অন্তরীক্ষে হিয়া

লিখেছেন - ফারহানা নিম্মী | লেখাটি 1181 বার দেখা হয়েছে

-আজকাল চোখেও কি যেন হয়েছে । খালি কড়কড় করে ,আর একটু পরপর পানি এসে

বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা । চোখে তো এম্নিতেই কম দেখি,এর উপর এমন চলতে থাকলে

চোখটাই মনে হয় যাবে । দেখি,আজকালের ভিতর মোর্শেদ কে বলতে হবে । ডাক্তারের

কাছে গেলে এই যন্ত্রনার কোন না কোন চিকিৎসা তো পাওয়াই যাবে । ভালো হতো

যদি,চোখ দুইটা উপড়ে ফেলা যেত । ছাতার কড়কড়ানি-ফড়ফড়ানি একেবারেই বন্ধ হয়ে

যেতো ।

 

সকাল থেকে জ্বরে কাতর জেসমিন,শুয়ে শুয়ে এইসব আবোল-তাবোল ভাবছিলেন । ভোরে

ঘুম থেকে উঠার পর হঠাৎ আবিষ্কার করলেন,বিছানা থেকে উঠার শক্তিটুকুও শরীরে

নেই । জোর করে উঠার চেষ্টা করতে গিয়ে রক্তবমি করে বিছানার চারপাশ ভাসিয়ে

ফেললেন ।

 

-এত রক্ত ! মরে-টরে যাব নাকি ? না না,এত তাড়াতাড়ি মরলে তো হবে না । অনেক

কাজ বাকী এখনো । অর্ণা আর আদ্র কে মানুষ করতে হবে , ওদের বিয়ে দিতে হবে ।

মোর্শেদ টা একেবারেই গাধা,ও একলা এত কিছু কিভাবে করবে?

 

-কে যেন ছুটে এসে,আবার শুইয়ে দিলো । মোর্শেদ এর বউটা নাকি ? একদমই বাচ্চা

মেয়ে । কেমন করে যে পুরা সংসার টা সামলাচ্ছে,না দেখলে বিশ্বাস হয় না ।

মাঝে মাঝে আমার সাথে একটু-আধটু খিটমিট করে । কিন্তু,দুই বাচ্চা মিলে

মেয়েটাকে রোজ যেভাবে জ্বালিয়ে মারে,সহ্য করাও তো মুশকিল । দেখি এযাত্রা

বেঁচে গেলে,মোর্শেদ কে বলব,মেয়েটাকে একটা ভালো শাড়ি কিনে দিতে ।

কে চিৎকার করছে ? অর্ণা নাকি ? দুইটা থাপ্পড় মেরে মেয়েটাকে বসিয়ে রাখলে

কি হয় ? মাথাটা তো ধরিয়ে ফেলল । মোর্শেদ তো আবার ছেলে-মেয়ে দুইটা কে

আধুনিক উপায়ে মানুষ করতে গিয়ে,বিচ্ছু বানিয়ে ছেড়েছে । মারলে নাকি

বাচ্চাদের মনে কেমন প্রভাব পড়ে । বাবা-মা তো আমাদের ছয় ভাই-বোনকে মারতে

কখনো কিপটামি করে নাই । কই,আমাদের তো কিছু হয় নি ?

 

মোর্শেদ তো আবার স্কুলের মাষ্টার । তাই ছেলে-মেয়ে কে মারা তার জন্য

নীতিবিরোধী । আমি তো আর কিছু না । মেয়েটা বিছানার কাছে আসুক খালি । মাপমত

হাতের কাছে পেলে,কষে দুইটা থাপ্পড় মারব ।

 

আচ্ছা,কি হয়েছে আমার ? পাগল হয়ে গেছি নাকি ? মাথায় এসব কি হাবিজাবি ঘুরছে

? এখন আর কিছু চিন্তা করব না । শুয়ে থাকব শুধু । প্রজেক্ট থাপ্পড় আপাতত

বাদ ।

 

আরে ! এইতো এইতো,মেয়েটা এসেছে বিছানার কাছে । আরেকটু কাছে আসুক খালি ।

থাপ্পড়টা মেরেই ঘুমাব ।

 

-ফুপ্পি,তোমার কি জ্বর হয়েছে ? পা টিপে দিই আমি । আম্মু আমাকে পা টিপে

দেয়া শিখিয়েছে । দেখো,তোমার জ্বর একদম ভালো হয়ে যাবে । আম্মু,আব্বুকে ফোন

করে বলেছে তোমার জন্য ডাক্তার আনতে ।তুমি কিন্তু মরে যেও না । কেমন ?

 

আরে ! বলে কি এই ফাজিল মেয়ে ! আশেপাশে কেউ নাই এখন;দিব নাকি একটা থাপ্পড় ?

 

না থাক । মরে-টরে গেলে আবার পাপ লাগবে । চোখ টা খালি ঝাপসা হয়ে আসছে ।

মোর্শেদ এর বউ টা মনে হয় কিছু একটা বলছে মাথার কাছে এসে ।

 

-বিড়বিড় করছ কেনো মালিহা ? জোরে বল,কি বলবা । কানেও তো শুনি না মরার ।

মোর্শেদ কই ? গাধাটারে একটু মানুষ কইরো,বুঝছ । তুমি তো ওরে চিন না । একদম

সোনার টুকরা একটা ছেলে । আমার বদ স্বামী টা যখন আরেকটা বিয়া করে,আমারে

বলল,"তুমি যাইতে পারবা না । আমি আমার দুই বউ এর সাথেই থাকতে চাই ।"

কোত্থেকে জানি গাধাটা উড়ে এসে বদটারে একটা কঠিন চড় মারল । হি হি

হি......। বুড়া হাবড়াটার উচিৎ শিক্ষা হইসিল,বুঝছ ?

 

এইযে দেখতেসো,তোমাদের ঘাড়ের উপরে বইসা বইসা খাইতেসি, না খাইলেও পারতাম ।

কিন্তু,গাধাটার মায়া ছাড়তে পারি না বুঝছ ? গাধাটা কই ? এখনো আসে নাই ?

ওরে বলবা,ছেলে-মেয়েগুলারে একটু মাইর-টাইর দিতে । তোমার ফাজিল মেয়ে আমারে

বলে,আমি যাতে না মরি । এত তাড়াতাড়ি মরব না বুঝছ । গাধাটা আসুক,তারে দেইখা

মরি ।

 

আমার তো বাচ্চা-কাচ্চা নাই । আমার বাকী ভাই-বোনগুলা বিয়ার পর আমার এই

দুর্দশা দেখে যখন খালি আহা-উহু করে,তখন মোর্শেদ টাই তো আমারে দেখে শুনে

রাখার দায়িত্ব নিয়ে ফেলল । গাধাটা নিজেও তো তখন পড়ালেখা করে । আমার কিছু

জমানো টাকা-পয়সা আছে বুঝছ,আমার আলমারিতে পাবা । তোমরা দুইজন খরচ কইরো ।

তুমি নিজে একটা ভাল শাড়ি নিবা মনে কইরা ।

 

মালিহা,ও মালিহা ,চোখের সামনে তো অন্ধকার হয়ে আসে । গাধাটারে বলো

না,তাড়াতাড়ি আসতে । আমার ডাক্তার-ডুক্তার লাগবে না ।

 

মোর্শেদ ..... ও মোর্শেদ.......

হাঁপাচ্ছে জেসমিন । তারপরেও তার আদরের ভাইটাকে ডেকে যাচ্ছে । ভাইটাকে শেষ

দেখা কি দেখতে পারব না ?

 

মালিহা বাসা থেকে ছুটে বেরিয়ে গেলো । বাচ্চা গুলোকে একলা রেখেই বের হল ।

মোর্শেদের আসতে এত দেরি হচ্ছে কেন কে জানে ?

কাছেই ডাক্তারের একটা ক্লিনিক আছে । কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটার আগেই

পৌঁছাতে পারব তো ? আপা কে বাঁচাতে হবে । আজ এত কষ্ট লাগছে কেন,বুঝতে

পারছে না সে । সবসময় এই মহিলাকে বাড়তি একটা বোঝা ছাড়া তো কিছুই মনে হয় নি

। শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘন ঘন চোখ মুছছে সে,আবার দুচোখ ভর্তি করে পানি আসছে ।

মানুষের মৃত্যু এত ভয়ংকর !

 

মোড়ের কাছেই দেখা গেলো,মোর্শেদ ছুটতে ছুটতে আসছে । ওইতো,ডাক্তারও আছে

সাথে । স্বস্তি ফিরে পেলো মালিহা । সব ঠিক হয়ে যাবে নিশ্চয়ই ।

-এযাত্রা আপা বেঁচে গেলে,আর কখনো,আপার সাথে রাগারাগি করব না,ভাবল মালিহা ।

 

ডাক্তার নিয়ে,মোর্শেদ এর পিছে পিছে ঘরে ঢুকতেই দুজন যে দৃশ্য দেখল,তাতে

দুজনই স্তব্ধ হয়ে গেলো । দেখল,অর্ণা তার ফুপ্পিকে ডেকেই যাচ্ছে । কিন্তু

জেসমিনের কোন সাড়া-শব্দ নেই । মোর্শেদ তার আপার বিছানার কাছে গিয়ে

বারকয়েক তার আপা কে ডাকল । শেষে দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে হাঁটু ভাঙ্গে পড়ে

গেল ।

 

-আমার আপা....আমার আপা আমাকে ছেড়ে যায়নি, আমি জানি । এই আপা....ওঠ না ।

দেখ,আমি এসেছি ।

 

কোন জবাব এল না,তার মমতাময়ী আপার মুখ থেকে ।

 

অর্ণা ঘাড় ঘুরিয়ে,তার আব্বু কে বলল,"আব্বু,ফুপ্পি কি মরে গেছে ? "

 ...................

Share