চড়ুই পাখি আর বেলী ফুলের গল্প…

লিখেছেন - রেজা শাওন | লেখাটি 1369 বার দেখা হয়েছে

জুন-জুলাই মাসের এই বৃষ্টির মা বাপ নাই। আসবে, ভিজাবে, চলে যাবে। একটু আগে ভিজিয়ে গেছে;মোটামুটি ভাবে কাউয়াভেজা। ফুলাররোড থেকে হাকিম চত্বর,পাঁচ মিনিটের এই পথটুকুতেই সর্বনাশ। মরণের দৌড় দিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। ভিজে একেবারে ন্যাতা ন্যাতা অবস্থা। নতুন কেনা জেলটা নাকি পানিতেও কিছু হবে না। ব্যাটা পুরাই ফলস মারছে। সারা মুখ আঠা আঠা হয়ে আছে। শার্টের হাতায় কোনো রকমে মুখ মুছে দাড়িয়েছি মাত্র, ঠিক এই সময়…

: এই গাধা…!! এখানে কি করিস? চেনা কণ্ঠ।

ঘাড় ঘুরিয়ে খুঁজতে হয়না। অনুপমা সামনে এসে দাড়ায়। কাঁধে ব্যাগ,লাল একটা ছাতা হাতে।

: কিছু করিনা। বাসায় যাব। ৫ টা ২০ এ বাস। তুই এখানে কেন?

: আমি এখানে কেন মানে? আমার কাম্পাস, আমার হল। এইটা তো আমার এলাকা। আমি ‘তোমার’ মত লুতুপুতু টাইপ না। হলে থাকি, একটা ভাব আছে।

: বাসায় থাকলে,কেউ লুতুপুতু হয়ে যায় নাকি? কই শিখছিস এই সব কথা?

: অবশ্যই। যারা বাসায় থাকে তারা এক একটা বিশাল লুতুপুতু। আর তুই তো আরও এক কাঠি উপরে। গাধা লুতুপুতু…!!

মেজাজ চরম খারাপ হয়ে যায়। ঠোঁট কাটা হলেও একটা কথা ছিল। এই মেয়ের ঠোঁটই নাই। ধ্বংসাত্বক সমালোচনা ব্যাপারটা অনুপমার চেয়ে ভাল কেউ করতে পারে না। এর সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নাই। জেতা যাবে না। কেটে পড়াই ভাল।

: শোন,মেলা বয়ান দিছিস। তুই ঘুরাঘুরি কর। আর লুতুপুতুদের লিস্ট বানা। আমি যাই……।।

: কেন…?সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরলে আম্মু কি বকা দিবে?

: শুধু বকাই দিবে না। কান ধরে দাড়ায়েও রাখতে পারে…!!

: আচ্ছা গাধা, তুই যা তাইলে …!! বাসায় গিয়ে হরলিক্স খা…!!

: আরেকটা কথা বলি, শোন। “রাস্তাঘাটে গাধা বলে ডাকাডাকি করবি না। শুনলাম,সাদা পোশাকে ডিবির লোকজন ঘুরাঘুরি করে। যেকোনো দিন তোরে পিকআপে তুলবে। দেশে ইভটিজার আর অ্যাডামটিজার সবার জন্য একই আইন। তুই যেকোনো দিন কেস খাবি।” সাবধান…!!

অনুপমা হেসে ফেলে।বেয়াদপ এই মেয়েটার হাসি সুন্দর। চোখ বন্ধ করে দশে সাড়ে আট দেওয়া যায়। এমনিতে সারাদিনই হাসে। আমরা অবশ্য দেখেও না দেখার ভান করে থাকি। ও যদি একবার বোঝে, ওর মুখের দিকে কেউ তাকিয়ে আছে, তাহলেই সে শেষ। ও এইটারে তিল থেকে তাল বানাবে। সেই তাল পাকিয়ে পিঠা হবে। আর অনুপমা এই পিঠা ক্লাসের সবাইকে ডেকে ডেকে খাওয়াবে। এতটা ঝুঁকি নেওয়া যায় না।

ওকে বিদায় দিয়ে বাড়ির পথ ধরি। ঠিক সন্ধ্যার আগে আগে বৃষ্টিস্নাত ঢাকা। রোদ নিভে আসা ঢাকা শহর। এই শহরের লোকগুলো কি জানে বৃষ্টি শেষেরও একটা গন্ধ আছে? কাছে টানার গন্ধ। সবাই জানেনা মনে হয়। অবশ্য সবাইকে সব কিছু জানতে হবে,এমনটা না। অনুপমাও যেমন জানলো না যে, আজকে ওর হাসি আমার বুকে মাঝারি মানের একটা ধাক্কা দিয়েছে। ভাগ্য ভাল…!! ধাক্কাটা মাঝারি মানের। বড়সড় হলে বিপদ ছিল। নির্ঘাত মাথা কাটা যেত। এই মেয়ের সাথে কোনো কিছু…?? ভাবাই যায় না।

অনুপমার ব্যাপারে একটু বলি। ওর বাবা-মা মনে হয় শখ করে তাঁদের মেয়ের জন্য শান্ত, নম্র, কোমল ধরনের একটা নাম রেখেছিলেন। মেয়ে লক্ষ্মী হবে এই আশায়। সেই আশার চিনিতে নীলফামারীর ডোমার(বালুর জন্য বিখ্যাত) বালু পড়েছে। এই মেয়ে মোটেও লক্ষ্মী হয়নি। ক্লাসের সিটবেঞ্চ গুলো যে বসার জন্য, অনুপমা ব্যাপারটা বিশ্বাস করে না। যতক্ষণ স্যার থাকে,সে খুব কষ্ট করে বসে থাকে। বাকি সময়টুকু উড়ে উড়ে বেড়ায়। আবীরের বড় বড় চোখ দেখে,তার সেটা দিয়ে টেবিল টেনিস খেলতে ইচ্ছে করে; কিংবা “পার্লার খাতে” ইরার প্রতি মাসে কত যায়?- এই সব ব্যাপারে সে একের পর এক মূল্যবান আলোচনা (ধ্বংসাত্মক সমালোচনা) করে বেড়ায়। তাই সবাই ভয় পায়। আমিও পাই। নিদেনপক্ষে ওর সাথে সন্ধিনীতি মেনে চলি। কোনদিন জানি একবার বেশ সাহসী হয়ে উঠেছিলাম। ওরে একটা খোঁচা মারতে গিয়ে বললাম,

: অনুপমা, তুই এক কাজ কর। ‘ঢাকা মহানগর মহিলা বেয়াদপ সমিতির’ ব্যানারে চেয়ারপার্সন পদের জন্য ইলেকশন কর। আমার বিশ্বাস তুই বিশাল ভোটে, রীতিমত রেকর্ড করে জিতবি।

: তাই নাকি? আমার মার্কা কি রে? গাধা মার্কা নিলে কেমন হয়? মনে কর, তোর একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি মার্কা হিসেবে থাকলো। আর তার নিচে বড় বড় করে লিখে দিলাম,”অনুপমাকে গাধা মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন।” আইডিয়াটা কেমন? অস্থির না?

নগদে বোল্ড। আমি অফ খেয়ে মুখ কালো করে ফেলি। এই মেয়ে আমাকে গাধা যে কেন বলে? যাই হোক, ওর নিজের কিন্তু খুব সুন্দর একটা নাম আছে। ক্লাসে সবাই ওকে “চড়ুই পাখি” বলে, ওর তিড়িং-বিড়িং ছট-ফট স্বভাবের জন্য। আমি অবশ্য এই নামকরণের ঘোর বিরোধী। “খুন্তিকুমারী” কিংবা “কাঠবিষনী” টাইপ নাম ওর সাথে ভাল যায়। কিন্তু ঐ যে ওর হাসি! ঐ হাসিটাই যত গোলমাল পাকায়!! আমার মত অনেকেই মনে হয়, প্রায়ই ধাক্কা খায়। ওর “চড়ুই পাখি” নামটাই ভালো।

ও যে ওর আরেকটা চেহারা লুকিয়ে রেখেছে,সেটা আমি একদমই জানতাম না। জানলাম অনেক পরে। আম্মা তখন বারডেমে ভর্তি । সন্ধ্যায় অপারেশন। দুই ব্যাগ রক্ত লাগবে। আমি নিজেই দিতে পারতাম। ঝামেলা বাঁধালো জন্ডিস। দুই মাসের আগে নাকি রক্ত দেওয়া যায় না, কী সব হাবিজাবি!! বিকেলের দিকে অনুপমাকে ফোন দিলাম।

: অনুপমা,তুই কি হলে?

: হুঁ, হলে। ক্যান কি হইছে? তুই এইদিকে নাকি?

: নাহ। আম্মা বারডেমে অ্যাডমিট। দুই ব্যাগ রক্ত লাগবে। তুই একটু দেখিসতো হলে, “এ পজেটিভ” কেউ আছে নাকি?

: আরে আমি নিজেইতো এ পজেটিভ। আমিই চলে আসবো নাহয়। কখন আসতে হবে?

: ধুর!! তুই কি রক্ত দিবি? চানখারপুলে জোরে বাতাস দিলে নিউ মার্কেটে গিয়া পরিস। তুই আগে দুধ-ডিম খা। নেক্সট টাইম আমার একটা কিছু হোক। তখন আমারে দিস নাহয়…!!

: চড় খাবি, গাধা!! বেশি বুঝিস না। আমি ছয়টার দিকে আসতেসি। ওর সাথে বরাবরের মত এবারও কথা বাড়ানো গেল না। আমি ওরে রিজার্ভ হিসেবে রেখে, অন্যসব জায়গায় ফোন দিতে থাকলাম। ওই বার দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ঢাকা শহরে এ পজেটিভ রক্তের আকাল পড়লো। কাউকে পেলাম না। গাধা বলেই পারলাম না মনে হয়।

অনুপমা আসলো ছয়টার একটু পরে। ব্লাডগ্রুপ ম্যাচিং ইত্যাদি হাবিযাবি করার পর,কী একটা রুমে নিয়ে গেল। এইখানে রক্ত নেয় মনে হয়। ডাক্তার নাম-ধাম,সাত সতেরো জিজ্ঞেস করার ফাঁকে টুক করে ওর বাম হাতের কব্জিতে সুইের মত কী জানি ফুটিয়ে দিল। আমি ওর মুখের দিকে তাকালাম একবার। ব্যাথা পেলে-ওকে দেখতে কেমন লাগে,ব্যাপারটা দেখবো বলে। তাকিয়ে কিছুই বুঝলাম না। “নো ফীলিংস” টাইপ একটা ভাব। আরে ধুর!! এই মেয়ের চোখ-মুখে হিব্রু ভাষায় ‘গরু রচনা’ লেখা। কিচ্ছু বোঝা যায় না।

আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে। ও স্বভাবমত ডাক্তারের সাথে দুনিয়ার গল্প শুরু করেছে। করতে থাকুক। আম্মার কেবিনের দিকে যাই।

মিনিট চল্লিশেক পরে ফিরে আসি। ওর রক্ত দেওয়া প্রায় শেষের দিকে। রক্তের ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে খারাপই লাগলো। এমনি ছোট-খাটো মানুষ। এতো গুলো রক্ত!! কিন্তু করারই বা কি ছিল? কাউকে পেলাম নাতো। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার চলে গেল। যাওয়ার আগে, অবশ্যই ওকে আধা ঘণ্টা বিশ্রাম নিতে বললো। অনুপমা বিছানায় শুয়ে। উঠে বসতে চায়। আমাকে দেখে লজ্জা-টজ্জা পাচ্ছে নাকি? (এইটা একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা)

: ওই!! উঠিস ক্যান?? শুয়ে থাক…কিছু খাবি? কেমন লাগছে এখন?

: আরে ধুর!! গত এক ঘণ্টা ধরে শুয়ে আছি। আর কি এক ফাঊল ডাক্তার!! বিশাল বোরিং।আর তুই কই ছিলি গাধা?

: ছিলাম আশে পাশেই। দেখলাম বুইড়া ডাক্তারের সাথে আলাপ জমাইছিস, তাই আর বিরক্ত করিনি।

: যা ভাগ! চড় খাবি…!! আমি হাসি। ওর কাছ থেকে আমার মেলা চড় পাওনা আছে। মনে করে কোনো একদিন খেয়ে নিতে হবে। আপাতত সুদে-আসলে বাড়তে থাকুক।

ঘরটায় শুধু আমি আর অনুপমা। সবুজ একটা টিপ ওর কপালে। আমি খেয়ালই করিনি। এই মাত্র দেখলাম। ওর দিকে কি একবার তাকাবো? ধরা খেয়ে যাবোনা তো? ও লজ্জা পাচ্ছে,নাকি আমি? আমিই পাচ্ছি, মনে হয়। ইতিমধ্যে কথা বলতে গিয়ে বেশ কয় বার hang খাইছি। নাহ লজ্জা পাওয়া যাবেনা। ও বুঝে ফেললে,খেলা শেষ। কাল সকালে ক্লাসে গিয়ে আমাকে মুরগি বানাবে। সেই মুরগি ডিম পারবে। আর ও সেই ডিম ভাজি করে,সবাইকে খেতে ডাকবে। স্বাভাবিক থাকার যুদ্ধে নামলাম। মুখের মানচিত্র এখন যথাসাধ্য সহজ।

-তোর হলের গেট কয়টায় বন্ধ করবে?

-এইতো। এগারোটায় মনে হয়। আমার উঠতে হবে এখন!!

-কি বলিস? ডাক্তার যে বলল, মিনিমাম আধাঘণ্টা শুয়ে থাকতে!!

-ওই ব্যাটা কি বুঝে? আমি ঠিক আছি। একটু আগে অবশ্য ঘুম ঘুম লাগছিলো। কিন্তু এখন ঠিক আছি।

অনুপমা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট কারো কথাই শোনে না। উঠে বসতে চায়। ও বাম হাতের কব্জিতে ভর দিয়ে উঠতে চাইলো।

ঠিক এই সময়টায়,হঠাৎ করেই আমাদের দুই জনকে অবাক করে দিয়ে অনুপমার বাম হাত থেকে অনেকটা রক্ত!! শুরুতে আমি কিছুই বুঝিনা। পরে ব্যাপার বুঝলাম, ডাক্তার কিছুক্ষণ ওকে বামহাতটা ভাজ করে রাখতে বলেছিল । গল্পের তালে, ওর আর সেটা মনে নাই। যা হবার তাই, রক্ত আর বন্ধ হওয়ার সুযোগ পায়নি। ও হাতের ওই জায়গাটা থেকে তুলোটুকু সরাতেই, মোটামুটি ভয়াবহ এক দৃশ্যের শুরু। প্রথম কয়েক সেকেন্ড কি করব, কিচ্ছু বুঝছিলাম না। পরে দৌড়ে গিয়ে ওর বাম হাতের ওই জায়গাটা চেপে ধরলাম। ততক্ষণে ওই রুমের চিত্র বদলে গেছে। আমার শার্টের হাতা মোটামুটিভাবে ওর রক্তে লাল। ওর বাম হাতের নিচে,বিছানার সাদা রং এর চাদর মুহূর্তেই রং পাল্টালো। অনুপমা চোখ বন্ধ করে ফেলে। আমি চিৎকার করে, কাউকে ডাকলাম কি না জানিনা। আমি শুধু টের পাচ্ছি, উষ্ণ একটা রক্তের স্রোতকে আমি কোনোভাবেই থামাতে পারছি না।

কতক্ষণ ওভাবে ছিলাম জানি না। মনে হয়,আমার জীবনের দীর্ঘতম দেড় মিনিট পার করলাম। দেড় মিনিটের মাথায় ডাক্তার আসলো। আমি ওর হাত ছেড়ে, রুম থেকে বের হয়ে আসলাম। বের হওয়ার সময় ওর মুখের দিকে একবারও তাকাইনি। আসলে তাকানোর সাহস পাইনি। তখনও কি ওর চোখ বন্ধ ছিল?

কতক্ষণ ওভাবে ছিলাম জানি না। মনে হয়,আমার জীবনের দীর্ঘতম দেড় মিনিট পার করলাম। দেড় মিনিটের মাথায় ডাক্তার আসলো। আমি ওর হাত ছেড়ে, রুম থেকে বের হয়ে আসলাম। বের হওয়ার সময় ওর মুখের দিকে একবারও তাকাইনি। আসলে তাকানোর সাহস পাইনি। তখনও কি ওর চোখ বন্ধ ছিল?

সেই রাতে অনুপমার আর হলে ফেরা হয়নি। আম্মার জন্য রাখা কেবিনটায় অনুপমার জায়গা হয়। আম্মা তখনও পোস্ট অপারেটিভে। অনুপমার কেবিনের বাইরে আমি সারা রাত ডিউটি দিলাম।

জুন মাসের এলোমেলো বৃষ্টি ছিল প্রায় সারা রাত ধরেই। সকাল হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম। সকাল বেলা যেখান থেকে পারি,বেলী ফুল খুঁজে আনতে হবে। অনুপমার জন্য……।।

 

 

বর্ষাকাল মানেই একটা প্রেম প্রেম ব্যাপার থাকবে। এই কথা আমি যেমন জানি, শাহ্‌বাগের ফুলওয়ালা মামারা আমার চাইতেও ভাল জানে। বেলী ফুল খুঁজতে আমাকে খুব বেশি একটা দৌড়াতে হয় না। নয়টার আগে শাহবাগ মোড়েই বেলীফুল পেলাম। ১০ টাকা বেশি দিয়ে দুইটা বেলীফুলের মালা কিনে পকেটে ভরলাম। এতক্ষণে অনুপমার ঘুম ভেঙেছে বোধ হয়। কতটা শৈল্পিক ভাবে ওকে ফুলগুলো দিব, ওর হিব্রু ভাষা আঁকানো চেহারাটা তখন দেখতে কেমন হবে- ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে বারডেমের দিকে হাঁটা দিই।

গতরাতের বৃষ্টিস্নাত ঢাকা। আর চার পাশ ঘিরে থাকা ভেজা বাতাস। কোন উজবুক যেন বলেছিল, “এই শহরে নাকি ভালোবাসা নাই!! সবই ঢং” !! উজবুকটারে পাইলে, মিরপুর চিড়িয়াখানায় নির্বাসন দিতাম। এই যে ভালোবাসা আছে। বেলীফুল আছে। বুকের মাঝে ক্ষণে ক্ষণে একটা ধাক্কা আছে। আর ধাক্কাটা অল্প অল্প করে বেপরোয়া হচ্ছে। আচ্ছা আমার কি ভয় পাওয়া উচিত? বেয়াদপ মেয়েটা যদি মুখের উপর না বল দেয়!! এই মেয়ে যেমন!! আরে ধুর!! না বললে বলুক। কত দিন আর এইভাবে থাকা যায়?

মেয়ের ঘুম ভেঙ্গেছে। হাসাপাতালে ফিরে দেখি, বিছানায় বসা। একটু লজ্জা লজ্জা ভাব। এর আগে কখনো হাসপাতালে থাকেনি মনে হয়। পরে কোন এক সময় ওর অভিজ্ঞতাটা শুনে নিতে হবে। আমার দুলাভাই ওর বিছানার পাশে চেয়ারটায় বসা। দুলাভাই দেখি হাত-টাত নাড়িয়ে সীমাহীন ভাব নিয়ে কথা-বার্তা বলছে। আমার বোনটাও না আমার মতই হালকা গাধা আছে। দুলাভাই যে ‘মেয়ে দেখলেই আমি হিরো হয়ে যাই’ এই জাতীয় সমস্যায় প্রবলভাবে আক্রান্ত, আমার বোন এই খবরটা একবারেই জানে না। ব্যাপার না। কোনও এক শুভক্ষণে আপার কানে দিয়ে দিব। আপাতত দুলাভাই এর দিকে কড়া একটা লুক দিলাম। যার মানে, ‘এই মিয়া, বান্ধবীটা আমার। আপনি বিদায় হন। মেলা সার্কাস করছেন’।

দুলাভাই ঠিক বুঝলো কি না জানিনা। কিন্তু আজকের দিনটা আমার। সেটা আরেকবার বুঝলাম। দুলাভাই দশ মিনিটের মাথায় অফিসের কথা বলে বের হয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে বেশ একটা ইঙ্গিতপূর্ণ স্বরে বলে গেলেন, ‘ভালভাবে দেখে রাখিস’।

ভালভাবে দেখেতো রাখতেই হবে। উনি চলে যাওয়ার পর অত্র এলাকায় আমিই একমাত্র মুরুব্বি। একটা দায়িত্ব আছে না! চোখের কোনা দিয়ে অনুপমার দিকে একটা চোরা দৃষ্টি দিলাম। ক্যাডেট কলেজে পাক্ষিক পরীক্ষার দুর্যোগের সময়টাতে যখন চার পাশে হাহাকার রব উঠত তখন এই ‘চোরা দৃষ্টি’ কত বার যে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বহুদিন প্র্যাকটিস না থাকলে খুব অভিজ্ঞ ব্যাটসমানরাও ফুলটস বলকে ইয়র্কার বানিয়ে ফেলে। এবং সে বলে আউট হয়। আমিও হলাম। অনুপমার চোখে চোখ পড়ে গেল। খুব বাজেভাবে ধরা খেলাম। এবং দুঃখজনকভাবে চোখ সরিয়ে নিতে পারলাম না। গতরাতের ধকল ওর উপর দিয়ে ভালই গেছে। ‘এখনই উড়াল দিব’ সেই ভাবটা আর নেই। এমনিতেই ছোটখাটো মানুষ। তার উপর লজ্জা পাচ্ছে। লজ্জা পাওয়ায় ওকে আরও ছোট্ট দেখাচ্ছে। বাধ্য হয়ে আমাকেই কথা শুরু করতে হল।

-কী রে, কী খবর এখন? কেমন লাগছে?

-এইতো, এখন ভাল আছি।(এইটুকু বলতে গিয়েই ও মনে হয় লজ্জায় মারা যাচ্ছে, এমন অবস্থা) আমি ভাবলাম, যাক! মেলা দিন পর পাখি ফাঁদে পড়েছে। এতো দিন ও আমাদের যা পেইন দিছে, আজকে সেই হিসাবটা ক্লিয়ার করতে হবে।

-কাল রাতে তুই যে কাহিনী করলি!! আমিতো ভাবলাম,এয়ার এ্যাম্বুলেন্সে করে তোরে সিঙ্গাপুর-টিঙ্গাপুর পাঠাতে হবে!!

-তোদের খুব ঝামেলায় ফেলে দিয়েছি, তাই না?(মাথা নিচু করে অনুপমা উত্তর দেয়)

-তোদের আবার কি রে? শুধু আমাকে ঝালেমায় ফেলে দিয়েছিস। সারা রাত ঘুম বিসর্জন দিলাম। বৃহত্তর রমনা এলাকার মশক সমাজ “অবাধে রক্তপান দিবস” পালন করেছে গত রাতে। এদের আগামি দুই দিন কিছু খেতে হবে না।

-কি বলিস? তুই সারা রাত জেগে ছিলি?(বালিকার চোখে লজ্জা মাখানো বিস্ময়)

-সারা রাত তোর জন্য জেগে ছিলাম, এমনটা ভাবার দরকার নাই। সুমি আর তিশার সাথে ফোনে একটা শিফট ছিল। বারটা থেকে দুইটা সুমি এরপর তিশা।

অনুপমা হাসে। কালরাতের পর এই প্রথম হাসলো ও। আবার সেই পরিচিত ধাক্কাটা!! বলা যায়, এবার একটু বেশ জোরেসোরেই খেলাম।

-তোর সাথে আবার কে কথা কয়? আমিতো জানতাম, ঢাকা শহরে আমিই একমাত্র মেয়ে যে তোরে একটু পাত্তা দেয়!!

-অফ যাও!! আমি কি ঢেউটিন নাকি? খালি একটা ডাক দিলে, আমার বান্ধবীরা সব স্রোতের মত আসবে। শাহবাগের রাস্তা ব্লক করা আমার জন্য কোনো ব্যাপারই না। ‘উইমেন পাওয়ার’ হেভি কড়া জিনিষ। অনুপমা আবারও ঘর কাঁপিয়ে হাসে।

অনেকটা সময় নিয়ে আমি বাতাসে ওর হাসির রেশ খুঁজি। তাৎক্ষণিকভাবে আমার মনে হয়,এই বেয়াদপ মেয়েটার জন্য সার্কাসের ভাঁড় হতে আমার একদমই খারাপ লাগবে না। অনুপমার হাসি মুখটা বার বার দেখার একটা নেশা আমাকে পেয়ে বসে।

এগারটার দিকে আম্মাকে কেবিনে আনা হয়। খুব বড় কোনো অপারেশন ছিল না। আম্মা তাই অনেকটাই স্বাভাবিক। অনুপমা তখন হলে ফিরবে। আম্মার সাথে টুকটাক কথা বলার পর আমি ওকে হলে নামিয়ে দিতে যাই।

শাহবাগ থেকে রিকশা নিলাম। এর আগেও ‘N’ সংখ্যক বার ওর সাথে রিকশায় নীলক্ষেত গিয়েছি। কখনো নিজেকে আমার ওর অভিভাবক মনে হয়নি। আজ মনে হচ্ছে। হঠাৎ করে কাউকে খুব কাছের মনে হওয়ার একটা বেপরোয়া অনুভূতিকে আমি খুব কষ্টে সামলাচ্ছি। পুরো সময়টুকুতে আমাদের কোন কথাই হলনা। অনুপমাকে খুব স্বাভাবিক দেখে, আমিও কেন জানি কিছু বলতে পারলাম না। এক ইঞ্চিরও কম দূরত্বে বসে থাকা মানুষটার ভেতরের ঝড় কি এই মেয়ে একটুও বুঝতে পারছে না?

শাহবাগ থেকে ওর হল খুব বেশি দূরের পথ না। হলের সামনে এসে রিকসা ছেড়ে দিলাম। হাতে কিন্তু তখনও সময় ছিল। চাইলেই কিছুটা সময় আটকে রেখে, ওকে আমি আমার বেলী ফুলের গল্পটা শোনাতে পারতাম। কেন জানি সেটা আর করা হল না। ওকে খুব সাধারন ভাবে বিদায় দিয়ে আমি বাসায় ফিরি। ফেরার পথে আমার সকালে কেনা বেলিফুলগুলোর কথা মনে হয়। ১৩ নম্বর বাসের অসাধ্য ভিড় আর ঠেলাঠেলিকে মোটামুটিভাবে অগ্রাহ্য করে আমি পকেট থেকে বেলীফুলের মালাটা দুটো বের করলাম। শাহবাগ থেকে মোহাম্মাদপুর পর্যন্ত বাকী পথটুকুতে লোকজন খুব অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেদিন আমি বেলিফুলের মালা গলায় পরে বাসায় ফিরলাম।

এর পরের কয়টা দিন আমার আর ক্লাসে যাওয়া হলো না। কেন জানি মনে হচ্ছিল, অনুপমার সামনে দাঁড়ালে ও ব্যাপার সব বুঝে যাবে। মানুষ প্রেমে পড়বে এবং আমার মত যারা ছোটকাল থেকেই নারী নিষিদ্ধ একটা পরিবেশে বড় হয়েছে, তারা চাইলে দিনে দশবারও পড়তে পারে। আমি এর আগে কার কার প্রেমে পড়েছিলাম তার একটা লিস্ট বানাতে থাকি। লিস্টে সবার আগে থাকে বাংলার লাকী ম্যাডাম। আর একেবারে শেষে এসে অনুপমা।

এর মধ্যে অনুপমা অসংখ্য বার ফোন করেছে। একে ওকে দিয়ে ফোন করিয়েছে। কারও ফোনই আমার আর ধরা হয়ে ওঠেনি। আমি প্রায় সারা দিনই ঘুমাই। খুব একঘেয়ে লাগলে মাঝে মাঝে ছাদে যাই। আকাশ দেখি। জুন মাসের ওই সময়টায় কেন জানি সেদিনের পর অনেক দিন আর বৃষ্টি হল না।

আমার শামুকদশা ভালই চলছিল। এর মধ্যে একদিন একটা মেইল আসে। বাইরের একটা ইউনিভার্সিটিতে অ্যাপ্লাই করেছিলাম অনেক আগে। ওরা মেইল পাঠিয়েছে। মেইলের সাথে ওদের কনফার্মেশন লেটার। মেইলের মানে যা বুঝলাম, সব কিছু ঠিক ঠাক থাকলে, ওরা আমার ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই করবে। হেনতেন হাবিজাবি। আমি যে আসলেই বাইরে চলে যাব, ব্যাপারটা তখনও মনে হয়নি। এরা এই ধরনের মেইল সবাইকেই পাঠায়। এই সব খুব সিরিয়াসলি নেওয়ার মত কোনো ব্যাপার না। কিন্তু খুব আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলাম মেইলটা পাওয়ার পর থেকে অনুপমার জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। বিকেল ৪টার দিকে ওই মেইলটা পেয়েছি। তারপর থেকেই কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেলাম। নিজের সাথে এতো দিন ধরে আমি যে নাটকটা করে এসেছি তার শেষ অঙ্কে এসে নিজেকে খুব অসহায় মনে হতে লাগলো। সাড়ে ছয়টার পর থেকে ঢাকার আকাশের দক্ষিনদিকটায় কিছু মেঘের আনাগোনা দেখলাম। আমি একটা বৃষ্টির অপেক্ষায় ছিলাম। ঘোর লাগা বৃষ্টি। আজ ঢাকা শহরে বান ডাকুক। আমি তাই চাই।

সন্ধ্যা সাতটার পর বৃষ্টি শুরু হল। আমি আমার জীবনে এই রকম বৃষ্টি খুব কমই দেখেছি। এই বৃষ্টিকে হিংস্র বললে খুব একটা ভুল হবে না। বড় বড় ফোঁটার লাগামহীন বৃষ্টি। সেই সাথে দলছুট বাতাস। বেশিরভাগ সময় বৃষ্টির সাথে বাতাসের দিকের একটা সম্পর্ক থাকে। আজকে সেটা নেই। বাতাস পারলে মোটামুটিভাবে সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে যায় এমন অবস্থা।

আমি বাসা থেকে বের হলাম। ওজনটা একটু বেশি বলেই মনে হয় বাতাস আমাকে উড়াতে পারলো না। কিন্তু চেষ্টা অব্যাহত থাকল। চার পাশ খুব কষ্ট করে দেখতে হচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটার জন্য চোখ খোলা রাখা দায় এমন অবস্থা। কপাল ভাল ছিল, এর মধ্যে একটা রিকশাও পেয়ে গেলাম। বৃষ্টি হলে রিকশা ভাড়া এমনিতেই দ্বিগুণ হয়ে যায়, আমি তিনগুন ভাড়ায় রিকশা নিলাম। সাতমসজিদ রোড আজকে একবারেই ফাঁকা। এই রকম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আজকে আর কেউ বের হবেনা । বৃষ্টি ক্ষণে ক্ষণে বাড়ছে, সেই সাথে বাড়ছে আমার কাঁপুনি। শাহবাগের কাছাকাছি এসে ফুলের দোকানগুলোতে দাঁড়ালাম। অনেক খুঁজেও বেলীফুল পেলাম না। অথচ আজকে আমার বেলিফুল খুব দরকার। খুউব…

অনুপমার হলের সামনে এসে ওকে ফোন দিলাম। অনুপমা ফোন ধরে না। কত বার ওকে ফোন করেছি জানিনা। মনে হয় তেইশতম বারে অনুপমা ফোন ধরলো।

-হ্যালো অনুপমা, তুই কি হলে?

-তুই কই থেকে? এতো দিন আমার ফোন ধরিসনি কেন?

-সব বলছি, তুই একটু বাইরে আয়।

-বাইরে আসব মানে? বাইরে কি অবস্থা দেখছিস? এর মধ্যে কিভাবে? হলের সামনে পানি জমে গেছে।

-জানিনা কিভাবে আসবি। কিন্তু প্লিজ আয়। খুব দরকার। অনুপমা ফোন রেখে দেয়। আমি পৃথিবীর সব উত্তেজনা বুকে নিয়ে বাইরে দাড়িয়ে ভিজছি। কোন কিছুই আমার মাথায় নেই। ও আসলে কী বলব, তাও জানিনা। শুধু জানি, আজকে আমাকে এই নাটকের শেষটা দেখতে হবে। চার পাশ কাঁপন তুলে বৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু এর মাঝেও অনুপমার জন্য আমার বুকে যে কাঁপনটুকু, সেটুকু আমি ঠিকই বুঝতে পারছি।

মিনিট দশেক পরে দূরে দেখলাম ছাতা মাথায় পানি ভেঙ্গে অনুপমা হল গেট থেকে বের হচ্ছে। সাড়ে আটটার মত বাজে। চার পাশে অন্ধকার। বৃষ্টি যেন বেগ বাড়িয়ে দিল। সেই সাথে বাতাস। এই মেয়ের ছাতা না উড়ে যায় আজকে!

অনুপমা সামনে দাড়িয়ে। কিছু ক্ষণের জন্য আমার মনে হল, পৃথিবীটা হঠাৎ করেই শব্দহীন হয়ে গেছে। আসে পাশের কোন শব্দই আমার কানে পৌছায় না। কতক্ষণ ওভাবে ছিলাম জানিনা। আমার হাতে সময় খুবই কম। আমি শেষ পর্যন্ত বলে ফেলি…

-অনুপমা, আমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজবি?

অনুপমা কিছু বলে না।

আমি আবার বলি,-চল বৃষ্টিতে ভিজি।

কথা গুলো বলেছিলাম মাটির দিকে তাকিয়ে, ওর মুখের দিকে তাকানো হয়নি।

অনুপমা মুখ নিচু করে দাঁড়িয়েছিল। একটা সময় ও কথা বলে ওঠে... -বাসায় যা। মেলা ভিজেছিস।

ওর কথায় কেন জানি আমার কোন কিছু মনে হল না। অনুভূতি মাঝে মাঝে মরে যায়। সে রাতে আমার অনুভূতির শেষ বিন্দুটুকুও যেন মরে গেল। সারা পৃথিবীর নির্লিপ্ততা তখন আমার স্বরে।

-চলে যাব?

-হুম, চলে যাবি। আমি আর পেছন ফিরে তাকাইনি। সে সুযোগও আমার ছিল না বোধহয়। এলোমেলো পায়ে অনেকটা পথ হেঁটে এসে বাংলা মোটরের কাছে এসে দাঁড়ালাম। বৃষ্টি সেই আগের মতই,বিরামহীন ভাবে তার দাপট দেখিয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় পানি জমে গেছে অনেক আগেই। নেহাৎ প্রয়োজনে বের হওয়া গাড়িগুলো সেই পানিতে স্রোত তুলে চলে যায়। কোথায় যে যাব, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। রাস্তা পার হয়ে ইস্কাটনের দিকে হাঁটা দিলাম।

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় নাটকের বোধহয় তখনও কিছু বাকী ছিল। হঠাৎ করে ফোনের এসএমএস টোনে,আমার এলোমেলো হাঁটায় ছেদ পড়ে। নেহাৎ নিরলিপ্ততায় এসএমএসটা খুলব না ভেবে ফোন পকেটে রেখে দিলাম। এমনিতেই বৃষ্টিতে ভিজে আমার ফোন প্রায় যায় যায় অবস্থা। মাঝে মাঝে অনেকে ‘কু’ ডাক শোনে। আমি মনে হয় সে রাতে ‘সু’ ডাক শুনেছিলাম। কী মনে করে যেন, ম্যাসেজটা পড়ে ফেললাম। কয়েকটা লাইনের এলোমেলো এক বার্তা ছিল সেখানে।

“তুই একটানা ৯ দিন আমার ফোন ধরিসনি। ক্লাসে সারাটা সময় দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তুই ক্লাসেও আসিস নি। আর আজকে হঠাৎ এসে বৃষ্টিতে ভিজতে চাইলি!! এতো সাহস কেন তোর??

তোকে এই শাস্তিটুকু দিয়ে হলে ফিরে অনেক কেঁদেছি। অনেক"।

(সমাপ্ত)

শেষের কিছু কথাঃ যাকে নিয়ে এই গল্পটা, তাকে নিয়ে একটু বলি। গল্পের নায়ক আমার এই বন্ধুটির নাম ‘কামরুল’। কামরুলের গল্পটাকে নিজের অনুভূতি থেকে কতটা লিখতে পেরেছি জানিনা। মজার ব্যাপার হল-আমাদের কামরুল গল্পের নায়কের চেয়েও ছিল আরও কয়েক গুন ভীতু। শেষ অবধি গাধাটা অনুপমাকে কিছু বলতে পারেনি। আমরা খুব চাইতাম ও একদিন বলুক। আমাদের চাওয়াটা কামরুল রাখেনি। ২০০৯ এর অগাস্টে আমরা শুনলাম কামরুল অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছে। আমরা সবাই খুব খুশি হয়েছিলাম। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে প্রথম কেউ বাইরে যাচ্ছে! ও যাওয়ার পর শুরুর কয়দিন আমার সাথে ওর মেইলে যোগাযোগ হত। পরের দিকে ওর নানা ব্যস্ততায় সে যোগাযোগটুকুও অনেকটা কমে যায়। সুরটুকু কেটে গিয়েছিল। তারপরও আমরা নিশ্চিত ছিলাম, মুখচোরা অনেকটা লাজুক আমাদের এই বন্ধুটি ঠিকই আমাদের কথা মনে করে, মাঝে মাঝে রাত জেগে কাঁদে। ২০১০ এর ডিসেম্বরে, শনিবারের কোন এক রাতে ব্রিসবেনের রাস্তায় কামরুলকে পাওয়া যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায়। কামরুল মারা যায় ২১শে ডিসেম্বর সকালে। আমার এই বন্ধুর মৃত্যুর খবরটা আমি পাই ও মারা যাওয়ার আরও মাসখানেক পরে। আমি এখনও বিশ্বাস করি না যে ও আমাদের মাঝে নেই। ডিসেম্বরের সকাল গুলোতে যখন চার পাশ কুয়াশায় ঢেকে যায়,তখন সে কুয়াশার কিছু অংশ আমাদের চোখেও ভর করে। আমরা ঘোরলাগা চোখে চার পাশে কামরুলকে খুঁজি।

Share