প্রতীক্ষার অন্তরালে

লিখেছেন - আসিফ শুভ | লেখাটি 1045 বার দেখা হয়েছে

মৌরি ও আসিফ। চলুন, আমরা দেখে আসি, বিভিন্ন মানুষের চোখে এদের কেমন মনে হয়।

 

মৌরির মাঃ "আমি মৌরির আম্মু। আমার মেয়ে এইবার কলেজে ভর্তি হয়েছে। কলেজ, কোচিং, প্রাইভেট স্যার- সব জায়গাতেই আমি মৌরির সাথে যাই। ইদানিং খেয়াল করছি, একটা ছেলে আমাদের রিকশার পিছে পিছে আসে। পর পর ৩-৪ আমি এটা লক্ষ্য করলাম। ছেলেটা মৌরির দিকে কেমন করে যেন তাকায় থাকে। আমার চোখে চোখ পড়লেই তখন অন্যদিকে মাথা ঘুরিয়ে নেয়। সেদিন বাসায় ফেরার পর আমি মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি ছেলেটাকে চিনো? তোমাদের কলেজের ইউনিফর্ম পরা ছিল।

মৌরি যেন আকাশ থেকে পড়লো। বললো, কোন ছেলে? আমি তো কাউকে দেখি নাই।

মৌরির কথার মাঝে অন্য রকম সুর ছিল। আমি আমার মেয়েকে বিশ্বাস করি। তবু সন্দেহের শুরু বোধহয় তখন থেকেই।"

 

কাহিনীর স্বার্থে আমরা এবার শুনবো মৌরিদের বাড়ির সামনের চায়ের দোকানদারের কথা।

 

চা ওয়ালাঃ "হ হ! এক পোলা রোজ এইহানে আসে। ওই যে তিনতলা দালান। হেই দিকেই তাকায় থাকে। ওই বাড়ির আম্মাজান যহন বিকালে বাইরে হাটতে যান, তহন পোলাডা আসে। হা কইরা তাকায় থাকে। আমার মনে হয়, পোলার মতলব ভাল না। ওই বাড়িত একটা মাইয়া থাকে। সুন্দরী। হের পিছনেই লাগছে। তয়, যা করার করুকগা, আমার দুকানে বইয়া চা খাইলে আমি কুনো আপত্তি করমু না! হে হে!"

 

এবার আমরা শুনবো মৌরির এক বান্ধবীর কথা।

 

মৌরির বান্ধবীঃ "আসিফ? ফালতু একটা ছেলে। মেয়েদের পিছে পিছে ঘুরে বেড়ায়। কিছুদিন আগে এক মেয়ের পিছে ছিল। আর এখন সে মৌরিকে দেখলেই পিছু নেয়! ইডিয়ট কোথাকার!"

 

মৌরিদের প্রতিবেশি এক সদ্য অবসর প্রাপ্ত পুলিশ অফিসার যিনি কিনা সারাদিন পত্রিকা পড়েন আর একটু পর পর রাস্তার মানুষ দেখেন। এবার আমরা শুনবো তার কথা।

 

প্রতিবেশিঃ "ছেলেটাকে প্রায় দেখি। দেখে তো ভদ্র ঘরের ছেলে মনে হয়। আজ কালকার মা-বাবারা যে কি করে! নিজেরা ভদ্র লোক কিন্তু এদিকে সন্তান হয়ে গেছে ইভ-টিজার। মেয়েদের বাড়ির সামনে দাড়ায় থাকতে এদের লজ্জা করে না? পুলিশের হাতে এদের ছেড়ে দেয়া উচিত।"

 

মৌরির বড় ভাইয়ের সাথে আসিফের অল্প স্বল্প পরিচয় আছে।

 

বড় ভাইঃ "আসিফ ছেলেটাকে খারাপ মনে হয় না। তবে সত্যি সত্যি যদি ও আমার ছোট বোনের দিকে ওভাবে তাকায়, তাহলে ওর খবর আছে। আমি ভালোর ভালো, খারাপের খারাপ!"

 

এখন পর্যন্ত ঘটনা স্বাভাবিক পর্যায়েই ছিলো। তবে ঘটনা সামান্য জট পাকালো আসিফের এক বন্ধুর বক্তব্যে।

 

আসিফের বন্ধুঃ "আসিফ খুবই ভাল ছেলে। কিন্তু মৌরির সাথে আসিফের ব্যাপারটা যে কি, তা আমরা কেউই বুঝতে পারি না। আসিফ আমাদের কিছু বলতেও চায় না। বেশ কিছুদিন আগে মৌরি আমার কাছে আসিফের মোবাইল নাম্বার চেয়েছিলো। হ্যা, মৌরি নিজেই আসিফের মোবাইল নাম্বার চেয়েছিলো। যাই হোক, আমি আসিফকে কথাটা বললাম। এই কথা শুনার পর থেকেই আসিফ কেমন যেন হয়ে গেছে। সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে। বিকালে মাঠে আর খেলতে আসে না। পুরাই আজব!"

 

এবার দেখা যাক, আসিফের মা কি বলেন।

 

আসিফের মাঃ: "আমার ছেলেটার যে কি হলো? সারাদিন মন খারাপ করে থাকে। লেখাপড়া করে না একটুও। কয়দিন আমাকে বললো, আম্মু, মানুষ এমন কেনো?

আমি বললাম, মানে কি? তোর কি হয়ছে? আমাকে বল বাবা।

আসিফ আর কোনো জবাব দেয়নি। এরপর থেকে চুপ হয়ে গেছে।"

 

আসিফের বড় বোন আসিফের চেয়ে মাত্র ১ বছরের বড়। ওরা বন্ধুর মতো। তাহলে শোনা যাক, আসিফের বোনের কথা।

 

আসিফের বোনঃ "মৌরি নামের মেয়েটা আমার ভাইকে ফোন করছিলো। আমার মনে হয়, মৌরিকে আমার ভাই একটু একটু পছন্দ করে। কারন সেদিন ওরা ফোনে খুব আস্তে আস্তে কথা বলছিলো! সেদিন মৌরি ফোন করে কি বললো, এটা ও আমাকে কিছুতেই বলছে না। বুঝেছি যে কাহিনী ঘটে গেছে! কিন্তু কোনপক্ষ যে ব্যাপারটা ঘটালো, কে জানে! হিহিহি!"

 

অনেক কথাই তো আমরা জানলাম। তবে মনের মাঝে অনেক প্রশ্নও জমা হয়েছে। আসিফ কি চায়? কি তার উদ্দেশ্য? মৌরি কেনো আসিফকে ফোন করলো? ফোনে মৌরি কি এমন বললো?

আলো আধারীর মাঝে এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো অনুমান করা যায়, তবে কখনই নিশ্চিত হওয়া যায় না।

 

পাঠক, ভয় নেই! একটু পরেই আপনাদের আলোর মুখ দেখাবো! তবে সে আলো গরম কালের অসহ্য আলো, নাকি শীতকালের প্রত্যাশিত আলো, তা এখুনি বলবো না!

 

এবার আমরা শুনবো মৌরি ও আসিফের নিজের কথা! প্রথমেই আসিফ!

 

আসিফঃ "মৌরি আমার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু আমার দোষটা কথায়? আমি শুধু মৌরির কাছে কিছু কথা জানতে চাই।"

 

আমরা আসিফের কাছে আবার একটু পরে আসবো। এখন শুনবো মৌরির কথা।

 

মৌরিঃ "আমি আসিফকে বলতে পারবো না। এটা হয় না, এটা সম্ভব না। আমি জানি, ও খুব কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু আমার কিছুই করার নেই।"

 

আমরা আবার ফিরে আসছি আসিফের কাছে।

 

আসিফঃ "মৌরি কেন আমার কথা একটুও চিন্তা করছে না? ও কেন বুঝছে না যে কথা গুলো না জানা পর্যন্ত আমি ঘুমাতে পারবো না। আমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে আছে।"

 

প্রিয় পাঠক, আর একবার আমরা শুনবো মৌরির কথা।

 

মৌরিঃ "আসিফকে আমি কথা গুলো কখনই বলবো না। আচ্ছা, আমি বিষয়টা স্পষ্ট করে বলছি।

মাধবি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। হ্যা, মাধবি। আসিফের সাথে মাধবির ২ বছর ধরে ভালোবাসার সম্পর্ক। সত্যি বলছি, ওদের মতো এতো পবিত্র আর মিষ্টি ভালোবাসা আমি কোথাও দেখি নাই। ওদের সম্পর্কের কথা আমি ছাড়া আর কেউ জানতো না। কিন্তু ভাগ্য খারাপ। কিভাবে যেন মাধবির বাবা মা জেনে গেলেন সব। মাধবির বাবা চাকুরির কারনে থাকেন অন্য শহরে। আর মাধবির মা নিজে এখানে একটা চাকুরি করতেন। আসিফ আর মাধবিকে নিয়ে সব কিছু জানার পর একাকি এই শহরে মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে মাধবির মা কোনো ঝুকি নিতে চাননি। তাই নিজের চাকুরি ছেড়ে দিয়ে উনি মেয়েকে নিয়ে শহর ছেড়ে চলে গেলেন। এর মাঝে মাধবিও বুঝতে পারে যে বাবা মাই তার সব কিছু। এটা সত্য, মাধবি আসিফকে অনেক অনেক ভালোবাসে। তবু যে সম্পর্ক শুধুই অনিশ্চিত আবেগের, তার জন্য বাবা মা কষ্ট দিতে পারবে না সে। এই কারনে চলে যাওয়ার আগে আসিফের সাথে মাধবি আর কোনো যোগাযোগ করেনি। মাধবি মোবাইল নাম্বার বদলে ফেলেছে। আমাকে বার বার বলেছে আমি যেন আসিফকে যোগাযোগের কোনো উপায় বলে না দেই সাময়িক সুখের জন্য ও ওর নিজের আর আসিফের জীবনটা নষ্ট করতে চায় না। ও কাদতে কাদতে বলেছে, আমি আমার ভালোবাসার মানুষের কাছে ক্ষমা চাইবো না। যদি সৃষ্টিকর্তা চায়, তাহলে একদিন না একদিন আমরা মিলবোই। তখন হয়তো আর কোনো বাধা থাকবে না।

আমি সেদিন আসিফকে ফোন করে এই কথা গুলোই বলেছিলাম। তারপর থেকেই আসিফ খুব ভেঙে পড়েছে। বার বার মোবাইল নাম্বার অথবা ঠিকানার খোজে আমার পিছে ছুটছে। প্রতিটা মূহুর্ত। হায়রে ভালোবাসা। আমি পারবো না আসিফ। আমাকে মাফ করে দিয়ো। দোয়া করি, জীবনের কোনো এক বাকে তোমরা আবার মুখোমুখি হও। তারপর, চিরস্থায়ী বন্ধনে নিজেদের বেধে নাও।"

 

গল্পটা এখানেই শেষ। মৌরি তার কথা রেখেছে। আর আসিফ বাস্তবতা মেনে নিয়ে অপেক্ষার পথ বেছে নিয়েছে। বসে বসে মাধবির স্বপ্ন আকে সে। লাল, নীল, সবুজ- রঙিন সব স্বপ্ন। 

..............

 

Share