নগ্ন নির্জন হাত

লিখেছেন - ইয়াসির আরাফাত | লেখাটি 1030 বার দেখা হয়েছে

‘প্রাচীন’ শব্দটার ভেতর যেটুকু জীর্ণতা আর প্রৌঢ়ত্ব লুকানো থাকে তারচেয়ে পুরানো, জরাজীর্ন লোহার একটা বেঞ্চের উপর আমার রুগ্ন তুলনামূলক শ্রীহীন দেহটা অসহায়ের মতো পড়ে আছে , নগ্ন । ঠিক নগ্ন নয়, একটা নোংরা বাসি চাদরে আবৃত আমার ক্লান্ত অবসন্ন দেহটা । মাথার কাছেই কম পাওয়ারের একটা বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে । ক্রমাগত জ্বলতে জ্বলতে মনে হয় তারও আয়ু ফুরিয়ে আসছে । এক ধরনের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে একটু পর পর আমার সারা শরীর দুমরে মুচড়ে একাকার হয়ে অন্ননালী দিয়ে বের হয়ে আসতে চাচ্ছে । কি কারনে ঠিক বুঝতে পারছিনা, গভীর এক ঘুমের আস্বাদে আমি তলিয়ে যাচ্ছি অন্ধকারের গহীন এক গহবরে । আমার চোখের দু’টি পাতাই যেন একে অপরকে নিষ্কৃতিহীন ভাবে টেনে ধরেছে পরষ্পরের দিকে । যতবার চোখ বন্ধ করছি ততবারেই দেখতে পাচ্ছি একটা শিশু অপূর্নাঙ্গ দেহে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছে আমার দিকে । তার অবিকশিত আঙুলগুলো দিয়ে বারবার আমাকে ছুঁবার চেষ্টা করছে । যেহেতু তার চোখগুলো এখনো অপ্রস্ফুটিত আর মুখের অবয়ব ঠিকঠাক আসেনি, আমি তার দিকে তাকানোর ভয়ে, অনির্বচনীয় এক আতঙ্কে বার বার চোখ মেলে ফেলছিলাম । কিন্তু ঐ যে বললাম কোন এক পাশবিক শক্তি টেনে রেখেছে আমার চোখের পাতাগুলো , আমি কোন ভাবেই তার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছিলাম না । অতঃপর আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম চিরতরে ।

 

হঠাত আমি আমার সারা জীবনের কামনার আরাধ্য পুরুষটাকেই যেন দেখতে পেলাম । গভীর আস্বাদে আমার আত্মা কেঁপে উঠলো অদ্ভুত এক তরঙ্গে । নিগূড় অন্ধকারের ভেতরও আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম আকাশী রঙের শার্ট পরা সেই দ্বীপ্তিমান যুবকটাকে । তার হাসিমাখা মুখের আড়ালে আশ্চর্য্য এক পৌরুষত্ব আর ব্যক্তিত্বের গভীর ছাপ লুকানো । সেই হাসিমাখা মুখ, প্রতিভায় উদ্ভাসিত একজোড়া সত্যি চোখ, পৌরষদীপ্ত ব্যক্তিত্ব এখানো আমার ভেতর এক ধরনের সুক্ষ্ণ উষ্ণতা ছড়াতে শুরু করেছে । খুব ভালো প্রস্তুতি আর ভালো পরীক্ষার পর প্রথম স্থান না পাওয়ার ভেতর যে একধরনের হতাশা ও হাহাকার থাকে তাই যেন টের পাচ্ছি থেমে থেমে ।

 

 

 

 

আমার মা আমার নাম রেখেছিলেন বকুল । আমি আমার মায়ের সমস্ত সৌন্দর্য্য নিজের ভেতর ধারন করে বেড়ে উঠছিলাম ধীরে ধীরে কুমিল্লা শহরের নিতান্তই সাধারন একটা গ্রামে । যতটাই না সাধারন ছিলো আমাদের গ্রামটা তার চেয়ে সাধারন এবং নিরীহ ছিলেন আমার বাবা । অপরিচিত কেউ আমাদের বাসায় প্রথমবার আসলে, আমার বাবা যে একজন স্কুল শিক্ষক তা নির্দ্বিধায় বুঝে ফেলতেন । তার কারন আমাদের বহু দিনের প্রাচীন ঘর এবং তার করুণ আসবাবপত্র । এই বাড়ির সবকিছুই আমার বয়সের তুলনায় পুরানো , এর মধ্যে নতুন ছিল কেবল আমার নতুন মা । সৎ মা ; আর আমার বৈমাত্রেয় দুই ভাই ।

 

যারা আশির দশকের বাংলা ও হিন্দি চলচিত্র দেখেছেন তাদের ভিন্ন ভাবে বুঝানোর দরকার হবে না, সৎ মায়ের সাথে আমার সম্পর্ক কেমন ছিলো । আমার নতুন মায়ের চোখে আমি কি ছিলাম তা বুঝাতে ‘দুই চোখের বিষ’ কথাটি নিতান্তই বিশেষত্বহীন একটা প্রবাদ । আর এ ক্ষেত্রে আমার নিরীহ বাবা নেহাত একজন দর্শক ছাড়া আর কিছু নন । আমার সৎ মায়ের প্রতাপ, একছত্র আধিপত্য আর নির্দয়তা এই পরিবারে আমাকে এবং বাবাকে এতোটাই আবিল করে তুলেছিলো যেন আমরা অতিসাধরন নিরীহ কীটসদৃশ একেকজন প্রজা । একটা উদাহরণ দিলেই তোমরা বুঝে ফেলবে আমি যে নির্দয়তার কথা বলেছি তার স্বরূপ । সব মেয়েরাই একটা বয়সে গিয়ে অনির্বচনীয় একটা আতঙ্ক আর প্রতিকারহীন কষ্টের ভেতর দিয়ে হঠাত নিজেকে ভিন্ন ভাবে অবিষ্কার করে । সেসময় একজন মেয়ে এরকম ঘটনার সাথে সম্পূর্ণভাবে অপরিচিত থাকে বলেই হয়ত ঘটনার আকষ্মিকতায় এবং আতঙ্কে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে ; যা পরবর্তিতে নিয়ম করে জানিয়ে দেয় মেয়ে হয়ে জন্মানোর যন্ত্রণা ।

 

 

একদিন দুপুরে এরকম কষ্টের প্রচন্ডতায় আমি ক্লান্ত, বিপর্যস্ত হয়ে দুর্বল শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়ে ছিলাম । সেদিন দুপুরে আমাদের বাড়িতে আমার সৎ মায়ের পক্ষের কয়েকজন আত্মীয়ের দাওয়াত ছিলো । শারীরিক যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট ও অসহ্য হয়ে আমি কখন যে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম খেয়ালই ছিলো না । ওদিকে রান্নাঘরে আমি যে চুলায় মুরগীর সালুন রেখে এসেছিলাম তা বেমালুম ভুলে গেলাম । সালুন শুকিয়ে পুড়ে ছাই-ভষ্ম হয়ে গেছে, তা না হয় গেলো । কিন্তু এদিকে আমার জীবনে নেমে এলো নারকীয় পৈশাচিক নির্যাতন । রাগে-ক্ষোভে হিংসায় আমার সৎ মা তখন পাগলপ্রায় । বাড়িভর্তি মেহমানের সামনে হাতের কাছে যা পেলো তাই দিয়ে মারতে লাগলো আমাকে । নির্দয় মারের প্রচন্ডতায় আমি যখন মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছি হঠাত সে সজোরে একটা লাথি মেরে বসলো আমার পেটে । ঝাপসা চোখের অস্পষ্ট দৃষ্টিতে আমি শেষবারের মতো তার নেকড়ের মতো হিংস্র চোখ দুটো দেখতে পেলাম । ঘটনার আকষ্মিকতায় তাকে জানানোই হলো না আমি তখন প্রতিমাসের নিয়মিত যন্ত্রণা আর বর্ণনাতীত সেই কষ্টের দিনগুলো অতিবাহিত করছিলাম । এতো কিছুর পরও একমাত্র আমার বাবার মমতা আমাকে এই পরিবারে আটকে রেখেছিলো । শত প্রতিরোধহীন অত্যাচারের ভেতরও আমি আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজে পেয়েছিলাম কিছু ছাপানো অক্ষর আর স্বপ্নীল গল্প-উপন্যাসের মাঝে । বিভিন্ন লেখকের এই সব চরিত্র বড়ো জীবন্ত আর বাস্তব হয়ে ভেসে উঠত আমার চোখে । দিবাস্বপ্নের মতো অবাস্তব একটা জগত তৈরি করে আমি হয়ত আমার এই প্রাপ্তিহীন জীবনের কিছুটা ক্ষতিপূরন আদায় করতে চাইতাম ।

 

 

 

আমার বয়স তখন ২১ ছুঁই ছুঁই করছে । যৌবনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কখনো কখনো আয়নার সামনে যখন নিজের প্রতিবিম্ব দেখতাম তখন সাপের মত একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসতো চুপি চুপি । আগেই বলেছি , আমার ইন্দ্রানীর মতো রূপবতী মায়ের সবটুকু সৌন্দর্য্য আমার শরীরে আলোর মতো ছড়িয়ে ধীরে ধীরে নারী হয়ে উঠছিলাম আমি । অন্য যেকোন মেয়েদের চেয়ে তুলনামূলক বাড়ন্ত আমার শরীর । আমার এমন সুস্মিত দেহসৌষ্টব যে কোন যুবকের কামনাকে যে মুহুর্তের মধ্যে বিষন্ন করে তুলতে পারে, তা আমি খুব ভালো করে জানতাম এবং বলা বাহুল্য এদের বেশ কয়েকজন আমার পেছনে পেছনে বাড়ির গেইট পর্যন্ত চলে আসতো । আমার সৎ মা এদের মধ্যে একজনকে প্রতিদিন গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমাকেই যত কুৎসিত আর অশ্রাব্য গালিগালাজ করতো । যেখানে তোমরা বেশ্যা মাগির মত গালিগুলোকে উৎকৃষ্ট মনে করতে পারো ।

 

এরপরেও প্রতিদিন আমি আমার নিজস্ব স্বপ্নগুলোর মাঝে আচ্ছন্ন হয়ে থাকতাম । আমার এই সকল স্বপ্নে, শরৎ বাবুর নরেণের মতো একজন হৃদয়বান যুবক হুড়হুড় করে ঢুকে বিস্রস্ত করে ফেলতো আমার জগত । আমরা অনেক গল্প করতাম , কথা বলতাম । আমরা কথা বলতাম সারা সন্ধ্যা , দীর্ঘ্য রাত, আমৃত্যু। আমরা মেঘ কুঁড়াতাম গোটা-কয়েক আষাঢ়-শ্রাবণে । আমরা হাঁটতাম দিগন্ত রেখার এপার আর ওপারে, আমরা ঘুমাতাম উত্তাল সাগরের উঁচু উঁচু ঢেউয়ের চূঁড়ায় । আমরা চুমু খেতাম আগুনের লেলীহান শিখায় দাঁড়িয়ে , আর আমরা গল্প করতাম স্বপ্ন আর শুধু স্বপ্নের জন্ম নিয়ে ।

 

আমার সৎ মায়ের সাথে সবচে কুৎসিত ঝগড়াটি বাঁধলো চৈত্রের ঝকঝকে একটি সুন্দর সকালে । আমাকে লেখা একটা উড়ো চিঠিকে কেন্দ্র করে সেদিন সে ফেটে পড়লো বীভৎস রূপে । বোধ জ্ঞানশূন্য পাগলের মতো ক্ষেপে ফুলে ফুলে উঠছিলো বারবার । আমি কলেজে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম । এই ধরনের প্রত্যহিক বিশ্রী গালিগালাজে অভ্যস্ত আমি । কিন্তু এসব অকথ্য কথার ফাঁকে সে এমন একটা কথা বলে ফেললো ঝগড়াটি আর কোনভাবেই এক পাক্ষিক থাকলো না । বহুদিন ধরে নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের ভেতর ধীরে ধীরে বেড়ে উঠা একধরনের ক্ষোভ,হিংস্রতা, প্রতিশোধের দাবানল যেমন একদিন অপ্রতিরোধ্য প্রতিকারহীন হয়ে উঠে, আমিও অনেকটা সেরকম ভাবে কথাটার জবাব দিতে হন্য হয়ে উঠলাম সেদিন । হাতের নাগালে কিছু না পেয়ে পায়ের জুতা খুলে ছুঁড়ে মারলাম তার মুখে । ঘটনার আকষ্মিকতায় সে এতোটাই আশ্চর্য্য আর হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলো যে, পাল্টা জবাব দেয়ার কথা ভুলেই গেলো । এই ফাঁকে কলেজের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাড়িতে ব্যবহৃত স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে কখন যে আমি রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম খেয়ালই করিনি ।

ঘামে ভেজা ক্লেদাক্ত শরীরে আর গালের দুই পাশে শুকিয়ে যাওয়া কান্নার জলের লবণাক্ততার ছাপ নিয়ে যখন আমি কলেজের মেইন গেইট পার করছিলাম তখন কলেজ শেষে আবার সেই নরকে ফিরে না যাওয়ার উপায়হীনতার কথা ভেবে নিজের অসহাত্বের প্রতি বার বার ঘৃণা হচ্ছিলো ।

 

 

২.

আমি এখন আমার গল্পের সবচে সুন্দর এবং প্রেমময় অংশে চলে এসেছি । আপনারা ইতিমধ্যে আমার জীবন সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা নিশ্চয় পেয়েছেন । গল্পের এই অংশে এমন একজন মানুষের আগমন ঘটবে যে আমার জীবনকে তার অলৌকিক যাদুর কাঠির ছোঁয়ায় তৃপ্তিতে স্বস্তিতে ভরিয়ে দিবে । তার স্নিগ্ধ হাতে মুছে দিবে জীবনের যত গ্লানি । অপ্রাপ্তি আর অবহেলা মনের গহীনে যে করুণ শূন্যতার জন্ম দিয়েছিলো এই মানুষটি তার সবটুকু ভরিয়ে দিবে অভাবনীয় ভালবাসায় । অন্য যেকোন সাধারণ প্রেম কাহিনীর মতো বিশেষত্বহীন ভাবে শুরু হয়েছিল আমার জীবনের এই বিশেষ অধ্যায়টিও । শুরুটা যেমনই হউক তবে এর ভ্রমণ ছিল উত্তেজনা ভয় আর বিষ্ময়াদিহেতু দেহের লোম খাড়া হওয়া ।

 

সকালে ঘটে যাওয়া কুৎসিত ঘটনাটি তখনো আমার মনের ভেতর আসন্ন বিপদের আশঙ্কা বিরতিহীনভাবে জাগিয়ে তুলছিলো । কলেজ শেষে যে যার পথে চলে গেছে । আমিও যেতাম । কিন্তু ঘরে ফেরার পর ঐ সুনির্দিষ্ট সংঘাতের কথা ভেবে বারবার নিথর হয়ে আসছিলো আমার শরীর । অনেকক্ষণ পর উপায়ান্তর না দেখে ধীরে ধীরে কলেজের নির্জন পথ ধরে হাঁটছিলাম বাসষ্টেন্ডের দিকে । পথে যেতে যেতে সারি সারি গাছগুলো এবং সেই গাছের ডালে ডালে অজস্র পাখিরাও যেন বলাবলি করছে আমার কষ্টের কথা । আমার জীবনটাই যেন এক দুঃসহ ভাগাড় ।

 

 

 

এমন সময় পেছন থেকে একটা গভীর স্বপ্নজাগানো কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম । তারও কয়েক মুহুর্ত পর শুনতে পেলাম সেই কন্ঠস্বর হতে উচ্চারিত আমার নাম । পেছনে তাকিয়ে যে ছেলেটাকে দেখলাম তার কথাই এতক্ষণ তোমাদেরকে বলেছি । প্রথমত, আমি প্রচন্ড মানষিক চাপের মধ্যে ছিলাম , দ্বিতীয়ত চৈত্রের দুপুরের গুমোট শ্বাসরোধকারী পরিবেশে বিভ্রম হওয়াটা অস্বাভাবিক নয় । তবুও তোমরা বিশ্বাস করো, ছেলেটাকে দেখে মনে হলো পরাবাস্তব জগত থেকে ভুল করে চলে আসা কোন পৌরাণিক দেবতা । ছেলেটা ডাকতে ডাকতে আমার অনেক কাছে চলে এসেছে । আরেকটু কাছে এলেই হয়ত আমার ভেতরে তিলে তিলে গড়ে উঠা সাম্রাজ্য, নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্যের অহংকার, সব ভেঙ্গে গুড়ো গুড়ো হয়ে মাটির সাথে মিশে যাবে । আমি স্পষ্ট টের পেলাম, ছেলেটা আমার সামনে এসে দাঁড়াতেই আমার নিজেকে মনে হলো বন্ধ বৈয়ামের ভেতর ছুটাছুটি করা একটা অসহায় প্রজাপতি ।

 

‘আপ্নিই তো বকুল ? সৈয়দ স্যার আপনাকে ডাকছেন’ ; বলেই ছেলেটা হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিলো স্যারের অবস্থান ।

 

মাথার কসম, ছেলেটার সামনে থেকে স্যারের কাছে যাওয়া, স্যারের সাথে কথোপকথন এসবের কিছুই আমার মনে নেই । আমি তখনো স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে পড়ে আছি ছেলেটার ভেতর । অসহায়ের মত আমার অস্থিত্ব ছুটে গেছে ছেলেটার চলার পথে পথে । প্রকৃতির কাছে এটুকু করুণাই হয়ত প্রাপ্য ছিলো আমার । ছেলেটার সাথে আবার দেখা না হলে গল্পটা যে এখানেই শেষ হয়ে যেতো । তাই হয়ত প্রকৃতি সেদিন চেয়েছিলো আমার সাদা-কালো জীবনে রঙিন আবহ এনে সুনিপুণভাবে বানাবে এক রোমাঞ্চকর সিনামা ।

 

ছেলেটা তখনো বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিলো । আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো । মনে হলো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অসংখ্যবার রিহার্সেলের পর অভ্যস্ত করে নেয়া হাসি । না হলে এমন সুন্দর করে গুছিয়ে কেউ হাসতে পারে !

প্রথম কথাটা তার মুখ থেকেই বের হলো ।

 

‘আপনি তো ইকোনোমিক্সে পড়েন ?’

‘হ্যাঁ’ আমার সংক্ষিপ্ত উত্তর ।

‘আমার নাম রূপম’

‘ও’

‘একটা কথা জানার প্রচণ্ড আগ্রহ থেকেই এতোক্ষণ আপনার জন্য দাঁড়িয়ে আছি । কিন্তু ভাবছি প্রশ্নটা আপনি কিভাবে নিবেন’ ।

 

শরীরের মধ্য দিয়ে এক ধরনের তরঙ্গ প্রবাহ টের পেলাম । নিজের ভেতরের অস্থিরতা লুকিয়ে যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় বললাম, ‘বলুন কি জানতে চান ?’

 

‘আজকে সকালে দেখলাম আপনি রিক্সা খুঁজছেন আর অঝোর ধারায় কাঁদছেন । চারদিকে যত মানুষ তার দ্বিগুন চোখ বিপুল বিষ্ময়ে তাকিয়ে দেখছে একটা রূপবতী মেয়ে বিরামহীন কান্নায় ভাসিয়ে দিচ্ছে পথ-ঘাট । আমি স্পষ্ট দেখলাম সেসব বিষ্মিত চোখে ফুটে উঠেছে একটা সহজ জিজ্ঞাসা , 'আহা! কি এমন অনর্থ হলো মেয়েটার সাথে ?' বস্তুত আমারও প্রশ্ন সেটাই , কি এমন কারন ঘটলো যে, আপনাকে এমন নির্বিকার ভাবে কাঁদতে হয়েছিলো ?’

 

যে অপরিচিত ভয় অনেকক্ষণ ধরে গোপনে আমাকে তাতিয়ে যাচ্ছিলো অকস্মাৎ সে প্রকাশিত হলো ভয়ঙ্কর রূপে । আমার শত প্রতিরোধ উপেক্ষা করে শরীরের ভেতরের সমস্ত ফেনিল সলিল ফুলে ফুলে গর্জে উঠলো । এই অকারন কান্না রূপমকে এতোটাই বিষ্মিত করলো যে সে হতভম্ব হয়ে পড়লো । অপ্রস্তুতের মতো দৌঁড়ে গিয়ে দোকান থেকে একটা ঠান্ডা পানির বোতল নিয়ে আসলো ।আমার হাতে ওটা দিতে দিতে বললো, ‘বাদ দিন, চলুন আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি’।

 

আমি জানি ভালোবাসার এমন অনেক স্বপ্নালু মুহুর্ত তোমাদের জীবনে আছে । তবে তোমারা অবশ্যই বুঝবে আমার কেমন লেগেছিলো, যখন প্রতিদিনের সেই অসীম, অফুরন্ত আর একঘেঁয়ে বাড়ির পথটা একগ্লাস ঠান্ডা পানির মত এক চুমুকেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো ! হাঁটার অসাবধানতায় মাঝে মাঝে আমার শরীরের যে যে অংশ ওর নিবিড় সান্নিধ্যে গেছে সেসব অংশ এখনো জীবন ফিরে পায়নি । এতো তাড়াতাড়ি হয়ত পেতও না , যদি না দরজা খুলতেই আমার বাবার চড়ের প্রচন্ডতা আমার সম্বিত ফিরিয়ে না দিতো ।

বাবাকে দোষ দিয়ে কি লাভ ! সুখ শান্তি এসব এখন এতোটায় অপ্রতুল যে, ঘরের চারদেয়ালে মাকড়শার ঝুলের মতো যেটুকু অবশিষ্ট আছে তা টিকিয়ে রাখতে আমার বাবা এটুকু করতেই পারেন ; কিছু না জেনেই । তারপরও ওটা আমার বাবা ছিলো বলেই যন্ত্রণা আর বুকের মাঝে পুষে রাখতে পারলাম না ; বলেই ফেললাম,

‘বাবা, বেশ্যা-মাগীর মতো গালি আমি প্রতিদিন শুনি । এসব নতুন নয় । কিন্তু আমার মাকে যদি কেউ চরিত্রহীন বলে গালি দেয় তখন আমার কি করা উচিৎ ?’

 

 

৩.

প্রায় প্রতিদিন রূপমের সাথে আমার দেখা হতে থাকলো । আমি বুঝতে পারছিলাম যে, সে ধিরে ধীরে আমার জীবনের সমান বড় হয়ে উঠছে । ভালবাসাহীন আমার জীবনের কঠোর একাকিত্ব তাকে বাস্তব থেকে উপরে তুলতে তুলতে একসময় দেবতার আসনে বসিয়ে দিচ্ছে । তার সান্নিধ্যে আমার ভেতর যে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য তৈরি হতো তা অবিকল দিনরাত্রির মতো প্রকাশ পেতে লাগলো আমার জীবনে । আমি সারারাত জেগে অপেক্ষা করতাম কখন ভোরের প্রথম আলোটা আমার একলা শূন্য বিছানায় এসে পড়বে, কখন আসবে কলেজে যাবার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ । কখন দেখতে পাবো বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো শত শত মানুষের ভিড়ের মধ্য হতে প্রকট হওয়া রূপমের উজ্জ্বল মুখ । আমি সব কিছুতেই একটু বেশিমাত্রায় চঞ্চল হয়ে উঠছিলাম তখন । সকাল হতে অসংখ্যবার ঘড়ি দেখতে দেখতে বিরক্ত হতাম সময়ের স্তবিরতা দেখে । সময় পেলেই আয়নায় নিজেকে দেখতাম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে । কিভাবে নিজেকে আরো আকর্ষনীয় করা যায় সেটা ভেবেই অস্থির হতাম । অনেকদিন পর নতুন দুইটা জামা বানাতে দিয়েছিলাম সেদিন , কিছু প্রসাধনী আর দুই-একটা অন্তর্বাস কিনে এনেছিলাম কলেজ থেকে ফেরার পথে । এভাবে আমার বিষনগরে ধীরে ধীরে প্রেমের মাতাল হাওয়া বইতে শুরু করেছিলো ।

প্রতিদিন রূপমের সাথে কলেজে যাওয়াটা প্রায় অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছিলো । এমন সময় একদিন বাসস্ট্যান্ডে তাকে না দেখে খুব অস্থির হয়ে পড়লাম । মানুষের ভীড়ে মাঝে আমার চোখদুটো যখন হন্য হয়ে খুঁজছিলো তাকে তখন তার এক বন্ধুকে দেখতে পেলাম আমাকে ইশারায় ডাকছে । রূপমের এরো বেশ কয়েকজন বন্ধুও অপেক্ষা করছিলো ওখানে । ঘটনাটা অনেকটা এমন , আমারা আজকে কলেজ ফাঁকি দিয়ে অন্য কোথাও বেড়াতে যাবো । রূপম সব ঠিক ঠাক করে রাখবে, ফোন দিলে আমরা রওনা দিবো । কেন জানি না সেদিন তাকে দেখার জন্য আমি অতিরিক্ত রকম অস্থিরতা অনুভব করছিলাম । বার বার তার বন্ধুদের ফোনের দিকে তাকিয়ে হতাশ হচ্ছিলাম । আমার মনে হচ্ছিলো ,

 

অপেক্ষমান বুকের ভিতর কাঁসরঘন্টা শাখেঁর উলু

একশ বনের বাতাস এসে একটা গাছে হুলুস্থুলু

আজ বুঝি তার ইচ্ছে আছে

ডাকবে আলিঙ্গনের কাছে

দীঘির পাড়ে হারিয়ে যেতে সাঁতার জলের মত্ত নাচে ।

এখনো কি ডাকার সাজে সাজেনি !

 

কতক্ষণ পর সঠিক বলতে পারবো না, টেক্সিতে চড়ে আমরা এসে নামলাম একটা পুরানো দুতলা বিল্ডিং এর সামনে । একটু পরে প্রায় ভাঙাচোরা একটা লোহার গেইট দিয়ে রূপমকে বেরিয়ে আসতে দেখলাম । তাকে দেখার জন্য আমার বুকের ভেতর জলের ফোটার মত যে তৃষ্ণা বাড়তে বাড়তে একসময় স্রোতস্বিনী হয়ে উঠেছিলো তা মুহুর্তেই যেন ঘামের মতো বের হয়ে আসতে লাগলো সারা শরীরময় । কে জানতো একটু পরেই তার ঘরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে জীবনের সবচে বড় বিষ্ময় । তার রুমের সামনে দাঁড়াতেই মনে পড়লো আজ আমার জন্মদিন ।

 

 

সেদিন যে আমার জন্মদিন ছিলো পালনের অনভ্যাসে তা মনেই ছিলো না । খোঁপায় বকুল ফুলের মালা গুঁজে দিয়ে সে যখন আমাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলো, আমার তখন মনে হলো আমার জন্ম হয়েছে শুধুমাত্র এই ছেলেটির জন্য । সে আমার জীবনের সকল দুঃখ যন্ত্রণার একমাত্র ক্ষতিপূরণ । রুমের এক কোনে চাঁদের মতো শুভ্র একটা কেক, ঘরভর্তি রঙিন বেলুন, স্যাঁতস্যাঁতে অমসৃণ দেয়ালে ফুটে আছে জীবন্ত কিছু অক্ষর,

‘শুভ জন্মদিন বকুল’ ।

 

সুখের দোলনায় দোল খেতে খেতে এভাবেই কেটে যাচ্ছিলো আমার কলেজের দিনগুলো । আমার জীবনের যত যন্ত্রণা, কষ্টের ক্ষত রূপমের আশ্চর্য্য মানবিক যাদুর স্নিগ্ধ ছোঁয়ায় মুছে যেতে লাগলো । বাবা-মা'র ঘরে, আমার নিঃশ্বাস কৈ মাছের কাঁটার মতো গলার কাছে আটকে থাকতো । সৎ মায়ের নৃশংসতা থেকে পালিয়ে বাঁচার জন্য আমি ঝড়ের মতো ছুটে যেতাম রূপমের কাছে । প্রথমে সপ্তাহে, তারপর প্রতিদিন, এভাবে বিরতিহীন প্রতিকারহীনভাবে আমি তার বাসায় ছুটে যেতাম । পৃথিবীর বুকে কেবল ঐ একটাই জায়গা যেখানে আমি সত্যিই বকুল ফুলের মতো সুসৌভিত সু্রভিত হয়ে প্রকাশ পেতাম ।

 

 

 

৪.

দিন তারিখ ঠিকঠাক মনে নেই । তবে সেই দিনটি আমার স্মৃতিতে আজো রৌদ্রোজ্জ্বল দিবালোকের মতো প্রকট হয়ে আছে । আমার মনে আছে আমি হালকা বেগুনী রঙের একটা জামা পরেছিলাম । সেদিন কি যেন একটা ইস্যু নিয়ে কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা হরতাল ডেকেছিলো । ছাত্র সংসদের ছেলে-মেয়েরা ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিতেই আমাদের সবাইকে যেন অপার কোন কিছু পাওয়ার আনন্দ ছুঁয়ে গেলো । সেদিনের ভ্যাপসা গরম, ঘামে ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে শরীর , একঘেয়েমি সব কিছু মিলিয়ে সবার মনের ভেতর যে বিরক্তি জন্মেছিলো, ক্লাস বর্জনের সংবাদটা মুহুর্তেই তা টর্নেডোর মত উড়িয়ে নিয়ে গেলো । আনন্দে আত্মহারা সবাই কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাবার প্ল্যান করতে বসে পড়লো । আর এই ফাঁকে আমি আর রূপম হাঁটতে হাঁটতে তার মেসে চলে এলাম ।

 

সেদিনের সব কিছুই ছিলো ভিন্নতর । সকালের অসহনীয় রোদ , প্রকৃতির ভেতর লুকানো চাপা গাম্ভীর্য, এবং একসময় তা আবার স্মরণকালের অবিশ্রান্ত বৃষ্টি-বাদলের দিনে রূপান্তরিত হওয়া, সব কিছুই ছিলো মনে রাখার মতো । আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিমীলিত চোখে তাকিয়ে দেখছিলাম প্রকৃতির এসব পরিবর্তন । এমন সময় আমার পিঠে একটা উষ্ণ স্থুল হাতের অস্থিত্ব অনুভব করলাম । মুহুর্তেই আমার সারা শরীরের ভেতর দিয়ে এক ধরনের ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো । অদ্ভুত এক শিহরণে আমার সারা শরীর কেঁপে উঠলো । শরীরে ঘামের বেগ টের পেলাম প্রচন্ডভাবে । রূপমের হাত যখন পিঠ ছাড়িয়ে আমার ঘাড় স্পর্শ করলো তখন মনে হলো আমার হাত,পা, হৃদপিন্ড, স্নায়ু, শিরা সবকিছু প্রতিরোধহীন ভাবে অবশ হয়ে আসছে । ঠিক তখন, সম্ভবত নারীত্বের চিরন্তন সংষ্কারবশে আমি তার সমস্ত স্পর্শ প্রতিহত করে শক্তিহীন দুর্বল পা ফেলে সরে এলাম ওখান থেকে।

কিন্তু এচেনা এই ঘোর থেকে চিরতরে বের হয়ে আসতে পারলাম না । হয়ত আজন্ম কামনার এই পুরুষটির মাঝে সম্পূর্ণ রূপে নিঃশেষিত হবার লোভ আমার দুই পা , বোধশক্তিকে বেড়ি পরিয়ে রেখেছিলো । এমন নিষ্কৃতিহীন পরিস্থিতিতে আমার ঘন ঘন নিঃশ্বাসে ঘরের বাতাস যখন ভারী হয়ে আসছিলো তখন আমার শরীরে তার পরবর্তী স্পর্শটি অনুভব করলাম । প্রতিরোধের সমস্ত দেয়াল ভেঙ্গেচুরে হঠাৎ বাঁধ ভাঙা পানির মতো হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লো আমার ভেতর ।

 

আমার শরীর যৌবনের অনবদ্য ভঙ্গিমায় একটা শাদা পদ্ম ফুলের মতো ছড়িয়ে আছে রূপমের বিছানার গাঢ় নীল চাদরের উপর । অতঃপর, দুজন নর-নারীর আবেগ ঘটিত এই সম্পর্ককে তোমরা প্রেম, ভালোবাসা, কামনা, অনুরাগ কিংবা নেহাত জৈবিক প্রণয় যা’ই নাম দাও না কেনো, এভাবেই প্রথম আমি আমার নারীত্বের স্বাধ পূর্ণরূপে আস্বাধন করি । সব মেয়েরাই সম্পর্কের এক পর্যায়ে তাদের কামনার পুরুষের কাছে হয়ত এমন অপার্থিব কিছু কমনা করে ।

 

আমার সমগ্র দেহ পল্লবে ভালবাসার স্পর্শ নিয়ে আমি আবার ফিরে আসলাম সেই দুঃসহ ভাগাড়ে ; যেখানে প্রায় বহুদিন ধরে প্রতিদিন আমার অজস্র স্বপ্নের গর্ভপাত হয়েছে । তার প্রায় মাসখানেক পরে একদিন বিকেলে আমার সবচে ছোট (সৎ) ভাই সৃজন পানিতে ডুবে মারা যায় । আমার নিজ মায়ের মৃত্যুর পর কারো মৃত্যু আমাকে এতোটা আঘাত দেয়নি । আমার এই ভাইটিই ছিলো পুরা পরিবারে আমার প্রিয়প্রাণ । সৃজনের মৃত্যুর পরপর আমার নানীও চলে যান তার মৃত মেয়ের কাছে । বিরতিহীনভাবে এই সব প্রিয় মানুষের মৃত্যু আমাকে রূপমের আরো কাছে ঠেলে দেয় । আমাদের মেলামেশা আরো বাঁধা বন্ধনহীন ব্যাপরোয়া হয়ে উঠে ।

বেশ কয়েকদিন ধরে আমি আমার মধ্যে বেশ কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ করছিলাম । মেয়েদের শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া প্রণালীর বাইরে ও এমন কিছু ঘটছিলো আমার জীবনে যা আমাকে ভীষণভাবে আতঙ্কিত করে তুলছিলো । শারীরিক দূর্বলতা, জৈবিক অসংগতিগুলো এতোটাই প্রবল হয়ে দেখা দিচ্ছিলো আমি বেশ কয়েকদিন কলেজেই যেতে পারিনি । তারপর, একদিন জ্যোৎস্নাভাঙ্গা রাতে আমি আরো একটি অপরিচিত ঘটনার মুখোমুখি হলাম । আমি টের পেলাম, রক্তের কাঁপুনি আর প্রতিটি নারীর মাঝে লুকায়িত মাতৃত্বের চিরায়ত বোধ আমার ভেতরে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠা একটি ভ্রুণের অস্তিত্বের কথা জানান দিচ্ছে ।

তার পরদিনেই অনেক দূরের একটি স্বাস্থ্য সেবা ক্লিনিকে গিয়ে নিশ্চিত হলাম, আমি অন্তঃস্বত্বা ।

 

 

ক্লিনিক থেকে বের হয়ে ঝড়ের মুখে পড়লাম । প্রকৃতি তার রাগী ক্রোধান্বিত চেহারায় প্রলয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে । চারদিক লণ্ডভণ্ড না করে বোধয় সে আজ ক্ষান্ত হবে না । ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে । আমার ব্যাগে ছাতা আছে । কিন্তু সেটার কথা আমার মনেই থাকলো না । ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আনমনে দূর্বল পা ফেলে গ্রামীন ভাঙাচুরা সড়ক ধরে আমি হাঁটছি । এমন একটা খবর জানার পর আমার কি করা উচিৎ ঠিক বুঝতে পারছি না । ডাক্তারের মুখে খবরটা শুনার পর এমন একটা প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো, যেন কিছুই হয়নি । অবহেলা, ভালোবাসা ! রাগ-অনুরাগ আমার অনুভূতিকে এতো জ্বালিয়েছে যে, সেখানে ছাই ভষ্ম ছাড়া আর কিছুই বাকি নেই ।

 

কলেজের সামনেই রূপমকে দেখতে পেলাম । সেই ভুবনমোহিনী হাসি, লম্বা-চওড়া শরীর ; যেন ক্ষণজন্মা কোন পুরুষের অবয়ব । আমাদের অনাগত সন্তানটা কি রূপমের মতোই হবে ? হলে কেমন হবে ! সহস্র মানুষের আকুতি হবে সে । শত শত মেয়েদের হাহাকার হয়ে ঘুরে বেড়াবে অহংকারী পা ফেলে পৃথিবীর পথে পথে । ভাবতেই আনন্দে আমার মন ভরে উঠে ।

 

‘রূপম চলো, কোথাও গিয়ে বসি । জরুরী কিছু কথা আছে’ ।

‘কোন সমস্যা ? চলো আমার বাসায় যাই’ ।

‘না । বাসায় যাবো না । চলো নদীর পাড়ে গিয়ে বসি’ ।

 

রূপম আর কথা বাড়ায়নি । একটা রক্সা নিয়ে আমরা সোজা চলে গেলাম নদীর পাড়ে । পথে কেউ কারো মৌনতা ভাঙানোর চেষ্টাও করিনি । প্রথম কথাটি রিক্সা থেকে নামার পরই বললাম আমি । একটু বেশি সরাসরিই বললাম ।

‘রূপম আমি প্রেগন্যান্ট’ ।

 

এতোক্ষণ ধরে মনের ভেতর যে ঝড় তুফান বিরামহীনভাবে তাণ্ডবলীলা চালিয়ে যাচ্ছিলো, কথাটা বলে ফেলার পর মনে হলো মুহুর্তেই সেটা থেমে গেছে । আমার মনে হলো, আমি পৃথিবীর সবচে নিরাপদ মানুষটির পাশে দাঁড়িয়ে আছি । তার শীতল চোখের দৃষ্টি আমাকে বারবার সান্তনা দিয়ে বলছে, সব ঠিক হয়ে যাবে । সব ঠিক হয়ে যাবে । আমি সব ঠিক হয়ে যাবার মন্ত্রটি শুনার জন্য অপলক তাকিয়ে ছিলাম তার মুখের দিকে ।

সেদিন সারা দুপুর- দীর্ঘ্য বিকেল কান ভার করে রেখেছিলো রূপমের একটি মাত্র কথা ‘আমাকে একটু ভাবার সময় দাও’ ।

 

এই প্রথমবার আমি তার কন্ঠে আশ্বাস খুঁজে পাইনি । আমি প্রথমবার আমি তার চোখে ভরশা দেখতে পাইনি । এই প্রথম বার আমি তার ভেতর অন্য কারো ছায়া দেখতে পেলাম । তারপরও কুল-কিনারহীন সমুদ্রের মাঝে দিকভ্রান্ত নাবিকও ভেতরে ভেতরে যেটুকু আশার প্রদীপ জ্বেলে রাখে আমিও তাই রাখলাম । সারা দিন-রাত একটা কথাই মাথার ভেতর বাজতে থাকে ‘সব ঠিক হয়ে যাবে, সব ঠিক হয়ে যাবে ’ ।

 

 

৫.

পরদিন কলেজে রূপমের সাথে দেখা হলো । খুব বেশি একটা কথা বার্তা হয়নি । তাকে খুব বিমর্ষ আর চিন্তিত দেখাচ্ছিলো । রাতে হয়ত ভালো ঘুম হয়নি ; চোখের নীচে কালি পড়ে গেছে । এর পরের দুই দিন কলেজেই আসেনি সে । তার এক বন্ধু খোঁজ দিলো রূপম খুব অসুস্থ । আমি তাকে দেখতে গেলাম তার বাসায় । এই কয়দিনে রোগা হয়ে গেছে অনেক । এলোমেলো কামরা, সিগেরেটের কটু গন্ধে রুমের বাতাস ভারী হয়ে আছে । আমার পায়ের শব্দ শুনে বিছানায় উঠে বসলো রূপম । লাল টকটকে চোখ , উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি । কোন কথা না বলেই বাথরুমে ঢুকে গেলো সে।

 

একটু ভালোবাসা আমাদের চিন্তা-চেতনা, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে কি অদ্ভুত ভাবেই না বদলে দেয় । ভালোবাসার শ্যামল ছায়ায় দাঁড়িয়ে আমরা কি অবলীলায় আমাদের অতি সাধারণ আটপৌরে জীবনটাকে আমরা অসাধারণত্বের খোলসে ঢেকে ফেলি ! না হয়, কিছুদিন আগেও যে ঘর আমার কাছে স্বর্গ তুল্য ছিলো কেনই বা সেটা আজ নিতান্তই একটা ঘর বলে মনে হবে !

ভালোবাসার সাথে বাস্তবতার বিরোধটা কি এতোটাই চিরন্তন !

এভাবে ভাবনাগুলো যখন আস্তে আস্তে জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছিলো ঠিক সে মুহুর্তে রূপমের ডাক শুনতে পেলাম ।

 

‘বকুল, বিষয়টা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি । কিন্তু উপযুক্ত কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিনা । এতো অল্প বয়সে এমন অগোছালো জীবন নিয়ে বিয়ের ঝুঁকি কি নেয়া যায় ? বিয়ের একটা চান্স তারপর ও নিতাম কিন্তু আমার বড় দুই ভায়েরই এখনো বিয়ে হয়নি । তাছাড়া আমি এখনো রেডি না’ ।

 

আমি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম রূপমের দিকে । একটা কথাও বলিনি । সে আবার বলতে আরম্ভ করলো ...

 

‘ এখন আবেগী হলে কিভাবে চলবে বলো ? সামনে আমাদের সমস্তই পড়ে আছে । তাড়াহুড়ায় এখন একটা ভুল সিদ্ধান্তে সব কিছু ভুল পথেই যাবে । আমি বলি কি ... ( অনেকক্ষণ আমতা আমতা করার পর ) এ্যাবরশনের একটা পথ অবশ্য আছে । ইন্‌ফ্যাক্ট এটাই আমার কাছে সবচে উপযুক্ত বলেই মনে হচ্ছে’ ।

 

‘এ্যাবরশন’ শব্দটা শুনার পর ভেতরটা রি রি করে উঠলো আমার । অজানা এক ধরনের আতঙ্ক খামছি দিয়ে রক্তাক্ত করে দিচ্ছিলো হৃদয় । এমন পরিস্থিতিতে কিই বা বলতে পারতাম আমি !

 

‘না পেতে, না পেতে মরে গেছে হৃদয় ।

চাওয়ার অনভ্যাসেই কি

 কারো কাছে কিছু চাইতে আজ এতো ভয় !!’

 

যে ক্লিনিকটাতে রূপম আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো এ্যাবরশন করাতে সেটা মূলত কোন ক্লিনিক নয়, অনেক চোরা গলি পার হয়ে নোংরা ঘর বাড়ির আর ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে একটা স্যাঁতস্যাঁতে ঘরের কামরায় এক বৃদ্ধা এই সব কাজ করেন । রূপম অনেক খবরা খবর নিয়েই এখানে আমাকে নিয়ে এসেছে । কিন্তু সবচে বেশি তাকেই হতাশ মনে হচ্ছে । ‘প্রাচীন’ শব্দটার ভেতর যেটুকু জীর্ণতা আর প্রৌঢ়ত্ব লুকানো থাকে তারচেয়ে পুরানো, জরাজীর্ন লোহার একটা বেঞ্চের উপর আমার রুগ্ন তুলনামূলক শ্রীহীন দেহটা অসহায়ের মতো পড়ে আছে , নগ্ন । ঠিক নগ্ন নয়, একটা নোংরা বাসি চাদরে আবৃত আমার ক্লান্ত অবসন্ন দেহটা । মাথার কাছেই কম পাওয়ারের একটা বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে । ক্রমাগত জ্বলতে জ্বলতে মনে হয় তারও আয়ু ফুরিয়ে এসেছে । আমি শক্ত করে ধরে আছি রূপমের হাত । কোন কারনেই আমি তাকে কোথাও যেতে দিবো না এখান থেকে । বেশ গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে বৃদ্ধা এবং তার সাথে মধ্য বয়সী এক মহিলা । রূপম চলে যাচ্ছে ; আমাকে একা ফেলে রেখে সে দরজার দিকে হেঁটে যাচ্ছে । আমি তার পিঠের দিকে তাকিয়ে আছি দরজার আড়ালে চলে যাবার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত । গভীর এক অতঙ্ক গ্রাস করে নিয়েছে আমার চেতনা । শরীরের সব রক্ত ভয়ে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে । ওরা দুজন আমাকে নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো ।

 

 

তার একটু পরেই আমি রূপমের কিংকর্তব্যবিমূঢ় চেহারা দেখতে পেলাম আবার । ওরা তিনজন মিলে কি যেন বলাবলি করছে । হন্তদন্ত হয়ে রূপম ঘর থেকে বের হয়ে গেলো । যাবার ঠিক আগ মুহুর্তে সে আমার দিকে শেষবারের মতো তাকালো । ক্ষমার অনুনয়ে বিচলিত তার চোখদুটো দেখতে পেলাম । শরীরের কোথায় কি ঘটেছিলো ঠিক করে বলতে পারবো না । তবে এটুকু বুঝতে পারছিলাম প্রবল রক্তের ক্ষরণে শরীরের শেষ রক্ত বিন্দুটিও যেন আর অবশিষ্ট নেই । গভীর এক ঘুমের আস্বাদে আমি আর জেগে থাকতে পারছিনা মুটেই । আমার চোখের দু’টি পাতাই যেন একে অপরকে নিষ্কৃতিহীন ভাবে টেনে ধরেছে পরষ্পরের দিকে । যতবার চোখ বন্ধ করছি ততবারেই দেখতে পাচ্ছি একটা শিশু অপূর্নাঙ্গ দেহে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছে আমার দিকে । তার অবিকশিত আঙুলগুলো দিয়ে বারবার আমাকে ছুঁবার চেষ্টা করছে । যেহেতু তার চোখগুলো এখনো অপ্রস্ফুটিত আর মুখের অবয়ব ঠিকঠাক আসেনি, আমি তার দিকে তাকানোর ভয়ে, অনির্বচনীয় এক আতঙ্কে বার বার চোখ মেলে ফেলছিলাম । কিন্তু ঐ যে বললাম কোন এক পাশবিক শক্তি টেনে রেখেছে আমার চোখের পাতাগুলো , আমি কোন ভাবেই তার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছিলাম না । অতঃপর আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম চিরতরে ।

 

অরব অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠব না আর;

তাকিয়ে দেখব না নির্জন বিমিশ্র চাঁদ বৈতরণীর থেকে

অর্ধেক ছায়া গুটিয়ে নিয়েছে

কীর্তিনাশার দিকে।

ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়ে থাকব-ধীরে-পউষের রাতে।

কোনদিন জাগব না জেনে-

 

কোনোদিন জাগব না আমি-কোনোদিন আর...

 

 

Share