দীর্ঘ এক বিকেলের গল্প

লিখেছেন - ইয়াসির আরাফাত | লেখাটি 1094 বার দেখা হয়েছে

“কি করলেন সারাদিন ?”

“তেমন কিছু না । কেটে গেলো ব্যস্ততায় ।”

“আপনি কাজের মানুষ ।”

“কাজের লোক বললেই যথার্থ হতো । আড়ালে আবডালে লোকে তাই বলে ।”

“কেন বলে ? এতো ভালো চাকরি করেন । মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী, ভালো বেতন । শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস বাসে চড়ে অফিসে যান । আর কি চায় ? আমরা না হয় গরীব স্কুল শিক্ষিকা । আট মাইল দূরে স্কুল । প্রতিদিন লোকাল বাসে চড়ে নাগর দোলায় দোল খেতে খেতে বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে যাই । ‘ম্যাডাম জুতার ফিতা খুলে গেছে’ , ‘বেঁধে দিচ্ছি’ ; ‘ম্যাডাম ও আমার টিফিন খেয়ে ফেলেছে’ , ‘টিফিন এনে দিচ্ছি’ ; কাজের মেয়ে তো আমরাই । বাবুদের বাড়ির ছেলে-পুলে মানুষ করছি ।” বেনুর ঠোঁটে বাঁকা হাসি ।

“বড় অফিসের বড় কর্তাদের ফুট ফরমায়েস তো খাটতে হয় না !”

 

ঠোঁটে আগের সেই হাসি ধরে রাখে বেনু । আর কথা বাড়ায় না ।

 

“চলেন নদীর এই পাড়টায় গিয়ে বসি ।” প্রসঙ্গ পাল্টায় সে ।

“এই নদীর নাম কি জানেন আপনি ?” নদীর ধারে একটা বড় সড় অশ্বত্থ গাছের নীচে সাফ জায়গা দেখে বসতে বসতে প্রশ্ন করে দীপু ।

“না । কি নাম ?”

“বাঁকখালী ।”  

“বেশ সুন্দর নদী । দুই ধারে উঁচু বাঁধানো পাড় , সারি সারি নৌকা , সবচে বড় সৌন্দর্য্য নদীতে এখনো ভর্তি পানি । আজকাল যে হারে নদী শুকিয়ে যাচ্ছে , আমাদের অনাগত শিশুরা এমন একটা নদীর কথা গল্প কবিতায় পড়বে কেবল ।” শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে বলে যায় বেনু ।

“এই নদীটায় আমার অনেক স্মৃতি আছে । এখনো মনে পড়লে কেমন কেমন লাগে ।” নিমিলিত চোখে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে দীপু ।

“কেমন কেমন লাগে ?”

“হুম, ...কেমন কেমন লাগে ।” ভাঁটার টানে ভেসে যাওয়া একটা প্লাস্টিকের বলের দিকে তাকিয়ে অন্যমনষ্ক ভাবে জবাব দেয় সে ।

“সেটাই জানতে চাইলাম , কেমন কেমন লাগে ?” দুষ্টুমীর হাসি হাসে বেনু ।

 

দীপুর সেদিকে কোন খেয়াল নেই , ভাঁটার টানে সেও হয়ত ভেসে যায় পেছনে । অনেক পেছনে ।

 

“শৈশবে এই নদীটাকে আমি বড়ো বেশি ভালবাসতাম । জানেন, মনে হতো এই নদীটাই আমার মা । যখন কোন কারনে মন অশান্ত হয়ে উঠতো , বিষময় হয়ে উঠতো পৃথিবী , আমি উল্কার বেগে ছুটে আসতাম এই নদীর কাছে । যেমন, বিপদের পূর্বাভাস জেনে আতঙ্কিত শাবক ছুটে যায় তার মায়ের বুকে । এই নদী আমাকে তাঁর বুক পেতে ডাকতো । আর আমিও সদ্য দাঁত উঠা শিশুর মত হাসতে হাসতে ঝাঁপিয়ে পড়তাম নদীর বুকে । আমি ভুলেই যেতাম আমি কখনো ডাঙ্গায় জন্মেছিলাম । বললে আপনি বিশ্বাস করতে চাইবেন না , আমি ‘মা’ বলে ডাক দিলে এই নদী আমার ডাকের জবাব দিতো । এভাবেই এই নদীর সাথে , নদীর মাঝে আমার শৈশব কেটে গেছে । এরপর একদিন ... ”

 

“কি হলো, থামলেন কেনো ?”

“থাক ওসব কথা । আপনার কথা বলুন । শুনেছি, আপনি খুব ভালো কবিতা লিখতেন।” মুহুর্তেই কথার অন্য পীঠে লাফ দেয় দীপু ।

“লিখতাম । সে অনেক দিন হয়ে গেছে কাগজের সাথে কলমের দেখা হয় না ।”

“সেকি ! প্রতিদিন তো কাগজ কলম দিয়েই লিখেন । নাকি , এখন শুধু হুয়াইট বোর্ডের সাথে মার্কারের প্রণয় ঘটান ?

“সে কথা বলিনি । বলেছি কবিতা লেখার জন্য বসা হয় না । আর প্রণয়ের কথা বলছেন ? দেখা হলে, কাছাকাছি আসলে প্রণয় হয়ত ঘটতেই পারে । কিন্তু কবিতা সে অন্যকিছু । বড় ভয়ঙ্কর তার প্রশব বেদনা । তার জন্য চেতনার দরকার হয়, আলাদা ভাবনার দরকার হয় । আরো গভীরতার দরকার হয় ।”

“হুউম, একসময় আমিও খুব কবিতা পড়তাম । সুনীল, গুন , হুমায়ূন আজাদ, সবার ।”

“সুনীলের ‘কবিতা’ টা মনে আছে ?”

“ও হ্যাঁ, কবিতাটার শিরোনাম’ই ‘কবিতা’ ...

 

‘আমি তোমাকে এত বেশি স্বপ্নে দেখেছি যে তুমি

তোমার বাস্তবতা হারিয়ে ফেলেছো

এখনো কি সময় আছে তোমার জীবন্ত শরীর স্পর্শ করার

এবং যে ওষ্ঠ থেকে আমার অতি প্রিয় স্বর জন্ম নেয়

সেখানে চুম্বন দেবার ?’ …”

 

দীপু এই পর্যন্ত বলে থামে । এরপর থেকে বেনু শুরু করে ...

 

“আমি তোমাকে এত বেশি স্বপ্ন দেখেছি যে হয়তো

আমার পক্ষে আর জাগাই সম্ভব হবে না

আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোই, আমার শরীর সব

রকম জীবন ও ভালোবাসার জন্য উন্মুক্ত……

আমি তোমার ভুরু ছুঁতে পারি,ওষ্ঠ ছুঁতে পারি এত কম……

আমি তোমাকে এত বেশি স্বপ্ন দেখেছি, হেঁটেছি,

কথা বলেছি।

শুয়েছি তোমার ছায়ার সঙ্গে……”

 

দুজনেই হেসে উঠে একসাথে । ঝন ঝন করে যেন ভেঙ্গে যায় অলস বিকেলের নীরবতা । অশ্বত্থের ডালে বসে যে কয়টা পাখি ঝিমুচ্ছিলো তারাও কিছুটা কি ভ্রু কুচকা্লো !

 

“শুনলাম ইংল্যান্ড যাবার চেষ্টা করছেন । সত্যি কি ?” চোখের দৃষ্টিতেও সমান জিজ্ঞাসা বেনুর ।

“হুম্‌ম”

“ কেন যাচ্ছেন এতোদূর ! এখানেই বা খারাপ কি ?”

 

“খারাপের প্রসঙ্গ নয় । আমার যে কোন পিছুটান নেই ! প্রতিদিন একরাশ ক্লান্তি নিয়ে আমি ঘরে ফিরে যাই । রোজ রোজ বাইরে থেকেই খুলতে হয় একাকিত্বের দরজা । আর ভেতরে আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকে নিঃসঙ্গতার ভূত-প্রেত । ছোট বেলায় খুব একান্ততা চাইতাম । বাবা-মা’র শাসন থেকে মুক্তি চাইতাম । তাই বুঝি সবাই আমাকে মুক্তি দিলো সব রকমের সান্নিধ্য থেকে । এটাকে কি ‘একাকিত্ব’ বলে নাকি ‘মুক্তি’ বলে আমি ঠিক জানি না । তবে যাই বলুক, এই পৃথিবীর সব জায়গা এখন আমার কাছে সমান মনে হয় । এখন, জগতের সব প্রাণ সমান আপন ।”

 

“তাই বলছি, এখন একটা বিয়ে করুন । নিঃস্বঙ্গতা ও কাটবে , আপনাকে রোজ রোজ বাইরে থেকে কষ্ট করে খুলতে হবে না একাকিত্বের দরজা ।”

 

হাসতে চেষ্টা করে দীপু । বড়ো মলীন দেখায় সে হাসি ।“তুমি করবে আমায় বিয়ে ?”  তার মনের ভেতর কে যেনো হঠাত্‌ কথাটা বলেই ফেললো ।

 

“কি ; করবেন বিয়ে ?” 

চমকে উঠে দীপু । লজ্জায় বিষ্ময়ে আড় চোখ তাকায় বেনুর দিকে । বুকের মাঝে বেজে উঠে শত শত কাঁসার ঘন্টা , শাখেঁর উলু । তবে কি বেনু শুনেই ফেললো কথাটা । আড়ষ্ট , অস্বচ্ছন্দ গলায় জানতে চাইলো , “ কাকে ?”

 

“ও মা ! আমি কি জানি ? পছন্দের কেউ থাকলে বলুন । আমরা না হয় খেটে খুটে সব আয়োজন করে দিলাম ।”

 

লজ্জা পায় দীপু । কিছুটা জড়তা ঝেড়ে ফেলে বলে , “ আমার কথা বাদ দিন । আপানার যে বিয়ের কথা বার্তা হচ্ছিলো , তার কি হলো ।”

“ঐ তো যা হয় । পাত্র পক্ষের পাত্রী অপছন্দ । আর তার কারন হিসেবে তারা বলেছে , তাদের শ্রী-মান পাত্রের জন্য আমি উপযুক্ত নই । এখন আপনি ই বলুন , আমি যে দেখতে কুৎসিত , সেটা তাদের আগে দেখা উচিৎ ছিলো না ? খামকা বিয়ের বাজারে আমার সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দিলো ।” বেনু হাসছে । কোন কৃত্রিমতা নেই সেই হাসিতে ।

 

“ বাজে কথা, আপনি মোটেই সে রকম নন । সুশ্রী, মার্জিত, আধুনিক একজন মেয়ে । আমার মনে হয় সমস্যা অন্যখানে । তারা ব্যাপারটি এড়িয়ে যাবার জন্যই এসব বানিয়ে বলছে ।”

“হুউম, সেটা আপনি বুঝছেন , আমি বুঝছি , কিন্তু আমার এতোগুলো চাচা-মামা কে কে বুঝিয়ে দিবে বলুন ! তাদের ধারনা, আমিই কিছু একটা করেছি ।” পুরানো হাসিটা বেনুর মুখে লেগে আছে এখনো ।

 

যে সব মাঝিরা সারা রাত মাছ ধরবে , নৌকায় তাদের প্রস্থানের শেষ প্রস্তুতি চলছে । দীপু সেদিক তাকিয়ে দেখছে সেসব ।

 

“আপনার নদীর গল্পটা কিন্তু এখনো শেষ করলেন না ।”

“ আজ নয় । অন্য কোনদিন ।”

“না না, অন্যদিন নয় । আজই বলুন না প্লিজ ।” বেনুর কন্ঠ অনুনয় ।

 

কিছুটা সময় নেয় দীপু ,

 

“ একদিন চৈত্রের দুপুরে আমরা সবাই খেলতে গেলাম ঐ যে দূরের বিলটা দেখছেন , ওখানে । কত কি যে খেললাম ! দাঁড়িয়াবান্ধা , গোল্লাছুট , ডাং-গুলী । রোদে পুড়ে আমার দেহে যে অবস্বাদ জন্মেছিলো তা কিছুতেই আমাকে খেলায় মন বসাতে দিচ্ছিলো না । বারবার টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো নদীর কাছে । সেটা বুঝতে পেরেছিলো শুধু বিপুল । বিপুল আমার ২ বছরের ছোট ছিল । একই মায়ের গর্ভে জন্ম নিয়েছিলো বলেই বোধয় সে আমার সবকিছু আগেই টের পেয়ে যেত । কোন রকম খেলা শেষ হতেই জলোচ্ছাসের মতো আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম নদীতে । নদীর এই মাথা ও’মাথা ছুটে বেড়াতে লাগলাম চৌকষ সাঁতারুর মতো । আমার আর অন্য কোন কিছুতেই খেয়াল ছিলো না । না জোয়ার , না ভাটায় । ঠান্ডা জলের ভেতর ও টের পাচ্ছিলাম নদীর বুকের আলিঙনের উষ্ণতা । যা কিছু মুহুর্ত হাতে ছিল সব উদার মনে খরচ করলাম সাঁতারে , জলের সাথে নিবিড় ভাবে মিশে যেতে যেতে । ভুলে গেলাম আমারা যে কয়জন ছিলাম স্রোতে , তার মধ্যে একজন ততক্ষণে হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে ধীরে ।

যখন টের পেলাম আমাদের মধ্যে বিপুল নেই , তখনো আমি কিছুতেই রনির কথা বিশ্বাস করছিলাম না । অনেকবার এরকম দঁড়িকে সাপ ভেবে ভয়ে মুর্ছা যাওয়া রনি বারবার বলছিলো বিপুল ডুবে গেছে পানিতে । আমার বিশ্বাস তখনো পুরাপুরি নষ্ট হয়ে যায়নি গণিকালয়ের বেশ্যার অবশিষ্ট সম্ভ্রমের মতো । যে নদী আমাকে মায়ের মত আগলে রেখেছে শত প্রতিকুলতায় , সে কেমন করে আমার ভাইকে টেনে নিবে রাক্ষসের মতো, গভীরে , অতলে ; যেখান থেকে সে আর সাঁতার কেটে ফিরে আসতে পারবে না । আমার মনে হলো সে বুঝি আগেই ফিরে গেছে ঘরে । দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আমি ছুটে গিয়েছি বাড়ির উঠানে ; চীৎকার করে ডাকতে লাগলাম , বিপুল বিপুল বলে । কিন্তু আমার সমস্ত চীৎকার ফিসফিস করে ফিরে আসতে লাগলো আমার নিজের কানে । তারপর আমার আর কিছু মনে নেই ।

জ্ঞান ফিরেই আমি দেখলাম বাড়িতে অনেক লোকজন জড়ো হয়েছে । নীচু গলায় একে অন্যের সাথে কথা বলছে দুর্বোধ্য কোন ভাষায় । আমি আস্তে করে মায়ের কোলের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম , ‘মা, বিপুল ফিরেছে?’ ! ”

 

 

 

 

এরমাঝে কখন যে বেনু শক্ত করে ধরে রেখেছে দীপুর হাত , সে নিজেই জানে না । কখন যে দীপুর এতো কথা বেনুর কানে না গিয়ে বুকের ভেতর আঘাতের পর আঘাত করেছে , আর সে আঘাতে ফিনকি দিয়ে বেনুর চোখ ফেটে জল গড়িয়েছে সে নিজেই জানে না ।

 

“বিপুল ফিরেছিলো ?” বেনু কি বুঝে কি জানতে চায় সে নিজেই জানে না । “হ্যাঁ ; তবে তার যে একা থাকার অভ্যেস নেই । তাই বোধয় মা’কে নিতে এসেছিলো আষাঢ় নীশিতের কোকিল হয়ে ।” দীপু এই পর্যন্ত বলে উঠে দাঁড়ায় ।

 

 

“চলুন ফেরা যাক । সন্ধ্যা হয়ে আসছে ।” দীপু উঠে দাঁড়ায় ফেরার পথে ।

“এখন কোথায় যাবেন ?” জিজ্ঞাসার চোখে বেনু তাকায় দীপুর দিকে ।

“পাখিরা প্রতি সন্ধ্যায় যেখানে ফিরে । যেখানে কখনো না ফেরার সহস হয়নি বলেই আমি এখনো বেঁচে থাকি জীবন্মৃত ; সেখানে । ঘরে ! চলুন না , একবার দেখে আসবেন আমার ঘর দুয়ার । বেশী দূরে নয় । ”

“যাক ! অবশেষে বললেন তাহলে । আমি ভাবছিলাম , এ কেমন মানুষ একবার ডাকছে ও না !”

 

“কি সাহসে ডাকি বলুন ? প্রাচীরে ঘেরা হলেই কোন জায়গা কি আর উঠান হয় ? তেমনি ইট কাঠ জোড়া তালি দিয়ে কাঠামো বানালেই কখনোই সেটা ঘর হয়ে উঠে না । সে অর্থে আমার তো কোন ঘর নেই । কোন ঊঠান নেই । আপনার দম বন্ধ হয়ে আসতে পারে । আর তারচেয়ে বড় কথা , একজন সুন্দরী নারীকে নির্জন জায়গায় আমন্ত্রন জানানোর আগে কত কিছু ভেবে নিতে হয় !”

 

“তো কি ভেবে নিলেন এখন ?” বেনু কথায় রঙ মাখে ইচ্ছেমতো ।

“আপনি পারেন ও বটে ! কথার কদর্থ করা !!”

“আচ্ছা সে না হয় মানলাম, কিন্তু আমাকে সুন্দরী আর নারী অর্থে আবিষ্কার করতে এতো সময় লাগলো আপনার !! আর সৌন্দর্য্যের প্রসঙ্গ থাক , শাড়ি পরেছি সেই অর্থেই কি আমি নারী ?”

“আপ্নাকে আবিষ্কার করেছি সে ক’বেই । তাই বলে এই ভুল ধারনাটা এত তাড়াতাড়ি জানাবার ইচ্ছে ছিলো না মনে । ” দীপুর চোখে দুষ্টুমীর হাসি ।

“কোনটা ভুল ধারণা , সুন্দরী, নাকি নারী ??” উত্তেজিত শোনায় বেনুর গলা ।

“দুটোই ।”

 

হাসি আর আটকাতে পারে না কোনমতেই । নির্জন রাস্তার সন্ধ্যা টুকরো টুকরো করে হেসে উঠে দীপু ।

 

“তবে আর যাচ্ছিনা আমি । আপনি একাই ফিরে যান আপনার ভূতুড়ে শ্মশানে ।”

বলেই জিব কামড়ে ধরে বেনু । মুহুর্তেই বাজ পাখির মতো ছোঁ মেরে আঁকড়ে ধরে দীপুর হাত । কন্ঠে রাজ্যের অনুতাপ-অনুশোচনা এনে বলে, “ ভুলে বলে ফেলেছি কিছু মনে করোনি তো তুমি ?”

 

 

 

 

কথার পীঠে কি কথা বলে ফেলেছে বেনু , সে সকল কথা দীপুর আর মনেই রইলো না । মন-মগজে, ধ্যানে আর অজস্র নিউরনে কেবলমাত্র একটি শব্দের অনুরন ; ‘তুমি’ ।

বিদ্যুতের প্রচন্ড প্রবাহে ছিটকে পড়ার মতো হঠাত দূরে সরে যায় দু’জন । রাস্তায় পড়ে যাওয়া শেষ সম্বল আদুলীটি খুঁজে দেখার মতোই সংলাপের কথা খুঁজতে থাকে দু'জন বাকি পথ । কুয়াশার চাদর চেপে সন্ধ্যা নেমে আসে হু হু করে ।

নদীর পাড় থেকে দীপুর ঘর তত বেশী দূরে নয়, তা’ও এটুকু পথ আসতেই ঝাঁক বেঁধে অন্ধকার নেমে আসে নগর জীবনে । ঘরের দরজা খুলে দীপু ।

 

অম্‌নি বেনুর বুকের হাড় পাঁজর মুছড়ে একাকার করে ধেয়ে আসে কষ্টের ঝাঁক ঝাঁক নীল পাখি । শীড়দাঁড় বেয়ে বয়ে যায় শীতল স্রোত । এ যেনো সত্যিকার শ্মশান । ঘরে এককোনে ধুলোর মতো জমে থাকা বহু প্রাচীন একাকিত্ব, বারান্দায় না-মানুষী জমিন । দরজার ঠিক ওপাশে অবহেলার ছায়ামুর্তি । বেনুর ভেতরটা ধুঁকরে কেঁদে উঠে গভীর রাতে ডেকে উঠা ককুরের মতো । নিজের অজান্তেই বলে ফেলে বেনু, “ একি মানুষের ঘর-দোর !!”

 

 

“আমি কিন্তু আগেই বলেছিলাম, অনর্থ করলেও এটাকে ঘর বলা যাবে না । তবে কেনো মিছে মিছে বকছেন ?”

“তাই বলে এমন !! একটা কাজের লোক তো রাখতে পারতেন অন্তত ।”

“চাইলে কতো কিছুই তো করতে পারতাম । সে কথা বলে আর কি হবে ! ইচ্ছেরা মরে গেছে বহু আগে । অন্তষ্টিক্রিয়া বিহীন সেগুলো পঁচে গলে গন্ধ ছড়িয়েছে এতোদিনে । ”

 

“ভীষন পাগল আছেন আপনি । মানুষ করতে হবে আপনাকে ।”

 

“আপনিই দায়িত্বটা নিন ‘না ! তাহলে মরা গাছে আবার হয়ত মুকুল আসবে । শ্মশানের সব ভূত-প্রেতগুলো ছুটে পালাবে দিক বি’দিক । ইট কাঠের দালান হয়ে উঠবে সতেজ ঘর । নিবেন ?” কোন এক মহাপ্রলয়ের আগে মানুষের ভেতর যেমন জন্ম নেয় অলৌকিক কোন সাহস, ঠিক তেমনি কোন সাহস তীব্র নিঃশ্বাসে বুকের গভীরে টনে নেয় দীপু ।

 

“আমি তো সুন্দরী নারী ও নই , না 'পাগল' মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছি । আপনি নিজেই খুঁজে নিন এমন কাউকে ।” মুখ বাঁকায় বেনু ।

 

 

“আমি বেশীক্ষণ বসবো না এই ভূতপুরীতে । গল্পটা শেষ করুন । আপনার সেই গল্পটা যে এখনো শেষ হলো না ।” মলিন, আধোয়া বিছানার এককোনে বেনু বসতে বসতে বলে ।

 

“একটু আগে তো তুমি করে বললেন, আবার কেনো বদলে দিলেন ডাক ?”

“সে সব মনের ভুলে বলেছি বৈকি ! মনে পুষে না রাখলে ও চলবে ।”

“তবে পুষে রাখার মতো কিছু দিচ্ছেন না যে ! বড্ড কৃপন আছেন আপনি ।”

“ এতোই যদি নিতে চান, তবে আমার অহংকার টূকুই নিন । বড়ো বেমানান লাগে আমার নিজের সাথে ।”

“ভেবে দিচ্ছেন তো !! পরে ফেরত চাইলে পাবেন না কিন্তু ।”

“ভারী নষ্ট লোকের পাল্লায় পড়লাম তো ! একা অবলা মেয়েকে ঘরে এনে রেখে দিতে চাইছেন । তারাতারি গল্পটা শেষ করুন , বাড়িতে সবাই চিন্তা করবে ।”

“তবে আর রক্ষা নেই আমার । কিন্তু আমার গল্প জেনে আপনার কি’ই বা লাভ ! শুধু শুধু কষ্ট বাড়াতে চাইছেন ।”

“ সে আমি বুঝবো ; আপনি বলুন ।”

 

 

স্মৃতির দাগ যুক্ত একখানা দেয়ালে ঠেশ দিয়ে দীপু তার বাকি গল্প টুকু শুরু করে ,

 

 

“ আগেই বলেছি, বিপুল চলে গেছে না’ফেরার দেশে । আমরা সবাই মেনে নিয়েছিলাম ব্যাপারটা । শুধু আমার মা মেনে নিতে পারেন নি । তিনি প্রায় বলতেন বিপুলের সাথে তার দেখা হওয়ার কথা । কখনো তাঁর শিয়রে দাঁড়ানো , কখনো উঠানের অমলকি গাছটার কাছে , আবার কখনো দক্ষিণের খোলা মাঠে বিপুলের সাথে মা’র অবচেতন মনের দেখা হতে লাগলো । এসব আমরা প্রতিদিন শুনতে লাগলাম ।

এর ক’দিন পর গভীর রাতে দক্ষিণের জানালা দিয়ে চলতে থাকে মা আর বিপুলের অশরীরী অন্ধকারের কথোপকথন । আমাদের মা, বড়ো দুঃখিনী মা দ্রুতই মানষিক ভারসাম্য হারাতে থাকলেন । বাবাকে দেখলে অচেনা কোন মানুষ বলে মনে হতো । চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, আমাকে দেখাশুনার কেউ থাকলো না ভেবে । সারাদিন-রাত মায়ের কথা শুনতেন ।

 

তখনো আষাঢ় মাস আসেনি, একদিন রাতে গভীর অন্ধোকারে মা ঘর ছেড়ে বের হয়ে গেলেন । আমি, বাবা, ছোট চাচা মিলে তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম চারদিক । শেষে মা’কে পেলাম আজকে আমারা দুজন যেখানটায় বসে ছিলাম সেখানে । মা বার বার করে বলতে থাকলো বিপুল তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলো সেখানে ।

সেদিনের পর থেকে মা’কে পশ্চিমের কামরায় তালা মেরে রাখা হলো । ”

 

 

 

এ পর্যন্ত বলে দম নেয় দীপু, একটা সিগারেট জ্বালায় আনমনে । আবার শুরু করে ...

 

 

“আষাঢ়ী পূর্নিমার রাত । বাবা বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন সেদিন , নাকি বহুদিনের নিদ্রাহীন চোখ সুযোগে আটকে গিয়েছিলো আঁঠার মতো ! ঠিক জানি না । মা আবার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন । এরপর থেকে মা’কে আর খুঁজে পাওয়া যায় নি । বাবা ও কদিন পর আমাদের ছেড়ে নিরুদ্দেশ হলেন । আমি তখন মাত্র ১৫ হয়েছি , সেটা তার খেয়ালই ছিলো না । সত্যি বলতে এখন বুঝি বাবার কষ্ট কি ছিলো । বেশ কিছু দিন পর মামারা মা’র লাশ পেয়েছিলো শুনেছি । আমাকে দেখায়নি ওরা । আমি হয়ত দেখতেও চাইতাম না । ওভাবে মা’কে দেখার ইচ্ছেই হতো না । আমার মা’ ছিল শুভ্র তুলার মতো , গায়ে লেগে থাকতো সারাক্ষণ । সবসময় পরিপাটী ভীষণ সুন্দরী রমনী । পঁচে যাওয়া দেহে , জীর্ণ শীর্ণ মা’ কে আমি কখনো দেখতেই চাইতাম না ।

 

এর পরে কেটে গেছে আরো বেশ কয়েকটা আষাঢ়ী পূর্নিমা । আমি উত্তরের পাহাড়টাতে গিয়ে বসে থাকতাম দিনের পর দিন । বিকেলের পর অজস্র বিকেল । পাহাড়টাকে মনে হতো আমার বাবা । দক্ষিনের যে বিশাল-অফুরন্ত আর সীমাহীন অশান্ত সমুদ্র, সে বোধয় আমি । ভীষন ব্যাপরোয়া আর উশৃঙ্খল । নিজেই নিজের নাম রাখলাম 'সমুদ্র' ।

 

আমার বাবা ছিলেন সত্যিকারের পাহাড়সম একজন মানুষ । কি উঁচু , কঠিন , স্থির , মহান একজন মানুষ । বাবার কাছে ধারে ঘেঁষতেই ভয় পেতাম । কিন্তু কে জানতো আমার বাবা বহু কাল ধরে প্রগাঢ় মমতায় তার ভেতর পুষেছিলো এক বিষ্ময়কর ঝর্ণা । তাই হয়ত , ঝার্নার জল বহু নদ-নদী ঘুরে সাগরে মিলিয়ে যাবার মতো তিনিও মিশে গেছেন আমার ভেতরে , ভীষণ গহীনে ।”

 

এ পর্যন্ত বলে একটু দম নেয় দীপু । আবার শুরু করে ...

'জানেন বেনু, আমি এখনো কেন এই দুঃসহ ভাগাড় আগলে রেখে বেঁচে আছি ? আমার মনে হয় কোন এক গভীর রাতে ফিরে আসবেন আমার বাবা । আমি আমার বাবার সেই শান্ত, সৌম্য চেহারাটি একবার দেখার জন্য এখনো প্রতিক্ষায় আছি । যে মানুষটি আকাশের মতো বিশাল একটা হৃদয় বুকে ধারন করে রেখেছে, সেই মানুষটির পা ছুঁয়ে আমি আকাশ ছুঁয়ার সাধ নিতে চাই' ।

 

বেনু আর দীপু বেরিয়ে আসে ঘর থেকে । অন্ধকার রাস্তা পারিয়ে বড় সড়কের কাছাকাছি চলে আসে ওরা দু'জন । অন্ধকার ভেঙ্গে ভেঙ্গে কেউ একজন হেঁটে আসছে রাস্তার অপর প্রান্ত হতে । আরো কাছাকাছি চলে এসেছে লোকটা । শরীরে রক্তের কাঁপুনি টের পায় দীপু ।

লোকটা যত কাছে আসতে থাকে দীপুর শরীরে রক্তের কাঁপুনি তত বাড়তে থাকে ।

Share