আমার প্রেমিকারা - ২য় পর্ব

লিখেছেন - জয় কবির | লেখাটি 858 বার দেখা হয়েছে

বগুড়া আসিবার পর আমি বগুড়া জিলা স্কুলে ভর্তি হইলাম। আমাদের গ্রামের বাড়ী রংপুরে হওয়ায় প্রায়শই গ্রামের বাড়ী যাওয়া হইতে লাগিল। সেই সুবাদে কাঁকনের সাথে মাঝে মাঝেই দেখা হইতো। কাঁকন আমার চাচাতো বোন। বাড়ীতে যাইয়াই আমরা বড় চাচার হেলিকপ্টারে (স্যালো ইঞ্জিনের তৈরি ছোট ট্রাক্টর বিশেষ) করিয়া সকাল বেলাতেই শহরের বাসা হইতে গ্রামে চলিয়া যাইতাম, সারাদিন সেইখানে খেলাধুলা করিয়া সন্ধ্যায় ফিরিতাম। মাঝে মাঝে কাঁকনও আমাদের সহিত শহরে চলিয়া আসিত। যদিও সে আমার ছোট বোনের সহিত বেশী খেলিত, তথাপি উহার সাথে ক্রমেই আমার সখ্যতা বৃদ্ধি পাইতে লাগিল।

 

একদা এক রাত্রিতে আমরা সকলে বিছানায় বসিয়া টিভিতে হিন্দি মুভি অবলোকন করিতেছিলাম। পাশাপাশি বসিয়াছিলাম আমি, আমার বোন ও কাঁকন। আমি মাঝে মাঝেই আমার দক্ষিণ হস্ত পেছনে রাখা বালিশের উপর রাখিতেছিলাম। এক্ষণে হঠাৎ আমার হস্তের উপর কোমল আরেকখানি হস্তের পরশে শিহরিত ও বিব্রত হইলাম, কাঁকনও দ্রুত হাত টানিয়া লইল, কিন্তু কেহ কিছুই বলিলাম না। কিছুকাল পরে আবারও আমি উক্ত স্থানে পুনরায় হাত রাখিলাম, মন তখন মোটেও হিন্দি ফিল্মের ঢিসুম ঢিসুমের প্রতি মনযোগী হইতে পারিতেছিলনা। মুহূর্তকাল পরে আবার আমার হস্তের উপর কোমল হস্তটির উপস্থিতি আমাকে শিহরিত করিল, কিন্তু এইবার আমি আর হাত সরাইয়া নিলাম না। সুকোমল হাতটিও জায়গা বদল করিল না বরং সকলের অজান্তে উহার হস্তটি আমার হস্তের কোমলতা অথবা কাঠিন্য পরীক্ষা করিতে লাগিল  এই অবস্থায় কখন যেন ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম খিয়াল রাখিতে পারি নাই।

পরদিন সকালে উঠিয়া দেখিলাম কাঁকন তাহার বাড়ীতে চলিয়া গিয়াছে, সাথে আমার ভগ্নীটিকেও লইয়া গিয়াছে। আমার আর সেইদিন উহাদের বাড়ীতে যাওয়া হইয়া উঠিল না, যদিও আমার মন সমস্ত দিন উহার কাছেই পড়িয়া ছিল।  কেমন যেন লজ্জা লজ্জাও লাগিতেছিল, মনে হইতেছিল আমাদের ছোঁয়াছুঁয়ি খেলার কথা যেন সকলে জানিয়া গিয়াছে এবং সকলে কেমন সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকাইতেছে, অথচ ঘটনা তখনও কেউ জানেনা। সন্ধ্যার কিছুকাল পূর্বে আমার ভগ্নী ফিরিয়া আসিলো এবং আমাকে খুঁজিতে লাগিল। কিন্তু আমি পাশের বাসায় থাকাতে আমার আসিতে সামান্য দেরী হইয়া গেল, এই সময়ের মধ্যে আমার অতিশয় অসহিষ্ণু ভগ্নী কাঁকনের দেওয়া একখানা প্রেমপত্র ও গুলাপ পুষ্প আমার মাতৃদেবীর হস্তে সমর্পণ করিল। পত্রখানিতে তেমন কিছুই লেখা ছিল না, শুধু অত্যন্ত দুর্বোধ্য বাংলা হস্তাক্ষরে লিখা ছিল - "আমি তোমাকে ভালবাসি" - যাহার পাঠোদ্ধার করিতে আমার মাতৃদেবীর মুহূর্তকাল সময় ব্যয় হইয়াছিল। ততক্ষণে আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়া চরম লজ্জা শরমের মধ্যে পড়িয়া গেলাম, কারণ তখন সকলে এই বিষয় লইয়া তীব্র হাসাহাসিতে ব্যস্ত ছিল। 

 

পরদিন খুব ভোরে উঠিয়া আমরা বগুড়া চলিয়া আসিলাম, আমার প্রেমের ফুল অঙ্কুরেই বিনাশ হইল।  আমি উহাকে ভালবাসা জানাইবার কোন অবকাশটুকুও পাই নাই। মাসাধিককাল পরে যখন পুনরায় বাড়ীতে গমন করিলাম তখন জানিতে পারিলাম কাঁকন ততদিনে তাহাদের বাড়িতে অবস্থানরত জায়গীর মাষ্টারের প্রেমে পড়িয়া গিয়াছে। 

 

এরপর কাঁকনের সহিত কোনকালেই আমার সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়িয়া উঠে নাই। বরাবর আমি তাহা হইতে অথবা সে আমা হইতে লুকাইয়া পলাইয়া নিজেকে ছুপাইয়া চলিতাম। শেষবার উহাকে দেখিয়াছিলাম আমার ছোট চাচার বিবাহের দিনে, যখন সে নিভৃতে এক নির্জন কোণে আমাকে একেলা পাইয়া (আবারও) আমার হাতখানি ধরিয়া ক্ষমা চাহিয়া লইয়াছিল যদি আমার মনে কোন কষ্ট থাকে - তাহা ভাবিয়া। আমি তাহাকে বলিতে পারিনাই যে আমিও ততদিনে লোপার প্রেমে হাবুডুবু খাইয়া খাইয়া ডুবিতেছি আর ভাসিতেছি। 

 

লোপা পর্ব -

 

শিশুকালের কিছু কিছু ঘটনা হৃদয়ে গাঁথিয়া যায়, যাহার কথা মানুষ কখনই ভুলিতে পারেনা এবং ঐ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কোনভাবে একই রূপ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিলে মানুষ উদ্ভট আচরণ করে। উহাকে নানারূপ ফোবিয়ার সহিত তুলনা করা যায়। যেমন ছোটবেলায় অনেককে তেলাপোকা অথবা টিকটিকি কামড়াইয়া দিবে বলিয়া ভয় দেখাইলে সেই ভয় মানুষ সারা জীবনেও ভুলিতে পারেনা। যদিও সে বড় হইবার পরে বুঝিতে পারে যে তেলাপোকা অথবা টিকটিকি বাঘ ভাল্লুক নহে, তথাপি সে আপন মন হইতে ভয়টা দূর করিতে পারেনা। লোপা - মতান্তরে লুপা তেমনি আমার একটি ফোবিয়া, লোপা নামের মেয়ে দেখিলে আমি এখনও পর্যন্ত তার ছায়া মাড়াইতেও সাহস করিনা, কাছে যাওয়া তো দুরের কথা। এক্ষণে কেমন করিয়া সে আমার প্রেমে পড়িয়াছিল এবং আমার জীবন সংশয় ঘটাইয়াছিল, সেই গল্প বলি ...

 

বগুড়ার জলেশ্বরীতলাস্থ আমাদের বাসার নিচেই ছিল এলজিইডি কোয়াটার ও গ্যারেজ। ভাঙ্গাচুরা বেশ কিছু গাড়ী ছিল সেইখানে। সর্পের ভীতি তুচ্ছ করিয়া আমরা - মানে আমি, সীমা, লোপা, ইমন, দোলা, কাশ্মীর, রাজন, সোমা আরও কিছু পুলাপাইন সেই ভাঙ্গা জরাজীর্ণ গাড়ীগুলিতে বসিয়া ভুম... ভুম... শব্দ করিয়া নিজেদেরকে ভবিষ্যতের খ্যাতনামা ট্রাক ড্রাইভার এবং হেল্পার ভাবিয়া খেলা করিতাম। আমাদের মধ্যে লোপা ছিল বেশ খানিকটা খ্যাপাটে টাইপের। উহার যখন যা মনে হইত, সে তাহাই করিত বলিয়া যে জনশ্রুতি আছে, তাহা সর্বাংশে সত্য। প্রত্যহ উহার সহিত কাহারও না কাহারও বিবাদ লাগিয়াই থাকিত। একদা এইরূপে খেলিতে গিয়া সে ঘোষণা দিয়া বসিল যে অদ্য আমরা সংসার সংসার খেলবো আর সে আমার বউ হইবে।  আমি এমনিতেই উহাকে যথেষ্ট ভয় পাইতাম, উহার অবাধ্য কোনদিনও হই নাই। কিন্তু বউ হিসাবে উহার চাইতে আমার সোমাকেই বেশী পছন্দ ছিল, সেই কথা বলিবার মত সৎ সাহস আমার হয় নাই। কাজেই আমি একান্ত বাধ্যগত জামাই হইয়া উহার মাটিতে গন্ডীকাটা ঘরে চুপটি করিয়া বসিয়া থাকিতাম, সে বাজার সদাই করিয়া, রান্না করিয়া আমাকে খাওয়াইয়া ঘুম পাড়াইয়া দিত। 

 

এমনি ভাবে চলিতে চলিতে কিছুদিন পর অন্য মেয়েদেরও ইচ্ছা হইলো আমার মত চরম বাধ্যগত, ভাজা মাছটি উল্টাইয়া খাইতে জানেনা টাইপের স্বামী পাইবার জন্য, কিন্তু লোপা আমাকে ছাড়িতে নারাজ।  আমারও মনে মনে ইচ্ছা একখানি নতুন স্ত্রী গ্রহণ করিবার, কিন্তু মুখ ফুটিয়া বলিবার সাহস হয়না। অন্যদিকে আমার স্ত্রী আমার উপর কুদৃষ্টি নিক্ষেপকারিনীদিগকে ঢিসুম ঢিসুম দিয়া উপযুক্ত শিক্ষা প্রদান করিয়া চলিয়াছিলেন। কিন্তু সে একা রমণী, কতই আর শত্রু রাজ্যের আক্রমণ প্রতিহত করিবে, কাজেই মাঝে মাঝে সে নিজেই আক্রান্ত হইয়া - রণে ভঙ্গ দিয়া - মা মা বলিয়া চিৎকার করিতে করিতে বাড়ী অভিমুখে যাত্রা করিতে লাগিল। ফলে আমাদের সংসারের কথা গোটা কোয়ার্টারে ছড়াইয়া পড়িল। 

 

উহার ছোট্ট কিন্তু উর্বর মস্তিষ্কে একদা ধরা পড়িল যে এমন করিয়া সে আমাকে রক্ষা করিতে পারিবেনা। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অধিকারিনীগণ যে কোন সময় আমাকে ছিনাইয়া লইয়া যাইবে। কাজেই সে তাহার ফুল প্রুফ নীল নকশা করিয়া ফেলিল - কিভাবে সে আমাকে রক্ষা করিবে। সে মত লোপা একদা ছুটির দিনে সকালে আমাকে উহাদের গৃহপরিচারিকা দ্বারা ডাকিয়া পাঠাইল। আমি সানন্দে নাচিতে নাচিতে আমাদের চারণভূমিতে গিয়া উপস্থিত হইলাম। লোপা সে ক্ষণে আমার সহিত খুবই ভাল ব্যবহার করিতে লাগিল দেখিয়া কিঞ্চিৎ সন্দেহ হইয়াছিল, কিন্তু আমি চিরকাল ভালবাসার কাঙ্গাল, খাদ্য আর ভালবাসাই আমার দুর্বলতা  - দ্রুতই সেই সন্দেহ কাটাইয়া উঠিলাম। আমরা সেই সময় হাঁটিতে হাঁটিতে গ্যারেজের দূর প্রান্তে উপনীত হইলাম, যেইখানে সহসা কেহ যাইতোনা, এবং পূর্বে সর্প দংশনে এক বালকের মৃত্যুর ইতিহাস থাকায় সবাই উক্ত এলাকাটি এড়াইয়া চলিত। সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া লোপা আমাকে একটি জরাজীর্ণ ট্রাকের ড্রাইভিং সীটে  বসিতে বলিল এবং তাহার জন্য কাজ করিয়া অর্থ সংগ্রহ করিয়া আনিতে বলিল। আমার চোখে মুখে ভয়ের ছাপ আর ইতস্তত ভাব দেখিয়া লোপা কহিল - "তুমি কি ভয় পাচ্ছ?" আমি পুরুষ মানুষ, জান দিব, তবুও মান দিবোনা। কাজেই অতি কষ্টে হাঁচড়াইয়া পাঁচড়াইয়া উক্ত ট্রাকের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িলাম। ট্রাকের সীটে বসিয়া স্টিয়ারিং হাতে লইয়া আমার পৌরুষ দ্বিধায় পড়িয়া গেল, ভয় আমাকে আচ্ছন্ন করিতে লাগিল, কাজেই আমি ট্রাক হইতে নামিয়া আসিবার জন্য ব্যস্ত হইলাম, কিন্তু কোন ভাবেই আর বাহির হইতে পারিতেছিলাম না। এক পর্যায়ে আমি কান্নাকাটি ও চিৎকার শুরু করিলাম কিন্তু লোপার মধ্যে কোন ভাবান্তর দেখিলামনা। সে একটু দূরে বসিয়া মাটিতে আঁকিবুঁকি কাটিয়া আপন মনে খেলিতেছিল। আমি উহাকে বলিলাম বাসা হইতে কাহাকেও ডাকিয়া আনিতে যাতে আমাকে উদ্ধার করিতে পারে, কিন্তু সে যাহা বলিল তাহা শুনিয়া আমার কান্না থামিয়া গেল, রক্ত হিম হইয়া গেল। সে বলিল যে সে আমাকে ইচ্ছা করিয়া এইস্থানে আনয়ন করিয়াছে, এবং সর্প দংশনে আমার মৃত্যুর অপেক্ষা করিতেছে। আমার মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত সে এস্থান ত্যাগ করিবেনা। তাহার প্রিয়তম স্বামী অন্য কাহাকেও স্ত্রী রূপে গ্রহণ করিবে তাহা যেন উহাকে দেখিতে না হয়, তাই সে এই বুদ্ধি রাত জাগিয়া না না ভাবে চিন্তা করিয়া বাহির করিয়াছে।

 

সকাল ১১টা হইতে দুপুর ২টা গড়াইয়া গেলেও আমাকে সর্প দংশন করিলনা দেখিয়া সে একদা বিরক্ত ও ক্ষুধার্ত হইয়া আমাকে একা রাখিয়া বাড়িতে চলিয়া গেল। এদিকে আমাকে খুঁজিয়া না পাইয়া সবাই চিন্তিত হইয়া উহাকে জিজ্ঞাসা করিলেও সে বলিয়াছিল যে সে জানেনা আমি কোথায়। এইদিকে ভয় ও ক্ষুধায় আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত, বুঝিতে পারিতেছিলাম অন্ধকার নামিয়া আসিলে আমি সর্প দংশনে না হউক, ভয়ের কারণেই মৃত্যুবরণ করিব। মনে মনে আমি যাবতীয় সুরা পড়িতে আরম্ভ করিয়াছিলাম ও সবার কাছে মনে মনে মাফ চাহিয়া লইয়াছিলাম।

 

পরে অবশ্য বিকেলের দিকে গ্যারেজ এলাকায় চিরুনী অভিযান চালাইয়া আমাকে উদ্ধার করা হয়। লোপাকে এই ঘটনার পর আমাদের সাথে আর খেলতে দেওয়া হয় নাই। 

 

চম্পা পর্ব -

 

লোপার হাতে পৈত্রিক জান খানি খোয়াইতে নিয়া যে ধাক্কা আমি খাইয়াছিলাম, উহা সামলাইয়া উঠিতে সময় লাগিয়াছিল অনেক। মূলত ওই সময় হইতেই আমি কন্যা প্রজাতিকে ভয় পাইতে আরম্ভ করি। বুঝিতে পারি উহারা হাসি মুখে মানব হত্যা করিতে পারে, যদিও পরে উহাদের ধারালো নখর ও সুতীক্ষ্ণ তরবারির ন্যায় ধারালো জিহ্বা - যাহা কলিজার একপ্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত চক্ষের নিমিষে ফালা ফালা করিয়া দিতে পারে - উহার সন্ধান পাইয়াছিলাম। 

যাহা হোক, বগুড়া হইতে পলায়ন করিয়া আমি পিতামাতার সহিত নাচিতে নাচিতে ঢাকা শহরে পুনরাগমন করিয়া আপন বাড়ী হইতে ভাড়াটিয়া খেদাইয়া দিয়া কল্যাণপুরে স্থায়ী হইলাম। কিন্তু কন্যা প্রজাতির উপর প্রবল ভয় আমাকে উহাদের ত্রিসীমানায় গমন করা হইতে বিরত রাখিয়াছিল। কিন্তু ওষ্ঠের উপরিভাগে সদ্য জন্ম লওয়া গুম্ফরাশীতে আয়নার সামনে দাঁড়াইয়া তা' দিতে দিতে মাঝে মাঝে বক্ষপিঞ্জরের অন্তঃস্থলে একাকীত্বের হু হু বাতাসের শব্দ শুনিতে পাইতাম আর মনে মনে একটি সুকোমল লাবণ্য মাখা মুখের সুখ চিন্তায় নিজেকে বিলীন করিতাম। কিন্তু এলাকার হার্টথ্রুব লিপি এবং শিল্পীর বাসার ছাদে দাঁড়াইয়া ঘুড়ি উড়াইতে গিয়া কখনই মুখ ফুটিয়া বলিতে পারিনাই যে তোমাদের দুই ভগ্নীকেই আমার অতিশয় পছন্দ। যদিও তাহাদের দুইজনের পাঠানো নানাবিধ উপহার সামগ্রী এবং চোখের ভাষার অর্থ আমি বুঝিতে পারিয়াছিলাম, তথাপি সেই আমন্ত্রণের সমুচিত জবাব প্রদানে সমর্থ হই নাই কখনই। 

 

এমনিভাবে বৎসরাধিক কাল অতিক্রান্ত হইবার পরে পিতাজীর পোস্টিং হইলো দিনাজপুরে। এই খবরে আমি অতিশয় আনন্দিত হইয়াছিলাম এই ভাবিয়া যে ঢাকা হইতে আগত ইসমার্ট ও কিউট চশমা ধারী বালকটির জন্য দিনাজপুর নামক মফস্বল শহরের তাবৎ কন্যারা হুমড়ি খাইয়া পরিবে, কাজেই এইবার আমার প্রেম না হইয়াই যায়না। কাজেই দ্রুত গাট্টি বোঁচকা বাঁধিয়া, লিপি শিল্পীর কাল্পনিক বাহুবন্ধন হইতে নিজেকে মুক্ত করিয়া দ্রুত দিনাজপুরের পথে রওয়ানা হইয়া গেলাম।

 

৩ মাস অতিক্রান্ত হইবার পর দিনাজপুর শহরের কালীতলাস্থ বাসভবনের দোতলার ছাদে পানির ট্যাঙ্কের উপর বসিয়া গভীর রাত্রিতে একদা আমার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া দীর্ঘশ্বাস নির্গত হইল এই ভাবিয়া যে - তিনটি মাস চলিয়া গেল, তবুও আমার প্রেম হইলোনা, এমনকি গার্লস স্কুলের সামনে নিয়মিত মহড়া দিয়াও প্রেম করার উপযুক্ত কোন কন্যার মনোযোগ আকর্ষণ করিতে আমি ব্যর্থ হইলাম। আমার দ্বারা বুঝি এ জনমে আর কিছু হইবেনা। এমতাবস্থায় আমাকে উদ্ধার করিয়াছিল ফ্লোরা নাম্নী এক অচেনা রমণী, যে কোন প্রকারে আমাদের বাসার ফোন নাম্বার যোগার করিয়া রাত বিরাতে আমাকে জ্বালাতন করিত। উক্ত রমণী আমি ভিন্ন অন্য কেহ ফোন ধরিলে কোন কথা বলিত না দেখিয়া আমার মাতৃদেবী উহার ওপর কিঞ্চিৎ বিরক্ত থাকিলেও আমি উহার সহিত বাক্যালাপ করিয়া বড়ই আমোদিত হইতাম।  এইভাবে দিনাতিপাত করিতে করিতে একদা আমার পিতা শহরের বাহির হইতে গাড়ী নষ্ট হইয়া যাওয়ায় বারংবার বাসায় কল করিয়া নাম্বার বিজি পাইয়া সাহায্যর আশা পরিত্যাগ কইরা অতিশয় রাগান্বিত হইয়া ট্রাকে করিয়া বাসায় প্রত্যাবর্তন করিয়া এক আছাড়ে টেলিফোন সেটটির দফারফা করিয়া আমার উপর ফতোয়া নাজিল করিলেন যে - এই মুহূর্ত হইতে আমার টেলিফোনে গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর করা নিষিদ্ধ। 

 

ভগ্ন হৃদয়ে কিছুকাল প্রেম বিহীন সময় কাটানোর পরে একদা ভগ্নীর পুতুল বিবাহ উপলক্ষে বাসায় উহার বান্ধবীদের আগমনে পুনরায় চার্জিত হইয়া উঠিলাম। কিন্তু আড়াল হইতে উহার পিচ্‌কি সব বান্ধবীদের চেহারা সুরত অবলোকন করিয়া আমার হৃদয় আবারও ব্যথিত হইয়া উঠিল, প্রেম করিবার জন্য উহারা অতিশয় ক্ষুদ্র এবং চেহারা ছবিও আশানুরূপ সৌন্দর্যমন্ডিত নহে।  যাহা হউক, পুতুলের বিবাহ উপলক্ষে পরদিন বাসায় প্রচুর খানাদানার আয়োজন ছিল, কিন্তু আমার কোন উৎসাহই ছিলনা বলিয়া ঘরে বসিয়া উচ্চ শব্দে সঙ্গীত শ্রবণ করিতেছিলাম, এমতাবস্থায় মা জননীর উচ্চ কণ্ঠের আহবানে দ্রুত সারা দিতে গিয়া ঘর হইতে বাহির হইতেই ঘরের অপর প্রান্ত হইতে আগত একখানা অসচেতন কইন্যা আমার গায়ে হুমড়ি খাইয়া পড়িল।  অতিশয় বিরক্ত হইয়া আমি উহাকে ঠেলিয়া সরাইতে গিয়া উহার মুখপানে চাহিয়া যেন জমিয়া গেলাম। আহা ... এ আমি কি দেখিলাম। প্রভাতের পদ্মফুলের ন্যায় স্নিগ্ধ মুখখানি যেন হীরকের দ্যুতি ছড়াইতেছে, চঞ্চলা হরিণী চোখের অতল গভীরতা আর লজ্জায় আরক্ত মুখমণ্ডল আমাকে কয়েক মুহূর্তের জন্য পৃথিবী হইতে শূন্যে নিক্ষেপ করিল। সম্বিত ফিরিয়া পাইলাম সমবেত কণ্ঠে হাসির শব্দে, ভগ্নী এবং তাহার বান্ধবীকুল চম্পাকে আমার উপর আছাড় খাইয়া পড়িতে দেখিয়া বড়ই আমোদিত হইয়া হাস্য করিতেছে। চম্পা উহাদিগকে সমুচিত শাস্তি প্রদান করিবার ছলে সেই মুহূর্তে উক্ত স্থান ত্যাগ করিয়া উহাদের পশ্চাদধাবন করিল, আমিও মাতৃদেবীর ডাকে সাড়া প্রদান করিয়া গাড়ী লইয়া শহরে শপিংয়ে চলিলাম। পরে ফিরিয়া আসিয়ে ভগ্নীকে উপযুক্ত পরিমাণ উপঢৌকন প্রদান করিয়া জানিতে পারিলাম যে সেই শ্যামাঙ্গী সুদর্শনা আমার সহিত একই শ্রেণীতে অধ্যয়ন করিতেছে এবং সে আমার ভগ্নীর প্রিয় বান্ধবীর বড় বোন। 

 

উহার পরে মাঝে মাঝেই আমি আমার ভগ্নীকে খোঁচাইয়া কোন কারণ ছাড়াই উহার বান্ধবীর সহিত সাক্ষাতে অনুপ্রাণিত করিতে লাগিলাম এবং বাইক সহযোগে উহাদের বাসায় যাইয়া ভগ্নীকে নামাইয়া দিয়া উহাদের বাসার সামনে দিয়া ঘোরাঘুরির সুযোগ সৃষ্টির প্রয়াস পাইলাম।  কিছুকাল পরে খিয়াল করিলাম যে আমি উচ্চগতিতে উহাদের বাসার সামনে দিয়া কিছু দুর গমন করিয়া ফিরিয়া আসিবার সময় চম্পাকে রাস্তার পার্শ্বের জানালায় অথবা বারান্দায় অযথা এটা সেটা নাড়াচাড়া করিতে দেখিতে পাইতাম।  মাঝে মাঝে বাইক থামাইয়া সৌজন্য বিনিময় করিবার ছলে কিছুক্ষণ তাহার সহিত সময় কাটানো আমার বড়ই ভাল লাগিতে লাগিল। 

 

কিছুকাল পরে একদা সকালে প্রাইভেট হইতে বাসায় ফিরিয়া বাসায় কাউকে দেখিতে না পাইয়া আপন ঘরে আসিয়া মাতৃদেবীর পত্র পাইলাম যাহাতে তিনি আমাকে অতি দ্রুত দিনাজপুর শহর হইতে কিছু দূরে অবস্থিত রামসাগর নামক স্থানে চলিয়া আসিতে আদেশ করিয়াছেন। আমি অনিচ্ছা স্বত্বেও শূন্য গৃহে চরম সাউন্ডে সঙ্গীত শ্রবণের আকর্ষণ পরিত্যাগ করিয়া রাম সাগরে বাইক লইয়া গমন করিলাম। আমি জানিতাম না যে সেইখানে আমার জন্য কি চমক অপেক্ষা করিতেছে। উক্ত স্থানে পৌঁছাইয়া দিঘীর একপ্রান্ত হইতে অন্য প্রান্তে সন্তরণরত রাজহংসীর ন্যায় ধবধবে সাদা পরিচ্ছদে সুসজ্জিতা চম্পাকে আবিষ্কার করিয়া আনন্দে আত্মহারা হইলাম। কাছে গিয়া দেখিতে পাইলাম যে মাতৃদেবী আমার ভগ্নীর বান্ধবীকুলকে লইয়া পিকনিকে মাতিয়াছেন, সেই কারণেই এত আয়োজন। সেই সময়ে মাতৃদেবী রান্নাবান্নায় এবং ভগ্নী ও তাহার বান্ধবীকুল কোন একটি খেলায় ব্যস্ত ছিল বলিয়া চম্পা আমাকে সকালের নাস্তা পরিবেশন করিল। হঠাৎ আমার মাথায় খেয়াল চাপিল যে আজিকে আমি চম্পাকে লইয়া বাইকে রামসাগর ভ্রমণে বাহির হইব। এই কথা উহাকে বলা মাত্র চম্পা লজ্জায় আরক্ত হইলো, মুখে না বলিলোনা, কিন্তু বাইকে বসিতে সঙ্কোচ করিতে লাগিল। এমন অবস্থায় মাতৃদেবী আগমন করিয়া অবস্থা বুঝিয়া চম্পাকে বলিলেন - যাও না, ঘুরে আসো ওর সাথে।

 

মাতৃদেবী নিষ্ক্রান্ত হইলে চম্পা আমার বাইকে উপবেশন করিল এবং আমরা বেশ খানিকটা দূরে গিয়া ছায়া শীতল একটি স্থানে বাইক থামাইয়া সতেজ সবুজ ঘাসের উপর উপবেশন করিয়া গল্প করিতে লাগিলাম। কিছুক্ষণ পরে আমি চম্পার হস্তে একগোছা ঘাস ফুল তুলিয়া দিতেই চম্পা বলিল - প্রথমবারেই ঘাস ফুল দিলা?  আমি আগামীকল্য সকালের মধ্যে উহাকে ১০১টি লাল গোলাপ প্রদানের অঙ্গীকার করিলাম যাহা পরে পালন করিবার কথা বেমালুম ভুলিয়া গিয়াছিলাম। 

 

পিতার বেরসিক বড়কর্তার কল্যাণে কয়েকমাস পরেই আমরা কুড়িগ্রাম চলিয়া যাইতে বাধ্য হইয়াছিলাম, এবং আমার চম্পা পর্বের অকাল পরিসমাপ্তি ঘটিয়াছিল। ভালবাসা কি তাহা চম্পা আমাকে তেমন ভাবে বুঝাইতে পারেনাই, যাহা আমি কুড়িগ্রামে শম্পার প্রেমে পড়িয়া হাড়ে হাড়ে টের পাইয়াছিলাম।

 

Share