অথৈ এবং আমি

লিখেছেন - মোস্তাফিজুর রহমান শুভ | লেখাটি 1167 বার দেখা হয়েছে

সারাদিন একটানা ক্লাসের পর হলে ফিরে ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ি।একঘেয়েমি ক্লাস,প্র্যকটিকাল আর এই হলের নিরানন্দ জীবনটাকে খুব বেশী বিরক্ত লাগছে ইদানিং।বাসায় যাওয়া হয়না প্রায় দু'মাস হলো।দু'মাস বাসায় যাইনা!ভাবতেই যেনো কেমন লাগছে!কত দিন হলো বাবা-মা আর অথৈকে দেখিনা!বুকের ভেতরটা যেনো কেমন করে ওঠে আমার.......

 

আপনমনে এসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি ঠিক মনে নেই!ঘুম ভাঙ্গে রুমমেট নিয়াজের ডাকে।হাত ঘড়িটার দিকে তাঁকিয়ে দেখি সন্ধ্যা ৭টা বাজে।বিছানা ছেড়ে ফ্রেশ হতে হতে নিয়াজের একগাদা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় আমাকে।

 

-"কি ব্যপার!তোকে এরকম বিদ্ধস্ত দেখাচ্ছে কেন?"

 

আমি একটু হেসে নিয়াজকে বলি,

-"বিদ্ধস্ত দেখাচ্ছে নাকি!?"

-"হুম!মনে হচ্ছে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলি,কিন্তু বিপক্ষের ধাওয়া খেয়ে জীবন

নিয়ে পালিয়ে এসেছিস!"

 

আমি শব্দ করে হেসে উঠি আর নিয়াজ অবাক হয়ে আমার দিকে তাঁকিয়ে থাকে!

 

রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে একগাদা প্র্যকটিকাল খাতা নিয়ে বসি।কয়েকদিনের মধ্যেই কয়েকটা প্র্যকটিকাল খাতা সিগনেচার করিয়ে নিতে হবে।প্র্যকটিকাল লিখতে লিখতেই মায়ের ফোন পাই,

 

-"কেমন আছিস বাবা?"

-"ভালো আছি মা।তোমরা কেমন আছো?"

-"আমরা ভালো আছি।আচ্ছা,তুই একটু অথৈ এর সাথে কথা বল তো।আজ সারাদিন ধরে ঘ্যনঘ্যন করছে 'ভাইয়ার সাথে কথা বলবো,ভাইয়ার সাথে কথা বলবো' বলে"

আমি অথৈ এর কন্ঠ শুনতে পাই,

-"ভাইয়া!তুই কবে আসবি?ভার্সিটিতে কি এতো কাজ তোর?তোকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে,তাড়াতাড়ি বাসায় আয়......."

 

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলি,

-"আসবো,খুব তাড়াতাড়িই চলে আসবোরে পাগলি"

-"মনে থাকে যেনো!আবার যেনো তোকে বাসায় আসার কথা মনে করিয়ে না দিতে হয়!"

 

আমি একটু হেসে বলি,

-"বাসায় এসে কি করবো বল!বাসায় আসলে তো তুই সারাদিন আমাকে জ্বালাবি!অন্যদের বোনগুলো কত ভালো হয়!আর তুই সারাদিন শুধু আমাকে যন্ত্রনা করিস!"

-"আর জ্বালাবোনা ভাইয়া,সত্যি বলছি!তবু তুই তাড়াতাড়ি বাসায় আয়......."

 

আরো কিছুক্ষন কথা বলে ফোনটা রেখে দিই আমি।প্র্যকটিকাল লিখতে আর ইচ্ছা করেনা।মনটা অনেক বেশী খারাপ হয়ে যায় আমার।কারন,আমি জানি খুব শীঘ্রী বাসায় যাওয়া সম্ভব হবেনা আমার।সামনে কোনো বন্ধ নাই।ক্লাস মিস্ দিলেও সমস্যায় পড়তে হবে।যতই বাসায় ইচ্ছা করুক না কেন,এই মুহুর্তে তা সম্ভব না.......

 

-"এই শুভ!কি হয়েছে তোর?এরকম ঝিম মেরে বসে আছিস কেন?" নিয়াজের ডাকে চিন্তায় ছেদ পড়ে আমার।

 

একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলি,

-"কই!কিছু হয়নি তো!?"

-"ইদানিং দেখছি তোর মনটা একটু বেশী খারাপ থাকে!ঘটনা কি খুলে বলতো?"

 

আমি একটু অবাক হয়ে নিয়াজের দিকে তাঁকিয়ে ভাবি,আসলেই কি আমার মনটা অনেক বেশী খারাপ থাকে?নিয়াজ আমার মন খারাপ তা বুঝলো কিভাবে!?

 

-"কি হলো?বললি না,কি হয়েছে তোর?বাসার সবাই ভালো আছে তো?"

-"হুম।আসলে অনেকদিন বাসায় যাই না তো,তাই একটু মন খারাপ।অথৈ ফোন করে বাসায় যাওয়ার জন্য বললো,কিন্তু বন্ধ না পেলে তো বাসায় যাওয়া সম্ভব না।বাসায় যেতে ইচ্ছা করছে খুব,কিন্তু যেতে পারছিনা!এই কারনেই মনটা একটু খারাপ।"

-"মন খারাপ করিস না।বন্ধ পেলেই এক ছুটে বাসায় চলে যাস"

আমি নিয়াজের দিকে তাঁকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করি।ওর স্বান্তনা সূচক কথাটা শুনতে খুব বেশী খারাপ লাগেনা.......

 

পরের দিনটা খুব বেশী ব্যস্ততায় কাটে আমার।ক্লাস শেষে হলে ফিরতেই অথৈ এর ফোন পাই,

 

-"ভাইয়া কি করছিস?"

-"ক্লাস শেষ করে হলে ফিরলাম মাত্র।তুই কি করিস?"

-"তোর রুমে বসে আছি......."

আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে!

-"ভাইয়া!তোর রুমের সামনের বারান্দাটায় তুই টবে অনেকগুলো গোলাপের গাছ লাগিয়েছিলি,মনে আছে তোর!ছোট্ট ছোট্ট চারাগাছ?"

 

আমি আস্তে করে বলি,

-"হুম।মনে আছে।"

-"জানিস ভাইয়া,সেই গাছগুলো না অনেক বড় হয়ে গেছে!ফুল আসতে শুরু করেছে!"

 

আমি কি বলবো ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা!চুপ করে অথৈ এর কথা শুনি।

 

-"ভাইয়া,তুই কবে বাসায় আসবি?তোকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে!সারাদিন ধরে তোকে জ্বালাতে ইচ্ছা করছে!তোর কাছে আইস্ক্রীম আর চকলেট খাওয়ার আবদার করতে ইচ্ছা করছে!কবে আসবি ভাইয়া?"

 

অথৈ এর ধরা গলায় বলা কথা গুলো শুনে আমি চুপ করে বসে থাকি।একসময় খুব আস্তে করে বলি,

-"খুব তাড়াতাড়িই চলে আসবোরে পাগলি......."

 

অথৈ ফোন রেখে দেয় আর আমি তখনো কানের সাথে ফোনটা লাগিয়ে রাখি।কেমন যেনো শূন্য শূন্য লাগছে সবকিছু আমার কাছে!অথৈটা নিশ্চয় আমার রুমে বসে এখন কাঁদছে!আচ্ছা,সবার বোনই কি এরকম হয় না কি আমার বোনটাই শুধু এরকম? হঠাত্‍ করেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি আমি!আমি বাসায় যাবো!যত ক্লাসই থাকুক আর যত যায় থাকুক,আমি বাসায় যাবো!

 

রাত জেগে কিছু অসমাপ্ত প্র্যকটিকাল লিখে শেষ করি আমি।সকালে ঘুম থেকে উঠেই খাতাগুলো নিয়াজের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলি,

 

-"এগুলো একটু সিগনেচার করিয়ে আনিস তো।"

নিয়াজ অবাক হয়ে জানতে চায়,

-"তুই কোথায় যাবি?"

-"বাসায় যাবো।অথৈ গতকাল ফোন করে কান্নাকাটি করেছে।আমার ভালো লাগছেনা একদম.......।"

নিয়াজ একটু হেসে বলে,

-"ঠিক আছে,আমি সিগনেচার করিয়ে আনবো।"

 

আমার তৈরী হতে খুব বেশী সময় লাগেনা।তাড়াতাড়ি তৈরী হয়েই বেরিয়ে পড়ি আমি।বাস পেতে খুব বেশী সমস্যা হয় না।একটানা ৭-৮ ঘন্টা জার্নি করে বাসার কাছাকাছি আসতেই অথৈকে ফোন করি আমি।

 

-"কি রে পাগলি!কি করিস?"

-"কিছু না।"

-"আমি যে এই দুই মাস বাসায় নেই,এই দু'মাসে কি কিটক্যট খাওয়ার পরিমান বাড়িয়েছিস না কমিয়েছিস?তোর জন্য কতগুলো কিটক্যট আনবো বল তো!?"

 

অথৈ কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলে,

-"ভাইয়া!তুই বাসায় আসতেছিস!?"

আমি হেসে বলি,

-"হুম"

তত্‍ক্ষনাত্‍ ওপাশে অথৈ এর চিত্‍কার শুনতে পাই,

-"মা!ভাইয়া আসতেছে!"

আমি ফোনটা নামিয়ে রেখে,পাগলিটার জন্য একগাদা কিটক্যট কিনে নিয়ে বাসার দিকে পা বাড়াই।আর মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিই পুনরায় অথৈ এর সাথে দুষ্টুমিতে মেতে ওঠার জন্য.......

 

[অনেক অনেক ভালবাসা,বাস্তবের অথৈদের জন্য]

Share