বিকেল থেকে সন্ধ্যা এবং শেষ থেকে শুরু

লিখেছেন - আসিফ শুভ | লেখাটি 2112 বার দেখা হয়েছে

সময়টা বিকেল। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে নদীর তীরে বসে আছে।

বর্ষার শেষ। নদী এখন পূর্ণরূপে। কখনো বাতাস আবার কখনো নৌকার যাত্রাপথ নদীতে ঢেউ তুলছে। ঢেউগুলো আলতো করে ছুয়ে যাচ্ছে ছেলেটা আর মেয়েটার পা।

শরতের সুবাসিত বাতাসে মেয়েটার অশান্ত চুল খেলা করছে ছেলেটার মুখে। আকাশের বুকে মেঘে মেঘে তখন বৃষ্টির আশঙ্কা।

 

কিন্তু এসবের কোনো কিছুই ছেলেটা আর মেয়েটার মনে প্রভাব ফেলছে না। তারা আজ এসেছে কথা বলতে। খুবই সিরিয়াস বিষয়ে। তাদের সম্পর্ক নিয়ে কথা।

 

নার্ভাস এই সময়টাতে প্রকৃতির রূপ অর্থহীন মনে হয়। প্রেমিক প্রেমিকার মিষ্টি নিষ্পাপ কথোপকথনকে ন্যাকামী মনে হয়।

 

এইতো কিছুদিন আগেই এই দুজন এই নদীর তীরেই এসেছিলো। সেদিনটা সুন্দর ছিলো না। গরম আবহাওয়া। সাথে প্রচন্ড রোদ। শুকনো পরিবেশে বিরক্তিকর ধুলোবালির আধিপত্য।

তবুও সেদিন ছেলেটা এভাবে কথা বলেছিলো, "দেখো, এই সোনালী রোদ কত্তো সুন্দর। এই রোদে তোমার চুলগুলো দারুন লাগছে। বিউটিকুইনদের মতো।"

মেয়েটা হেসে বলেছিলো, "তোমার কাছে আমার চুল কখন সুন্দর লাগে না শুনি?"

সন্ধ্যার কিছুটা আগে ছেলেটা আরো বলেছিলো, "তুমি গোধুলী দেখেছো? এই ধুলোবালি আর সূর্যাস্তের আভা যখন এক সরলরেখায় আসবে, দেখবে কত্তো মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি হয়!"

তারা দুজন হাত ধরে নদীর তীরে অনেকটা পথ হেটেছিলো সেদিন। সুখ-স্বপ্নে বিভোর ছিলো তারা।

 

আজ তারা এখনো নীরব। মেয়েটার মন খারাপ। ছেলেটা চিন্তিত, কৌতুহলী। হয়তো তারা মনে মনে তাদের কথাগুলো সাজিয়ে নিচ্ছে।

 

বেশ কিছুদিন ধরেই একটা ঝামেলার মধ্যে আছে তারা। প্রশ্ন এখন সম্পর্কটার অস্তিত্ব নিয়ে। সম্পর্কটা হয়তো থাকবে না আর। আজ একটা মীমাংসা হয়ে যাবে।

 

সেই কলেজ লাইফ থেকে তাদের প্রেম শুরু। প্রথমে পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, তারপর আরো কাছে আসা, ধীরে ধীরে একে অন্যের মাঝে হারিয়ে যাওয়া, তারপর বুঝতে শেখা যে এটাই ভালোবাসা। তারপর... তারপর একই সাথে স্বপ্ন দেখার শুরু।

 

প্রতিদিন তারা দেখা করতো। ফুচকা খেতো। তারপর একসাথে রিকশায় উঠে রিকশাওয়ালাকে বলতো, "এক ঘন্টা চালান। যেদিকে আপনার ইচ্ছা। এক ঘন্টা পর আবার এই জায়গায় নিয়ে আসবেন!"

 

এই বর্ষাকাল তাদের অনেক প্রিয় ছিলো। সময় সুযোগ হলেই একসাথে বৃষ্টিতে ভিজতো তারা। কখনো পাশাপাশি বসে রিকশায় চড়ে বৃষ্টিতে ভিজতো, আবার কখনো হাত ধরে হাটতে হাটতে।

 

তাদের দেখে অন্য মেয়েরা ঈর্ষান্বিত হয়ে বলতো, "ইস! আমাকে যদি কেউ এতো ভালোবাসতো!"

আর অন্য ছেলেরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতো, "হায় রে। এ জীবনে কেউ আদর করে কখনো একটু কথাও বললো না।"

 

এভাবেই এগিয়ে চলছিলো তাদের মধুর সম্পর্ক। হঠাত্‍ একটা ঘটনা পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। সম্পর্কটা কি আর টিকে থাকবে?

 

আজ নদীর তীরে বসে পুরোনো স্মৃতিগুলো খুব মনে পড়ছে ছেলেটার। হয়তো মেয়েটারও এসব মনে পড়ছে। হয়তো এগুলো আর কখনো ঘটবে না। তবু কিছুই করার নেই। আজ তাদের পথের একটা সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে।

 

সম্পর্কে ভাঙনের মেঘ ইতোমধ্যেই দেখা দিয়েছে। হয়তো দুজনের চোখে বৃষ্টি দিয়েই সব কিছু, সব সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে। অথবা অন্য কিছু...

 

তাই আজ মেয়েটা এখানে আসতে বলেছে ছেলেটাকে। এ বিষয়ে তাদের আগেও কথা হয়েছে। মেনে নিতে হয়েছে সবকিছু। তবু মুখোমুখি কথা বলার স্বার্থেই আজ এখানে তাদের আসা।

 

 

ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে।

মেয়েটা তার হাতের কাপড়ের ব্যাগটা ধরিয়ে দিলো ছেলেটার হাতে।

 

ছেলেটা জানতে চাইলো, "কি এর মধ্যে?"

 

মেয়েটা উত্তরে বললো, "তুমি আমাকে এতোদিন যত গিফট দিয়েছো , সব এখানে আছে। তোমার দেয়া ড্রেস, শোপিস সব।"

 

ছেলেটা অবাক ও করুন চোখে তাকিয়ে থাকলো মেয়েটার দিকে। তারপর নদীর দিকে তাকিয়ে ছেলেটা বললো, "তাই বলে তুমি এগুলো আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছো?"

 

মেয়েটা এবার নড়েচড়ে বসলো। বললো, "দেখো ছেলে, তোমাকে আমি কিছু বাস্তব কথা বলতে চাই।"

 

ছেলেটা নীরব।

মেয়েটা আবার বলতে শুরু করলো, "তুমি তো জানো যে বাবা আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে অন্য জায়গায়। তাই আমাদের এই সম্পর্ক আর রাখতে চাই না।"

 

দূরের ছোট্ট পাল তোলা নৌকার দিকে ঘোলাটে দৃষ্টি রেখে ছেলেটা বললো, "ওহ।"

 

মেয়েটা বললো, "বুঝতেই পারছো। আমি আর তোমার গার্লফ্রেন্ড হয়ে থাকতে পারছি না। so..."

 

ছেলেটা মেয়েটার দিকে তাকালো। মন খারাপের সুরে বললো, "so কি? এইজন্য এই গিফ্টগুলো ফেরত দিতে এসেছো?"

 

আজ মেয়েটা এই প্রথম হাসলো। বললো, "না জবাব। so আমি তোমার গার্লফ্রেন্ড হয়ে থাকবো না। আমি.. আমি.. আমি তোমার বউ হবো। প্লিজ আজই আমাকে বিয়ে করো। প্লিজ। আমি চলে এসেছি।"

তারপর লজ্জিত মুখে মেয়েটা বললো, "এই জন্যই তোমার দেয়া ড্রেসগুলো সঙ্গে এনেছি। তোমার ঘরে যেয়ে তোমার দেয়া ড্রেসগুলোই পড়বো!"

 

ছেলেটা বিস্ময় আর আনন্দে হতবাক! বহুকষ্টে গলা দিয়ে স্বর বের হলো, "সত্যি??!!"

 

মেয়েটা মিষ্টি হেসে বললো, "জি!"

 

তারপর উঠে দাড়ালো তারা। হাটতে শুরু করলো নদীর তীর ধরে। এখন তারা তাদের আগামীকালের চিন্তায় বিভোর।

 

প্রকৃতিটাকে আবার অদ্ভুদ সুন্দর লাগছে। সূর্য বিদায় নিয়েছে। কাল যখন আবার সূর্য উঠবে, তখন হয়তো ছেলেটা আর মেয়েটা নতুন এক পরিচয়ে একে অপরকে আলিঙ্গন করে থাকবে।ভ

Share