ভালবাসার অনেক রং

লিখেছেন - মোস্তাফিজুর রহমান শুভ | লেখাটি 973 বার দেখা হয়েছে

যখন খুব ছোট ছিলাম,তখন যদি প্লেনের শব্দ কানে আসতো তবে দৌড়ে বাইরে চলে আসতাম।হাঁ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম এই জিনিসটা আকাশে কিভাবে চলে?আকাশে তো কোন রাস্তা দেখিনা!কিছু বুঝতে পারি আর না পারি,রাতে ঘুমিয়ে ঠিকই স্বপ্ন দেখতাম আমি প্লেন চালাচ্ছি।মজার ব্যাপারটা হলো আমার স্বপ্নে দেখা প্লেনটার থাকতো একটা সাইকেলের হ্যান্ডেল আর সেই হ্যান্ডেলে থাকতো একটা বেল।আমি স্বপ্নে দেখতাম ঐ হ্যান্ডেল ধরে আমি প্লেন চালাচ্ছি আর মাঝে মাঝে বেল বাজাচ্ছি ! অদ্ভুত স্বপ্ন ! তখন থেকে পাইলট হওয়ার ইচ্ছা জাগতো।যদিও এই ইচ্ছাটা আমার মাঝে বেশীদিন স্থায়ী ছিলনা।

 

 

একটু বড় হয়ে যখন দেখতাম রাস্তার পাশের দোকানটাতে কোন বাবা-মা তাঁর সন্তানকে চিপস্ কিনে দিচ্ছেন,তখন ভাবতাম বড় হয়ে দোকানদার হবো,তাহলে ইচ্ছামতো চিপস্ খেতে পারবো।চিপস্ এর প্রতি আলাদা দুর্বলতা ছিলো আমার।

 

ছোট বেলায় অন্য বাচ্চাদের চিপস্ খেতে দেখলেই কান্না পেতো । ভাবতাম আমার যদি অনেক টাকা থাকতো তাহলে সব চিপস্ কিনে একাই খেয়ে ফেলতাম।বাবা-মা কি জিনিস তা ছোটবেলায় কখনো বুঝতে পারিনি।রাস্তা দিয়ে ছোট বাচ্চারা হেটে যেতো আর তাদের হাত ধরে রাখতো বড় বড় মানুষেরা।বাচ্চা গুলো তাদেরকে বাবা-মা বলে ডাকতো।আমি ভেবে নিলাম যারা হাত ধরে রাখে,তারাই বোধহয় বাবা-মা।একবার ভীষন জ্বরে ছটফট করছিলাম।আমাদের এতিমখানার কেয়ারটেকার চাচা এসে আমার হাত ধরে বলেছিলেন,"সব ঠিক হয়ে যাবে"।তিনি যেহেতু আমার হাত ধরলেন তাই আমি ভাবলাম তিনিই আমার বাবা-মা ।পরম যত্নে তাঁর হাতটা আমার ছোট্ট হাত দিয়ে ধরে রেখেছিলাম সেদিন।

 

ধীরে ধীরে বুঝতে শিখলাম অনেক কিছু।বুঝতে পারলাম বাবা-মা বলে আমার কেউ নেই,আর আমার সাথে যারা থাকে তাঁদের অবস্থা ও আমার মতোই।বাবা-মায়ের অভাব কখনো অনুভব করিনি।ছোট বেলা থেকেই যা ছাড়া বড় হয়েছি,তার প্রতি অনুভূতি না থাকাটাই স্বভাবিক।

 

অনেক ঈদেই ময়লা কাপড় পরে কাটিয়ে দিয়েছি।পছন্দের খাবার কখনোই খেতে পারিনি।অনেক শখ্ ছিলো একটা সাইকেলের,কিন্তু কে আমার স্বপ্ন পূরন করবে?আমার তো বাবা-মা নেই।যখন আমার বয়সী কাউকে দেখতাম সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে তখন চিন্তা করতাম আমার বাবা-মা থাকলে নিশ্চয়ই আমাকে সাইকেল কিনে দিতো।বাবা মা থাকলে তাঁদের কাছে আরো কি কি আবদার করা যেতো তার একটা লম্বা লিস্ট মনে মনে অনেকবার করেছি।মাঝে মাঝে রাতের কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে খুজতাম,আর খুজতাম আমার বাবা-মাকে।মনে আছে,আকাশের দিকে তাঁকিয়ে অনেক রাতেই কেঁদেছি,আর বাবা-মাকে ডেকেছি।

 

দেখতে দেখতে কবে যেন বড় হয়ে গেলাম।আমার অনেকদিনের আবাসস্থল,যে জায়গাটা ছিল আমার ছোট্ট একটা পৃথিবী,সেই এতিমখানাটা ছেড়ে দিতে হলো।ব্যাস্ত পৃথিবীতে সময়ের স্রোতের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নিতে ভীষন কষ্ট হয়েছে সে সময়।অবশেষে একটা ছোট্ট চাকরী জোগাড় করতে পারি।যা দিয়ে নিজের ভালই চলে যায়।যার কেউ নেই তাঁর তো খুব বেশী টাকার দরকার নেই, তাইনা?

 

আমার জীবনটা সাদা কালো।খুব বেশী চাওয়া আমার কখনো ছিলনা,এখনো নেই।এখন আমার যেটুকু চাওয়া তা ঐ এতিমখানার বাচ্চাগুলোকে ঘিরে। সময় করে এখনো ছুটে যাই আমার সেই পুরনো আবাসস্থলে।যেখানে বড় হচ্ছে আমার মতো বাবা মায়ের খোজ না জানা অনেক ছোট ছোট বাচ্চা।মাস শেষে যখন হাতে টাকা পাই তখন চেষ্টা করি ওদের জন্য কিছু নিয়ে যাওয়ার।চিপস্ তো অবশ্যই নিয়ে যাই।আর কোন বিশেষ উত্‍সবের আগে যখন কিছু বাড়তি টাকা হাতে আসে,তখন ওদের জন্য কিছু জামা কাপড় কেনার চেষ্টা করি।আমার মতো যেন পুরনো ময়লা কাপড় পরে ওদেরকে কোন ঈদের দিন না কাটাতে হয়,সে চেষ্টা করি।

 

যখন ছোট ছিলাম তখন ভাবতাম বড় হয়ে একটা প্লেন কিনবো,অথচ একটা ছোট্ট খেলনা প্লেন ও আমি কখনো ছুঁয়ে দেখতে পারিনি।ওদের ভেতর যারা এখনো অনেক ছোট,তাঁদের জন্য মাঝে মাঝে খেলনা নিয়ে যাই।তখন ওদের মুখে যে হাসিটুকু দেখি,তার সাথে অন্য কোন কিছুর তুলনা চলেনা।

 

ভালবাসার সংজ্ঞা কি তা আমি ভাল করে বুঝিনা।তবে আমার কাছে ভালবাসা মানে,ঐ ছোট ছোট এতিম বাচ্চাগুলোর মুখের হাসি।আমার কাছে ভালবাসা মানে,আমাকে দেখে ওদের ছুটে আসা।আমার কাছে ভালবাসা মানে,কোন কারনে ওদের কাছে যেতে দেরী হলে নিজের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতার সৃষ্টি হওয়া।আমার কাছে ভালবাসা মানে,ঐ ছোট বাচ্চাগুলো যখন আমার কাছে ছুটে এসে আমার হাতের আংগুল ধরে অভিমানি কন্ঠে জানতে চায়,আংকেল এতোদিন আসোনি কেন?ভালবাসা বলতে আমি এগুলোই বুঝি।চেষ্টা করে যাচ্ছি ওদের মাথার উপর একটা ছায়া দেওয়ার যাতে করে আমার মতো অসহায়ত্ব নিয়ে ওরা কেউ বড় না হয়।ওদের কোন বড় আবদার হয়তো আমি রাখতে পারবোনা কিন্তু ওদের ছোট ছোট আবদারগুলোতো রাখতে পারবো,এটাই তো আমার

অনেক বড় পাওয়া.......।

 

আদনান সাহেবের কথা শুনতে শুনতে কখন যে চোখে পানি চলে আসলো বুঝতে পারলামনা।এই লোকটাকে প্রায় সকালেই দেখি আমাদের বাসার সামনের দোকানে এসে চা খায়।সকাল বেলা আমিও দোকানে চা খেতে যাই।সেই সুবাদে তাঁর সাথে টুকটাক কথাবার্তা হতে হতে এক সময় ভাল সম্পর্ক হয়ে যায়।কিন্তু তাঁর ব্যাক্তিগত জীবন সম্পর্কে কখনো কিছু জানা হয়নি।আজ জানলাম।অনেক কিছু শিখলাম আজ।সবচেয়ে বড় যে জিনিসটা শিখলাম,তা হলো ভালবাসা।অদ্ভুত এক ভালবাসা। সত্যিই,ভালবাসার অনেক রং........

 

 

 

[এই গল্পটা কেন লিখলাম তা আমি নিজেই জানিনা।তবে আজ একটা বন্ধুর কথা খুব মনে পড়ছিলো।ওকে যখন বলতাম,আমার মনটা খারাপ,তখন ও বলতো,"যখন মন খারাপ থাকবে তখন পকেটে কিছু টাকা নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়বি,খুঁজে বের করবি একটা অসহায় বাচ্চাকে।তারপর ওকে কোন দোকানে বা রেস্টুরেন্টে নিয়ে কোন একটা খাবার কিনে দিবি।এরপর বাচ্চাটার যে হাসিমাখা মুখটা তুই দেখবি তাতে তোর মন ভাল হয়ে যাবেই"।বন্ধুটার সাথে অনেকদিন যোগাযোগ নেই।ভীষন মিস্ করছি ওকে।আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে,আপনারা যে যার জায়গা থেকে অসহায় শিশুগুলোর মুখে একটু হলেও হাসি ফোটানোর চেষ্টা করবেন........]

 

Share