একজন শুদ্ধ মানুষ

লিখেছেন - ইয়াসির আরাফাত | লেখাটি 785 বার দেখা হয়েছে

নিশুতি রাত । শীত পড়ি পড়ি করছে, কিন্তু পড়ছে না । প্রকৃতি মনে হয় সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না ঠিক কখন থেকে শীতকাল আরম্ভ করলে ভাল হয় । বৃদ্ধ আবুল খায়ের পুকুর পাড়ে বসেছেন শহর থেকে বেড়াতে আসা তার নাতি নাত্নীদের নিয়ে । আবুল খায়ের সাহেব বুঝতে পেরেছেন তাদের মতলব খারাপ । গল্প না শুনে তার নাতি নাত্নীরা আজ তাকে আর ছাড়ছে না । অগত্যা তিনি শুরু করলেন তার জীবনের একমাত্র আর সবচেয়ে পুরানো গল্পটি ...নাহার চা দিতে এসেছিলেন । তিনি নিজেও আটকে গেছেন গল্পে । শামছুন্নাহার ; বৃদ্ধের জীবন সঙ্গিনী । বড় মেয়ে মুক্তি আর একমাত্র ছেলে রাসেল এর মা । এছাড়া দেবার মত তার আরো একটা পরিচয় আছে , তিনি একজন মহান মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী । দীর্ঘ্য প্রায় ৫৭ বছর ধরে বৃদ্ধ আবুল খায়েরের জীবনে ছায়া হয়ে আছেন এই স্বল্পভাষী , ছোটখাট মহিলাটি । এই দীর্ঘ্ জীবনে নাহার অসংখ্য বার শুনেছেন এই গল্প । তারপর ও কেন জানি তিনি প্রতিবার মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেন বৃদ্ধ আবুল খায়েরের মুখের প্রতিটা বাক্য ।

" আজ থেকে অনেক অনেক বছর আগে ... ,

> দাদু কত বছর ? ( গল্পের শুরুতেই প্রশ্ন করে বসে সুহি । মুক্তি'র ছোট মেয়ে । সে এবার ক্লাস টু'র বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে নানু'র বাড়ি বেড়াতে এসেছে । )

সুহি'র দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে তার বড় ভাই সাকিব । সে এবার এস,এস,সি পরীক্ষার্থী ।

সাকিব সুহিকে সাবধান করে দিল ...'' গল্পের মধ্যে আর একটা কথা বললে চটকানা খাবি । ''

সুহি ভয়ে নানুর কোলে গিয়ে বসে পড়ল । আবুল খায়ের সাহেব হাসতে হাসতে আবার শুরু করেন । এই গল্প বলতে গেলে তিনি ঘোরের মধ্যে চলে যান । ভুলে যান তিনি তার সামনের দু'জন শ্রোতা ; একজনের বয়স ১৫ আরেকজনের বয়স ৭ । মুখস্থ বলতে থাকেন ...

 

'' আজ থেকে অনেক অনেক বছর আগে আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিল । তাঁর ছিল বেজায় সাহস । আর এই দেশের মানুষের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ ভালবাসা । পৌষের চন্দ্রালোকিত মধ্যরাত্রির প্রকৃতির মত কোমল একখানা হৃদয় ছিল তাঁর । তিনি ছিলেন চাষী । না না , কোন ক্ষেত খামারের চাষী না । চিনি চাষ করতেন স্বাধীনতা নামের একটা শব্দের । নির্যাতীত এই দেশের ৭ কোটি মানুষের মনে তিনি চাষ করেছিলেন স্বাধীনতার । বুনেছিলেন স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন । তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান । তিনি ছিলেন আমার মত কোটি কোটি জনতার স্বপ্নের কারিগর ।

সেদিন ৭ই মার্চ , ১৯৭১ সালের কথা । আমি আর আমার এক বন্ধু মোবারক মিলে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম মিয়া বাড়ির পুকুরে । বড় বড় রুই-কাতলা মাছ উঠছে । ভীষণ খুশী আমরা দুজন । এমন সময় হাকিম দৌঁড়ায় এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল ,

'' কিরে তুঁয়ারা ন-যাইবা ?

মোবারক : হ-ড়ে ( কোথায় ) ?

হাকিম : শেখ সা'ব আইস্যে রেডিও 'ত । বেকগুন হাল্লুয়্যার দুয়ানত । হা-রা হা-রা আয় । ( শেখ সাহেব আসছে রেডিও তে । সবাই কালুর দোকানে জড়ো হয়েছে । তারাতারি আয় । )

সাথে সাথে আমি আর মোবারক ভেজা লুংগি কাচা মেরে দৌঁড় । গিয়ে দেখি সবাই কালুর দোকানে ভীড় করেছে । চুপ চাপ , কেউ কোন কথা বলছে না । যেন একটু পরেই কবি আসবেন জনতার মঞ্চে । অতঃপর,

( এর পরের কথা গুলো আবুল খায়ের সাহেব নির্মলেন্দু গুনের মত করেই বলতে থাকেন ... )

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে ,

রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে

অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন ৷

তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল ,

হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার                      

সকল দুয়ার খোলা ৷ কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী ?

গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি :

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম ,

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ৷’

সমবেত আমরা সবাই তখন চিৎকার করে শ্লোগান দিতে লাগলাম '' জয় বাংলা , জয় বঙ্গবন্ধু '' ।

এইটুকু বলে দম নেন বৃদ্ধ আবুল খায়ের । চোখের পাতা ভিজে আসে তাঁর । পানির জন্য নাহারের দিকে তাকান তিনি । নাহার পানি আনতে উঠে যায় । সুহি এই ফাঁকে আবার প্রশ্ন করে , '' নানু ভাই তুমি কাঁদছো কেন ? ''

আবুল খায়ের সাহেব কয়েক বার মনে মনে বিড় বিড় করেন , '' আমি কাঁদছি কেন , আমি কাঁদছি কেন ! ''

'' আজকের মত না হয় শেষ করে দেন , রাত জাগলে শরীর খারাপ করবে । '' -- নাহার পানি নিয়ে এসে আস্তে করে পিঠে হাত রেখে তার স্বামীকে বলেন । তখন রাসেল আর মুক্তি এসে পাশে দাঁড়ায় ।

'' দেখি বাচ্চারা ঘরে যাও , ঘুমিয়ে পড় । '' -- রাসেল কিছুটা রেগে যায় ।

সুহি : মামা আমরা গল্প শুনছি । ডিষ্টার্ব করবে না ।

মুক্তি : মামনী আজকে আর না , চল ঘুমাবে ।

সাকিব - সুহি মায়ের হাত ধরে ঘরের ভেতর চলে যায় । রাসেল তার বাবার সামনে বসে থাকে চুপ চাপ । একটু পর সে বলে উঠে ... '' বাবা, এই একই গল্প বলতে বলতে ক্লান্তি আসেনা তোমার ? সেই ছোট বেলা থেকে আমি আর দিদি শুনেছি অসংখ্য বার । তার চেয়ে বেশি বার শুনিয়েছো তোমার স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের। কি হয় বাবা এই গল্প বলে! ''

-- এই গল্প যে আমার অস্থিত্বের সাথে মিশে আছেরে বাপ। 

-- অস্তিত্ব ! কেন ভুলে যাও এই স্বাধীনতা তোমাকে বাংলাদেশ নামের একটা নির্দিষ্ট আয়তনের ভূখন্ড দিয়েছে মাত্র , এরচেয়ে বেশি কিছু নয় । এই জাতি না দিয়েছে সম্মান তোমাকে , না তোমার স্বপ্নের কারিগরকে। না নিজে পেয়েছ কিছু , না দিতে পেরেছ আমাদের কিছু। এই স্বাধীনতা তোমাদের সব খেয়েছে বাবা , শুধু খেতে পারেনি তোমাদের দুঃখ।

রাসেল উঠে যায় ওখান থেকে। বৃদ্ধ আবুল খায়ের তার স্ত্রী নাহারের হাতটা ধরে বসে থাকে। চন্দ্রভূক অমাবশ্যা ও যেন বৃদ্ধের দুঃখ খেয়ে এতটুকু কমাতে পারে না। তার চোখে ভাসতে থাকে সংগ্রামের সেই অগ্নীঝরা দিনগুলো। কানের মাঝে ঠা ঠা করে বাজতে থাকে রাইফেলের আওয়াজ। মনে পড়ে শ্লোগানে শ্লোগানে মুখর মুক্তি বাহিনীর ক্যাম্প '' বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধর , বাংলাদেশ স্বাধীন কর ''। অনেক দামে কেনা এই স্বাধীন বাংলাদেশ আজ বড় বিলাসী সুখ তার কাছে। তার পরিবার পরিজন , ভিটা মাটি সব খেয়েছে সে। তার স্ত্রী, পুত্র-কন্যা আজ তার কাছে জানতে চাইতেই পারে কি দিয়েছে সে তাদের।

অথচ তার নিজের গ্রামের মইত্যা চোরা, স্বঘোষিত রাজাকার , স্বাধীনতার পরে কি থেকে কি হয়ে গেল। সংগ্রাম শেষে কেমনে কেমনে পাকিস্থান হয়ে বিদেশ চলে যায় সে। এরপর দেশে ফিরে এখন সে মতিন চৌধুরী। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। দামী বিদেশী গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ছেলে বিলেত থেকে বেরিষ্টার হয়ে এসেছে। কানাকানি হচ্ছে সে নাকি এম,পি ইলেকশন করেবে এবার। মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়েরের স্বাধীনতার গল্প শুনতে খারাপ লাগতেই পারে।

------------------------------------------------------------------

রাসেল তার কলেজের টিচার্স কমন রুমে বসে আছে। বছর খানিক আগে সে ফুলবাড়িয়া কলেজের বাংলার প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে। কলেজের বাংলার আরেক প্রভাষক সাইফুদ্দিন সাহেব উল্কার বেগে রুমে ঢুকলেন।

-- রাসেল সাহেব , বিজয় দিবস উপলক্ষে আমাদের কলেজ যে অনুষ্ঠান করছে সেখানে মুল প্রবন্ধটি পাঠ করবেন আপনি। আফ্‌টার অল , আপনি আমাদের মধ্যে একমাত্র বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান । '' হেহে হেহে করে দাঁত বের করে হাসতে থাকে সাইফুদ্দিন।

-- সাইফুদ্দিন সাহেব আপনার হাসিটা পছন্দ হয়েছে। বেশ মজা পেয়েছি। কিন্তু প্রবন্ধ পাঠ করার প্রস্তাবটা পছন্দ হলো না। সরি।

-- কেন ? প্রশ্নটা করেই সাইফুদ্দিন , রাসেলে দিকে হা করে উত্তরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে। রাসেল তার সামনের কুতসিত খোলা মুখ উপেক্ষা করে পত্রিকায় মনোযোগ দিল। সাইফুদ্দিন যেই বেগে রুমে ঢুকেছিল তার চেয়ে বেশী বেগে বের হয়ে যায়।

রাসেলের মনটা কিঞ্চিত খারাপ আজ। বি সি এস পরীক্ষায় সব পাশ করেও শেষ পর্যন্ত পাশ করা হলো না তার। পুলিশ ভ্যরিফিকেশন নামের এক ধরনের নাটকে সে বাদ পরে যায়। এই বেসরকারী কলেজের চাকরীটা চালিয়ে যেতে হবে , কিন্তু ক'দিন চালানো যাবে ঠিক বলা যাচ্ছে না। এটা ভেবেই তার মনটা আরো খারাপ হয়ে আছে। এমন সময় কলেজের পিওন আসে রাসেল কে জানিয়ে যায় প্রিন্সিপাল স্যার তাকে ডাকছেন। রাসেল কিছুটা বিরক্ত হয়। প্রিন্সিপালের সাথে রাসেলের শুরু থেকেই বনিবনা হচ্ছে না। দালাল শ্রেণীর লোকজন দেখলে তার গায়ে ফোস্কা পড়ে । বিরক্তি'র বিশাল একটা বোর্ড টাঙ্গিয়ে রাসেল প্রিন্সিপালের অফিসে ঢুকে।

'' কি খবর রাসেল সাহেব , সব ঠিক ঠাক ? ''

> জি স্যার।

'' ক্লাস ভালোমত নিতে পারছেন তো ? ''

> জি , কোন অসুবিধে হচ্ছে না।

'' রাসেল সাহেব , এবারের বিজয় দিবসের প্রোগ্রামে আমরা চাচ্ছিলাম ; আমরা মানে ট্রাষ্টি বোর্ডের সব সদস্যরা চাচ্ছিলাম আপনার বাবা কে সম্মাননা পদক দিব। উনি আমাদের দেশের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। উনাকে সম্মান জানানোটা তো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আর আপনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রবন্ধটা পাঠ করবেন প্লিজ।

> স্যার প্রোগ্রামে অতিথি হিসেবে কে কে থাকছেন জানতে পারি ?

'' হ্যাঁ , আমাদের আসন থেকে নির্বাচিত এম,পি সাহেব থাকবেন প্রধান অতিথি , সভাপতিত্ব করবেন কলেজের ট্রাষ্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মতিন চৌধুরী।

রাসেল কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে যায়। যেন তার কিছুই বলার নেই। কিংবা এতকিছু বলার আছে যে কোথা থেকে শুরু করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।

> স্যার , আপনি কিভাবে ধরে নিলেন এই মানুষগুলোর হাত থেকে পদক নিতে আমার বাবা আসবেন ? এই এম,পি - এই মতিন চৌধুরী কারা ? কি তাদের পরিচয় ? ৭১ এ সংগ্রামের সময় তারা রাতের পর রাত মানুষের ঘর বাড়ি লুট করেছিল। এই দেশের শত শত নারীদের ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল তাদের পাকিস্থানী বাপদের জন্য। চোরের মত লুকিয়ে লুকিয়ে রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে চিনিয়ে দিয়েছিল এই দেশের বুদ্ধিজীবীদের ঘর । আর আপনি বলছেন ৭১ এর সেই মইত্যা চোরার হাতে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে পদক নিতে। বাহ! আপনারা পারেন ও স্যার।

'' শুনুন রাসেল সাহেব ...

> স্যার আপনি শুনুন ।। সেই ছোটবেলা থেকে বাবার মুখে একটি গল্প শুনে শুনেই বড় হয়েছি। আর কোন গল্প জানেন ও না আমার বৃদ্ধ পিতা । সেই থেকে ৬৯,৭১ , সংগ্রাম , মুক্তিযুদ্ধ আমার অস্থিত্ব ও মননে , বিশ্বাস ও বহিঃপ্রকাশে। কিন্তু আমি বড় হওয়ার পর বাবাকে সেই গল্প আর কাউকে শোনাতে দেইনি। কি প্রচন্ড অভিমান থেকে এই কাজটা করি আপনি কোনদিন ও বুঝবেন না স্যার। আমার বাবাকেও বলি , আজ আপনি ও শুনুন। আমার বাবা, আরো অনেকের বাবারা তাদের সোনা ঝরা দিনগুলো রক্তাক্ত করে যে স্বাধীন দেশের জন্ম দিয়েছিলেন আতুর ঘরেই তার কবর দিয়েছে এই দেশেরই কতিপয় দালালরা। স্বাধীনতার পর আরো কয়েক বার পরাধীন হয়েছে এই দেশ। আমার নিজেকে আজ একজন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে হিসেবে নয় স্কুল মাষ্টার আবুল খায়েরের ছেলে হিসেবে পরিচয় দিতেই ভাল লাগে।

কিছু মনে করবেন না স্যার , আপনার ছেলে কৌশিককে দেখলাম সেদিন কলেজের পুকুর পাড়ে তার বন্ধুদের নিয়ে খুব বড় গলায় পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের গল্প শুনাতে। এটা তার দোষ নয়। আমাদের দেহে প্রবাহিত রক্তের দোষ। ছোট্ট একটা দেশ , এত কিছুর বিনিময়ে পাওয়া , তাকে ভালবাসায় ভরিয়ে দিতে পারলাম না আমরা । দেশের প্রতি আমাদের ভালবাসার এত বেশি আকাল পরেছে আজ মইত্যা চোরার ভালবাসা দরাকার পরেছে । গুড ।

 

তাচ্ছিল্যের একগাল হাসি হেসে প্রিন্সিপালের অফিস থেকে বের হয়ে আসে রাসেল ।

-----------------------------------------------------------------------

থিয়েটারের নতুন নাটকের রিহার্সেল হচ্ছে । সবার মাঝে বিষন্ন মনে বসে আছে রাসেল । এই একটা জায়গা যেখানে এসে রাসেল কিছুটা সুখ পায় । ভুলে যায় যত অপ্রাপ্তির কষ্ট । কিন্তু কোন এক অদ্ভুত কারনে তার মনে আজ নিদারুন অসুখ । বকুল এসে রাসেলের পাশে বসলো । রাসেলের হাতটা নিজের কোলের উপর নিয়ে আহ্লাদী গলায় বললো ...

'' কি কবি, মন খারাপ নাকি ? এমন উদাস মনে বসে আছো । ''

: না , কিছু না । কেমন আছো তুমি ?

'' আমি ভালো আছি । কিন্তু তোমার এই বিষন্ন মনের বিষন্নতার শানে-নযুল বলবে তো, নাকি । ''

অনেক্ষন কিছুই বলেনা রাসেল । একবার বকুলের দিকে তাকালও না ।

: তোমার অনেক সুখ না বকুল ? অনেক সুখ !

'' হঠাত্‌ এই কথা !!

: না এমনি । মাঝে মাঝে ভাবি এমন কেন হয় ? এই যেমন ধর , তোমার বাবা আর আমার বাবা বাল্যকালের বন্ধু ছিলেন । কি বন্ধুত্বই না ছিল তাদের । বাবার মুখে শোনা, তিনি ছিলেন সে সময়ের তুখোড় ছাত্র নেতা । ছাত্র জীবনে তারা দেশের ব্যপারে কোন কিছুর সাথে আপোষ করেন নি । কেবল পরবর্তী জীবনে এসে ছোট্ট একটা আপোষ করলেন তোমার বাবা । আরে ! এখনতো উনি আর ছাত্র নেই , বড় হয়ে গেছেন । বড় হলে অনেক কিছুর সাথে আপোষ করতে হয় । আমার সেকেলে বাবাটাই শুধু বড় হলেন না , আপোষ করতে পারলেন না কোন ভাবেই । তাই আজ ...

তুমি থাক মহা সুখে অট্টালিকা পরে

আমি কত কষ্ট পাই রোদ বৃষ্টি-ঝড়ে !

'' আচ্ছা কবিতাটা কি এমন ছিল ? '' আপন মনে বকতে থাকে রাসেল । বিকারগ্রস্থ শুনায় তার গলাটা । বকুল কোন কথা বলে না । আসলে তার বলার কিছু নেই । সব কিছু বুঝেও আসলে তার কি-ই বা করার আছে ? এমন সময় রাসেলের মোবাইল বেজে উঠে । তার বড় বোন মুক্তির ফোনকল ।

- '' এই রাসেল তুই কোথায় রে ? '' মুক্তির কন্ঠ কেমন যেন ভেজা ভেজা শুনায় ।

-- আমি থিয়েটারে । কেন বলতো ?

- জলদি বাসায় আয় । বাবার কি জানি হয়েছে । ঘামে সারা শরীর ভেজা । কোন সাড়া শব্দ নেই । একদম নড়া চড়াও করছে না । তুই জলদি আয়রে ভাই ।

-- আমি আসছি , এক্ষুনি আসছি ।

গত তিন দিন ধরে আবুল খায়ের সাহেব হাসপাতালে । তার জ্ঞান ফিরেছে , কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর একটি কথাও তিনি বলেন নি । রাসেল চুপচাপ তার বাবার পাশে বসে আছে । গত তিন দিন এভাবেই বসে ছিল এক কাপড়ে । না ঘুমিয়ে চোখ লাল হয়ে আছে । এমন সময় একঝাঁক তরুণ তরুণীর প্রবেশ । তারা তাদের স্যারকে দেখতে এসেছে । কারো হাতে ফুল , কারো হাতে ফল । রাসেল তার বাবার কপালে হাত রাখলেন । আবুল খায়ের সাহেব আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকান । তরুণদের মধ্য থেকে একজন বললো ...

'' স্যার আমরা সবাই এসেছি আপনাকে দাওয়াত দিতে । আমাদের একটা সংগঠন আছে , '' ভালবাসি বাংলাদেশ '' নামে । বিজয় দিবস উপলক্ষে আমরা একটা অনুষ্ঠান করছি । আপনি আমাদের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি । দুই দিন পর বিজয় দিবস । আমরা সবাই আপনার গল্প শুনতে চাই । আপনি আসবেন না আমাদের মাঝে ? আপনি কি আমাদেরকে শুনাবেন না আপনার গল্প ? ''

 

আজ বিজয় দিবস । '' ভালবাসি বাংলাদেশ ''এর অনুষ্ঠান আজ । রাসেল, আবুল খায়ের সাহেব কে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে মঞ্চের দিকে । রাসেলের মনে পড়ে ঠিক এভাবেই তার হাত ধরে আবুল খায়ের সাহেব তাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন । আজ কতদিন পর তার বুকে সুখের বাতাস বয়ে গেল , সে নিজেও সে খবর রাখেনি । একঝাঁক তরুণ তরুণী অধীর আগ্রহে বসে আছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনার জন্য । মঞ্চে আবুল খায়ের , সমবেত সবাই চুপ । চারদিকে পিন পতন নিস্তব্দতা । যেন বহুকাল প্রতিক্ষার পর কবি এসেছেন জনতার মঞ্চে । আবুল খায়ের সাহেব তার গল্প শুরু করলেন । তার জীবনের একমাত্র আর সবচেয়ে পুরানো গল্প ...

'' আজ থেকে অনেক অনেক বছর আগে আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিল । তাঁর ছিল বেজায় সাহস । আর এই দেশের মানুষের প্রতি ছিল তার অগাধ ভালবাসা । পৌষের চন্দ্রালোকিত মধ্যরাত্রির প্রকৃতির মত কোমল একখানা হৃদয় ছিল তাঁর । তিনি ছিলেন চাষী । না না , কোন ক্ষেত খামারের চাষী না । চিনি চাষ করতেন স্বাধীনতা নামের একটা শব্দের । নির্যাতীত এই দেশের ৭ কোটি মানুষের মনে তিনি চাষ করেছিলেন স্বাধীনতার । বুনেছিলেন স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন । তোমরা কি তার নাম জানো ? .....''

Share