আমার প্রেমিকারা

লিখেছেন - জয় কবির | লেখাটি 995 বার দেখা হয়েছে

ইলোরা পর্ব 

জন্মের সময়ের নানাবিধ জ্বালা যন্ত্রণার মধ্য দিয়া বাঁচিয়া যাওয়া ছোট্ট শিশুটি ক্রমে ক্রমে ক্ষুদ্রাকৃতি বালকে রূপান্তরিত হইয়াছে। কিন্তু তাহার মাতা তাহাকে প্রায়শই গামছা অথবা টেবিল ক্লথের শাড়ীতে জড়াইয়া ঠোঁটে টুকটুকে লাল লিপিশটিক লাগাইয়া এবং কপালে টিপ পরাইয়া আসন্ন কইন্যা সন্তানের আবির্ভাবের মহড়া দিয়া লইতেন। সেও বউ সাজিয়া চুপটি করিয়া খাটের উপর বসিয়া থাকিতে বিশেষ অপছন্দ করিতোনা, কারণ স্বল্প পরিচিত প্রতিবেশীদের ভড়কাইয়া দিয়া যেই আনন্দ তাহার মাতা উপলব্ধি করিতেন, পুত্র নিজেও তাহার কিছুটা হইলেও ভাগ পাইতো। এমনি ভাবে সুখে দুঃখে উহাদের সময় অতিবাহিত হইতেছিল। এমন সময় পুত্রের বাবা দিব্য দৃষ্টিতে তাহার পুত্রকে জজ ব্যারিস্টার রূপে দর্শন করিয়া ফেলিলেন, এবং পুত্রের অফুরন্ত খেলার সময়কে বিনা দ্বিধায় বিনা কাঁচিতে কাটিয়া ছোট করিয়া দিলেন। বিনা মেঘে ভূমিকম্পের ন্যায় এহেন কষ্টদায়ক কাটাকাটিতে পুত্র যারপর নাই ব্যথিত হইলেও পিতামাতা বেশ আহ্লাদিত ছিলেন। সুপ্রিয় পাঠক, আপনি যাহা ভাবিতেছেন, ঘটনা আসলে তাহা নয়, আমি বলিতে চাহিতেছি যে - বাবা তার সন্তানকে মুনলাইট কিন্ডারগার্টেন স্কুল নামক জেলখানায় অর্থের বিনিময়ে পোস্ট করিয়া আসিলেন।

 

ফকিরাপুলের গলির গলি তস্য গলির বাসা ছাড়িয়া উহারা তখন সবে মাত্র বাসাবোতে রেল লাইন সংলগ্ন চারতলা বাসায় নতুন সংসার পাতিয়া বসিয়াছে। বাসা হইতে স্কুলে হাঁটিয়াই যাওয়া যায়। তথাপি পুত্রের পিতা একদিন পুত্রের বিদ্যালয় বিমুখিতা (!) স্বভাবের পরিবর্তন আনয়নের লক্ষ্যে একখানা ছাতা মার্কা ঢেউটিনের তৈরি জীপ গাড়ী ক্রয় করিয়া আনিলেন। প্যাডেল চালিত সেই জীপ গাড়ীতে বসিয়া ভাবের সহিত বিদ্যালয়ে গমন করিতে পুত্র আর কখনই পিছুপা হয়নাই। এইভাবে কিছুদিন বিদ্যালয়ে গমন করিবার পরে সহপাঠীদের মাঝে সে মর্কট সম্রাটের মর্যাদা লাভ করিল আর পরীক্ষায় আশাতীত নম্বর প্রাপ্তির ফলে শিক্ষিকাদিগের প্রিয় পাত্রে পরিণত হইলো। এমনভাবে তার পরিচিতি ঘটিল ইলোরা, হুমায়রা আর তিন্নির সহিত। তাহাদের মধ্যে ইলোরা অতিশয় সুন্দরী গোলগাল এবং নির্বুদ্ধিমতি ছিল। উহার ডাক্তার পিতা উহাকে গাদা গাদা বুদ্ধির ইনজেকশন ক্যাপসুলে ভরিয়া খাওয়াইয়াও উহার মাথার হেড অফিসে কিছু ধরাইতে সমর্থ হন নাই বলিয়া বিদগ্ধজনের ধারনা। এই কারণে তিন্নি এবং হুমায়রার সহিত বালকটির বেশী খাতির জমিয়া উঠিল। অপরদিকে ইলোরার মাতাপিতার সহিত বালকের পরিবারের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হইতে ঘনিষ্টতর হইতে লাগিলো। সেই উপলক্ষে প্রায়শই বিদ্যালয় ছুটির পর বালকটিকে হুমায়রা এবং তিন্নিকে বিদায় দিয়া মাতৃদেবীর হাত ধরিয়া ইলোরার বাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা করিতে দেখা যাইতে লাগিলো।

 

এমনি ভাবে চলিতে চলিতে একদিন উভয় পরিবারের সম্মতিতে সকলে মিলিয়া রাজেন্দ্রপুরে পিকনিকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করিল। পিকনিকের স্থানে পৌছিয়া বালক খিয়াল করিল ইলোরা নামের অতিশয় পরিচিতা সেই গোলগাল বোকাসোকা বলিকাটিকে আজিকে অতি অতি সৌন্দর্য লাগিতেছে। কিন্তু কেন যেন বালিকা তাহাকে সযতনে এড়াইয়া চলিতেছে। অর্ধঘন্টার কাকুতি মিনতি পর, ৩ খানা চকলেট বার, ২ খানা পুষ্প ও এক খানা ঘাস ফড়িঙের বিনিময়ে কইন্যা অভিমানে মেঘাচ্ছন্ন নেত্রে বালকের দিকে তাকাইয়া বলিল - "তুমি প্রতিদিন শুধু হুমায়রার সাথে বসো, আমার সাথে বসোনা " বালকের অন্তরে কি যেন হইয়া গেল, সে বিনা চিন্তায় বিনা দ্বিধায় বলিয়া ফেলিল যে সে এখন হইতে প্রতিদিন ইলোরার সাথেই উপবেশন করিবে। এতে কইন্যা যারপরনাই আনন্দিত হইয়া জঙ্গলের শুকনা ডালপালা ও ঝরা পাতা মাড়াইয়া নূপুর নিক্বণ তুলিয়া দৌড়াইয়া যাইতে লাগিলো, বালকও তাহার পিছু নিল এবং এক পর্যায়ে তাহারা ক্লান্ত হইয়া পাশাপাশি হাঁটিতে লাগিলো।

 

বালক আজও জানেনা কেন তার সেই মুহূর্তে পৃথিবীর সবকিছু ভুলিয়া ইলোরার হাতখানি ধরিতে এত বেশী শখ হইয়াছিল। এক সময় বালক সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব পরিত্যাগ করিয়া বালিকার সুকোমল হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় তুলিয়া লইলো। আহা ... সেই স্পর্শ সে আজও ভুলিতে পারেনা। হাত ধরার সঙ্গে সঙ্গে বালিকা বালকের মুখের দিকে চাহিয়া পৃথিবী আলোকিত করিয়া একখানি হাসি উপহার দিয়া কহিল ... "হুমায়রা আর তিন্নির সাথে আর কথা বলবানা,আচ্ছা? সেই জন্য কিন্তু হাত ধরতে দিয়েছি"। বালকের তখন চোখের সামনে হাজার প্রজাপতির উড়া উড়ি,সে কোন রকমে "আচ্ছা" বলিয়া বালিকার হাতটি আরও জোরে চাপিয়া ধরিল।

 

উহাদের প্রেম পর্ব খুব বেশীদিন স্থায়ী হয়নাই। পরের দিন ক্লাসে হুমায়রার বাসা হইতে লইয়া আসা নুডোলসের লোভ সামলাইতে না পারিয়া বালক প্রথমে হুমায়রার সাথে কথা বলিয়া ফেলে,পরে উহার সাথেই বসিয়া গল্পগুজবে মত্ত হয়,ফলে ইলোরার সহিত দাম্পত্য কলহ নিত্যদিনের ব্যাপারে পরিণত হয়। এক পর্যায়ে উহাদের মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হইয়া যায়।

 

হুমায়রা পর্ব  

 

দেখিতে ছোটখাটো হইলেও হুমায়রা ছিল বিশাল বুদ্ধিমতী। সে ঠিকই কোন না কোন প্রকারে নিজের দাবী আদায় করিয়া লইতো। যখনই সে বুঝিতে পারিল যে ইলোরার সহিত আমার কিঞ্চিৎ ইটিশ পিটিশ চলিতেছে, তখনই সে লাগিয়া পড়িল আমার দুর্বলতার খোঁজে যাহাতে সে আমারে দ্রুত কাবু করিয়া তাহার বশীভূত করিয়া ফেলিতে পারে। খাদ্য দ্রব্যের প্রতি আমার আসক্তির কথা সর্বজনবিদিত, কাজেই আমার দুর্বলতা খুঁজিয়া পাইতে উহাকে মোটেও বেগ পাইতে হয় নাই। হুমায়রার মাতৃদেবী (আমাদের শ্রদ্ধেয়া শিক্ষিকা রানু ম্যাডাম) রন্ধন শিল্পে অতি পটু ছিলেন, প্রত্যহ তিনি নানাবিধ মজাদার খাবার প্রস্তুত করিয়া কন্যাত্রয়ের টিফিন বাক্স ভর্তি করিয়া দিয়া দিতেন। আমিও আমার খাবার সবার সহিত বিনিময় করিয়া খাইতাম। উহাতে রোজ নতুন নতুন খাবারের স্বাদ আস্বাদন করা সম্ভব হইতো। ক্রমে আমি হুমায়রার চাইতে উহার টিফিন বাক্সের প্রতি বেশী মনোযোগী হইয়া পড়িলাম। এই সত্য উপলব্ধি করিয়া হুমায়রা একদিন আমাকে তাহার টিফিনের ভাগ দিতে অস্বীকার করিয়া বসিল। পরে আপোষ হইল এইরূপে যে - আমি রোজ একখানা চুম্বনের বিনিময়ে উহার টিফিন বাক্সের অধিকার পাইবো।

 

হুমায়রা আমা হইতে শুধু চুম্বন লইয়াই ক্ষান্ত হয়নাই, একদা সে আমাকে নির্জনে ডাকিয়া লইয়া আমার হস্তে একখানি তাজা লাল গোলাপ পুষ্প ধরাইয়া দিয়া পরের দিনের টিফিনে বিরিয়ানি খাওয়াইবার প্রতিশ্রুতি দিয়া অঙ্গীকার করাইয়া লইয়াছিল যে আমরা কিছু দিন পর বিবাহ করিয়া সুখের সংসার করিব। আমি নিত্যদিন উহার মায়ের মজাদার রান্নার লোভে পড়িয়া নিঃসঙ্কোচে রাজী হইয়া গিয়াছিলাম। কিন্তু গোল বাধিল শ্রেণী কক্ষে ফিরিয়া আসিবার সঙ্গে সঙ্গেই। আমার হাতে গোলাপ দেখিয়া ইলোরা সহ আরও কয়েকজন বালিকা উহা লইবার জন্য ঝাঁপাইয়া পড়িল, আমিও প্রাণপণে উহাদের বাধা দিবার চেষ্টায় গোলাপখানা মুঠোয় ভরিয়া গোলাপ রক্ষার সংগ্রামে লিপ্ত হইলাম। কিন্তু যুদ্ধ জয়ের আনন্দে হুমায়রার সামনে গিয়া দাঁড়াইতেই কন্যা চোখ ভর্তি জল লইয়া দ্রুত ক্লাস ত্যাগ করিয়া উহার মাতৃদেবীর কক্ষের দিকে ধাবিত হইল। কারণ অ্ণুসন্ধান করিয়া দেখিতে পাইলাম যে তাহার সাধের গোলাপখানি কুটিকুটি হইয়া ছিঁড়িয়া পদ দ্বারা দলিত মথিত হইয়া ধুলায় লুটাইতেছে, যুদ্ধ করিবার সময়ে কখন যেন উহা মুঠি হইতে মেঝেতে পড়িয়া গিয়াছে, তাহা আমি খিয়াল করিতে পারি নাই ।

 

এই ঘটনার কিছুক্ষণ পরেই টিচার্স রুমে আমার ডাক পড়িল। আমি দুরু দুরু বক্ষে নানাবিধ দুশ্চিন্তায় ভীত হইয়া উক্ত কক্ষে প্রবেশ করিয়া রানু ম্যাডামের মুখোমুখি হইয়া দেখিতে পাইলাম হুমায়রা অশ্রুসজল নেত্রে ম্যাডামের পাশে দণ্ডায়মান। আমাকে দেখিয়া ম্যাডাম হাসিহাসি মুখে জিজ্ঞাসিলেন - "তুমি কি আমার কইন্যাকে বিবাহ করিতে ইচ্ছুক?"। আমি মাথা নাড়িয়া সন্মতি প্রকাশ করিতেই টিচার্স রুমে হাসির রোল পড়িয়া গেল, আর হুমায়রা লজ্জা পাইয়া তাহার মাতৃদেবীর কোলে মুখ লুকাইলো। রানু ম্যাডাম আমাকেও তাহার কোলে টানিয়া লইয়া কহিলেন - "তাহা হইলে তুমি আমার কইন্যাকে আর কাঁদাইবেনা, প্রহার করিবেনা, পড়াশুনায় সাহায্য করিবে, আর ভাল ছেলে হইয়া থাকিবে"। আমি লাজুক মুখে সন্মতি দিয়া উক্ত কক্ষ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলাম। আপন শ্রেণী কক্ষে প্রবেশের সাথে সাথেই দেখিতে পাইলাম ইলোরা আমার ব্যাগ বেঞ্চের উপর হইতে টানিয়া মেঝেতে ফালাইয়া দিয়ে হাপুস নয়নে কাঁদিতে কাঁদিতে স্কুল ত্যাগ করিতে উদ্যত হইয়াছে। এমতাবস্থায় টিচার ক্লাসে প্রবেশ করিয়া ইলোরাকে শান্ত করিতে ব্যর্থ হইয়া প্রধান শিক্ষিকা মহাশয়াকে ইনফর্ম করিলেন। তাহার পরে আমার আর হুমায়রার প্রেম কাহিনী গোটা স্কুলে দাবানলের মত ছড়াইয়া পড়িল। 

 

এই ঘটনার পর দুইদিন ইলোরা আর স্কুলে আসেনাই। পরে স্কুলে আসিলেও আমি আর তাহাকে কোন ভাবেই পটাইতে সমর্থ হইনাই। নারীজাতি বড়ই মারাত্মক।

 

জেনী পর্ব...

 

কিছুকাল পরে পিতার কর্মস্থল পরিবর্তনের কারণে আমাকে কুমিল্লা চলিয়া যাইতে হয়। ইলোরা হুমায়রা সহ আরও বেশ কিছু বন্ধু বান্ধবীকে চোখের জলে ভাসাইয়া আমি ডিং ডিং করিয়া নাচিতে নাচিতে কুমিল্লার চৌধুরীপাড়াস্থ দোতলা বাড়ীটিতে যাইয়া উপস্থিত হই, এবং মিশনারি স্কুল নামে খ্যাত - আওয়ার লেডী অব ফাতেমা গার্লস স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে যোগদান করি।

 

প্রতিদিন সকালে উঠিয়া চোখ ডলিতে ডলিতে বিদ্যালয়ে গমন করা যখন যন্ত্রণাকর কাজ বলিয়া মনে হইতে লাগিলো, তখন আমাকে উদ্ধার করিলো জেনী আর জেমী দুই যমজ বোন, উহারা আমার পাশের বাসায় থাকিতো, একদা এক শুভক্ষণে উহারাও মিশনারি স্কুলে ভর্তি হইয়া আমাকে আহ্লাদিত করিল। অতঃপর আমরা একসাথে মুরগীর খাঁচার মত স্কুল ভ্যানে করিয়া নিয়মিত বিদ্যালয়ে গমন করিতে লাগিলাম। দেখিতে হুবহু একই রকম হওয়ায় জেনী জেমীর মা উহাদিগকে সর্বদা আলাদা করিয়া রাখিতে বিশেষ ভাবে সচেষ্ট ছিলেন। জেনী শান্তশিষ্ট হওয়ায় তিনি জেনীর লম্বা চুলে তেল দিয়া বিনুনি বাঁধিয়া দিতেন, আর জেমী একটু দুষ্টু প্রকৃতির হওয়ায় উহার মাথার চুল ছোট করিয়া ছাঁটিয়া দিয়াছিলেন। উহাতে অবশ্য জেমীর তেমন কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নাই, কারণ যে সময় অসময়ে জেনীর বিনুনি টানিয়া অতিশয় আমোদিত হইতো। জেনীও কেহ তাহার বিনুনি স্পর্শ করিলে অগ্নিশর্মা হইয়া তাড়া করিতো, আমি প্রথম দিকে তাহাদিগের এই মজার খেলা বেকুবের ন্যায় অবলোকন করিয়া হাততালি দিয়া আমোদ প্রকাশ করিলেও ক্রমেই জেমীর সহিত মিলিয়া জেনীকে খেপাইতে আরম্ভ করিলাম। 

 

একদা বৈকালে এইরূপ এক খেলায় মাতিয়া আমি আর জেমী জেনীকে উত্ত্যক্ত করিতে লাগিলাম। জেনীও সেইদিন প্রচণ্ড খেপিয়া গিয়া আমাদের দুইজনকেই তাড়া করিয়া বেড়াইতে লাগিলো। কিন্তু এক পর্যায়ে কাহাকেও হাতের নাগালে না পাইয়া আমাকে লক্ষ্য করিয়া সে একখানে আধলা ইষ্টকের আধখানা টুকরা নিক্ষেপ করিল। ক্রম পলায়মান (!) আমার পৃষ্ঠদেশে ইষ্টক খণ্ড খানা পতিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে আমি চোখে মুখে অন্ধকার দেখিলাম এবং আছাড় খাইয়া চিৎপটাং দিয়া পড়িয়া গেলাম। আমার এহেন আছাড় খাওয়া দর্শন করিয়া জেমী জেনী দুই জনেই স্তব্ধ হইয়া তাকাইয়া রহিল, কিন্তু সামান্যকাল পরে আমার ক্রন্দনের তীব্রতায় জেনীর কোমল হৃদয় তরল হইয়া উঠিল। সে আস্তে আস্তে আমার নিকট উপস্থিত হইয়া আমার পিঠে হাত বুলাইয়া দিতে গেল, কিন্তু আমি অভিমান হেতু উহাকে আমার পৃষ্ঠদেশ স্পর্শ করিতে দিলাম না। তৎক্ষণাৎ জেনী আমার পার্শ্বে উপবেশন করিল এবং আমি উহার চোখে অশ্রুকণা দেখিয়া নিজের কান্নার কথা ভুলিয়া গেলাম। আমাকে থামিতে দেখিয়া জেনী কান্না মিশ্রিত গলায় আসকাইলো - "বেশী ব্যথা পাইছো?" আমি কহিলাম - হুমম। শুনিয়া জেনী আমাকে জড়াইয়া ধরিয়া কান্না আরম্ভ করিল, আমিও ভ্যবলের মত কিছুই বুঝিতে না পারিয়া পুনরায় কান্না শুরু করিলাম। জেমী এই দৃশ্য দেখিয়া উহার মাতৃদেবীকে অবহিত করিবার মানসে উল্টা দিকে দৌড় দিলো। 

 

সেইদিন হইতে আমার আর জেনীর মধ্যে সখ্যতা গড়িয়া উঠিল। আমি উহার মধ্যে চিরন্তন মমতাময়ী এক নারীকে খুঁজিয়া পাইলাম, যে সদা সর্বদা ক্ষুধার্ত এই চশমা পরিহিত বালকটিকে খাওয়াইয়া বড়ই আহ্লাদ বোধ করে। জেনী নিয়মিত আমাকে ঘরের আলুটা মূলোটা - আই মিন ... বিস্কুট চানাচুর মিষ্টি সন্দেশ খাওয়াইতো। আমিও জাহানারা কটেজ হইতে সদ্য তালিম প্রাপ্ত হইয়া উহাকে অমূল্য সব চিত্রকর্ম আঁকিয়া উপহার দিতাম, যাহা ক্রমে জেমীর চক্ষুশূল হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। একদা জেমী তেমনি একটি চিত্রকর্মের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া উহাকে দ্বিখণ্ডিত করিয়া ফেলায় জেমী জেনীর যুদ্ধ বাঁধিয়া গেল ও কেহ কাহাকেও পরাস্ত করিতে না পারিয়া আমার শরণাপন্ন হইল এবং আসকাইলো যে আমি কাহাকে বেশী ভালবাসি। জেমী আমাকে কোনদিন কিছু খাওয়ায় নাই বলিয়ে ভবিষ্যতের ফুলঝুরির ন্যায় খাদ্যের বর্ষণ দিব্য দৃষ্টিতে দেখিতে পাইয়া আমি নিঃসঙ্কোচে বলিয়া দিলাম যে আমি জেনীকেই বেশী ভালবাসি। ইহা শুনিয়া জেমী হতভম্ব হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেও জেনী লজ্জা পাইয়া বাড়ির উদ্দেশ্যে পলায়ন করিল। এই ঘটনার পর অনেক দিন জেমী আমার সহিত বাৎচিত করে নাই।

 

উহার কয়েক মাস পর আমার পিতা পুনরায় কর্মস্থল পরিবর্তন করিয়া বগুড়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইয়া যান।

 

Share