আত্মজ

লিখেছেন - জয় কবির | লেখাটি 777 বার দেখা হয়েছে

ছোট্ট কাপড়টার মধ্যে থেকে হাত পা ছুঁড়ে চিৎকার করছে বাচ্চাটা। ডাস্টবিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কুকুরটার চোয়াল থেকে নোংরা লালা গড়িয়ে পড়ছে জিভ বেয়ে। কাছেই টিনের চালে বসে থাকা কাক গুলো লোভী দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে। ওদের জন্য এটা এক খণ্ড মাংসপিণ্ড ছাড়া আর কিছুই নয়। সাহসী একটা কাক উড়ে এসে বসে বাচ্চাটার কাছে। ঘেউ ঘেউ করে এগিয়ে আসে কুকুরটা। সে তার খাবারের ভাগ কাউকেই দেবেনা। বাচ্চাটার চোখে মুখে ঘিনঘিনে বড় বড় মাছি বসে থাকে। ক্লান্ত শিশু ঘুমিয়ে গেছে ততক্ষণে।

 

শহরতলীর এই দিকটায় লোক জন তেমন একটা আসেনা। খুব ভোরে খেটে খাওয়া কিছু লোক কাজের সন্ধানে আসে শহরে। ওদের কেউ কেউ চলার পথে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে ঘুমন্ত বাচ্চাটাকে। এই শহর বড় বেশী নির্দয়। কে যেচে পড়ে ঝামেলা কাঁধে নিতে চায়? আর মানুষের বাচ্চা বলে কথা। গরু ছাগলের বাচ্চা, নিদেনপক্ষে কুকুরের বাচ্চা হলেও পেলে পুষে বড় করলে কিছু লাভ পাওয়ার আশা ছিল। সত্যিই তো, মানুষে কোন বিক্রয়মূল্য নেই।

 

বাচ্চাটার পাশে বসে থাকা কুকুরটা উঠে দাঁড়ায়। ক্ষুধার তাড়নায় জেগে গেছে বাচ্চাটা। তারস্বরে চিৎকার করছে আবারও। হয়তো ঠাণ্ডাও লাগছে তার। মাতৃগর্ভের ওম থেকে বেড়িয়ে সে পায়নি নরম কাঁথা আর মায়ের কোমল স্নেহের উষ্ণতা। তার অভিমান তীক্ষ্ণ চিৎকার হয়ে চীরে দিচ্ছে ভোরের পবিত্রতা। দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে প্রতিবাদ করছে ক্ষয়ে যাওয়া এই সমাজ ব্যবস্থার। যেখানে একজন মা তার সন্তানকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

 

"ওই সাদেক, বাচ্চা কই পাইলি?" - চা দোকানদার নশু চাচার প্রশ্নের কোন জবাব দেয়না সাদেক। বলে - "চাচা, একটু দুধ দেও তো। বাচ্চাডারে খাওয়াইমু"। "তর নিজেরই তো ঘরে খাওন নাই, বাচ্চা পালবি কেমনে?" - ছোট্ট চায়ের কাপ ভরে দুধ দেয় নশু। কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি দিয়ে তার দিকে দেখে সাদেক। বলে - "চাচা, কুকুরটারে খেদাও তো। তখন থিকা পিছ ছাড়তাছে না কিছুতেই"। এক হাতে চায়ের কাপ, অন্য হাতে তার ছেড়া চাদরে বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ঝুপড়ির দিকে হাটা দেয় সাদেক।

 

ঘরে কোন চামচ নেই। থাকার কথাও না। সাদেকের এই ঝুপড়ি ঘরে কুড়িয়ে পাওয়া কিছু কাপড় চোপড়, একটা ছেড়া কাঁথা, কয়েকটা কাগজের বাক্স তার দ্বীন হীনতার সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। এর মাঝেই কাপড় গুলো জড় করে বাচ্চাটাকে রাখে সাদেক। বাচ্চাটা বড় বড় করে শ্বাস নেবার চেষ্টা করছে। মুখ খোলা, কিন্তু কোন শব্দ বের হচ্ছেনা মুখ থেকে। হয়তো কান্নার শক্তিটুকুও ওর মধ্যে অবশিষ্ট নেই আর। ভীত চোখে এদিক ওদিক দেখে সাদেক। তারপর বেড়িয়ে গিয়ে প্লাস্টিকের ভাঙ্গা বোতলটা থেকে পানি নিয়ে ভাল করে কচলে হাত ধোয়। তারপর তর্জনী চায়ের কাপে চুবিয়ে আঙ্গুলটা ধরে বাচ্চাটার মুখের সামনে। দু ফোটা দুধ আঙ্গুল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে শিশুর ঠোটে। জিভ দিয়ে সেটুকু চেটে খায় বাচ্চাটা। সাদেক এবার দুধে চুবিয়ে তার আঙ্গুলটা দেয় বাচ্চাটার মুখে। চুক চুক শব্দ করে দুধ খায় বাচ্চাটা। অপার্থিব এক আনন্দে সাদেকের ভাঙ্গা ঘর উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তার ঘরের উঠোনে বসে থাকে সেই কুকুরটা।

 

আধ কাপ দুধ খেয়ে ঘুমিয়ে গেছে বাচ্চাটা। ছেড়া কাঁথায় তাকে বিছানা করে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় সাদেক। সকাল থেকে কিচ্ছু খাওয়া হয়নি। খিধেয় পেট চো চো করছে। গতরাতে কেনা মুড়ি আছে ঘরে। তাই নিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে সে। কুকুরটাকে দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে যায় তার। একটা ঢিল কুড়িয়ে নিয়ে কুকুরটাকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দেয় সে। কেঁউ কেঁউ শব্দ করে ওঠে কুকুরটা ব্যথায়। দৌড়ে উঠোনের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসে পড়ে আবারও। সাদেকের মনে হয় - কোন বদ উদ্দেশ্যে আসেনি কুকুরটা। বাচ্চাটাকে মেরে ফেলে অনেক আগেই ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারতো ক্ষুধার্ত কুকুর। তা না করে সযত্নে তাকে পাহারা দিয়েছে জানোয়ারটা। এখন সাদেকের পিছু পিছু এসেছে বাচ্চাটার টানেই। মায়া পড়ে গেছে বোধ হয়। বুক চীরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে সাদেকের।

 

তিন দিন পর কাজের খোঁজে বের হয় সাদেক। জমানো টাকা কয়টা এর মধ্যেই শেষ। আজ কাজ না পেলে ওকে আর বাচ্চাটাকে না খেয়ে থাকতে হবে। তার অবশ্য উপোষ দিয়ে অভ্যাস আছে, কিন্তু বাচ্চাটা কোন ভাবেই না খেয়ে থাকতে পারবে না। ঘরে আর কেউ নেই বাচ্চাটাকে দেখার। তাই কুকুরটার জিম্মায় ওকে রেখে কয়েক ঘণ্টার কাজের জন্য বের হয় সাদেক। এই কয়দিনে কুকুরটার সাথে বোঝা পড়া হয়ে গেছে ওর। সে জানে বাচ্চাটার গায়ে একটা মাছিও বসতে দেবেনা কুকুরটা। শহরে নতুন বলে ওকে কেউ রিক্সা দিতে চায়না এখানে। তবুও আজ মমিন মিয়ার গ্যারেজে একবার ঢু মারে সাদেক। যে করেই হোক, ওকে একটা কাজ যোগার করতেই হবে যে। নিজের জন্য নয়, বাচ্চাটার জন্য ওর কিছু টাকা দরকার।

 

---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

 

ভেজা বালিশটা উলটে দিয়ে পাশ ফিরে শোয় তন্বী। দুচোখে জলের ধারা থামেনা তার। সাতটা বছর কেটে গেছে, এখনও বাচ্চাটার কথা ভেবে প্রতি রাতে কাঁদে সে। এত দিনে কত বড় হয়ে যেত তার সন্তান। রাতের বেলা মা'কে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতো। ভোরে ঘুম থেকে উঠতে চাইতো না। নাস্তা খাওয়া নিয়ে না না বায়না ধরতো। স্কুলে যেত কাঁধে ব্যাগ আর পানির পট ঝুলিয়ে। প্রতিদিন স্কুল থেকে এসে চোখ বড় বড় করে গল্প শোনাতো মা'কে। নাহ ... তন্বী আর ভাবতে পারে না। তার বুক ফেটে যায় কষ্টে।

 

"এই রিক্সা, যাবে" - মাঝে মাঝেই উদ্দেশহীন ভাবে রিক্সায় করে ঘুরতে বের হয় তন্বী। নিজেকে ব্যস্ত রাখার না না কৌশলের মধ্যে এটাও একটা। অবশ্য এতে লাভ হয়না কিছুই। শুধু সময় কাটানোটাই সার। তার ফেলে আসা অতীত এক মুহূর্তের জন্যেও পিছু ছাড়েনা তার। কিছুতেই ভুলতে পারেনা আট বছর আগে করা সেই ভুলের কথা। যার অনিবার্য ফল স্বরূপ তন্বীর সন্তানের জন্ম, এরপর লোক লজ্জার ভয়ে হাসপাতাল থেকেই সেই সন্তানকে সরিয়ে দেয়া। ওকে অবশ্য বলে হয়েছিল যে ওর মৃত সন্তান হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালের নার্স কিছু টাকার বিনিময়ে ওকে আসল ঘটনা বলে দেয়। বলে দেয় যে, কোন এক এলাকায় সেই বাচ্চাটিকে রেখে আসা হয়েছিল, যদি কারও দয়া হয়, যদি কোন নিঃসন্তান দম্পতি তুলে নিয়ে যান বাচ্চাটাকে। যদিও এর পরের খবর কেউই জানেনা। তবুও ওর মনে ক্ষীণ আশা, হয়তো বেঁচে আছে ওর সন্তান। হয়তো ভাল আছে।

 

রিক্সা নিয়ে শহরের এপ্রান্ত ওপ্রান্ত ঘুরে বেড়ায় তন্বী। কয়েকঘন্টা পরে রিকশাওয়ালা যা চায়, তাই দিয়ে নেমে যায় কোন এক জায়গায়। আজও রিক্সায় বসে বসে অতীতের কথাই ভাবছিল সে। রিকশাওয়ালার ডাকে সচকিত হয় এবার - "আফা, আপনে ইট্টু বসেন। এইখানে আমার বাড়ী, আমি এক দৌড়ে পুলাডারে বই দুইডা দিয়া আহি" - বলে রাস্তার পাশে রিক্সা থামিয়ে দৌড় লাগায় রিকশাওয়ালা। তন্বী তাকিয়ে দেখে। ঝুপড়ী একটা ঘরের সামনে ফর্সা মতন একটা ছেলে খেলা করছে একটা বুড়ো কুকুরের সাথে। রিকশাওয়ালাকে দেখেই সে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে। অপরূপ একটা দৃশ্ব্য। দু'চোখ ভিজে ওঠে তন্বীর। বই দুটো পেয়ে খুশীতে লাফাতে থাকে ছেলেটা। তারপর কি নিয়ে যেন জেদ ধরে বাবার সাথে। ওর বাবা বার বার রিক্সার দিয়ে আঙ্গুল তুলে দেখায় আর কি যেন বলে। ওর ছেলেটা বেঁচে থাকলে এই রকম বড়ই হতো এখন। ছেলেটাকে সাথে করে ফিরে আসে রিকশাওয়ালা। তারপর মুখ কাচুমাচু করে বলে - "আফা, আইজকা পুলাডার জন্মদিন। তাই জেদ করতাছে আমার লগে ঘুরতে যাওনের। আমার আরও আগেই আওনের কথা আছিলো। এখন পুলায় আমারে ছাড়ে না। আপনে যদি কিছু মনে না লইন, তাইলে অরে আমি হ্যান্ডেলের উপর বসাইয়া লইয়া লই?" কিছুটা বিরক্ত মুখেই সায় দেয় তন্বী। রিক্সা চলতে শুরু করে।

 

গতকাল ছিল তন্বীর সন্তান জন্মের দিন। ওর বাচ্চাটা থাকলে আজকে হয়তো এভাবে বাইরে যাবার আবদার করতো। ওর জন্য জন্মদিনের কেক আনতে হতো, বাসায় পার্টি হতো। কত কত লোকজন আসতো। অনেক গিফট পেতো বাচ্চাটা। কেক কেটে মজা করে খেতো আর কত আনন্দ করতো। বুকটা ব্যাথায় মুচড়ে ওঠে ওর। কষ্ট লুকাতে অন্য কিছু ভাবতে চেষ্টা করে সে। কিছুক্ষণ পর বাজারের মত একটা জায়গায় রিক্সা থামিয়ে পাশের দোকান থেকে ছোট একটা শার্ট কেনে তন্বী। ফিরে এসে রিক্সাওয়ালাকে বলে - "এই, তোমার নাম যেন কি?" অবাক হয়ে রিক্সাওয়ালা উত্তর দেয় - "আমার নাম সাদেক, ক্যান আফা, কোন অন্যায় হইছে?"। "না না, সাদেক, এই শার্টটা তোমার ছেলেটার জন্য এনেছি। ওর জন্মদিনের উপহার। আমারও একটা বাচ্চা ছিল, প্রায় ওর সমানই হতো এখন। এই নাও" - বলে প্যাকেটটা বাড়িয়ে দেয় সাদেকের দিকে। সাদেক প্যাকেট খুলে শার্টটা বাচ্চাটার হাতে দেয়, সে সাথে সাথেই পড়ে ফেলে নতুন শার্ট। তারপর কি মনে করে তন্বীর পা ছুঁয়ে সালাম করে ফেলে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেছে ছেলেটা, দেখেই বোঝা যায়। এই শহরে ভাল মানুষের দেখা এখনও পাওয়া যায়। সাদেক কিছুই বলতে পারেনা। ওর দৃষ্টিতে কৃতজ্ঞতা।

 

কিছুক্ষণ পর রিক্সা থেকে নেমে যায় তন্বী। সাদেক নামের রিক্সাওয়ালা আর তার ছেলেটা হারিয়ে যায় শহরের রাস্তায়, মিশে যায় জনারন্যে। জীবন থেমে থাকেনা কখনই, জীবন চলে তার নিজস্ব গতিতে।

 

সমাপ্ত ...

 

Share