স্কুলের "সম্রাট আকবর"

লিখেছেন - ফারহানা নিম্মী | লেখাটি 1208 বার দেখা হয়েছে

সকাল ১০ টায় হুড়োহুড়ি করে স্কুলে ঢুকতে গিয়েই স্কুল-গেইটে রাম বাড়ি

খেলাম...সাথে সাথে কপালের কাছে ফুলে আলু বের হয়ে গেলো ..টনটন করে উঠলো

মাথা টা ।  আরেকটু দেরি হলে,স্কুলে ঢুকতেও দিতো না । সকাল ৯টায় ঘুম থেকে

উঠে মুখ ধুয়ে,যখন নাস্তার টেবিলে এলাম,মার বকুনির সাথে,বাবার ঝাড়া ৪৫

মিনিটের একটা free lecture ও শুনতে হল ।

 

ধুত্তেরি,আজকের দিনটাই কুফা !! ক্লাশে গিয়েও মনে হয় নুরুজ্জামান স্যার এর

মাইর খাব আজকে । আমাদের এই স্যার আবার মারপিটে অনেক ওস্তাদ...আমার তো মনে

হয়,উনার কাছে কুংফুর সব বেল্টই পাওয়া যাবে । স্যার হলেন গিয়ে আমাদের

অঙ্কের শিক্ষ...মারামারির অসাধারণ দক্ষতার সবটুকুই তিনি মহাসুখে আমাদের

উপর প্রয়োগ করেন ।

 

আমরাও তো আর কম যাই না । লজ্জা-শরম ত্যাগ করে গন্ডার কেও হার মানিয়েছি ।

স্যার এর ক্লশে,কি ফার্স্ট গার্ল,আর কি লাস্ট ? স্যার এর বেত এর মধু খায়

নি,এমন কেউ নেই । কেউ স্যার এর মাইর থেকে ভুলে বেঁচে গেলে,বাসায় গিয়েই

শোকরানা নামাজ পড়ে ফেলে । আমরা তো স্যার এর ভয় এ তটস্থ থাকি ই,আমার

ধারণা,স্কুলের অন্যান্য শিক্ষক,এমন কি প্রিন্সিপাল স্যার ও তাকে ভয় পান ।

 

কপাল এমন ই,প্রথম ক্লাশ টাই নুরুজ্জামান স্যার এর । যদি,স্যার এর আগে

ক্লাশে ঢুকতে না পারি,তাহলে লাশ হয়ে বের হতে হবে । দৌড়ে দোতলার ক্লাশরুমে

ঢুকে দেখি,স্যার পৌছাননি এখনও...

 

বিধি বাম; ফার্স্ট বেঞ্চ টাই খালি শুধু । স্যার এর ক্লাশ বলে,সবাই পিছনের

বেঞ্চগুলো দখলে নিয়ে ফেলছে । কি আর করা ? সেখানেই বসলাম । তারপর,চোখের

কোণা দিয়ে তাকিয়ে দেখি সবাই আমার দুর্দশা দেখে মিটিমিটি হাসছে ।

দাঁড়া,বদের দল,ক্লাশ টা শেষ হোক খালি,তারপর সবাইকে একহাত দেখে নিব...

 

হঠাৎ ক্লাশের সবাই একদম চুপ । একটা পিন পড়লেও এখন শোনা যায়,এই দশা । কেউ

কেউ আড়ালে ঢোক ও গিলে ফেলল । স্যার তার বিশাল সাইজের তেল মাখানো বেত নিয়ে

ক্লাশে প্রবেশ করলেন । কি তার স্টাইল !! দেখে মনে হচ্ছে,সম্রাট আকবর তার

তলোয়ার হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন । আমরা সবাই,তার ছাত্র-ছাত্রী

নই,তার শত্রু । যারাই পীথাগোরাসের উপপাদ্যের অবমাননা করবে,তিনি সকলকেই

মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করবেন । ভয়ে সবাই সিঁটিয়ে গেলো ।

 

এসেই তার চেয়ারে বসলেন এবং রোল কল করলেন । অবশেষে এলো,পড়া ধরার পালা ।

 

-রোল নাম্বার এক

(ডাকার সাথে সাথেই বিনু স্যারের টেবিলের কাছে গিয়ে দাড়ালো ।)

 

-উপপাদ্য পড়েছিস ?

 ঃ জ্বী স্যার ।

-সাধারন নির্বচন টা বল ।

 ঃ ইয়ে মানে,স্যার...

-মানে মানে,আবার কি ?(ধমকের সুরে বললেন,স্যার)

ঃ স্যার বিশেষ নির্বচন পারি ।

-তোকে কি আমি তাই জিজ্ঞাসা করলাম ?

ঃ স্যার,সাধারন নির্বচন ভুলে গেছি ।

-হাত দে ।

 

বেচরী একবার হাত সামনে দেয়,দশবার পিছায় ।

কিছু ভাবার আগেই শাঁই শাঁই করে আকাশ থেকে হাতের উপর কি যেন একটা নেমে

এলো,মনে হয় । আমরা সবাই হা করে তাকিয়ে আছি... বিনুর এই অবস্থা,না জানি

আমাদের কি হয় ?

 

আল্লাহর কাছে দোয়া করছি,আজকে যাতে রোল নাম্বার তেইশ টা না ডাকে । কপালের

ব্যাথাটাই এখনো গেলো না,আবার হাতে বেতের বাড়ি !! আয়াতুল কুরসী টা পারি

না,নাহলে পড়া যেত । আজকে কোনমতে ছাড়া পেলে,বাসায় গিয়েই শিখে ফেলব ।

আল্লাহ এখন নারাজ না হলেই হয় ।

 

নারাজ মনে হয় হয়ছেন । একটু পরেই শুনতে পেলাম,স্যারের গর্জন । কান টা ঝাঁ

ঝাঁ করছে । মনে হচ্ছে,অনেক দূর থেকে কেউ ডাকছে ।

 

-রোল নাম্বার তেইশ

উঠে গেলাম ধীর পায়ে ।

 

-বোর্ড এ চিত্র দেয়া আছে । দেখে দেখে 'প্রমাণ' টা বল ।

 বোর্ডে তাকালাম,হিজিবিজি কি যেন একটা আঁকা তাতে । আর তাছাড়া,বিনু যেখানে

মার খেয়েছে,সেখানে আমার পড়া পারা টা তো ট্রেডিশন বিরোধী । মিন্ মিন করে

বললাম,

ঃ স্যার,পড়া পারি না ।

 

এরপর কি হল,বুঝতেই পারলাম না । মাতালের মত দুলতে দুলতে বেঞ্চে এসে বসে

পড়লাম । কোন ব্যাথার অনুভূতি ই হচ্ছে না । মার কি,তাহলে খাই নি ?

বুঝতে পারলাম একটু পরেই । যখন হাত টা নাড়তে গেলাম । মনে হচ্ছে কেউ,হাতটা

ধরে আগ্নেয়গিরির লাভায় চুবিয়ে দিয়েছে । ব্যাথায় চোখে পানি চলে এল ।

 

মনে মনে,স্যার কে একশ অভিশাপ দিয়েছিলাম ।

 

অভিশাপের ফলেই কিনা জানিনা,অল্প কিছুদিন পরে স্যারের একটা খারাপ ধরনের

এক্সিডেন্ট হল । বেশ অনেকদিন স্যার বিছানায় ছিলেন । অনেকদিন ক্লাশ ও নিতে

পারেননি । কোথায় সবাই খুশি হবে,তা না,দেখি সবাই মুখ কালো করে বসে আছে ।

বুঝলাম ভীষণ রাগী এই মানুষ টাকে সবাই খুব ভালোবাসে ।

 

স্কুলের দিনগুলো কে ভীষণ মিস করি । সবচাইতে বেশি মিস করি নুরুজ্জামান

স্যার কে । মার এর কারণেই কিনা জানিনা,স্কুল টীচার এর কথা আসলেই সবার আগে

নুরুজ্জামান স্যার এর কথা মনে পড়ে ।

Share