রুপন্তি...

লিখেছেন - জয় কবির | লেখাটি 2641 বার দেখা হয়েছে

- রূপন্তি, রূপন্তি, রূপন্তি ...

- কি হয়েছে, ডাকো কেন?

- ক্ষুধা পেয়েছে অনেক, খেতে দে ...

- টেবিলে ভাত তরকারি রাখা আছে, নিয়ে খাওনা ভাইয়া, আমি কাজ করছি তো।

- পারবো না, তুই বেড়ে দিয়ে যা ...

... - উফফ ... তুমি এত অলস কেন? নিজে নিয়ে খেতে পারো না?

- পারলে কি আর তোকে ডাকি?

 

কোত্থেকে যেন উড়ে এলো পাগলীটা, কোমরে ওড়না পেঁচিয়ে মারমুখী ভঙ্গীতে দাঁড়াল আমার সামনে। ভয়ে ভয়ে ওর দিকে তাকালাম। কপালে খারাবী আছে আমার মনে হচ্ছে। পাগলীর মেজাজ গরম।

 

- আমার ডায়েরী কই?

গলায় ঝাঁঝ এনে বলল রূপন্তি।

 

- তোর ড্রয়ারে নেই? সেখানেই তো রাখিস। না রাখলে তোর তোষকের নীচে খুঁজে দেখ।

- আমার ডায়েরী যে তোষকের নীচে রাখা ছিল সেটা তুমি কেমনে জানো?

- না, মনে হল আর কি, তুই রাতে ডায়েরী লিখে সেখানেও তো রাখতে পারিস।

- ভাইয়া, এখুনি বলো কোথায় রেখেছ আমার ডায়েরী।

 

ধরা পড়ে গেছি অবশ্য, ওকে আর খেপিয়ে লাভ নেই, তাই বলে দেই ...

 

- ফ্রিজের মধ্যে দেখ।

 

আক্ষরিক অর্থেই মুখ হা হয়ে গেল পাগলীটার। তারপর দৌড়ে চলে গেল কিচেনে। সেখান থেকে আরেক চিৎকার দিলো ...

 

- ফ্রিজে তো নেই

- ডীপ ফ্রিজেও থাকতে পারে

 

ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া, পলিথিন মোড়ানো ডায়েরীটা এনে টেবিলের ওপর রাখলো সে। যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না, এমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ওটার দিকে। অবস্থা সুবিধার না, বেশী খেপানো হয়ে গেছে আজকে। কাজেই ভদ্র ছেলের মত প্লেট টেনে নিয়ে ভাত নিতে গেলাম। রূপন্তি এক টানে ভাতের গামলা আর তরকারীর বাটি আমার নাগালের বাইরে নিয়ে গেল। সর্বনাশ, আজকে আমার সত্যি খবর আছে। দু’বার ঢোক গিললাম।

 

- তুমি একটা কি?

- তুই যা, আমিও তাই। উৎপত্তিস্থল যখন এক, তখন দুজনের একই রকম স্পিশিজ হওয়ার সম্ভাবনা নিরানব্বই পার্সেন্ট।

- উফফ ... এতো পাজি তুমি। কানে ধরো, বলো আর করবা না এমন।

- আচ্ছা ... বলে ভাল মানুষের মত মুখ করে উঠে ওর কান ধরতে গেলাম। এক লাফে পিছিয়ে গেল পাগলীটা। তারপর ঘুরে এসে আমার পিছনে দাঁড়ালো। আমি চেয়ারে বসে পড়লাম আবারও।

 

- আমার কান ধরতে বলছি?

- না ... মানে তুই তো বলিস নাই যে কোন কান ধরতে হবে।

- এই কান ধরতে বলছি ... বলে দুই হাতে আমার কান আচ্ছা মত টেনে দেয় সেই ছোট বেলার মত করে।

 

আমি হাসি হাসি মুখ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। কান টানা শেষ করে আমার চুলে বিলি কেটে দেয় পাগলী। তারপর চুলের মধ্যে নাক ডুবিয়ে শ্যাম্পুর ঘ্রাণ নেয়। বলে ...

 

- আজকে শ্যাম্পু দিছো চুলে, না? গন্ধটা এত সুন্দর।

 

তারপর ভাত তরকারী বেড়ে দেয় আমার প্লেটে। চেয়ার টেনে বসে সামনে।

 

- বেশী করে খাবা আজকে। তোমার পছন্দের সব খাবার রেঁধেছি। চিংড়ী দিয়ে পুই শাক, বেগুন ভাজি, আলু আর মিষ্টি কুমড়ার ভাজি আর মাসকলাইয়ের ডাল।

 

আমি হাপুস হুপুস করে খাই, পাগলীটা হাসে আমার খাওয়া দেখে।

 

- আস্তে খাও, কেউ নিয়ে যাচ্ছেনা তোমার তরকারী।

- যা ভাগ, শান্তি মত খেতে দে। কি না কাজ করছিলি তুই? কাজ করতে যা।

- হুম ... ডায়েরী খুঁজছিলাম। তুমি এত বদ কেন? আর একদিন নিজে বেড়ে নিয়ে খেতে পারো না? ক’দিন পর আমি চলে গেলে কি করবা?

- তোর বাসায় গিয়ে খেয়ে আসবো।

- আমার জামাই তোমাকে খাওয়াবে কেন?

- কেন খাওয়াবে না? আস্ত একটা বিনা বেতনের কাজের মেয়ে দিলাম তাকে, সারা জীবনের জন্য, আর আমাকে তিন বেলা খাওয়াবে না?

- কি? আমি কাজের লোক?

 

পিঠের উপর দুমাদুম কিল পড়তে থাকে, আমি খাওয়ায় মনোযোগ দেই।

 

রূপন্তি, আমার একটা মাত্র বোন। আমার চাইতে বছর তিনেকের ছোট। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আমরা, তাছাড়া বাবার ঘন ঘন বদলীর চাকুরী। নতুন একটা জায়গার গিয়ে কিছু বন্ধুবান্ধব হতে হতেই আবার অন্য জায়গায় চলে যেতে হয় আমাদের। তাই ছোটবেলা থেকেই আমার সব চাইতে আপন, আমার সব চাইতে কাছের বন্ধু রূপন্তি। আমার সব আদর, সব দুষ্টুমি, সব রাগ, আবদার, চাওয়া – সব কিছুই রূপন্তির কাছে। রূপন্তি এক কথায় আমার ফ্রেন্ড, ফিলোসফার আর গাইড। বড় হয়ে ওঠার একটা সময়ে কখন যেন রূপন্তি বয়সের তিন বছরের দূরত্বটা পার করে আমার চাইতে খানিকটা বড়ই হয়ে উঠেছে। অনেক কিছুই আমি এখনও বুঝিনা, যেটা রূপন্তি খুব ভাল বোঝে। মাঝে মাঝে ওকে হিংসাও যে হয়না, তা না। বাবা মা ওকে আমার চাইতে বেশী আদর করেন। কারণ সে বংশের এক মাত্র মেয়ে। আর আমিও অন্তত এই ব্যাপারে ওকে হিংসা করিনা। এমন অনেকবার হয়েছে, যখন আমার ঈদের বাজার করার জন্য আমরা মার্কেটে গেছি, আমার আগে রূপন্তির জামা জুতো কিনতে গিয়ে টাকা কম পড়ে গেছে। আমি হাসি মুখেই আমার টাকার ভাগ দিয়ে দিয়েছি ওকে। বড় হয়ে অনার্স করতে চলে গেছি হোস্টেলে। সেখান থেকে টাকা জমিয়ে ওর জন্য এটা সেটা কেনা আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। আর পাগলীটা এখনও আমি বাড়ী এলেই আমার ব্যাগটা কেড়ে নিয়ে আঁতিপাঁতি করে খুঁজে ওর গিফট বের করে নেবে। তারপর শুরু করবে বকা ঝকা। কেন এটা কিনছো? নিজের জন্য খরচ করতে পারোনা টাকা? হাজারটা অভিমানের কথা ওর। আমি জানি ভেতর ভেতর কত খুশী হয়েছে রূপন্তি।

 

ক’দিন আগে রূপন্তি ফোন দিয়েছিল হোস্টেলে।

- ভাইয়া, তাড়াতাড়ি চলে আসো বাসায়।

- কেন, কি হয়েছে?

- আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে আব্বা। ওরা আসবে এনগেজমেন্ট করতে।

- আহা রে ... বিশাল এক দীর্ঘশ্বাস ফেলি। রূপন্তি হকচকিয়ে যায়। তাড়াতাড়ি বলে;

- আই ভাইয়া,একটুও মন খারাপ করবা না কিন্তু।

- মন তো খারাপ হবেই রে পাগলী। কার যে কপাল পুড়ল কে জানে,মন খারাপ তার জন্য।

- মানে?

- মানে ... যে তোকে বিয়ে করছে,বেচারা তো জানে না যে কি জিনিস ঘরে নিয়ে তুলছে। তোকে দেখে তো বোঝার উপায় নেই যে তুই কি পরিমাণ মাস্তান। বেচারার জীবন শেষ করে ঝামা ঝামা,তামা তামা, কয়লা কয়লা করে দিবি তুই। তারপর সেই কয়লা দিয়ে দাঁত মাজবি।

- আম্মা ... বলে বিশাল চিৎকার দেয় রূপন্তি। তারপর বলে ...

- তোমার মত পাজী ভাইয়া এই পৃথিবীতে আর নেই।

 

বাসায় এসেছি আজ দু’দিন। এর মাঝেই শুরু হয়ে গেছে ওর বিয়ের প্রস্তুতি। বেশ আনন্দ নিয়ে যোগাড়যন্ত্র করছি। অবশ্য বাসায় আসার পরের দিন মা আমাকে ডেকে বলে দিয়েছে যেন মন খারাপ করে না থাকি। আমি হেসেছি মা’র কথা শুনে। আমার মন খারাপ লাগছেনা তো। বন্ধুর বিয়ের একটা আমেজ পাচ্ছি বেশ।

 

সন্ধ্যের পর দু’ভাইবোন আর পাশের বাসার কয়েকটা পিচ্চি বসেছি ওদের জন্য গিফট প্যাকেট করতে। আমি অবশ্য বরাবরের মতই ফাঁকিবাজ। কাজের চাইতে গল্পই বেশী করছি।

 

- বুঝছো রূপমা, রূপন্তি যখন ছোট ছিল, তখন একদিন আমি ওর মাথা কলম দিয়ে ফুটো করে দিয়েছিলাম।

মুখ হা করে চেয়ে থাকে পিচ্চি গুলো। বিশ্বাস করতে চায়না আমার কথা।

 

- সত্যি। ও তখন অনেক ছোট। আমরা খেলতে গিয়ে ফাউন্টেন পেন দিয়ে ওর মাথায় ফুটো করে দিয়েছিলাম। তারপর সে তো চিৎকার, আমি রক্ত দেখে সেখানেই অজ্ঞান। বাসার সবাই দৌড়ে এসে দুই ভাইবোনকে নিয়ে টানাটানি। জ্ঞ্যন হতেই আমার প্রথম কথা “রূপন্তি কেমন আছে?” দেখি পাগলীটা দুই হাতে দুইটা কমলা নিয়ে আমার পায়ের কাছে বসে আছে। আমাকে কথা বলতে দেখেই হামা দিয়ে এগিয়ে এসে আমার বুকের ওপর উঠে বসে একটা কমলা এগিয়ে দিল আমার দিকে। আমি ...

 

রূপন্তি উঠে চলে গেল ওর ঘরে। আমি জানি ও এখন কাঁদবে।

 

আজ রূপন্তির এনগেজমেন্ট। বাড়ী ভর্তি লোক। সকাল থেকে চরম ব্যাস্থ হয়ে আছি। কত কি যে করতে হচ্ছে। একলা ভাই আমি। আমার ওপরেই তো সব দায়িত্ব। বাবা তো অফিস নিয়েই পড়ে আছেন। মা সামলাচ্ছেন রান্নাবান্না। রূপন্তি নিজেই সাহায্য করছে মা’কে। সত্যি বলতে কি, আমার মন খারাপ লাগছেনা একটুও। বোনের বিয়ে ব্যাপারটা এত কাছ থেকে দেখিনি আগে। আর কাজের ব্যস্ততায় মন খারাপ করার সময় কই?

 

যথা সময় ওরা চলে আসলো। আমরা স্বাগত জানালাম ওদের। বেশীরভাগই মুরুব্বি গোছের মানুষ। সবাইকে বসতে দিয়ে নাস্তা পরিবেশন করা হল। এখন আমার মুল দায়িত্ব ছবি তোলা, গানের সিডি বদলে দেয়া আর আমাদের সব আত্মীয়দের সাথে ওদের পরিচয় করিয়ে দেয়া। ভালই সময় কাটছিল। বরের ছোট একটা বোন এসেছে। বেশ ভাব নিয়ে বসে আছে। ওকে পঁচানোর প্লান করছি মনে মনে। এমন সময় আম্মু বললেন রূপন্তি আসবে এখন, ছবি তোলার জন্য তৈরি হতে। আমি বসার ঘরের এক কোণে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার ছোট্ট বোনটা, মাথায় একটা ঘোমটা টেনে বড়দের সাথে এসে বসলো সোফায়। রূপন্তিকে আজকে যে কি সুন্দর লাগছে, বলে বোঝানো যাবেনা। আমি ছবি তুলছি। এক সময় ওদের পক্ষের বয়স্ক এক মহিলা উঠে গিয়ে রূপন্তির গলায় পড়িয়ে দিলেন স্বর্ণের চেইন। ছেলের মা পড়িয়ে দিলেন আংটি। আমি ছবি তুলতে তুলতে হঠাৎ খেয়াল করলাম ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারটা ঝাপসা হয়ে আছে। ক্যামেরা মুছতে গিয়ে টের পেলাম ভিউ ফাইন্ডার নয়, ঝাপসা হয়ে আছে আমার চোখ। চোখের পানির সাথে কষ্টের একটা প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে। আমার কোন কষ্ট লাগছে না, অথচ আমি চোখের পানি আটকে রাখতে পারছিনা। কোনভাবেই পারছিনা। আমার দুচোখ বেয়ে, আমার গাল বেয়ে ক্রমাগত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। ক্যামেরাটা কাজিনের হাতে দিয়ে একটু নির্জনতা খুঁজতে চলে এলাম ছাদে। নাহ্‌ ... কোন ভাবেই চোখের পানি থামছে না। আমার ছোট্ট বোনটা আজ হঠাৎ করেই কি এক জাদুর ছোঁয়ায় যেন বড় হয়ে গেল। বিশটা বছর একসাথে কাটিয়েছি আমরা। ওর মুখে প্রথম ফিডার তুলে দেয়ার সেই স্মৃতি আজও আমি মনে করতে পারি। একটু একটু করে ওর বেড়ে ওঠা, আমার হাত ধরে, দুই বেণী দুলিয়ে, পানির ফ্লাস্ক আর ছোট্ট স্কুল ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ওর স্কুলে যাওয়া, আমার বাইসাইকেলে চেপে দুজনের এডভেঞ্চার, একটু বড় হয়ে ওঠার পর ওর পেছনে ঘুরঘুর করা ছেলের দলকে পিটিয়ে এলাকা ছাড়া করা, ওর প্রথম স্টেজে গান করতে যাওয়া, ওর এসএসসি পরীক্ষার আগের দিন অনেক রাত পর্যন্ত আমার একটা হাত জড়িয়ে ধরে বই পড়া,প্রচণ্ড ঝড়ের রাতে ভয় পেয়ে উঠে এসে গুটিসুটি মেরে আমার কাছে শুয়ে পড়া,দাঁত তুলতে গিয়ে ভয় পেয়ে এক হাতে আমাকে ধরে রাখা – সব, সব স্মৃতি আমার চোখের সামনে ভাসছিল।

 

একটু পরে কেউ একজন উঠে এলো সিঁড়ি বেয়ে। না দেখেই বুঝলাম এটা রূপন্তি। দ্রুত চোখ মুছে পেছন ফিরলাম। রূপন্তির উদবিঘ্ন চেহারাটা দেখে হেসে ফেললাম। ও জিজ্ঞেস করলো –

 

- কি করো ছাদে?

- সূর্য ডোবার ছবি তুলি – আমার নির্বিকার উত্তর।

- তোমার ক্যামেরা কই?

- ছিল তো এখানেই।

 

রূপন্তি ঝাঁপিয়ে পড়লো আমার বুকে।

 

~ সমাপ্ত ~

 

উৎসর্গঃ পৃথিবীর সব রূপন্তিকে।--

Share