লিটল এন্জেল এবং একজন বাবার গল্প.......

লিখেছেন - মোস্তাফিজুর রহমান (শুভ) | লেখাটি 937 বার দেখা হয়েছে

"বাবা!তুমি বাচ্চাদের মতো বাইরে বসে আছো কেন?তোমার তো ঠান্ডা লেগে যাবে?তুমি কি ভুলে গেছো তোমার একটুতেই ঠান্ডা লেগে যায়?কতবার যে তোমাকে এই কথাটা মনে করিয়ে দিতে হবে!তাড়াতাড়ি ভেতরে এসো..."

 

রাতেই বাংলাদেশে এসেছেন রাইয়ান সাহেব তাঁর মেয়েকে নিয়ে।এখন লঞ্চে করে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে।কতদিন পর বাংলাদেশে আসলেন তিনি?মনে করার চেষ্টা করেন।প্রায় ২৩ বছর পর।অন্তি অজানার দেশে চলে যাওয়ার পরই তিনি আশালতাকে নিয়ে পাড়ি দেন অস্ট্রেলিয়ায়।আশালতার বয়স তখন মাত্র ১ বছর। ঠিকমতো কথাও বলতে পারেনা।তারপরো হামাগুড়ি দিয়ে এ ঘর থেকে ও ঘরে শুধু অন্তিকে খুজে বেড়াতো।এই দৃশ্য রাইয়ান সাহেবের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব ছিলোনা।অবুঝ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলা ছাড়া কি বা করার ছিলো তাঁর?দেশেও তেমন কেউ ছিলনা তাঁর।নিজের বাবা মা কে অনেক আগেই হারিয়েছেন।আত্মীয় স্বজনও খুব বেশী ছিলনা।আপন বলতে ছিলো দুটি মানুষ,অন্তি আর আশালতা।এই দুজনকে ঘিরেই ছিলো তাঁর পৃথিবী।সেই পৃথিবীর সব নিয়ম-শৃংখলা ভেঙ্গে দিয়ে অন্তি যখন আকাশের তাঁরা হয়ে যায়,তখন খুব নিঃস্বঙ্গ হয়ে পড়েন রাইয়ান সাহেব।

 

কিন্তু ছোট্ট আশালতার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে শক্ত করেন তিনি।যেহেতু এখানে তাঁর তেমন কোন আত্মীয় স্বজন ছিলনা তাই তিনি দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।আশালতাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।যেখানে কেউ আশালতাকে তাঁর মায়ের কথা মনে করিয়ে দেবেনা।কেউ তাঁকে দেখে কপট দুঃখের সুরে বলবেনা,"আহারে!মা মরা মেয়েটা।"

 

সেই ছোট্ট আশালতা আজ অনেক বড় হয়ে গেছে।পুরনো কথা ভাবতে গেলেই কেন যেন চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে রাইয়ান সাহেবের।

-"বাবা!তুমি ভেতরে আসছোনা কেন?এই নিয়ে তোমাকে আমি ৫বার ডাকলাম!আমি কিন্তু ভীষন রাগ করছি..."

আশালতার ডাকে চিন্তায় ছেদ পড়ে রাইয়ান সাহেবের।এখন ভেতরে না গেলে মেয়েটা সত্যিই গাল ফুলিয়ে বসে থাকবে।তিনি কেবিনের দিকে এগোতে এগোতেই বলেন,

-"আমার 'লিটল এন্জেল'টা যদি আমার উপর রাগ করে,তাহলে আমি কোথায় যাবো?"

-"এতই যখন "লিটল এন্জেল"টাকে ভালবাসো তবে তার কথা শোননা কেন?"

-"কে বলেছে শুনিনা!এই তো শুনলাম!"

-"বাবা,আমাদের পৌছাতে আর কত সময় লাগবে?"

-"সন্ধ্যার আগে আগে পৌছে যাবো আশা করি।"

-"আমাদের নিতে কি কেউ আসবে?"

-"আমার এক চাচাতো ভাইকে বলেছিলাম,তাঁর আসার কথা।না আসলেও সমস্যা নেই।ঠিকই তোকে নিয়ে পৌছে যাবো।এখনো পথঘাটা ভুলিনি!"

-"তোমার যা ভুলো মন!সব কিছুই তো আমার মনে করিয়ে দেওয়া লাগে।আর সেই তুমি ২৩ বছর আগের পথঘাট চিনে পৌছাতে পারবে!"

 

রাইয়ান সাহেব আগে থেকেই তাঁর চাচাতো ভাই মজিদকে জানিয়ে রেখেছিলেন আশালতাকে নিয়ে দেশে আসার কথা।আর দেশে এসেই যে তিনি প্রথমে গ্রামের বাড়িতে যাবেন তাও মজিদকে বলে রেখেছেন।সুতরাং চিন্তিত হওয়ার মতো কিছু নেই।বরং তিনি একটু ভয়ে আছেন এইটা ভেবে যে তাঁদের নিতে কতজন মানুষ আসবে!মজিদ নিশ্চয় একা আসবেনা,সাথে করে অনেক লোকজন নিয়ে আসবে।দেখা যাবে অনেককেই তিনি চেনেন না।একটা অস্বস্তিকর পরিবেশের সম্মুখীন হতে হবে তখন।তবে তিনি বেশী চিন্তা করছেন আশালতাকে নিয়ে।এই মেয়েটা নতুন এই পরিবেশের সাথে কিভাবে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবে,তা নিয়েই তিনি বেশী চিন্তা করছেন।

 

-"বাবা,কি চিন্তা করছো?"

-"না,তেমন কিছুনা।আসলে,বড়সড় একটা জার্নি করলাম তো তাই অনেক ক্লান্ত লাগছে।বয়স তো আর কম হলোনা।"

-"বাবা,তুমি কিছুক্ষন ঘুমিয়ে নাও।আমাদের পৌছাতে তো মনে হয় এখনো অনেক দেরী হবে।"

-"আমি ঘুমিয়ে পড়লে তুই একা একা কি করবি?"

-"কি করবো?তোমাকে পাহারা দেবো!কেউ যেন আমার বাবার ঘুমের ব্যঘাত ঘটাতে না পারে!"

 

মুঠি পাকিয়ে কথাগুলো বলে আশালতা।রাইয়ান সাহেব আশালতার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলেন।মাঝে মাঝে মেয়েটাকে তাঁর থেকেও বড় মনে হয়।মনে হয়,তিনি আশালতার অভিভাবক নন বরং আশালতাই তাঁর অভিভাবক!তাঁর সব কিছুই যে এই "লিটল এন্জেল"টা গুছিয়ে দেয়।এসব কথা ভাবতে ভাবতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যান রাইয়ান সাহেব।

 

##############

 

আশালতা রেলিং ধরে দাড়িয়ে পানির দিকে তাকিয়ে আছে।বাবা ঘুমিয়ে পড়েছে।অনেক ক্লান্ত এই মানুষটা।জীবনের অনেক আঁকাবাঁকা পথ তাঁকে পরম মমতায় আগলে রেখে পাড়ি দিয়েছে এই মানুষটা।কখনোই কোন কারনে রাগ করেনি আশালতার উপর।বরং আশালতা কোন ভুল করলে ভুলটা ধরিয়ে দিয়ে হাসিমুখে বুঝিয়েছে,ভুলটা কোথায় ছিলো।

 

আশালতা যখন খুব ছোট্ট ছিল তখন কিছুই খেতে চাইতো না,আর বাবা তাঁকে একটু খাওয়ানোর জন্য খাবার নিয়ে পেছন পেছন দৌড়ে বেড়াতো।কিন্তু ওকে ধরতে পারলে তো!কতবার যে মুখে তুলে খাইয়ে দেওয়ার সময় বাবার আঙ্গুল কামড়ে ধরেছে ও তা ঠিক মনে করতে পারেনা।আনমনেই হেসে ওঠে আশালতা।কোন কারনে মন খারাপ থাকলে চুপ করে বসে থাকতো আশালতা।চেষ্টা করতো বাবা যেন কিছুতেই মন খারাপের ব্যাপারটি টের না পায়।কিন্তু বাবার চোখ ফাকি দেওয়া কি এত সহজ!বাবা ঠিকই টের পেয়ে যেতো।কখন যে পাশে বসে মাথায় হাত রাখতো বুঝতে পারতোনা ও।মাথায় হাত রেখেই মমতা মাখা কন্ঠে শুধু জিঞ্জেস করতো,"আমার লিটল এন্জেলটার কি মন খারাপ"?ব্যস,এটুকুই যথেষ্ট ছিলো আশালতার মন ভাল করার জন্য।

 

সেই ছোট বেলা থেকেই ছায়ার মতো পাশে থেকে যে কোন কাজেই অভয় দিয়ে গেছে এই মানুষটা।আশালতা নীরবতা পছন্দ করে বিধায় এই পুরো লঞ্চটা শুধু তাঁর জন্যই ভাড়া করেছেন তিনি।এতো বেশী কেন চিন্তা করে বাবা তাঁকে নিয়ে?এতো বেশী কেন ভালবাসে?সব

বাবাই কি তাঁর সন্তানকে এভাবে ভালবাসে?আচ্ছা,এই ভাল মানুষটাকে ছেড়ে কিভাবে স্বার্থপরের মতো মা আকাশের তাঁরা হয়ে গেল?বুঝতে পারেনা আশালতা।বাবার কাছে সে শুনেছে,তাঁর "আশালতা" নামটা মায়ের দেওয়া।

 

আচ্ছা,মা আমার নাম "আশালতা" রাখলো কেন?মা কোন একদিন ফিরে আসবে এই আশাটা বুকে নিয়ে বাবাকে লতার মতো আকড়ে ধরে বেঁচে থাকবো সে জন্য?ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা আশালতা।

আশালতা একটু পেছনের দিকে তাঁকিয়ে বাবার মুখটা দেখার চেষ্টা করে।এই মানুষটাকে সে অনেক বেশী ভালবাসে,অনেক বেশী.....।কতটা বেশী তা সে নিজেও জানেনা।

 

পড়ন্ত বিকেলের সূর্যটাকে অনেক ক্লান্ত মনে হচ্ছে।আশালতা ভাবে তাঁরও একটা সূর্য আছে,আর সেই সূর্যটা হলো তাঁর বাবা।সূর্যরুপ বাবাই যে তাঁর পৃথিবীটাকে আলোকিত করে রেখেছে।আশালতার খুব ইচ্ছা করছে তাঁর বাবাকে ঘুম থেকে তুলে বাইরে এনে ডুবে যেতে থাকা সূর্যটার তাঁকিয়ে বলতে,"বাবা,আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি,অনেক......."।

 

আশালতা রক্তিম আকাশটার দিকে তাকায়।মায়ের প্রতি তাঁর অনেক অভিযোগ।সে মনে মনে ঠিক করে নেয় মায়ের কবরের পাশে দাড়িয়ে তাঁকে কি কি বলবে।একটা কথা সে তাঁর মাকে বলবেই,আর তা হলো,"মা তুমি চলে গিয়ে কিন্তু অনেক কিছু মিস করছো,আমার আর বাবার ভালবাসা মাখা ছোট্ট পৃথিবীটা তুমি দেখতে পারছোনা,আমার আর বাবার খুনসুটি তুমি দেখতে পারছোনা।তুমি অনেক পঁচা,আমার বাবাটাই অনেক ভাল......."।আশালতার চোখ বেয়ে জল ঝরে।সেই জলে সবই মিশে থাকে।ভালবাসা,অভিমান সব.......

 

 

[আমরা কাঁদি,আমাদের প্রিয় মানুষগুলোর জন্য।কখনো সেই কান্নায় মিশে থাকে অনেক অভিমান,আবার কখনো মিশে থাকে অনেক ভালবাসা।আমাদের এই প্রিয় মানুষগুলো যেন সবসময় আমাদের পাশে ছাঁয়ার মতো থাকে এটুকুই সৃষ্টিকর্তার কাছে চাওয়া.......]

 

 

Share