একটি অসম্পূর্ণ গল্প

লিখেছেন - জয় কবির | লেখাটি 1140 বার দেখা হয়েছে

স্বাধীনতার কয়েক বছর পরের কথা। সঠিক করে বললে সেপ্টেম্বর মাসের ৮ তারিখের একটি ভোর। দুরের মসজিদে আজান দেবে বলে সবে জেগে উঠেছে মুয়াজ্জিন। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে দিয়ে ঠিক এমন সময় শোনা যায় একটি আর্তচিৎকার, সদ্য জন্ম নেয়া শিশুটি জন্মের প্রায় পাঁচ মিনিট পর চিৎকার করে জানায় দেয় জীবনের আগমনী বার্তা। হাফ ছেড়ে বাঁচেন বুড়ী দাইমা, তারপর অভ্যস্ত হাতে কুসুম গরম পানি থেকে তুলে নেন সময়ের আগেই জন্ম নেয়া বাচ্চাটিকে। জন্মের পর নিঃশ্বাস না নেয়া বাচ্চাটাকে বাঁচানোর এটাই ছিল তার শেষ চেষ্টা। হাসি ফুটে ওঠে রাত জাগা মানুষ গুলোর মুখে। আঁতুড়ঘর থেকে বেড়িয়ে গিয়ে সবাইকে জন্মের সুসংবাদ দেন বাচ্চার নানী "ছেলে হয়েছে, রোজীর ছেলে হয়েছে"।

 

সাড়ে সাত মাসে জন্ম নেয়া বাচ্চাটার গায়ের চামড়া এতই পাতলা ছিল যে চামড়া ভেদ করে তার রক্তবাহী শিরাগুলো দেখা যেত। এই বাচ্চাকে কাঁথায় মুড়িয়ে কোলে নিয়েও শান্তি পেলেননা জাহানারা বেগম, বাচ্চার নানী। বাচ্চার জন্যে বানানো নতুন বালিশ ছিঁড়ে বের করলেন একগাদা তুলো। তারপর তুলোতে জড়িয়ে বুকের মাঝে তুলে নিলেন তার পনেরো বছর বয়সী আত্মজার প্রথম সন্তানকে। যেন পণ করলেন পৃথিবীর সব আঘাত থেকে এই মানব সন্তানটিকে রক্ষা করার। দাইমা অভিজ্ঞ চোখে বাচ্চাটিকে কিছুক্ষণ দেখে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে বললেন "এই বাচ্চা বাঁচবেনা, খামাখা মায়া বাড়াইয়েননা আর"। জাহানারা বেগমের চোখ জ্বলে ওঠে ভাটার মত, বুকের মাঝে আরও শক্ত করে চেপে ধরেন বাচ্চাটিকে, যেন চোখের সামনে দেখতে পারছেন মৃত্যুর ফেরেশতাকে, কিন্তু এযাত্রা তিনি হেরে যেতে নারাজ। মা'র কোলে থাকা শিশুর জান না কি কবচ করতে পারেননা মৃত্যুদুত, সে কথা মিথ্যে প্রমাণ করে তার কোল খালি করে চলে গেছে তার নিজের সন্তান। কিন্তু আত্মজার নাড়ি ছেড়া ধনকে তিনি কিছুতেই চলে যেতে দেবেননা, কিছুতেই না। তুলোয় মোড়ানো বাচ্চাটাকে নিয়ে জায়নামাজের পেতে বসলেন মমতাময়ী, এক হাতে বাচ্চাকে জড়িয়ে অন্য হাতে কোরআন শরীফ দিয়ে ঢেকে রাখলেন বাচ্চাটাকে, মনে মনে আওড়াতে থাকলেন জানা সব সূরা। সকাল বেলা সদর হাসপাতাল থেকে ডাক্তার না আসা পর্যন্ত বসে রইলেন ঠিক সেভাবেই।

 

ডাক্তার এসে ভাল করে পরীক্ষা করলেন বাচ্চাটিকে। শারীরিক কোন সমস্যার লক্ষণ দেখা গেলনা বাচ্চাটার মধ্যে। তাই ওর মুখে তখনই দেয়া হল এক চামচ দুধ। জীবনের প্রথম মুখে খাবারের স্বাদ পেল বাচ্চাটা। চেটে চেটে খেয়ে ফেললো দুধটুকু, তারপর আরও দু চামচ। তারপর ঘুমিয়ে পড়লো পরম নির্ভরতায় মমতাময়ীর বুকের উষ্ণতায়। ডাক্তার মিষ্টিমুখ করে যাবার সময় বলে গেলেন কোন সমস্যা দেখা দিলেই যেন দ্রুত ঢাকায় নেয়া হয় বাচ্চাকে, এখানে এই প্রিম্যাচিওর বেবির কোন চিকিৎসা সম্ভব নয়। অন্তত সাতদিন না গেলে বলা যাবে না যে এই বাচ্চা বাঁচবে কি না।

 

ততক্ষণে কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে দু'রাত কষ্ট পাওয়া বাচ্চার মা। মা'র কোলে দেয়া হল তার সাতরাজার ধনকে। তার কোলে উঠেই চিৎকার করে উঠলো ছোট্ট বাচ্চাটা, ঠোট চাটতে লাগলো ঘন ঘন, সবাই বুঝল এটা খিধের কান্না। অপটু হাতে মা তার সন্তানকে চেপে ধরলেন বুকের সাথে, সন্তানের মুখে তুলে দিলেন স্তনের বোঁটা। বুকের শ্বাস টেনে নেয়া অনুভূতিতে বুঝতে পারলেন দুধ খেতে শুরু করেছে তার ছেলে। পরম মমতায় ছেলেকে বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরলেন মা। দু মিনিট খাবার পরেই ঘুমিয়ে পড়লো ছোট্ট বাচ্চাটা। দ্রুত গোসল সেরে আবার বাচ্চাটাকে তুলোতে জড়িয়ে কোলে করে জায়নামাজে বসলেন জাহানারা বেগম, কোরআন শরীফের পাতা দিয়ে ঢেকে রাখলেন ছেলেটাকে, প্রতিজ্ঞা করলেন বিপদ না কাটা পর্যন্ত রোজা রাখবেন তিনি, যত দিন লাগে লাগুক, কিন্তু যেমন করেই হোক, এ বাচ্চাকে বাঁচাবেনই তিনি।

 

সন্ধে মিলিয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। প্রতিবেশীদের আনাগোনাও কমে গেছে ততক্ষণে। মফস্বল শহরে রাত নেমে আসে দ্রুতই। এমন সময় সবুজ একটি জীপ গাড়ী এসে থামে সিও সাহেবের বাসার সামনে। গাড়ী থেকে নেমে আসেন বাচ্চাটির বাবা। বাচ্চা হবার খবর পেয়েই কর্মস্থল থেকে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন তিনি, পৌঁছুলেন সন্ধ্যের পরে। ঘরে ঢুকে সৌজন্য বিনিময়ের পর তিনি সোজা চলে গেলেন বাচ্চাটার মা'র ঘরে। কিন্তু সাত আট ঘণ্টা গাড়ী চালানোর পরে তার কোলে তখনই বাচ্চাটা দিতে নারাজ জাহানারা বেগম, তাই কাপড় পাল্টে গোসলে ঢুকলেন তিনি। গোসল শেষে নামাজ আদায় করে বাচ্চাকে দেখতে চাইলেন। জায়নামাজে বসা অবস্থাতেই তার কোলে তুলে দেয়া হল তার প্রথম সন্তানটিকে। তুলোয় মোড়ানো ছোট্ট বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হল এ যেন তারই প্রতিচ্ছবি, সন্তানকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে ফেললেন বাবা, এই কান্নার কারণটা অনেকের কাছেই অজানা। কেবল একজন বাবাই বলতে পারবেন তার সেই সময়ের অনুভূতি।

 

রাত গভীর হতে থাকে আর সেই সাথে বাড়তে থাকে জাহানারা বেগমের আশঙ্কা। অন্ধকার আজ যেন ভয়াল দৈত্য দানবের রূপ নিয়ে এগিয়ে আসে তার কাছে। না - কোন ভাবেই হার মানবেননা তিনি, এক মুহূর্তের জন্য কোল থেকে নামাবেননা আত্মজার সন্তানটিকে।

 

খাটের ওপর হেলান দিয়ে বসে থাকায় সারা দিনের ক্লান্তিতে শেষ রাতের দিকে চোখের পাতা বুজে আসে তার। চমকে জেগে ওঠেন বাচ্চাটার সামান্য নড়াচড়ায়। তাকিয়ে দেখেন নীল হয়ে গেছে বাচ্চাটা, শ্বাস নিতে পারছেনা কিছুতেই। সেই মুহূর্তে জাহানারা অনুভব করলেন যেন তার চারপাশের পরিবেশ পালটে গেছে, নিজেকে আবিষ্কার করলেন খোলা এক মাঠের ভেতর ... যতদূর চোখ যায় ধুধু প্রান্তর ... কোথাও কেউ নেই। ভয় আর আশঙ্কার শীতল এক স্রোত নেমে গেল তার মেরুদণ্ড বেয়ে। সেই মুহূর্তে প্রথম যে চিন্তাটি মাথায় এলো তার, তা হল যে কোন ভাবে বাচ্চার শ্বাস প্রশ্বাস চালু করতে হবে খুব দ্রুত। মুখ ভর্তি বাতাস টেনে নিয়ে খুব অল্প অল্প করে বাচ্চাটার মুখে মুখ লাগিয়ে কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাস দেয়া শুরু করলেন তিনি। অল্পক্ষণ পরেই বুঝতে পারলেন আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে আসছে শক্ত হয়ে যাওয়া বাচ্চাটা। ছোট্ট বুকটা স্বাভাবিক ছন্দে ওঠানামা করতে শুরু করেছে আবারও। শ্বাস নিতে পারছে বাচ্চাটা এখন। ক্রমে নীলচে ভাবটা মিলিয়ে গেল বাচ্চার গোলাপি শরীর থেকে। জাহানারা নিজেও ফিরে এলেন স্বাভাবিক পৃথিবীতে। বাকি রাতটুকুতে আর কোন সমস্যা হয়নি বাচ্চাটার।

 

পরের ছয়টা দিন কেটে গেল একই ভাবে। এই কয়েক দিনে নানীর বুকের মাঝে একটু একটু করে বেড়ে উঠেছে বাচ্চাটা, খিধে পেলে ঘুম থেকে জেগে উঠে চিৎকার করেছে, খেতে খেতেই ঘুমিয়ে গেছে আবার। জন্মের দ্বিতীয় দিন থেকেই দিনে দুই বার করে তাকে দেখে গেছে ডাক্তার। একমাত্র শিশু জন্ডিসের লক্ষণ দেখা যাওয়া ছাড়া আর তেমন কোন সমস্যা হয়নি তার। ওটা জন্মের পর সব বাচ্চারই হয়, এতে চিন্তার তেমন কিছুই নেই।

 

উৎসবের সাজে সেজেছে আজ সেই বাড়ীটা। চারিদিক থেকে এসেছেন আত্নীয় স্বজনেরা, আজ বাচ্চাটার আকিকা। কিন্তু শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের চাইতে সেদিনের অনুষ্ঠানে প্রাধান্য পেয়েছিলো অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটানো গরীব লোকগুলো। আকিকা অনুষ্ঠানের সময় বাচ্চার দাদার পছন্দ করা নামেই নামকরণ করা হয় তার। কিন্তু সবার অলক্ষ্যে কিশোরী মা তার সন্তানের নাম দেন 'জয়'। যে নামটির কথা জানতো শুধু সেই মমতাময়ী আর তার সন্তান।

 

এমনি করে সবার আদরে, দোয়ায়, ভালবাসায় একটু একটু করে বেড়ে ওঠে বাচ্চাটা। জন্মের অষ্টম দিনে বড় বড় দুটি চোখ খুলে পৃথিবী দেখে সে। প্রায় স্বচ্ছ গায়ের চামড়া স্বাভাবিক হয়ে আসে। খাওয়া দাওয়া করার সময়টা একটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসেন জাহানারা বেগম। বাচ্চাটা এখন দিনের বেলায় ঘুমায় তার মা'র কাছেই, রাতে তাকে কোল থেকে নামান না মমতাময়ী নানী।

 

  বাচ্চাটার বয়স সেদিন আঠারো দিন। সকাল থেকেই অকারণে কান্না করছিলো সে। ঘুমিয়ে গিয়েও বার বার চমকে চমকে জেগে উঠছিল। দুপুরের দিকে ডাক্তার নিয়ে আসা হয় বাসায়, ডাক্তার দেখে বলেন ঠাণ্ডা লেগেছে বাচ্চার। শ্বাস নিতে পারছেনা ঠিক মত, সে জন্য কান্না করছে। ডাক্তার একটি ঔষধের নাম লিখে দিলেন, যেটা সেই ছোট শহরে পাওয়া যাবেনা, বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হবে। তখন ডাক্তার বাচ্চাটিকে একটা ইনজেকশন দিলেন, বাচ্চা ঘুমিয়ে গেলো তখনই, ডাক্তারও চলে গেলেন।

 

  এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর পর বাচ্চাটা স্বাভাবিক ভাবে জেগে ওঠে খাবার জন্য। ৩ ঘণ্টা পেড়িয়ে যাবার পরেও যখন বাচ্চা জাগলোনা, তখন সন্দেহ হল সবার। পেড়িয়ে গেলো আরও একটি ঘণ্টা, জাগার নাম গন্ধ নেই বাচ্চাটার। তখন সদর হাসপাতালের বড় ডাক্তারকে নিয়ে আসা হল বাসায়। ইনজেকশনের নাম আর পরিমাণ দেখেই তার চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তিনি জানালেন - যে ইনজেকশনটা দেয়া হয়েছে, সেটা বড়দের জন্য, পরিমাণটাও প্রায় তিন সপ্তাহের বাচ্চার জন্য ভয়াবহ রকমের বেশী। বাচ্চা ঘুম থেকে না জেগে স্রেফ না খেতে পেয়ে মরে যেতে পারে। হাসপাতালে এত ছোট বাচ্চার চিকিৎসার তেমন ভাল ব্যবস্থা নেই, আর স্যালাইন দেয়া ছাড়া এর কোন বিকল্প নেই দেখে বাসাতেই তাকে রাখা হল। তার ছোট্ট শরীরে ঢোকানো হল স্যালাইনের সুচ, বাচ্চাটা নড়লোনা পর্যন্ত। বাসার সবাই কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া পড়া শুরু করলেন। এ ছাড়া আর কিছুই করার ছিলোনা সে সময়।

 

সে রাতে সময় যেন থেমে গিয়েছিলো। ঘড়ির কাটা নড়ছিলোনা সহজে। ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া বাচ্চাটা ঘুমুচ্ছিলো মরার মতই। তার মা আর নানী অপলক তাকিয়ে ছিলেন তার মুখের দিকে, উৎকণ্ঠায় তাদের হৃৎপিণ্ড খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে আসছিল যেন। বাচ্চাটার ছোট্ট বুকটা মৃদু ওঠানামায় প্রাণের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল শুধু। ক্রমেই যেন কমে যাচ্ছিলো নিঃশ্বাসের গতি। গোলাপি গায়ের চামড়া ফ্যাকাসে থেকে সাদায় রূপান্তরিত হচ্ছিলো। সবাই চোখের সামনে দেখছিলেন মৃত্যুর ভয়ঙ্করতম রূপ।

রাত চারটার পরে হঠাৎ করে একটু নড়ে ওঠে বাচ্চাটার ঠোট দুটো। কেঁদে ওঠার মত সামান্য শব্দ করে ওঠে সে। ছোট্ট দেহটাতে যেন প্রাণের স্পন্দন ফিরে আসতে থাকে। অল্প কিছুক্ষণ পরেই নড়ে ওঠে বাচ্চাটা। ডাক্তারের নির্দেশ মত নার্স তখনই খুলে দেয় স্যালাইনের সুচ। ক্রমে গায়ের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ফিরে আসে তার। ঘণ্টা খানেক পর কেঁদেও ওঠে, একটু খেয়ে সতের আঠারো ঘণ্টা পর কাঁথা ভেজায়। সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তখন।

 

  একে একে দিন কেটে যায়। স্বাভাবিক নিয়মে বেড়ে ওঠে বাচ্চাটি। তার মা ও ক্রমেই শিখে নেয় বাচ্চা সামলানোর কৌশল গুলো। জন্মের চল্লিশ দিনের দিন মা ছেলেকে নিতে আসেন বাচ্চার বাবা। বাচ্চাটির সেবারেই প্রথম গাড়ীতে ওঠা। গাড়ীতে উঠে সে ছোট্ট দুটি হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মা'কে। আর বড় বড় অবাক চোখদুটি মেলে এদিক সেদিক দেখতে থাকে। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে তাদের বিদায় দেন জাহানারা বেগম।

 

[ মা ও নানীর মুখে শোনা আমার খুব প্রিয় একটা গল্প - আমার ছোটবেলার গল্প ]

 

 

Share