একটি বরই গাছ এবং পাতার গল্প

লিখেছেন - ইয়াসির আরাফাত | লেখাটি 755 বার দেখা হয়েছে

বরই গাছ থেকে লাফিয়ে পড়তেই প্রেম । প্যান্ট ঝেড়ে উঠে দাঁড়াতেই ভেঙে গেছে । মানিক বন্দ্যোপাধ্যা্য়ের উপন্যাসে পড়েছিলাম আকাশ দেবতার কথা, জেনেছিলাম তাঁর বাঁকা চাহনির কথা । কিন্তু সেদিন নিজ চোখে দেখেছিলাম আকাশ দেবতার কটাক্ষে পুড়ে যাওয়া বৃন্দার মুখ । মন খারাপ কেন হয় জানতাম না বলেই প্রতিদিনের মত সেদিনও খেলতে গিয়েছিলাম চঙহোলা । বারবার চোখ ভিজে গিয়েছিলো যখন বরই পাতার জলে ভেজানো হলো বৃন্দার গা । মৃত্যু বোঝার বয়স হয়নি তখনো । এখনও  কি হয়েছ ? এখনও তবে কী খুঁজি ? সেদিন নিখিলেশের বাড়িতে বড় বড় চোখের মেয়েটাকে দেখে আমি তবে কার চেহারা মনে করার চেষ্টা করছিলাম ?

বৃন্দার মৃত্যুর পর তার বাব-মা চলে গেলেন কোলকাতা । এর বেশ কয়েকদিন পর সে বাড়িতেই জহিরকে দেখলাম, উঠানের উপর এক বৃদ্ধের সাথে বেড়া বানাচ্ছিলো । 

 

একদিন দুপুরে উত্তরের পুকুরে ঝাঁপ দিতেই দেখেছিলাম একজোড়া হরিণের চোখ ।

' তোমার দাদা কি হরিণ পোষত ? '- এই কথার উত্তরে পেয়েছিলাম প্রথম পত্র । লিখেছিলো মারা গেছে তার জন্মের রাতে । এও জানিয়েছে, ওর মা নাকি দিন রাত তাকিয়ে থাকতো হরিণটার দিকে । এভাবে অনেকদিন চোখের পলকে কেটে যাওয়ার পর একদিন সন্ধ্যায়, সারা গায়ে হলুদ মেখে চিত্রাকে বসে থাকতে দেখে মনে হয়েছিল, বিশেষ একটা কথা বলা হয়নি তাকে  । আগুনরাঙা বেনারশী শাড়ি পরে চিত্রা এসেছিলো আশীর্বাদ নিতে । গুটিসুটি মেরে বসে পায়ের ধুলো মাথায় নিয়েছিলো । মাথার উপর হাত রেখে আশীর্বাদ দিয়েছি । তবু যেন সেখানেও শেষ নেই, তাকে খুব বলতে ইচ্ছে হয়েছিলো সুনীলের কবিতার কয়েকটা লাইন…

 

কবি নয়, মুহূর্তে পুরুষ হয়ে উঠি

অস্থির দু’হাত

দশ আঙুলে আঁকড়ে ধরতে চায়

সিংহিনীর মতো ঐ যে তোমার কোমর

অবোধ শিশুর মতো মুখ ঘষে তোমার শরীরে

যেন কোনো গুপ্ত সংবাদের জন্য ছটফটানি । 

 

সেদিন রাতে ভেঙ্গে গেছে অনেক কিছু, আবার জন্ম হয়েছে অসামান্য কিছু বোধের । বেশি কিছু বলার সুযোগ ছিলো না , শুধু বলেছিলাম, পত্র দিও । এক বিকেলে পত্র পেলাম, লিখেছিলো-

 

শ্বশুর বাড়িতে আমি একা থাকি বললে চলে । চারপাশে যা কিছু ঘটে সারাদিন মনযোগ দিয়ে খেয়াল করি । প্রতিদিন দুপুরের আগে একটা লোক ঘরে ঘরে বরই, আমলকি, কামরাঙ্গা, জলপাই ইত্যাদি বিক্রি করতে আসে । একদিন সকালে ঘুম থাকে জেগে খুব টকফল খেতে ইচ্ছে হলো । অপেক্ষা করে থাকলাম সারাটা দিন । কিন্তু আমলকি, কামরাঙ্গা নিয়ে সেই লোক আর আসেনি । গতকাল ভয়ঙ্কর একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি । দেখলাম, গভীর রাতে নদী পার হবার জন্য আমি আর উনি নদীর ঘাটে নৌকার জন্য অপেক্ষা করছি । একসময় নৌকা এলো । উনি নৌকায় উঠে গেলেন । আমি যে-ই নৌকায় উঠতে যাবো দেখি ঘাট থেকে ধীরে ধীরে নৌকা সরে যেতে লাগলো দূরে । আমি চিৎকার করছি । কিন্তু কোন শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম না । ঘুম ভাঙার পর থেকে খোয়াবনামা হাতে নিয়ে বসে আছি । আচ্ছা তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি- কাঠবিড়ালির চারা লাফায় উঠানে । জানো তার মানে ? 

 

শেষবার যে পত্র পতিগৃহ থেকে লিখেছিলো সে, সেখানেও আমার প্রতি অজস্র অভিযোগ অনুযোগ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো । কোনটা রাগ কোনটা অনুরাগ তা-ই বুঝিনা, সংসার বুঝবো ছাই ।

গত বছর শ্রাবণের ঝুম বৃষ্টি মাথায় করে শ্বশুর বাড়ি চলে গিয়েছিল চিত্রা । সেদিন মমিন চাচা জড়িয়ে ধরে অনেক্ষণ কেঁদেছিলেন । বলেছিলেন, বড্ড একা হয়ে গেইলাম রে মঞ্জু । তারপরের বছর ভাদ্র মাসের বিভ্রম জাগানো এক রোদেলা দুপুরে বাড়ি ফিরলো চিত্রা ; সন্তান সম্ভবা । দিঘির ঘাটে দেখা হয়েছিল তার সাথে । মোটা পেটটা শাড়ির আঁচলে ঢেকে আমলকি গাছে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল সে । শুধু দাঁড়িয়েই ছিল । তার দুই দিন পর অসময়ে আজান শুনে বুঝতে পেরেছিলাম হরিণের চোখ নিয়ে আরেকজনের জন্ম হয়েছে । কেন জানি সেদিন খুব আনন্দ লেগেছিল মনে । উঠানে লাগিয়েছিলাম একটা কাঁঠালি-চাঁপার গাছ । আমার জন্মের দিন দাদাও বাড়িয়েছিলেন এক অদৃশ্য বংশীয় বৃক্ষের ডাল । কিন্তু গোঁড়া কেটে তিনি নিজেই প্রথমে চলে গেলেন । তারপর চাচারা কেটে নিয়ে গেলেন যার যার ডাল-পালা । শুধু আমরাই থেকে গেলাম দাদার বাড়ি ; চিত্রাদের পাশের বাড়িতেই ।

 

শেকড়ে বাঁধা পড়েছি বলেই হয়ত আমার ভেতর বৃক্ষ ভাব প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে । সারাদিন বাড়িতেই থাকি, পাতার পরিচর্যা করি । চিত্রার মেয়ের নাম রেখেছি পাতা । অথচ যাপনের জন্য আমি সবসময় একটা পাখির জীবনের কথাই ভাবতাম । সারাদিন উড়াউড়ি, গ্রাম-গ্রামান্তর, দেশ থেকে দেশান্তর । ক্লাস ফাইভে পড়েছিলাম আল মাহমুদের অদ্ভুত এই ভাবনার কথা । তিনি লিখেছিলেন, '' তোমরা যখন শিখছো পড়া মানুষ হবার জন্য আমি না হয় পাখিই হবো, পাখির মতো বন্য । ''

হেলাল হাফিজ অবশ্য পাখি হতে চেয়েছিলেন প্রেমিকার মৌনতা খাওয়ার জন্য । এই কারণটাও আমার খুব পছন্দের ছিলো । আমিও যদি হতে পারতাম প্রেমিকার মৌনতা খাওয়া তেমন একটা আমরণ পাখি ! স্বল্পভাষী চিত্রা আরো চুপচাপ হয়ে উঠছিলো দিন দিন । একটু মৌনতা খেয়ে নিলেই হয়ত সেবার ঠিক বেঁচে যেতো চিত্রা ।

ভয়ে ভয়ে একদিন চিত্রাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কবে চইলা যাবা ? জবাব দিয়েছিলো, বইলা যাবো ।

 

কোন কিছুর উপর থেকে লাফিয়ে পড়ার মত স্বাভাবিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে একদিন পড়েছিলাম বৃন্দার প্রেমে । এই ঘটনার বর্ণনা প্রসঙ্গে যে বরই গাছটির কথা উল্লেখ করেছি, সেটা এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে উত্তরের যে পুকুরে ঝাঁপ দিতে গিয়ে চিত্রাকে প্রথমবার দেখেছিলাম, ঠিক তার পাশে । প্রায়ই আমি বসে থাকি সেই বরই গাছের নিচে । তাকিয়ে থাকি, খেয়াল করে দেখি তার এক একটা পাতা । প্রতিবছর পুরানো পাতা ঝরে গিয়ে জন্ম দেয় নতুন পাতার । এই বরই পাতার গন্ধ নিয়ে চলে গেছে দাদা, বৃন্দা, মমিন চাচার বৌ, ছেলেবেলার বন্ধু জহির । আমার বয়সী জহির অল্প বয়সেই ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো স্বপ্না নামের এক হিন্দু মেয়েকে । তাদের এই সম্পর্ককে রক্ত-মাংস দিতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে দেখেছি জহিরকে । অনেকবার পুকুরঘাটের আবছা আলোতে জহিরকে বসে থাকতে দেখেছি ঘুমহীন । এসব রাতে একান্ত কিছু স্বপ্নের কথা শুনতে শুনতে কতবার যে দেখেছি তার কপালের নীচে একজোড়া নাবিকের চোখ ঠিক মনেও নেই । শুধু মনে আছে বরই পাতায় ঢাকা তার চোখদুটো । জহিরের কথা মনে হতেই আমার মনে পড়ে জীবনানন্দ দাশের কবিতা- আট বছর আগের একদিন । আমি যদি কবি হতাম জীবনানন্দের মতোই লিখতাম-

 

শোনা গেল লাশকাটা ঘরে

নিয়ে গেছে তারে;

কাল রাতে - ফাল্গুনের রাতের আধাঁরে

 

যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ

মরিবার হল তার সাধ। বধূ শুয়ে ছিল পাশে - শিশুটিও ছিল;

প্রেম ছিল,আশা ছিল-জোৎসনায়,-তবে সে দেখিল

কোন ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেলো তার?

অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল - লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার।

এই ঘুম চেয়েছিলো বুঝি!

 

রক্তফেনা-মাখা মুখে মড়কের ইদুঁরের মত ঘাড় গুজি

আধার ঘুজির বুকে ঘুমায় এবার;

কোনোদিন জাগিবেনা আর।

 

কিসের দুঃখ ! কি এমন অপমান নেমে এসেছিল জহিরের জীবনে যার স্রোত তাকে টেনে নিয়ে গেছে স্বপ্নহীন এক জগতে ! নাকি সে যেখানে চলে গেছে সেটাই একমাত্র স্বপ্নের দেশ ? জহিরের স্বপ্ন আমার চোখেও লেগেছিলো তার বোন চিত্রাকে ঘিরে । কিন্তু জহিরের মতো সাহস ছিলো না বলেই চিত্রাকে বলা হয়নি এই বিশেষ কথাটা ।

 

চিত্রার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি । পাতাকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছে বুঝিবা । এই গরমে ঘরে থাকতে চায় না হয়ত । আমি সাবধানে ডাক পাড়ি - চিত্রা

আমার পেছনে অন্ধকারের সাথে আঁটসাঁট হয়ে দাঁড়ায় সে । নিচু স্বরে জানতে চায়- কেমন আছ মামুন ?

- ভালো । দাও, পাতাকে আমার কোলে দাও ।

দুই হাতের তালুর ভেতর পাখির মতো ধরে রাখি পাতাকে ।

 

- আজকাল জহিরের কথা মনে পড়ে খুব ।

--হুম ।

- পাতার বাবার কোন খোঁজ পেলে ?

--নাহ ।

- দুই বছরতো হয়ে গেলো । তোমার শ্বশুরবাড়ির কারো সাথে যোগাযোগ হয়নি ?

--জানি না ।

আমি আর কথা খুঁজে পাইনা । অন্ধকারের ভেতর আলো হয়ে ফুটে উঠা পাতার শাদা দাঁতগুলো দেখতে থাকি । ভাবি, একদিন এর মধ্য হতে ফুটবে অজস্র কথার খই ।  জানতে চাইবে কাকু, বাবা আসে না কেন ? সেদিন তার নিখোঁজ বাবার খোঁজ আমি কই পাবো ? এসব ভাবতে ভাবতে একসময় আলো আসে । গ্রামীণ পল্লী বিদ্যুৎ । যাবার সময় চিত্রা বলে গেলো- যাই ।

 

যাবার আগে যে বলে যাবার কথা ছিলো । কথা রেখে বলে গেছে চিত্রা । হাতে মেহেদী, পায়ে আলতা আর গলায় কলসি বেঁধেউত্তরের পুকুরে নেমে পড়ার আগে ; যার পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা বৃদ্ধ হয়ে যাওয়া বরই গাছ ।

কাঁঠালি-চাঁপার গাছে নতুন পাতা এসেছে ।

দূর থেকে পাতার কান্না শুনতে পাচ্ছি । 

 

Share