আমাদের আকাশে সাদা কালো মেঘ

লিখেছেন - আসিফ শুভ | লেখাটি 923 বার দেখা হয়েছে

অপারেশন থিয়েটারের বাইরে অপেক্ষা করছিলাম। মানুষের মুখে তখন কথার ফোয়ারা। "মেয়েটা কালো হবে? নাকি ফরসা? মা তো অনেক ফরসা, কিন্তু বাবা তো ফরসা না। বাচ্চাটা কেমন হবে কে জানে!" এমন হাজারো অপ্রয়োজনীয় অর্থহীন বাক্য বিনিময়ে ব্যস্ত সবাই।

 

এদিকে আমি তখন অদ্ভুত এক অনুভূতিতে আচ্ছন্ন। বাবা হওয়ার আনন্দ আর আমার মাধবিকে নিয়ে শঙ্কা। ডাক্তার ব্লাড রেডি রাখতে বলেছেন। যে কোনো কিছু ঘটতে পারে...

চুপচাপ বসে ছিলাম। মনে পড়ছিলো তখন- নয় মাস আগে আমি মাধবিকে বলেছিলাম, "আমি যদি তোমাকে কিছু উপহার দিতে চাই, তুমি কি নিবা?"

এমন একটা প্রশ্নের উত্তরে ও কিছু বলতে পারেনি। শুধু লজ্জা মিশ্রিত হাসিতে আমাকে জানিয়ে দিয়েছিলো, ও চায়.. ও নিজেও আমাকে উপহার দিতে চায়।

মনে চিন্তার চলছিলো তখন। আমার ভাবতে অবাক লাগছিলো, উপহার পাচ্ছি দুজনাই, কিন্তু কষ্টটা পেতে হচ্ছে শুধু মাধবি কে। এই এতোদিন, এই দীর্ঘ নয় মাস অনেক কষ্ট পেয়েছে ও। আর এখন? একেবারে জীবন নিয়ে টানাটানি। সৃষ্টিকর্তার এটা কেমন নিয়ম?? 

যদি ও মরে যায়, তাহলে আমি কি করবো? আমি কিভাবে বাচবো? আমাদের মেয়েটার কি হবে? আমি আর ভাবতে পারছিলাম না। থেমে যাওয়া সময় আর নির্মম বাস্তবতা তবু আমাকে বারবার ঐসব ভাবতে বাধ্য করছিলো।

হঠাত কান্নার আওয়াজে চমকে উঠলাম। না, এটা কোনো নবজাতকের কান্না না। আমাদের পাশের কেবিনের এক মহিলা কাঁদছিলো। লোক মুখে শুনলাম, মৃত শিশু জন্মে দিয়েছে সে।

এ ঘটনায় পরিবেশ কিছুটা থমথমে হয়ে গেলো। সবাই একবার করে আমার দিকে তাকালো। চিন্তাটা তখন আমার মনেও। আমাদের মেয়েটার কিছু হবে না তো??

মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম। নিজের অজান্তেই আমার দুহাত তখন মোনাজাতের ভঙ্গিতে চলে এসেছিলো। মাধবির পেটে কান রেখে যার নড়াচড়ার আওয়াজ শুনেছিলাম এতদিন, সেই শিশুকে অনুভব করার চেষ্টা করছিলাম। আমার সন্তান...

এসব ভাবতে ভাবতে অপারেশন থিয়েটার থেকে একজন নার্স বেরিয়ে এলো। তার কোলে একটা ফুটফুটে পরীর মতো মেয়ে! আমার মেয়ে! আমি অবাক হয়ে চেয়ে থাকলাম।

নার্স অনির্দিষ্ট ভাবে প্রশ্ন করলো, বাচ্চার বাবা কোথায়??

আমি এগিয়ে গেলাম। আমার মেয়েটাকে আর এক নজর দেখেই পাল্টা প্রশ্ন করলাম, ওর মা??

নার্স হেসে উত্তর দিলো, বাচ্চার মা একদম সেইফ!

তবে আমি উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা করিনি। মেয়েকে একবারো কোলে না নিয়ে ততক্ষনে ঢুকে গেছি অপারেশন থিয়েটারের মধ্যে!

মাধবি শুয়ে আছে! মুখে একটু একটু হাসি। ডাক্তার আমাকে বললেন, কংগ্রাচুলেশন! মা ও মেয়ে দুজনেই সুস্থ আছে! 

আমার কি যে ভালো লাগছিলো!! সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না! নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ মনে হচ্ছিলো।

এরপর আমি যখন অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে আসলাম, তখন আমার ছোট বোন আমাকে বললো, "সারাদিন ভাবির কাছে থাকলে কি চলবে? উফ! ভাইয়া তোমার, মতো মানুষ আমি কখনো দেখি নাই! পিচ্চিটাকে এখন পর্যন্ত একবারো কি কোলে নিছো??"

আমি হাসলাম! হাসি ছাড়া আমার মুখে তখন আর কিছুই ছিলো না। পরম আদরে কোলে নিলাম আমার ছোট্ট মেয়েটাকে! আমার সুখের নতুন উৎস!

আর ওদিকে উপস্থিত আনন্দিত মানুষের ভীড় থেকে একটা বাক্য বার বার ভেসে আসছিলো- "ছেলেটা খুবি বউ পাগল!"

মিথ্যা বলবো না, শুনতে ভালোই লাগছিলো!

বেশ কিছুক্ষণ পর মাধবিকে কেবিনে আনা হয়েছিলো। দুর্বল শরীর নিয়ে বিছানায় পড়ে ছিলো ও। আর ওর বুকের উপরে আমাদের সন্তান। সত্যি বলছি, আমার দেখা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দৃশ্য এটা! ওর মুখের প্রশান্তি দেখেই বুঝেছিলাম, মাতৃত্বের ব্যাপকতা কতো বিস্তৃত।

তারপর? তারপর সুখের এক নতুন অধ্যায়ের সুচনা করলাম আমরা! সারাটাদিন কেটে যেতো আমাদের ছোট্ট পরীকে নিয়ে। কখনো মা-মেয়ের ভালোবাসা দেখতাম চেয়ে চেয়ে! একটু একটু হিংসা হতো! মাকে কাছে পেলে আমাদের মেয়ে তখন আর আমাকেও চিনতে পারতো না! হায়রে দুনিয়া! মিথ্যা মিথ্যা অভিমান করতাম ওদের উপর...

আবার কখনো কখনো পিচ্চি পরীর ভালোবাসায় নিজেই সিক্ত হতাম!

আর আমাদের, মানে আমার আর আমার প্রেয়সীর একান্ত সময়গুলো তো চির অমলিন!

মেয়েকে নিয়ে মাধবি আমার সাথে কত্তো কিছু করতো! মাধবিকে নিজের নাম ধরে ডাকলে উত্তর নিতো না, কথা বলতো না। এমনকি প্রেমময় কোনো কিছু বলে ডাকলেও ও না শোনার ভান করতো! কিন্তু যদি বলতাম, বাবুর আম্মু? আমার পরীর আম্মু?

তখন ও সাথে সাথে উত্তর নিতো! দাঁত বের করে বলতো, বলো বলো শুনছি!!

এভাবেই চলতো আমাদের ২৪ ঘন্টা। কিন্তু এরপর সুখের দিনগুলোকে পেছনে ফেলে ২ বছর পর আমি পিএইচডি করতে আমেরিকা চলে গেলাম। আমি চলে গেলাম বললে ভুল হবে। আসলে সুযোগটা পাওয়ার পর মাধবি আমাকে একপ্রকার জোর করেই পাঠিয়ে দিলো আমেরিকাতে। আমাকে ও বোঝালো, "মাত্রতো অল্প কয়েকটা দিন! ভবিষ্যতে আমাদের সুখের জন্য এখন না হয় একটু কষ্ট করি?"

এইতো... তারপর চলে যাওয়া। মাধবিকে ছেড়ে, আমার পরীকে ছেড়ে.. পরবাসে.. উন্নত জীবিকার স্বার্থে। 

অবশ্য বিদায় মুহুর্তে মাধবি নিজেই খুব কেদেছিলো। কিভাবে জানি না, আমাদের মেয়েটা হয়তো কিছু বুঝেছিলো। পরীটাও খুব কেদেছিলো। কিছুতেই আমার কোল থেকে নামছিলো না ও।

বাস্তবতার কাছে সেদিন চোখের জলকে পরাজিত করেছিলাম।

তারপর প্রতিদিন কথা হতো আমাদের। ভিডিও কলিং করে আমার পিচ্চি মেয়েটাকে দেখতাম। ও খেলা করতো। হাসতো। ল্যাপটপের স্ক্রীনে আমাকে দেখতে পেয়ে ল্যাপটপকে ছুঁয়ে দিতো বারবার! আর এসবের মাঝে ওর আম্মুর সাথে আমার কথা তো চলতোই! অফুরন্ত কথা! মুখে মুখে আমরা প্রেমের মহাকাব্য রচনা করতাম!

হঠাত একদিন কল দিয়ে ভিন্ন চিত্র দেখলাম। মাধবি চুপ করে বসে ছিলো। চোখ দুটো ফোলা। উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। অন্যান্য দিনের মতো আমাদের মেয়েকে দেখলাম না আশেপাশে। ভয়ের স্রোত বয়ে গেলো আমার শিরা উপশিরা দিয়ে। বললাম, কি হইছে?? পরী কই?

হঠাৎ করেই মাধবি কান্নায় ভেঙে পড়লো! কাদতে কাদতে ও দৌড়ে চলে গেলো।

আমার তখন পাগল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। একটু পরে স্ক্রীনে আমার ছোটবোনকে দেখলাম। ওর চোখও ভেজা। বললো, "ভাইয়া সব শেষ।"

আমি প্রচন্ড অস্থিরতা নিয়ে বললাম, "মানে? প্লিজ আমাকে বল। কি হয়েছে? আমার পরী কই??"

-নাই।

-নাই মানে? কি বলতেছিস তুই?

-ও মরে গেছে ভাইয়া।

আমি নিজেকে সামলে রাখতে পারলাম না। কি শুনছি, কি হচ্ছে কিছুই বুঝতেছিলাম না। আসলে বোঝার সামর্থ্য আমার ছিলো না। বললাম,

-কি বলতেছিস তুই?? এখুনি পরীকে নিয়ে আয়! আমি দেখবো!

উত্তর না দিয়ে ছোট বোনটাও চলে গেলো। অনেকক্ষণ স্ক্রীনে আমি শুন্য ঘর ছাড়া কিছুই দেখলাম না।

তার একটু পর, একটা কাপড়ে জড়িয়ে আমার মেয়েটাকে ক্যামেরার সামনে আনা হলো।

না, প্রতিবারের মতো ও এবার আর ল্যাপটপটাকে ছুঁয়ে দিলো না। একবারো হাসলো না। ও নীরব, নিথর।

আমার পরীটার চেহারা আগের মতই ছিলো। ঘুমন্ত শিশুর অভিব্যাক্তি ওর চোখে মুখে। তবু কি যেন নেই... ওর মাঝে শুধু প্রান নেই। ও কে ঘিরে নিষ্ঠুর পৃথিবী একটা সত্যের বুলি আউরে যাচ্ছে। ও মরে গেছে। ও মরে গেছে.....

আমার বিশ্বাস হচ্ছিলো না। আমার অনুভূতিগুলো বন্দি হয়ে গেছিলো। আমি আমার আদরের মেয়েটাকে দেখছি কিন্তু ছুঁয়ে দিতে না। দূর থেকে দেখে, মানুষের মুখে শুনে মেনে নিতে হচ্ছে যে ও আর বেঁচে নেই।

নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিলো। খুব জোরে জোরে কাঁদতে ইচ্ছা করছিলো।

হঠাত মাধবির কথা মনে পড়লো। আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় করে গিয়েছিলো তখন। ও তো মা। কাজের ফাকে হয়তো একটু আদর করতে এসেছিলো মেয়েটাকে। কিন্তু তারপর....

মাধবির কাছে তখন আমি নেই। যে ছিলো ওর পৃথিবী হয়ে, সেও হারিয়ে গেলো।

পরে সব শুনেছিলাম। ফ্রীজের পাশে খেলছিলো আমার পরী। খেলতে খেলতে ওর বল চলে গিয়েছিলো ফ্রীজের পেছনে। নিজে নিজে সেখান থেকে বল আনতে যেয়ে.... ইলেক্ট্রিক শক। তখনই আমার মেয়ের মৃত্যু। সেদিনের কথা, সেদিনের অনুভূতি কোনোভাবেই প্রকাশ করা সম্ভব না। সৃষ্টিকর্তা আমাকে সেই ক্ষমতা দেননি। অথবা আমি হয়তো অনুভূতিহীন হয়ে গিয়েছিলাম। যাকে নিয়ে মিষ্টি মিষ্টি ভালোবাসার অনুভূতিগুলো গড়ে উঠেছিলো, সেই তো মরে গেলো....

 

Share