বৃষ্টি শেষের গান

লিখেছেন - রেজা শাওন | লেখাটি 698 বার দেখা হয়েছে

লেখার শুরুতেই কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের তৃতীয় ব্যাচের ক্যাডেট, মুক্তিযোদ্ধা লেঃ কর্নেল(অবঃ) খাইরুল আলম বেলাল ভাইকে। ভাইয়া অশেষ ধন্যবাদ,এই সময়ের একজনকে সেই সময়ে নিয়ে যাবার জন্য।

আমার মা’র কথা

আমার মা’র জন্য আমাকে প্রায়ই বিব্রত হতে হয়। বিশ্বাস করুন প্রায়ই হতে হয়। বিশেষ করে ছুটি শেষে কলেজে ফেরার সময়। মা আমাকে বিদায় দিতে রেলষ্টেশন পর্যন্ত চলে আসেন । আমি সব সময়ই চাইতাম যাতে বিদায় পর্বটা অন্তত বাড়িতেই শেষ হোক।

মাকে আমি কখনোই বোঝাতে পারিনি যে,আমি এখন অনেক বড় হয়েছি। কলেজ ফার্স্ট ইয়ারে যারা পড়ে, তাদের মা’রা এভাবে স্টেশন পর্যন্ত চলে এলে ফার্স্ট ইয়ারে পড়া ছেলেরা লজ্জা পায়। মা অবশ্য কখনোই তার ছেলের লজ্জার ধার ধারেননি। মা ব্যস্ত হয়ে দোয়া ইউনুস পড়েন। আমার মাথায় ফুঁ দেন। আমি লজ্জা পাই। অপেক্ষা করি, ট্রেনের জন্য। ট্রেনটা এসে পড়লে বেঁচে যাই। এভাবে এতো লোকের সামনে এতো বড় একটা ছেলেকে এভাবে কেউ দোয়া পড়ে মাথায় ফুঁ দেয়?

 

কিন্তু শেষের দিকটায় কেন যেন আমার অনেক খারাপ লাগতো। আমার মনে হত বড় হয়ে যাওয়াটা মোটেই ভাল কিছু না। আমার মা যখন স্টেশনভর্তি লোকের সামনে আমার গায়ে ফু দেন, তখন আমার লজ্জা লাগে ঠিকই কিন্তু নাম না জানা একটা অনুভূতি চারপাশ থেকে আমাকে ঘিরে ধরে। আমার নিজেকে খুব নিরাপদ মনে হয়।

 

আমার ট্রেন চলে আসে। আমি ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে মা’কে হাত নাড়িয়ে বিদায় দিই। ট্রেন চলতে শুরু করার পর আমাদের মাঝে দূরত্বটা বাড়তে থাকতো। ট্রেনটা ধীরে ধীরে তার গতি বাড়াতো, আমি দেখতাম ধীরে ধীরে আমার মা ছোট হয়ে আসছেন। একটা সময় দূর থেকে মাকে দেখা যেত বিন্দুর মত। ট্রেনটা মোড় ঘুরে অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত আমার মা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকতেন।

আমি এরপরও অনেকটা সময় হাতল ধরে ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতাম। চলন বিলের বুক চিড়ে রাজশাহী মেইল ছুটে চলতো। বিলের একরাশ ভেজা বাতাস আমার চুল এলোমেলো করে দিয়ে যেত। আমি সেই বাতাসে আমার মাকে খুঁজতাম। আমার মা’র শরীরের গন্ধ আর বাতাসের সেই গন্ধ এক ছিল। আমি কখনো আলাদা করতে পারি নি।

 

কিছু দিন ধরে আমার চার পাশে সব অপরিচিত গন্ধ। চলন বিলের বাতাসে আমি আমার মা’র গন্ধ খুঁজে পাই না। নিজেকে আমার খুব অনিরাপদ মনে হয়।

 

২৬ মার্চ ১৯৭১,ভোর ৫টা

কালিতলার হাট, রংপুর-বগুড়া মহাসড়ক।

 

২৩ ব্রিগেড হেড কোয়ার্টার রংপুর থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি সাঁজোয়া দল রওনা হয়েছে বগুড়ার দিকে। এ দলের অধিনায়ক মেজর এজাজ বেগ। ব্রিগেড কমান্ডার আবদুল্লাহ মালিক খুব ঠাণ্ডা ভাষায় মেজর এজাজ বেগকে ব্রিফ করেছেন, কিভাবে বগুড়াকে ‘ডার্টি ব্লাড’ মুক্ত করতে হবে। প্রিয় পাঠক,ব্রিগেডিয়ার আব্দুল্লাহ মালিক সেই লোক যার নির্দেশে ২৮ মার্চ একদিনেই বৃহত্তর রংপুর এলাকায় ৬০০ বাঙালীকে মারা হয়েছে। রংপুরবাসীর শোকের সেই গল্পটা পরে একদিন বলা হবে।

 

মেজর এজাজ বেগ যখন বগুড়া শহরের উপকণ্ঠে তখন তার দলের উপর প্রথম আক্রমণটি হলো। শোনা গেছে স্থানীয় থানা লুট করা হয়েছে। অস্ত্র সব চলে গিয়েছে সিভিলিয়ানদের হাতে। এজাজ বেগ ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তিত। তার কাছে খবর আছে, ওসি মোয়াজ্জেম নামের লোক থানার সব অস্ত্র সিভিলিয়ানদের দিয়ে দিয়েছে। একটু আগে পর পর তিন রাউন্ড গুলি ছোঁড়া হয়েছে এজাজ বেগের জিপের দিকে। এজাজ বেগ তার দলকে থামালেন না। যারা এলোমেলোভাবে গুলি ছুঁড়ছে, তারা সংখ্যায় কত সেই ধারণা এই মুহূর্তে তার কাছে নেই। তারা কখন কোথায় থাকে এজাজ বেগ সেটাও জানেন না। এছাড়াও এজাজ বেগের ভয়ের আরও কারণ আছে। ২৫ তারিখ দুপুরের দিকে এই এলাকার লোকেরা একজন তরুণ ক্যাপ্টেনসহ পাক আর্মির পুরো এক কোম্পানি সৈন্যকে পিটিয়ে মেরেছে। স্থানীয় প্রশাসন শেষের দিকে এই দলটাকে বাঁচানোর একটা শেষ চেষ্টা করেছিল তাদের জেলখানায় নিয়ে গিয়ে। শেষ রক্ষা অবশ্য হয়নি। উন্মত্ত জনস্রোত জেলের গেট ভাঙতে খুব কম সময় নিয়েছিল।

 

ব্রিগেডিয়ার আবদুল্লাহ মালিকের নির্দেশ আছে, এই নির্মমতার যথাযথ উত্তর পাক আর্মি যেন দিয়ে আসে।

 

আক্রান্ত এক জনপদের গল্প

 

হায়েনার দল আমাদের শহরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। পথে যাকে পেয়েছে তাঁকেই মেরেছে। মাটিডালি মোড়ে পাখির মত গুলি করে মেরেছে আমাদের লোকেদের। সকাল বেলা রিকশা নিয়ে তোতা মিয়া বের হয়েছিল। তোতা মিয়া ফিরে আসেনি। যত সময় গিয়েছে ফিরে না আসার দল ভারী হয়েছে। রেলগেট এলাকায় ফল ব্যবসায়ী আতাউরকে ওরা গুলি করেছে খুব কাছ থেকে। আতাউর বুকে ধাপ করে যে গুলিটা প্রথম এসে লেগেছিল, আমি ব্যাংকের ছাদে বসে তার শব্দ পেয়েছি। আতাউরের মত আরও অনেকের লাশ বাসি হচ্ছে। ওদের শরীর থেকে উষ্ণ রক্তের যে স্রোতটা একসময় বহমান ছিল, তা এখন জমাট বাঁধছে। আমি দূর থেকেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, মাছি উড়ছে ওদের মুখের উপর। এক একটা লাশ মনে করিয়ে দিচ্ছে, কতটা অনিরাপদ ছিলাম আমরা এই কয়টা বছর! সময় আমাদের সবাইকে একদল হায়েনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

 

আমি কখনোই সাহসী হয়ে উঠতে পারিনি। আমি সাঁতার জানিনা। কখনো চেষ্টাও করা হয়নি। আমি ঘুড়ি উড়াতে জানিনা। আমি আরও অনেক কিছুই জানিনা। আমি জানিনা কিভাবে একটা দেশের জন্ম হয়। শুধু জানি, আমাদের নিজেদের একটা আকাশ খুব দরকার। করতোয়ার উপরে রেলের যে ব্রিজটা আছে, সেটার উপর থেকে ঝাঁপিয়ে নিচে পড়বার স্বাধীনতা দরকার। বিকেলের দিকে দুরন্ত গতিতে যে ট্রেনগুলো উত্তরের দিকে চলে যায়, রেললাইনে কান পেতে তাদের চলে যাওয়ার শব্দ শুনবার অধিকার দরকার।

 

সকাল থেকে আমরা তিন জন অপেক্ষা করছি। প্রতিটা মুহূর্তে মনে হয়েছে, ট্রিগার চেপে এক একটা হায়েনাকে ঝাঁঝরা করে দিই। সেটা করতে পারি নি। তিনটা থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে বড়জোর আমরা মিনিট দশেক টিকতে পারবো। তাই অপেক্ষা করেছি। হায়েনার দলের আরও কাছে আসার অপেক্ষা। আমরা একটা গুলিও অপচয় করতে চাই না। এতক্ষণে আমরা সবাই অন্তত এই সমীকরণটা বুঝে ফেলেছি যে, এক একটা বুলেট আমাদের স্বাধীন আকাশের স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

বেলা বারোটার দিকে দেখলাম হায়েনার দল মহিলা কলেজ মাঠে বেশ কিছু মানুষকে জড় করছে। মানুষগুলো সবাই আমাদের পরিচিত। আমাদের স্বজন। কেউ হয়তো পাশের পাড়ায় থাকেন। তাদের সাথে আমাদের কথা হয়েছে বাজারে, মাঠে-ময়দানে, ঈদের জামাতে কিংবা অন্য কোথাও। আমরা কাউকে আলাদা করতে পারি না। সবাইকে আমাদের এক মনে হয়। আমাদের স্বজনেরা এক একজন উৎকণ্ঠা চোখে চারপাশ দেখছেন। হায়েনারা কারও কারও চোখ বেঁধে দিয়েছে।

 

আমার বন্ধু টিটু হায়েনাদের দিকে প্রথম গুলিটা করলো। এরপ রসবাই কিভাবে যেন অদ্ভুত স্বপ্নময় একটা জগতে চলে গেলাম। চারপাশের কোন কিছুর কথা আমাদের মাথায় নেই। আমরা তখন রাইফেলে নিরন্তরভাবে আমাদের স্বপ্নগুলো বুনে চলেছি। স্বাধীন একটা আকাশের স্বপ্ন। একটা রেলস্টেশন, একটা নদী, একটা সবুজ ধানখেত। ততক্ষণে সেই খুব পরিচিত গন্ধটা আমাদের চারপাশে ঘুরে ফিরতে শুরু করেছে। চলন বিল থেকে উঠে আসা সেই ভেজা বাতাসের গন্ধ। আমাদের মা’র শরীরের গন্ধ আর সেই বাতাসের সেই গন্ধ এক ছিল। যাকে আমরা কখনো আলাদা করতে পারি নি।

 

আমরা জানি আমাদের হাতে সময় খুব কম। খুব বড়জোড় মিনিট দশেক আমরা এই প্রতিরোধটা চালিয়ে যেতে পারবো। নিচ থেকে আমাদের দিকে বৃষ্টির মত গুলি ছোঁড়া হচ্ছে। খুব সম্ভবত ওরা চারপাশ থেকে আমাদের ঘিরে ফেলেছে। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, পিছনের পাইপ বেয়ে আমরা পালিয়ে যাব। সেটা এখন আর কোনভাবেই সম্ভব না। আমাদের শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে। আমরা সবাই গত কয়েক মিনিটে খুব অদ্ভুত কিছু অনুভূতির সাথে পরিচিত হয়েছি। এই অনুভূতির নাম আমরা কেউ জানি না। শুধু জানি, স্বাধীন একটা আকাশে ঘুড়ি উড়ানোর স্বপ্ন দেখাটা খুব আনন্দের। নিজেদের একটা পতাকার স্বপ্ন দেখাটা খুব আনন্দের। প্রিয়জনদের ইচ্ছেমত ঘুরতে ফিরতে দেখাটা আনন্দের। আমরা স্বপ্নটা দেখতে শিখে গিয়েছি। বিশ্বাস করুন আমরা একদমই ভয় পাচ্ছি না। একদমই না।আমরা বুঝে গিয়েছি একটা দেশ কখনও আয়তনে তৈরি হয় না, একটা দেশ তৈরি হয় স্বপ্নে।

 

বৃষ্টি শেষের গান

 

প্রিয় পাঠক, আমার পূর্বসূরির কথা বলছিলাম। যার কথা বলছিলাম তিনি রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ২য় ব্যাচের ক্যাডেট শহীদ আব্দুল মোমেন। ক্যাডেট নং- ৩৫।

 

পাক আর্মি বগুড়া আক্রমনের প্রাক্বালে সেই সময়ের ইউনাইটেড ব্যাংকের ছাদ থেকে একদল কিশোর-তরুণ আর্মিকে চালেঞ্জ করে প্রথম গুলি ছোঁড়ে। শহীদ আব্দুল মোমেন হিটলু তাঁদেরই একজন। অসম এই যুদ্ধ প্রয়াসের ব্যাপ্তি ছিল খুব অল্পক্ষণের। পরবর্তীতে এই দলটি ধরা পড়ে পাক আর্মির হাতে। মোমেনের সাথে যারা ছিল তাঁদের মধ্যে দুই জনের নাম পাওয়া গিয়েছে। এরা হলেন শহীদ মোস্তাফিজার রহমান চুন্নু এবং টিটু।

 

ধরা পড়ার পরপরই খুব কাছ থেকে চুন্নু এবং টিটুর চোখে গুলি করা হয়। পরবর্তীতে পাক আর্মি বেয়নেট দিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাঁদের সেখানেই মেরে ফেলে।

 

মোমেনকে তাৎক্ষণিকভাবে মারা হয়নি। জনশ্রুতি আছে, তাঁকে অজ্ঞাত স্থানে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর পেট্রোল ঢেলে তাঁর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। শহীদ মোমেন এদেশের নিখোঁজ সেই সব অগণিত সূর্য সন্তানদের একজন যার কবর খুঁজে পাওয়া যায় নি।

 

আমার খুব ভাবতে ইচ্ছে করে প্রবল বর্ষার কোন এক দিনে করতোয়ার উপরের রেলসেতুটা ধরে হেঁটে হেঁটে মোমেন বাড়ি ফিরছে। চলন বিলের ভেজা বাতাস বার বার মোমেনের চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে। সূর্যকে ছুঁয়ে বাড়ি ফেরা মোমেনরা আজ বড় ক্লান্ত।

 

 

Share