহরণকারীদের হাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

উৎসর্গঃ

            যারা চলে গেছেন নিঃশব্দে। তাঁদের পদধ্বনি আজও পাওয়া যায়। শ্রদ্ধেয় শহীদুল্লাহ কায়সার, জহির রায়হান ও খান আতাউর রহমান স্যার।

 

Share