প্রথম জীবনের দ্বিতীয় পর্ব

লিখেছেন - ইয়াসির আরাফাত | লেখাটি 891 বার দেখা হয়েছে

যে টেলিফোন আসার কথা সে টেলিফোন আসেনি ।

 

প্রতীক্ষাতে প্রতীক্ষাতে

 

সূর্য ডোবে রক্তপাতে

 

সব নিভিয়ে একলা আকাশ নিজের শূন্য বিছানাতে ।

 

একান্তে যার হাসির কথা হাসেনি ।

 

যে টেলিফোন আসার কথা আসেনি ।

 

..................................................

 

প্রতীক্ষা তাই প্রহরবিহীন

 

আজীবন ও সর্বজনীন

 

সরোবর তো সবার বুকেই, পদ্ম কেবল পর্দানশীন

 

স্বপ্নকে দেয় সর্বশরীর, সমক্ষে সে ভাসে না ।

 

যে টেলিফোন আসার কথা সচরাচর আসে না ।

 

 

 

মুঠোফোনটার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে শ্রাবণী । পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতাটা আজ যেন শুধু কবিতা নয় । তার জীবনের ক্লাসিফাইড কিছু মূহুর্ত । বারান্দার এককোনে রাখা চেয়ারে গা এলিয়ে দিতে দিতে ভাবতে থাকে শ্রাবণী । ভালোই তো কাটছিল তার প্রথম জীবনের দ্বিতীয় পর্ব । ওসব কিছু ভুলেই গিয়েছিল সে । পড়ালেখা , বন্ধুদের আড্ডা ,লন্ডনে ৯-৫ টার ব্রিটিশদের দাসত্বে সে অলমোষ্ট ভুলেই গিয়েছিল তার জীবনেও একটা অতীত ছিল । সাধারন যে কোন তরুণীর মতো তারও প্রেমময় দীর্ঘ সময় কেটেছে একসময় । রিশাদ নামের সাধারন একটা ছেলে তার জীবনটাকে বানিয়ে তুলেছিল কি অসাধারনই না ! অনেকটা গল্প উপন্যাসের রূপসী রাজকুমারীদের মতো । এতোসব কিছু সে গোপনে লুকিয়ে রেখেছিল অসামান্য কোন রহস্যের মত । কে জানতো এসব স্মৃতি আজ এতো দিন পরে সুখের মতো চিন চিনে ব্যথা হয়ে বেজে উঠবে তার বুকে । কে জানতো অক্সফোর্ড স্ট্রিটে শত শত জনতার ভিড়ে রিশাদ তার নাম ধরে ঝড়ের মতো ডেকে উঠবে ? আর ৮৯ এর প্লাবনের মতো , তার সব কিছু ভেসে যাবে মূহুর্তেই । এর আগেও রিশাদ যতবার শ্রাবণী বলে ডেকেছে , ততবার মনে হয়েছে যেন শত বর্ষার জল থৈ থৈ করছে তার মনে । আজও এতোদিন পরে সেরকমই মনে হলো শ্রাবণীর ।

 

কাজ শেষ করে বিকেলে বাড়ি ফিরছিল শ্রাবনী । প্রতিদিনের মতো আজও আন্ডার গ্রাউন্ড টিউব স্টেশনের দিকে হাঁটছিলো । হটাৎ পেছন দিক থেকে রিশাদ শ্রাবণী বলে ডেকে উঠলো । " এ কি তুমি তো আগের চেয়ে সুন্দরী হয়ে গেছো , ঠিক সেই গ্রীক রূপসী রাজকন্যাদের মতো দেখাচ্ছে তোমাকে । '' কাছে আসতে আসতে রিশাদ বলে উঠে ।

 

- তা কেমন আছেন ক্লিউপেট্রা ? কি মনে করে আজ আমাদের এই ধুলাবালির পথে ?

 

কিছুক্ষণ কোন কথা বলতে পারে না শ্রাবণী । কলেজের এক বছরের সিনিয়র সেই রিশাদ ভাই । কতো বদলে গেছে । জিন্স-টিশার্ট ! ৪ বছর দীর্ঘ সময় বটে । মানুষ বেঁচে থাকলে এভাবে বদলায় ! বদলায়নি কেবল তার কথার স্টাইল । হুম, সে স্টাইলই বলতো এভাবে কথা বলাটাকে ।

 

- কি আর করা ,আসতেই হলো । না হয় এতোসব শাদা চামড়ার ভিড়ে আপনারা ভুলেই যাবেন রূপসীর আসল মুখ । '' জীবনানন্দের জেনারেশনে উনিই কেবল দেখেছিলেন এমন রূপ । বনলতা সেন কে । আর আমাদের জেনারেশন দেখেছে শ্রাবণীর মুখ । ''

 

এমনই বলেছিলেন আপনি একদিন , অনেকদিন আগে , তাই না রিশাদ ভাই ?

 

- হাহাহাহা , তোমার এখনো মনে আছে দেখছি । সত্যি বলছি , একটুও বদলাওনি তুমি । আজো জীবনানন্দ তোমাকে দেখলে আবার লিখতেন '' আমারে দু'দন্ড শান্তি দিয়েছিলো বনানীর শ্রাবণী হোসেন । ''

 

- হইছে , খুব একটা বললেন । কেমন আছেন আপনি ?

 

- এইতো । শিখছি । এখনো ঠিক পুরোপুরি শিখে উঠতে পারিনি ।

 

- কি ?

 

- কিভাবে ভাল থাকতে হয় । :)

 

- OH MY GOD ! কোন কথা কোথায় যে নিয়ে যান আপনি ; YOU JUST IMPOSSIBLE .

 

- YOU NEVER TRIED . একবার চেষ্টা করে দেখতে , তবে তুমিও জেনে যেতে আমি কতোটা সহজ । জীবনের কতো কঠিন সমিকরণও আমি সহজ ভাবে এঁকে রেখেছিলাম আমার দুই চঞ্চুতে । তুমিতো কখনো পড়তেও চাওনি ।

 

এরপর দুজনের কেউই কোন কথা বলে না অনেক্ষণ ।

 

- তুমি লন্ডনে জানতাম না । কবে আসলে ?

 

- কিভাবে জানবেন ? আপনি তো কোন যোগাযোগ রাখেন নি । না কোন ফোনকল , না কোন ই-মেইল । আমি লন্ডন আসার আগেও সেই একিই নাম্বার ইউজ করতাম । কই আপনি তো কখনো একবার ফোন করে জানতে চাননি , কেমন আছি আমি ?

 

- কিভাবে চাইবো বলো । এখানে আসার পরে সব কিছু বদলে গেলো ।

 

- হুম । দেখতেই পাচ্ছি ।

 

আর কিছুই বলতে পারে না রিশাদ । কিভাবে বলবে , '' শ্রাবণী, অজস্র বার তোমাকে কল করতে গিয়েও , বারবার ভীষণ সংকোচে গুটিয়ে নিয়েছি হাত । তোমাকে লেখা অসংখ চিঠির স্তুপ খেয়ে গেছে উইপোকার দল । আমার নিজের জন্মদিন ভুলেই গিয়েছি , উদযাপনের অনিয়ম-অনভ্যাসে । কিন্তু ঠিকই তোমার প্রতিটা জন্মদিন পালন করেছি নিয়মিত । তোমার চকলেট কেক খুব পছন্দ । শেষ বার আমরা সবাই মিলে তোমার যে জন্মদিন কাটিয়েছিলাম , সেদিন তুমিই কেক কেটে মুখে তুলে খাইয়েছিলে । আজও তোমার জন্মদিনে আস্ত কেক সামনে নিয়ে বসে থাকি দীর্ঘরাত । শ্রাবনী তুমি কখনই জানবে না , আমি কতোদিন মৃদুলকে ফুল হাতে পাঠিয়েছি তোমাদের বাড়ির দরজায় । মৃদুলের কথা মনে আছে তোমার ? তোমারা একই ক্লাসে পড়তে । সেই বলেছিল , কলেজের শেষদিন তুমি নাকি নীল শাড়ি পড়ে গিয়েছিলে । কি অপূর্বই না লেগেছিলো তোমাকে । কেউ জানে না , শুধু আমি জানি আর আমার ঈশ্বর জানেন , সেদিন সারাটা দিন আমি হাইড পার্কে শুয়ে ছিলাম খোলা আকাশের নীচে । আমার দৃষ্টিময় ওই একখন্ড নীল আকাশের নীলিমায় তুমিই ছিলে । সেদিন বিকেলে কেন যেন আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি পড়েছিলো । সে-কি বৃষ্টি । আমার মনে হয়েছিল আকাশ জোড়া নীলের কণা বৃষ্টির এক একটা ফোঁটা হয়ে নেমে এসেছিল পৃথিবীতে । সারা বিকেল তুমি ভেবে বৃষ্টির এক এক ফোঁটা গায়ে মেখেছিলাম । সে রাতে জ্বরের আগুনে পুড়তে পুড়তে মরতে ও বসেছিলাম । সেও তো তোমার কারনে । ''

 

- আপনি কি কোথাও যাচ্ছিলেন ? শ্রাবণীর কথায় মৌনতা ভাঙ্গে দুজনের ।

 

- ও হ্যাঁ । বাসার দিকেই যাবো ।

 

- কোথায় থাকেন আপনি ?

 

- East London . I mean East Ham . তুমি ?

 

- Menor park .

 

- বেশ তো , চলো ,একসাথেই যাওয়া যাক কিছুটা পথ ।

 

এই বলেই দুজনেই ট্রেন ষ্টেশনের দিকে যেতে থাকে । পথে যেতে যেতে কতো কথা হয় , শ্রাবণীর কিছুই মনে নেই । যেনো একটা ঘোরের মধ্যদিয়েই কেটে গেছে দীর্ঘপথ । শুধু মনে পড়ে বিদায় নিতে গিয়েই রিশাদ তাড়াহুড়া করে তার নাম্বারটা save করে নেয় ওর মোবাইলে । সেই থেকে সারাটা সন্ধ্যা তার মুঠোফোনটা হাতের মুঠোয় নিয়ে বসে আছে । এই বুঝি রিশাদের কল এলো ।

 

 

 

আসলেই সেই টেলিফোন আর আসে না । প্রতিক্ষাতে প্রতিক্ষাতে একসময় সত্যি সত্যি সূর্য ডোবে রক্তপাতে , শ্রাবণীর ঘরময় অন্ধকার নেমে আসে । অপেক্ষমান বুকের ভিতর কাঁসরঘন্টা বেজেই যায় ক্রমাগত । কিন্তু যে টেলিফোন বাজার কথা সেটা আর বাজেনা । তার পরদিন , তারও পরেরদিন রিশাদের কোন খোঁজ নেই । একসময় শ্রাবণীর নিজের উপর ভীষণ রাগ হয় , কেনই বা রিশাদের ফোনের জন্য তার ভেতরে এতো হুলুস্থুল অনটন ! অথচ একসময় তার কতো আয়োজন হেয়ালী ভেবে উড়িয়ে দিয়েছে সে নিজেই । কতবার রিশাদ বুঝাতে চেয়েছে কতকিছু । আর সে নিজে সেসব কিছু , রিশাদের সমস্ত আয়োজন বোঝা ভেবে না বুঝার ভান করেছে । তবে কেনইবা আজ এতদিন পর একশ বনের বাতাস এসে এলোমেলো করে যায় তার চিন্তার জগত ! এভাবেই ধীরে ধিরে এক এক মুহুর্তের প্রতিক্ষা শত বছরের অভিমান হয়ে জমতে থাকে শ্রাবণীর বুকে ।

 

ব্যস্ততার সমুদ্রে ডুবে যায় আরো কয়েকদিনের সূর্য । তেমনি কোন এক অলস বিকেলে শ্রাবণী ফেইসবুকের পাতা নাড়াচাড়া করছিল । এমন সময় তার ফোন বেজে উঠে । অপরিচিত নাম্বার । রিশাদের কল ভেবে তার পৃথিবী যেন থমকে যায় কয়েক মূহুর্তের জন্য । হৃদয়ের ঈশান কোনে জমে থাকা অভিমান বাষ্পাকারে মেঘ হয়ে জমতে থাকে তার চোখের কোনে । সমস্ত আনন্দের উচ্ছাস , চোখের কোনে জমে উঠা আবেগের জলোচ্ছাসকে থামিয়ে কল রিসিভ করে শ্রাবণী ।

 

 

 

এই মূহুর্তে রিশাদ তার মেনর পার্কের বাড়ির উঠানে বসে আছে । লন্ডনে অবশ্য এই ধরনের উঠানকে গার্ডেন বলে । রিশাদ মনে মনে ভাবে, আজ কি পূর্ণিমা ? কোন এক অদ্ভূত কারনে পূর্ণিমা রাতে রিশাদের ঘুম হয়না । জোছনার বানে তার মনও ভেসে যায় পথে ঘাটে । রিশাদ একদিন তার মাকে বলেছিল এই কথা । '' মা , আমার মনে হয় পূর্নিমার সাথে আমার কোন একটা সম্পর্ক আছে । ''

 

এই কথায় তার মা কি না কি বুঝলো , সরাসরি তার কানের নীচে বিকট আওয়াজে থাপ্পর । রিশাদ রি-এ্যাক্ট করার আগেই তার মা চিৎকার করে বলে উঠল '' এসব কি বাজে কথা ? পূর্নিমার সাথে সম্পর্ক ! কে এই পূর্ণিমা ? ''

 

ততক্ষনে রিশাদের ভাবোদয় হয় । আজ অনেক দিন পরে কথাটা মনে পড়লো রিশাদের । মনে মনে হাসতে থাকে রিশাদ । সত্যিই কিন্তু জোছনা রাতে রিশাদের ও হিমুর মতো গৃহত্যাগী হতে ইচ্ছে করে । কিন্তু ইচ্ছে করলেই কি আর সব কিছু পারা যায় ?

 

চাইলেই কি সব কিছু পাওয়া যায় ! এক জীবনে রিশাদ হৃদয় উজাড় করেই চেয়েছিল শ্রাবণীকে । কিন্তু শ্রাবণী হয়ত অন্য কিছু চেয়েছিলো । সেদিন যখন শ্রাবণীর সাথে দেখা হলো , রিশাদের খুব জানতে ইচ্ছে হয়েছিল , শ্রাবনী কি সত্যিই পেয়েছিল যা সে চেয়েছিল । নাহিয়ান কে নিয়ে সে কি ছুঁতে পেরেছে সুখের সীমারেখা ? পেরেছে নিশ্চই ।।

 

পরে কি না কি ভেবে আর জানা হয়নি । এখন চাইলেই সে জানতে পারে । শ্রাবনীর নাম্বার তার মোবাইলেই save করা আছে । ইচ্ছে করলেই সে একটা ফোন করতে পারে । কিন্তু তাকে নতুন করে কিই বা বলার আছে তার ।

 

যেদিন রিশাদ তার দেশের বাইরে চলে আসার খবর শ্রাবনীকে বলতে গিয়েছিল , খুব চেষ্টা করেও তার মনের পাঠোদ্ধার করতে পেরেনি সে । কিছুই বলেনি শ্রাবনী সেদিন । শুধু রিশাদকে জড়িয়ে ধরে কয়েক মুহুর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল । কি অদ্ভুত সময়ই না ছিল সেই কয়েক মুহুর্ত । এখনো সেই আলিঙ্গনের উষ্ণতা গায়ে লেগে আছে রিশাদের । ভয়ঙ্কর এক কষ্ট নিয়ে দেশ ছেড়েছিল রিশাদ । আস্তে আস্তে সেই কষ্ট মুছেও গিয়েছিল । তারপর , না জানি কেনরে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল তার প্রাণ ।

 

এই মুহুর্তে রিশাদের নিজেকে কলেজ পড়ুয়া সেই তরুণ বলেই মনে হয় । যে রিশাদ জানত না সে কি চায় । কেন চায় । শুধু মনে হতো শ্রাবণীকে ছাড়া তার জীবন অর্থহীন । শ্রাবণীর এত কিছু জানার পর ও চৈত্রের খাঁ খাঁ রোদ মাথায় নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল একদিন । স্কুলে মুখস্ত করা পীথাগোরাসের উপপাদ্যের মতো একনাগাড়ে বলেই ফেলেছিল তাকে তার ভালবাসার কথা । এখন রিশাদ অনেক কিছুই বুঝে । বয়স তাকে খুব যত্ন করেই পড়িয়েছে জীবনের পাঠ । তবু কেন শ্রাবণীকে দেখে সেদিন তার বুকের মাঝে এমন শূণ্যতা ঘুরে উঠেছিলো । রাজ্যের দ্বিধা ঝেড়ে-মুছে রিশাদ মোবাইল হাতে নেয় । তাকিয়ে দেখে শ্রাবণী লেখার নীচে সাজানো নাম্বারগুলো কেমন অস্থির হয়ে উঠে হঠাৎ !

 

- কেমন আছো শ্রাবণী ?

 

অনেক্ষণ পর ,

 

-- হ্যালো

 

আরও অনেক্ষণ পর ,

 

- চিনতে পেরেছ ? আমি রিশাদ ।

 

-- হুম ।

 

- বল্লেনা তো , কেমন আছো ?

 

-- এই সামান্য কুশলটুকু জানতে তিনদিন লাগলো আপনার !

 

- সত্যি বলতে , আরো অনেকবার ইচ্ছে হয়েছে ফোন দিই । কিন্তু কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলাম না কি বলবো । কোথা থেকে শুরু করবো ।

 

-- আগে তো অকারনেই কতো কারন বানিয়ে নিতেন ! আর এখন ...

 

- ওসব দিনে কতো কিছুইতো অহেতুক অথচ অসামান্য ছিল । নিছক অথচ মূল্যবান ছিল । থাক সে সব কথা । এখন বল , কাল কি প্লান ?

 

-- কাল আমার পূর্ণ দিবস অবসর ।

 

- nice , চল কোথাও বসে এক কাপ কফি খেয়ে আসি । সেই ফাঁকে পুরানো দিনের গল্প করা যাবে ।

 

-- কফি ........................ ok

 

- canary wharf , ৪ টায় । আমি অপেক্ষা করবো ।

 

-- ঠিক আছে , দেখা হবে ।

 

সেদিন বিশ্বচরাচরে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল । ঘুমায়নি কেবল এই দুইজন প্রানী । দুইজনেই তখন অতীত খুঁড়াখুঁড়ি নিয়ে ব্যস্ত । তারা যে কপাল খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে । রাত যায় , সকাল-দুপুর কাটে ঘুমে । canary wharf স্টেশন আন্ডারগ্রাওন্ড থেকে উঠেই সিগেরেট জ্বালায় রিশাদ । মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছিলো কি ভাবে কি বলা যায় । তার কত কি যে জানার আছে । শিল্পকলার কথা , দীপু , মৃদুল , তাহি'র কথা । কলেজের ছাত্র সংসদের কথা , নাহিয়ানের কথা । হ্যাঁ , নাহিয়ানের কথা ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে । অথচ শ্রাবণী একবারও নাহিয়ানের কথা তুলে নি । ব্যপারটা নিয়ে রিশাদ ভাবতে ভাবতে হঠাত দেখে শ্রাবণী হেঁটে আসছে তার দিকে । রিশাদ বেশিক্ষণ তাকাতে পারেনা সেদিকে । ভয় হয় তার চোখজোড়া যদি হঠাত অক্ষিকোটর থেকে বের হয়ে আসে । যদি সে ট্যরা হয়ে যায় । রিশাদের বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে , তার মনে হয় , পরম করূণাময় এই মেয়েটির প্রতি একটু বেশীই করুণা করে ফেলেছেন । রূপটা একটু কমিয়ে দিলেই পারতেন ।

 

- রাজকুমারী , এভাবে যে সেজেগুজে বের হলেন , এদিকে পৃথিবীর আহ্নিক গতি,বার্ষিক গতি তো বন্ধ হওয়ার উপক্রম । সে খেয়াল আছে ?

 

-- ফালতু কথা একেবারেই বন্ধ প্লিজ , রিশাদ ভাই । আমি কি বেশী দেরী করে ফেলেছি ?

 

-ফালতু কথা !!!! আর পৃথিবীর মুভমেন্টই যখন বন্ধ দেরী কিসের । সময় এখানে স্থির মহামান্যা ।।

 

ঠোঁটের এক কোনেএক টুকরো হাসির ঝিলিক , এরপর দু'জনেই কোন কথা বলে না । পাশাপাশি হাঁটতে থাকে ।

 

- বাড়ির সবাই কেমন আছে ?

 

-- ভালো ।

 

- আমরা এভাবে অনেকবার পাশাপাশি হেঁটে গেছি কলেজের সামনের দীর্ঘ সড়ক । তোমার মনে আছে সেসব দিনের কথা ।

 

-- হুম , মনে থাকবে না আবার ! আপনি প্রায় বলতেন , আপনার কি জানি কি বলার আছে । একটু বলেই আর বাকিটা বলতেন না । বলতেন পরে বলবেন একদিন । রাগে আমার গা জ্বালা করতো । তারপর তো ...

 

- যে কথা তোমাকে একা একা বলতে সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারতাম না , সে কথা বলে বসলাম ভারা মজলিসে । তোমার সব বন্ধুরা এমন ভাবে তাকাচ্ছিলো আমি না জানি, কি না কি করে বসলাম । নাহিয়ানের সাথে বেপারটা আমি জানার পর ও । সেদিন আমার কি হয়েছিলো আমি জানি না । তুমি কালো রঙ্গের একটা জামা পরা ছিলে । কলেজের Annual day ছিল সেদিন । আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার সাথে কথাই বলবে না এর পরে । কিন্তু সবাই কে অবাক করে দিয়ে তুমি সবার মাঝখান থেকে উঠে এসে আমাকে বলেছিলে , চলুন বাসায় যাওয়া যাক । আমি হা করে তাকিয়ে ছিলাম তোমার দিকে । তুমি আরো চেঁচিয়ে বললে , এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন ? বাসায় যেতে বলেছি , কাজি অফিস না । আচ্ছা তুমি এমন ছিলে কেন ? I mean এখনও কি এমন আছো , না একটু বদলেছো স্বভাব।

 

-- এরপর ও কিন্তু আমরা ভালো বন্ধু ছিলাম ।

 

- ছিলাম ?

 

-- ও আচ্ছা , আমরা এখনও অনেক ভাল বন্ধু । by the way , আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি ?

 

- এই তো আরেকটু সামনে । thems এর পাড়ে একটা ইটালিয়ান কফি সপ আছে । আসাধারন কফি বানায় । আমরা ওখানেই যাব । ও হ্যাঁ মৃদুলের কি খবর , আর তাহি , আর একজন ছিলো তোমার বান্ধবী কি যেন নাম ...

 

-- পাতা ।

 

- yes yes পাতা । ওরা কেমন আছে ?

 

-- সবাই ভাল । মৃদুল কানাডায় । ফেইসবুকে যোগাযোগ হয় মাঝেমধ্যে ।

 

- আর নাহিয়ান ?

 

অনেক্ষন কোন কথা বলেনা শ্রাবনী । সন্ধ্যার আলোয় ঝাপসা হয়ে আসে তার চোখ । ইটালিয়ান কফি সপ থেকে দুইটা cappuccino নিয়ে thems নদীর পাড়ের একটা বেঞ্চিতে গিয়ে বসে ওরা । '' লন্ডনের শীতের দিন গুলো এতো ছোট , ৪টা বাজতে না বাজতেই অন্ধকার হয়ে আসে চারদিক । ''

 

-- হ্যাঁ , সেটাই । এটা আমার ফার্ষ্ট উইন্টার লন্ডনে । গত বছর জুনে নাহিয়ানের বিয়ে হয় । আমি লন্ডন আসছি ৩ মাস আগে । অথচ দেখুন , এই বিশাল পৃথিবী , এত মানুষ । আপনার সাথেই দেখা হয়ে গেল । এখানে আমার ছোট খালার সাথে থাকি । খালা খালু অনেক মজার মানুষ । আপনার সাথে জমবে ভাল ।

 

- আমি জানতাম , নাহিয়ান আর তোমার কথা তোমাদের দুই পরিবারই জানতো । কিন্তু ...

 

-- জানতো তো সবাই । এই বছর বিয়ে করার প্লানও ছিল ।

 

- তাহলে ?

 

-- রিনি নামের ওদের দুঃসম্পর্কের একটা আত্বীয় নাহিয়ানদের বাসায় থাকতো । মেয়েটা মেডিকেল এ পড়তো । ওদের বাসায় থেকেই পড়তো ।

 

-তারপর

 

--একদিন সন্ধ্যায় নাহিয়ান আমাদের বাসায় আসে । আমি বাসায় ছিলাম না । একটা চিঠি লিখে রেখে যায় ও আমার রুমে । আমি সারা রাত কেঁদেছিলাম সে চিঠি পড়ে । এরপর আর কোনদিন কাঁদিনি সেই প্রসঙ্গে ।

 

- কি হয়েছিল । তার সাথে আর কথা হয়নি ?

 

-- হয়েছে , তবে অনেক পরে ।

 

রিনির সাথে তার শারিরিক সম্পর্ক হয় । then she become pregnant . Abortion করাতে গিয়েই ...

 

- oh my God , মেয়েটা কি মারা যায় ?

 

-- না তবে অনেক জটিলতা হয় । মেয়েটার অনেক রক্ত দরকার ছিল । বি নেগেটিভ রক্ত খুঁজতে গিয়ে ওর কিছু বন্ধু বান্ধব ব্যপারটা জেনে যায় । এর পর ওর ফ্যমেলী মেয়েটার take care করে ।

 

- রিনির সাথেই কি নাহিয়ানের বিয়ে হয় ?

 

--হুম ।

 

বলতে বলতে নিঃশব্দে কেঁদে উঠে শ্রাবণী । মনে হচ্ছিল এমন মাতাল করা জোছনা রাতে রাশি রাশি শীলা খন্ড খসে পড়ছে তার চোখ দিয়ে , টপ টপ , টপ টপ ।

 

'' কেন এমন হতে হবে , এত ভালবাসতাম তাকে । কোথায় কি কম থেকে গেলো ? ''

 

 

 

আস্তে করে রিশাদ উঠে দাঁড়ায় । মেয়েটা কাঁদুক ,আরো বেশি করে কাঁদুক । কেঁদে কেটে যদি এতটুকু শান্তি পায় সে । একটা সিগারেট জ্বালিয়ে লম্বা টান দিয়ে , ভেতর থেকে অনেকগুলো ধোঁয়া ছাড়ে । যদি ধোঁয়ার সাথে একটু কষ্ট বের হয়ে আসে ।

 

Thames এর পাড় ঘেঁষে হাঁটতে থাকে চুপচাপ তারা দুইজন চলতি হাওয়ার পন্থি । নির্মলেন্দু গুণের একটা কবিতা একটু পরিবর্তন করে আবৃত্তি করতে থাকে রিশাদ ...

 

যদি কভু মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায় , যদি আচ্ছন্ন স্বপ্নের ঘোরে উচ্চারণ করো এই মুখ , যদি ডাকো যৌবনের প্রিয় নাম ধরে–; রুদ্ধশ্বাসে ছুটে যাবো পুরোনো প্রেমিক । মুখোমুখি দাঁড়াবো তোমার , যদি প্রতিশ্রুতি পাই ।

 

সোডিয়ামের আলোয় অনেক দূরে বসে আরো একজন যুবক চোখ মুছে । খেয়াল করতে চেষ্টা করে তারা কি হাত ধরাধরি করে হাঁটছে কি না ?

 

 

ঝাপসা চোখে কতদূরেই বা আর দেখা যায় ?

 

 

Share