গল্পের নাম চন্দ্রগ্রস্থ

লিখেছেন - ইয়াসির আরাফাত | লেখাটি 751 বার দেখা হয়েছে

 ১.

 

একদিন একজন যাদুকর আসে বাজারে, তার যাদুর বাক্‌সভরা অলৌকিক সব গল্প।

 

“কতগুলো সূবর্ণ পাখির ডানা পুড়ে যায় দুঃস্বপ্নের আগুনে। ‘দুঃস্বপ্ন’ এখানে স্বপ্নের দোষ, স্বপ্নদোষ কিংবা গড়পড়তা মানুষের যে জীবন, তার ডাক নাম। হাজার হাজার ডানা, নীলরঙ আগুনের পালক। কেউ একজন তাদের নির্মাণ করে তার কল্পনায়। অথচ তারা নিজেদের অস্থিত্ব বিশ্বাস করে বেঁচে থাকে নিশুতি রাতে অন্ধ পেঁচার মতো” ।

 

যাদুকর গল্প বলে যায়। কিছুই বুঝেনা মানুষ।

 

রাজধানী থেকে কয়েক’শ মাইল দূরে বিভাগীয় শহর থেকে আরো দুইশ কিলোমিটার পাকা রাস্তা পার হয়ে ৩০ কিলোমিটার কাঁচা পথ পাড়ি দিলে সমুদ্র উপকূলীয় সন্ধ্যার মতো নির্জন একটা গ্রাম। গ্রামের মানুষগুলো সহজ, সরল, আর বিশ্বাসী। ওরা সন্ধ্যার রোমান্টিকতার সাথে তখনো পরিচিত হয়ে উঠেনি এবং রাতের অন্ধকার আর তার ভয় ভীতি জয় করতে পারেনি বলেই সূর্য ডোবার পর পুরো গ্রামকে নৈঃশব্দের বৈয়ামের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলে।

 

গ্রামে সব মিলিয়ে তখনো হাজার তিনেক মানুষের বসতি এবং একটাই মাত্র বাজার। প্রকাণ্ড একটা বট গাছকে কেন্দ্র করে সেই বাজার বসে সপ্তাহে সাতদিন। কতবছর আগের পুরানো এই বট গাছ সেই হদিস কেউ না জানলেও কোন এক কালবৈশাখী ঝড়ে বিরাট এক উটপাখির পীঠে করে এই বটবৃক্ষ এই গ্রামে উড়ে এসেছিলো বলেই গ্রামবাসী বিশ্বাস করে।

 

একটা লাল কাশ্মীরী চাদর বিছিয়ে, বিভিন্ন ধরনের হাড় কঙ্কাল ঝুলিয়ে, আরব্য রজনীর গল্পগুলোর মতো অতিলৌকিক একটা আবহ সাজিয়ে বট গাছের নিচে বসে থাকে যাদুকর। অদ্ভুত কারুকার্যময় সুন্দর সুন্দর সব তাবিজ সামনে সাজিয়ে রাখে। প্রাচীন কয়েকটা ধর্মীয় গ্রন্থ চকচকে রঙিন কাপড়ে আলাদা আলাদা করে মুড়িয়ে সাজিয়ে রাখে তার পাশে। বেলা বাড়ে, ধীরে ধীরে মানুষজন গোল হয়ে বসে পড়ে যাদুকরকে ঘিরে।

 

যাদুকর গল্প বলে,

 

 

২.

 

যাদুকর তার দ্বিতীয় গল্পটি যেদিন শোনায় সেদিন রাতে গ্রামে কিছু পুরুষের স্বপ্নদোষ হয়। তারা তাদের রমণীদের শোনায় সে সব গল্প। তারা ভয় পায় আর হাসতে থাকে। লজ্জার কারনে সে ভয় তাদের মধ্যে একধরনের আনন্দের ইশারা দেয়। তারা আরও গল্প শুনতে চায়। অতঃপর যাদুকর তাদের শোনায়,

 

“আফ্রিকান মেশিনবাহী যুবক-যুবতীর মুখে মুখে বাংলাদেশী যে মেশিনের ফ্যান্টাসিগীত শোনা যেত, সেই মেশিন বেয়েই নাকি একদিন আমেরিকানরা পৌঁছে যায় চাঁদে। সেই শুরু, জয় গুরু। তারপর রাতদিন শুধু মানুষ যাচ্ছে চাঁদে” ।

 

সহসা একজন জানতে চায়, কোন চাঁদ ভাইসাব? আমার চালার ফুঁটা দিয়া গোল মতন শাদা যেটা দেখা যায় সেটা নাকী... ?

 

যাদুকর বিরক্ত হয়। সেদিন সে আর গল্প বলে না।

 

এরপর অনেকদিন যাদুকরের আর দেখা নেই। গ্রামবাসী ভুলে যায় যাদুকর, মেশিনম্যান ও তৎসম্পর্কিত সকল গল্প। কেবল সেদিন গল্পের মধ্যে প্রশ্নকর্তা যুবকটির মনে তখনো আগ্রহ থেকে যায়। সে অপেক্ষা করতে থাকে যাদুকরের।

 

একদিন বেলা-ঠিক-দুপুরে যাদুকর গ্রামে আসে। খবর শুনে যুবকটি ছুটে যায়। যাদুকর তাকে দেখে বিরক্ত হলেও ঐদিন মন দিয়ে শোনে যুবকের কথা। যুবক প্রথমে জানতে চায় এতোদিন সে আসেনি কেন?

 

যাদুকর যুবকের কানে কানে বলে, সে গেছিলো চাঁদে। ওখানেই তার পার্মানেন্ট রেসিডেন্স।

 

এতো ইংলিশ বোঝে না যুবক। উল্লাসিত উচ্চস্বরে শুধু জানতে চায় সে,  “কোন চাঁদ ভাইসাব? আমার চালার ফুঁটা দিয়া গোল মতন শাদা যেটা দেখা যায় সেটা নাকী... ?”

 

বলে যুবক আর থামে না। হর হর করে বলতে থাকে, “ ভাইসাব আমিও যেতে চাই চাঁদে। আম্মা বলছে, আমার দাদাও চাঁদে গেছে চান্দের গাড়ির ছাদে করে। অনেকদিন বাড়িত আসেনা। ওর নাম মুবিন, সাবাই ডাকে মুবিন্যা। সেদিন আপনি বললেন কার যেন মিশিন বেয়ে বেয়ে চাঁদে যাচ্ছে লোকজন।আমিও যাবো। ”  বলে দম নেয় যুবক।

 

আবার শুরু করে বলা, “দাদার সাথে আপনার নিশ্চই দেখা হবে, আপনি নিজেও আসা যাওয়া করেন। পরের বার গেলে মনে করে বলবেন, আমাদের কালুনী নতুন ছা বিয়োইছে। কালুনী হইল আমাদের গাই” ।

 

যাদুকর মন দিয়ে শোনে যুবকের কথা। অনেক কথা বলে শেষে তাকে যাদুর বাকসো থেকে বের করে দেয় একটা তাবিজ। কিভাবে কি করতে হবে, অতিঅবশ্যই লোকচক্ষুর অন্তরালে, সব বলে দেয় তাকে।

 

 

৩.

 

যুবক কালো সুতা দিয়ে কোমরে তাবিজ বেঁধে ঘুমাতে যায় রাতে। সে স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নে দেখে আসমান সমান উঁচা একটা পিচ্ছিল সুপারী গাছ। যুবক বেয়ে বেয়ে উঠতে থাকে আর খালি পিছলায় পড়ে যুবক। এভাবে অনেক্ষণ চেষ্টার পর একসময় তার ঘুম ভেঙে যায়।

ভেজা লুঙ্গি নিয়ে যুবক পুকুর ঘাটে যায়। তার মনে হতে থাকে ঘুম ভাঙার ঠিক আগে কার যেন মুখ দেখেছে সে। কিন্তু কার, তা আর মনে করতে পারে না।

 

একটা খেজুর গাছ পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে একা নিঃসঙ্গ, মাঝে মাঝে বাতাসে দোল খায় তার পাতা। চারদিকে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। চাঁদ ঝুলে আছে পুকুরের উপরে, পানিতে তৈরি করে তার প্রতিবিম্ব। অদূরে শেয়ালের ডাক শোনা যায়। পুকুর পাড়ে বাঁধানো ঘাট। যুবক পানির একেবারে কাছের সিঁড়িতে গিয়ে বসে। চাঁদের প্রতিবিম্ব পড়েছে তার মুখ বরাবর নীচে। সে অনেক্ষণ চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে। পাশের বাড়ির কুকুরটা বিকট শব্দে ডেকে উঠে তখন। যুবক ভয় পায়। চাঁদের প্রতিবম্বের জায়গায় সে কার যেন চেহারা দেখতে পায়, দ্রুত আসমানের দিকে চোখ তোলে তাকায় সে। এমন সময় যুবক তার শরীরে একটা শীতল হাতের স্পর্শ বুঝতে পারে।

 

পাশ ফিরে যুবক তাকিয়ে দেখে তার পাশে বসে আছে যাদুকর। যাদুকরের হাতে মেসোয়াকের মতো একটা কাট জাতীয় বস্তু, সেটা দিয়ে দাঁত মাজছে মাঝে মাঝে। যাদুকর যুবকের দিকে তাকিয়ে হাসে।

 

“কী ভাই এতো রাতে পুকুর পাড়ে? লুঙ্গী গামছা হাতে, গোসল করবেন? স্বপ্ন দোষ হইছে?”

 

যাদুকরের কথায় যুবক লজ্জা পায়। যুবকের মনে পড়ে স্বপ্নের শেষের দিকে সে কার চেহারা দেখেছিলো। যুবক আবারও লজ্জা পায়।

 

এবার যুবক প্রশ্ন করে, আপনে এতো রাইতে?

“আজকে চাঁদে সেইভ দা ওয়াটার দিবস।” যাদুকর জবাব দেয়।

যুবকের মাথায় কুলায় না। শুধু বোঝে চাঁদ, বলে, ‘আপনি এখন চাঁদ থেকে আসতেছেন?’

যাদুকর একদলা থুথু ফেলে ঘাড় নাড়ে উপর নীচ। মুখে বলে, ‘হু’ ।

“কি জানি বলতেছিলেন,” যুবক আগের কথায় ফিরে যেতে চায়,

“ও, বলতেছিলাম আজকে, চাঁদে সরকারীভাবে পানির সাপ্লাই বন্ধ। পশ্রাব, পায়খানা, গোসল, বিস্তর ঝামেলা,

তাই আসলাম।

“এতো ঝামেলা, পানি জমায় রাখলেই পারেন?”

“পাগল! সম্ভব না। মিটার আছে। একজনের জন্য প্রতিদিন যে পরিমাণ পানি লাগে সব হিসাব আছে। সেই পরিমাণ পানি সাপ্লাই দেয় সরকার।”

যুবক এসব হিসাবের কথার আগামাথা খুঁজে পায় না। বলে, ‘আপনার বউ পোলা মাইয়্যা, তেনারা কই? ’

‘আছে হয়ত, আশেপাশে। তোমাদের গ্রামের উত্তরে পরীবিবির দীঘিটা আছে না, তার পানি আমার বড় ছেলের খুব পছন্দ। আসার সময় বলতেছিলো, হবে হয়ত সেখানে’।

‘আপনার কয়জন ছেলেমেয়ে’?

‘দুই জন ছেলে, ইরান, ইরাক।

‘সুবাহানাল্লাহ’

‘কী ! আচ্ছা অনেক কথা হইছে, এখন যাই গোসল করি, চলে যেতে হবে, আমার বউয়ের চুলের গন্ধ পাইছি, কাছে ধারে চলে আসছে মনে হয় ওরা’।

 

যুবক আর লোকটা একসাথে পানিতে নামে। যুবক পানিতে ডুব দেয়। ডুব দিয়ে কিছুক্ষণ পানির নীচে থাকে সেখানে। লুঙ্গী দিয়ে গা মাজে। পানির নীচ থেকে মাথা তুলে যুবক দেখে তার পাশে কেউ নেই।

ফজরের আজান শোনা যায়। যুবক আস্তে আস্তে বাড়ির দিকে চলে যায়।

 

যুবক খুব সকালে বাজারে আসে। যাদুকরের দেখা পায় না সে। সে কয়েকজনের সাথে গ্রাম্য বিষয়াদি নিয়ে কথা বলে, ঘরের জন্য কিছু বাজার সদায় কিনে, অপেক্ষা করে। দুপুরের একটু আগে যুবক যাদুকরকে গ্রাম থেকে যে পথটা গ্রামের বাইরে চলে গেছে, সেই পথে গ্রামের দিকে আসিতে দেখে।

যাদুকর বটগাছের নীচে এসে বসে। যুবক তার কাছে যায়।

‘কাল রাতে আচানক চলে গেলেন আপনি?’ যুবক যাদুকরকে লক্ষ্য করে বলে, ‘ইচ্ছা ছিলো আপনার পরিবারের সাথে দেখা করবো। ইরান ইরাক রে গাছপাকনা দুইটা আতা দিবো’।

‘আপনি কেমন করে জানলেন আমার ছেলের নাম ইরান,ইরাক ?’

‘আপনি নিজেই তো কাল রাতে পুকুর পাড়ে বললেন’ ।  

যাদুকর যুবকের দিকে শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সে তার কথার মাথামণ্ডু ধরতে পারতে না।  

 

************************

গল্পটা মূলত এখানেই শেষ। কারন সেদিন যাদুকর আর গল্প শোনায় না, তাবিজ বেচে না। যাদুকর চলে যায়। সেদিনের পর আর কখনো কেউ তাকে সেখানে গল্প বলতে কিংবা তাবিজ দিতে কিংবা যাদু দেখাতে দেখে নাই।

 

Share