অনুভূতির ঠিকানা

লিখেছেন - আসিফ শুভ | লেখাটি 1007 বার দেখা হয়েছে

নদীর তীর ধরে হেটে চলেছি আমরা দুজন। আমাদের আর নতুন কোনো গন্তব্য নেই। আমরা আমাদের ঠিকানায় পৌঁছে গেছি। আমার ঠিকানা মাধবী। মাধবীর ঠিকানা আমি। তবু আমরা হেটে চলেছি। উদ্দেশ্য একে অপরকে সময় দেয়া। কিছু গল্পের মাঝে আরো একটিবার সুখের পরিকল্পনা করা। হয়তো পরিকল্পনা করার এটাই শেষ মূহুর্ত। কারন, আবার তিনদিন পর যখন আমাদের দেখা হবে, তখন তা এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের সময়। সুখ সাগরে নিজেদের ভাসিয়ে দেয়ার সময়। তখন কি আর পরিকল্পনা করার অবসর থাকবে?

 

হ্যা, তিনদিন পর আমাদের বিয়ে। সবাই জানে এটা হবে arrange marriage. কিন্তু, আমরা দুজন জানি, শুধু আমরা দুজন জানি, এটা Love marriage.

 

আমাদের সম্পর্কের শুরুটা প্রায় ছয় বছর আগে। এই ছয় বছরে আমরা অনেক হেসেছি, অনেক কেঁদেছি। হাতে হাত রেখে ঘুরে বেড়িয়েছি কতো নির্জন প্রান্তরে। ফোনে কথা বলেছি সারারাত। প্রতিরাতে কথা বলার একপর্যায়ে হয়তো মাধবী বলতো, "অনেক রাত হয়েছে। এখন বিদায় দাও। bye বলো।"

আমি তখন বলতাম, "আর একটু! প্লিজ জান।"

এভাবে কথা বলতে বলতে একসময় রাত বিদায় নিতো। সূর্য উঠতো। তবু আমার আর মাধবীকে বিদায় দেয়া হতো না।

 

এরকম ফোনালাপের মাঝেই মাধবী একদিন ধরা পড়ে গেলো ওর মায়ের কাছে। সেই রাতে ওর মা জেনে গেলো আমার নাম। এটাও জানলো যে শুভ নামের ছেলেটা তার মেয়েকে রাত বিরাতে ফোন করে। স্বাভাবিকভাবেই আমার সম্পর্কে তার মনে একটা খারাপ ধারনা জন্মে গেলো।

 

এদিকে দিন চলে যায়। আমাদের লেখাপড়া শেষ। দুজনেই job শুরু করেছি তখন। সম্পর্কের পরিণতি প্রয়োজন। কিন্তু আমরা ভালোভাবেই জানতাম যে আমাদের সম্পর্কটা মেনে নেওয়া হবে না। কারন মাধবীর পরিবার আমাকে ভালো চোখে দেখে না। তারা অবশ্য আমাকে খুব বেশি চিনতো না। তখন পর্যন্ত তারা আমাকে দেখেনি। শুধু জানতো যে মাধবীর এক বন্ধুর নাম শুভ। ছেলেটা ভালো না। রাতের বেলায় ফোন করে।

মাধবী শতচেষ্টা করেও তাদের মনে আমার সম্পর্কে কোনো ভালো ধারনা আনতে পারেনি।

 

অবশেষে আমরা একটা সহজ সরল পথ ধরলাম। ব্যাপারটা অনেক ঝুকিপূর্ণ ছিলো। তবুও ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়েছিলাম।

আমি আমার পরিবারে সবকিছু জানিয়ে দিলাম। আমার বাবা মা খুশিমনেই রাজি হলেন।

তারপর বিয়ের প্রস্তার পাঠানো হলো মাধবীর মা বাবার কাছে। একেবারেই formal proposal. ভাবখানা এমন, বাহ মেয়েটা তো খুব সুন্দর, গুণবতী। মেয়েটাকে আমাদের ঘরের বউ করতে চাই। আমাদের ছেলেও ভালো। আপনারা রাজি থাকলে কথাবার্তা বলতে চাই!

 

আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন! মাধবীর বাবা মা আমাকে পছন্দ করলেন। ছেলে পছন্দ করা মানে আমার যোগ্যতায় তারা সন্তুষ্ট হলেন! এখন মেয়ে রাজি থাকলে কথাবার্তা বলা যায়!

 

এদিকে আমিও মাধবীকে নানান রকম অভিনয় শিখিয়ে দিলাম।

একদিন মাধবীর মা মাধবীকে বললেন,

-খুব ভালো একটা পাত্র পেয়েছি। এবার আর অমত করিসনা মা। তুই একটু দেখ।

মাধবী বললো,

-নাম কি? কি করে??

মাধবীর মা বললেন,

- ছেলের ডাকনাম শুভ। আর্কিটেক্ট!

মাধবী ভ্রু কুচকে বললো,

-শুভ?? না আম্মু। এই নামের ছেলেরা ভালো হয় না। তুমি তো জানো, শুভ নামের একটা বাজে ছেলে আমাকে রাতে ফোন করতো।

মাধবীর মা ভীত কন্ঠে বললেন,

-ছি মা! এভাবে বলতে হয় না। নাম এক হলেই কি মানুষের স্বভাবচরিত্র এক হয়? এই ছেলেটা সত্যি খুব ভালো। এই শুভর সাথে ঐ বাজে ছেলেটার তুলনাই হয় না!

মাধবী চেহারায় চিন্তার রেখা এঁকে বললো,

-হতে পারে। ছবি দেখাও। ভেবে দেখবো।

মাধবীর মা ওকে আমার ছবি দেখালেন। ছবি দেখে মাধবী বললো,

-পাগল পাগল চেহারা। তবে খারাপ না। চলে!

মাধবীর মায়ের মুখে তখন বিশ্বজয়ের হাসি। আর মাধবী তখন অট্টহাসি আটকে রাখতে ব্যস্ত!

 

কিছুদিন পর আমরা মেয়ে দেখতে গেলাম। সাথে আমিও ছিলাম। একটু পর আমাকে আর মাধবীকে আলাদা একটা রুমে কথা বলতে দেয়া হলো। যেন কথা বলে আমরা নিজেদের একটু চিনে নিতে পারি!

আলাদা ঐ রুমে ঢুকে প্রথমেই আমি মাধবীকে বললাম,

-hi! কেমন আছেন?

মাধবী রেগে বললো,

-থাক থাক! আর acting করতে হবে না! যথেষ্ট হয়েছে!

আমি হেসে বললাম,

-সবকিছু ok তো?

মাধবীর স্টাইলিশ উত্তর,

-জি জনাব!

 

ঐদিনই আংটি পরানো হলো মাধবীকে। বিয়ের দিন তারিখও ঠিক হয়ে গেলো।

 

সেই রাতে আমরা ফোনে কথা বলছিলাম। চিন্তামুক্ত হয়ে অনাবিল প্রশান্তি বুকে নিয়ে গল্প করছিলাম আমার প্রেয়সীর সাথে। মনের উচ্ছাসের মাত্রা ছিলো বেশি, আর তার বহিঃপ্রকাশও ঘটলো একটু অতিরিক্ত! তাই এক পর্যায়ে রোমান্টিক সুরে মাধবী বলে ফেললো,

-তুমি কবে আমাকে তোমার ঘরে নিয়ে যাবা?

 

এবার ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। ঠিক এই বাক্যটাই শুনে ফেললো মাধবীর মা!

এটা শুনে তো মাধবীর মায়ের হার্ট ফেইল করার মত অবস্থা! যেই মেয়ের আজ বিয়ে ঠিক হয়েছে, সেই মেয়ে কিনা রাত দুটোয় ফোনে কাউকে এমন কথা বলছে! কি সর্বনাশ!!!

 

মাধবীর মা জানতো যে তাদের হবু জামাই শুভর সাথে আজই মাধবীর প্রথম কথা হয়েছে। তাই সেই রাতেই এতো অন্তরঙ্গ কথা তাকে বলা অসম্ভব! তাহলে নিশ্চয় অন্য কেউ! অন্য কোনো ছেলের সাথে কথা বলছিলো মাধবী!

মাধবীর মা ভাবলেন যে মেয়ের মতিগতি সুবিধার না! অঘটন ঘটতে পারে! বিয়ে ভেঙে যেতে পারে। না না! এতো ভালো পাত্র হাতছাড়া করা যায় না!! তাই তিনি মাধবীর মোবাইল কেড়ে নিলেন। বললেন যে বিয়ের আগে আর মোবাইল দেয়া হবে না!

মাধবী অসহায়। কিছুই বলতে পারেনি এর প্রতিবাদে। নীরবে সহ্য করেছে।

 

বিয়ের তখনো সাতদিন বাকি। পরদিন মাধবীর এক বান্ধবীর কাছে আমি ঘটনা শুনলাম। আমার তো পাগল হবার অবস্থা! সাতদিন কথা না বলে থাকবো কিভাবে?

ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমিও নীরব থাকার চেষ্টা করলাম। বহুকষ্টে চারদিন পার করলাম। কিন্তু আর থাকতে পারলাম না। হবু জামাই হিসেবে মাধবীর মাকে ফোন করলাম। (উল্লেখ্য, দুইটা নাম্বার ব্যবহার করতাম)

কুশলাদি বিনিময়ের পর বললাম যে আমি মাধবীর সাথে একটু কথা বলতে চাই। আমাকে কথা বলতে দেয়া হলো। আর আমি তখনি ওকে আসতে বললাম নদীর তীরে।

 

হাজার হাজার অজুহাত দেখিয়ে এক বান্ধবীর সাথে আজ বের হয়েছিলো মাধবী। বান্ধবী এখন বিদায় নিয়েছে।

 

আমরা দুজন হাটতে শুরু করলাম নদীর দিকে। হাটতে হাটতে আমরা এগিয়ে গেলাম। একসময় নদীর জল আমাদের পা স্পর্শ করলো। হঠাত্‍ মাধবী থেমে গেলো।

আমি বললাম,

-থেমে গেলে কেনো?

মাধবী বললো,

-আর কোথায় যাবে? নদীতে ডুবে যাবো তো!

আমি হেসে বললাম,

-সেই কবেই তো ডুবে গেছি! আর ডুববো না!

ও অবাক হয়ে বললো, কোথায় ডুবেছো?

 

মাধবী তখন আমার উত্তরের প্রতিক্ষায়। আর অস্তগামী সূর্যটাও ক্ষনিকের জন্য দিগন্তে ঝুলে থাকলো আমার উত্তর শোনার জন্য। ঝরে পড়া গোলাপের শেষ পাপড়িটা আমার উত্তরের অপেক্ষায় প্রেমময় সৌরভ ছড়িয়ে দিলো। মাধবী তখনো অদৃশ্য অস্থিরতা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো।

আমি একটু হেসে উত্তর দিলাম,

-ডুবেছি তোমার হৃদয়ের নদীতে!

মাধবী নিজের উচ্ছাসটুকু লুকিয়ে বললো,

-যত্তোসব আজগুবি কথা!

 

 

রহস্যময় সেই আলো আধারীতে ঠোঁটে কিছু স্নিগ্ধতা নিয়ে মায়াবী নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে যাই দুজন। 

 

আমরা এখনো আমাদের হাত স্পর্শ করে হেটে চলেছি। নদীর এক প্রান্ত ধরে। স্বপ্ন দেখার এ পথ শেষ হবার নয়..

 

Share