পাক স্যরজমিন বাদ

লিখেছেন - জয় কবির | লেখাটি 688 বার দেখা হয়েছে

ছোটবেলায় আমি অনেক ছোট ছিলাম। অনেক কিছুই বুঝতামনা। মাথার হার্ড ডিস্কটা ফাঁকা ছিল, র‍্যাম কম ছিল, কিন্তু প্রসেসর স্পীড ভাল ছিল। তাই অনেক কিছু সহজে ক্যাচ করতে পারতাম। আবার অনেক কিছু পারতাম না। যেমন -

 

আমি তখন ঢাকা মেট্রোপলিটান স্কুলের ছাত্র। সবে মাত্র ভর্তি হয়েছি স্কুলটাতে। খুব সম্ভব বাসাবো অথবা মুগদাপাড়া এলাকায় ছিল স্কুলটা। সেখানে আমার অ আ ই ঈ শেখা আরম্ভ। সাথে ا ب ت ث শেখাটাও বাধ্যতামূলক ছিল।

একদিন ক্লাশের শেষে দুজন পাঞ্জাবী পায়জামা টুপি পড়া, দাড়ীওয়ালা যুবকের দেখা পাই। উনারা কোরআন ও হাদিস সম্বন্ধে কিছুক্ষন আলোচনা করলেন। কি কি বলেছিলেন মনে নেই। কিন্তু আলোচনার পর সবাইকে কিছু ইসলামী ছাত্র শিবিরের বই, একটা শিবিরের মনোগ্রাম লাগানো ব্যাজ আর পাকিস্তানের চানতারা খচিত পতাকা উপহার দিলেন। আমি তো মহা খুশী। ব্যাজটা বুকে লাগিয়ে হাতে ছোট্ট পতাকাটা দুলাতে দুলাতে বাসায় এলাম। আব্বু তখন দুপুরে বাসায় খেতে আসতেন। আমি লাফাতে লাফাতে আব্বুর সামনে গেলাম ব্যাজ আর পতাকাটা দেখাতে। আব্বু কিছু না বলে আমার হাত থেকে পতাকাটা কেড়ে নিয়ে ছিড়ে ফেলে দিলেন আর আমাকে দিলেন একটা রাম থাপ্পর। আমি কান্না করতে করতে আম্মুর কোলে গিয়ে উঠলাম। সেদিন বিকেলে আব্বু গাড়ী পাঠিয়ে দিলেন, আমি, ছোট বোনটা আর আম্মু শিশু পার্কে ঘুরতে গেলাম। আম্মু আমাকে কয়েকটা খেলনা কিনে দিলেন। এর এক সপ্তাহ পরেই আমি মুনলাইট কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি হলাম। তখন থেকেই একটা জিনিস মাথার মধ্যে ঢুকে গেল যে - পাকিস্তানের পতাকা হাতে নেয়া যাবেনা, শিবির নামের একটা কিছু থেকে দূরে থাকতে হবে - না হলে বাসায় গিয়ে মার অবধারিত।

 

 

অনেকদিন পর যখন মাথার র‍্যাম বাড়লো, তখন বুঝতে পারলাম, আমার মুক্তিযোদ্ধা পিতা ছেলের হাতে পাকিস্তানের পতাকা আর বুকে শিবিরের ব্যাজ দেখে সহ্য করতে না পেরে চড় দিয়ে বসেছিলেন । পরে অনুশোচনায় আমাকে খেলনা কিনে দিতে ও শিশু পার্কে নিয়ে যেতে বলেছিলেন । কিন্তু যে শিক্ষাটা উনি দিতে চেয়েছিলেন, আমি তা গ্রহণ করেছিলাম ভাল ভাবেই । সেই বয়সে আমাকে ব্যাখ্যা করে বোঝানোটা প্রাক্তন যোগাযোগ মন্ত্রী আবুল হোসেনকে ঘুষ গ্রহণের অপকারিতার পাঠ দেবার মতই নিরর্থক হতো।

 

এরপর কেটে গেছে কয়েক শত বসন্ত। সিডনীতে আসার কিছুদিন পর শুনলাম আষ্ট্রেলিয়ার কোথায় যেন দুজন পাকিস্তানী ভাই একটা মেয়েকে তুলে নিয়ে দিয়ে সাতদিন আটকে রেখে রেপ করেছ। যথারিতি ধরাও পড়েছে। এখানকার ইসলামী আমির, খুব সম্ভব আরব কোন রাষ্ট্রের লোক, সেই দুই ভাইকে বাঁচানোর জন্য বাণী দিলেন যে পাকিস্তানে রেপ করাটা খুব সাধারন ব্যাপার। ওখানে সবাই সবাইকে রেপ করে, কেউ কিছু মনে করেনা। চমৎকার তথ্য, কি বলেন?

 

স্বভাবতই জারজের জাত পাকিস্তানীদের এড়িয়ে চলি। এখানে আসার পর পড়াশুনার পাশাপাশি সপ্তাহে বিশ ঘন্টা কাজ করার অনুমতি পাই। কিন্তু এই পরিমান কাজ করে টিউশন ফি তোলার মত টাকা যোগার হয় না। মাস ছয়েক ক্লাস করার পর এক মাসের একটা ভ্যাকেশন পাই। ভ্যাকেশনের সময় আনলিমিটেড কাজ করা যায়, বিশ ঘন্টার রেষ্ট্রিকশন থাকেনা। কাজেই কাজ খুজতে লাগলাম। পেয়েও গেলাম এক পাকিস্তানীর রেস্টুরেন্টে। থালা বাসন ধোবার কাজ। মালিক খুব ভাল। সালাম দিয়ে মোসাহাবা করে ভেতরে নিয়ে কাজ বুঝিয়ে দিলেন। মনের ভেতর একটা অস্বস্তি কাজ করে, আবার টিউশন ফি\'র বিশাল অঙ্কটার কথা মনে করে পিছিয়ে আসতেও মন সায় দেয় না। অফারটা ভাল ছিল, নগদে (এখানে দু ধরনের কাজ পাওয়া যায়, একটা ট্যাক্স পে করে লিগাল ওয়েতে, আরেকটা ইল্লিগাল ওয়েতে ট্যাক্স না দিয়ে নগদ টাকা হাতে দিয়ে) নিলে দশ ডলার, ট্যাক্সে নিলে ষোল ডলার প্রতি ঘন্টায়। কাজ দৈনিক আট থেকে দশ ঘন্টা, সপ্তাহে ছয় দিন। ছুটি ফুরিয়ে গেলেও কাজ থাকবে। বিশ ঘন্টা কাজের টাকা ট্যাক্সে বাকিটা নগদে দেবে। কাজেই নিয়ে নিলাম কাজটা।

 

খুব সকালে উঠে কাজে যাই, বিকেলে বাসায় ফিরি। রাতে আবার আরেকটা কাজ করি। এত হাটাহাটি করতে হয় রেষ্টুরেন্টে, পায়ের তলা আগুনে পড়ে যাবার মত জ্বলতে থাকে এক এক দিন। মনে মনে \"মা ... মাগো\" বলে চিৎকার করি, তবুও কাজ থামাই না। মালিকের গুড বুকে নাম উঠে গেলে কাজের শিফট পেতে সমস্যা হবে না। আস্তে আস্তে সয়ে গেল পায়ের জ্বলুনী। দেশে ফোন করে বলি - খুব আরামের কাজ, সারাদিন শুধু খাই আর খাই। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্য। মালিকের সাথে কথা ছিল এক মাস পর সে আমার টিউশন ফি\'র টাকাটা তার ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দিয়ে দেবে অনলাইনে, আর বাকি টাকা আমার একাউন্টে পাঠিয়ে দেবে। কাজেই মাস শেষ হয়ে যাবার আগেই তার কাছে ধরণা দিলাম। সে বললো - কোন সমস্যা নেই। অমুক তারিখে এসে আমার কলেজের ডিটেইলস দিয়ে দিলেই সে টাকা পে করে দেবে। যথারিতি গেলাম সেই দিন। পাকি শুওরটা আমাকে তখন বলে যেহেতু আমার একটা ট্যাক্সের জব আছে (রাতের জবটা), কাজেই সে আমাকে ট্যাক্সে পে করতে পারবেনা। নগদে দেবে। কিন্তু সপ্তাহে কমপক্ষে পঞ্চাশ ঘন্টা কাজ করার পরেও সে আমাকে বিশ ঘন্টার বেশী পে দিতে পারবেনা। একটু তর্কাতর্কি করার পরে ভয় দেখালো যে - যেহেতু তার কাছে আমার সব কাগজ আছে, সে কাগজপত্রে দেখাবে আমি ছুটির আগে বিশ ঘন্টার বেশী কাজ করেছি, এবং সে এই খবর ইমিগ্রেশনে জানিয়ে দেবে। তখন নিয়ম ভাঙ্গার অপরাধে আমাকে দেশে ফিরে যেতে হবে। এমন ঘটনায় ইমিগ্রেশন খুব দ্রুত আর কঠোর ব্যবস্থা নেয়। এর পর শুওরটা আমাকে ৭২০ ডলার হাতে দিয়ে বলে আরও কিছু টাকা সে আমার একাউন্টে পাঠাবে। আমার কোন উপায় ছিলনা। কাজেই যা নগদে পাই তাই নিয়ে চলে আসি। যদিও আমার কমপক্ষে তিন হাজার ডলার পাবার কথা, আমি একাউন্টে আর কোন টাকাই পাইনি। এর কিছুদিন পরে সেই রেষ্টুরেন্টটা বন্ধ করে দিয়ে মালিক হাওয়া হয়ে যায়। সেদিন মনে পড়ে যায় আব্বুর হাতের চড়টার কথা।

 

এই ন্যাড়ার মাথায় বেল পড়ার পরেও ন্যাড়া আবারও কাকতালীয় ভাবে বেল তলায় চলে আসে। বিশ পঁচিশ ঘন্টা কাজ করে কোন ভাবেই চলা সম্ভব নয় বিধায় সবাই মোটামুটি নগদে এক্সট্রা কাজ করে, আমিও করতাম। তখন বড় একটা ব্যাঙ্কের ম্যানেজমেন্ট সুপারভাইজারের কাজ করি। বত্রিশ তলা বিল্ডিং, লাঞ্চ রুমের নষ্ট টিভি ফ্রিজ ওয়াশিং মেশিন, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফটোকপিয়ার নষ্ট হলে সেই যন্ত্রের কারিগরের সাথে যোগাযোগ করে সারিয়ে তোলা অথবা রিপ্লেস করাই আমার কাজ। সেটাও ছিল নগদে। ওরলান্দো নামের এক সাউথ আমেরিকান আমার বস ছিল। টাকা নিয়ে কখনই ঝামেলা করতো না। আমি জানতাম প্রতি দুসপ্তাহ পর পর আমার টাকা একাউন্টে চলে যাবে। কি একটা গন্ডোগোলে তার চাকুরী চলে যায়, তার যায়গায় আসে মাইকেল খান নামে এক পাকিস্তানী। সে এসেই পুরানো সব স্টাফ ছাড়াই করে নিজের লোক ঢুকিয়ে দেয়। শুধু আমাকে সরাতে পারেনি, কারণ আমাকে সরালে তার ওই বিল্ডিংয়ে কন্ট্রাক্টটাই চলে যাবে বলে সাফ জানিয়ে দেন ওপরওয়ালারা। কিন্তু আমি তো ঘর পোড়া গরু, হন্যে হয়ে নতুন কাজ খুজি। পাকিস্তানীর সাথে কাজ আর নয়। এক সময় পুরোনো বস আমাকে আরেকটা কাজ অফার করেন, সারা রাত জেগে করতে হবে। পাকিস্তানীর হাত থেকে বাঁচা যাবে ভেবে সেই কাজটাও নিয়ে নেই। চলে যাবার সময় এক সপ্তাহের বেতন আটশ ডলার বাকি থাকে, পেমেন্ট পরের সপ্তাহে হবে বলে পিছলে যেতে চায় এই শুওরটাও। আমি ওকে ছাই দিয়ে ধরে পাঁচশ টাকা তখনই তুলে নেই। বাকি টাকা কোনদিনও পাইনি। এরপর কিছুদিন সে ফোন ধরতো না। পরে ওই নম্বরটাই বন্ধ করে দেয়।

 

লেটেস্ট ঘটনাটা আমার ফেসবুক বন্ধুরা অনেকে জানেন। এক পাকি জানোয়ার সিকিউরিটি গার্ড ষোলই ডিসেম্বর অন্য গার্ডদের (ওরা সবাই লেবানীজ) বুঝিয়েছে যে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ওরা বাংলাদেশকে ত্যাজ্য দেশ ঘোষনা করছিল। ইন্ডিয়ার প্ররোচনায় আমরা হিন্দু হয়ে গেছিলাম, মসজিদে মূর্তি রেখে পূজা করতাম, কাজেই আমাদের তারা ত্যাগ করছে। এদিকে ইন্ডিয়াও আমাদের নেয় নাই, কাজেই আমরা এখন জারজ সন্তানের মত একবার এদিক একবার ওদিন দৌড়াই। আমাদের দেশ রসাতলে গেছে। আমার অফিস রুমের জানালায় সেদিন সারাদিন লাল সবুজ পতাকাটা লাগানো ছিল, এটাই জানোয়ারটার গায়ে জ্বালা ধরিয়েছে। আমি ওদের (শুওরটা তখন ডিউটিতে ছিলনা) উইকি আর কয়েকটা লিঙ্ক দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছি ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সালে কি কি হয়েছিল।

 

আমার ফেসবুকে এই স্ট্যাটাসে আমার বড় আপু জানা আপুর কমেন্টটা দিয়ে শেষ করি -

 

এরা জন্মগতভাবে এবং জাতিগতভাবে অবিশ্বাসী, বিশ্বাসঘাতক এবং চরম মিথ্যাবাদী। এদের জনসমক্ষে জুতোপেটা করা উচিত। এদের বিশেষভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে সত্যিকারের ইতিহাসটা সবাইকে জানানো দরকার। আমাদের একাত্তর, আমাদের বিজয়, আমাদের স্বাধীনতা ওদের চৌষট্টি পুরুষের মস্তিষ্কে স্থায়ী ঘা তৈরী করে দিয়েছে। সেই যন্ত্রণা কি এত সহজেই যায়! ওরা যুগ যুগ ধরে ক্ষেপা কুকুরের মতই আচরণ করে মরবে।

 

Share