বাঘবন্দী’র সমীকরণ

লিখেছেন - রেজা শাওন | লেখাটি 670 বার দেখা হয়েছে

অক্টোবরের পাতা ঝরা রাত। পশ্চিম থেকে অ্যাড্রিয়াটিকের গা ছুঁয়ে আসা বাতাস হিম করে রেখেছে চারপাশ। খুব সজাগ হয়ে কান পাতলে বাতাসের ডাক শোনা যায়। বিমর্ষ এক হাহাকার জাগিয়ে সে বাতাস দিনারিক পর্বতমালার গা ঘেঁষে হারিয়ে যায়। নিস্তব্ধ চারপাশ। গাছের পাতাটি পড়লেও শোনা যায় এমন। মানুষ পৃথিবীতে আসার অনেক অনেক আগে, যখন মহীসঞ্চারণে প্যানেজিয়া ভেঙে সাত সাতটি আলাদা মহাদেশ হচ্ছিল, তখন কি পৃথিবী এমন ছিল? এমন শান্ত, অবিশ্রান্তভাবে নীরব আর নিশ্চুপ?  

 

 

‘দিয়ান এল্ভির’ নামের মাঝবয়সী এক লোক সিগরেট ধরাবার জন্য চারপাশ হাঁতড়ে লাইটার খুঁজছে। খুব সাবধাণে হামাগুড়ি দিয়ে সামনে পড়ে থাকা একজনের দিকে এগিয়ে যায় সে। অন্ধকারে মুখ চেনা যায় না। এ হয়তো ‘মিহাল’ হবে। মিহাল জোরান, দিয়ানের প্রতিবেশী। সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে আগে, সাইরেন বেজে ওঠার সাথে সাথে ওরা যখন শুনেছিল, ফ্রেঞ্চ শান্তিরক্ষীদের হটিয়ে দিয়ে সার্ব’রা আসছে; তখনই বেড়িয়ে পড়ে ওরা। ওরা অনেকেই। হয়তো সেব্রেনিতসার সবাই। এরপর শুধু দৌড়ে পালিয়েছে ওরা। পেছন থেকে বৃষ্টির মত গুলি হয়েছে। শহরের একেবারে শেষপ্রান্তে এসে ওদের আবার ঘুড়ে দাঁড়াতে হয়। রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে থাকা সার্ব ট্যাংকগুলো একের পর এক নিশানা করছিল ওদের। দিয়ানের পাঁচ বছর বয়সী নীলচে চোখের মেয়েটা, যে কিনা পাহাড় থেকে নেমে আসা পরীদের গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তো; ওর ঠিক পিঠের দিকটায় একঝাঁক গুলি এসে বিঁধে যায়। অনেকটা সময়, প্রায় অনেকটা সময় দিয়ান ওকে নিয়ে দৌড়েছে। পাগলের মত, উদাভ্রান্তের মত। তুষারঝড়ে দিক হারিয়ে বুনো হরিণের দল যেভাবে মরিয়া হয়ে আশ্রয় খোঁজে, ওরাও ঠিক সেভাবে আশ্রয় খুঁজেছিল। তারপর একটা সময় দিয়ান যখন বুঝেছে, চারপাশ থেকে ওদের লোকেরা সবাই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে কোথায় যেন-তখন ক্লান্ত হয়ে থেমে যেতে হয় তাঁকে। শিশিরের শব্দের মত অনুভূতির শেষ বিন্দুটুকুও ঝড়ে পড়ার শব্দ শুনেছিল সে। এরপর লালচে পাতার একটা সিলভার ফার গাছের নিচে গা এলিয়ে দিয়েছিল ও। 

 

রাত প্রায় শেষ প্রহরে। আবছায়া কাটছে। ক্রমাগত ভারী হয়ে ওঠা চোখের পাতাজোড়া শিশিরের স্পর্শে সচকিত হয়। পকেট হাঁতড়ে শেষ সিগরেটটাকে আরেকবার ছুঁয়ে দেখে সে। একটা লাইটার খুব দরকার। খুব অল্প কিছু আগুন। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলেই সার্ব’রা তীব্র সব আলো নিয়ে লাশগুলোকে খুঁজতে আসবে। মৃতদের পরিসংখ্যান এখানে করা হয়, খুব যত্ন নিয়ে। হাতে সময় খুবই কম। খানিকটা মরিয়া হয়ে চারপাশের ঘুমিয়ে পড়া মানুষগুলোর পকেটে লাইটার খুঁজতে শুরু করে দিয়ান। ঘুমিয়ে পড়া মানুষগুলো ওদের নিশ্বাসের শব্দ হারিয়েছে অনেক আগেই। এমনই একজনের বুক পকেটে ধাতব একটা কিছুর স্পর্শে একটু কেঁপে ওঠে ও। রক্তে ভিজে যাওয়া আধ প্যাকেট সিগরেট, একটা লাইটার আরেকটা চিঠি।    

 

অসম্ভব দ্রুততায় সিগরেট ধরিয়ে মানুষটার পাশে বসে পড়ে সে। বয়সে তরুণ একজন। কোঁকড়ানো কালো চুল এলোমেলো হয়ে কপালের উপর পড়া। আঁধার কেটে যাচ্ছে। আলো আঁধারির আবছায়াতে তরুণের বুক পকেটের রক্তে ভেজা চিঠিটি খুলে পড়তে শুরু করে দিয়ান। ঠিক চিঠি নয়, একে সুপারিশ পত্র বলাটাই বোধহয় বেশি যুক্তিযুক্ত হয়। কেউ একজন হাতে লিখেছে যে, এই লোকটিকে যেন কিছু শুকনো খাবার আর পানি দেওয়া হয়। গত কয়দিনের অবরোধ করে রাখা শহরে লোকটি পরিবার নিয়ে বড় বিপদে পড়ে গিয়েছে।   

 

চারপাশে আলো ফুটছে। সেব্রেনিতসার দক্ষিণে পৃথিবীর ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলো অপেক্ষা করছে তাদের শান্তিরক্ষীদের নিয়ে। তাঁদের কাছে খাদ্য আর পানীয়ের অভাব নেই। আর শহরের উত্তর দিকে সার্ব’রা সকালের অপেক্ষায়। ঘুমিয়ে পড়া মানুষদের লুকিয়ে ফেলতে হবে খুব দ্রুত। আয়োজন চলছে। মাটি খুঁড়ে বড় বড় সব গর্ত তৈরি হয়। সকাল হচ্ছে। দিয়ানের হাতের সিগরেট প্রায় নিভে এসেছে। ক্লান্ত চোখজোড়া মুজে ফেলার ঠিক আগে আগে আকাশের দিকে তাকায় একবার ও। এরপর শান্ত হয়ে গাছের গুঁড়িতে গা এলিয়ে দেয় দিয়ান।   

 

উপর থেকে করুণার মত বড় বড় ফোঁটার শিশির বিন্দু দিয়ানের হাতের চিঠির অক্ষরগুলোকে অস্পষ্ট করে দেয়। লাল আর কালো মিশে একাকার হয়। বিমর্ষ এক হাহাকার জাগিয়ে বাতাস দিনারিক পর্বতমালার গা ঘেঁষে হারিয়ে যায়। নিস্তব্ধ চারপাশ। গাছের পাতাটি পড়লেও শোনা যায় এমন। মানুষ পৃথিবীতে আসার অনেক অনেক আগে, যখন মহীসঞ্চারণে প্যানেজিয়া ভেঙে সাত সাতটি আলাদা মহাদেশ হচ্ছিল, তখন কি পৃথিবী এমন ছিল? এমন শান্ত, অবিশ্রান্তভাবে নীরব আর নিশ্চুপ?

 

সকাল হচ্ছে। প্রথম সূর্যের উদ্ভাসিত আলোর উপস্থিতিকে অস্বীকার করে, বাতাস ঘুমন্ত মানুষগুলোর এলোমেলো চুলে ঢেউ খেলে যায়। গোলার্ধ জুড়ে বাঘবন্দী খেলায় হেরে যাওয়া মানুষের দল- শুধু ছাঁয়া হয়ে পড়ে থাকে। সূর্য গোলার্ধ বদলায় এভাবেই। একবার করে। প্রতিদিন। প্রতিনিয়ত।

 

(পৃথিবীর নানা প্রান্ত জুড়ে নিরপরাধ মানুষ মেরে ফেলবার ধরণটা এক। বিশ্ব মানবতা আর মৃত্যু সব সময়ই এই হেরে যাওয়া মানুষগুলোর খুব কাছাকাছি থাকে। মৃত্যু বরাবরই এই হেরে যাওয়া মানুষগুলো কে নির্মমভাবে ছুঁয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু বিশ্ব মানবতা তাঁদের ছোঁবার ক্ষমতা রাখে না। )  

 

Share