চোখ ঢেকে যায় মেঘরোদে

লিখেছেন - মোস্তাফিজুর রহমান শুভ | লেখাটি 783 বার দেখা হয়েছে

কফির মগ থেকে ধোঁয়ারা কুন্ডলী পাকিয়ে উড়ে যাচ্ছে।শেষ বিকেলের কিছু শান্ত হাওয়া এলোমেলো করে দিচ্ছে ধোঁয়ার শরীর।নির্বিঘ্নে উড়ে যাওয়া ধোঁয়ারা যেনো খানিকটা বিরক্ত এই শান্ত হাওয়ার উপর।হাওয়ার হঠাৎ হঠাৎ আগমনে এলোমেলো হয়ে,কিছুক্ষন থমকে দাঁড়িয়ে যেনো নীরব প্রতিবাদ জানাচ্ছে ধোঁয়ার দল।নিধি অবাক হয়ে তাঁকিয়ে আছে কফির মগের দিকে।দুপুরের এই মুহুর্তটাতে সে বারান্দায় বসে থাকে।সঙ্গী হিসাবে থাকে এক মগ কফি।আজকাল অবশ্য কফি খাওয়া হয়না তাঁর।

 

যতক্ষন ধোঁয়া উড়তে থাকে,ততক্ষন সে অবাক হয়ে তাঁকিয়ে থাকে।একসময় ধোঁয়ারা ক্লান্ত হয়ে ঝিমিয়ে পড়ে।থেমে যায় ধোঁয়া আর মৃদু বাতাসের দুষ্টামি দুষ্টামি খেলা!ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফি তখন ফেলে দেয় নিধি।কফির মগ সামনে নিয়ে ধোঁয়া আর বাতাসের খেলা দেখাটা এখন নেশার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে নিধির কাছে।এই নেশাটা অনেক দিন ধরেই আচ্ছন্ন করে রেখেছে তাঁকে।কেউ দেখলে অবশ্য পাগল ভাবতে পারে তাঁকে!কিন্তু তাঁর কাছে এটা অনেকটা আনন্দের এবং অনেকটা নেশার মতো।

 

কফির মগ থেকে উড়ে যাওয়া ধোঁয়ারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে এখন।ঝিমিয়ে পড়েছে ওরা।এর মানে হলো,কিছুক্ষনের মধ্যেই ফাহাদ বাসায় ফিরবে।নিধি অনেকদিন ধরেই বিষয়টা নিয়ে পরীক্ষা করেছে।কফি ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার পর যখন ধোঁয়ার দল হারিয়ে যায়,ঠিক তার কিছু সময় পরই ফাহাদ বাসায় ফেরে!অবাক হওয়ার মতই একটা বিষয়!সে নিজেও আগে অবাক হতো।কিন্তু এখন আর অবাক হয়না।সে ধরেই নিয়েছে,ধোঁয়া হারিয়ে যাওয়া মানেই ফাহাদের বাসায় ফেরা।

 

ঠান্ডা কফির মগটা রেখে উঠে পড়ে নিধি।খুব ধীরে ধীরে অন্তুর রুমের দিকে পা বাড়ায় সে।অন্তুর রুমের দরজা সব সময় বন্ধ থাকে।হাল্কা একটু ফাঁকা হয়ে থাকা বদ্ধ দরজার ভেতর দিয়ে ওপাশে তাঁকায় নিধি।উপুড় হয়ে কি যেনো করছে অন্তুটা।একটু পরপর খুব ধীরে ধীরে ঠোঁট নাড়ছে অন্তু।আপনমনে কি করে চলেছে তা জানার খুব আগ্রহ জাগে নিধির।আগ্রহ চাঁপা দিয়ে আবার ওপাশে তাঁকায় নিধি।অন্তুর রুমের জানালা গলে এক টুকরো ক্লান্ত সূর্যের আলো পড়েছে অন্তুর মুখে।অন্তুর মুখে জমা হওয়া বিন্দু বিন্দু ঘাম চিকচিক করে উঠছে সূর্যের আলো পেয়ে!নিধি অবাক হয়ে তাঁকিয়ে থাকে।ছেলেটাকে এতো সুন্দর লাগছে কেনো?ওর পাশে গিয়ে বসলে কি ও খুব বেশী বিরক্ত হবে?ওর এলোচুলে হাত বুলিয়ে দিলে কি ও হাত সরিয়ে দেবে?

নিধি আর তাঁকিয়ে থাকতে পারেনা।তাঁর চোখ ভিজে আসছে.......

 

অন্তুর রুমের দরজা থেকে সরে এসে সে তাঁর শ্বাশুড়ীর রুমের দিকে রওনা হয়।তাঁর শ্বাশুড়ী গত দুদিন হলো এসেছেন।প্রায় দু বছর পর আসলেন তিনি।ফাহাদের ব্যস্ততার কারনে নিধিদেরও গত দু বছর গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয়নি।এবার অবশ্য যাওয়ার একটা চিন্তা ভাবনা ছিলো নিধির।শ্বাশুড়ী চলে আসায় চিন্তাটা বাদ দিয়েছে নিধি।অন্তুকে নিয়ে কোথাও যেতে তাঁর ভালো লাগেনা।অপরিচিত পরিবেশে ভীষন ভাবে ঘাবড়ে যায় ছেলেটা।যা দেখে তাতেই চমকে ওঠে সে।আর মানুষের ভীড় তো একদমই সহ্য করতে পারেনা অন্তু!অন্তুর মুখ দেখলে  নিধির খুব অসহায় লাগে তখন.......

 

-“মা,আসবো?”

-“এইটা কি অফিস নাকি যে অনুমতি নেওয়া লাগবে?কি যে এক অদ্ভুত নিয়ম তোমাদের!ঘরটাকে অফিস আদালত বানায়ে রাখো!”

রাজিয়া বেগমের কথা শুনে একটু ঘাবড়ে যায় নিধি!এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়।রাজিয়া বেগমের কথা বলার ধরনই এমন।তবু প্রতিবারই অস্বস্তিতে পড়ে যায় নিধি।

-“ফাহাদ ফেরে নাই এখনো?”

-“না মা।তবে এখনই চলে আসবে।”

-“এখনই চলে আসবে তা তুমি কিভাবে জানলে?তুমি কি তাঁর সাথে সাথে থাকো?”

নিধি কিছু না বলে চুপ করে থাকে।এখন কিছু বলা মানেই আরো কিছু কথা শোনা।তার চেয়ে বরং চুপ করে থাকাটাই শ্রেয়!

-“তোমার ছেলে কি করছে?”

-“মা,ও তো ওর রুমে।খেলছে বোধহয়।”

-“খেলছে বোধহয় মানে কি?ছেলেকে চোখে চোখে রাখবানা?এই বয়সে আহ্লাদ দিলে পরে গিয়ে মাথায় উঠবে!অবশ্য পরে আর কি উঠবে,এখনই তো নষ্ট হয়ে গেছে!”

নিধি অবাক হয়ে তাঁর শ্বাশুড়ীর দিকে তাঁকিয়ে থাকে!রাজিয়া বেগম আবার শুরু করেন,

-“আমি আসলাম অথচ আমারে সালাম দিলোনা!আমি তাঁরে একটু ধরলাম,আমার হাত সরায়ে দিয়া বললো,ধরবানা!ছেলেটারে তো বেয়াদপ বানাচ্ছো!”

নিধি ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা,এই মুহুর্তে তাঁর কি বলা উচিৎ!খুব ধীরে ধীরে সে বলে,

-“মা,ও তো অসুস্থ!”

-“অসুস্থ না ছাঁই!হাত,পা,চোখ,নাক সবই তো ঠিক আছে,তাইলে আবার কিসের অসুস্থ!ধরে দুইটা থাপ্পড় দাও,সুস্থ হয়ে যাবে।”

নিধি দাঁত মুখ শক্ত করে বলে,

-“মা, অন্তু অটিসমে আক্রান্ত।ও আর দশটা স্বাভাবিক বাচ্চার মতো না।”

-“ওরে আমার কাছে নিয়ে আসো।দুইটা থাপ্পড় দিই,দেখো তার পর স্বাভাবিক হয় কি না!মাইরের উপর কোনো ওষুধ নাই,বুঝলা?বেল বাজতেছে।যাও দেখো ফাহাদ আসছে মনে হয়।”

নিধি চুপচাপ উঠে পড়ে।দরজা খোলার আগে খুব সাবধানে চোখের জল মুছে ফেলে সে।তাঁর চোখের জল সে কাউকে দেখাতে চায়না,কাউকে না.......

 

সন্ধ্যাটা অনেক ভালো কাটে অন্তুর।বাইরের পৃথিবীটাতে আঁধার নামার সাথে সাথেই নিধি এসে অন্তুর এই ছোট্ট ঘরটাতে আলো জ্বালিয়ে দিয়ে যায়।আলো জ্বালানোর পরপরই একঝাক ছোট ছোট পোকামাকড় এসে ঢুকে পড়ে ঘরের মধ্যে।আর তখনই আগমন ঘটে টিকটিকিদের।দেয়াল বেয়ে ধীরে ধীরে হাঁটে ওরা।হঠাৎ হঠাৎ থমকে দাড়ায় ওরা।থমকে দাড়ালেই অন্তু বুঝতে পারে,ওরা আশেপাশে পোকামাকড়ের সন্ধান পেয়েছে।এই মুহূর্তটাতে অন্তু খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। টিকটিকি যখন লম্বা জিহ্বা বের করে কোন পোকাকে মুখে পুরে নেয়,তখন টিকটিকিগুলোকে অদ্ভুত লাগে দেখতে!অন্তু কয়েকদিন ধরে চেষ্টা করছে থমকে দাড়ানো টিকটিকির ছবি আকতে,কিন্তু কিছুতেই পারছেনা সে!টিকটিকিগুলো খুব কম সময়ই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।আজো অন্তু পেন্সিল আর ড্রয়িং পেপার নিয়ে বসে আছে।আজ একটা টিকটিকির ছবি সে আকবেই!টিকটিকিগুলো একটু বেশী সময় ধরে স্থির হয়ে থাকলেই হয়!

 

-“অন্তু!কি করছো?”

অন্তু দেয়ালের দিক থেকে চোখ সরিয়ে দরজার দিকে তাকায়।দরজার কাছে তাঁর বাবা দাঁড়িয়ে আছে।অন্তু খুব ধীরে কিন্তু স্পষ্টভাবে বলে,

-“কিছু না।”

-“আমি কি একটু ভেতরে আসবো?”

 

অন্তু কিছু না বলে আবার দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে।ফাহাদের মনটা খারাপ হয়ে যায়।সে আশা করেছিলো,অন্তু তাঁকে ভেতরে যেতে বলবে।তবে অন্ত যেহেতু “না”  বলেনি,সেহেতু ভেতরে ঢোকা যায়।ফাহাদ খুব সাবধানে ভেতরে ঢুকে,অন্তুর কাছ থেকে একটু দূরে মেঝেতে বসে পড়ে।একটু উঁকি দিয়ে অন্তুর ড্রয়িং পেপারটা দেখে নেয় সে।ড্রয়িং পেপার আর দেয়ালের দিকে তাঁকিয়ে ফাহাদ বুঝতে পারে,অন্তু টিকটিকির ছবি আঁকতে চেষ্টা করছে।সে অন্তুর দিকে তাঁকিয়ে বলে,

 

-“অন্তু!বাবা তুমি তো ছবি আঁকছো!তাহলে কিছু করছোনা বললে কেন?”

-“ছবি আঁকছিলাম,কিন্তু এখন তো আঁকছিনা,তাই বলেছি।”

-“আঁকছো না কেন এখন?”

 

অন্তু একটু বিরক্ত হয়ে তার বাবার দিকে তাকায়।ফাহাদ একটু চমকে যায়!এতো প্রশ্ন করা ঠিক হচ্ছেনা বোধহয়!

ফাহাদ ভেবেছিলো অন্তু তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেবেনা।কিন্তু ফাহাদকে অবাক করে দিয়ে অন্তু ধীরে ধীরে বলে,

-“একটা টিকটিকি জিহ্বা বের করে পোকা ধরছে,এই ছবিটা আঁকতে পারছিনা।”

ফাহাদ একটু হেসে বলে,

-“এটাতো সহজ!আমার কাছে দাও আমি এঁকে দিই।”

অন্তু কিছুক্ষন ফাহাদের দিকে তাঁকিয়ে থেকে ড্রয়িং পেপারটা এগিয়ে দেয়।

 

অন্তু তার বাবার দিকে তাঁকিয়ে আছে।কিভাবে পোকা ধরা টিকটিকির ছবি আঁকতে হয়,তা দেখার খুব ইচ্ছা তাঁর।ফাহাদ ও অবাক হয়ে তাঁকিয়ে আছে,তবে অন্তুর দিকে নয়!ড্রয়িং পেপারের দিকে!আচ্ছা,টিকটিকি কিভাবে জিহ্বা দিয়ে পোকা ধরে?জিহ্বা কতটুকু বের হয়?ফাহাদ অনুভব করে,সে ধীরে ধীরে ঘামছে!সে ছবি আঁকতে পারছেনা!চোখ তুলে একবার অন্তুর দিকে তাঁকায় ফাহাদ।অন্তুর উজ্জ্বল দুটি চোখ দেখে ঘাবড়ে যায় ফাহাদ!অন্তু যেন চোখ দিয়ে বলছে,“আমার সাথে মিথ্যা বলবেনা।আমি মিথ্যাবাদীদের পছন্দ করিনা।”

 

নিধি অন্তুর বিছানা গুছিয়ে দিয়ে আলো নেভানোর পর নিজের বিছানা ঠিক করতে যায় প্রতিদিন।নিধির খুব ভালো লাগে এই কাজটা করতে।অন্তুর বিছানা গুছিয়ে দেওয়ার সময়,অন্তুর সাথে টুকটাক কথা বলা যায়।এ সময়টাতে অন্তু খুব একটা বিরক্ত হয়না।আজ যেমন নিজ থেকেই বলে উঠলো,

-“বাবা টিকটিকির ছবি আঁকতে পারেনা।কিন্তু আমাকে বললো আঁকতে পারে।কেউ আমার সাথে মিথ্যা বললে আমার খারাপ লাগে।”

নিধি কি বলবে তা বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকে।কিছুক্ষন পর একটু হেসে বলে,

 

-“আমি তোমার বাবাকে বকে দেবো।আর কখনো যেনো তোমার সাথে মিথ্যা না বলে।আমি তোমার সাথে কিছুক্ষন গল্প করি অন্তু?”

-“না।”

নিধি আলো নিভিয়ে চলে আসার আগে একবার অন্তুর দিকে তাঁকায়।ছেলটাকে যদি একটু গাল টেনে আদর করা যেত!নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিধি.......

 

নিধি রুমে ঢুকে দেখে ফাহাদ শুয়ে পড়েছে।লাইট নিভিয়ে নিধিও শুয়ে পড়ে।

-“অন্তু ঘুমিয়েছে?”

-“হুম”

-“অন্তুকে স্কুলে ভর্তি করার কথা বলেছিলে না?আজ একটা স্কুলে গিয়েছিলাম।ভালই মনে হলো।টিচারদের দেখলাম ছোট ছোট বাচ্চাদের খুব কেয়ার নেয়।”

-“টিচারদের সাথে অন্তুর ব্যপারে কথা বলে তারপর ভর্তি করাতে হবে।তাঁদেরকে আগে বোঝাতে হবে অন্তু অন্য বাচ্চাদের মতো স্বাভাবিক নয়।”

-“হুম।ভাবছি আরো কয়েকটা স্কুল সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেব।তারপর না হয় ভর্তি করানো যাবে।”

বেশ কিছুক্ষন দুজনে চুপ করে থাকে।নীরবতা ভেঙ্গে কথা বলে ওঠে ফাহাদ,

-“মা বলছিল গ্রামের বাড়ি থেকে কয়েকদিনের জন্য বেড়িয়ে আসতে।অনেকদিনই তো যাওয়া হয়না!এমনিতেই ব্যস্ততার কারনে অবসর পাওয়া যায়না?এরপর অন্তুকে স্কুলে ভর্তি করালে তো সুযোগই পাওয়া যাবেনা!”

-“অন্তু অচেনা পরিবেশে খুব অস্বস্তিতে থাকে।মানুষের ভীড় ও সহ্য করতে পারেনা।এই অবস্থায় ওকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া ঠিক হবেনা।”

-“কিন্তু ওকে তো মানুষের মাঝে নিতে হবে।মানুষের সাথে কিভাবে মিশতে হয় তা শেখাতে হবে।ডাক্তার তো এমনটাই বলেছিলো তাই না?ঘরের ভেতর রেখে দিলে তো ওর অবস্থার কোনো উন্নতি হবেনা!”

নিধি আর কিছু বলেনা।পাশ ফিরতে ফিরতে খুব আস্ত আস্তে বলে,

-“আমার ছেলেকে নিয়ে কেউ কটূক্তি করলে আমি সহ্য করতে পারিনা।আমার খুব কষ্ট লাগে।মানুষের মাঝে অন্তুকে নিতে আমার ভালো লাগেনা.......”

 

ফাহাদ চুপ করে যায়।রাতের নীরবতার মাঝে ফাহাদ শুধু নিধির মৃদু ফোপানির আওয়াজ পায়।নিধি কষ্ট পাবে জানলে সে কখনোই এধরনের কথা বলতোনা।অদ্ভুত এক কষ্ট হচ্ছে তাঁর!হাত বাড়িয়ে নিধির হাতটা ধরে সে।এই মেয়েটাকে কখনোই কাঁদাতে চায়না সে,কখনোই না.......

 

অন্তুর খুব একটা খারাপ লাগছেনা দাদু বাড়িতে এসে।সমবয়সী কয়েকটা বাচ্চার সাথে কথা বলতে শুরু করেছে সে।নিধি খুব অবাক হয়েছে অন্তুর এই খানিক পরিবর্তন দেখে।গ্রামের বাড়িতে এসে তাহলে ভালোই হয়েছে।তাঁর অবশ্য অন্তুকে নিয়ে আসার ইচ্ছা ছিলোনা।কিন্তু কেন যেন  মনে হলো,এখানে সমবয়সী কিছু বাচ্চা পেয়ে অন্তুর স্বভাবে খানিকটা পরিবর্তন আসতে পারে।আর ফাহাদের মনেও সে কষ্ট দিতে চায়না।

নিধি বারান্দায় বসে বড় উঠানটার দিকে তাঁকিয়ে আছে।অন্তু বাচ্চাদের সাথে খেলছে।নিধির খুব ভালো লাগছে দৃশ্যটা দেখতে।কিন্তু অবাক হওয়ার মতো ব্যপারটা হচ্ছে,সে চোখের পাতা খুলে রাখতে পারছেনা!অনেক দুপুরের পর,তাঁর দুচোখ ভেঙ্গে আজ ঘুম নেমেছে।সে একবার ভাবলো অন্তুকে ডাক দেবে।পরে ভাবলো ডাকাটা ঠিক হবেনা।নিজের মতো করেই সময় কাটাক বাবুটা।নিধি আর বসে থাকতে পারেনা।এতো ঘুম পাচ্ছে কেনো তাঁর আজ?

 

অন্তু পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে।অন্যরা সবাই পুকুরে নেমে গেছে।ওদের সাঁতার কাটা দেখে অন্তু অবাক হয়ে গেছে।এমনভাবে পানিতে ভেসে থাকা যায়!অন্তুকে কয়েকবার ডেকেছে ওরা,কিন্তু অন্তু নামেনি।সাঁতার জানা থাকলে অবশ্য সে এতোক্ষনে নেমে পড়তো!

-“অন্তু!তুমি পানিতে নামবা?এই দেখো এইখানে এতডুক পানি!”

অন্তু ছেলেটার দিকে তাঁকিয়ে আছে।তাঁর চেয়ে বয়সে ছোট।ছেলেটার নাম মনে পড়ছেনা অন্তুর।

-“নামবা অন্তু?”

ছেলেটা বুক সমান পানিতে দাঁড়িয়ে আছে।এমন সময় কেউ একজন বলে,

“ঐ সব চল্!ঐ হাঁসটারে ধরি!”

 

সবাই মিলে একটা হাসের পেছনে ছুঁটে যায়।অন্তুকে যে ছেলেটা ডাকছিলো সেও হাঁস ধরার জন্য ছুঁটে যায়।পানিতে তখন একগাদা ছেলেমেয়ের দাপাদাপি চলছে।অন্তু অবাক হয়ে ওদের দিকে তাঁকিয়ে থাকে।তাঁর খুব পানিতে নামতে ইচ্ছা করছে!আচ্ছা,ঐ ছেলেটাতো বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ছিলো,ঐ পর্যন্ত নেমে না হয় দাঁড়িয়ে থাকবে সে।

 

অন্তু খুব ধীরে ধীরে পানিতে নেমে পড়ে।তাঁর খুব ইচ্ছা করছে সবার মতো ঐ হাঁসটাকে ধরার জন্য ছুঁটতে।সাঁতরাতে না পারলেও কিছুদুর মনে হয় হেঁটে যাওয়া যাবে!অন্তু এক পা,দু পা করে পা বাড়াতে থাকে।হঠাৎ করে সে অনুভব করে,নিচে পা রাখার মতো কিছু পাচ্ছে না সে!অনেক চেষ্টা করেও সে ভেসে থাকতে পারছেনা!এক সময় খুব ধীরে ধীরে পানির নিচে চলে যায় অন্তু।চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছে তাঁর!কিন্তু চোখ বন্ধ করতে একদমই ইচ্ছা করছেনা অন্তুর!আচ্ছা,হাঁসটা কি ওরা ধরতে পেরেছে?

 

নিধি অবাক হয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা অন্তুর মুখের দিকে তাঁকিয়ে আছে।এই মুহুর্তে ঠিক কি করা উচিৎ,তা সে বুঝে উঠতে পারছেনা।সে শুধু বুঝতে পারছে তাঁর সমস্ত শরীর কাঁপছে!ঠিক মতো বসেও থাকতে পারছেনা সে!রাজিয়া বেগম শক্ত করে তাঁর একটা হাত ধরে রেখেছে।নিধি একসময় অবাক হয়ে রাজিয়া বেগমের দিকে তাঁকিয়ে অস্পষ্টভাবে বলে,

-“মা!আমার বাবুটা কি চোখ খুলবেনা?”

রাজিয়া বেগম নিধির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন,

-“আল্লাহকে ডাকো মা।আর ডাক্তার তো বলছেই,ভয়ের কিছু নাই.......”

 

অন্তুর জ্ঞান  ফেরে সন্ধ্যার দিকে।অন্তুকে চোখ খুলতে দেখেই রাজিয়া বেগম নিধিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন।নিধি একবার অবাক হয়ে অন্তুকে আরেকবার অবাক হয়ে রাজিয়া বেগমকে দেখছে।কিছু সময় পর,অন্তুর দিকে একটু ঝুকে এসে ফিসফিসিয়ে  বলে,

-“অন্তু!বাবা,আমি তোমার হাতটা একটু ধরি?”

অন্তু তাঁর একটা হাত নিধির দিকে বাড়িয়ে দেয়।কাঁদবেনা কাঁদবেনা করেও নিধি কেঁদে দেয়।অন্তু অবাক হয়ে তাঁর মায়ের দিক তাঁকিয়ে থাকে।বড় মানুষেরা এমনভাবে কাঁদে কেন,ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা সে.......

 

ফাহাদ কেবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে নিধি আর অন্তুকে দেখছে।তাঁর উচিৎ ওদের কাছে যাওয়া।কিন্তু সে যেতে পারছেনা।নিজেকে কেন যেনো ভীষন অপরাধী লাগছে তাঁর।কেবিনের দরজা থেকে সরে আসে ফাহাদ।হাসপাতালের বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়ায় সে।সন্ধ্যা হয়ে গেছে,কিন্তু দূরের কিছু উঁচু গাছের পাতায় সূর্যের লাল আলো উঁকি দিচ্ছে।ফাহাদ সূর্যের শেষ আলোটুকুর দিকে তাঁকিয়ে থাকে।পরিস্কারভাবে সে আলোটুকু দেখতে পারছেনা!চোখের কোনে লেপ্টে থাকা জল সবকিছু ঝাপসা করে দিচ্ছে।ফাহাদ চোখ মুছে ফেলে।এরকম এক সুন্দর সন্ধ্যাতে পুরুষের চোখের জল খুব বেশী বেমানান লাগে.......

 

ফাহাদ ধীর পায়ে কেবিনের দিকে এগিয়ে যায়।অন্তুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে ভীষণ ইচ্ছা করছে তাঁর……

Share