এইতো আমার গল্প

লিখেছেন - মোস্তাফিজুর রহমান শুভ | লেখাটি 1979 বার দেখা হয়েছে

ছোটবেলায় গ্যস বেলুনের প্রতি আলাদা ধরনের একটা দূর্বলতা ছিলো আমার।এতটুকু একটা বস্তু একটু ছাড়া পেলেই মুক্তির আনন্দে কত সুন্দর ভাবেই না আকাশপানে ছুটে যেতো তাঁর ঠিকানা খুঁজে নিতে!

যতবারই কোনো গ্যস বেলুনকে আকাশপানে ছুঁটে যেতে দেখতাম ততবারই অবাক হয়ে তাঁকিয়ে ভাবতাম,"এই বেলুনগুলো কোথায় যায়!ওরা কি হারিয়ে যায়?কখনো ফিরে আসেনা?"

ছোট্ট মনটাতে এরকম অনেক প্রশ্ন নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম।আপনমনে উত্তর খুঁজতাম।কখনো বা নিজের মত করেই প্রশ্নের পিঠে উত্তর বসিয়ে নিতাম!

 

একবার কে যেনো একটা গ্যস বেলুন কিনে দিয়েছিলো।আমি তাড়াতাড়ি গ্যস বেলুনটা নিয়ে আমার রুমে চলে আসি।আমি ধরেই নিয়েছিলাম,বাইরে থাকলেই বেলুনটা আমায় ফাঁকি দিয়ে আকাশপানে ছুঁটে যাবে!

রুমে নিয়ে একটা চেয়ারের সাথে শক্ত করে বেঁধে রেখেছিলাম বেলুনটাকে!কোন ভাবেই যাতে আমায় ফাঁকি দিয়ে যেতে না পারে!

না,বেলুনটা আমায় ফাঁকি দেয়নি। সে চেষ্টা করেনি শক্ত বাঁধন ছিড়ে আকাশপানে ছুটে যাওয়ার।কিন্তু,একসময় সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে!যেনো ভয়ানক কোনো অসুখে আক্রান্ত হয়ে মৃতপ্রায় সে!

বেলুনটা চুপসে যাওয়ার আগ পর্যন্ত চেয়ারের সাথেই বাঁধা ছিলো।আমার মনে আছে,যেদিন বেলুনটা আর ওড়ার চেষ্টা না করে,পুরোপুরি চুপসে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিলো,সেদিন আমি কেঁদেছিলাম! অনেক কেঁদেছিলাম!

কে যেনো বলেছিলো,কেউ যদি মারা যায় তবে সে আকাশের তাঁরা হয়ে যায়!অবিশ্বাস্য হলেও সত্য,আমি আকাশপানে চেয়ে অনেক অনেক তাঁরার ভিড়ে গ্যস বেলুনটাকে খুঁজতাম আর কাঁদতাম।গ্যস বেলুনটাকে যে আমার কথা বলার সঙ্গী ভাবতে শুরু করেছি ততদিনে.......

 

বাবা-মায়ের আদর একটু কম পেয়েছি ছোটবেলায়।আমার পৃথিবীটাও ছিলো সংকীর্ন।পৃথিবী বলতে আমি বুঝতাম আমার চার দেয়ালে ঘেরা ছোট্ট রুমটাকে ! আমার সারাটা দিন ঐ ছোট্ট রুমটাতেই কাটতো।কখনো রূপকথার রাজকুমার সেজে কল্পপুরীর রাক্ষসকে মেরে,কখনোবা খাতায় আঁকা অদ্ভুত ভূতগুলোর সাথে কথা বলে,কখনোবা বারান্দার ফুলগাছের সাথে ঝগড়া করে!

 

একটু বড় হওয়ার পর আমাকে একটা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়।স্কুলটা একটু অদ্ভুত!স্কুলের শিক্ষার্থীগুলোও অদ্ভুত!কেউ হয়তো বা একটা লম্বা লাঠির মতো কি একটা নিয়ে হাতড়ে হাতড়ে পথ চলছে,কেউ আবার কথা না বলে অদ্ভুত রকম "আ" "উ" শব্দ করছে!আমার মতো কয়েকজনকে দেখলাম,হুইল চেয়ারে ঘুরে বেড়াচ্ছে!

 

চার দেয়ালে আবদ্ধ আমার পৃথিবীটা ছেড়ে যেনো হঠাত্‍ করেই বের হয়ে আসতে হয় আমাকে।একা একা চার দেয়ালের মাঝে বন্দী থাকা একটা ছেলের জন্য বিষয়টা একটু কঠিনই।আমার একদমই ইচ্ছা করতোনা চেনা ছোট্ট পৃথিবীটার বাইরে বের হতে!তবে আমার ইচ্ছাটা দ্রুত বদলে যেতে থাকে।আমার কৌতুহল জাগতে থাকে স্কুলের ঐ অদ্ভুত ছেলেগুলোর প্রতি।আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে আমার মতো যে ছেলেগুলো হুইল চেয়ার ব্যবহার করে,ওরা কি কখনো কারো সাহায্য ছাড়া উঠে দাড়ানোর চেষ্টা করেছে আমার মতো?যে ছেলেগুলো ছড়ি ব্যবহার করে তাঁরা কি কখনো ছড়ি ছাড়াই অন্যান্য মানুষের মতো হাটতে চেষ্টা করেছে?এতো এতো কৌতুহল আমার চেনা ছোট্ট পৃথিবীটার বাইরে টেনে নিয়ে আসে আমাকে।

 

একবার হুইল চেয়ার নিয়ে চলতে গিয়ে ইটের সাথে ধাক্কা খেয়ে হুইল চেয়ার নিয়েই পড়ে গিয়েছিলাম।অনেক চেষ্টা করেছিলাম একটু উঠে দাড়ানোর জন্য!কিন্তু পারিনি!কি অদ্ভুত তাই না?অন্য মানুষের মত আমারো দুটি পা আছে অথচ আমি সে পা দুটি কাজে লাগিয়ে উঠে দাড়াতে পারছিনা! খুব অসহায় লাগছিলো।দাঁত দিয়ে ঠোট কামড়ে অনেক কষ্টে কান্না সামলিয়ে রেখেছিলাম। আমাকে উঠে দাড়াতে সাহায্য করেছিলো আবিদ।আবিদ চোখে দেখতোনা,কিন্তু ঠিকই আমাকে উঠে দাড়াতে সাহায্য করেছিলো!

কথা বলতে না পারা ফাহাদ দৌড়ে এসে হুইল চেয়ারটা তুলে দিয়েছিলো!কাঁদবোনা কাঁদবোনা করেও একদম ছোট্ট বাচ্চাদের মতো কেঁদে দিয়েছিলাম সেদিন!শেষ পর্যন্ত কান্না সামলাতে পারিনি ! আমার কান্না দেখে ফাহাদ হাত ইশারায় জানতে চেয়েছিলো কোথাও ব্যথা পেয়েছি কি না!আর আবিদ বলেছিলো,"তোর কি কোথাও কেটেছে? আমি তো দেখতে পারিনা,তাই বুঝতে পারছিনা......."

আমি বোকার মতো কাঁদতে কাঁদতে বলি,"না,আমার কিছু হয়নি।"

 

আমার নিঃসঙ্গ দিনগুলো ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে।আমি বুঝতে পারি আমি নিঃস্বঙ্গ নই!

আবিদ,ফাহাদের মতো আরো কিছু মানুষের জন্য একাকীত্ব নামক জিনিসটাকে ততদিনে ভুলতে বসেছি।বিশ্বাস করতে শিখেছি,চার দেয়ালের বাইরেও আমার একটা পৃথিবী আছে!সেই পৃথিবীতে খাতায় আঁকা কোন ভূত বা ফুল গাছের সাথে কথা বলতে হবেনা আমাকে!

 

বাসার থেকে স্কুলটা প্রিয় হয়ে ওঠে আমার।বাসায় থাকতে একদমই ইচ্ছা করতোনা।সারাক্ষনই স্কুলে থাকতে ইচ্ছা করতো।কারন আমি ততদিনে বুঝতে শিখেছি,স্কুলে থাকলে আমার দাদীর মতো কেউ বলবেনা,"এই বয়সে ছেলেপুলেরা দৌড়ঝাপ করে বেড়াবে,আর সেখানে এই ছেলের বসে থাকতে হয় হুইল চেয়ারে । কি বিশ্রী লাগে দেখতে!"

বড় চাচার মতো কেউ বলবেনা,"তুই কি কোনোদিন হাঁটতে পারবি?না কি সারাজীবন এই হুইল চেয়ারে বসেই কাটিয়ে দিবি!?"

এসব কথা শুনে বাবা মায়ের মতো আড়ালে কেউ দীর্ঘশ্বাস ছাড়বেনা!

আর চারপাশের মানুষের এমন ব্যবহারের কারনে নিজেকে নিজের মাঝে গুটিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে হবেনা আমায়!পারবোনা জেনেও জেদের বশে উঠে দাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করতে গিয়ে পড়ে যেতে হবেনা আর!

 

বাবা-মায়ের কাছ থেকে যতটুকু দূরত্ব রাখা যায় ততটুকু দূরত্ব রেখে চলতাম সবসময়।কারন ছোট হলেও বুঝতে পারতাম,আমার কারনে বাবা-মা হীনমন্যতায় ভুগতেন।দিনে দিনে দূরত্বটা বাড়তে থাকে বাবা-মায়ের সাথে আমার।বাবা-মা বোধহয় আমাকে একটু এড়িয়ে চলতে থাকেন।আমি বুঝতে পারতাম কিন্তু মন খারাপ করতাম না,একদম না.......

 

মন ভালো করার জন্য তো আবিদ,ফাহাদ আরো কত বন্ধু আছে আমার!কেন মন খারাপ করবো আমি? আমরা একসাথে বসে কত গল্প করতাম!ফাহাদ কথা না বলতে পারলেও,হাসতে পারতো খুব!আবিদ যখন ভয়ংকর ভয়ংকর এক একটা ভূতের গল্প শোনাতো আর আমি দিনের বেলাতেও ভয়ে আধমরা হয়ে যেতাম,ফাহাদ তখন হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতো!আবিদ বিরক্ত হয়ে আমাকে বলতো,"ফাহাদ এতো হাসে কেনো?ও কি ভয় পায় না?"

ফাহাদ তখন জোরে জোরে "না" সূচক মাথা নাড়তো!আমি আবিদকে বলতাম,"ও না কি ভয় পায় না!"

আবিদ তখন বলতো,"ওকে এমন একটা গল্প শোনাবো একদিন!ভয়ে মরেই যাবে!"

এটা শুনে ফাহাদ বেশী করে হাসতো!

 

স্কুলের হোস্টেলটা একসময় অনেক আপন হয়ে ওঠে আমার কাছে!এখানের মানুষগুলো আমার মতই।আমরা নিজেদের মতো করে গড়ে তুলি নিজেদের জগত্‍।যেখানে আমার দাদীর মতো,আমার চাচার মতো কেউ নেই।যেখানে আমাদের শুনতে হয়না কোনো "ল্যংড়া,লুলা,আন্ধা,বোবা" ধরনের মন্তব্য।

 

আমাদের মধ্যে "ভালবাসা" নামক বস্তুটার অভাব ছিলোনা।একজনের প্রতি আরেকজনের ভালবাসাটা ছিলো বর্ণনাতীত।আবিদের মত চোখে দেখতে না পাওয়া নীলান্ত একবার হোচট খেয়ে পড়ে গিয়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলে।ওকে যখন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো তখন আমি প্রতিটা ছেলেকে কাঁদতে দেখেছি!নিজেদের আপন ভাইটা যেনো পড়ে গিয়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলেছে,আর তাঁর জন্য কেঁদে চলেছি আমরা!

নীলান্ত ফিরে আসার পর ফাহাদ সবসময় ওর সাথে সাথে থাকতো,যদি নীলান্ত আবার হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়!

 

বাসায় যাওয়া হতো দুমাস পরপর।১৫ দিনের একটা ছুটি দেওয়া হতো আমাদের।ঐ ১৫ টা দিন খুবই খারাপ কাটতো আমার।মনে হতো আপন মানুগুলোকে ছেড়ে অচেনা কিছু মানুষের মাঝে এসেছি আমি  ।১৫ টা দিন কোনভাবে শেষ হলে,স্কুলে ফিরে তবেই শান্তি পেতাম!নিজের বাবা-মা'কেও যে পর ভাবতে শুরু করেছি ততদিনে.......

 

দেখতে দেখতে অনেক বড় হয়ে যাই।স্কুল ছাড়ার সময় চলে আসে।স্কুলের এই চেনা হোস্টেলটা ছেড়ে আবার অচেনা পৃথিবীতে ফিরে যেতে হবে ভাবলেই চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে আসতো।প্রিয় মানুষগুলোকে ছেড়ে অপ্রিয় মানুষদের মাঝে যেতে ইচ্ছা করতোনা একদম,সত্যিই ইচ্ছা করতোনা.......

 

অবশেষে সত্যি সত্যি একদিন স্কুল ছাড়ার দিনটি আসে।বাবা-মা নিতে আসেননি।এসেছিলেন আমার বড় চাচা।এসেই মুখ বাঁকিয়ে বলেছিলেন,"এতো দেখছি পুরাই ল্যংড়া লুলার কারখানা।তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নে!আমি এখানে বেশীক্ষন থাকতে পারবোনা।"

চাচার কথা শুনে আমার খুব কান্না পাচ্ছিলো।কিন্তু আমি কাঁদিনি।ততদিনে কিভাবে কান্না হজম করতে হয় তা শিখে গেছি আমি।

সবার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময়ও আমি কাঁদিনি কিন্তু বোকাগুলো খুব কেঁদেছে!আর আমি অবাক হয়ে ওদের বলেছি,"তোরা কবে কান্না হজম করা শিখবি!?"

চলে আসার আগে আবিদের সাথে অনেকক্ষন কথা হয়।আবিদ বার বার করে বলে দেয়,"মানুষের কথায় কখনো মন খারাপ করবিনা বুঝলি?মানুষের কথায় কিছু যায় আসেনা।আমরা আমাদের মতই এবং আমাদের জায়গা থেকেই আমরা ভাল কিছু করার চেষ্টা করবো।আর একটা কথা,সবসময় যোগাযোগ রাখবি,কেমন?"

আবিদকে অনেক বড় মনে হচ্ছিলো আমার কাছে।"যোগাযোগ রাখবো" একথা বলে শেষবারের মতো আমার চেনা স্কুল প্রাঙ্গন,আত্মার সাথে মিশে যাওয়া হোস্টেল আর নিজের থেকেও বেশী ভালবাসার মানুষগুলোকে দেখে চলে আসি আমি।আমি কিন্তু কান্না হজম করতে শিখেছিলাম,কিন্তু সেই শেখার ভেতর বোধহয় কোনো একটা ভুল ছিলো!কারন পুরোটা পথ আমি চোখ মুছতে মুছতে এসেছি.......

 

এরপর অনেকদিন কেটে গেছে।বৈরী এই পৃথিবীটার বুকে সময়ের হাত ধরে আর হুইল চেয়ারটাকে সঙ্গী করে পাড়ি দিয়েছি অনেকটা পথ।এখন একটা বাচ্চাদের স্কুলে শিক্ষকতা করছি।

বাচ্চাগুলোর চোখে কোনো সহানুভুতি বা অবহেলা খেলা করেনা!ভালই আছি এই বাচ্চাগুলোকে নিয়ে।ওদের সাথে থাকলে অনেক আনন্দ নিয়ে থাকা যায়।ওদের দুষ্টামি দেখলে মনে পড়ে যাই সেই স্কুল,হোস্টেল আর সেই প্রিয় মানুষগুলোর কথা.......

 

খুব মনে পড়ে ওদের।কেমন আছে ওরা?ওদের সাথে যোগাযোগ করার কোনো উপায় নেই।সবার ঠিকানা লেখা ডায়েরীটা হারিয়ে ফেলেছি বাসা বদলানোর সময়।বাবাকে অনেকবার বলেছিলাম পুরোনো বাসাতে গিয়ে আমার ডায়েরীটার খোঁজ নিতে।তিনি আদৌ কোনোদিন খোঁজ নিয়েছেন বলে মনে হয়না!

 

গ্যস বেলুনের প্রতি ভালবাসা কিন্তু এখনো আছে আমার।তবে ভালবাসাটা এখন একটু অন্যরকম!গ্যস বেলুনটাকে ধরে নিয়েছি আবিদ,ফাহাদ,নীলান্ত সহ আরো অনেকের সাথে যোগাযোগের একমত্র মাধ্যম হিসাবে!প্রতি সপ্তাহের একটা নির্দিষ্ট দিনে ফাহাদ,আবিদ এবং অন্যদের নামে একটা করে চিঠি লিখে বেলুনের সুতোয় বেঁধে উড়িয়ে দিই আমি।আমি আশায় থাকি,কোনো একদিন কোন একটা গ্যসবেলুন আমার প্রিয় মানুষগুলোর কাছে গিয়ে পড়বে!আমার লেখা চিঠি পড়ে তাঁরা নিশ্চয় আমার সাথে যোগাযোগ করবে,নিশ্চয় করবে!

 

এইতো আমার গল্প।ভালবাসা অথবা ভালবাসাহীন একটা গল্প.......

 

Share