ধরণী কাঁপিয়া উঠিলো! অতঃপর...

লিখেছেন - আসিফ শুভ | লেখাটি 1134 বার দেখা হয়েছে

মোবাইলে গল্প করতেছিলাম মাধবির সাথে। কত্তো রকম গল্প। আস্তে আস্তে প্রেমিক রূপে আবির্ভূত হচ্ছিলাম। কন্ঠে রোমান্টিক মুড আনয়ন করে বললাম, জান, আমি তোমাকে খুব.......

 

কথা শেষ করতে পারলাম না। মাধবি প্রচন্ড জোরে চিৎকার দিলো- আম্মুঊঊউউউ!!!

 

ঘটনা কি হলো বুঝলাম না! যাই হোক, পরিস্থিতি শান্ত করতে বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে ঠিক আছে! আর বলবো না!

 

এদিকে মাধবির থামাথামি নাই! চিৎকার করেই চলেছে, ও আম্মু, তাড়াতাড়ি এদিকে এসো!

 

 আমি করুণকন্ঠে বললাম, আহা.. আন্টিকে বলার কি দরকার? একটু মনের কথা প্রকাশ করবো, তাতেও এতো বাধা? মাধবি, এ তোমার কেমন বিচার??

 

মাধবি বললো, হ্যা আম্মু! বাইরে! তাড়াতাড়ি! গেট খোলো!

 

আমি নিশ্চিন্ত হলাম! তার মানে আমাকে নিয়ে কিছু না! মাধবির বাসায় মনে হয় কোনো গেস্ট এসেছে! তাই গেট খুলতে এতো তাড়াহুড়া!

 

মাধবি তখনো বলেই যাচ্ছে- তোমরা এখনো কেউ খেয়াল করো নাই? ইস রে! হ্যা! হ্যা! অনেকক্ষন ধরে! তাড়াতাড়ি গেট খোলো!

 

আমি এবার মনে মনে খুব রেগে হলাম। হিংসা হচ্ছিলো! কে আসছে যে মাধবিকে এতো উতলা হতে হবে???!!

 

ইতোমধ্যে, শব্দ শুনে বুঝলাম যে ওরা গেট খুলে নিচে নামতেছে সেই অতিথিকে রিসিভ করার জন্য।

 

রাগে, ক্ষোভে, হতাশায় সিদ্ধান্ত নিলাম, এ জীবন আর রাখবো না! যেই জীবনে মাধবি অন্য কারো জন্য উতলা হয়, সেই জীবন আমার দরকার নাই!!! এর থেকে মরে যাওয়াই ভালো।

 

এসব সিরিয়াস চিন্তা করতে করতেই হঠাত আমার খাট, চেয়ার টেবিল সহ নিজেই দুলে উঠলাম!!! ভূমিকম্প হলো মনে হয়! আমি চিতকার করে উঠলাম, আল্লাহ! রহম করো! এ যাত্রায় বাচিয়ে দাও! রহম করো প্লিজ!

 

বলতে বলতে বাইরে বের হয়ে গেলাম! তখন অনুধাবন করতে পারলাম যে মাধবি কেনো এতো উতলা হয়েছিলো! 

 মাধবি কল কেটে দিয়েছে। মনের মাঝে খটকা লাগলো? আমি কেনো মাধবিদের এতো পরে ভূমিকম্প টের পেলাম? এটা এক রহস্য। হয়তো গভীর মনোযোগ দিয়ে মাধবির চিৎকার শুনতেছিলাম, তাই এই অবস্থা! অথবা অন্য কিছু। অবশ্য বিগত দিনের ছোটোখাটো ভূমিকম্পগুলোতে আমি কিছুই বুঝি নাই!! এবার বড় ভূমিকম্প হলো, তাই হয়তো একটু দেরীতে হলেও বুঝেছি! টিউব লাইট!!!

হঠাত আমার মনে হলো, আচ্ছা, সত্যি সত্যিই কি ভূমিকম্প হইছে? নাকি এটা আমাদের মনের কল্পনা?

 

যেই ভাবা, সেই কাজ, ফেসবুকে লগিন করলাম! মানুষের স্ট্যাটাস দেখে নিশ্চিন্ত হলাম যে সত্যি ভূমিকম্প হয়েছে! আহা! ডিজিটাল যুগের কত্তো সুবিধা!

 

কয়েকটা স্ট্যাটাস শেয়ার না করলেই না!!

অসম্ভব রূপবতি এক ললনাকে দেখলাম স্ট্যাটাস দিয়েছে! তার প্রোফাইল ছবিটা আবার সেইরকম! আই মিন, ঐরকম!! আরেহ্! ঐ ঐরকম! বুঝতে হবে!! এ জন্যই হয়তো জনৈক কবি বলেছেন,

 

"পড়ে না চোখের পলক!

কি তোমার প্রো পিকের ঝলক!"

 

যাই হোক, সেই ললনা লিখেছেঃ wowww!!! Its earthquake! Really amazing! oh God! Thanx a lot for this joss shaking! :D ohh! Ami ekhono believe korte partesi na! Ami.. Ami earthquake feel koresi! Yahooooo!! Friends, its party time! C'mon!

 

এক ডিজুস বালক লিখেছেঃ polapainzzz! Amar loge vab marish??!! Toder shobar moddhe amar new mobile Da best! Its awesome man!! Mobile a vibration diya rakhsilam! Sei vibration a amar pura room kaipa utse! Prothom deikhai bujhsilam, mobile dar moddhe ekta Dj Dj vab ase! Hehe! Uncle usa theke ei mob pathaise! Ki? Togo hingsha hoy? Hehe! Keu eiram mobile pabi na!

 

আমি আবার বাস্তবে ফিরে আসলাম। রাস্তায় আমরা আতংকিত জনতা দাড়িয়ে আছি।

রাস্তায় দাড়িয়ে থাকা এক মেয়ে চিৎকার করতেছিলো- বাবা, ও বাবা। এতো লেট হয় কেনো? প্লিজ তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ির বাইরে এসো!

 রাস্তার পাশের দোতলা বাড়ি থেকে এক মধ্য বয়স্ক লোকের কন্ঠস্বর ভেসে এলো- আসছি! সব ঘরের লাইট ফ্যান বন্ধ করতে হবে না? প্রতিমাসে এতো এতো বিদ্যুৎ বিল দিতে গেলে আর বেঁচে থাকা লাগবে না! বুঝলি?......

 

ধীরে ধীরে রাস্তায় মানুষজন কমে গেলো। আশেপাশে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয় নাই। এক পিচ্চি বিরক্ত হয়ে বললো, ধুর! ফালতু ভূমিকম্প! কিছুই হলো না! তাহলে কেন কষ্ট করে ভূমিকম্প দেখতে বাইরে আসলাম? ভাবছিলাম, কত্তো কিছু হবে! ধুর!

 

কিছুক্ষন পর আমরাও ঘরে ফিরে আসলাম। রিলেটিভদের ফোন আসা শুরু হয়ে গেলো! সবাই বেচে আছে! আমার মাধবিও ঠিক আছে। 

 

হঠাৎ প্রচন্ড কান্নাকাটির শব্দ শুনলাম পাশের বাসায়। আহারে। কেউ বুঝি সন্তানহারা হলো, কেউ তার ভাই হারালো, কেউ তার বাবা হারালো। বিষাদময় এ পৃথিবী...

 

যাই হোক, পাশের বাসায় গেলাম। পিচ্চি মেয়েটা কাদছে। আমি আমার উপস্থিতবুদ্ধি দিয়ে সব বুঝে নিলাম। সমবেদনা জানিয়ে জানতে চাইলাম, আঙ্কেল তখন কোথায় ছিলেন? ইসসস রে, বড় ভালো

মানুষ ছিলেন।

 

ঐ বাসার আন্টি বিরক্ত হয়ে বললেন, এই ছেলে, উনি ভালমানুষ ছিলেন? এখন কি উনি আর ভালমানুষ নাই? কেন? তুমি মেয়েদের সাথে গল্প করে বেড়াও, এটা উনি দেখে ফেলেছেন, তাই উনি এখন খারাপ?

 

আমি তো হা হয়ে গেলাম! বলে কি??!!

 

তখন যা জানলাম, তা হলো, আসলে ঘটনা এটা না, আঙ্কেল ভালোই আছেন। ভূমিকম্পের সময় আন্টির পিচ্চি মেয়েটা ঘুমাচ্ছিলো। সে কিছুই বুঝে নাই। ঘুম ভাঙার পর সবার মুখে ভূমিকম্পের কথা শুনে সে এখন বায়না ধরেছে, সেও ভূমিকম্প দেখবে! এই জন্যই এতো কান্নাকাটি!

 

কিছুক্ষন পর এক ফ্রেন্ড ফোন করলো। সে আনন্দিত হয়ে বললো,

 

-দোস্ত, ভূমিকম্পের মাত্রা ছিলো ৬.৮! বিশাল ব্যাপার, তাই না? আমার মনে হয়, কলেজ বিল্ডিং ভেঙে গেছে! তার মানে, কালকের ম্যাথ কুইজ হবে না! দারুন খবর!

 

আমি বললাম, হ! তুই ঐ আশাতেই থাক! তবে এমন হলে মন্দ হতো না!

 

এভাবেই কেটে গেলো সময়। মাধবিকে ফোন করলাম। ও আবেগের সাথে বললো, ওগো, তুমি আমাকে এতো ভালবাসো? ভূমিকম্পের সময়ও তুমি আমাকে ভালবাসার কথা বলেছো! আমি আগে কখনো বুঝিনি যে তুমি আমাকে এতটা ফিল করো। ভূমিকম্পে আমি ভয় পাচ্ছিলাম, তখন তোমার ভালবাসা আমার সাথে ছিলো। ভালবাসার কথা বলে সাহস দিয়েছো! আহা! তুমি এতো ভালো কেনো?

 

আমি হঠাৎ কিছু না বুঝে বললাম, মানে কি?

 

তারপর বুঝতে পেরে আবার সাথে সাথেই বললাম, ও হ্যা হ্যা! খুব ভালবাসি।

 

Share