স্বপ্নচারিনী

লিখেছেন - জয় কবির | লেখাটি 1000 বার দেখা হয়েছে

মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে মেঘ হয়ে ভেসে যাই আকাশে। চলে যাই ইচ্ছে মত এদিক কিংবা ওদিক। দমকা বাতাসে ভর করে, রংধনুকে সাথী করে চলে যাই দিগন্তের ওপাশে। সাগরের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে দেখে আসি কেমন করে সাগরের নীল জলকে আলিঙ্গন করে রাতের আকাশ। লক্ষ কোটি তারার ঝাঁক কি এত গল্প করে সারা রাত? সমুদ্রের মাঝে ছোট্ট দ্বীপ কুমারীর চরণে সাগরের জল ভালবেসে চুমু খেয়ে কি অস্ফুটে বলে “ভালবাসি তোমায়”?

 

  ছেলে হিসেবে আমি বোধ হয় একটু বেশী রোমান্টিক। বৃষ্টির দিনে একবার না একবার আমাকে ভিজতেই হবে। শীতের দিনে শিশিরে ভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে হবেই আমাকে। সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে শুনতে হবে অনেক গান। যদি সুন্দর একটা কবিতা পড়ি সকালে, তবে দিনটা আমার ভাল যাবে। অফিসের জানালা দিয়ে পাখী দেখা আর তাদের গান শোনা আমার নিত্যদিনের কাজ। আর হ্যাঁ ... আরও একটা কাজ আছে আমার। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ওর ছবি দেখা। আমার ধারনা, পরীটা নিজেও জানেনা যে সে কত সুন্দর।

 

সেদিন কি হয়েছে জানো? রোজ সকাল বেলা ওকে আমি একটা টেক্সট করি,শুভ সকাল বলি। কখনও গানের কোন লাইন, কখনও কবিতা, কখনও বা রূপকথার দু’তিনটে লাইন। সেদিন লিখেছিলাম মেঘের কথা। লিখলাম – “আমি একটুকরো মেঘের গায়ে তোমার নাম লিখে দিয়েছি। তুমি খুঁজে নিও পশ্চিমের আকাশ থেকে”। সে কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই করলো – “খুঁজে নিলাম। কিং কোবরা লাইভ দেখায় টিভিতে, দেখবে?”। আমার এই চরম রোমান্টিক মেঘের টেক্সটের মধ্যে অবলীলায় সে ভয়ঙ্কর কালো সরীসৃপটাকে টেনে আনলো। কি আন-রোমান্টিক মেয়েরে বাবা। আমি কিনা এই মেয়ের চোখের মাঝেই অনন্ত নক্ষত্রবীথি দেখি !

 

শীতের শুরুতে একটা উজ্জ্বল দিনে শুনি তার মন খারাপ। জিজ্ঞেস করলাম – গল্প শুনবে? বলে – হুম। আমি শুরু করি।

-রূপকথার এক দেশে ছিল একটা পাতা।

- পাতা? রূপকথার দেশে পাতা থাকে না কি?

- হু ... রূপকথার দেশের গাছেও পাতা থাকে। সেটা ছিল খুব সাধারণ একটা পাতা। শীতের সময় যখন গাছের পাতা ঝরে যায়, ঠিক সেই সময়ে ওই পাতাটাও ঝরে পড়েছিল কোন এক নাম না জানা গাছের বড়সড় একটা ডাল থেকে।

- তারপর?

- তারপর ... সেই পাতাটা বাতাসের ধাক্কায় উড়ে এসে পড়ে একটা শান্ত পুকুরের জলে। পুকুরটা কিন্তু সাধারণ কোন পুকুর ছিলনা। সেটা ছিল রাজবাড়ীর দক্ষিণে গোলাপ বাগানের পাশের ছোট্ট পুকুর। পুকুরের এক পাশে শ্বেত পাথরের মূর্তি আর দশ ধাপ সিঁড়িতে সাজানো ঘাট, যেখানে রোজ বিকেল বেলা রাজকুমারী শকুন্তলা এসে বসতো।

- পাতাটা সেখানেই এসে পড়লো কেন?

- আমি কি জানি পাতাটা সেখানে এসে কেন পড়লো। মাঝে মাঝে বাতাসের বেগ কাকে কোথায় উড়িয়ে নিয়ে ফেলে কে জানে?

- আচ্ছা, তারপর কি হলো?

- তারপর পাতাটা সেই শান্ত পুকুরের জলে ভাসতে লাগলো। প্রতিদিন বিকেলে সে দেখতো অসম্ভব রূপবতী রাজকুমারী এসে সেই ঘাটে বসে পানিতে পা ডুবিয়ে খেলা করে। রাজকুমারী ছিল ভীষণ খেয়ালী ধরনের। কোনদিন সে আজলা ভরে পানি নিয়ে নিজের মুখ দেখতো আর গুনগুন করে গান গাইতো। কোনদিন দুহাতে জল ছিটিয়ে ভিজিয়ে ফেলত নিজেকেই। মাঝে মাঝে সে মুঠো ভর্তি গোলাপের পাপড়ি এনে ছড়িয়ে দিত পুকুরের জলে। মুগ্ধ হয়ে দেখতো জলের মাঝে রঙিন মাছের খেলা।

 

একদিন শুকনো সেই পাতাটা পুকুরের জলে ভাসতে ভাসতে চলে এলো শ্বেত পাথরে বাঁধানো ঘাটটার খুব কাছে। সেদিন সকাল থেকেই রাজকুমারীর ভীষণ মন খারাপ। সে তাই একটু আগে ভাগেই চলে এলো পুকুর ঘাটে। কিন্তু সেদিন কোন খেলাই ভাল লাগছিলনা তার। কিছুক্ষণ জলের দিকে চেয়ে থেকে সে দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলো। তার আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো তপ্ত অশ্রু। পাতাটার বুক ভেঙ্গে গেল সেই দৃশ্য দেখে। সে একটু এগিয়ে দিয়ে ঘাটের একেবারে কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার বুকে ধারণ করলো শকুন্তলার চোখের জল। সেই জলে শুকিয়ে আসা পাতাটা হয়ে উঠলো ঘন সবুজ। পাতাটার আর বুঝতে বাকি রইলোনা – সে ভালবেসে ফেলেছে রাজকুমারীকে।

 

এরপর থেকে প্রতিদিন পাতাটা ঘাটের কাছাকাছি ভেসে থাকতো। মাঝে মাঝে আলতো করে ছুঁয়ে দিতো রাজকুমারীকে। একদিন শকুন্তলাও খেয়াল করলো পাতাটাকে। সে আনমনেই পাতাটার ওপর ছড়িয়ে দিল কয়েকটি লাল টুকটুকে গোলাপ পাপড়ি। পাতাটা আনন্দে তিরতির করে কাঁপতে লাগলো। আর সেই আনন্দে পাতাটা হয়ে উঠলো স্নিগ্ধ লাল।

 

পরদিন রাজকুমারী এসে পাতাটাকে দেখে অবাক হয়ে গেল। সে দুহাতে তুলে নিলো পাতাটা জলের ওপর থেকে। তারপর আলতো করে নামিয়ে দিলো জলে। এরপর প্রতিদিনই রাজকুমারী এসে পাতাটার সাথে গল্প করতো, তার সাথে খেলতো। খুব আনন্দে কাটছিল তাদের সময়। কিন্তু একদিন পাশের রাজ্যের দানবেরা আক্রমণ করলো শকুন্তলার প্রাসাদ। রক্ষী সৈনিকেরা সব মরে গেল সেই ভয়ঙ্কর যুদ্ধে। রাজকুমারী কোন রকমে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিলো পুকুর ঘাটে। তারপর পাতাটাকে বললো – “আমি কোন ভাবেই কোন কুৎসিত দানবের হাতে পড়তে চাই না”। বলেই সে ঝাঁপিয়ে পড়লো পুকুরের জলে। দিশেহারা পাতাটা তার সমস্ত ইচ্ছে শক্তি একত্র করে প্রার্থনা করলো, আর হয়ে উঠলো অনেক বড়, তারপর আলিঙ্গন করলো শকুন্তলাকে।

 

প্রাসাদের শেষ প্রহরীকে হত্যা করে দানবদের রাজা যখন রাজকুমারীকে খুঁজতে খুঁজতে চলে এলো পুকুর ঘাটে, সে দেখলো বিশাল এক পদ্ম পাতার ওপর ফুটে আছে গোলাপি একটি ফুল। সেই ফুলের উজ্জ্বলতায় চিকমিক করছে পুকুরের শান্ত জল। কিন্তু দানব কি বুঝবে ফুলের মর্ম? রাজকুমারীকে না পেয়ে ফিরে গেল দানবটা। আর পরবর্তী হাজার বছর ধরে সেই সাধারণ পাতাটার বুকের ওপর স্নিগ্ধ ফুলটা আলো ছড়িয়ে গেল।

 

- মন ভাল হয়েছে? জিজ্ঞেস করলাম আমি। ছোট্ট করে সে বললো – হুম।

 

এসব গল্পের আসলে কোন শেষ নেই, শেষ হয়না কখনই। ভালবাসা তার নিজস্ব গতিতে চলতে থাকে। ছড়িয়ে পরে মানুষ থেকে মানুষে। পৃথিবীর সাতশ কোটি মানুষের মধ্যে একটা মাত্র মানুষ হয়ে ওঠে একান্ত আপন, খুব নিজের। তাকে ভেবে পেরিয়ে যায় ঘণ্টা দিন মাস। আনন্দে, বিরহে, অভিমানে, পূর্ণতায় কাটে দিনের পর দিন। বিনি সুতোর স্বপ্নে দুটি জীবনের মাঝে তৈরি হয় সেতু বন্ধন। ভালবাসা রংধনুর সাত রঙ্গে সাজিয়ে দেয় ধরণী।

 

আমার প্রতিটা রাত ভোর হয় ওকে ভেবে। আমার প্রতিটা কাজের শুরুতে থাকে সে, প্রতিটা কাজের শেষেও। আমার সবটুকু আনন্দ তাকে ঘিরে, আবার অনেক কষ্টও। সে একাধারে আমার বন্ধু, আমার সব চাইতে কাছের মানুষ, অনামা এক সম্পর্কের একক সাথী।

 

“ রাত জাগা ভেবে তোমাকে

স্বপ্ন ফিরে আসে দুচোখে

হারিয়ে কোনো চেনা আবেগে

পথ চলি মিশে তোমাতে

ভোরের আলোতে স্বপ্ন শেষে

কল্পনাতে রাখি তোমাকে

সারাদিন শত ব্যস্ত ভীরে

আছো তুমি ঘিরে আমাকে ... ”

 

সমাপ্ত ...

 

উৎসর্গ: ভীষণ আন-রোমান্টিক আর দুষ্টু সেই মেয়েটাকে। এই গল্পটা পড়ার পর থেকে যার আনন্দচ্ছটায় উজ্জ্বল হয়ে আছে পৃথিবী।-

Share