রাখি ধরে চোখেরও জলে

লিখেছেন - জয় কবির | লেখাটি 1144 বার দেখা হয়েছে

“একটা কাজ করে দিবা, প্লিজ? আমাকে একটু পার্লারে নিয়ে যাবা আজকে?” – মেঘলার সাথে পার্লারে যাবার মোটেও ইচ্ছে ছিলনা অনন্তর। তবুও রাজী হতে হয়।

 

ফোন রেখে বিছানার ওপর বসে পরে অনন্ত। ওর চারিদিকে নিস্তব্ধ পৃথিবীতে মাঝে মাঝেই শোনা যায় কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ। শব্দটা কেবল অনন্তই শুনতে পায়, আর কষ্টটা অনুভব করে অন্তরে। একটা বছর চলে গেল সেদিন। এত গুলো দিন  নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে, মনকে প্রচণ্ড শাসনে রেখেও কোন লাভ হয়নি। যে কষ্টের কথা ভেবে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিল অনন্ত, সেই কষ্টটাই পেতে হচ্ছে ওকে।

 

 

কতটা কষ্ট পেলে একটা ছেলে কাঁদে? ছোটবেলায় স্কুল পালিয়ে ধরা পড়ে বাবার হাতে সে বার প্রচণ্ড মার খেয়েছিল। আশে পাশের বাসার মানুষ পর্যন্ত জমা হয়ে গিয়েছিল জানালায়। বাবা শুধু একটা কথাই বলছিলেন বারবার, “ও কাঁদেনা কেন? ওর কিছুই হচ্ছেনা এই মারে। চিৎকার কর, নাহলে তোকে ছাড়বোনা আজকে”। অনন্তর বয়স তখন কত? বার অথবা তের বছর হবে। কি এক জিদ চেপে গিয়েছিল ওর মাথায়, এক ফোটা কাঁদেনি, চোখ দিয়ে গড়ায়নি এক ফোটা জল। এক সময় ব্যথা সহ্য করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যায় অনন্ত। পরের দুটো সপ্তাহ কাটে ভীষণ জ্বরে। এক সময় সেরে ওঠে সে, কিন্তু বাবার সাথে তৈরি হয় একটা দূরত্ব, যা কোনদিন পূরণ হবার নয়। বাবার শত চেষ্টার পরেও অনন্ত কখনওই কিছু চায়নি আর বাবার কাছে। বড় হয়ে হোস্টেলে যাবার দিনগুলোতে একবারের জন্যেও বাবার দিকে পেছন ফিরে তাকায়নি।

 

যে বার বাইক এক্সিডেন্ট করলো অনন্ত, শরীরের বা দিকটা জখম হয়ে গিয়েছিল মারাত্মক ভাবে। ডাক্তার যখন সেলাই দিচ্ছিলেন, দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করেছে অনন্ত, কাঁদেনি একটুও। স্কুলের গণ্ডী না পেরুনো একটা ছেলের জন্য অস্বাভাবিকই বটে। এরপর একবার অন্ধকারে সুযোগ মত ধারালো রাম দা’র কোপ দিয়েছিল শত্রুরা। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটেছিল তখন। অনন্তকে দেখে সবাই চমকে গেছে সে বার। ভাবলেশহীন চেহারায় বসে আছে হাসপাতালের বেডে। অনন্ত কাঁদেনি, অনন্ত কাঁদতে জানেনা।

 

ডান হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মোছে সে। গরম সে নোনা জল, চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে নামার সময় যেন পুড়িয়ে দিচ্ছিল চোখ দুটো। এ কেমন কষ্ট, এ কেমন কান্না। এ কষ্টের কোন তুলনা হয়না। ভালবাসা মানুষকে এত বেশী দুর্বল করে দেয়, মানুষ তার স্বাভাবিক আচরণ থেকে সরে আসে অজান্তেই। নিজেই জানেনা কখন বদলে গেছে সে। 

 

বিছানা থেকে উঠে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায় অনন্ত। চোখ দুটো লাল আর ফোলা ফোলা। চোখে মুখে পানি দিয়েও লাভ হয়না। শেভ করে অকারণেই, প্রয়োজন ছিলনা আজকে শেভ করার। মেঘলার কাছে ও কিভাবে লুকোবে এই চোখ? মেয়েরা অনেক কিছুই বুঝে ফেলে না বলতেই। মেঘলা যদি জিজ্ঞেস করে, কি উত্তর দেবে অনন্ত? কিভাবে ওকে বলবে যে সব জেনে শুনেও আগুনে ঝাঁপ দেয়া পতঙ্গের মত ওকে ভালবেসে বসে আছে অনন্ত?

 

“শোনো, আমার আসলে কি করা উচিৎ, আই মিন, মেয়েরা কি করে যখন তাদের দেখতে আসে?” – মেঘলার সরল প্রশ্ন। এই মেয়েটা অন্য সব মেয়েদের থেকে কেন যেন একটু আলাদা। মাঝে মাঝে এমন সব কথা বলে, এমন সব কাণ্ড করে, অবাক হয়ে যায় সবাই। অনেকেই ভাবে ন্যাকামো। অনন্ত এই এক বছরে বেশ মানিয়ে নিয়েছে ওর সাথে। সে জানে এটা মেঘলার ন্যাকামো নয়, সরলতা। ও এমনই। এই কারণেই মেঘলার সাথে সব কিছু বলা যায় নিশ্চিন্তে। ম্যাসেঞ্জারে বা মোবাইল টেক্সটে অনন্ত যখন নিজেকে হারিয়ে একটার পর একটা ভালবাসার চিহ্ন দিয়ে যায়, ওর একবারও মনে হয়না যে মেঘলা মাইন্ড করতে পারে, অন্য মেয়েদের মত ডিফেন্সিভ হয়ে বলতে পারে – দেখো, তুমি কিন্তু আমার বন্ধু, আর কিছুই না। পরে অনেক সময় অনন্ত নিজেই লজ্জা পায়। ভয় হয়, যদি ওর ভালবাসার কথা জেনে যায় মেঘলা, যদি সরে যায়। মেঘলাকে হারাতে চায়না সে, কোন ভাবেই না, কোন দিনও না।

 

- “মেয়েরা এই দিন ছেলে পক্ষের সবার সামনে নাচে, গান গেয়ে শোনায়, অনেকে আবার ...”

- “যাও, শয়তান একটা, সিরিয়াসনেস নেই কেন তোমার একটুও? সারাক্ষণ শুধু হাসো আর হাসাও। আচ্ছা, তোমার মুখ ব্যথা করেনা? আর কই পাও এত হিউমার? যে কোন বিষয়ে তার একটা না একটা হাসির কথা বের করা চাই। এত পাজি কেন তুমি?”

 

হাসি হাসি মুখ করে শোনে অনন্ত। কি যে ভাল লাগে মেঘলার কথা গুলো। এত সুন্দর করে কথা বলে কেন মেয়েটা? ওর চোখের পাপড়ি গুলো এত নিখুঁত করে সাজানো। আর কি মায়া ওই চোখে। “মেয়ে, তোমার এই চোখে চেয়ে আমি হাসতে হাসতে মরতে পারি” – মনে মনে বলে অনন্ত। কথাগুলো বাংলা ছবির ন্যাকা ন্যাকা ডায়লগের মত, কিন্তু এই কথাগুলোই যে কতটা সত্যি, সেটা কেবল অনন্ত জানে।

 

ভালবাসার অনুভূতিটা আসলেও অদ্ভুত। কখনও অকারণে মন আনন্দে ভরে দেয়, কখনও বিষাদে ডুবিয়ে দেয়। অল্পতেই অভিমান করা অনন্তর স্বভাব। মেঘলার সাথে মাঝে মাঝে তার আরও বেশী অভিমান হয়। ও যদি অনেকক্ষণ টেক্সট না করে, ফোনে কথা বলতে বলতে যদি মনোযোগ না দেয় ওর প্রতি, অসুখ নিয়েও যদি ঘুরতে যায় বাহিরে – তাহলে অনেক অভিমান হয় অনন্তর। কিন্তু সে অভিমান বেশীক্ষণ থাকেনা। অনন্ত ভাবে মেঘলাকে বলবে ওর অভিমানের কথা। অভিমান জমে জমে পাথর হয়ে যাবার আগেই বলে দেয়া উচিৎ। কিন্তু বলা হয়ে ওঠেনা ওর, যদি মেঘলা কিছু মনে করে, যদি কষ্ট পায়। নিজেই মেঘলার ওই আচরণের কারণ খুঁজে বের করে। হয়তো সে ব্যস্ত ছিল, হয়তো মন ভাল ছিলনা। মেয়েটাকে এক বিন্দু কষ্ট দেয়া ওর পক্ষে সম্ভব না।

 

পার্লারের সামনে ছোট্ট কফি সপে বসে বসে আকাশ পাতাল ভাবে অনন্ত। কি হবে আর কিছুদিন পর? আজ মেঘলাকে দেখতে আসবে। অনন্ত জানে এটা ফর্মাল একটা ব্যাপার। দেখার পর অবশ্যই ওরা আংটি পড়িয়ে এনগেজমেট করে যাবে একেবারে। অনন্তর চোখের সামনে দিয়ে ফুলে ফুলে সাজানো গাড়ীতে চড়ে সারা জীবনের অন্যের হয়ে যাবে মেঘলা। হয়তো কোনদিন জানবেওনা যে অনন্ত কত ভালবাসতো ওকে। অনন্ত কোনদিন কিছুই বলেনি ওকে। মেঘলার আচরণেও সিরিয়াস কিছু পায়নি অনন্ত। মেয়েটা অনেক ভালবাসে ওকে, অনেক মায়া করে, কিন্তু সেটা বন্ধু হিসেবেই। এদিকে অনন্তও সময় নিচ্ছিলো, নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছিলো। টিন এইজ পেরিয়ে এসেছে ওরা অনেকদিন। হুট করে প্রেমে পড়ে যাবার বয়সটা তো আর নেই। দ্বিধায় জড়ানো ভালবাসা নিয়ে চিন্তিত অনন্ত আচমকার দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে ওঠে যখন মেঘলার বিয়ের কথাবার্তা আরম্ভ হয়। তখন কি বা করার ছিল ওর?

 

অনন্ত জানে, সামলে উঠবে সে। তবে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে। হয়তো ওর জীবনটা এলোমেলো হয়ে যাবে। মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির জবটা ছেড়ে দিয়ে দূরে কোথাও চলে যাবে হয়তো। কিন্তু যত দূরেই যাক, নিজের কাছ থেকে পালাতে পারবে কি সে? কেউ কি পারে? তবুও দূরে চলে যেতে হবে ওকে। এই শহরের স্মৃতি গুলো, স্মৃতিময় স্থান গুলো ওকে অনেক বেশী মনে করিয়ে দেবে মেঘলার কথা।

 

পার্লার থেকে বেড়িয়ে আসে মেঘলা। ওকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এতক্ষণ কি করেছে ভেতরে। মেঘলা এমনিতেই অনেক সুন্দর। এই মেয়েটাকে সাজলে সুন্দর লাগে, না সাজলে আরও স্নিগ্ধ লাগে। ভালবাসার চোখে দেখে বলেই কি? হেসে ফেলে অনন্ত। ভালবাসা না কি চোখের ভেতর মমতার ছায়া ফেলে। চোখের দৃষ্টিতেই মেয়েরা বুঝে ফেলে কে তার প্রেমে পড়েছে। মেঘলা কি বুঝেছে তার চোখের ভাষা? যদিও সে সচেতন ভাবেই চোখটাকে শাসনে রাখে। ন্যাকা ভাবতে পারে মেঘলা ওকে।

 

- “কেমন লাগছে আমাকে?” গাড়ীতে বসেই মেঘলার প্রশ্ন।

- “অনেক সুন্দর লাগছে। তুমি তো এমনিতেই সুন্দর”

- “তুমি কি দেখো আমার দিকে? এই এক বছরে দেখেছো কখনও?” – হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে মেঘলা। “তুমি এত লাজুক কেন? অন্য মেয়েদের দিকে তো তাকাও দেখি, আমার দিকে তাকাওনা কেন তুমি?”

- এহ্‌ ... আমি কোন মেয়ের দিকেই তাকাইনা। অন্তত খোলা চোখে না। ক্যামেরার লেন্স দিয়ে তাকাই অবশ্য। জুম করে দেখা যায়, অবশ্য যদি জুম করে দেখবার মত সুন্দর হয়, তবে”

-  “হুম ... তোমার চারপাশে তো আবার সুন্দরীদের ভিড়। আমার মত সাধারণ চেহারার একটা মেয়ে কিভাবে তোমার বন্ধু হলো, তাই বুঝলামনা”।

- “আমিও সেটা ভাবি মাঝে মাঝে। বন্ধুত্ব সবার সাথে হয়না। কারও কারও সাথে হয়ে যায় আর কি”

- “আচ্ছা, একটা কথা বলবা? তোমার মন খারাপ কেন কয়েকদিন থেকে?”

 

কি জবাব দেবে অনন্ত? সব চাইতে সোজা বুদ্ধি হচ্ছে অফিসে ঝামেলার কথা বলা। এতে পরবর্তী মিথ্যে গুলো বলতে সুবিধা হয়। কিন্তু এবার কোন জবাব দেয়না অনন্ত, সাবধানে ড্রাইভ করতে থাকে।

 

মেঘলা গাড়ীর মিউজিক প্লেয়ারটা অন করে। মন উদাস করা কণ্ঠে বেজে ওঠে –

 

মন চিনলোনা রে

যারে রাখি বুকে ধরে

জলের ভেতর আগুন জ্বলে

দুখের নদী বইয়া চলে

তারে রাখি ধরে

রাখি ধরে চোখেরও জলে ...

 

বুকের মধ্যে চিনচিনে ব্যথা অনুভব করে অনন্ত। মনের অজান্তেই মেঘলার দিকে তাকায়। মেঘলার চোখে পানি। সাগরের মত সুন্দর চোখদুটো টলমল করছে জলে। যেন এখুনি আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামবে। সহ্য করতে পারেনা অনন্ত, একটা হাত বাড়িয়ে দেয় মেঘলার দিকে। মেঘলা দু’হাত দিয়ে ওর বাড়িয়ে দেয়া হাতটা ধরে। চোখ থেকে চোখ সরায়না কেউই। অনন্তর হাতের ওপর মুক্তো দানার মত গড়িয়ে পড়তে থাকে তপ্ত অশ্রু।

 

 

 

Share