ঘাসফুলদের ইতিকথা

লিখেছেন - রেজা শাওন | লেখাটি 648 বার দেখা হয়েছে

ক্লাস ফাইভের দিনগুলি আমার খুব কষ্টে কেটেছে। বৃত্তি পরীক্ষা আমার ছিল, কিন্তু টেনশন ছিল আমার মা’র। আমার উন্মত্ত দিনগুলোকে মা নানা ধরনের নিয়ম-কানুনের বেড়াজালে বেঁধে ফেললেন। বাবা চাকুরিসূত্রে বাইরে থাকেন। তাই আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে মা’র টেনশনের শেষ ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই মা’র নিয়ম শৃঙ্খলাজনিত নানা ধরনের পরীক্ষা চালানো হত আমার উপরেই। ছোট ভাইয়ের বয়স কম, তাকে কখনও কিছু বলাও হয়নি।

 

সব কিছুই গিয়েছে আমার উপর দিয়ে। বাসা থেকে একটু দূরে রেলস্টেশনের পাশে বিশাল এক পুকুর ছিল। সেই পুকুরের পানি সারা বছরই একরকম, খরার সময়ও মাঝ পুকুরে তিন মানুষ গভীরতা। সেই পুকুরে দল বেঁধে ডুব দিয়ে এপার ওপার খেলা। মা সেই সময় যে গল্পগুলো প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করতেন, সেগুলো হলো- “পুকুরে মাঝখানে শিকল আছে। একশত ছিয়াশি সংখ্যক জীনের পরিবার-পরিজন নিয়ে পুকুরের মাঝখানে বসবাস। তাই ভর দুপুর বেলা পুকুরে নামলেই খবর আছে। একেবারে শিকলের টানে নিয়ে যাবে মাঝপুকুরে। এরপর ঠিক ভর সন্ধ্যায় লাশ ভেসে উঠবে।”

 

মা’র এই সব গল্প শুনে রাতে তুমুল ভয় পেতাম। সকাল হতে শুরু করলে ভয় একটু একটু করে কমতো। আর দুপুর বেলা সেই ভয় যে কোথায় উড়াল দিত, সে খবর আমাদের কারোরই জানা ছিল না। রুটিনটা এমনই ছিল।

 

আমার শৈশবের বন্ধুরা ছিল এক এক জন দুরন্ত সাহসী। তারা জানতো কিভাবে সাইকেলের স্পোকের মাঝে বারুদ পুরে দিয়ে বন্দুক বানাতে হয়, কিভাবে ট্রেনের ছাদে করে আত্রাই নদীর উপরে বিশাল রেলের ব্রিজটা ঘুরে আসতে হয়। আমি এতো সাহসী ছিলাম না। আমি শুধু পুকুরে ডুবাডুবিতে ওস্তাদ ছিলাম। আর মার্বেল খেলতে পারতাম। শীতের শেষের দিকে ফাঁদ পেতে দুই একটা বকও ধরতে পারতাম। মার্বেল খেলাটা নেশা ছিল। কঠিন ধরনের নেশা। টাকায় ১৬টা মার্বেল পাওয়া যেতো। কত দিন যে স্কুল পালিয়ে ধুলো মাখা তেঘরের রাস্তাগুলোতে দাগ টেনে মার্বেল খেলেছি, সে হিসাব জানা নেই। ১৬ টা মার্বেল নিয়ে খেলা শুরু করে দিন শেষে পকেট ভর্তি মার্বেল নিয়ে বাড়ি ফেরার যে কী আনন্দ, কী যে আনন্দ, সেটা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই। মার্বেল খেলাটা পরে বাদ দিতে হয়েছিল বিশেষ কারণে। আমার ছোটভাইয়ের পছন্দের খাবার ছিল মার্বেল। মার্বেল দেখলেই, ‘ভাইয়া মজা’ বলে মুখে পুরতো। পরে মেলা কাহিনী করে, তার মুখ থেকে মার্বেল বের করতে হতো। একবার বোধহয় বেশি মজা পেয়ে গিয়েছিল। মজার আতিশয্যে সে মার্বেল গিলেই ফেলে। বাসায় বাবা নেই। মা সাড়ে তিন বছরের এই বদশিশুকে চূড়ান্ত বিপদে পড়লেন। শিশু মার্বেল গিলে ফেলে, মুখ হা করে থাকে। সেই হা করা মুখ আর বন্ধ হয় না। পুরো একটা দিন ডাক্তার-কবিরাজ গুলিয়ে খাওয়ানোর পর, পরের দিন শিশুর পেট থেকে স্বাভাবিক নিয়মে মার্বেল বের হলো।

 

এই ঘটনার ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। মা মার্বেলের কৌটা নিয়ে পুকুরে ফেলে দিলেন। বৃত্তি পরীক্ষারও আর বেশি দিন বাকী ছিল না। বাচ্চু মাস্টারকে আমার দায়িত্ব দেওয়া হলো। বাচ্চু স্যার ছিলেন, ওই সময়কার বৃত্তি স্পেশালিস্ট এবং সম্পর্কে আমার চাচা। বাচ্চু স্যার আমাকে আর পাশের বাসার মেয়েটিকে একসাথে পড়ান। আমি একদিনও পড়া পারি না। সন্ধ্যা বেলা ধুলোমাখা পা আর গায়ের ঘাম নিয়েই খেলা ফেলে কোনমতে দৌড় দিয়ে পড়তে আসি। স্যার বুঝলেন আমার শাসনের দরকার আছে। আমার জন্য ২৪ ইঞ্চির অর্ডার দিয়ে বানানো মোটা রুলার আনানো হলো। পড়া না পারলে বাচ্চু স্যার দূর থেকেই সপাং সপাং আওয়াজ তোলেন। সাধারণ রুলারের মাপ হয় ১২ ইঞ্চি। কিন্তু বাচ্চু স্যারের বিশেষ সেই রুলার ছিল ২৪ ইঞ্চি। উনি দূর থেকে আয়েশ করে বসেই আমাকে সাইজ দিতে পারেন। আমার এই দুরবস্থা দেখে আমার বান্ধবীর( বান্ধবী বলা ঠিক হচ্ছে না, সেই সময় শত্রু ছিল) মা’র মন দয়ায় আদ্র হলো। উনি পড়ার টেবিল থেকে সেই ঘাতক রুলারটি সরিয়ে রাখতেন। বালিকার মা’র মনে হয়তো আমার জন্য দয়া জন্মেছিল। কিন্তু বালিকার মনে জন্মায়নি। বাচ্চু স্যার রুলার চাহিবা মাত্র, সেটাকে দুনিয়া একাকার করে খুঁজে আনাকে বালিকা তার দায়িত্ব মনে করতো। সেই সাথে দাঁত বের করে আমার পিঠে পড়া সপাং সপাং বাড়ি উপভোগের অংশটুকু ছিল তার জন্য বাড়তি পাওনা। আমি সেই শিশু বয়সেই বুঝে গিয়েছিলাম, এই সুন্দর পৃথিবী নির্মম করে তোলার জন্য কিছু সংখ্যক বালিকার উপস্থিতিই যথেষ্ট।

 

তারপরও কিন্তু আমার বা আমাদের শৈশব থেমে ছিল না। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ আই সি সি ট্রফি জিতে দেশে ফিরলো। সুপারম্যান আর ক্যাপ্টেন প্ল্যানেটকে আমরা বিদায় করে দিলাম। আমাদের স্বপ্নের সেই মায়াময় জগতে আসলেন খালেদ মাসুদ পাইলট। আমরা সবাই শেষ ওভারে ছক্কা মেরে হিরো হতে চাই। মা আমাকে ক্রিকেট ব্যাট কিনে দিলেন। আমি ভাল ব্যাট করতে পারি না। বলও করতে পারি না। কিন্তু তাতে কি হয়েছে? পাড়ার খেলাগুলোতে বড় ভাইয়েরা আমার বাসায় ব্যাট চাইতে আসেন। সেই ব্যাট দিয়ে বিশাল বিশাল সব ছক্কা মারা হয়। আমার ব্যাট দিয়ে সেসব ছক্কা মারা হয়, এতেই বা আনন্দ কম কিসের??

 

আমার অদ্ভুত সুন্দর কৈশোরের শুরুর দিকে একটা পরিবর্তন আসে। ২০০১ সালে আমাকে ক্যাডেট কলেজে পাঠানো হয়। সেই জগতও ছিল আরেক ভালোবাসার জগত। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, শুরুর দিকের ক্যাডেট কলেজকে আমি আপন করে নিতে পারি নি। সারাটা ক্ষণ আমার মন পড়ে থাকতো, উত্তর বঙ্গের ছোট্ট সেই মফস্বলে। আর সেই ঘাসফুলগুলো। আমার ভালোবাসার ঘাসফুল।

 

এর পরের দৃশ্যগুলো আমার কাছে অস্পষ্ট। সেটা হওয়াটাই বোধহয় স্বাভাবিক। এরপর আমার স্বপ্নের মফস্বলকে আর কখনোই নিজের মত করে পাওয়া হয়নি। অনেক দিন হয়ে গেল, ঘাসফুলগুলো কেমন আছে, সে খবরও আমার জানা নেই। দীর্ঘদিন পর দেশে গিয়েছিলাম কিছু দিন আগে। দেশের বাইরে থাকলে একটা বদঅভ্যাস জন্ম নেয়। মিল-অমিল খুঁজে বেড়ানোর বদ অভ্যাস।

 

সীমান্তবর্তী আমার সেই ছোট্ট মফস্বল এখন অনেকটাই শহর হয়েছে। কলেজপড়ুয়ারা ভারতীয় বাইকে চড়ে আওয়াজ তুলে কলেজে যায়। আর তাদের চেয়ে ছোট যারা, তারা সেভাবে আর ক্রিকেটও খেলে না। এরা পিছনে ‘পাগলু’(ভারতীয় বাংলা ছবি) লেখা শার্টের কলার তুলে দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ঈদের সময় সবাই দল বেঁধে বাইকে করে ভারতীয় সীমান্তের খুব কাছের গ্রামগুলোতে চলে যায়। সেখানে বাড়িতে বসে, নিরাপদে ফেনসিডিল খাওয়ার সু ব্যবস্থা আছে। শুধু খাওয়াই নয়, বরং ব্যাগ ভর্তি করে সেগুলো শহর পর্যন্ত নিয়ে আসারও ব্যবস্থা আছে। তাই ‘পাগলু’রা খালি হাতে ফিরে আসে না। পরে সময়-অসময়ে আয়েশ করে খাওয়ার জন্য ব্যাগ ভর্তি করে ফেন্সিডিল নিয়ে আসে। পথে তিন জায়গায় বিজিবির চেকপোস্ট পড়ে। নিয়ম করে কড়া একটা চেক হয়,কিন্তু কিছুই ধরা পড়ে না।

 

আপনি যদি ট্রেনে করে ঢাকা থেকে কখনো দিনাজপুরের দিকে যান, তাহলে জয়পুরহাটের কিছু পরে হিলি নামে একটা জায়গা পড়বে। আপনার ট্রেনটার হয়তো সেখানে বিরতি দেবার কথা নয়। তারপরও সব ট্রেন সেখানে থামে। এর পর দেখার মত একটা দৃশ্য তৈরি হয়। হাজার হাজার মানুষ ট্রেনের দিকে দৌড়ে আসবে। আপনি কিন্তু একদমই ভয় পাবেন না। এরা আপনার কিছু করবে না। এরা ট্রেনের দরজায় কিংবা জানালায় দাঁড়ানো তাদের লোকদের হাতে কিছু বস্তা ছুড়ে দেয়। অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় সে বস্তা টেনে তুলে নেওয়া হয়। এরপর সেই বস্তাগুলো ঢাকায় আসে।

 

ভারত একদিক থেকে আমাদের সুবিধা করে দিয়েছে। বাংলাদেশে যে ফেন্সিডিলগুলো আসে, সেগুলো মূলত সীমান্ত থেকে ২০ কি.মি ব্যাসার্ধের এলাকায় যে কারখানাগুলো আছে, সেখান থেকেই আসে। ভারত খুব ভাল করেই জানে, তার পণ্য স্বল্পতম সময়ে বাংলাদেশী ভোক্তাদের হাতে পৌঁছানো তার দায়িত্ব। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই ফেন্সিডিলের এই কারখানাগুলো গড়ে উঠছে সীমান্তের একেবারেই কাছে। নিকটতম দূরত্বে।

 

আমার ছোট্ট মফস্বলে একটা চিনিকল আছে। এক সময় লাভ হতো। গত পরশুর খবরে পড়লাম, আখ নাই। মাড়াই বন্ধ। খুশিতে লাফ দিতে ইচ্ছে হলো। ভাল হয়েছে, অন্তত কৃষকের ক্ষতি হবে না। আখ সুগারমিলে দিলে দাম পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও এই বছরের পাওনা টাকা সুগারমিল দেয় সেই বছরে, ইত্যাদি নানা কাহিনী। এর চেয়ে প্রতি বছর লস করা, অচল এই সুগারমিল বন্ধ থাকুক। আখাচাষিরা ভারতীয় বস্তা এপার ওপার করার ব্যবসা করুক, এটা লাভজনক। এটাই ভাল।

 

সম্প্রতি বিএসএফের বাংলাদেশী যুবককে নগ্ন করে পেটানোর খবর নিয়ে দেশ তোলপাড়। এপারের দিপু আর ওপারের মমতা সমানতালে গালি খাচ্ছেন। আমরা যারা সীমান্তের খুব কাছে থাকি, তারা অবশ্য গালি-টালি দেইনি । আমরা জানি, একটা ঘাসফুলকে মেরে ফেলতে অনেকদিন সময় লাগে। ধীরে ধীরে সময় নিয়ে মারতে হয়। আমাদের চোখের সামনে আমাদের ঘাসফুলগুলোকে অনেকদিন ধরে অনেক পরিকল্পনা করে,ধীরে ধীরে মেরে ফেলা হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ একটি ধীরগতির চলমান প্রক্রিয়া।

 

 

আমার শৈশব-কৈশোরের মায়াময় মফস্বল এখন মৃত ঘাসফুলদের শহর

 

Share