ধুসর পান্ডুলিপি

লিখেছেন - ইয়েসির আরাফাত | লেখাটি 784 বার দেখা হয়েছে

ভালবাসা আমার মেঘ গুড় গুড় সন্ধ্যা ,

রক্তজবা ভিটে মাটির আসমান ।

সুখী সুখী বাতাসে আয়েশী রাত ।

প্রজাপতি ভোর ।

অলস চোখ স্বপ্নে বিভোর ,

তোমার রঙিন চুড়ির নির্ভরতার হাত ।

হাতের মুঠোয় বেহুঁশ প্রাণ ।  

 

খামের উপর পরিচিত হাতের লেখা । তাড়াহুড়া করে খাম খুলতে গিয়ে চিঠির কিছুটা অংশ ছিঁড়ে গেছে । খুব বিরক্ত হয় মেয়েটা । বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে মেয়েটা পড়তে শুরু করে ।

 

  '' ... অনেকটা জোর করেই  কপল সেদিন ধরে নিয়ে গিয়েছিল নটিং হিল কার্নিভালে ( Notting Hill Carnival ) । চারদিকে রঙ আর পোষাকের বৈচিত্র । এসব দেখে সত্যিকার অর্থে লন্ডনকে উৎসবের শহর বলে মনে হয় ।  চারদিকে দেখতে দেখতে হাঁটছিলাম আমরা । যা-ই দেখছি চোখ আটকে যাচ্ছে । হঠাৎ একটা মেয়ে এসে জানতে চাইলো নিকটবর্তী আন্ডারগ্রাঊন্ড ষ্টেশনে যেতে হলে কোন দিকে যেতে হবে ।

 

            এখানে এসেই ফাইনালি আটকে গেলাম আমি । কোন কথাই বলতে পারিনি , হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিলাম । মেয়েটা থাঙ্কস বলে সামনে হেঁটে যাওয়ার পরও অনেক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম সেদিকে ।

 

            বর্ষা , মেয়েটিকে দেখে তোমার কথা খুব মনে পড়ে গেল । চেরী ফুলের মত ছোট ছোট চোখ । কি গভীর বিষাদ সেই চোখে । তোমার মতই হাত নেড়ে , মাথা নেড়ে কথা বলছিল মেয়েটি । কিছুক্ষণের জন্য মনে হয়েছিল তুমি কি না !

 

সেদিন আমার আর কার্নিভালের মজাই নেয়া হয়নি । সিগেরেট জ্বালিয়ে এককোনায় বসে পড়লাম । কপল বার বার জিজ্ঞেস করছিলো , আমার কি হয়েছে । '' তোমার কি শরীর খারাপ ? ''

 

'' না ''

 

'' তাহলে এখানে বসে পড়লে কেন ? ''

 

'' এমনি ''

 

'' এমনি , মানে কি ? ''

 

'' একটা মেয়ে এসে জানতে চাইল ষ্টেশন কোন দিকে ''

 

'' কেউ এরকম কিছু জানতে চাইলেই বসে পড়তে হয়  ! ''

 

'' না সেরকম কিছু না । মেয়েটাকে দেখে '' বর্ষার '' কথা মনে পড়ল ''

 

কপল আর কথা বাড়ায়নি , পাশে এসে সেও বসে পড়ল ।

 

                     বর্ষা , আজকাল তোমাকে খুব মনে পড়ে । আমার প্রিয় পোষাকে তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে  । তুমি কেমন আছো ? তোমার আমার দূরত্বটা এতো বেড়ে গেলো হঠাৎ করে , এখন ইচ্ছে করলেই দেখা করতে পারিনা । অথচ আগে কারনে অকারনে কতদিন তোমার বাসায় গিয়ে বসে থাকতাম । তৃষা আপু , আমি , তুমি  কত বিচিত্র বিষয়ে আড্ডা দিতাম । হাসির শব্দে ঘর বাড়ি মাথায় তুলতাম । এসব এখন শুধুই স্মৃতি । ইদানিং স্মৃতি বড়ো বেশি জ্বালাতন করছে । কাজের ফাঁকে , চলার পথে বিভিন্ন কারনে তুমি এসে পড় । আবার তোমাকে-আমাকে জড়িয়ে জট পাকিয়ে ফেলি সবকিছু । বড্ড বেহায়া এই জীবন , তাই না !

 

          সেদিন খুব ইচ্ছে করছিল , ৬০ মেলফোর্ড রোড থেকে একবার ঘুরে আসি । ঐ বাসায় আমাদের সবার কত স্মৃতি । কত পার্টি , ৩টা পহেলা বৈশাখ , ডজনখানেক বার্থডে । ছেলেমানুষী যত আনন্দ । তোমার মনে আছে বর্ষা, আমার বাসায় প্রতিবছর বৈশাখের সেই পার্টিগুলোর কথা ? ঐ একটা দিন তোমরা মেয়েরা সবাই শাড়ি পড়তে । যেন একঝাঁক বালিহাঁস । তুমি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছো , ঐ দৃশ্য এখনো আমার চোখে ফ্রিজ হয়ে আছে ।

 

                        ইদানিং জীবন বড়ো বেশী একঘেঁয়ে মনে হয় । মন খুলে আড্ডা দিতে খুব মন চায় । উম্মাদের মত ঘর ফাঁটিয়ে হাসতে ইচ্ছে করছে । আগে এরকম কত আড্ডা হতো । তোমার মনে পড়ে , তোমাদের বাসায় আমরা সবাই  রাতব্যপী আড্ডা দিব বলে জড়ো হতাম প্রায় । এরকম কতরাত সবাই মিলে আড্ডা দিয়ে পার করেছি । কিন্ত আমার সেই প্রথম রাতটাই বেশী মনে পড়ে । রায়হানের ভুতের গল্প বলা , আর তোমাদের সবার মিছে মিছে ভয় পাওয়া । তুমি আমার পাশেই বসা ছিলে  । আনন্দ  আর উত্তেজনা তোমার চোখে মুখে নিংড়ে পড়ছিলো । কিছুক্ষনের জন্য আমার মনে হয়েছিল , সুখ এমন কোন আলীক বস্তু নয় । তোমার পাশাপাশি থেকে , শরীরের ইলেক্ট্রন আদান প্রদানের মত সুলভ আর তুচ্ছ কোন বিষয় । সেই রাতে truth or dare এর কথা মনে আছে ? বার বার আমাকেই অদ্ভুত সব প্রশ্ন করা হচ্ছিল । আমার প্রথম প্রেম , first kiss , আরো কি কি সব ! একজন প্রশ্ন করে বসলো লন্ডনে কারো প্রেমে পড়েছি কি না । সত্য বলছি বর্ষা সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি এত কিছু ভাবিনি । বলেই ফেললাম ...।

 

                       শুনে কিছুই বলনি তুমি । কেবল সোজাসুজি তাকিয়ে ছিলে চোখের দিকে । তারপর অনেক্ষণ চেয়ে থাকো এভাবে । পলক পড়ে না । কি দেখছিলে অমন করে ? আমাকে ভালবাসো না এটা বলতে গিয়ে তুচ্ছ একটা কারন দেখালে । আমার হাসি পেল । তখন ও বুজেছিলাম , আজো বুঝি বর্ষা , আমাকে ছোট করতে চাওনি সবার সামনে । এ ও কি আমাকে শিখিয়ে দিতে হবে ,

 

    '' ইচ্ছের বিরুদ্ধে মৃত্যু সম্ভব , ভালবাসা নয় । ''

 

 

 

কিছুদিন আগে bournemouth গিয়েছিলাম কয়জন বন্ধু মিলে । বিচ্ এর এ প্রান্ত ও প্রান্ত হেঁটে ক্লান্ত হয়ে অবশেষে ঠিক ওখানটায় গিয়েই বসে পড়লাম, যেখানে আমি আর তুমি এর আগেরবার বসেছিলাম  । তোমার আমার পুরানো দিন খুঁজে দেখার মিথ্যে চেষ্টা । স্মৃতি খুঁড়ে বেদনা জাগানোর মিথ্যে চেষ্টা । মনে আছে বর্ষা , সমুদ্রের বালিতে দাগ কেটে তুমি কি জানি লেখার চেষ্টা করছিলে । ও হ্যাঁ , তৃষাপু , তোমার আর রন এর নাম । বার বার পানি এসে মুছে দিচ্ছিলো । তোমাকে বললাম '' জানো তো , সমুদ্রে একজন প্রহরি থাকে , তাকে সমুদ্রের কর্তা  বলে । ওর কাছে কিছু চাইলেই পাবে । "

 

   তুমি বিশ্বাসী চোখে তাকালে আমার দিকে , '' তাই ? "

 

'' হ্যাঁ , বিশাল সমুদ্রের জলরাশি সাক্ষী রেখে কিছু চাইলেই পাবে ।  তুমি কিছু চাও নাকি ?  "

 

'' না । আপনি মিথ্যে মিথ্যে বলছেন এসব । ''

 

'' একদমই না , উপকূলীয় অঞ্চলের ছেলে আমি । আমি জানি । জেলে- মাঝিরা বলে এসব । ''

 

                        তুমি কিছুক্ষণ চুপ হয়ে থাকো । হয়ত মনে মনে কিছু একটা চেয়ে নিচ্ছিলে । আমিও মনে মনে বললাম , '' হে এই পৃথিবীর অধিকর্তা , তোমার সৌন্দর্য্যে বিভোর আমার মননের শপথ , আমি দীর্ঘ দিবস রজনী তোমার প্রার্থনায় কাটিয়ে দিব । শুধু আমার পাশে দাঁড়ানো এই মেয়ের মন কি চায় , প্লিজ পুরণ করো । ''

 

                        বর্ষা , তোমার সাথে যেদিন আমার প্রথম দেখা হয় , আমার মনে হয়েছিল আমি একটুকরো মেঘ হাতে নিয়ে বসে আছি আমার চারপাশে মেঘেদের দল ঝাঁক বেঁধে উড়ে বেড়াচ্ছে । রাশি রাশি কুয়াশায় ঘিরে আছে আমার আস্থিত্ব । তুমি আমার অবিশ্বাস্য আবিষ্কার । এরপর তোমাকে একটু একটু করে জানতে শুরু করলাম । এখন মনে হয় , এই রহস্য ফুরাবার নয় । আমি সবসময় চাইতাম , তোমাকে জানার যে প্রবল আগ্রহ আমার ভেতর , ঠিক তেমনি তুমিও আমাকে জানতে চাও । আমি কি ভাবি , আমার স্বপ্নগুলো কতটা তোমার কাছাকাছি , আমার চাহিদায় তোমার কতটুকু যোগান , এসব । নিজেকে রহস্যময় করে তুলতে , আমাকে জানার প্রতি তোমার আগ্রহ তৈরি করতে একটা খেলা আবিষ্কার করি আমি আর কপল মিলে । নাম দিই জ্যাম । মিশন জানার আগ্রহ । এই খেলার প্রতিটা স্টেপ সাজানো হয় তোমাকে মুগ্ধ করার জন্য । তোমাকে আনন্দ দেয়ার জন্য । তুমি অনেক বার জানতে চেয়েছিলে জ্যাম কি । আমার ফেইসবুকে স্টেটাস দেখেই তুমি জানতে চেয়েছিলে । সত্যি সত্যি তুমিই ছিলে আমার স্টেটাস কন্যা । তোমার উপর আমার শত রাগ , অভিমান ঐ স্টটাসেই লিখতাম । এই সব পাগলামী করতাম আর মন খারাপ করে থাকতাম । কপলটাই সব সময় খেয়াল করত , আর একশ একটা প্রশ্ন করত ।

 

 

 

 

 

                           কপল ছেলেটা আমার জীবনে ছায়া হয়ে আছে তখন থেকে । বয়সে কত ছোট ! কিন্তু বন্ধুর ছেয়ে কম ছিলোনা কখনোই ।  তোমার মনে আছে কপলের কথা ? খুব ভালো গিটার বাজাতো , গান করতো কপল । মানুষকে জানার প্রবল আগ্রহ ছিল তার মধ্যে । খুব সহজে সবার মাঝে জায়গাও করে নিতে পারত । সব সময় অনেক প্রশ্ন করতো । একদিন সকালে কাজ শেষে আমার সাথে আমার বাসায় চলে এলো  । কত কিছু  রান্না-বান্না করলো ও আর রাজিব মিলে । খেয়েদেয়ে আমার ৬০ মেলফোর্ড রোডের বাসার গার্ডেনে বসে চা খেতে খেতে এসব প্ল্যান করি । কপল বলে , '' ভাই , তোমার তো এখানে হারাবার কিছু নেই । তোমার কোন চাওয়া ও নেই বর্ষা আপুর কাছে। ক্ষতি কি তুমি একটু আনন্দ পেলে , সে ও একটু আনন্দ পেলো । ''

 

      সত্যিই তো খুব বেশি চাওয়া কি কখনোই ছিল আমার , তোমার কাছে । পরিস্থিতি তোমাকে এতই কৃপণ বানিয়ে রেখেছিলো , কি বা চাইতাম তোমার কাছে । তোমাকে না পাওয়ার কষ্ট কখনোই বেশি ছিল না , অন্যকারো প্রতি তোমার আবেগের বাড়াবাড়ি যতটা কষ্ট দিত ।

 

 

 

                                   রান্না-বান্নার আশপাশ দিয়েই তুমি যেতে না । তৃষা'পু তখন বাংলাদেশে । ইচ্ছে করতো তোমার জন্য রান্না করে দিয়ে আসি । তোমার জন্য রান্না করতে আমার কখনোই কষ্ট লাগতো না , কষ্টটা ছিল অন্যখানে । তুমি জানতে তো কষ্টটা কোথায় ছিল , জানতে না ? একদিন হঠাৎ করে অনেকগুলো পরটা আর ফুল নিয়ে তোমাকে দেখতে গেলাম । আনেক হাসিখুশি ছিলাম সেদিন । তুমি কিছুটা আশ্চর্য্য হয়েছিলে , তাই না । কারন অনেক দিন পর তুমি আমাকে হাসতে দেখেছিলে । ওটাই ছিল জ্যাম । আমার মধ্যের পরিবর্তন তোমাকে আনন্দ দিবে , কৌতুহলী করবে ।

 

                                   দিন-সাতেক পর তোমার জন্য রান্না করলাম , তোমার বাসায় । এক সাথে খেলাম । আসার সময় লুকিয়ে তোমার জন্য একটা চিঠি রেখে আসি । এই যুগে কেউ চিঠি লেখে ! আমি লিখেছিলাম । একরকম কাগজে দুইটা চিঠি । একটা তুমি সেদিন পেয়েছিলে । আরেকটা তোমাকে '' জ্যাম '' যেদিন শেষ হবে সেদিন দেব বলে রেখে দিয়েছিলাম । চিঠিটা পড়ে তুমি খুব অবাক হয়েছিলে । কারন ওখানে কোন লেখা ছিল না । শুধু ৫টা প্রশ্নবোধক চিহ্ন ।

 

                                    চিঠির প্রসঙ্গে মনে পড়েছে , তোমাকে লেখা ১৬৯ তম চিঠিটা কিছুদিন আগে আরেকবার পড়লাম । এর আগের চিঠিগুলোও দেয়া হয়নি তোমাকে । নীলখামে অবহেলায় অযত্নে ছত্রাক জমেছে । তোমাকে লেখা এই একটা চিঠি আমার খুব প্রিয় । বড় প্রিয় ।

 

                  

 

 

 

প্রিয় '' বিষন্নতা ''

 

কেমন আছো ? ভাবছ এমন অদ্ভূত নামে তোমাকে ডাকার কারন কি ? আমার সুখ ঠিক ঠাক মত তোমাকে ছুঁতে পারেনি । ছুঁয়েছে কেবল বিষন্নতা । আমি কিছু বললেই তুমি তার কদর্থ কর । রেগে যাও , ঝগড়া কর । আমি কষ্ট পাই , এটুকুও কি বোঝ না তুমি , নারী ! বেশ আজ থেকে তোমাকে '' নারী '' নামেই ডাকবো । নারী-ই তো । দীঘল কালো চুল , শড়ি সজ্জায় আপার্থিব তুমি , দীঘির জলের মত টলটলে মন , স্বপ্নমাখা দিঠি , পুঁই লতার মত বাহু আমার ভেতর কেমন লুকিয়ে থাকো তুমি যেমন জলের মধ্যে মিশে থাকা জল-রং আলো ।

 

             তুমি যাবে বলে আসনি আমার জীবনে । তারপর ও বস্তুত তুমি চলে যাও । আমার অনুভুতিগুলো কেমন আস্থির করে দিয়ে যাও । ক্লান্তিহীন তাকিয়ে থাকি তোমার ফিরে আসার পথে । দৃষ্টিময় আশি বছরের দীর্ঘ প্রতিক্ষা । অনুভুতিতে ফিরে আসার অনুনয় । যেন কখনো আসনি তুমি । কিংবা এসেছিলে আমার স্বপ্নে স্বল্পদৈর্ঘ্য কোন মনোরম বিজ্ঞাপন চিত্রের মত । মুহুর্তেই তোমাকে পেতে ইচ্ছে করে । চিৎকার দিয়ে বলি , ফিরে এসো স্বপ্নচারিনী । ফিরে এসো হৃদয়ে আমার ।

 

                   সেদিন ট্রাফেলগার স্কোয়ারে একা একা হাঁটছিলাম । ক্লান্ত হয়ে এক কোনে গিয়ে বসে পড়লাম । ইদানিং আর একা হাঁটতে ইচ্ছে করে না ।  ইচ্ছে করে পুরুনো দিন গুলোর মত তোমার হাত ধরে হেঁটে বেড়াই লন্ডনের ব্যস্ততম সড়কে । চারদিকে থৈ থৈ মানুষ , অথচ কেউ আমাদের চিনে না , কেউ আমাদের দিকে তাকাবেনা । মনে হবে জনতার মাঝে পিন পতন নির্জনতা । তুমি গাইবে আর আমি গানের অনুকরনে ছোট ছোট করে আবৃত্তি করবো ,

 

    '' আমি তোমারো বিরহে রহিব বিলীন ,

 

       তোমাতে করিব বাস ।

 

       দীর্ঘ দিবস , দীর্ঘ রজনী , দীর্ঘ বরষ মাস । ''

 

 

 

                    তুমি সেই যে গেলে আর এলে না । কেন আস না ? বাগানে ফুল ফুটেছে । আমি চিনিও না কি ফুল এগুলো । ছোট ছোট ঘাসফুলের মত দেখতে । সকালে যখন চা হাতে বাগানে গিয়ে দাঁড়াই , কি অদ্ভুত সুগন্ধ ছড়ায় ফুলগুলো । ভেবেছিলাম তুমি এবার এলে তোমাকে চমকে দিব । তাই তোমাকে জানাইনি । কিন্তু তুমি সে-ই যে গেলে আর অসোনি ।  কেন আস না ?  আমার প্রতিরাতে গা কেঁপে জ্বর আসে । কিচ্ছু ভাল লাগে না । একবার অন্তঃত এসে কপালে হাত রেখে জ্বরটুকু দেখে যাও ।

 

                                                                                          বিনীত "ঘুম কুমার"

 

                          এভাবে আরো একদিন চকলেট বক্সের ভিতর প্রতিটা চকলেটে লেখা ছোট ছোট অক্ষর তোমাকে ধাঁধায় ফেলে দিয়েছলো । পাজলটা তুমি ভাংতে পেরেছিলে অবশ্য । এভাবে কত বিচিত্র সব কান্ড যে করেছি । সত্যি করে বল , তুমি কি একটুও আনন্দ পাওনি ? এসব পাগলামি তোমাকে এক মূহুর্তও কি মুগ্ধ করেনি ? ভেবেছিলাম তোমার জন্মদিনটাই হবে জ্যামের শেষ দিন । যেদিন  শেষ হবে  তুমি ফিরে যেতে পারবে না , বাঁধা পড়ে যাবে । থেকে যাবে আমার জীবন আলোকিত করে । এই সম্ভাবনা অবশ্য খুব বেশি ছিল না । তার মধ্যে তুমি একদিন জানালে তুমি দেশে যাচ্ছ , জন্মদিন সেখানেই করবে ।

 

মুহুর্তেই মনে হলো সব শেষ । বেজে উঠেছে ছুঠির ঘন্টা । শিমুল তুলার মত উড়ে যাচ্ছে এক একটা জমানো আয়োজন ।

 

          কত রিকোয়েষ্ট করলাম , কোন কিছুতেই তোমাকে ফিরাতে পারলাম না । তুমি দেশে যাচ্ছ , এটাই ফাইনাল ।

 

কপল বলে '' ভাই , সব তো শেষ । ''

 

আমি বললাম '' কপল , সব পেলে নষ্ট জীবন '' ।

 

কপল হঠাত লাফ দিয়ে উঠে , '' এভাবে সব আয়োজন শেষ হতে দেয়া যায় না । ''

 

''এর পরও কি করতে চাস তুই ? ''

 

'' প্লানের সব ঠিক থাকবে , শুধু সে বাদ ''

 

''মানে ! লাভ কি ? যার জন্য এত কিছু সেই তো নেই । ''

 

'' আরে সে থাকলেও যে তোমাকে ভালবেসে জড়িয়ে ধরতো এমন তো না ''

 

           সত্যিই তো , তুমি থাকলেই যে সবকিছু দেখে ভালবেসে জড়িয়ে ধরতে তা কিন্তু না । আমি তো চেয়েছিলাম তোমার চোখের মুগ্ধতা দেখবো । আবিরল রঙের ধারার মাঝে বসে তুমি কাঁদছ । মুক্তার মত তোমার চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে । আমি ব্যস্ত হয়ে তোমার চোখের জল মুছে দিচ্ছি । এসব স্বপ্নকথন । তুমি থাকছো না এটাই বাস্তবতা ।

 

 

 

                         অনেক্ষন বসে লিখতে লিখতে শিরদাঁড়া ব্যাথা করছে । বড্ড বিরক্ত লাগছে । ইদানিং অল্পতে বিরক্ত হয়ে পড়ি । সিগেরেট খাওয়ার পরিমান বেড়ে গেছে খুব ।  ইচ্ছে করছে  একটু হেঁটে আসি বাইরে থেকে । পুকুরে মাছগুলোকে খাবার দেয়া হয়নি । লন্ডনে বাড়ির উঠানে পুকুর থাকে কল্পনা করতে পার । কিছুদিন আগে লাগানো গোলাপের গাছটা কত বড় হয়ে গেছে । সেদিন একটা কবিতা লিখেছিলাম । '' খুব ইচ্ছে হয় ,  আরো একবার মানুষ হয়ে জন্মাবার '' এই শিরোনামে ।

 

    আজও কিছু মানুষ আমাকে ভালবাসে ।

 

    আজও কিছু মানুষ হঠাৎ ফোন করে জানতে চায়

 

    কেমন আছি ।

 

    তাদের বড়ো দয়া ; থাকে কাছাকাছি ।

 

    আজও কেউ পোড়া হাত দেখে আতংকগ্রস্থ হয় ,

 

    পরম মমতায় এন্টিসেপ্টিক ক্রিম লাগিয়ে দেয় ।

 

    আভিমানী ঠোঁট ফুলিয়ে বলে , '' যত্ন নিও '' ।

 

    কারো সবিনয় অনুরোধ ; " পত্র দিও " ।

 

    এ জীবনের সব যে ভাল তা কিন্তু নয় ।

 

    আমার দীনতা নিয়ে কারো উপহাস ;

 

    কারো কারো মনে তীব্র ঘৃণার চাষ ।

 

    ভাবি , হয়ত আমার দোষ ; আমিই এমন ।

 

    মেনে নিই , '' সব পেলে নষ্ট জীবন " ।

 

    কেউ চোখে চোখ রেখে বলে , " i trust you "

 

    যদি ভাঙ্গো , পরিনাম ভেবে নিও ।।

 

    এখনো কিছু মানুষ ভাই বলে ডাক দেয় ;

 

    আলিঙ্গনের উষ্ণতায় বেঁচে থাকার অযুহাত দেয় ।

 

    কারো রাগ , কারো অভিমান ;

 

    কারো ঘৃণা , কারো অপমান ।

 

    তোমার দাবি , তার প্রত্যাশা ।

 

    তার বন্ধুত্ব , তোমার ভালবাসা ;

 

    এত কিছু ,

 

    জীবনময় এত আয়োজন ।

 

    কেবল সময়টাই বড় কৃপণ ।

 

    আমি আর এমন কে ? চড়ুই পাখির জীবন আমার ;

 

    খুব ইচ্ছে হয় ,  আরো একবার মানুষ হয়ে জন্মাবার ।।

 

                          আসলেই জীবনময় এতো আয়োজন । শুধু তুমি নেই ।  সেদিন তুমি চলে যাবে জেনেও আমি আয়োজনের চুড়ান্ত করেছিলাম । সারটা দিন রাত আমি কপল মিলে প্লান করতাম কি কি করবো । আবশেষে তোমার জন্মদিন রাত ১২টা । thames এর উপর ছোট একটা ship , তার ছাদে আমি আর কপল । আতসবাজি নিয়ে ব্যস্ত কপল , আমি জন্মদিনের কেক নিয়ে । তুমি থাকলে যেমন হতো ঠিক তেমন করে । শত শত মোমের আলো , দূর থেকে মনে হবে আজস্র জোনাকি পোকা । সামনে তোমাকে লেখা চিঠির স্তুপ । একটা একটা করে পড়ছি আর পুড়িয়ে ফেলছি । তোমার কিছু জিনিস আমার কাছে ছিল । ওসব একটা একটা করে বের করছি আর নষ্ট করছি । কপল গান ধরলো , '' সেই নীল শাড়ি পড়ে তুই , ইচ্ছে করে একটু ছূঁই । আমার দেয়া দুলটা কই .........''

 

                           এত কিছুর পর কিভাবে তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়াই বলো । এই আমলকান্তি মুখ কেমন করে দেখাই । তাই সব কিছু ছেড়ে চলে এলাম । মোবাইল নাম্বার চেইঞ্জ করে ফেললাম । মাঝে মাঝে তোমার চেহারা এভাবেই উচ্চারিত হয় । মনে পড়ে সব কথা । বর্ষা তোমাকে না পেয়ে হেরে যাইনি আমি । তার ও অনেক আগে আমি হেরে গছি । আমি বুঝি আমাকে গ্রহন করতে না পারার কারন । তোমার সাথে আমার বিরাট একটা contrast ছিল । তোমার সাথে দেখা হওয়ার পরও এটা কমেনি , বেড়েই গেছে । এরপর ও তোমরা সবাই আমার প্রতি যে মমতা দেখিয়েছ , তার বিনিময়ে আমি কিছুই করতে পারি নি । আমাকে মাফ করে দিও বর্ষা । তৃষা আপুকে বলে দিও আমার প্রনামটুকু ওনার চরণে যেন রাখে । নাবিলাকে ও বলো , যদি কখনো মানুষ হয়ে ফিরি তোমাদের মাঝে আবার তবে সে যেন আমার বোন হয়ে জন্ম নেয় ।

 

                              যাই বর্ষা , আমার যাবার সময় হয়ে এসেছে । যেতে যেতে তোমার শুভ্র মুখখানি চোখের কোণায় জল করে নিয়ে গেলাম । মহাকালের যাত্রা পথে একটু শান্তিতো দেবে । মৃত্যুযাত্রা এত সুন্দর জানা ছিল না আমার । এখানে সব কিছু স্থির । মনে হচ্ছে যুগ যুগ ধরে আমি একটি মুহুর্ত যাপন করছি । সব সৌন্দর্য্যের মত এখানেও সামান্য বিষাদ লুকানো ...।।

 

 

 

 

Share