এ আমার সহজ স্বীকারোক্তি..

লিখেছেন - আসিফ শুভ | লেখাটি 903 বার দেখা হয়েছে

জানালা খোলা রেখেই আমরা রাতে ঘুমাই। তাই প্রতিদিন সকালে একমুঠো সোনালী রোদ এসে আমাদের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে যায়। আমরা দুজন মানুষ উঠে বসি। আমি আর মাধবি একে অপরের দিকে তাকাই। মাধবির আকুতিমাখা চোখ দুটো আমি দেখি। কিছু বলার জন্য নড়ে ওঠা অস্থির ঠোট দুটোও আমি দেখি। আরো কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলে হয়তো আমার মাঝে আকুতি আসতো, আমিও অস্থির হতাম। কিন্তু সে সুযোগ আর নিজেকে দিতে পারি না। মনে পড়ে যায় অফিসের মিটিং এর কথা, কিংবা বন্ধুদের সাথে গেট টুগেদার করার কথা। ব্যস্ত হয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ি।

 

আমি আবার সেই চোখ আর সেই ঠোট দেখতে পাই ডাইনিং টেবিলে। ব্রেকফাস্ট করার সময়। ডাইনিং টেবিলে ওপারে দেখি আমার জীবনসঙ্গিনীর করুণ চাহনী। আরো কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলে হয়তো আমারো ইচ্ছে করতো মাধবিকে খুব আপন করে কিছু সময় কাটাতে। কিন্তু সে সুযোগ আর নিজেকে দিতে পারি না। মনে পড়ে যায় ঢাকা শহরের ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যামের কথা।

 

হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলে উঠি- "আমি যাচ্ছি। সাবধানে থেকো। বাই।"

 

এ কথা বলে আমি যখন দরজা দিয়ে বের হয়ে যাই, তখন শুনতে পাই, পেছন থেকে স্নেহমাখা কন্ঠে ও বলছে- "দুপুরে ঠিকমত খেয়ে নিও প্লিজ। নিজের প্রতি খেয়াল রেখো।"

 

আচ্ছা, কথাগুলো বলার সময় ও কি কাঁদে? কি জানি.... অত কিছু খেয়াল করার সময় কোথায়?? আমি ব্যস্ত মানুষ...

 

 

মাধবিও চাকরী করে। আমি বের হয়ে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষন পর ও বের হয়। আসলে আমাদের অফিস টাইম একই। কিন্তু বিভিন্ন কাজের যৌক্তিক কিংবা অযৌক্তিক অজুহাতে আমাকে প্রতিদিন আগে আগে চলে যেতে হয়।

 

দুজনারই অফিস টাইম শেষ হয় বিকাল পাঁচটায়। মাধবি তখনই বাসায় ফিরে আসে। আমার জন্য রান্না করে। রান্না শেষে আমার পথ চেয়ে বসে থাকে।

 

আর তখন আমি হয়তো কোনো ক্যাফেতে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় ব্যস্ত। রাজনীতি, ক্রিকেট কিংবা সাম্প্রতিক কোনো ইস্যু নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তুলি। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে(!) অতি মূল্যবান বাক্য বিনিময় করি। অথচ যে আমার সবচেয়ে আপন, তাকে দিব্যি ভুলে যাই। কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করছে, এটা আমার মনেই পড়ে না।

 

আচ্ছা, আমার কি মন আছে? আমি কি কাউকে মন দিয়েছিলাম? কি জানি.... এত কিছু ভাবার সময় কোথায়?? আমি ব্যস্ত মানুষ।

 

এভাবে বাসায় ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে যায়। মাঝে মাঝে মাধবিকে কিছু না জানিয়ে একদল বন্ধু নিয়ে বাসায় হাজির হই। মাধবি তখন খুব বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়। ও কে নতুন রান্না করতে হয়। বাড়তি কষ্ট।

 

আবার মাঝে মাঝে আমি বাইরে থেকেই খেয়ে আসি। তখন মাধবির ঐ একবার রান্না করাই বৃথা। বৃথা কষ্ট।

 

ঘুমানোর আগে মাধবি একা একা টিভি দেখে। আমাকে ও ডাকে- "আসো, আমরা একসাথে একটা মুভি দেখি।"

 

আমি কিছু বলি না। ও দ্বিগুন উত্‍সাহ নিয়ে আবার বলে, "খুউউব রোমান্টিক মুভি! প্লিজ তুমি আসো।"

 

আমি মাধবির রোমান্সে ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। ওর ঠোট দুটো আবারো কিঞ্চিত নড়ে ওঠে। আরো কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলে হয়তো আমারো ইচ্ছা করতো ওর কোলে মাথা থেকে মুভি দেখতে আর দুষ্টু মিষ্টি রোমান্স করতে। কিন্তু সে সুযোগ আর নিজেকে দিতে পারি না। মনে পড়ে যায় রাজনীতির আর্টিকেল লেখার কথা। আবেগশূণ্য হয়ে টিভি রুম থেকে বের হয়ে যাই।

 

আচ্ছা, ও কি মন খারাপ করল? কি জানি... এত কিছু ভাবার সময় কোথায়? আমি ব্যস্ত মানুষ।

 

তারপর.. তারপর কোনো একসময় ঘুম।

 

এই তো... এটাই আমাদের ডেইলী রুটিন।

 

প্রেম ভালোবাসা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। সুখপাখিটাও আর আমাদের ঘরে তার একটা সাদা পালক ফেলে যায় না। ভুল করেও না।

 

ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, ভালোবাসার জায়গাটুকু দখল করে নিয়েছে যান্ত্রিকতা। হয়তো আরো বিলাসিতার খোঁজে আমার এই ব্যস্ততা।

 

কিন্তু যে জীবনে ভালোবাসার আদান প্রদান নেই, সেটাকে তো জীবন বলা যায় না। বিলাসিতা কিংবা দারিদ্র্য- দুটোই সেখানে অর্থহীন।

 

যখন গাছের ডালে জোড়ায় জোড়ায় কিছু পাখি কিচির মিচির করে, তখন আমারো সাধ জাগে। ইচ্ছে করে মাধবিকে নিয়ে ঐ নীলাকাশে উড়ে যাই... প্রাণ ভরে ভালবাসি আমার ভালবাসাকে....

 

ভালবেসেই মাধবিকে বিয়ে করেছিলাম। এই যে এখন আমি বদলে গেছি, এটা নিয়ে ও কোনোদিন কোনো কথা বলেনি। আমি রাগ করলেও ও এটাকে ভালবাসা মনে করেছে। আর কখনো এক বিন্দু ভালবাসা পেলেই আনন্দে কেদে ফেলেছে।

 

 

অফিসে বসে বসে এসব ভাবছিলাম। নিজেকে কেমন যেন এলোমেলো মনে হচ্ছিলো। প্রচন্ড অপরাধবোধ কাজ করছিলো নিজের ভেতর।

 

ঘড়ি দেখলাম। দুপুর তিনটা বাজে। সিদ্ধান্ত নিতে এক সেকেন্ডও দেরী হলো না। অফিস থেকে বেরিয়ে গেলাম। চলে আসলাম সরাসরি বাসায়!

 

আজ আমি ভালোবাসবো! সত্যিকার অর্থেই মাধবির প্রেমিক হবো! সেই আগের মতো...... নিজের মনেই হাসলাম। কি একটা সিনেম্যাটিক ডায়ালগ দিয়ে দিলাম!!

 

একটু পরেই সিরিয়াস হলাম। কিন্তু কিভাবে শুরু করা যায়? মাধবি বাসায় ফিরবে দুইঘন্টা পর। হাতে যথেষ্ট সময় আছে। যেই ভাবা সেই কাজ! দেড়ঘন্টা পরিশ্রম করে প্লান রেডি করলাম। খিচুরি রান্না করলাম। সাথে ডিম আর ইলিশ মাছ ভাজা।

 

 

এবার অপেক্ষার পালা। কখন আসবে আমার মহারাণী?

 

সাড়ে পাঁচটার সময় মাধবি ফোন করলো আমাকে। বেশ অবাক হলাম। ভয়ও হলো। প্লান যেন ভেস্তে না যায়!

 

ফোন ধরলাম।

 

 

মাধবি শুরুতেই খুব উত্তেজিত স্বরে বললো,

 

-শুভ!! ডাকাতি!! সব শেষ!

 

আমি বললাম,

 

-ডাকাতি?? মানে কি? কি বলছো এসব?

 

মাধবি এবার ফিসফিস করে বললো,

 

-আমি বাসায় এসে দেখি, দরজায় তালা নেই। কিন্তু ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। ভেতরে মানুষের চলাফেরার শব্দ। আমি তখনি দৌড় দিয়ে রাস্তায় চলে আসছি। আমার খুব ভয় করছে। প্লিজ তুমি এখনি আসো। প্লিজ!

 

 

বহুকষ্টে হাসি আটকালাম! গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করলাম। বললাম,

 

-আরে ধুর! চোর ডাকাতের আর খেয়ে দেয়ে কাজ নাই, আমাদের বাসায় আসবে!! ওটা ইদুরের দৌড়াদৌড়ির শব্দ। আর তুমি নিজেই আজ তালা লাগাতে ভুলে গেছো। তুমি কি শিওর, তুমি সকালে তালা লাগাইছো?

 

শেষের কথাটা জোর দিয়ে বললাম।

 

মাধবি কান্না কান্না কন্ঠে বললো,

 

-জানি না। আমার কিছুই মনে পড়ছে না।

 

আমি মিটিমিটি হাসলাম! এইতো চাই! অভয় দিয়ে বললাম,

 

-তুমি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছ। বাসায় যাও। রেস্ট নাও। আমি একটু পরে আসবো।

 

আমার এমন নির্লিপ্ত ভঙ্গি দেখে মাধবি রাগ করে ফোন কেটে দিলো।

 

এদিকে আমি দরজা ভেতর থেকে আন-লক করে রাখলাম যেন বাইরে থেকে ধাক্কা দিলেই দরজা খুলে যায়।

 

দরজার এপাশে আমি একটা গোলাপ হাতে দাড়িয়ে আছি। রোমান্টিক একটা দৃশ্য!

 

বেশ কিছুক্ষন পর দরজা খুলে গেলো। আমি গোলাপটা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু একি??!!

 

 

আমার সামনে দাড়িয়ে আছে প্রতিবেশি নীলা ভাবি! আর তার পেছনে মাধবি। এই মেয়েটা ভয় পেয়ে নীলা

 

ভাবিকে সাথে নিয়ে আসছে!

 

 

আমি তো বিস্ময়ে হতবাক! সারপ্রাইজ দিতে যেয়ে নিজেই বোকা বনে গেলাম!

 

গোলাপটা লুকানোর অবকাশ পাইনি। নীলা ভাবি আমার হাত থেকে গোলাপ টা নিয়ে বললো,

 

-আহা! আমার জন্য! শুভ, ইউ আর ভেরি রোমান্টিক!

 

একথা বলে সে হাসতে লাগলো। আর মাধবিকে বললো,

 

-যাও যাও! ভেতরে যাও! তোমার ডাকাতের কাছে যাও! আমি গেলাম!

 

 

এদিকে আমি লজ্জায় শেষ! মাধবির দিকে তাকাতেও পারছি না। নীলা ভাবি চলে যাওয়ার পর মাধবি অভিমানী কন্ঠে বললো, "বাহ! খুব ভালো। ভালোই নাটক করলে।"

 

লজ্জা ভেঙে আমি বললাম, "আমার কাছে কিন্তু আরো একটা গোলাপ আছে! নিবা না?"

 

মাধবি লজ্জায় লাল হলো এবার। মিষ্টি করে হেসে বেডরুমে চলে গেল।

 

সে রাতে আমরা একসাথে খেলাম। মাধবি আমার রান্নার বেশ প্রশংসা করলো।

 

খাওয়া শেষে মাধবি একটা খাতা বের করলো। খাতাটা আমার হাতে দিতে বললো, উত্তর চাই!

 

আমি খাতা খুললাম। এতদিন আমি ওর সাথে কি কি খারাপ ব্যবহার করেছি, তার বিস্তারিত তালিকা! ১৭৪টা পয়েন্ট! আমি দুই বার ঢোক গিললাম!

 

মাধবি আবারো মিথ্যা অভিমান করে বললো, এগুলো কেনো করেছ এতদিন আমার সাথে? আমি উত্তর চাই!

 

ওর চোখে মুখে স্পষ্ট ভালবাসা...

 

 

আমি মাধবির সামনে হাটু ভেঙ্গে বসে পড়লাম। হাসতে হাসতে হাত জোর করে বললাম- সখি, ক্ষমা কর আমায়। ভালবাসা ভিক্ষা দাও!

 

মাধবিও হেসে ফেললো! বললো- পারবো না! ভালবাসা খুচরা নাই!

 

এভাবেই আমাদের নতুন জীবনের শুরু। পারস্পারিক ভালোবাসার পুনর্জন্ম হলো আমাদের মাঝে।

 

সত্যি মেয়েরা এমনই হয়। ওরা ভালবাসার দেবী...

 

 

এরপরদিন অফিস শেষে পুরোনো অভ্যাসবশত আমি চলে গেছিলাম বন্ধুদের আড্ডার স্থানে।

 

চায়ের কাপে উড়ন্ত ধোয়া দেখা যাচ্ছিলো। দেখলাম বন্ধুদের ঠোটগুলো নড়ে উঠছে নতুন কোনো ইস্যু নিয়ে। আরো কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলে হয়তো আমারো ইচ্ছা করতো আড্ডা দিতে। কিন্তু সে সুযোগ আর নিজেকে দিতে পারি নাই। মনে পড়ে গেলো আমার মাধবির কথা। উঠে পড়লাম আমি। গন্তব্য: মাধবির কাছে।

 

আচ্ছা, ওরা কি আমাকে বউপাগল বললো? কি জানি... এত কিছু শোনার সময় কোথায়?? আমি প্রেমিক মানুষ!

 

 

 

Share