মাধবীর গল্প

লিখেছেন - আসিফ শুভ | লেখাটি 951 বার দেখা হয়েছে

চারিদিকটা ভালো করে দেখে নিলো মেয়েটা। নাহ, ক্লাসে আর কেউ নেই । টিফিন পিরিয়ডে যে যার যার মতো বেরিয়ে গেছে । কেউ ছুটেছে বাইরে খাবার হাতে অপেক্ষমান মায়ের কাছে , আবার কেউবা দুই টাকার খুচরো নোটগুলো সাজাতে সাজাতে পা বাড়িয়েছে ক্যান্টিনের পথে ।

 

অষ্টম শ্রেণীর মাঝারী আকারের রুমটাতে তখন আর কেউ নেই । শুধু ঐ মেয়েটা । নাম মাধবী । নীল সাদা স্কুল ড্রেসটা মলিন হয়ে আছে । ছোট্ট একটা রাবার ব্যান্ড দিয়ে চুলগুলো বাধা তার । চেহারা দেখলেই বোঝা যায় যে মাধবী জীবনে খুব একটা হাসেনি । তবে চেহারায় দুঃখের কোনো ছাপ নেই । অদ্ভুত নির্লিপ্ততা । যেন জীবন নিয়ে তার মাঝে কোনো আবেগ অনুভূতি নেই ।

 

শেষবারের মতো আশেপাশে চোখ বুলালো সে । নিশ্চিত হয়ে এগিয়ে গেলো সবচেয়ে কাছের বান্ধবী নোশিনের ব্যাগের দিকে । তারপর আস্তে করে ব্যাগের চেইন খুললো । পরিচিত একটা ভঙ্গিতে হাত প্রবেশ করালো ব্যাগের মধ্যে । একটু পরে যখন মাধবী তার হাত বের করে আনলো, তখন তার হাতে দুটো দশ টাকার নোট । অন্য হাত দিয়ে নীরবে ব্যাগের চেইনটা লাগিয়ে দিলো ।

তারপর টাকাসহ হাত মুঠোবন্দি করে সে বেরিয়ে গেলো ক্লাসরুম থেকে ।

এটা প্রথম না । মাধবী পুনরাবৃত্তি ঘটায় এই কাজের । আর অষ্টম শ্রেণীর চার দেয়াল সাক্ষী হয়ে থাকে। এই টাকাগুলো মাধবী খরচ করেনা । জমিয়ে রাখে ।

তবে মাধবীকে চোর বলাটা হয়তো ঠিক হবে না । কেনো ঠিক হবে না , তা জানতে হলে জানা প্রয়োজন মাধবীর জীবনকাহিনী । তাহলে শুরু করা যাক মাধবীর গল্প ।

 

মাধবীর মা বাবার লাভ ম্যারেজ হয়েছিলো । পালিয়ে বিয়ে করেছিলো তারা । এদিকে ছেলে মেয়ে কারো পরিবারই এ বিয়ে মেনে নেয়নি । শুরুতে ছোট্ট একটা ভাড়া বাড়িতে সংসার শুরু করে তারা । বিয়ের কিছুদিন পরেই পাল্টে যায় মাধবীর বাবা । সব ভালোবাসা উড়ে যায় কর্পূরের মতো । তারপর শুরু হয় অবহেলার এক রঙা কাব্য । এরই মাঝে মাধবীর জন্ম ।

মাধবীর বাবা একদিন মাধবী ও তার মাকে ফেলে রেখে আসে তার বাবার বাড়িতে । তখন শুরু হয় শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচারিত হওয়ার নতুন অধ্যায় ।

ছোট্ট মেয়ে মাধবীর কথা চিন্তা করে সব সহ্য করতো মাধবীর মা ।

ঠিকমতো খাবার দেয়া হতো না তাদের । ক্ষুধার্ত শিশুকে পর্যাপ্ত খাবার দিতে মাধবীর মা বাধ্য হতো রান্নাঘর থেকে খাবার চুরি করতে ।

সেই শৈশবেই মাধবী দেখেছে যে তার মা তাকে বাচানোর জন্য চুরির পথ বেছে নিয়েছে । আর এভাবেই বড় হয়েছে মাধবী ।

মাধবীর যথন আট বছর বয়স তখন তার মা মারা যায় ।

তারপর থেকে একা একা সংগ্রামের জীবন । জীবন থেকে সে শিক্ষা নিয়েছে । বাচার জন্য তার মা যে পথ অবলম্বন করেছিলো , সে নিজেও এখন সে পথে । মাধবীর মা চুরি করতো নিজের সংসারে । নিজের অধিকারটুকু তাকে চুরি করে নিতে হতো ।

আট বছরের মা হীন একটা মেয়ে এই ব্যাপারটি বুঝতে পারেনি । সে এই চুরিটাকেই বাচার একমাত্র পথ মনে করেছে । চুরির ক্ষেত্রটা সে এলোমেলো করে ফেলেছে ।

মাধবী বইয়ের পাতার অনেক পড়েছে যে চুরি করা মহাপাপ । তবুও এই জাতীয় কথাগুলো মাধবীর বিবেক কে স্পর্শ করতে পারে না । সত্য মিথ্যা ন্যায় অন্যায় এই শব্দগুলোর অর্থ নির্ধারিত হয় পরিবেশ দ্বারা । পৃথিবীর চোখে এমন অনেক অন্যায় কাজ আছে যা স্বর্গে বৈধ ।

তেমনি মাধবীর চারপাশের পরিবেশ অনুযায়ী তার কাছে বিবেকের ব্যপকতা অন্য রকম । সে শুধু জানে তাকে বাচতে হবে । তার পাশে দাড়ানোর মতো নেই । দাদুবাড়ির স্টোররুমটা তার একমাত্র আশ্রয় । এখনো তাকে তার মায়ের মতোই মাঝে মাঝে খাবার চুরি করে খেতে হয় ।

 

স্কুলে মাধবীর চুরি-কাহিনী একসময় প্রকাশিত হয়ে যায় । এলাকার সব মানুষ জেনে যায় । তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয় ।

আস্তে আস্তে আশেপাশের সব ছোটখাটো চুরির দায়ভার মাধবীর উপর এসে পড়ে । মাধবীর পৃথিবীটা সংকুচিত হয়ে আসে ।

সে বুঝতে পারে জীবনের প্রকৃত অর্থ । বুঝতে পারে যে সে এতোদিন যা করতো তা আসলে কি । কিন্তু এখন তো আর কিছুই করার নেই । অপবাদে আর অপমানে মাথা তুলে দাড়ানোর শক্তি হারিয়ে ফেলে সে । একাকী কিশোরী মেয়েটা বাঁচার স্পৃহা খুঁজে পায় না আর ।

 

কিছুদিন পরে কোনো একটা দৈনিকের ভেতরের পাতায় ছাপা হয়: "চুরির অপবাদে এক কিশোরীর আত্মহত্যা ।"

 

হ্যা , মাধবীই সেই কিশোরী । যে মেয়েটা অষ্টম শ্রেণীতে পড়তো । বান্ধবীদের টাকা চুরি করতো ।

 

মাধবীর পড়ার বইয়ের মাঝে একটা আলাদা কাগজ পাওয়া যায় । সেখানে লেখা ছিলো :

"মা তো আমাকে খাবারের সন্ধান দিয়ে গেছে । কিভাবে টাকা পাওয়া যায় , তাও আমি জানি । কিন্তু চুরি করে কি ভালোবাসা পাওয়া যায় ? কেউ আমাকে ভালোবাসে না কেনো ? সবাই আমাকে দূরে ঠেলে দেয় । মা যদি আমাকে একটু আদর ভালোবাসা চুরি করার উপায় শিখিয়ে দিতো , তাহলে কতোই না ভালো হতো ..."

 

Share