নক্ষত্র ঝরা কোনো রাতের গল্প

লিখেছেন - মোস্তাফিজুর রহমান শুভ | লেখাটি 774 বার দেখা হয়েছে

-"চাচা!ঘুমাইছো?"

-"উহু"

শিহাবের ডাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সাড়া দেয় আলম।আজকাল পিচ্চিটা খুব বেশী বিরক্ত করে।পিচ্চি পোলাপান রাতের বেলা এতো কথা বলবে কেন?বয়সের ভারে অচল হয়ে পড়া শরীরটা নিয়ে বেশীক্ষন জেগে থাকতে কষ্ট হয় আলমের।ইদানিং আবার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে তাঁর।একটা জিনিস সে বুঝতে পারেনা,পৃথিবীতে যদি নিঃশ্বাস নেওয়ার সামর্থ দিয়েই পাঠানো হয়,তাহলে কেন আবার এই শ্বাসকষ্ট নামক ভয়ংকর অসুখটা দেওয়া দরকার?সৃষ্টিকর্তার সাথে যদি কথা বলা যেতো,তাহলে সে নির্ঘাত এই প্রশ্নটা করতো!

 

-"চাচা?"

-"হু"

-"তোমার শ্বাসবেদনা উঠে নাই আইজ?"

-"উহু"

-"আইজ উঠবে?"

-"আমি ক্যমনে কমু?শ্বাসবেদনা কি আমি উঠাই?"

কিছুটা রাগের স্বরে বলে আলম।শিহাব অবশ্য রাগের কিছুই বোঝেনা।সে বলতে থাকে,

 

-"আইজ তোমার শ্বাসবেদনা না উঠাই ভালা।বাতাস করতে পারুম না।"

আলমের একটু মন খারাপ হয়।কি এক অসুখ বাঁধলো যে তাঁর!বাতাসের জন্যও একটা ছোট বাচ্চার উপর নির্ভরশীল হতে হয় তাঁকে!

 

-"চাচা!"

-"হু"

-"তুমি কখনো বড় বাক্সে বন্দী আইস্ক্রীম খাইছো?"

-"শ্বাসবেদনায় বাঁচিনা,তার উপর আইস্ক্রীম!আচ্ছা,তুই ঘুমাইস না ক্যন!?বকবক করতেই আছিস!রাইত কত হইছে হিসাব আছে!?"

 

কিছুটা রাগত স্বরে বলে আলম।চুপ করে যায় শিহাব।আলমের হঠাত্‍ করে মনটা খারাপ হয়ে যায়।এই বাচ্চাটারে সে অনেক পছন্দ করে।ছেলেটার সাথে রাগ করে কথা না বললেই হতো!

 

-"শিহাব!ঘুমাইছিস?"

-"উহু।চাচা,আইজ যহন রাস্তার পাশে খালি বোতল টুকাইতেছিলাম,তহন দেখলাম,একজন বড় মানুষ একটা বাচ্চারে বড় বাক্সের আইস্ক্রীম কিইন্যা দিছে।বাচ্চাটা আইস্ক্রীম খাইতে যাইয়া সারামুখে মাইখা ফেলছে!কি যে মজা লাগতেছিলো দেখতে!"

 

আলমের মনটা খারাপ হয়ে যায়।সব বাচ্চা কেন আইস্ক্রীম খেতে পারেনা?সব বাচ্চার কেন বাবা থাকেনা?

 

-"চাচা!"

-"হু"

-"একটা কিচ্ছা শুনাবা?"

-"তুই আইজ ঘুমাইবিনা?রাইত তো গভীর হইয়া গেছে!"

-"শুনাও না চাচা,একটা কিচ্ছা!"

-"তুই বড় জ্বালাতন করিস আইজকাল!কেন যে তোরে আমার সাথে রাখছিলাম!"

 

কিছুক্ষন চুপ থাকার পর আলম নিজেই গল্প বলা শুরু করে। "এক দ্যশে এক রাজা ছিলো।রাজার দ্যশে কোনো অশান্তি আছিলোনা।সেই দ্যশে কোনো কিছুর অভাব আছিলোনা।মানুষের খালি সুখ আর সুখ।রাজা ও আছিলো খুব ভালো মানুষ।সে তাঁর রাইজ্যের প্রজাদের খুব বেশী ভালোবাইসতো।সবই ঠিক আছিলো,কিন্তু একদিন হইলো কি......."

 

-"চাচা!এক বাক্স আইসক্রীমের দাম কত হইতে পারে?এক বাক্স আইসক্রীমের দাম দিয়া কয়বেলা ভাত খাওন যায়?"

 

গল্প বলায় বাঁধা পেয়ে বিরক্ত হয় আলম।একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে,

 

-"এই জন্য তোরে কিচ্ছা শুনাইতে চাইনা।কিচ্ছার মধ্যিখানে অন্য কথা কইলে কি কিচ্ছার মজা থাকে!?"

-"চাচা,চাচা!দেখো,একটা তাঁরা খইসা পড়ছে!"

আলম আকাশের দিকে তাঁকিয়ে দেখে,সত্যিই একটা তাঁরা খসে পড়েছে আকাশের বুক থেকে!

 

-"চাচা!তুমি একবার কইছিলা না,তাঁরা খসার সময় কিছু চাইলে পাওয়া যায়?"

-"হু"

-"তাইলে আমি যদি এহন কিছু চাই,তা কি পামু?"

-"হুম,পাবি।তাঁরার দিকে তাঁকাইয়া চা"

 

উঠে দাড়ায় শিহাব।দিকভ্রান্ত হয়ে ছুঁটে চলা তাঁরাটির দিকে তাঁকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে সে!ঘটনার আকস্মিকতায় অবাক হয়ে যায় আলম।অবাক হয়ে শিহাবের দিকে তাঁকিয়ে আস্তে করে বলে,

 

-"এই শিহাব!কাঁদিস ক্যন!?"

ফোপাতে ফোপাতে শিহাব বলে,

-"আমি ভাত খাইতে চাই।এক প্লেট সাদা ভাত।আর কিচ্ছু লাগবেনা,শুধু লবন দিয়া খামু......."

 

আলম অবাক হয়ে জানতে চাই,

-"আইজ সারাদিনে ভাত খাইস নাই!?"

কান্নার মাঝেই ফোপাতে ফোপাতে শিহাব বলে,

-"আইজ তেমন কিছু টুকাইয়া পাই নাই।শুধু দুইটা প্লাস্টিকের ছোট পট পাইছি.......একটা পাউরুটি খাইছি আইজ,ভাত খাইতে পারি নাই"

 

আলমের বুকের ভেতরটা কেমন যেনো দুমড়ে-মুচড়ে ওঠে!নিজেকে খুব অসহায় লাগে তাঁর।অদ্ভুত এক মায়া অনুভব করে সে শিহাবের প্রতি।রাস্তায় ঘুমানো

মানুষগুলোর মায়া থাকতে নেই,কখনোই থাকতে নেই!কিন্তু তাঁর যে খুব বেশী মায়া লাগছে!আস্তে করে শিহাবের হাত ধরে বলে সে,

 

-"ফাজিল পোলা!খাইস নাই তা আগে বলিস নাই কেন!?চল ব্যটা,দেখি কোনো ভাতের হোটেল খোলা পাওয়া যায় কি না!আর কান্দন থামা বোকা পোলা!"

 

শ্বাসকষ্টের ওষুধ কেনার জন্য জমানো কিছু টাকা নিয়ে নেয় আলম।শিহাবকে নিয়ে রাস্তায় নামার আগে একবার আকাশের দিকে তাকায় আলম।খসে পড়া তাঁরাটা খুঁজে পাইনা সে!ঝাপসা চোখে কি কিছু খুঁজে পাওয়া যায়?

Share