স্বাধীন

লিখেছেন - জয় কবির | লেখাটি 821 বার দেখা হয়েছে

সারা গায়ে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে জ্ঞান ফেরে নিপুর। ব্যথার কারণেই জ্ঞান হারিয়েছিল, আবার সেই ব্যথাই জাগিয়ে দেয় তাকে। ভাঙ্গাচোরা চা দোকানের পরিচিত কাঠামোটা মনে পরে যায় তার। অজান্তেই ঠোঁটের মাঝে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। কয়েক ঘণ্টা আগেও এই দোকানে বসে চা খেয়েছে কয়েকজন মানুষ। হ্যাঁ, তারা দেখতে মানুষের মতই ছিল। কিন্তু এখন আর তাদের মানুষ বলে চেনার কোন উপায় নাই। দোকানটার ধ্বংসস্তূপই বলে দিচ্ছে তার ভেতরে পরে থাকা মানুষরূপী জানোয়ার গুলোর শেষ পরিণতি।

 

 

বাংলাদেশ - একটা স্বপ্ন, একটা পতাকা, আমার অস্তিত্ব। হায়রে বাংলাদেশের মানুষ। কি করে পারে এরা? কি করে নিজের দেশকে, নিজের বিবেকটাকে নিশ্চিন্তে বিক্রি করে দেয় মানুষ? সৌভাগ্য এই যে, সব মানুষ এমন না। হাতে গোনা কিছু লোক হয়তো টাকার লোভে, নতুবা বিপদে পড়ার দোহাই দিয়ে এই পথে পা বাড়ায়। তারা নিজেরাও বোধহয় জানেনা যে দেশের কাছে, এই মাটির কাছে তারা কোন দিন আর ক্ষমা পাবেনা। হয়তো একদিন স্বাধীন হবে দেশটা, হয়তো হবেনা। কিন্তু যতো দিন মানুষের মনে বাংলাদেশ থাকবে, ততো দিন সবাই ঘৃণা ভরে তাদের কথা স্মরণ করবে।

 

হঠাৎ করেই যেন বাস্তবে ফিরে আসে নিপু। কতক্ষণ সময় পেরিয়েছে? ভোর হতে দেরি নেই মনে হয় আর। আলো ফোটার সাথে সাথেই এই এলাকায় ঝাঁপিয়ে পড়বে পাকিস্তানী সেনারা। নির্বিচারে গুলি চালাবে। শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে উঠে দাঁড়ায় নিপু। ছিঁড়ে যাওয়া জামা কাপড় থেকে কাদামাটি ঝেড়ে ফেলে দুহাতে, তারপর হাটতে থাকে বাসার দিকে।

 

বাসায় ঢুকে দ্রুত গোসল সেরে নেয় সে। শরীরের ক্ষত গুলোতে কামড়ে ধরে ঠাণ্ডা পানি, না, সে দিকে নজর দেয়ার সময় নেই এখন। ভোর হবার আগেই জানাতে হবে সবাইকে, যেন দ্রুত সরে যেতে পারে মানুষ গুলো। এলাকায় কোন যুবক ছেলে নেই, মিলিটারির অত্যাচারে থাকতে পারেনি কেউই। শুধু কিছু পরিবার তাদের সহায় সম্বল আঁকড়ে ধরে পড়ে আছে। একে একে তাদের জানিয়ে দিতে থাকে নিপু, সরে যেতে বলে এই এলাকা থেকে।

 

ফজরের আজান দেয় দূরের কোন মসজিদে। শেষ বাড়ীটাতে কড়া নাড়ে নিপু। নিজ মনেই ভাবে "এতো দূর কি আসবে মিলিটারি?" তবুও জানিয়ে রাখা ভালো। সাবধানে থাকলে তো ক্ষতি হবার সম্ভাবনাটা কমবে। " নিপু মা - এতো রাতে তুই?" - ঘুম জড়ানো অবাক হওয়া কণ্ঠ মহিলার। "চাচী, আপনারা যত তাড়াতাড়ি পারেন সরে যান এই এলাকা থেকে"।

সংক্ষেপে কাল রাতের ঘটনা খুলে বলে নিপু। বলে বেড়িয়ে আসে। আপাতত কাজ শেষ।

 

নিপুকে দেখে চমকে ওঠে সবাই। শুধু নির্বিকার তাকিয়ে দেখে আসিফ। "আপু, আমরা তো ভেবেছিলাম যে তুমি শেষ" কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলে ওঠে শান্ত, চোখ দেখে বোঝা যায় অনেক কেঁদেছে এই ছেলে। এগিয়ে গিয়ে ভাইকে জড়িয়ে ধরে নিপু। "এখনো অনেক কাজ বাকিরে শান্ত, আমি এতো সহজে মরছিনা। বাবার শেষ আদরের স্পর্শ এখনও আমার কপালে লেগে আছে"।

চোখ ভিজে ওঠে নিপুর।

 

ভাঙ্গা মন্দিরটা থেকে সবাই বেড়িয়ে গেছে নিপু আর আসিফকে একা করে দিয়ে। আসিফের বুকে মাথা রেখে বসে আছে নিপু। শরীরে এক বিন্দু শক্তি অবশিষ্ট নেই তার। প্রয়োজনও নেই। তাকে দুহাতে জড়িয়ে আছে আসিফ। কি অসাধারণ চিন্তা শক্তি এই ছেলেটার। কি নিখুঁত পরিকল্পনা। সমস্যা ছিল, নূরুর চা'র দোকানে রাজাকারদের মিটিঙের সময় বোমা নিয়ে যাবে কে। কোন ছেলেকে দেখলেই ওরা গুলি করে বসতে পারে। নিজে থেকেই যেতে চেয়েছিল নিপু। আসিফ একটি বার নিষেধ করেনি তাকে। ভালোবাসার মানুষটাকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে একবারও কাঁপেনি তার চোখের পাতা। সময়টা যে এখন দেশকে ভালোবাসার। আর যে কোন সময় ছোট্ট একটা বুলেট আঘাত করতে পারে আসিফের কপালে কিংবা বুকে।

 

কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নিপু নিজেও জানেনা। সন্ধে মিলিয়ে গেছে, অন্ধকার ঘরের এক কোণে মিটমিট করে জ্বলছে একটা হারিকেন। হারিকেনের পাশে টিনের থালায় নিশ্চয় কোন খাবার। আসিফের কোন কাজে ভুল নেই, আনমনে হাসে নিপু।

 

খেতে বসে প্রথম গুলির তীক্ষ্ণ শব্দটা শোনে নিপু। এখন আর ওই শব্দ কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনা তার মধ্যে। একে একে গুলির শব্দ বাড়তে থাকে। ভারী মর্টারের আওয়াজ শোনা যায় মাঝে মাঝে। খেয়ে নিয়ে মেঝেতে পাটি পেড়ে নামাজে বসে নিপু। দুহাত তুলে দোয়া করে দেশের জন্য, দেশের মানুষ গুলোর জন্য।

 

প্রথমেই মন্দিরের ভেতর ঢোকে শান্ত, তার পেছনে বাকি সবাই। শান্তর চোখের দিকে তাকিয়ে বুকটা ধক করে ওঠে নিপুর। আসিফ আসেনি। তবে কি? "আমরা জিতেছি আপি, এই এলাকা এখন আমাদের দখলে" - মৌনতা ভাঙ্গে জামান। "আসিফ ভাই আমাদের সঙ্গে ছিলেননা, আমাদের অ্যামবুশে সেট করে দিয়ে উনি চলে গেছিলেন অনেক সামনে, পূর্ব পাড়া স্কুলের পেছনে। সেখানেই আজকে ক্যাম্প করেছিলো মিলিটারি। খাল পাড়ের ব্রিজটা উড়িয়ে দেয়ার আগে মনে হয় তিনটা জীপে করে কয়েকজন সেনা পালাতে পেরেছে। আর পেছনে কমপক্ষে ৭০টা লাশ রেখে গেছে তারা। আমরা হারিয়েছি অমলদা আর নাসিম কে। রাজীব, নবীন, পল্লব আহত। ওরা আছে জসীম স্যারের বাসায়। কপাল ভালো, আজকে সকালেই বেশ কিছু ওষুধপত্র পাওয়া গিয়েছিল। আগামীকাল সকালে ডাক্তার পাওয়া যাবে। স্যার'ই ব্যবস্থা করবেন বলেছেন। কিন্তু আসিফ ভাইকে কেউ দেখেনি। আমরা আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করে ফিরে এলাম। জানিনা উনি কোথায়।" একটানা কথা বলে থামল জামান। কেমন যেন সবকিছু এলোমেলো লাগছে নিপুর। অজানা একটা আশংকা, একটা ভয় ঘিরে ধরছে তাকে। আস্তে করে মেঝেতে বসে পড়লো নিপু।

 

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে ছোট্ট একটা বাচ্চার কান্না সচকিত করে তোলে সবাইকে। হারিকেনের আলোটা বাড়িয়ে দেয় নিপু, নিজের গায়ের ধুসর শালে জড়িয়ে একটা ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে ঘরে ঢোকে আসিফ। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে নিপুর সামনে। শাল সরিয়ে এক হাতে ব্যান্ডেজ জড়ানো বাচ্চাটাকে তুলে দেয় নিপুর কোলে। "নিপু, আমি জানিনা এটা কার সন্তান। হয়তো কোন মুক্তিযোদ্ধার, হয়তো কোন রাজাকারের, হয়তো কোন সাধারণ দরিদ্র মানুষের। ওকে আমি কুড়িয়ে পেয়েছি পথের পাশে। হেরে গিয়ে পালানোর সময় ওর মা'কে তুলে নিয়ে গেছে মিলিটারিরা। বাচ্চাটাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে অমানুষ গুলো। আমি ওকে নিয়ে গিয়েছিলাম ডাক্তারের কাছে। তাই ফিরতে দেরি হল। যদি তুমি চাও, তাহলে ওকে রাখতে পারো আমাদের সাথেই, আমাদের সন্তানের মত। না চাইলে ..." আসিফের মুখে হাত চাপা দেয় নিপু। "ও আমাদের সন্তান, ওর নাম স্বাধীন। ওর বাবা মুক্তিযোদ্ধা আসিফ ইশতিয়াক, মা আয়েশা পারভিন নিপু"।

 

------------------------------------------------------------

--

 

 

Share