ছেলেমানুষী ভালবাসা

লিখেছেন - ফারহানা নিম্মী | লেখাটি 1769 বার দেখা হয়েছে

যুক্তি-তর্ক তুমি অনেক ভালো বোঝ । প্রকৌশলী মানুষ তো,তাই তোমার কাছে কৌশলের অভাব নেই । তোমার শার্টের পকেটে যুক্তি থাকে,প্যান্টের পকেটে যুক্তি থাকে । ফাঁকতালে আমি ই কোথাও নাই । তবে,যন্ত্র নিয়ে কাজ করতে করতে,আমার বাসার একটা টিউবলাইট কিংবা নষ্ট ফ্যানের সাথে তোমার কোন তফাৎ পাইনা আজকাল । তারপরেও এই তোমাকেই কোন এক কুক্ষণে(আপাতদৃষ্টিতে তাই ই মনে হচ্ছে) সম্প্রদান কারকের নিয়ম মেনে হৃদয়টা একেবারেই দান করে দিয়েছিলাম ।

যন্ত্রের বিপরীতে,এই আমার নিজের কিছুটা বর্ণনা তো দেয়াই উচিৎ । তোমার ভাষ্যমতে,আমি হলাম আধুনিক মীনাকুমারী । কথায় কথায় অ্যাকুয়াস হিউমারের নোনা রস বিসর্জন করে বালিশ ভিজানো আমার প্রতিদিনকার প্রধান কাজ । তাই বুঝি আমাকে কাঁদাতে তোমার খুব আনন্দ ?

আমার বসবাস স্বপ্নের দুনিয়ায় । সে স্বপ্নে রাজকুমার আছে,রাজকুমারী আছে । প্রথমদিকে রাজকুমারের চেহারাও দেখতে পেতাম । কিছুদিন হল,সবই ধোঁয়াটে লাগে । তোমার ছবিটাই বেশি অস্পষ্ট ।

ভালোবাসার প্রতিটা জিনিসকেই খুব ভালোবাসতাম । ভালোবাসতাম ভালোবাসার গল্প,কবিতা । গল্পের নায়িকার সুখে হাসতাম,আর দুঃখে কেঁদে বুক ভাসাতাম । এতো আবেগপ্রবণ মানুষ হয়ে তোমার মত জড়পদার্থের সাথে কিভাবে জ়ড়ালাম বল তো ?

কোন একদিন কোন এক উপন্যাস পড়ে কাঁদছিলাম আর হেঁচকি তুলছিলাম । অনেক জটিল রোগে আক্রান্ত উপন্যাসের নায়িকাটি । মৃত্যুর আগে সে তার ভালোবাসার মানুষটিকে সারাক্ষণ পাশে পেয়েছে । মারা যাওয়ার অল্প কিছুদিন আগেই নায়ক তাকে বিয়ে করে নায়িকার শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করেছিলো । ভাবছিলাম,এতো ভালোবাসা পেলে অল্প আয়ুতেও আমার কোন আপত্তি নেই ।

সেদিন রাতে তুমি ফোন দিলে ।

অনেক আবেগ নিয়ে তোমার কাছে জানতে চাইলাম,"আচ্ছা,ধরে নাও,আমার অনেক বড় বিপদ হল । দুইদিনের মাথায় আমাকে বিয়ে করতে হবে তোমার । কি করবে তখন তুমি ?"

তুমি বললে,"কি ধরনের বিপদ ? তোমার বিয়ের জন্য প্রপোজাল আসার কথা বলছ তো ?"

আমি বললাম,"নাহ্‌,সে ধরনের কিছু না । মানুষের কত রকমের বিপদ আপদ হয় না ?"

ঃতোমার এই মূহুর্তে বিয়ের জন্য বাসা থেকে চাপাচাপি হওয়া ছাড়া আমি তো আর কোন বিপদ দেখি না । তবে যদি,এরকম কিছু হয় তাহলে এমন গিট্টু লাগাবো,যে পাত্র তোমাকে বিয়ে করা তো দূরেই থাক,নাম শুনলেই ফিট্‌ হয়ে যাবে । হা হা হা...

দিলে তো আমার আবেগের শ্রাদ্ধ করে ? ঠাট্টা টা কোন জায়গায় করা উচিৎ তাও তো দেখি বোঝ না । তবুও,তোমায় যখন বলেছিলাম,"ঠাট্টা করো না । বলোনা,করবে বিয়ে ?"

তুমি বললে, "দেখো,আবেগের কথা বলে লাভ নেই । জীবনটা উপন্যাস না । এখন বিয়ে করলে তোমাকে তুলব কই ? আমার বাপ তো সোজাই বলবে,"নিজেই আমার ঘাড়ে চেপে খাচ্ছ । এখন আবার আরেকজন কে ধরে নিয়ে এসেছ । ব্যাপারটা কি ?"

চাকরি-বাকরি না করলে,বিয়ের পর যাব কই ? খাব কি ?

মিথ্যে করেই নাহয় বলতে,বিয়ে করবে । সত্যি সত্যি কি আর ২-৩ দিনের ভিতরই বিয়ে করে ফেলতাম ? আমার অভিমানটুকুও কি এতোটাই দুর্বোধ্য ?

আমি রাগ করে তোমায় বললাম,"প্রশ্নটা এম্নিতেই করেছিলাম । ভয় পেয়ো না,২-৩ দিন কেনো,২-৩ বছরেও আমাকে বিয়ে করতে হবে না তোমার । "

তুমি বললে,"বাঁচালে আমাকে । আমিতো আরও ভাবলাম,তুমি সিরিয়াসলিই বলছ বুঝি ।"

আড়ালে ছিলাম বলে আমার আহত চোখ তুমি দেখতে পাওনি । তোমার মতে,প্রতিদিন কত ছোট ছোট কারণে(বেশির ভাগ সময় অকারণে) অভিমান করতাম । কত ছোট খাটো কারণে কান্নাকাটি করতাম । আচ্ছা,তোমার কি মনে পড়ে শেষ কবে তুমি আমার হাত ধরে "ভালবাসি" শব্দ টা উচ্চারণ করেছিলে ? আমার মনে পড়ে না ।

আমার বান্ধবীদের বয়ফ্রেন্ডরা চব্বিশ ঘন্টার নিউজ চ্যানেলের মত ওদের খোঁজ নিতো । ভার্সিটি তে ঢুকতে একবার,বের হওয়ার সময় একবার,আর প্রত্যেক ক্লাশের ফাঁকে ফাঁকে গুটুর গুটুর তো চলছেই । আর আমার ব্যাপার ছিলো উলটা । প্রথম ২-৩ বছর তো কেউ বিশ্বাসই করে না আমার কারো সাথে কিছু থাকতেও পারে ।

তোমাকে যখনই ওদের কথা বলতাম । তুমি বলতে,"ফালতু বকবক করার মত এতো সময় আছে নাকি আমার ?"

কনফিউজড হয়ে যেতাম আমি । সব couple এর আচরণ ছিলো একরকম,আর আমাদের অন্যরকম ।

দুজনের ভার্সিটি একই এলাকায় ছিলো,তারপরেও সহজে দেখা হতো না আমাদের । ফোনের কথা তো বাদই দিলাম । তবুও যা দেখা হত,ঘন্টার পর ঘন্টা আমি একাই বকবক করে যেতাম । আর,তুমি তোমাদের ক্লাশে কি ইন্টারেস্টিং ব্যাপার নিয়ে আলোচনা হয়েছে সেটা আমাকে জোর করে শুনাতে চাইতে । তখন মনে হত,যন্ত্র-পাতির কথা শুনতে শুনতে আমি নিজেও রোবটিক হয়ে যাচ্ছি ।

শেষ দিকে প্রায় প্রতিদিনই তোমার উপর রাগ করে ফোন রেখে দিতাম,দেখা করতে চাইতাম না । কেমন অসহ্য লাগত তোমার উদ্ভট আচরণ । কতদিন তোমাকে বলেছি,"চল আজকে তোমাদের বাসায় যাব । তুমি বলবে,আমি তোমার ক্লাশমেট ।"

তুমি সাথে সাথে মানা করে দিলে ।

বললে, এইসব ফালতু ঢং এ আমি নাই । আমাকে বাংলা সিনেমার নায়ক পাইসো,যে মা কে দেখায় বলবো,"দেখ মা তোমাদের বউমাকে নিয়ে এসেছি । "

-আমি কি তাই বলেছি নাকি??আমার সব ফ্রেন্ডরা ওদের হবু দেবর,ননদের সাথে কত মজা করে কথা বলে । ওদের জন্মদিনে গিফ্‌ট দেয় । আর,আমি তো আজ পর্যন্ত নিধিকে দেখলামও না ।

ঃবিয়ের পর ডেইলি দেখবা । তখন দেখতে দেখতে পঁচেও যাবা । এখন আগ বাড়ায়ে এতো পীরিতের দরকার নাই ।

একসময় ভাবতে শুরু করলাম আমি আসলে তোমার শোপিস গার্লফ্রেন্ড । এই যুগে সবারই গার্লফ্রেন্ড আছে,কিন্তু তোমার নাই,সেটা বিরাট লজ্জার ব্যাপার হতো । একারণেই ফোন করে,আর মাঝে মাঝে আমার সাথে দেখা করে তোমার গার্লফ্রেন্ড আছে,সেই ব্যাপারটা নিশ্চিত রাখতে ।

কি ভেবে যেনো সিদ্ধান্ত নিলাম,তোমার একটা ছোট-খাট পরীক্ষা নেয়া যাক । দেখি,তোমার দৌড় কদ্দুর । ঠিক করে ফেললাম,তোমাকে একদিন বলব,"তোমার সাথে থেকে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে,দূরে সরে যাওয়াই ভালো ।" দেখি তুমি কি কর ?

যেদিন তোমাকে আমার সিদ্ধান্ত জানালাম,মাথা নিচু করে চুপচাপ আমার সব অভিযোগ তুমি মেনে নিলে । কিছুই বললেনা । কথার ফাঁকে শুধু একবার অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিলে ।

চলে আসার সময় একবার পিছে ফিরে তাকালাম । তুমি সেভাবেই বসে ছিলে ।

রাগে,অভিমানে কান্না চলে এলো । একবারও কি আমায় আটকাতে পারলেনা ? কেনো আপত্তি করলে না ? কেনো একবারও বললে না,"যেও না..."

আজ একমাসে একবারের জন্যও আমার কথা মনে পড়েনি তোমার ? আর তোমার মত রোবটের কথা ভেবে প্রতিদিন গ্যালন গ্যালন অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছি । কেনো এতো ভাবি তোমার কথা ? তোমার থেকে দূরে সরে আসার সিদ্ধান্ত তো আমারই ।

ভালোই আছি আমি । আগে বাবা-মার চোখ ফাঁকি দিয়ে তোমার সাথে কথা বলতে হত । অনেকদিন হল মিথ্যেও বলি না ।

তারপরেও দিনগুলি মিস করি অনেক । প্রতিটা দিন তোমার ফোনের জন্য অপেক্ষা করেছি । একবার যদি বলতে "ফিরে এসো", সব ছেড়ে ছুড়ে তোমার কাছে চলে আসতাম ।

এখন চাইলেও ফিরে আসার কোন উপায় নেই । আজ আমাকে ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে । মেয়ে তাদের পছন্দ হলে,খুব সম্ভবত আজই আমার এঙ্গেজমেন্ট ।

তোমার কথা ভেবে সবসময় বিয়েতে আপত্তি জানিয়ে এসেছি । আর কত বল ?

ঃ নীলু...

মার গলার আওয়াজে পেছন ফিরে তাকালাম ।

- জ্বী আম্মু ঃ ওরা তো একটু পরেই চলে আসবে । শাড়িটা পরে ফেল্‌,মা ।

- হুম্‌,পরছি । ঃ হালকা করে একটু সেজে নিস । তোকে কত করে বললাম পার্লারে গিয়ে সেজে আয় । আমার কোন কথাই তো শুনিস না । তোর বান্ধবীগুলাও অকর্মার ঢেঁকি । সেই কতক্ষণ আগে সূচি কে ফোন দিয়েছি । ওই মেয়ের তো এখনো কোন খবর নেই ।

- হুম । ঃ হুম কি ? তুই আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস ? এই নীলু ...

-হুম ।

ঃ তাড়াতাড়ি কর । ওরা চলে আসবে যেকোন সময় ।

খাটের উপর আম্মু সবুজ রঙের জামদানি শাড়ি রেখে গেছে । সবুজ রঙটা তূর্যের অনেক পছন্দের । কোনদিন যেন সবুজ রঙের ড্রেস পরে তোমার সাথে দেখা করতে গেছি । আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তুমি বললে,"তোমার সব ড্রেস সবুজ রঙের হওয়া উচিৎ ।

" আমি বললাম,"কেনো ? আমি কি মোগলি ? যে,সবসময় সবুজ কাপড় পরব ? তবে,কোনদিন যদি পাকাপাকি ভাবে জঙ্গলে থাকার প্ল্যান করি তাহলে ভেবে দেখব ।"

একটু বিরক্তই হয়েছিলাম ।প্রশংসাটাও ঠিকমত করতে জানোনা । দুনিয়ার আজাইরা কাজ তো ভালোই জানো ।

চোখে কাজলটা ঠিকমত দিতে পারছিনা । একটু পর পর চোখ ভর্তি হয়ে যাচ্ছে পানিতে । তবুও মার কথা মত অনেক সময় নিয়ে সেজে ফেললাম ।হাত ভর্তি সবুজ রঙের চুড়ি পরলাম । সাজগোজে আমার সারাজীবন অ্যালার্জি ছিলো...সামান্য লিপস্টিক দিলেও রক্তচোষার মত মনে হতো নিজেকে...সেই লিপস্টিকও আজ বেশ খানিকটা দিয়ে ফেললাম ।

তুমি সাজগোজ একদম পছন্দ করতে না । আচ্ছা,তুমি যদি আজ আমাকে এই অদ্ভুত সাজে দেখতে,তাহলে কি বলতে??

ওরা এসে গেছে বোধহয় । মা-বাবা ছোটাছুটি করছেন অতিথি আপ্যায়নের জন্য । একটু পর আমাকে ওদের সামনে নিয়ে যাওয়া হবে । আমি সেলফোন হাতে নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছি ।

এখন মনে হচ্ছে অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি । আজকের দিনেও তোমাকে ভুলতে পারছিনা । কেনো তোমাকে ছেড়ে এলাম ? আমার একজনের ভালোবাসাই তো আমাদের দুজনের জন্য যথেষ্ট ছিলো ।

মা আমকে নিতে এসেছেন ।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মার সাথে রুম থেকে বেরিয়ে এলাম । বেরোনোর আগে ফোনটা খাটের উপর ছুড়ে ফেললাম ।

৪-৫ জন এসেছেন । মা আমার সাথে আসতে আসতে বলেছিলেন ছেলের মা,বাবা,বোন,ছোট খালা বা ফুফু টাইপ কেউ একজন এবং ছেলে নিজেও এসেছেন । সবাইকে গিয়ে যাতে সালাম দেই তারপর কেউ কিছু জানতে চাইলে,হাসিমুখে যেন সবার কথার উত্তর দেই । তবে আমার কোন আচরনেই যাতে আমাকে বেহায়া মনে না হয়,সেদিকে বিশেষ ভাবে লক্ষ্য রাকতে বললেন ।

সবাই বসে আছেন ড্রয়িংরুমে । মা যখন আমাকে নিয়ে ঢুকলেন সালামের কথা মাথা থেকে একদমই বেরিয়ে গেলো । মা অনবরত গায়ে চিমটি কাটছিলেন অবশ্য । কিন্তু,সংকেতটা ওই মূহুর্তে ধরতে পারিনি । গিয়ে সবার সামনে বসে পড়লাম ।

আগেরদিন রাতে মা সব শিখিয়ে-পড়িয়ে নিয়েছিলেন । কথা ছিলো,নাস্তা-পানি যাই আনা হোক না কেনো আমি নিজ হাতে তুলে দিব ।

সব ভুলে গেলাম । মাথা নিচু করে রুমে ঢুকেছিলাম,বসেও ছিলাম সেভাবেই । কান টা ঝাঁ ঝাঁ করছে । আশেপাশের কারো কথাই মাথায় ঢুকছে না ।

বারবার মনে হচ্ছে,"আমি ঠিক করছি তো ?"মাথা উঠিয়ে কি ছেলের দিকে তাকানো উচিৎ আমার ? কোন অপদার্থের ঘাড়ে চাপতে যাচ্ছি,কে জানে ?

১০-১৫ মিনিট ধরে বসে আছি,কিন্তু মনে হচ্ছে কত কাল পেরিয়ে গেছে । মাথা নিচু করে বসে থাকতে থাকতে ঘাড় ব্যাথা হয়ে গেছে রীতিমত ।

মজার ব্যাপার হল,আমাকে কেউ কিছু জিজ্ঞাসাই করছে না ।

হঠাৎ করে আমার সেলফোন বেজে উঠল । আমি চমকে উঠে আড়চোখে রুমের দিকে তাকালাম । তূর্য না তো ? যদি তূর্য হয় ? আমি ছটফট করে উঠলাম ।

ছেলের মা ব্যাপারটা খেয়াল করলেন । তিনি বললেন,"কোন সমস্যা,মা ? জরুরী ফোন হয়তো । চাইলে,গিয়ে দেখতে পারো । "

সাথে সাথে মা বলে উঠলেন,"না,না,তেমন জরুরি কিছু না । পরে কথা বললেও চলবে ।"

ছেলের খালা কিংবা ফুফু তখন বললেন,"ছেলে-মেয়ে একজন-আরেকজন কে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলে করে নিতে পারো । "

মা বললেন,"অবশ্যই,অবশ্যই ।"

আমি মাথা আরো নিচু করে ফেললাম । মনে-প্রাণে চাইছি,আমার চেহারা যাতে কেউ দেখতে না পায় । অথবা,দেখতে পেলেও আমাকে যাতে ড্রাকুলা,কিংবা আলিফ লায়লার কোন রাক্ষুসী(সারারাগুল)র মত দেখায় । এই বিপদ থেকে উদ্ধার হলে,প্রথমেই তূর্য কে খুঁজে বের করব । গুষ্টি কিলাই আমার ইগোর । ও ভালো না বাসলে নাই,আমি একলাই বাসব ।

হঠাৎ ছেলের মায়ের কথা কানে এলো...

"আংটি পরিয়ে দেয়ার কাজটা সেরে ফেলি কি বলেন আপা ? আমাদের তো মেয়ে খুব পছন্দ । অবশ্য পছন্দ তো ছবি দেখেই হয়েছিলো । আনুষ্ঠানিকতার জন্যই জন্য আসা । তারপর,ছেলে-মেয়ের কিছু বলার থাকলে বলে নিল । নীলুও যদি কিছু জানতে চায়,তাও জেনে নিল । তূর্য,তুই কি বলিস ? নীলুর সাথে কথা বলতে চাস্‌??"

তূর্য কিছু বলার আগেই মা বললেন,"হ্যাঁ আপা অবশ্যই । আগে আংটি পরানো হয়ে যাক্‌,তারপর আমি রহিমার মাকে বলে দিব,ও ছাদে নিয়ে যাবে দুজনকে । তানাহলে সবার সামনে লজ্জা পাবে কথা বলতে । সূচি আসুক,তারপর ওকে বলব ওদের সাথে যেতে । "

নাম শুনেই আমি মুখ তুলে ভ্যাবলার মত তাকিয়েছিলাম । প্রথম কিছুক্ষণ মনে হয়েছিলো স্বপ্ন দেখছি । সামনে তূর্য বসে আছে । স্যুট পরে বাবুসাহেব সেজে আছে ।

আমি হা করে তাকিয়ে আছি । কি হচ্ছে,কিছুই বুঝতে পারছিনা । আংটি পরানো হল । কেমন ঘোরের মধ্যে আছি,মনে হচ্ছে ।

আংটি পরানো শেষে তূর্যের ছোট বোন নিধি বলে উঠল,"আন্টি,আমি যাই ভাবী আর ভাইয়ার সাথে ।

" মা হেসে ফেলে বললেন,"যাবে তুমি ? ভালোই হল । সূচি মেয়েটা তো এখনো এলো না । আমি রহিমার মাকে বলে দিচ্ছি । ও তোমাদের কে দিয়েই চলে আসবে..."

মাথায় ঘোমটা টেনে ছাদে দাঁড়িয়ে আছি । নিধি কথা বলেই যাচ্ছে । আমি চুপচাপ শুনছি ।

"জানো ভাবী,তোমার কথা ভাইয়ার পেট থেকে বের করতে কত কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে আমার ? একমাস আগে কি জানি কি হল । ভাইয়া ঠিকমত খায় না,ঘুমায় না । কোন কারণে ভাইয়াকে ডাকলে,চমকে উঠে উদ্ভ্রান্তের মত এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে । ৪-৫ দিনের মধ্যেই না ঘুমিয়ে চোখের নিচে কালি ফেলে দিলো । মা তো টেনশনেই বাঁচে না ।

এদিকে ভাইয়ার দেশের বাইরে যাওয়ারও দিন ঘনিয়ে এসেছে । কিন্তু,এ নিয়েও ভাইয়ার মধ্যে কোন বিকার নেই ।

হঠাৎ করেই একদিন কথা নেই,বার্তা নেই বাবার সামনে গিয়ে বলে,"বাবা,আমি বিয়ে করব..."

বাবা তো আকাশ থেকে সজোরে ভূপতিত হলেন । যে ছেলে ছোটবেলায় একটা ফুটবল কিংবা ক্রিকেট ব্যাট এর জন্যও আবদার করেনি,সে ছেলে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বউ চায় । তুমি তো জানোনা,বাবা যে কি রাগী । বাবা কষে এক চড় লাগালো ভাইয়াকে ।

পরে অবশ্য,আমি ভাইয়ার থেকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রহস্য উদ্ধার করলাম । মাকে সব খুলে বললাম । ভাইয়ার ডায়েরীতে অবশ্য আগেই দেখেছিলাম । সুযোগ বুঝে হাত সাফ করে মাকে দেখালাম...

আমি আর মা মিলে বাবাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজী করে ফেললাম । তো সব ক্রেডিট কিন্তু আমার,বুঝলে ?

ভাবী,তুমি বিয়েতে রাজী হয়ে যেও । তোমার সাথে থাকলে হয়তো ভাইয়া গাধামি করে । কিন্তু,তুমি না থাকলে যা করে,সেটা বেশি অসহ্য ।

আমি সিঁড়ি তে দাড়াচ্ছি । তোমাদের কথা বলার থাকলে তাড়াতাড়ি সেরে ফেলো । বিয়ের পর সারাজীবন সময় পাবে । "

নিধি যেতেই,আমি তূর্যের দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম । তূর্য ভ্রু নাচিয়ে হাসতে হাসতে বলল,"তোমার না আমার বউ হওয়ার খুব শখ ? দেখলে,কিভাবে তোমার শখ পূরণ করে দিলাম ? "

-হাসবে না ,গাধা কোথাকার !! খুব যে দাঁত কেলাচ্ছো এখন ? ছাদ থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেই ? তূর্য দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলল,

ঃফেলে দিবে??দাও । ধাক্কা অবশ্য মারিনি । কাজল,চোখের পানি তে মাখামাখি আমি,তূর্যর স্যুটের বারোটা বাজাতে এগিয়ে গিয়ে তার বুকে মাথা রাখলাম শুধু...

ও তখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে...

আমি বললাম,"জড়িয়ে ধর,গাধা কোথাকার !! নিধি ঠিকই বলে তুমি গাধাও না,রামছাগল !! "

Share