চিঠির প্রতিটা শব্দ গল্প

লিখেছেন - ইয়াসির আরাফাত | লেখাটি 700 বার দেখা হয়েছে

কাঁক পোড়া গন্ধ ছড়াচ্ছে প্রকৃতি । এমন প্রখর রোদ উপেক্ষা করে মানুষের ঘামে ভেজা শরীরের ভীড় ঠেলে শহরের ব্যস্ততম সড়ক ধরে হাঁটছি আমি । বুকপকেটে সযত্নে সুবাস ছড়াচ্ছে একজনের মন । আসলে একটা চিঠি ; যেখানে মেয়েটাই লিখেছে- ‘ কাগজে লেখা চিরকুট নয় শুধু, আমার মন পাঠালাম ।’

যে মেয়েটির মন নিয়ে আমি হাঁটছি আমি তাকে চিনি না ; তবে সে আমাকে চিনে । অনেক আগে আমাদের বাড়িতে ব্যবহৃত টেলিফোন নাম্বার সে জানে । যেটা আমার নিজেরও ঠিক মনে ছিলোনা । কলেজে পড়ার সময় একবার রোড এক্সিডেন্টে প্রায় মরে গিয়েছিলাম । বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে গিয়েছিলাম চট্টগ্রাম, এই ঘটনার কথা ও সে চিঠিতে লিখেছে । আরো লিখেছে- যে কোন উজ্জ্বল রঙের প্রতি আমার তীব্র আকর্ষনের কথা, অন্ধকার ভীতির কথা, বিনয় মজুমদারের কবিতা প্রীতির কথা, আমার বুকের ডানপাশে কালো জন্মদাগটির কথা ।

 

আমি কিছুটা অস্থির বোধ করছি । ছোটবেলা থেকে ছাগলের মতো ঘি'য়ে ভাজা বেলপাতা খেয়েছি অথবা তেঁতুল গাছের ত্রিসীমানায় যাইনি বলেই হয়ত আমার স্মৃতিশক্তি বেশ ভালো । কিন্তু আমি কিছুতেই পত্র-লেখিকাকে চিনতে পারছিনা । তবে মেয়েটার জন্য আমার ভেতর চমৎকার একটা বোধ তৈরি হচ্ছে । আশ্চর্য সব কথা লিখে রেখেছে সারাটা চিঠি জুড়ে । এক লাইন ভেবে, তারপর অন্য লাইন পড়তে হয় । এক জায়গায় লিখলো-

 

শব্দ করে বলো ‘ভালোবাসি’ , দেখবে বুকের মধ্য হতে একটা মৌমাছি উড়ে যাবে ; পড়ে থাকবে এক ফোঁটা মধু ।

 

কি জানি কি অর্থ এসব কথার । অন্য এক জায়গায়  লিখলো-

 

ধরো একটা বৃক্ষ । তার শাখায় শাখায় নতুন মুকুল এসেছে ; দেখতে  আসবে না ?

 

এসব কথার অর্থ আনিস অবশ্যই জানবে । আনিস- দি পত্রলেখক । চিঠির সাংকেতিক ভাষা উদ্ধার এবং চিঠি লিখে দেওয়া, এই ছিলো বন্ধুমহলে আনিসের কাজ । আমার মনে পড়ে আফ্রোজার লেখা চিঠির কথা । একই স্যারের কাছে পড়তে যেতাম আমি আর আফ্রোজা । সে হাসলে গালের বাম পাশে গভীর একটা গর্ত হয়ে যেতো । আমি বলতাম একটা পুকুর হতো । ভয়ানক সুন্দর সেই পুকুরে আমি প্রায়ই গলায় কলসী বেঁধে নেমে পড়তাম । একদিন সে আমার রসায়ন বইটা চেয়ে নিলো বাসায় নিবে বলে । পরদিন যখন বইটা ফিরিয়ে দিলো ঠিক এরকম একটা সুবাস বইয়ের মধ্য হতে বেরিয়ে এসেছিলো । বাসায় ফিরে ‘পর্যায় সারণী’ অধ্যায় খুলতেই পেলাম একটা পত্র । প্রথম পত্র । এক জায়গায় লিখেছিলো-

 

আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে ,

তোমার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে ,

চিঠি লিখব না ।

আমরা একত্রে আছি বইয়ের পাতায় ।

 

আনিস অনেক্ষণ ধরে চেষ্টার পর বীনয় মজুমদারের কবিতার ভাষা, রসায়নের ভাষায় লেখা এই চিঠির পাঠ উদ্ধার করতে পেরেছিলো । তবে সেই পত্রের জাবাব আমার দেয়া হয়নি । কারন, সারাদিনের ঘুরাঘুরিতে বুকপকেটে ভিজে যাওয়া পত্রটা পেয়েছিলেন আমার মা । মায়ের প্রতি আমার ভালোবাসা ভাগ হয়ে যাবে এই ভয়ে আম্মু স্যারের বাসায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন । আফ্রোজার সাথে আর দেখা হয়নি আমার । অনিসের দেখা পেলে ভালো হতো । আনিস এখন কোথায় থাকে জানি না । তার সাথে যোগাযোগ নেই এক যুগেরও বেশী ।

 

হাঁটতে হাঁটতে এক সময় আমি চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমীর সামনের রাস্তায় চলে এলাম । এখানে এসে আমার চিন্তায় ছেদ পড়লো । দেখলাম একজোড়া ছেলেমেয়ে বসে আছে রাস্তার ধারে । ছেলেটা হাত নেড়ে, মাথা দুলিয়ে কি সব বলে যাচ্ছে আর মেয়েটা হেসে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে ছেলেটার গায়ে । অদ্ভুত সুন্দর এসব দৃশ্য দেখার জন্যই বুঝি পরম করূণাময় এই পৃথিবী বানিয়েছেন । নাকি বুকপকেট থেকে উঠে আসা আশ্চর্য্য সেই গন্ধটা আমার ভেতর সৌন্দর্যের ব্যপারে একধরনের বিভ্রম তৈরি করেছে ? নয়ত রাস্তার পাশের খোলা ডাষ্টবিনগুলোকেও কেন মনে হচ্ছে জয়নুলের এক একটা পোর্ট্রেট ? বিপরীত দিক হতে ছুটে আসা প্রতিটা রিক্সাকে কেনই বা মনে হবে উড়ে আসা এক একটা প্রজাপতি ? প্রতিদিন সন্ধ্যা নামতেই ঘরে ফেরা পতঙ্গের মতো যে আমি ফিরে যাই ঘুমঘরে, কিসের উত্তেজনায় আমি এখনো জেগে আছি রাস্তায় ?

 

এই মুহুর্তে তিনজন যুবক আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে । একজনের হাতে ধারালো ক্ষুর । এদেরকে দেখে আমার একটা কৌতুক মনে পড়ে গেল । হ্যাঁ, কৌতুক । এরকম উদ্ভট মজা প্রায়ই জীবন আমাদের সাথে করে থাকে । শফিকের সাথেও করেছিলো । শফিক আমাদের এক বছরের বড় । মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার জন্য মেধাবী ছাত্র হিসেবে শফিক পেয়েছিল জেলা পরিষদ পদক । কি এমন অনর্থ ঘটলো শফিক কাছে টেনে নিয়েছিলো নেশার আধি-ভৌতিক জগত । হিরোইন নিয়ে বুদ হয়ে থাকতো প্রায় । এই বস্তুর নাম কেন হিরোইন হয়েছে জানা নেই আমার । সেটা এখানে অপ্রাসঙ্গিকও বটে । তবে নেশার টাকা জোগাড় করতে ছিনতায়ের উদ্দেশ্যে শফিক যখন অন্ধকার গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতো তখন তার হাতেও শোভা পেতো একটা ঝকঝকে ক্ষুর । এর-তার হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে পালানোর সময় অনেক মানুষের বোধগম্য হতো না জীবনের এই কৌতুকের অর্থ । জীবনের কৌতুকটা ছিলো নিষ্ঠুর । এতোটাই ব্যঙ্গাত্মক ছিলো যে, শফিক এক মহিলার ব্যাগ নিয়ে পালাতে গিয়ে বজ্রাঘাতের মত দাঁড়িয়ে পড়েছলো । কারণ অন্ধকারের আধো আলোয় যে মহিলার চেহারা সে দেখেছিলো সেই মহিলা ছিলো ওর মা । শফিক আজো বাড়ি ফিরেনি ।

 

যে ছেলেগুলো আমাকে ঘিরে আছে ছিনতায়ের উদ্দেশ্যে তারা আমাকে চিনতে পারছে না । কিন্তু আমি তাদের চিনতে পারছি । তাহলে কি আমার প্রার্থনা সত্যি হতে যাচ্ছে ! একটা কবিতায় লিখেছিলাম ...

মনে রাখার মতো কিছু নেই, 

মনে রেখো না ; 

অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে না মানুষ । 

এমনতো হতেই পারে কারো মনে নেই আমার কথা । 

অপরিচিতের মতো দাঁড়ালে, হেঁটে গেলে 

চিনতে পারছো না ।

 

                  চিনতে না পারার জন্যই বোধয় আমার প্রতি তারা খুব একটা সুহৃদ না । তাদের একজন একটা কুৎসিত গালি দিয়ে বললো- দামি যা কিছু আছে দিয়ে দিতে । নয়তো ছেলেটা তার হাতের ক্ষুরটা পিকাসোর তুলির শৈল্পিক আঁচড়ের মতো আমার পেটে চালিয়ে দিবে ।

কিন্তু ছেলেটার প্রথম কথাটা আমাকে ভাবনায় ফেলে দিলো । এই মুহুর্তে বুকপকেটে রাখা চিঠিটাই আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান । কিংবা বার্সেলোনা রিয়েল মাদ্রিদ্রের পুরানো একটা ম্যাচের টিকেট আছে মানিব্যাগে ; স্মৃতির ঐ টুকরোটাও আমার কাছে অমূল্য । এসব দিলে তারা কি চলে যাবে ? মনে হয় না ; বরং এই মুহুর্তে আমার কাছে মূল্যহীন, কিছু টাকা আর মোবাইল সেটটা দিয়ে দিলাম ।

তারা চলেই যাচ্ছিলো, হঠাৎ তাদের একজন এসে বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে বুকপকেট থেকে চিঠিটা নিয়ে গেলো । একটুর জন্য আমার মনে হলো আমি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি । ছেলেটা দৌঁড়ে যতটা দূরত্বে যাচ্ছে আমি পৃথিবী থেকে ততোটাই দূরে সরে যাচ্ছি । আমার মনে হলো, আর কখনোই এই চিঠির জবাব দিতে পারবো না আমি । মেয়েটি হয়ত প্রতিক্ষায় থাকবে । প্রতিদিন ডাকপিয়নের খোঁজ নিবে ।

 

একসময় তারও মনে থাকবে না এসব কিছু।

Share