সখি ভালবাসা কারে কয়

লিখেছেন - ইয়েসির আরাফাত | লেখাটি 1101 বার দেখা হয়েছে

রামিম আহমেদ আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে অপরিচিত চেহারা । ফার্ষ্ট ইয়ার ফাইনালে মেধাতালিকায় প্রথম স্থানে তার নাম দেখে সবার চোখ অক্ষিকোটর থেকে বের হয়ে পড়ে যাবার অবস্থা । এই ছেলের নাম এর আগে কেউ কখনো শুনেনি । কিছুদিন হলো সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাস শুরু হয়েছে । জীব বিজ্ঞান ক্লাসে পেছনের দিকের সীটে বসে রামিম মনযোগ দিয়ে কবিতা লিখছে । শিরিন ম্যাডাম ক্লাস নিচ্ছেন । ক্লাসে পিন পতন নিস্তব্ধতা । হঠাত্‌ শিরিন ম্যাডাম ডেকে উঠলেন .........

'' এই ছেলে , তুমি , হ্যা হ্যা তুমি ; দাঁড়াও । ''

মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে পড়লো রামিম । মনে মনে দুয়া ইউনুস পড়া শুরু করে দিল সে । না জানি কি-না কি হয় আজকে । শিরিন ম্যাডাম কে ক্লাসের সবাই খুব ভয় পায় । উনাকে ভয় পাওয়ার যতেষ্ট কারন আছে , উনি তিল কে তাল না , তিল কে তিলোত্তমা বানিয়ে ছাড়েন ।

- কি নাম তোমার ?

-- রামিম ।

- ক্লাসের সেই শুরু থেকে দেখছি খাতায় কি জানি লিখেই যাচ্ছ । কি লিখছিলে ?

-- কিছু না ম্যাডাম । এমনি...

- দেখি , খাতা নিয়ে এখানে আস ।

ক্লাসের সবাই চাপা স্বরে কথা বলা শুরু করে দিল । রামিমের পৃথিবী রিক্টার স্কেলে ১০ এর কাছাকাছি মাত্রায় দুল খেল । এ রকম সিচুয়েশনে ওর খালি হিসু আসে ; এখনো হিসু পাচ্ছে । সে মনে মনে দোয়া করছে , ম্যাডাম যেন আজকে তিল কে এটলিষ্ট কাঁঠাল পর্যায়ে হলেও রাখেন । বেশ কয়েক বার মনে মনে বললো , '' মা ধরিত্রী দ্বিধা হও '' ।

শিরিন ম্যাডাম মিটমিট করে হাসছেন । আনমনে বলেই ফেললেন , ' বাহ ! তোমার হাতের লেখাতো বেশ চমত্‌কার ' । এর পর শিরিন আপা তাই করলেন , যার ভয়ে অস্থির হয়ে ছিল রামিম । প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে রামিমের খাতায় লেখা ছোট ছোট কবিতাগুলো বড় করে পড়তে শুরু করলেন ।

 

    ফিরে গেছে ডাকপিয়ন ,

    তুমি শুনলে না তখন ।

    নীলাভ খামের ডাক / তবে স্বযতনে তোলা থাক ।

    বেহায়া ভালবাসা, চিনে এসেছে বাসা, পৌঁছে যাবে ঠিক ঠাক ।

 

ক্লাসে হাসির ধুম পড়ে গেল । রামিমের সেদিকে খেয়াল নেই এখন । কারন সে বেহায়ার মত তাকিয়ে আছে জয়ন্তীর দিকে । জয়ন্তী হাসছে । জয়ন্তী বড়ুয়া ; তার ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে । ভুল , জয়ন্তী এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী । সে হাসছে । রামিমের কাছে মনে হল জয়ন্তীর হাসির বিভায় সূয্যি মামা কিছুটা লজ্জা পেলেন ।

- কার লেখা কবিতা ?

রামিম সংকোচের সাথে বলল ,

-- ম্যাডাম , আমার ।

- তোমার ! বেশ ভাল লিখেছ । কিন্তু জীব-বিজ্ঞান ক্লাসে কবিতা চর্চার অপরাধে তুমি আজ পুরা ক্লাস বেঞ্চির উপর দাঁড়িয়ে থাকবে , যাও ।

সেদিন রামিম পুরাটা ক্লাস বেঞ্চির উপর দাঁড়িয়ে ছিল । এরপর টানা ১ সপ্তাহ সে ক্লাসে যায় নি । প্রতিদিন কলেজে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হতো , আর সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে বসে থাকতো । ভেবেছিল কোনদিন কলেজে যাবে না আর । কিন্তু জয়ন্তীর সাথে যে তার দেখা হয়না , সেটাই হলো প্রব্লেম । এই কয়দিন প্রতি সন্ধ্যায় সে জয়ন্তীদের বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল । এই কাজটা সে প্রতিদিনই করে অবশ্য । জয়ন্তী মাঝে মাঝে বেল্কনীতে আসে । অন্ধকার রাস্তায় সে রামিমকে দেখতে পায় না । কিন্তু রামিম ঠিকি জয়ন্তীকে দেখে ।

খুব তুচ্ছ কারনে জয়ন্তীর মনটা খারাপ হয়ে আছে । কারনটা তুচ্ছ হলেও এর প্রভাব কিন্তু ব্যাপক । আজ সারাটা দিন ভুগতে হবে তাকে । এরকম প্রায়ই হয় তার । আজ যা-ই ঘটবে , সেটাতেই সে বিরক্ত হবে । তার উপর কখন থেকে সে অপেক্ষা করছে নকিব আর সামান্তা'র জন্য । অথচ ওদের কোন হদিস নেই । শিশু একাডেমীর নীচ তলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জয়ন্তী বিরক্তির চুড়ান্ত সীমায় পৌছার ঠিক একটু আগেই সে দেখলো উপর থেকে রামিম নামছে । জয়ন্তী কিছুটা বিব্রত হলো । রামিম জয়ন্তীকে দেখেনি , অন্যপথে চলেই যাচ্ছিল । হটাত্‌ পেছেন থেকে জয়ন্তী রামিম বলে ডাক দিল । পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখে জয়ন্তী তার নাম ধরে ডাকছে । সে তার কানকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না । রামিমের মনে হল হঠাত্‌ পৃথিবীর আহ্নিক গতি - বার্ষিক গতি বোধয় বেড়ে গেছে । সূর্য আরো কাছে নেমে এসেছে কয়েক আলোকবর্ষ । নয়ত এর মধ্যেই সে কেন এমন করে ঘামছে ! তৃষ্ণায় তার গলা শুকিয়ে ভয়াবহ অবস্থা ।

- তোমার নামতো রামিম, তাই না ?

-- হ্যা ; ভাল আছো জয়ন্তী ?

- ভাল । তুমি এখানে ? কারো সাথে দেখা করতে এসছো ?

-- না না , শিশু একাডেমীতেই একটা কাজ ছিল ।

- আমি নকিব আর সামান্তার জন্য অপেক্ষা করছি । ওদের আসার কোন নাম গন্ধ নেই । আচ্ছা , তুমি এই কয়দিন কলেজে আসনি কেন ? শিরিন ম্যাডাম খুঁজছিলেন তোমাকে ।

-- তাই ! না আসলে শরীরটা খুব একটা ভাল ছিল না । আর তাছাড়া বেশ লজ্জা পেয়েছিলাম সেদিন । ভেবেছিলাম আর কোনদিন কলেজে যাব না ।

জয়ন্তী আর রামিমের কথা আর বেশী দূর আগায় না । রিক্সা থেকে নেমে সামান্তা প্রায় দৌঁড়ে ওদের কাছে এলো ।

'' সরি দোস্ত দেরী হয়ে গেল । ঐ নকিব গাধাটার জন্যই দেরী হলো । তা, আমাদের হেলাল হাফিজ কে কই পেলি ? '' সামান্তার কন্ঠে রাজ্যের উচ্ছাস ।

জয়ন্তী রামিমের প্রশ্নবোধক চিহ্ন মার্কা দৃষ্টি উপেক্ষা করতে পারলো না , বলেই ফেললো '' ও হ্যা , কলেজের ঐ দিনের ঘটনার পর সামান্তা তোমার নাম দিয়েছে হেলাল হাফিজ । ''

রামিম কিঞ্চিত লজ্জা পায় । মুখে সৌজন্যমুলক হাসি ।

'' আচ্ছা , আজ তাহলে আমি চলি । তোমরা মজা কর । দেখা হবে অন্য কোন দিন । '' রামিম কিছুটা ব্যস্ততা দেখায় ।

'' চলি মানে ! আজকে আমার জন্মদিন । আর তুমি আমাদের সাথেই যাচ্ছ । '' সামান্তা অনেকটা অধিকার নিয়েই বলে ।

'' তাই নাকি ! হ্যাপি বার্থ ডে ; তোমার জীবন হউক সজিনার ফুলের মত সুন্দর । কিন্তু আজ যে আমাকে যেতে হয় , ইম্পর্টেন্ট একটা কাজ ছিল । ''

সামান্তা : কোন ভাবেই না ।

জয়ন্তী : চল আমাদের সাথে , বেশিক্ষণ থাকবো না এম্নিতে আমরাও ।

জয়ন্তীর ডাক উপেক্ষা করার ক্ষমতা কিংবা সাহস কোনটাই রামিমের ছিল না । বরং তার কাছে পুরো বিষয়টা এখনো ঘোরলাগা । সে নিজেকে , এই অপরাহ্ন কে বিশ্বাস করতে পারছে না ঠিক মত । ওরা তিনজন হাঁটতে থাকে ।

শিশু একাডেমীটা বেশ চমত্‌কার একটা জায়গায় । সামনে সারি সারি ঝাউবন যেখানে দৃষ্টি আটকে যায় । আর দৃষ্টির সীমানা পার হলেই অন্য কোন পৃথিবী যেন । অথৈ জলধারা , দীর্ঘতম সমুদ্রের অসমাপ্ত বেলাভূমি ।

একঝাঁক তরুন তরুনী হাঁটছে সাগরতীর ধরে । সমুদ্রের গর্জন ছাপিয়ে তাদের চিত্‌কার , হাসাহাসিতে মুখরিত ছিল সেদিনের বিকেল । রামিম বেশ শান্ত , একা একাই হাঁটছে । তাদের অনেকের সাথেই তার তেমন সখ্যতা নেই । জয়ন্তী তার পাশে চলে আসে । পাশাপাশি হাঁটছে তারা দুইজন । প্রকৃতি তাদের দুজনকে কাছাকাছি আসার একটা সুযোগ করে দেয় । সেই বিকেলের সব কটা মুহুর্তই যেন অপার্থিব ।

- '' তুমি বেশ চুপচাপ ; আমরা মনে হয় তোমাকে বিব্রতকর আবস্থায় ফেলে দিলাম । ''

রামিম হাসে ।

-- জয়ন্তী , তোমাকে একটা কথা বলবো বলে ভাবছিলাম । কিন্তু কিভাবে বলি ; বা বলা উচিত হবে কিনা তাও জানি না ।

- খুব খারাপ কিছু কি ? তাহলে বলোনা - জয়ন্তীর হাসিতে প্রশ্রয় ।

-- না, এমন কিছু না । আচ্ছা বলেই ফেলি ।

'' তুমি স্বপ্ন দেখ ? ''

জয়ন্তী বেশ অবাক দৃষ্টিতে রামিমের দিকে তাকায় । যেন এমন অদ্ভুত প্রশ্ন সে আগে কোনদিন শুনেনি ।

- এটা কেমন প্রশ্ন । সবাই স্বপ্ন দেখে , সবার নিজস্ব কিছু স্বপ্ন থাকে ।

-- হুঁ , সত্যি । আমিও দেখি । পার্থক্য হল , আমি আমার দেখা স্বপ্ন হুবাহু যাপন করছি ।

- মানে কি ? বুঝলাম না ।

-- আমি দিনের পর দিন , অবিশ্রান্ত নিজের ভেতর একটা স্বপ্ন সাজিয়েছিলাম অবিকল এমন একটা বিকেলের । আমার ধুসর পান্ডুলিপিতে লিখে রেখেছি সব । তুমি বিশ্বাস করবে না জানি , তারপর ও বলি । শুধু এটুকু আলাদা ,আমার স্বপ্নে তুমি শাড়ি পড়ে আস । তোমার খোলা চুল বাতাস এলোমেলো করে দেয় । তোমার চোখে মুখে চুল । তোমার চুলের ঝাপ্টা কিছুটা আমার গালেও পড়ছে । এমন সুখদায়ক বাতাসী যন্ত্রনায় কিঞ্চিত বিরক্ত হও তুমি । আমি গল্প বলি , তুমি হাসতে হাসতে ভেঙ্গে পড় । তোমার হাসির আওয়াজ আমার ভেতর এই রকম ফেনীল ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়ে । হঠাত্‌ ধমকা হাওয়ায় আমার চোখে বালি পড়ে । আর তুমি তোমার আঁচলের ভাপ দিয়ে মুছে দাও ।

রামিম আর কোন কথা বলে না । জয়ন্তী কিছুটা বিব্রত হয়ে চুল গুছাতে থাকে । এরপর দু'জনেই চুপ চাপ । তারপর হঠাত্‌ রামিম ,'' may be i should go '' বলে কোন উত্তরের অপেক্ষা না করেই উল্টা পথে হাটতে থাকে । জয়ন্তী কিছু বুঝে উঠার আগেই সে অনেক দূর চলে যায় ।

জয়ন্তী কলেজে এসেই মনে মনে রামিমকেই খুঁজছিল । কিন্তু তার কোন খবর নেই । গতকাল কি সব বলে গেল , জয়ন্তীর সারাটা রাত কেটেছে এলোমেলো ভাবনায় । '' আশ্চর্য্য ছেলে তো ! আজকেও কি কলেজে এলো না । '' মনে মনে ভাবতে থাকে জয়ন্তী । এসব ভাবতে ভাবতে কলেজের যাত্রী ছাউনির দিকে হাঁটতে থাকে সে । একটু পরে বাস এসে যাবে । সামান্তারা খুব চিত্‌কার চেঁচামেচি করছে । হঠাত্‌ জয়ন্তী পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে রামিম দাঁড়িয়ে আছে । জয়ন্তী কিছুই বলে না । রামিমের হাতে তার ডায়রী , ধুসর পান্ডুলিপি । রামিম জয়ন্তীর দিকে সেটা বাড়িয়ে দেয় । জয়ন্তী বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে , '' কি ওটা ? "

- ধুসর পান্ডুলিপি ।

-- তো আমাকে দিচ্ছা কেন ?

- তোমার জন্য । প্লিজ নিয়ে যাও । পছন্দ না হলে ফেলে দিও ।

-- ক্লাস করোনি কেন ?

- করেছি । পেছনে বসে ছিলাম । তুমি খেয়াল করনি ।

এর মধ্যে বাস চলে আসে । জয়ন্তী বাসে উঠে যায় । রামিমের ডায়রীটা ব্যাগে ঢুকাতে গিয়ে সামান্তা দেখে ফেলে । শুরু হয় মেয়েলি কথাবার্তা । জয়ন্তীর ওদিকে একদম মন নেই । তার কৌতুহল, কি আছে ঐ ডায়রীতে । জয়ন্তীর তাড়া কখন বাসায় যাবে সে , কখন পড়বে সেটা । অতএব , বাসায় পৌঁছে সে তার রুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দেয় । ডায়রী খুলেতেই দেখলো একটা নীল খাম । জয়ন্তী খাম খুলে চিঠি পড়তে শুরু করলো ।

 

   " জয়ন্তী ,

    মনে হয় বেশ অস্বস্থির মধ্যে ফেলে দিলাম তোমাকে । এই ভয়টাই ছিল আমার । আমি চাইনি আমার স্বপ্ন , আমার বিষন্নতা কখনো তোমার স্বাভাবিক জীবনকে আন্দোলিত করুক । তাই গত এক বছরে তুমি কখনোই জানতে না রামিম নামের কেউ তোমার ক্লাসে পড়ে । আমি প্রতিদিন তোমাকে দেখেছি , ভিন্ন ভিন্ন রূপে সাজিয়েছি তোমাকে । আমার ভেতর কেমন লুকিয়ে থাকো তুমি । যেন জলের মধ্যে মিশে থাকা জল রঙ আলো । আমি প্রতিদিন তোমার বাসার সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেছি , তোমাকে দেখবো বলে । তুমি মাঝে মাঝে বারান্দায় আসতে । আমি তোমাকে দেখতাম , কিন্তু অন্ধকারে তুমি কখনোই আমাকে দেখনি ।

    জয়ন্তী , আমি জানি না আমার কেন এমন হলো ? কেন আমার দিন কাটে না , না রাত কাটে । কেন আমার অনুভুতিগুলো কেবল তোমার সূর্যমূখীর মুখাপেক্ষি ? কেন আমার প্রতিটা সন্ধ্যা নামে তোমার উঠোনে ? তুমি কিভাবে জানবে , এত কিছুর জবাব আমি নিজেই জানতে পারিনি । সেদিন যে স্বপ্নের কথা বলেছিলাম , সেই স্বপ্ন প্রায়শঃ আমার মাথার ভেতর ঘুরে উঠে । আমার বুকের চারপাশে ঘুরে । আমি তাকে এড়াতে পারি না ।

    তোমাকে দেখার পর থেকে আমার মাথা খারাপের মত হয়ে গেল । প্রথম প্রথম মনে হত এটা একটা মোহ ; মায়া । তোমাকে নিজের কাছ থেকে আড়াল করে রাখলে মনে হয় এই মোহ কেটে যাবে । তাই ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম । ম্যাথ প্রব্লেম সল্‌ভ করতে লাগলাম । রসায়ন, পদার্থ বিজ্ঞানে কন্সেন্‌ট্রেট করতে শুরু করলাম বেশী করে । কিন্তু লাভ হলো না । যেটা হলো তা হল অনিদ্রা রোগ । পাতার পর পাতা চিঠি লিখতে শুরু করলাম ।

    জয়ন্তী , আমি বিশ্বাস করি প্রকৃতি নির্দিষ্ট কোন কারন ছাড়া কিছুই করে না । কিন্তু তাই বলে প্রকৃতির এই বাঘবন্দি র খেলায় আমি হেরে যেতে চাই না । আমি তোমার খুব কাছে যেতে চাই । আমাকে তোমার ভেতর আবিষ্কার করতে চাই । তোমাকে নিদারুন ভালবেসে যেতে চাই । শিমুল তুলার মত তোমাকে নিয়ে উড়ে যেতে চাই মেঘেদের দলে মিশে । আমি চাই ,ভীষন জ্বরে আমার গা পুড়ে গেলে তোমার হাত খানি আমার কপালে রাখো ।

    পুনশ্চ ; যদি পার কাল একবার দেখা করো । শিশু একাডেমির নীচে থাকবো আমি বিকেল ৪ টায় ।"

 

জয়ন্তী চিঠি রেখে , ডায়রীর পাতা উল্টায় একটার পর একটা । তার নিশ্বাস ভারী হয়ে আসে । সমুদ্র পাড়ের মেয়ে , তাই সমুদ্রের লোনা ঢেউ আছড়ে পড়তে চায় চোখের পাতায় । এর পর কে রোধে তার অবিরাম স্রোত ! সারাটি রাত ডায়রীর পাতাগুলোর সাথে তার মনের কথা হয় । দ্বিধার স্তুপ বাড়তে থাকে । তারও স্বপ্ন ছিল একসময় এমন করে কেউ তাকে ভালবাসবে । রামিম বেসেছে । যে ভালবাসা উপেক্ষা করার ক্ষমতা ঈশ্বর তাকে দেয় নি । যে উপেক্ষা করতে পারবে , সে হয় দেবী না হয় পাথর । জয়ন্তী দেবী ও নয় , পাথর ও নয় । সাধারন একটা মেয়ে । এতই সাধারন যে ধর্ম তার সামনে আজ দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে । ছোট শহরের মেয়ে হয়ে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী একটা ছেলেকে ভালবাসা নেহায়েত স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয় । যার সাথে বাস্তবতার যোজন যোজন দূরত্ব । কিন্ত, '' প্রেম একবার এসেছিল নীরবে ......... '' এই একটা গান শুনে সারা জীবন কাটাতে চায় না সে । অতঃপর রাত শেষে জয়ন্তী তার জীবনের সবচে কঠিন সীদ্ধান্তটা নেয় ।

সেদিন পৃথিবীটা কেমন ছিল তার খবর কেউ রাখেনি । প্রতিদিনের মত আকাশ নীল ছিল , নাকি ঈষৎ গোলাপী হয়ে উঠেছিল তা কেউ খেয়াল করেনি । শুধু রামিম জানত আর করুণাময় জানতেন সেদিন পৃথিবী ব্যাপক আয়োজনে সেজেছিল । জয়ন্তী এসেছিল সেদিন । দেবী কিংবা রাজকন্যা নয় , সাধারন অন্য যে কোন নারীর মত ।

জয়ন্তী ধিমি ধিমি পায়ে হেঁটে আসছে । রামিম অপলক তাকিয়ে আছে সেদিকে । তখন তার পলকে দারুন ঝলকে ভরে উঠে জল । হৃদয় দোলা দিয়ে উঠে । তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে ...............

 

    তোমাকে, শুধু তোমাকে চাই, পাবো?

    পাই বা না পাই এক জীবনে তোমার কাছেই যাবো ।

    ইচ্ছে হলে দেখতে দিও, দেখো

    হাত বাড়িয়ে হাত চেয়েছি রাখতে দিও, রেখো

    অপূণতায় নষ্টে-কষ্টে গেলো                         

    এতোটা কাল, আজকে যদি মাতাল জোয়ার এলো

    এসো দু’জন প্লাবিত হই প্রেমে

    নিরাভরণ সখ্য হবে যুগল-স্নানে নেমে ।

    থাকবো ব্যাকুল শর্তবিহীন নত

    পরস্পরের বুকের কাছে মুগ্ধ অভিভূত ।

 

 

 

    ----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

 

     

 

পুনশ্চ : রামিম-জয়ন্তীর প্রেম পরবর্তী সময়গুলো আরো রোমাঞ্চকর । হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া । সবার জীবনেই এক একজন জয়ন্তী থাকে । জয়ন্তীরা কেন এত মায়াবতী হয় !!

 

 

 

Share