অথৈ

লিখেছেন - মোস্তাফিজুর রহমান (শুভ) | লেখাটি 764 বার দেখা হয়েছে

বাসায় ঢুকবো কিনা চিন্তা করছি । দরজার সামনে এসে দাড়িয়ে আছি অনেকক্ষন । ভেতরে ঢুকতে ইচ্ছা করছেনা।অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভেতরে ঢুকলাম । বাসায় কেউ নেই।বাবা-মা,অথৈ এর কাছে । আমিও থাকতে চেয়েছিলাম।কিন্তু,বাবা-মা দুজনই বললো বাসায় ফিরে বিশ্রাম নিতে । আমি নাকি গতো দুদিন ধরে একটুও ঘুমাইনি  ! একটুও বিশ্রাম নিইনি ! আমি অনেকবার বললাম,আমার ...কিছু হবেনা ! আমি থেকে যাই ? না,কিছুতেই তাঁরা আমার কথা শুনবেনা ! এমন কি,অথৈ ও বললো,

 

-"ভাইয়া,তুই বাসায় যা।একটু বিশ্রাম নে"।

 

আমি ওকে বোঝাতে পারলাম না,আমার বাসায় ফিরতে একদম ইচ্ছা করছেনা ! একদম না ! কিন্তু,সবাই একপ্রকার জোর করেই আমাকে বাসায় পাঠিয়েছে ।

 

সারাদিনে ঠিকমতো কিছু খাওয়া হয়নি।এখন কিছু খাওয়া দরকার। মা বলে দিয়েছে,ফ্রীজে সবকিছু আছে,একটু গরম করে যেন খেয়ে নিই।কখনো নিজ হাতে খাবার গরম করেছি কি না,ঠিক মনে পড়ছেনা।অবশ্য,কখনো দরকার পড়েনি।মা সবসময় সবকিছু গুছিয়ে রাখে।আর কোন কারনে খাবার গরম করার দরকার পড়লে,অথৈ তো আছেই!

 

অথৈ,আমার ছোটবোন।বয়সের ব্যবধান খুব বেশী নয় আমাদের।২ বছর।বয়সের ব্যবধান কম থাকলে নাকি ভাই-বোনের সম্পর্কটা খুব ভালো হয়!কিন্তু,আমাদের ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টোটা।নাহ্,"আমাদের" বলাটা ঠিক হচ্ছেনা।বলা উচিত্‍,আমার ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টোটা।

 

সকাল বেলা ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বের হয়ে যাওয়া,ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া,সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফিরে আবার বাইরে বের হওয়া!এভাবেই কাটছিলো আমার দিনগুলো।আমার যে একটা ছোটবোন আছে,তা ভুলতেই বসেছিলাম আমি!ছুটির দিনেও খুব একটা বাসায় থাকা হয়না আমার।যার ফলে অথৈ এর সাথে খুব বেশী দেখা হয়না আমার।কথা হয় খুব কম।অবশ্য দেখা না হওয়া অথবা কথা না হওয়াটাই স্বাভাবিক।আমি বাসায় থাকলে তো দেখা হবে!

 

আচ্ছা,সময় কি মানুষকে  বদলে দেয়,নাকি মানুষ নিজেই বদলে যায়?আমি মনে হয় অনেক বেশী বদলে গেছি।আজ ভাবতেই অবাক লাগছে,এই আমি কি না একসময় আমার এই ছোট্টবোনটাকে ছাড়া অন্য কোন কিছুই বুঝতাম না!ছোটবেলায় স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি ফিরতে চাইতাম।ক্লাসে বসে প্রতিদিনই প্রার্থনা করতাম,আজ যেন তাড়াতাড়ি ছুটি দেয় ! কেন?

 

কারন,আমাকে যে খুব তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে!একটা ছোট্ট জীবন্ত পুতুলের জন্য!যে পুতুলটা তাঁর ছোট্ট হাত দিয়ে আমার চুল টানবে,কখনো বা খামচি দিবে,কখনো আমার উপর রাগ করে অদ্ভুত ভাষায় মাকে নালিশ জানাবে!আবার কখনো বা ভীষন পড়ুয়া হয়ে আমার বইয়ের পাতাগুলো ছিড়বে!এই ছোট্ট পুতুলটার জন্যই আমি তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতাম।আমার এখনো মনে আছে,অথৈকে লিখতে শিখিয়েছিলাম আমি।লিখতে পারতোনা ঠিকভাবে।"ই" লিখতো ২পেজ জুড়ে!আর "ঈ" লিখতে গেলেতো আমি রীতিমতো ভয়ে থাকতাম,এই বুঝি আমার পেন্সিলটা ভেঙ্গে গেলো!কত যে আনন্দের ছিলো দিনগুলো।একবার ফাইনাল পরীক্ষার পর নানুবাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম আমি।আমার এক মামা এসে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো।তখন কিসে পড়ি,ক্লাস ফোরে সম্ভবতো।নানুবাড়িতে ছিলাম বেশ কিছুদিন।বাসায় ফিরে শুনি,অথৈ নাকি আমার জন্য কান্নাকাটি করে জ্বর বাধিয়ে বসে আছে!আমাকে দেখেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে বললো,"ভাইয়া,তুই আমাকে নিয়ে যাসনি কেন?"

 

অথৈ গত কয়েকদিন ধরে অসুস্থ,অথচ আমি জানিই না!জানবোই বা কি করে!ওর সাথে শেষ কবে কথা বলেছি,তাই তো মনে পড়ছেনা!বাইরের জগত্‍টা নিয়ে ভীষন ব্যস্ত ছিলাম যে!ওর অসুস্থতার কথা জানতে পারলাম দু'দিন আগে,যখন হাসপাতাল থেকে বাবা ফোন করে বলোলো,অথৈকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।আমি তখনো বাইরে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম।বাবার ফোনটা পাওয়ার পর আমার যেন কি হলো,চোখের সামনে ভেসে উঠলো,সেই ছোট্ট পুতুলের মতো অথৈ এর ছবি।নিজেকে ভীষন অপরাধী মনে হতে লাগে।আমি তখনই হাসপাতালে ছুটে যাই।

 

অথৈ তখন ঘুমিয়ে ছিলো।আমি বাবা-মা অথবা অন্য কারো কাছে জানতে চাইনি,"অথৈ এর কি হয়েছে"?ভয়ে জানতে চাইনি,যদি অথৈ এর খুব বড় কোন অসুখ হয়ে থাকে!এই দুটি দিন আমি একদমই ঘুমাইনি।সব সময় অথৈ এর কেবিনের আশেপাশে থেকেছি।ও যদি ঘুম থেকে উঠে দেখে ওর ভাইয়াটা ওর আশেপাশে নেই,তাহলে ও কি ভাববে?কখনো ওষুধের জন্য আবার কখনো রক্তের জন্য ছুটে যেতে হয়েছে।খুব তাড়াতাড়িই ফিরে এসেছি আবার।অথৈ কে দৃষ্টির আড়ালে রাখতে ভীষন ভয় হচ্ছিলো আমার।আজো আমি থেকে যেতে চেয়েছিলাম।কিন্তু,সবাই মিলে আমাকে ধরে বেঁধে বাসায় পাঠিয়ে দিলো!

 

কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি,ঠিক মনে নেই।খুব একটা খারাপ স্বপ্ন দেখে ঘুমটা ভেঙ্গে গেছে।অথৈ এর কিছু হয়নি তো!বুকের মাঝে একটা চাপা ব্যথা অনুভব করি।ঘড়িতে সময় দেখলাম।রাত ৩:০০ টা।নাহ্,আমি বাসায় থাকতে পারবোনা।আমাকে অথৈ এর কাছে যেতে হবে।ও সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ওর পাশে আমাকে থাকতে হবে।

 

হাসপাতালে পৌছানোর পর দেখলাম,বাবা-মা খুব অবাক হয়েছে।এত রাতে এভাবে চলে আসবো,ভাবতে পারেনি বোধহয়!আমি ছুটে গেলাম অথৈ এর কাছে।অথৈ ঘুমাচ্ছে।ঘুমন্ত অথৈকে সত্যিই পুতুলের মতো লাগছে!মনে হচ্ছে,একটু পরই ঘুম থেকে উঠে গম্ভীর স্বরে আমাকে বলবে,"ভাইয়া,পেন্সিল দে!আমি লিখবো!"

 

আমার খুব কান্না পাচ্ছে।এই পুতুলটার সাথে কতদিন যে আমি ভালভাবে কথা বলিনা!ভাই হিসেবে আমি খুব খারাপ।খুব খারাপ।

 

-"ভাইয়া,তুই কখন এসেছিস?তুই বাসায় যাসনি"?

 

কখন যে অথৈ এর বেডের পাশে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই।অথৈ এর দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলাম।

 

-"ভাইয়া,তুই না বাসায় চলে গেলি!তাহলে,এই ভোরবেলা কিভাবে আসলি"!

 

মা কপট অভিমানের সুরে বললো,

 

-"ভোরবেলা নয়,সাড়ে তিনটার দিকে এসেছে।১২টার দিকে জোর করে বাসায় পাঠিয়েছি,সাড়ে তিনটার দিকে আবার চলে এসেছে।বাসায় পাঠালাম যাতে একটু বিশ্রাম নেয়,তা না করে চলে এসেছে!"

 

অথৈ আমার দিকে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষন তাঁকিয়ে থেকে বলে,

 

-"ভাইয়া,তুই অনেক ভালো.......।"

 

অথৈ এর দুচোখ বেয়ে জল নামে।আমি সেই জল মুছে দিতে দিতে বলি,

 

-"অথৈ নামে পুতুলের মতো একটা বোন আছে আমার,সেও অনেক ভালো।কিন্তু,এই মুহুর্তে সে পঁচা।কারন,সে এখন তাঁর ভাইয়ার সামনে বসে কাঁদছে।তাঁর ভাইয়ার খুব কষ্ট হচ্ছে.......।"

 

অথৈ হাসে।আমি অবাক হয়ে ওর হাসি দেখি।অনেক বড় হয়ে গেছে আমার সেই ছোট্ট বোনটা।কিভাবে আমি দূরত্ব সৃষ্টি করলাম আমার এই বোনটার সাথে!ভাবতেই অবাক লাগে.......

 

 

*******************

 

 

-"ভাইয়া!"

 

-"তুই আমার আইসক্রীম খেয়েছিস?!"

 

-"কই!না তো!"

 

-"সত্যি করে বল!"

 

-"তোর ঐ পঁচা আইসক্রীম আমি খেতে যাবো কোন দুঃখে!স্বাদ নেই,খেতে গেলে মনে

 

হয় বরফের কুচি খাচ্ছি!আর কালারের কথা নাই বা বললাম!"

 

-"কালারের কথা তুই জানলি কিভাবে!তার মানে তুই খেয়েছিস!"

 

 

ধুর!ধরা পড়ে গেলাম!ওহ্,আসল কথাই তো বলা হয়নি!অথৈকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছেকিছুদিন আগে।অথৈ এখন সম্পুর্ন সুস্থ।ওর কি হয়েছিলো তা আমি এখনো কারো কাছে জানতে চাইনি।ভয় হয়,অসুখের নামটা মুখে নিলেই যদি অথৈ আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে!অথৈটা মনে হয় বড় হওয়ার সাথে সাথে বেশী দুষ্টু হয়ে গেছে!এখনো ছোটবেলার মতো আমার চুল ধরে টানে!কয়েকদিন যদি শেভ না করি তাহলে শুনতে হয়,"ভাইয়া,তোকে না উল্লুকের মতো লাগছে!"

 

ঝগড়াও হচ্ছে ইদানিং!মজার মজার ঝগড়া।আমি কিন্তু আইসক্রীম পছন্দ করিনা।তবু ওকে ক্ষেপানোর জন্য,ওর জন্য বাবার আনা আইসক্রীম খেয়ে ফেলি।আমি খুব আনন্দে আছি এখন।আমার সবচেয়ে ভাল লাগছে যে কথাটা ভেবে তা হলো,আমি ওর আর আমার দূরত্বটা ঘোচাতে পেরেছি।আমার মনে হয়,অথৈ আমার চেয়ে বেশী খুশী হয়েছে,কারন,ও ওর পুরোনো ভাইয়াটাকে ফিরে পেয়েছে আবার নতুন করে!

 

-"ভাইয়া!তুই এখন আমাকে আইসক্রীম কিনে খাওয়াবি।"

 

-"ঠিক আছে,খাওয়াবো।"

 

অথৈ এর সব আবদার এখন রাখার চেষ্টা করি আমি।একটাই তো ছোটবোন আমার।ওর আবদার রাখবোনা তো কার আবদার রাখবো!

 

 -"ভাইয়া ! চল ! আমি রেডী।"

 

আমি উঠে পড়ি।আর নতুন করে ভাবতে থাকি,ওকে কিভাবে ক্ষেপানো যায়.......!

 

Share