ভাষা নিয়ে যত কথা

লিখেছেন - রেজা শাওন | লেখাটি 596 বার দেখা হয়েছে

ঘটনা-১

 

নেদারল্যান্ডসে পা রাখার পঞ্চম দিনের মাথায় আমার নামের আগে “আগুন” লেগে গেল। ইউনিভার্সিটিতে সবাই মোটামুটি এক নামে চেনে। বাংলাদেশের ‘ফায়ার রেজা’।

 

নামের আগে এই অহেতুক আগুনটুকু কিন্তু আমি মোটেও চাইনি। কিন্তু আগুন ভয়াবহ জিনিষ, আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো ব্যাপারে ধার ধারে না। একবার লেগে গেলে থামানো কঠিন। আগুন লাগার গল্পটা বলি।

 

প্রথম দিন ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছি। ক্লাস ছিল না শুধু দেখবার জন্য গিয়েছি। ঘুরে ঘুরে দেখছি। যা দেখি তা খুবই মনোযোগ দিয়ে দেখি। অনেকক্ষণ এভাবে ভালই চলছিল, হঠাৎ আমি আবিষ্কার করলাম আমার মনোযোগ এতোই বেশি ছিল যে, কোন দিক দিয়ে উঠেছিলাম সে পথ ভুলে গেছি। ব্যাপার না। অবশ্যই কোথাও না কোথাও লেখা আছে। একটু খুঁজতে হবে এই যা।

কিন্তু একী হায়?? এই সব কি লেখা? ডিরেকশন বোর্ডে ডাচ ভাষায় যা লেখা আছে সেটা উচ্চারণ করতে গিয়ে আমার দাঁতে দাঁত বাড়ি খেল। তারপরও মেলা ক্ষণ চেষ্টা করে একটা পর্যায়ে এসে ছাড়ান দিলাম। এই কী এক জিনিষ উচ্চারণ করতে গিয়ে আমার বাকযন্ত্র বিকল হোক, সেটার দরকার নেই। বিকল্প কোনো উপায় বের করতে হবে। কাউকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো বলে দিত। কিন্তু বিশাল একজন মানুষ এভাবে নাদানের মত হারিয়ে গেছে, এটা কাউকে বলতে ইচ্ছে হল না। আমি নিজেই মাঠে নামলাম।

 

দুঃখজনকভাবে খুব একটা লাভ হল না। আমি লক্ষ্য করলাম, আমি চরকির মত ঘুরে ফিরে বার বার একই জায়গায় ফিরে আসি। বিকেল পাঁচটার মত বাজে। ৬টায় একাডেমিক বিল্ডিং বন্ধ হয়ে যায়। আমি চোখের সামনে “ছুটির ঘণ্টার” রিমেক দেখতে পাচ্ছি। একবারেই সময় নষ্ট করার সময় নেই। এই সিঁড়িতে যাই, ওই সিঁড়িতে যাই , দেখি সব সিঁড়িই আশ্চর্যজনক ভাবে ঘুর পাক খেয়ে উপর দিকে উঠে গিয়েছে। নিচে নামার সিস্টেম এই গাধাগুলা কেন যে রাখে নাই!

 

ওদের কে গাধা বলে আসলে আমি নিজেই হালকা একটা লজ্জা পাই। আরে গাধাতো আমি নিজে, নামার সিঁড়ি নিশ্চয়ই আছে কোথাও, আমি খুঁজে পাচ্ছি না। বিধাতা আমাকে প্রমাণ সাইজের একটা মাথা দিয়েছেন। উনি হয়তো চেয়েছিলেন এটা খালিই থাক। ও ওর নিজের খুশি মত সিস্টেম ইন্সটল দিয়ে নেবে। সিস্টেম আর ইন্সটল দেওয়া হয় নাই। আমি খালি মাথা নিয়ে ঘুরাঘুরি করি। আর মাঝে মাঝেই এই জাতীয় বিপদে পড়ি।

 

মিনিট পনেরো গিয়েছে। এই পনেরো মিনিট আমি মোটামুটি গুগল-ভূগোল যা কিছু আছে সবই ব্যাবহার করা হয়ে গেছে। কিন্তু নিচে নামার সিঁড়ি আর খুঁজে পাইনা। আমি যখন ধরেই নিলাম আজ রাতটা এখানে আটকা পরেছি, তখন মনে হল দক্ষিণ দিকের সিঁড়িটা আরেকবার দেখা দরকার। ওই দিকটায় যাই। সিঁড়ির উপরে বা দিকটায় অনেক কিছু লেখা। অনেক কিছুর ভেতরে শুধু “exit” লেখাটা আমার চোখে পড়লো। আমি যেন প্রান ফিরে পেলাম। তৎক্ষণাৎ “ইউরেকা,ইয়াহ” ইত্যাদি যাবতীয় আওয়াজের হুংকার তুলে আমি সশব্দে ওই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকি। একটা সময় বাইরে বের হওয়ার সেই কাঙ্ক্ষিত দরজাটা আমার চোখে পড়লো। তখন ওই সময়টায় আমার অনুভূতি নীল আর্মস্ট্রং এর চন্দ্র বিজয়ের চেয়েও কয়েকগুন বেশি। আমি ব্যাপক উত্তেজনা চোখে মুখে নিয়ে দরজার বাইরে আমার প্রথম পা টা রাখলাম। তারপরের দৃশ্যটুকু ছিল ইতিহাস।

 

মুহূর্তেই তীব্র ‘ক্যাঁ ক্যাঁ’ শব্দে গোটা এলাকা প্রকম্পিত হলো। আমি শুধু দেখলাম, হাই হিল পরা সব সুন্দরীরা পায়ের হিল খুলে সব হাতে নিয়ে যে গতিতে দৌড় দিচ্ছে, তার কাছে ‘উসাইন বোল্ট’ কিছুই না। দুই মিনিটের মাথায় এলাকা জনশূন্য হল। আর আমি তাৎক্ষণিক ভাবে নিজেকে সিকিউরিটির কুস্তীগিরদের মাঝে আবিষ্কার করলাম। মাঝখানের সময়টায় আমি আচানক একটা তব্দা খেয়ে দাড়িয়ে থাকা ছাড়া আর আর কিছুই করতে পারিনি।

 

পরে সিকিউরিটির লোকদের কাছ থেকে বিস্তারিত জেনেছিলাম। আমি আসলে বের হয়েছি ‘ফায়ার এক্সিট’ দিয়ে। পরে ওরা আরও জানাল, ইমারজেন্সির এই এক্সিটটা তৈরি হবার পর,তুমিই প্রথম মানব সন্তান যে এই এক্সিট ব্যাবহার করলে।

 

পরদিন আমি একটা মেইল পাই। আমার স্টাডি অ্যাডভাইজর আমাকে মেইল করেছে-

 

ডিয়ার রেজা  

 

আশা করি ভালো আছো। তুমি জেনে খুশি হবে যে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে “সারভাইভাল ডাচ” নামে ভাষা শিক্ষার যে কোর্সটা আছে সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমরা তোমাকে ডাচ ভাষা শেখার সুযোগ করে দিচ্ছি।

সাধারণত এই ভাষা শিক্ষার কোর্সটির ফী ৬০০ ইউরো। তবে তোমার জন্য এটা একবারেই ফ্রি!!

 

আমি বাংলা টাকায় ৬০০০০ টাকা বাঁচানোর আনন্দে তাৎক্ষণিক ভাবে আবারো ‘ইয়াহ-ইউরেকা’ বলে একটা লাফ দিলাম।

 

 

 

 

ঘটনা-২

 

শুরুর দিকে বাসা অনেক দূরে হওয়ায় প্রতিদিন আমাকে বাসে যাওয়া আসা করতে হত। বাসে উঠে সামনের দিকটাতেই বসতাম। নামতে সুবিধা। একদিন কেন যেন মনে হল, সবাই আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। আমি একটু নড়ে চড়ে বসি। খুব খেয়াল করে দেখি, কোথাও কোনো সমস্যা আছে কী না। নাহ সবই ঠিক আছে। শার্টের জায়গায় শার্ট আর প্যান্টের জায়গায় প্যান্ট। তাহলে সমস্যা টা কী? এরা এমন গরু গরু চোখে আমাকে এভাবে দেখছে কেন? আমি কোনভাবেই হিসাব মেলাতে পারি না। সম্ভাব্য সমস্যাটা খুঁজতে খুঁজতে আমার স্টপেজ চলে আসে। সেদিনের মত নেমে পড়ি। কিন্তু পরের দিনগুলোতেও একই কাহিনী। লোকজন সবাই আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আর আমি উদ্বিগ্ন হয়ে সেই রহস্যময় সমস্যা খুঁজি। কিন্তু বরাবরের মত কিছুই পাইনা।

 

একটা সময় মনে হল, এরা বুঝি আমার দিকে প্রেম নয়নে তাকায়। এতো এতো সাদা চামড়ার ভীরে একজন বিচিত্র চামড়ার প্রতি প্রেম জাগতেই পারে। আমি আনন্দে আত্মহারা হতে বাধ্য হই। আহারে বাংলাদেশি বুদ্ধিহীনা নারীকুল, তোমরা বুঝলেনা। একুশটি বসন্ত গেল, আমি আজো ফেসবুকে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস সিঙ্গেল দিয়ে ঘুরে বেড়াই। তোমরা কেউ তাকালেনা!! দেখ এদেরকে দেখ। এরা গুণী লোকের কদর জানে। মুখে মুখে না হোক, চোখে চোখেতো প্রতিদিন সম্মান দেখিয়ে যাচ্ছে। আমি আবারও সমগ্র ডাচ জাতির প্রতি ভালবাসায় বিগলিত হলামি

 

এর পরের দিন গুলোতে আমি মাঞ্জার আকাশে নতুন সূর্য হিসেবে উদিত হই। প্রতি দিন বাসা থেকে বের হওয়ার আগে সীমাহীন মাঞ্জায় আমার চুল আর বেশভূষা অলংকৃত হতে থাকে। ঢাকা থেকে নিয়ে আসা শার্টের মজুদে শর্ট পড়লো। আমার তখন মাঞ্জায় সীমাহীন বৈচিত্র্য দরকার।

 

একটা সমস্যা কিন্তু তখনও থেকে গেল। মেয়েরা নাহয় তাকায় ঠিক আছে। কিন্তু খেয়াল করে দেখলাম বাসে ছেলেরাও সমান তালে তাকাচ্ছে। আমাকে এই বার একটু কৌশলী হয়ে উঠতে হয়। নিজের মাঞ্জা যে ঠিক আছে এটা আমি নিশ্চিত। আমি একটু আসে পাশে তাকাই। দেখি যেখানে বসেছি ঠিক তার উপরে ডাচ ভাষায় কীসব যেন লেখা। আমি ফোনের ড্রাফটে লেখা গুলো লিখে সেভ করে ইউনিভার্সিটি আসি। এসেই ব্যাপক কৌতূহল নিয়ে গুগল ট্রান্সলেটে লেখাগুলো ট্রান্সলেট করি। অনুবাদখানা দেখে আমি কয়েক হাজার ভোল্টের একটা শক খাই। অনুবাদটা ছিল এমন-

 

এই সিটগুলো বয়স্ক,শারীরিক প্রতিবন্ধী আর গর্ভবতী মহিলাদের জন্য বিশেষভাবে সংরক্ষিত।”

 

সেদিনের শকের তীব্রতায় আমি মাঞ্জা মারার যাবতীয় কায়দা কানুন ভুলে গেলাম।

 

উপরের ঘটনাগুলো থেকে আমি যে শিক্ষাটা পাই, সেটা হল এই দেশে বাস করতে হলে এদের ভাষাটা শিখতে হবে। নাহলে প্রতিদিন এখানে সেখানে এরা আমাকে এদের নির্মল বিনোদনের উপাদান হিসেব ব্যবহার করবে। আমি ডাচ ভাষা শিক্ষা নিয়ে ব্যাপক সিরিয়াস হয়ে পড়ি। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে আমি কোনভাবেই কিছু করতে পারি না। আমি অনেক কষ্টে ‘ik ben’( i am) পর্যন্ত এসে আটকে গেলাম। এর পর শত চেষ্টায়ও এগুতে পারি না।

 

সমাধান খুঁজতে আমি অর্পিতার কাছে গেলাম। অর্পিতা এবার সারে চারে পড়েছে । অর্পিতার বাবা অভিজিৎ ভাই পি এইচ ডি করছেন এখানে। অর্পিতার জন্মও এখানে। অর্পিতা গুলির মত ডাচ বলতে পারে। আমার উপর মেজাজ খারাপ হলে অর্পিতা ডাচে ‘starout’(বদ পোলা) বলে বকা দেয়। আমি ওর কাছে গেলাম শেষ ভরসা নিয়ে।

 

 

-মামনি আমাকে ডাচ শেখাবে?

-শেখাব।( অর্পিতা দাঁত বের করে উত্তর দেয়)

 

-এখনই শেখাও। পারবে না?

-পারব। তুমি আমার সাথে সাথে বল।

-কী বলব?

-ইক প্লেসেন ডে হেলে ডাগ (ik plassen de hele dag)

-এর মানে কী মা?

-মানে হল, আমি সারা দিন পিসু করি।

-আমিতো সারাদিন পিসু করিনা মা।

-না তুমি কর। তুমি একটা ‘স্ত্রাউট’।

-স্ত্রাউট! স্ত্রাউট ! স্ত্রাউট!!

 

অর্পিতাকে এর পর অনেক ক্ষণ বোঝালাম। আমি আসলে ‘স্ত্রাউট’ না। অর্পিতা কিছুই বুঝলোনা। আমি নিদারুণ আশাহত হয়ে হাল ছেড়ে দিলাম। অর্পিতাকে বিশাল সাইজের একটা ভেংচি দেখিয়ে অভিজিৎ ভাইের বাসা থেকে বের হচ্ছি, ঠিক এই সময় উপর থেকে কে জানি পানি ফেলে আমাকে পুরাই ভিজিয়ে দিল। আমি আর উপরে তাকানোর সাহস পাইনা। আড়চোখে দেখি অর্পিতা তার দ্বিতীয় বালতি নিয়ে অ্যাকশনে যাওয়ায় জন্য রেডি হচ্ছে।

 

অর্পিতা শেখালো না তো কি হয়েছে? আমি ‘স্বশিক্ষিত জনই সুশিক্ষিত’ এই নীতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে দুই দিনের মাথায় শখানেক ডাচ সিনেমা জোগাড় করে ফেললাম। দেখা ও শেখা পদ্ধতিতে এবার ডাচ শিখে ফেলবো ইনসাল্লাহ!! ক্লাস থেকে ফিরেই আমি ডাচ মুভি নিয়ে বসি। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে আধা ঘণ্টার বেশি চোখ খোলা রাখতে পারি না। একটা পর্যায়ে চরম ধৈর্যচ্যুতি হলে আমি আমার সেই পুরানো বিনোদন গুরু ‘ইলিয়াস কাঞ্চনে’ ফিরে যাই। ল্যাপটপ খুলে ‘ইলিয়াস কাঞ্চন আর্কাইভস’ থেকে আমার খুব প্রিয় এই নায়কের সেই গানটা ছেড়ে দেই।

 

 

“মাইরো না, মাইরো না আমারে

আমি যে তোমারই দিওয়ানা”

 

গানের দৃশ্যে দেখা যায়, নায়িকা ‘অঞ্জু ঘোষ’ কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ইলিয়াস ভাইের উপর মাইন্ড খেয়েছেন। তাই উনি বাঁশের কঞ্চি নিয়ে নায়ককে ধাওয়া করেছে। নায়কও কম যায় না। নায়িকার মান ভাঙাতে নায়ক সাপের মত নাচতেছে, আর সেই সাথে চলছে গান-

 

 

মাইরো না, মাইরো না আমারে

আমি যে তোমারই দিওয়ানা।

 

আমি আমার ভাষাশিক্ষা পর্ব চুলায় দিয়ে, ইলিয়াস কাঞ্চনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

 

 

Share